রবিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

কথার মূল্য মাহদী অযার ইয়াযদী

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ৩১, ২০১৮ 

অনুবাদ : কামাল মাহমুদ –
সে অনেক দিন আগের কথা। সুলতান মাহমুদ একদিন তার অমাত্য, ভৃত্য, সেনাপতি ও সৈন্যদের নিয়ে মরুভূমিতে শিকারে বের হলেন। টিলার পাশে সবুজ গাছ-গাছালি বেষ্টিত একটি খোলা জায়গা দেখতে পেলেন এবং সেখানে বিশ্রামের জন্য মনস্থির করলেন। ভৃত্যরা দুপুরের খাবার প্রস্তুতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সৈন্যরা চারদিকে পাহারা দিতে লাগলো। অমাত্যগণ সুলতানের নির্দেশে আশেপাশে শিকারে বের হলেন। স্বয়ং সুলতান মাহমুদও ঘোড়ার পিঠে চড়ে সঙ্গীদের সাথে শিকারে বের হলেন।
তিনি একটি টিলার কাছে পৌঁছতেই এক বৃদ্ধ লোকের মুখোমুখি হলেন যাঁর পেশা হলো আগাছা পরিষ্কার করা ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করা। তিনি জ্বালানি কাঠ একত্র করে আঁটি বেঁধে মাথায় তোলার চেষ্টা করছিলেন; কিন্তু উঠাতে পারছিলেন না। এভাবে জ্বালানি কাঠ মাথায় উঠানোর চেষ্টা করতে করতে তিনি অসহায় বোধ করছিলেন। সুলতান মাহমুদ তাঁর সামনে গিয়ে বললেন : ‘আপনি চাইলে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।’
বৃদ্ধ ব্যক্তি বললেন : ‘এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে যে, এতে আমার বোঝা বহন করা সম্ভব হবে আর আপনারও সওয়াব হবে। আর এতে আপনার কোন ক্ষতি নেই। এখানে তো আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না যে আমাকে সাহায্য করতে পারে। আপনি শক্ত-সামর্থ্যবান যুবক। আপনার দ্বারা এমন ভালো কাজ করা অসম্ভব কিছু নয়।’
সুলতান মাহমুদ ঘোড়া থেকে নেমে বৃদ্ধ লোকটির বোঝা বহনে সাহায্য করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন : ‘এই মরুভূমিতে একা একা এত কষ্ট করে কাজ করছেন কেন?’
বৃদ্ধ লোকটি বললেন : ‘হ্যাঁ। আমার তো আর কেউ নেই।’
সুলতান মাহমুদ বললেন : ‘তা হলে এর আগে কিভাবে এই ভারী বোঝা বহন ও উত্তোলন করেছেন যেটা এখন পারছেন না?’
বৃদ্ধ লোকটি জবাব দিলেন : ‘আমি প্রতিদিনই এই কাজ করি। প্রথমে চিন্তা করেছিলাম এই জ¦ালানিগুলোকে টিলার উপরে জমা করবো এবং বাঁধবো। এরপর টিলার পাদদেশে নিচু হয়ে ধাক্কা দিয়ে মাথায় তুলে নেবো; কিন্তু এখানে পাথরে পা ফসকে বোঝাটা নিচে পড়ে গেছে; তাই আর তুলতে পারছি না।’
সুলতান মাহমুদ বললেন : ‘ঠিক আছে। সব কাজই এরকম। প্রথমে মানুষ হিসাব করে একরকম, কিন্তু পরে পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে সে হিসাব পাল্টে যায়।’
বৃদ্ধ লোকটি এবার বললেন : ‘পরিস্থিতির চিন্তা সবাই করে, কিন্তু ভবিষ্যতের কথা জানি না। হয়ত এখানে আপনার কাছে একটা সুযোগ এসেছে সাহায্যের মাধ্যমে সওয়াব অর্জন করার। অসহায় মানুষের সাহায্য করা খুবই সওয়াবের কাজ।’
সুলতান বললেন : ‘তাই নাকি! আপনার চিন্তা-বিশ্বাস তো খুবই ভালো।’
বৃদ্ধ লোকটি বললেন : ‘আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আপনি যদি সময় মতো না পৌঁছতেন তা হলে আমার বোঝা বহন করা মুশকিল হয়ে যেতো। হে যুবক! খোদা আপনাকে সৌভাগ্যবান করুন।’
