শনিবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম খোমেইনী (র.): যুগান্তকারী বিপ্লবের নেতা

পোস্ট হয়েছে: জুন ১৫, ২০২১ 

news-image
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
প্রত্যেক বছর খোরদাদ মাসের মাঝের তারিখটি (৪ জুন) মহান ইরানি জাতিকে এবং একই সাথে বিশ্বের সকল মুক্তিকামী মানুষকে এক অশেষ দুঃখ ও শোকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যা ভোলার নয়। এই শোক এমন  একজন মহান, সাহসী ও শক্তিশালী নেতাকে হারানোর শোক- যিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপ্লবের নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে ইরানি জাতিকে আড়াই হাজার বছরের স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র ও বিজাতীয় আধিপত্যের কবল থেকে মুক্ত করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, অত্যন্ত রূঢ় বাস্তবতা ছিল এই যে, মহান ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পূর্বে ইরানের বুকে এমন এক সংস্কৃতি বিরাজমান ছিল সংক্ষেপে যার চেতনা ছিল ‘আমরা পারব না- আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’ অর্থাৎ মনে করা হতো যে, পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভর করা ব্যতীত আমাদের পক্ষে বেঁচে থাকা- যিন্দেগী যাপন করা সম্ভব নয়। এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শাহী ইরানের সরকারি কর্তাব্যক্তিরা এমনকি দেশী বিশেষজ্ঞদেরকে শিল্পোৎপাদনের অনুমতি পর্যন্ত দিত না। ইসলামি বিপ্লব ইরানি সমাজে বিরাজমান সংস্কৃতির ও তার ভূমিকার ওপর বিরাট ও সুগভীর প্রভাব বিস্তার করে। ইসলামি বিপ্লব ইরানি জনমনে এ প্রত্যয় সৃষ্টি করে যে, কোনো জাতিকে যা পরিবর্তন করে তা হচ্ছে তার সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি। এ কারণে হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) যে বিপ্লবে নেতৃত্ব প্রদান করেন তিনি সে বিপ্লবকে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব হিসেবে গণ্য করতেন। তিনি আত্মবিশ্বাস ও সৃদৃঢ় ঈমানী চেতনা সহকারে মহান ইরানি জাতিকে তার স্বকীয় প্রকৃতির দিকে দিকনির্দেশ করেন।
এ কারণে ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর বিগত ৪২ বছরে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কৃষি ও শিল্প সহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবং সামরিক, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি সহ অন্য সমস্ত ক্ষেত্রে যে নজিরবিহীন উন্নতির অধিকারী হয়েছে তা হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) কর্তৃক ইরানি জাতিকে আত্মপরিচিতি ও আত্মবিশ্বাসে উৎসাহিতকরণের নিকট ঋণী।
হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) সাংস্কৃতিক বিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি একদিকে যেমন অসুস্থ সংস্কৃতি, ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি ও পরনির্ভরশীলতার সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করেন, তেমনি সঠিক সংস্কৃতিকে ঐশী সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য করেন এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ওপরে বিরাট গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী ব্যবহার, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক চিন্তার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর বার বার জোর গুরুত্ব আরোপ করেন।
হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) ভাষার ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার হেফাযত এবং নিজেদের ভাষায় বিজাতীয় পশ্চিমা শব্দ ও পরিভাষা ব্যবহার পরিহার করার জন্য তাকীদ করতেন। তিনি দেশী ভাষাসমূহে বিজাতীয় পশ্চিমা শব্দ ও পরিভাষা ব্যবহার করাকে জাতিসমূহের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার বরখেলাফ বলে গণ্য করতেন ঠিক যেভাবে আপনারা বাংলাদেশী জনগণ মাতৃভাষার হেফাযত ও মর্যাদার লক্ষ্যে অভ্যুত্থান করেছিলেন।
হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহকে এবং সাধারণ শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা ও দ্বীনী শিক্ষার প্রতিষ্ঠানসমূহ সহ সমাজের সংস্কৃতি বিনির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে যে কোনো সমাজের সংশোধন ও সংস্কারের পথ ও মাধ্যম হিসেবে গণ্য করতেন।
হযরত ইমাম খোমেইনীর (র.) দৃষ্টিতে স্বাধীনতা, আত্মবিশ্বাস, আধিপত্য মেনে না নেয়া, সভ্যতা সৃষ্টিকারী বস্তুগত ও আত্মিক-মানসিক উন্নয়ন ও মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি সম্মানবোধ- এগুলো হচ্ছে সংস্কৃতির প্রধান ও অপরিহার্য উপাদান।
হযরত ইমামের (র.) চিন্তাধারার মৌলিক ও কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ঐশী সাংস্কৃতিক চিন্তা। তিনি সর্বাবস্থায় এদিকে দৃষ্টি রাখতেন যে, আল্লাহ্ তা‘আলা কী পছন্দ করেন এবং আল্লাহ্ তা‘আলার দ্বীনের দাবি কী। এছাড়া তিনি সমাজের দুর্বল ও বঞ্চিত মুস্তায্‘আফ্ শ্রেণির লোকদেরকে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করাকে অপরিহার্য কর্তব্য বলে গভীরভাবে বিশ্বাস পোষণ করতেন এবং সব সময় এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করতেন।
হযরত ইমাম খোমেইনীর (র.) ইন্তেকালের এ দুঃখজনক উপলক্ষ্যে আমরা বাংলাদেশ সহ বিশ্বের মসলিম ও মুস্তায্‘আফ্ জনগণের প্রতি, বিশেষ করে নিউজলেটারের পাঠক-পাঠিকাদের উদ্দেশে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি এবং এ মহান ইমামের বিদেহী নাফ্সের কল্যাণের জন্য দো‘আ করছি; আমাদের এ প্রিয় নেতাকে জান্নাতের সমুন্নত ধামে স্থান দেয়ার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে আকুল আবেদন জানাচ্ছি। সেই সাথে আমরা আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট শুকরিয়া জানাচ্ছি যে, ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা হযরত ইমাম খোমেইনীর (র.) ইন্তেকালের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহে হযরত ইমামের (র.) যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমান মহান রাহ্বার হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ীর ন্যায় নেতৃত্ব লাভ করেছে- যিনি হযরত ইমামের (র.) প্রদর্শিত পথের ধারাবাহিকতাকে যথাযথভাবে অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
ড. সাইয়্যেদ হাসান সেহাত
কালচারাল কাউন্সেলর

সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান দূতাবাস

ঢাকা, বাংলাদেশ