বৃদ্ধের কথায় সুলতান মাহমুদ খুশি হলেন। বৃদ্ধ লোকটি যখন তাঁর গাধা নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলেন তখন সুলতান মাহমুদ তাঁর সাথে আরো কিছুক্ষণ আলাপচারিতা করতে মনস্থির করলেন। তিনি তাঁর তাঁবুর পাশের সৈন্যদের বললেন : ‘একজন বৃদ্ধ লোক বোঝা ও গাধা নিয়ে ঐদিকে যাচ্ছেন। সবদিক থেকে তাঁর পথ রুদ্ধ করে দেবে যাতে তিনি এ দিক দিয়ে অর্থাৎ আমার সামনে দিয়ে যেতে বাধ্য হন।’
সৈন্যরা গিয়ে তাঁর সবগুলো পথ আগলে রাখলো। বৃদ্ধ লোকটি সৈন্যদের এর কারণ জিজ্ঞেস করলে একজন সৈন্য বললো : ‘এ দিক দিয়ে যাওয়া যাবে না, রাস্তা বন্ধ। আপনি অন্য রাস্তা দিয়ে যান।’
বৃদ্ধ লোকটি তার সাথে আর কথা না বাড়িয়ে অন্য পথ ধরলেন। কিছুদূর যাবার পর একজন সৈন্য তাঁর সামনে এসে বললো : ‘এ রাস্তায় যাওয়া যাবে না। এদিকে যাওয়া নিষেধ।’ বৃদ্ধ লোকটি পথ বদল করলেন। একটু পথ যেতেই আবার আর একজন সৈন্য একই কথা বললো।
বৃদ্ধ লোকটি বিরক্ত হয়ে বললেন : ‘আজকে এমন কী হলো যে, সব রাস্তাই বন্ধ। তা হলে আমি কোন দিক দিয়ে যাবো?’
সর্বশেষ যার সাথে কথা বলেছিলেন সেই সৈন্য সুলতান মাহমুদের তাঁবুর দিকে দেখিয়ে দিয়ে বললো : ‘ঐ দিক খোলা আছে। ঐ দিক দিয়ে যান। আপনি তো শহরের দিকে যেতে চান। ঐ দিক দিয়ে দ্রুত শহরে পৌঁছে যাবেন।’
বৃদ্ধ লোকটি বিড়বিড় করে বললেন : ‘আমাকে দূরের পথ দেখিয়ে দিয়ে বলে কি না দ্রুত পৌঁছে যাবেন! ঠিক আছে হয়ত দ্রুতই পৌঁছবো, কী জানি বাপু!’
বৃদ্ধ লোকটি সৈন্যের দেখানো পথে তাঁর গাধা হাঁকিয়ে যেতেই একটু দূরে এমন একজনকে দেখতে পেলেন যাকে তিনি পূর্ব থেকেই চিনতেন। যেহেতু তাঁর কাছে কোন কাজ নেই তাই তার সাথে কথা না বলেই চলে যেতে উদ্যত হলেন এবং নিরুপায় হয়ে সুলতান মাহমুদের তাঁবুর সামনে দিয়ে যেতে লাগলেন। বৃদ্ধ লোকটি চিন্তা করলেনÑ ‘সৈন্যরা এতই অত্যাচারী যে আমার এই দুর্বল গাধাটিকে নিয়ে এই শক্তিশালী ঘোড়াগুলোর মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করলো!’
একটু সামনে আসতেই সুলতান মাহমুদের সামনে এসে পৌঁছলেন এবং একটু ভয় পেয়ে গেলেন; কিন্তু আর তো কোন উপায় ছিলো না। এছাড়া আর কোন রাস্তা তো তাঁর জন্য খোলা ছিলো না। বাধ্য হয়ে সুলতান মাহমুদের তাঁবুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সুলতানকে তাঁবুর কাছে একটি ছাতার নিচে চেয়ারে বসে থাকতে দেখলেন। সুলতানকে দেখে তিনি চিনতে পারলেন এবং বুঝতে পারলেন তিনিই তাঁকে বোঝা তোলার ব্যাপারে সাহায্য করেছিলেন। তিনি আর কেউ নন, সুলতান মাহমুদ নিজেই। মনে মনে বললেনÑ ‘আমি তাঁকে কষ্ট দিয়েছি।’ তাই তিনি লজ্জিত হয়ে কাঁচুমাচু হয়ে সুলতান মাহমুদের কাছে গেলেন। সুলতান মাহমুদের কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম দিলেন। লজ্জায় তাঁর দিকে তাকাতে পারছিলেন না। তাই আবার আস্তে করে তাঁর গাধার দিকে ফিরে যেতে উদ্যত হলেন।
সুলতান মাহমুদ সালামের জবাব দিয়ে বললেন : ‘হে সম্মানিত ব্যক্তি! মরুভূমিতে আপনি কী করেন?’
জ্বালানি কাঠ সংগ্রহকারী বৃদ্ধ লোকটি বললেন : ‘আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করুন। আপনি নিজেই তো জানেন যে, আমি মরুভূমিতে কী করি? আমি কপর্দকহীন বৃদ্ধ মানুষ। মরুভূমিতে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে আঁটি বেঁধে তা নিয়ে শহরে বিক্রি করি। এভাবে জীবনযাপন করে খোদার শুকরিয়া আদায় করি।’
সুলতান বললেন : ‘আপনি বোঝা বহন করে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করবেন কেন, এখানেই বিক্রি করবেন কি?’
বৃদ্ধ লোকটি জবাব দিলেন : ‘কেন বিক্রি করবো না; কিন্তু ক্রেতা কোথায়?’ বৃদ্ধ লোকটি নিজে নিজে চিন্তা করলেনÑ ‘নিশ্চয়ই সুলতান এ জ্বালানি কিনবেন। তাঁর কেনার সামর্থ্য এবং অর্থ দুটিই আছে। তিনি ওখানে আমাকে সাহায্য করেছেন, আর এখানে আমার সময় নষ্ট করে আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না।’
সুলতান বললেন : ‘আপনি বিক্রি করলে আমি আপনার জ্বালানি কাঠ কিনতে পারি।’
বৃদ্ধ লোকটি বললেন : ‘আমি জানি যে, এখানে জ্বালানি কাঠ আপনার কোন কাজে আসবে না। তারপরও যদি আপনি নিতে চান, আমি আপনার জন্য এগুলো উৎসর্গ করতে চাই।’
সুলতান বললেন : ‘আমি কিনতে চাই। এবার দাম বলে মূল্য নিয়ে নিন।’
বৃদ্ধ লোকটি বললেন : ‘বেশ তো। এর দাম এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা।’
সেখানে উপস্থিত একজন সেনা কমান্ডার বৃদ্ধের কথার জবাবে বললেন: ‘হাজার স্বর্ণমুদ্রা! এই মরুভূমিতে কি এই কাঠ এতই দুষ্প্রাপ্য ও দামী?’
বৃদ্ধ লোকটি বললেন : ‘এই মরুভূমিতে এগুলো দুষ্প্রাপ্য নয় আর এত দামীও নয়, কিন্তু এখানে এমন দামী ক্রেতা পাওয়া দুষ্প্রাপ্য, খুবই বিরল।’
সুলতান মাহমুদ এ জবাব শুনে খুব খুশি হয়ে বললেন : ‘যদি তাই হয় তা হলে আমি দু’হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিয়েই এই জ্বালানি কিনলাম।’
সুলতান মাহমুদের কাছ থেকে স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে লোকটি চলে যেতে উদ্যত হলেন। সুলতান মাহমুদ তাঁকে দুপুরের খাবারের জন্য দাওয়াত করলেন। বৃদ্ধ লোকটি দুপুরের খাবার খেয়ে বিদায় নিয়ে চলে যেতে চাইলেন। এমন সময় সেনাপতি তাঁকে বললেন : ‘খুব তো চালাকি করে চাটুকারি করে অনেক দামে জ্বালানি বিক্রি করলেন, যদিও এখানে এগুলোর কোন অভাব নেই।’
বৃদ্ধ লোকটি জবাব দিলেন : ‘আরে ভাই! আমি তো অভাবী মানুষ। তাই এগুলো সস্তায় বিক্রি করেছি। কেননা, এই জ্বালানির সাথে অন্যান্য জ্বালানির পার্থক্য আছে। আমি চল্লিশ বছর ধরে এই মরুভূমিতে জ্বালানি সংগ্রহ করে বিক্রি করি। কোনদিন কোন জ্বালানি কাঠ সুলতান মাহমুদের স্পর্শ পায় নাই। আমি অভাবী না হলে দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রার কমে এ জ্বালানি বিক্রি করতাম না।’
সুলতান মাহমুদ এ কথা শুনে অত্যধিক খুশি হলেন এবং দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ঐ বৃদ্ধকে প্রদানের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন : ‘আপনার মুখের মিষ্টি কথার দাম এর চেয়ে আরো অনেক বেশি মূল্যবান।’
বৃদ্ধ লোকটির উপস্থিত জবাবে সেনাপতি আশ্চর্যান্বিত হলেন আর বৃদ্ধ লোকটি স্বর্ণমুদ্রার থলি নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন।