All posts by dreamboy

হযরত আলী (আ.)-এর বাণী- নাহজুল বালাগা থেকে

হযরত আলী (আ.) বলেন : যাবতীয় পাত্র তাতে রাখা বস্তু দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায় তবে ব্যতিক্রম শুধু জ্ঞানের পাত্র। কারণ, জ্ঞানের পাত্র প্রশস্ত হয়ে যায়।

নাহজুল বালাগা, উক্তি ২০৫

হযরত আলী (আ.) বলেন : সহিষ্ণু ব্যক্তি সহিষ্ণুতার ফলে প্রথম যে জিনিসটি (পুরস্কার হিসেবে) লাভ করে তা হচ্ছে এই যে, অজ্ঞ লোকদের বিপক্ষে লোকেরা তার সমর্থক ও সাহায্যকারী হয়ে যায়।

নাহজুল বালাগা, উক্তি ২০৬

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : তুমি ধৈর্যশীল হতে না পারলেও ধৈর্যধারণকারীদের ন্যায় হওয়ার চেষ্টা কর। কারণ, যে কোন লোক অন্য কারো মতো (সদৃশ) হওয়ার চেষ্টা করে সে অচিরেই তাদের মধ্যে গণ্য হবে।

নাহজুল বালাগা, উক্তি ২০৭

হযরত আলী (আ.) বলেন : যে ব্যক্তি নিজের হিসাব নিজে নেয় সে লাভবান হয়। সে নিজেকে ভুলে থাকে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে ভয় পায় সে নিরাপদ হতে পারে। যে উপদেশ গ্রহণ করে সে বিচক্ষণ হয়। আর যে বিচক্ষণ হয় সে বোধ লাভ করে। আর যে বোধশক্তি লাভ করে সে জ্ঞানের অধিকারী হয়।

নাহজুল বালাগা, উক্তি ২০৮

হযরত আলী (আ.) বলেন : আবদ্ধ ঘোটকী যেরূপ দয়াপরবশে স্বীয় বাচ্চার প্রতি আকৃষ্ট হয়, তেমনিভাবে দুনিয়া রুষ্ট হয়ে যাবার পর আবার আমাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে।এ উক্তিটি করার পর তিনি পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করেন : আমি ইচ্ছা করলাম, সে দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে ও দেশের অধিকারী করতে।’-সূরা কাসাস : ২০৯

নাহজুল বালাগা, উক্তি ২০৯

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : হে লোকসকল! যে ব্যক্তি বসন গুছিয়ে নিয়ে ভালোভাবে দৌড়ায়, সম্মুখে অগ্রসর হতে গিয়ে ভেবে-চিন্তে এগোয়, ভীতগ্রস্ত হওয়ার পূর্বেই ব্যবস্থা নেয়, গন্তব্যের দিক থেকে কোন পাল্টা হামলার প্রতি নজর রাখে, উৎসের পরিণামের দিকে লক্ষ্য করে এবং মৃত্যুর পর কী পরিণতি হবে সে দিকে দৃষ্টি রাখে- তার ন্যায় আল্লাহকে ভয় কর।

নাহাজুল বালাগা, উক্তি ২১০

হযরত আলী (আ.)  বলেছেন : মানুষের জ্ঞানের একটি হিংসাত্মক কাজ হলো আত্মম্ভরিতা।

নাহজুল বালাগা, উক্তি ২১২

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : মতবিরোধ সুষ্ঠু ধারণা বা সিদ্ধান্ত বরবাদ করে দেয়।

নাহজুল বালাগা, উক্তি ২১৫

(নিউজলেটার, জানুয়ারি ১৯৯২)

ইসলাম ও পাশ্চাত্যের দৃষ্টিতে নারীর সম অধিকার ও কর্মসংস্থান

চাকরি করা বা চুক্তিভিত্তিক কাজ করা মানুষের অন্যতম অধিকার।

বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণার ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদে মানুষের কাজ করার অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে এটাও বলা হয়েছে যে, মানুষ তার কাজ বা পেশা বেছে নেয়ার ব্যাপারে স্বাধীন।

 নারীর কর্মসংস্থানের বিষয়টি আধুনিক যুগের বিষয়। গত দুই শতকে নানা ধরনের ঘটনা ও পরিবর্তনের ফলে নারীর কর্মসংস্থানের ঝোঁক এবং প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।

 শিল্প বিপ্লবের পর কল-কারখানাসহ নানা ধরনের কর্মক্ষেত্রের সংখ্যা বহু গুণ বেড়েছে। পুঁজিপতিরা অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন ও উতপাদন-ব্যয় কম রাখার জন্য তাদের কারখানায় সস্তা শ্রম শক্তি নিয়োগের পথ খুঁজছিলেন। আর নারীকেই তারা বেছে নিয়েছেন এ জন্য।

 নানা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বে এখনও নারী কর্মী ও শ্রমিকরা অপেক্ষাকৃত কম পারিশ্রমিক পাচ্ছে।

 আধুনিক যুগেও নারী কর্মী ও শ্রমিকরা শোষণের শিকার হচ্ছে। নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে কঠিন ও ব্যাপক শ্রম-সাধ্য কাজ। ফলে অসুস্থ হচ্ছে তারা।  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীকে এমন কর্মক্ষেত্রে নিয়ে আসা হচ্ছে যেখানে তারা কাজ করতে পারছেন না স্বচ্ছন্দে। বিশেষ করে পাশ্চাত্যে নারীর নানা কর্মক্ষেত্রে যে অনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে তা তাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক। অথচ পশ্চিমা সরকারগুলো নারী অধিকারের রক্ষক বলে দাবি করছে এবং তারা নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার দাবি করে আসছে!

নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের নামে নারীবাদীরা ঘরের বাইরে নানা কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষকে একসঙ্গে কাজ করতে উতসাহ যুগিয়ে থাকে। পশ্চিমা শিল্প-সমাজের কর্তারাও নারীবাদীদের ওই লক্ষ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব ধরনের কর্মক্ষেত্রে নারীকে টেনে এনেছে। নারী ও পুরুষের স্বাভাবিক শক্তি-সামর্থ্য, মানসিক অবস্থা ও শারীরিক গঠনের বা আকর্ষণের  পার্থক্যকেও তারা বিবেচনায় আনেননি এক্ষেত্রে। ফলে কর্মক্ষেত্রে ভারসাম্য নারীর অনুকূল না হয়ে পুরুষের অনুকূল হয়ে পড়েছে। অর্থাত এই পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী। কর্মক্ষেত্রে শক্তিমান পুরুষের কুদৃষ্টি ও যৌন নির্যাতনের হাত থেকে সুদর্শনা ও  দুর্বল নারীর আত্মরক্ষার কোনো উপায় রইল না।

 পশ্চিমা নারীবাদীদের দৃষ্টিতে সমান অধিকারের অন্যতম অর্থ হল ঘরের বাইরে নারী ও পুরুষের জন্য চাকরির অধিকার নিশ্চিত করা। যে নারী কেবলই গৃহবধূ তাকে পশ্চাদপদ বলে মনে করে নারীবাদীরা। এভাবে পাশ্চাত্য নারীকে কেবলই সামাজিক ভূমিকায় ব্যস্ত রেখে তাদের মাতৃত্ব ও স্ত্রীর ভূমিকাকে বিলুপ্ত করছে।  পশ্চিমে নারী ও মায়েদের ওপর মানসিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

অন্যদিকে মানুষের জীবনের জন্য পরিপূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ বিধানের ব্যবস্থা করেছে ইসলাম।

এই ধর্ম অধিকারের দিক থেকে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলে।

 ইসলাম নারীর মালিকানা ও অর্থনৈতিক ততপরতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক চাহিদাগুলো পূরণ করা স্বামীর দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছে যাতে নারী কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়াই তার সাংসারিক দায়িত্বগুলো পালন করতে পারে। এরই আলোকে ঘরের বাইরে কাজ করার কোনো প্রয়োজন নেই নারীর। বাইরে চাকরি করা নারীর জন্য বাধ্যতামূলক কোনো বিষয় নয় বরং তা তাদের ইচ্ছাধীন বিষয়। তারা ঘরের বাইরে যে কোনো বৈধ পেশা বেছে নিতে পারেন।

 ইসলামের দৃষ্টিতে নারী সাংসারিক বা পারিবারিক দায়িত্ব পালন ছাড়াও সামাজিক ও অর্থনৈতিক ততপরতায় জড়িত হতে পারেন। তবে তাদেরকে এই দায়িত্ব এমনভাবে পালন করতে হবে যাতে স্বামী ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনের কাজটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, নারীর সবচেয়ে বড় ও আসল কাজ হল সন্তানের প্রশিক্ষণ এবং পরিবার রক্ষা করা। এই দায়িত্ব বা মিশনের ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত নারীর যে কোনো বাড়তি কাজ বা ভূমিকাকে ইসলাম সমর্থন করে।

  মোটকথা, ইসলাম নারীর কাজ বা চাকরিকে মর্যাদা দেয়। পুরুষ বা স্বামী নারীকে ঘরে ও বাইরে কাজ করতে বাধ্য করার অধিকার রাখে না। অর্থাত নারী ঘরেও বিনা পারিশ্রমিকে  ঘর-কন্না ও সংসারের কাজ করতে বাধ্য নয়। নারী  স্বামীর সহযোগী হিসেবেই বা জীবন-সঙ্গী হিসেবে ঘরের কাজে স্বেচ্ছায় সহায়তা করে মাত্র।

 ইসলামও নারী ও পুরুষের সমান অধিকারকেও সমর্থন করে। তবে তা পশ্চিমাদের কথিত সমান অধিকারের অর্থে নয়। বরং নারীর প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের আলোকে তাকে কাজ দেয়ার কথা বলে ইসলাম। কারণ, খুব কঠিন কায়িক শ্রমের কাজ নারীর পক্ষে করা সম্ভব নয় এবং তা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের স্বার্থেরও অনুকূল নয়।

মার্কিন লেখিকা মিসেস ন্যান্সি লিইঘ ডি-মস  লিখেছেন,

 “নারীদেরকে ঘর-সংসারের কাজের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হতে উতসাহ দেয়া এবং তাদের বেশি আনন্দ দেয়ার জন্য ঘর থেকে বের করে আনা –এসবই নারীর জন্য মাত্রাতিরিক্ত টেনশন বা উদ্বেগ ছাড়া অন্য কোনো ফল বয়ে আনেনি। বিপুল সংখ্যক নারী আজ মানসিক চিকিতসক ও নানা ধরনের ওষুধের সাহায্য ছাড়া জীবন যাপন করতে পারছেন না। যেসব নারী সব সময় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাচ্ছে ও এক পেশা ছেড়ে অন্য পেশা ধরছে তাদের বেশিরভাগই অনৈতিক সম্পর্কের শিকার হয়েছেন ও হচ্ছেন।”

 ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের পেশাগত পার্থক্য এবং তাদের অধিকারের পার্থক্য এক কথা নয়।  তাদের অধিকার সমান। যেমন, আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা (সা.)-উভয়ই উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু ঘরের বাইরের কাজগুলো ছিল আলী (আ.)’র পেশা, আর ঘরের বা ঘরোয়া কাজগুলো করা ছিল বেহেশতি নারীকুলের নেত্রী ফাতিমা (সা.)’র পেশা।

 জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রতিভা ও শারীরিক শক্তির দিক থেকে মানুষে মানুষে রয়েছে পার্থক্য। তাই মহান আল্লাহ সবার জন্য তার উপযোগী কাজ নির্ধারণ করেছেন। নারী-পুরুষও এর ব্যতিক্রম নয়। যেসব পার্থক্য প্রকৃতিগত তা পরিবর্তন করা যায় না।

 শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় দয়াময় মায়ের স্নেহের আচলে। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ নারীকে চাকরি দেয়ার অজুহাতে নারীকে তার মূল কাজ থেকে দূরে রাখছে যাতে তাদেরকে পুঁজিবাদের সেবায় বেশি ব্যবহার করা যায়।

 কানাডীয় লেখক উইলিয়াম গার্ডনার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, কর্মজীবী মায়েরা শিশুদেরকে যে ডে কেয়ার সেন্টারে রেখে যান তা কখনও শিশুর জন্য পরিবারের মত উত্তম নয়। ফেমিনিস্ট বা নারীবাদীরা আজও এ প্রশ্নের জবাব দেননি।

 উইলিয়াম গার্ডনারের মতে নারীবাদ গড়ে উঠেছে  কাজের ব্যাপারে বিপুল সংখ্যক পশ্চিমা নারীর ক্লান্তি, শ্রান্তি ও হতাশার মত বাস্তবতা থেকে। এইসব নারীই তাদের সন্তানকে ডে-কেয়ার সেন্টারে পাঠান ও কম বেতনের চাকরি পেলেও তা আঁকড়ে ধরেন। অথচ এ ধরনের চাকরির প্রতি তাদের কোনো আগ্রহই নেই।

 ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে শিশুদেরকে স্নেহের ছায়াতলে যথাযথ শিক্ষা দেয়া মায়েদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ শিক্ষা নিয়ে তারা যখন বড় হবে তখন তারা হবে সঠিক পথে চলা সুস্থ মন-মানসিকতাসম্পন্ন  মানুষ।  তারা হবে কুসংস্কার, গোঁড়ামি, কলুষতা ও হীনমন্যতামুক্ত। পাশ্চাত্যের যুব প্রজন্ম আজ এইসব সংকটেই আক্রান্ত।

সূত্র: রেডিও তেহরান

ফরমালিনমুক্ত আম চেনার ৮ উপায়

দোকানে দোকানে হাজার ফলের সমাহার জানান দিচ্ছে শুরু হয়েছে মধুমাস। তাল, বাঙ্গি, তরমুজ, জাম, কাঁঠাল কোনো কিছুই বাদ নেই এর থেকে। তবে এ সময় বেশি দেখা মিলছে কাঁচা-পাকা, ছোট-বড় বিভিন্ন আমের। আর মানুষ কিনছেও সমানতালে। কিন্তু এত আমের ভিড়ে বুঝবেন কিভাবে কোন আমটি ভালো? কোনটিতে দেয়া নেই কোনো ফরমালিন বা কার্বাইড?

এর জন্য আপনাকে জানতে হবে নিচের দেয়া তথ্যগুলো-

১. প্রথমেই লক্ষ্য করুন যে, আমের গায়ে মাছি বসছে কিনা। কারণ ফরমালিন যুক্ত আমে মাছি বসবে না।

২. আম গাছে থাকা অবস্থায় বা গাছ পাকা আম হলে লক্ষ্য করে দেখবেন যে, আমের শরীরে এক রকম সাদাটে ভাব থাকে। কিন্তু ফরমালিন বা অন্য রাসায়নিকে চুবানো আম হবে ঝকঝকে সুন্দর।

৩. কারবাইড বা অন্য কিছু দিয়ে পাকানো আমের শরীর হয় মোলায়েম ও দাগহীন। কেননা আমগুলো কাঁচা অবস্থাতেই পেড়ে ফেলে ওষুধ দিয়ে পাকানো হয়। গাছ পাকা আমের ত্বকে দাগ পড়বেই।

৪. গাছপাকা আমের ত্বকের রঙে ভিন্নতা থাকবে। গোঁড়ার দিকে গাঢ় রঙ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কারবাইড দেয়া আমের আগাগোড়া হলদেটে হয়ে যায়, কখনো কখনো বেশি দেয়া হলে সাদাটেও হয়ে যায়।

৫. হিমসাগর ছাড়াও আরো নানান জাতের আম আছে যারা পাকলেও সবুজ থাকে, কিন্তু অত্যন্ত মিষ্টি হয়। গাছপাকা হলে এইসব আমের ত্বকে বিচ্ছিরি দাগ পড়ে। ওষুধ দিয়ে পাকানো হলে আমের শরীর হয় মসৃণ ও সুন্দর।

৬. আম নাকের কাছে নিয়ে ভালো করে শুঁকে কিনুন। গাছ পাকা আম হলে অবশ্যই বোটার কাছে ঘ্রাণ থাকবে। ওষুধ দেয়া আম হলে কোনও গন্ধ থাকবে না, কিংবা বিচ্ছিরি বাজে গন্ধ থাকবে।

৭. আম মুখে দেয়ার পর যদি দেখেন যে কোনো সৌরভ নেই, কিংবা আমে টক/ মিষ্টি কোনো স্বাদই নেই, বুঝবেন যে আমে ওষুধ দেয়া।

৮. আম কেনা হলে কিছুক্ষণ রেখে দিন। এমন কোথাও রাখুন যেখানে বাতাস চলাচল করে না। গাছ পাকা আম হলে গন্ধে মৌ মৌ করবে চারপাশ। ওষুধ দেয়া আমে এই মিষ্টি গন্ধ হবেই না।

সূত্র : নতুনবার্তা

সাত ব্যক্তি নিজের কাজকর্ম বিনাশ করে

ইয়াহইয়া ইবনে ইমরান, ইমাম সাদিক (আ.)-কে বলতে শুনেছেন : সাত ব্যক্তি আপন কর্মবিনাশী হয় :

১.   অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি- যাকে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বলে লোকেরা জানে না । জ্ঞানী বলে তার নাম  প্রসিদ্ধ হয় না।

২.   দার্শনিক- যিনি তাঁর সঞ্চিত দর্শনকে এমন মিথ্যুক ব্যক্তির নিকট রেখে যান, যে তার নিকট রেখে যাওয়া দর্শনে বিশ্বাসী নয়।

৩.   যে শঠ ও প্রবঞ্চনাকারী ব্যক্তিকে বিশ্বাস করে।

৪.   কঠোর হৃদয়ের অধিকারী জাতীয় নেতা।

৫.   যে মা নিজের সন্তানের গোমর ফাঁস করে দেয়। গোপন করে রাখে না।

৬.   যে ব্যক্তি ঘটনার খবর না নিয়েই নিজের মতাদর্শী ব্যক্তিদের সমালোচনায় তাড়াহুড়া করে। তাদেরকে তিরস্কার করে।

৭.   যে স্বধর্মীয় ভাইদের সাথে বৈরিতা পোষণ করে।

কিছু মূল্যবান কথা

১.   যে বুঝে শুনে কথা বলে না, সে তদুত্তরে মর্মাহত হয়।

২.   জীবনকে সুখী করার জন্য সম্পদের প্রয়োজন। সম্পদ সঞ্চয়ের জন্য জীবন নয়।

৩.   কেন বললাম- এ অনুতাপ করার পূর্বে কী বলা উচিত, তা ভেবে দেখা উত্তম।

৪.   যে ব্যক্তি অসাধু হয়, সে হিসাব দিতে ভয় পায়।

৫.   বিদ্বানগণ বলেছেন : কিছু বিষয়ের স্থায়িত্ব নেই : ভাসমান মেঘের ছায়া, অসৎ লোকের বন্ধুত্ব, মিথ্যা প্রশংসা, অধিক সম্পদ, মূর্খদের খোশামোদ, যুবকের সৌদর্য, লোকদেখানো ইবাদত।

(নিউজলেটার, এপ্রিল ১৯৮৯)

নবী করীম (সা.)-এর দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রণালি ও ব্যক্তিত্বের কিছু দিক

বাইলামী ইরশাদুল কুলুব গ্রন্থে বর্ণনা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম পরিধানের বস্ত্র নিজ হাতে সেলাই করতেন, নিজের পাদুকা সেলাই করতেন, বকরীর দুধ দোহন করতেন, ক্রীতদাসদের সাথে বসে আহার করতেন । তিনি মাটিতে বসতেন, গাধায় আরোহণ করতেন, অন্যকে সাথে আরোহণ করিয়েছেন, কোনোরূপ লজ্জাবোধ না করে পরিবারের প্রয়োজনী দ্রব্যাদি বিপনি হতে ক্রয় করে বহন করে বাড়িতে নিয়ে আসতেন। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের সাথে হাত মিলিয়ে মুসাফাহা করতেন- মুসাফাহাকারী তার হাত সরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর হাত সরাতেন না। যার সাথে দেখা হতো তাকেই তিনি সালাম করতেন- ধনবান, নিঃস্ব, ছোট, বড়, সকলের সাথে তাঁর এ আচরণ ছিল। কোনো খাবার গ্রহণের ডাক আসলে তিনি তা নিতান্ত  নিম্নমানের খুরমা হলেও তুচ্ছ মনে করতেন না। তাঁর জীবনযাপনের উপকরণাদি মামুলি ছিল। তিনি বিরাট ব্যক্তিত্বের অধিকারী, সহনশীল ও হাস্যমুখ ছিলেন- না হাসলেও তাঁর মুখে যেন হাসি লেগেই থাকত। মুখশ্রী কুঞ্চিত করে না রাখলেও তাঁকে চিন্তাযুক্ত মনে হতো। তাঁকে সর্বদা সবিনয়-ব্যক্তি বলে মনে হতো। তিনি আপব্যয়ী না হয়েও দানশীল ছিলেন । কোমল অন্তরের অধিকারী মুসলমানদের প্রতি অতি দয়ালু ছিলেন। তিনি অতি ভোজনের দরুন ঢেকুর তুলতেন না। লোভের বশীভূত হয়ে কোনো কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হতেন না ।

(নিউজলেটার, এপ্রিল ১৯৮৯)

ইরানে হস্তশিল্প

বর্তমানে আমাদের গোটা জীবনটাই যেন অনেকটা যন্ত্রনির্ভর। যন্ত্র উদ্ভাবিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষকে তার পরিবেশের ওপর নির্ভরতার একটা সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে হতো। তখন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং এই সম্পর্কের প্রতি মানুষের যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল। মানুষের চোখে তখন প্রকৃতিকে মনে হয়েছে যেন একটা ক্যালিডাস্কোপ বা খেলনা দূরবিন-যার ভিতরে তাকালে সতত পরিবর্তনশীল সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়-যা বিস্ময়ের সৃষ্টি করলেও স্থায়ী হতে পারে না-মানুষের মনে একটা রেখাপাত করেই যার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।

প্রকৃতির সুন্দর সুন্দর অস্থায়ী দৃশ্যগুলোকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখার প্রেরণা থেকেই সম্ভবত মানুষ এমন একটা সৃজনী শক্তিকে আয়ত্ত করেছে যাকে আমরা এখন ‘চারুকলা’ বলে অভিহিত করি। প্রাচীনকালের নিআন ডারটাল উপত্যকার মানুষ তাদের গুহার দেয়ালে দেয়ালে যেসব অতি সাধারণ চিত্র অঙ্কন করেছে সেগুলো থেকে শুরু করে দ্যা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ সহ আজ পর্যন্ত যত শিল্পী যত চিত্র অঙ্কন করেছেন তাঁদের সকল সৃষ্টির পশ্চাতে একটা উদ্দেশ্যই কাজ করেছে। তা হচ্ছে কোনো দুর্লভ বস্তুকে অথবা মোহিনী মুহূর্তকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখা। এ ক্ষেত্রে রুচির পার্থক্য মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মানুষের মননশীলতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে চারুকলার প্রতি তার আগ্রহ ক্রমশ সম্প্রসারিত ও এর মর্মোপলব্ধি গভীরতর হতে থাকে। এক পর্যায়ে এসে মানুষের মনে দর্শনের উপলব্ধিও বিকাশ লাভ করে এবং তা থেকেই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে। তখন থেকেই মানুষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি তার উপলব্ধির মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা করতে শুরু করে। তাই দেখা যায় বিশ্বের এক অংশের শিল্পকলায় প্রকৃতির সহজাত সাদৃশ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং অপর অংশে প্রাকৃতিক দৃশ্যের সারল্যের মধ্যে নিহিত যে সৌন্দর্য তাকেই বড় করে দেখা হয়েছে। কালক্রমে মানুষ তার নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র, এমনকি, বাসন-কোসনেও চিত্রাঙ্কন শুরু করে। চিত্রশোভিত একটি ছুরি দিয়ে কোনো জিনিস কাটার সুবিধা হবে এবং চিত্রশোভিত না হলে সে সুবিধা নষ্ট হয়ে যাবে- এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। চামড়ার একটা বেল্টে নকশা থাকলে যেভাবে তা ব্যবহার করা যাবে, নকশা না থাকলেও তেমনি ব্যবহারে কোনো সমস্যাই দেখা দেবে না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ধরে রাখার জন্য মানুষের প্রয়োজন সেই সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধ দৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে তার সাংস্কৃতিক ও মানসিক পটভূমি- যা সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মূল্যায়নে তাকে প্রভাবিত করেছে এবং যার দ্বারা সৌন্দর্যের চিত্রায়নে তার কারিগরি কৌশল ও দক্ষতা প্রয়োগ করেছে, এর সবকিছু মিলে চিত্রকলার একটা স্বতন্ত্র শাখার সৃষ্টি হয়েছে যা ‘হস্তশিল্প’ নামে পরিচিত। বলা যেতে পারে, এসব হস্তশিল্পে শিল্পী হাত দিয়ে তাঁর প্রতিভা ও মননশীলতাকেই ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পান।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তির অধিকারী ও বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ মাত্রই প্রতিটি হস্তশিল্পের মধ্যে শিল্পীর ব্যক্তিসত্তার পর্যাপ্ত পরিচয় খুঁজে পাবেন। প্রকৃতপক্ষে, আজকাল হস্তশিল্প বলতে শিল্পকর্মের সেই শাখাটিকেই বুঝায় যার উৎপাদন প্রক্রিয়ার সর্বাংশ অথবা অংশবিশেষে মানুষের সংস্কৃতি, দর্শন এবং তার জাতিগত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শৈল্পিক রুচিবোধ বিধৃত থাকে। হস্তশিল্প যখন একটা জাতির অথবা জাতিগত গ্রুপের সহজাত প্রতিভার ধারক হিসেবে এবং তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রীতি-নীতির বাস্তব প্রতীক হিসেবে স্থায়িত্ব লাভ করে তখন তা শুধু উন্নয়নশীল জাতির ক্ষেত্রেই নয়, উন্নত জাতির ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইরানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে হস্তশিল্পজাত বাসন-কোসন ও অন্যান্য সামগ্রী এক বিরাট স্থান দখল করে রয়েছে। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এটা চলে আসছে। ইরানের গ্রাম-গঞ্জে ও উপজাতি অঞ্চলে বহু হস্তশিল্পী ঐতিহ্যগতভাবেই সস্তা কাঁচামাল ও অতি সাধারণ যন্ত্রপাতির সাহায্যে বিচিত্র কারুকার্য খচিত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রস্তুত করে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই। ইরানে বিভিন্ন উপজাতির এক বিরাট অংশ এবং বহু গ্রামীণ মানুষ তাদের জাতিগত ঐতিহ্য ও রীতিনীতির ওপর এখনও সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। বহুবিধ অভাব-অভিযোগ, শহরের বিলাসী জীবনের হাতছানি এবং কৃষি ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রের সকল তৎপরতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য বিপ্লবপূর্ব সাবেক সরকারের সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ইরানে প্রায় ১৫ লাখ লোক বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। ইরানের হস্তশিল্প উন্নয়নের বহু ক্ষেত্র রয়েছে এবং এর সম্ভাবনাও বিরাট। হস্তশিল্পে যে কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় তার একটা বিরাট অংশ কৃষিজাত পণ্য থেকেই সংগৃহীত হয়, অথবা বলা যেতে পারে, গ্রামাঞ্চল থেকেই এর যাবতীয় কাঁচামাল সরবরাহ করা সম্ভব। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে হস্তশিল্পে যে কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় তার মূল্য দাঁড়ায় গোটা শিল্প সামগ্রীটির বিক্রয় মূল্যের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। অপর দিকে হস্তশিল্পের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তি ইরানে যথেষ্টই রয়েছে।

ইরানে হস্তশিল্পের পুনরুদ্ধার এবং এর বাজারজাতকরণ ইরানীদের এক বিরাট অংশের কর্মসংস্থানই শুধু করবে না, পাশ্চাত্যের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার অবসানেও বিরাট ভূমিকা পালন করবে। কারণ, ইরানের হস্তশিল্প দেশের অর্থনীতিকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। যে মওসুমে কৃষিক্ষেত্রে কৃষকদের কোনো কাজ থাকে না তাদের তখনকার অবসর মুহূর্তগুলোতেও হস্তশিল্প কর্মমুখর করে তুলতে পারে।

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান একে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। ইরানের ইতিহাস এবং এর জাতিগত বৈশিষ্ট্য ইরানের হস্তশিল্পকে করেছে বৈচিত্র্যময় এবং সুশোভন। গত ৫০ বছরেও ইরানি হস্তশিল্পের এই রূপ কিছুমাত্র ক্ষুণ্ন হয়নি, এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে সমুজ্জ্বল; বরং অনেক ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তা উন্নীত ও পরিবর্তিত হয়েছে।

ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর ‘ইরানের হস্তশিল্প কেন্দ্র’ এবং ‘হস্তশিল্প কেন্দ্র স্টোর্‌স লি.’ নামক সংস্থা দুটিকে একত্র করে ‘ইরানের হস্তশিল্প সংস্থা’ নাম দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হস্তশিল্প কারখানাগুলোকে একটি মাত্র শিল্প ইউনিটে সমন্বিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৬৪ সালে ‘ইরানের হস্তশিল্প কেন্দ্র’ নামক সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে গঠিত ‘ইরানের হস্তশিল্প সংস্থা’ একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি হিসেবে সরকারি নিয়মকানুন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে :

  • পল্লি এবং শহর এলাকার গুণগত মান ও সংখ্যা উভয় দিক থেকে হস্তশিল্পের উন্নয়ন এবং এর পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ অথবা সাহায্য-সহায়তা দান।
  • ইরানি হস্তশিল্পের উৎপাদন, ক্রয়, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানিকরণ।
  • জনশক্তিকে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান এবং ইরানি হস্তশিল্পের মূল ডিজাইন, জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে উন্নত নির্মাণ কৌশলের ব্যাপক প্রয়োগে সহায়তা।
  • উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আর্থিক, কারিগরি ও ঋণ সহায়তা প্রদান এবং কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি সরবরাহের মাধ্যমে সমবায় প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করা এবং জোরদার করা।
  • হস্তশিল্প এবং সেই সঙ্গে দেশের সাধারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহ করা, পরিসংখ্যান তৈরি করা ও গবেষণার ব্যবস্থা করা।

(নিউজলেটার, জানুয়ারি ১৯৮৬)

ইসলামে সামাজিক ন্যায়বিচার

উত্তম ইসলামি সমাজে নারী-পুরুষ সবাই কাজ করে

(হুজ্জাতুল ইসলাম হাশেমী রাফসানজানির শুক্রবারের জুমার নামাজের খুতবা থেকে)

 মহিলাদের চাকরি

মহিলাদের আর্থিক নিরাপত্তার একটি উৎস হচ্ছে চাকরি। আমাদের এই যুগে মহিলাদের চাকরির ব্যাপারটি একটি সমস্যা হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক প্রশ্ন হচ্ছে : মহিলাদের কাজ করা উচিত, না উচিত নয়? ইসলাম বলে, মহিলারা কাজ করতে পারে এবং তাদের কাজ করা উচিত। ইসলামে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই শ্রমবিমুখতা ও আলস্য নিষিদ্ধ। বেশ কিছুসংখ্যক হাদিসে স্পষ্টই বলা হয়েছে যে, মহিলাদেরও কাজ করা উচিত। আমি এমন কয়েকটি হাদীসের উল্লেখ করছি যা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মহানবী (সা.) বলেছেন : ‘সত্তর ধরনের ইবাদতের মধ্যে সর্বোত্তম ইবাদত হচ্ছে সৎভাবে জীবনযাপনের জন্য পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা।’

এখানে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য করা হয়নি। আবার রাসুলুল্লাহ বলেছেন : ‘যারা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা আল্লাহর ক্ষমা লাভের যোগ্যতা অর্জন করে।’ এখানেও নারী বা পুরুষ কারো জন্যই বিশেষভাবে কথাটি বলা হয়নি- উভয়ের ক্ষেত্রেই সাধারণভাবে কথাটি প্রযোজ্য।

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : আল্লাহ সৎ, পরিশ্রমী মানুষকে ভালোবাসেন। এখানেও মানুষ কথাটি দ্বারা নারী ও পুরুষ উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। হযরত শুয়াইব (আ.)-এর কন্যারা মেষ পালন করতেন। একদিন তাঁরা যখন মেষগুলোর জন্য একটি কূপ থেকে পানি আনতে যান তখনই হযরত মূসার সঙ্গে তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। ইমাম কাযেম (আ.) বলেছেন : আল্লাহ তাঁর নিদ্রাকাতর ও আলস্যপরায়ণ বান্দাদের অপছন্দ করেন। এখানে বান্দা বলতে নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝানো হয়েছে।

নিশ্চিতই এমন অনেক হাদীস রয়েছে যেখানে শুধু পুরুষদের কথাই বলা হয়েছে। তবে তা এই কারণে যে, যে সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নির্দেশগুলো এসেছে সে সময়ে পুরুষদের ওপরই পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল এবং এখনও পুরুষরাই সে দায়িত্ব পালন করে আসছে। সাধারণভাবে, স্মরণ রাখা দরকার যে, সময় নষ্ট করাকে ইসলাম অত্যন্ত ঘৃণা করে। প্রতিদিনের সময়কে আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা নিদ্রা ও বাকি আট ঘণ্টা ইবাদত, বিনোদন ও বিশ্রামের জন্য বিভক্ত করা একটি উত্তম ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য। কিন্তু যারা কেবল আলসেমি করে সময় কাটায় তারা আল্লাহর সৎ বান্দা নয়।

এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, একটি উৎকৃষ্ট মুসলিম সমাজ হচ্ছে এমন একটি সমাজ যেখানে নারী-পুরুষ সবাই কাজ করে। তবে, উভয়ের মধ্যে যথাযথ শ্রমবিভাগের একটি প্রশ্ন রয়েছে। নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই দৈহিক, মানসিক, হৃদয়বৃত্তিমূলক ও সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ বেছে নিতে হবে।

যেসব ক্ষেত্রে মহিলাদের নিয়োগ নিষিদ্ধ

আমি যতটা জানি, দুই বা তিন ধরনের কাজে যোগদানের পথ মহিলাদের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। তবে, এগুলো চাকরির ক্ষেত্রে নয়। এগুলো হচ্ছে, কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে- যেখানে পারিশ্রমিকের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই ধরনের একটি ক্ষেত্র হচ্ছে বিচারকের কাজ। ইসলাম একে একটি পালনীয় কর্তব্য হিসেবে গণ্য করে, গ্রহণযোগ্য পেশা হিসেবে বিবেচনা করে না। যারা বিচার করেন এবং লোকজনদের মধ্যে বিরোধের মীমাংসা করেন তাঁদের এই দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করা উচিত নয়। এ কাজের জন্য তাঁদের যে অর্থ ব্যয় হবে তা মুসলিম ট্রেজারি (বায়তুল মাল) থেকে দেওয়া হবে। কিন্তু অ্যাটর্নী ও আইন উপদেষ্টা হতে মহিলাদের কোনো বাধা নেই।

দ্বিতীয় যে ক্ষেত্রটিতে মহিলাদের প্রবেশে বাধা রয়েছে তা হচ্ছে, মৌলিক জেহাদে অংশগ্রহণ (অস্ত্রধারণ করা এবং যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেওয়া)। এটাও একটা ধর্মীয় কর্তব্য, কোনো পেশা নয়। তবে, আত্মরক্ষামূলক জেহাদে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ নয়। কারণ, পুরুষের মতো মহিলাদেরও আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। সমরকৌশল আয়ত্ত করাতেও মহিলাদের বাধা নেই, কিন্তু আত্মরক্ষামূলক না হলে মহিলাদের যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ অনুমোদিত নয়। ইসলাম মহিলাদেরকে এই গুরুদায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে।

মহিলাদের প্রবেশের অনুমতিহীন তৃতীয় ক্ষেত্রটি হচ্ছে ধর্মীয় বিধান জারির (ফতোয়া) অধিকার। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সিদ্ধান্ত দিতে হলে ধর্মীয় অনুশাসন সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হতে হয়। কেননা, তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং অবশ্যপালনীয় বলে গণ্য হয়। এ কাজটিও একটি ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের কাজ মাত্র, পেশা বা বৃত্তি নয়। ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা করে মহিলারা ধর্মতত্ত্ববিদ হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তাঁর মতামত শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা হবে, কিন্তু তিনি ধর্মীয় অনুশাসনের উৎস হতে পারেন না।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, মহিলাদের কয়েকটি মাত্র দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা কাজের অধিকার হরণ নয়- অন্য বিষয়। এছাড়া অন্য সকল ক্ষেত্রেই মহিলাদের কাজে নিযুক্তির অধিকার রয়েছে। তাঁরা উকিল হতে পারেন, অ্যাটর্নী হতে পারেন, মন্ত্রী হতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা হতে পারেন, মেকানিক হতে পারেন অথবা অপর যেকোনো পেশা বা ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করতে পারেন। মহিলাদের কাজের ব্যাপারে ইসলাম গত ১৪০০ বছর ধরেই এই অভিমত ব্যক্ত করে আসছে।

সমাজে মহিলাদের কাজের আওতা

কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে কিছু যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত ইসলামি নীতিমালা অবশ্যই বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব নীতির ভিত্তি হচ্ছে নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক স্বার্থ এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কিত প্রশ্ন। এসব বিষয়ের ওপর ইসলাম যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছে। ইসলাম মনে করে, প্রতিটি পরিবারেরই নিরাপত্তা থাকতে হবে, পরিবারের প্রতিটি ছেলেমেয়েকেই আল্লাহর নির্দেশিত পরিবেশে গড়ে তুলতে হবে এবং স্বামী-স্ত্রীকে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

সমাজে এমন কিছু অবস্থা বিদ্যমান থাকে যাতে মহিলাদেরকে কোনো কোনো কাজে নিয়োগ করা যায় এবং কোনো কোনো কাজে নিয়োগ করা যায় না। তাছাড়া নৈতিকতা ও সতীত্বের প্রশ্নও বিবেচনা করতে হবে।

আমি দেশের বাইরে অনেকের সঙ্গেই মেয়েদের কাজের ব্যাপারে আলোচনা করেছি। আমি তাদের বলেছি যে, আমাদের পথ ও তাদের পথের মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে, তাদের পরিবেশে মেয়েদের জন্যে নৈতিকতা বর্জনের প্ররোচনা থাকে, যেখানে পুরুষরা মহিলাদের সঙ্গে অসঙ্গত আচরণ করে। কিন্তু আমরা মনে করি, মহিলাদের মর্যাদার নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। ইসলাম মেয়েদের জন্য কাজের সকল দরজাই খোলা রেখেছে। কিন্তু কিছু শর্ত অবশ্যই পালন করতে হবে এবং কিছু নীতিমালা অবশ্যই মেনে চলতে হবে।

পাশ্চাত্যের পরিবার-কাঠামো

আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন যে, পরিবারের অস্থিতিশীল অবস্থা ও বন্ধনহীন সম্পর্কের জন্য প্রতি বছর দশ লক্ষাধিক আমেরিকান যুবক-যুবতী বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। মাত্র সেদিন আমরা সংবাদপত্রে দেখেছি যে, জার্মানিতে পায় পাঁচ লাখ পরিত্যক্ত ছেলে-মেয়েকে সরকারি হেফাযতে রাখা হয়েছে। তাছাড়া সে দেশে প্রায় ত্রিশ লাখ মহিলাকে পৌরসভাগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। পাশ্চাত্য সমাজে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং ইসলামি সমাজের পারিবারিক বন্ধনের তুলনা করলেই ইসলামি জীবনপদ্ধতির যৌক্তিকতা উপলব্ধি করা যায়।

ঘৃণ্য পাহলভী শাসনামলে পাশ্চাত্যের অনুকরণে আমাদের মহিলাদেরও কাজের নামে এমন এক পরিবেশে টেনে আনা হয়েছিল যেখানে তাদের জন্য শুধু পাপ আর অনাচারই অপেক্ষা করছিল। সৌভাগ্যক্রমে, ইসলামি বিপ্লবের সাথে সাথে এই প্রবণতা বন্ধ হয়েছে। ইসলামি উপদেষ্টা পরিষদ পার্টটাইম কাজের যে বিল প্রণয়ন করেছেন তার ফলে মহিলারা এখন পরিবারের প্রতি তাঁদের প্রাথমিক দায়িত্ব পালনের পরে চাকরি করে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন।

সম্প্রতি বিবিসি’র একজন আমেরিকান মহিলা রিপোর্টার আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। এর আগে তিনি শুক্রবারের এক জুমা সমাবেশে আমার খুতবা শুনেছিলেন। তাতে আমি আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজে মহিলাদের দুরবস্থার কথা বলেছিলাম। মহিলা রিপোর্টার আমাকে বললেন : ‘আমি তো চাদর পরি না। তাই বলে কি আমি একজন দুর্দশাগ্রস্ত মহিলা?’ জবাবে আমি বলেছি : ‘আমি আপনার ব্যক্তিগত অবস্থার কথা জানি না। আমি লাখ লাখ আশ্রয়হীনা জার্মান মহিলার কথাই বলেছি যারা রাষ্ট্রীয় আশ্রয়ে রয়েছে। তাদের এমন কেউ নেই যার কাছে তারা আশ্রয় পেতে পারে। এরা কি ভাগ্যহত নয়? এরা কি সুখী? আমি আপনার নিজের দেশের কথাও বলতে পারি। মাত্র কয়েকদিন আগে আমি আপনাদের সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরেই দেখেছি, সেখানে হাইস্কুলে অধ্যয়নরত প্রায় পাঁচ লাখ ছেলেমেয়ে মাদকাশক্তির মতো অস্বাস্থ্যকর ও নৈতিকতাহীন কার্যকলাপে লিপ্ত রয়েছে। পাশ্চাত্যের সব দেশেই এখন এই ধরনের পরিস্থিতি বিদ্যমান। আমরা মনে করি, এটা সমাজের সামগ্রিক অবক্ষয়েরই দঃখজনক পরিণতি। ইসলামি সমাজে মহিলাদেরকে এমন দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হয় না।’

ঐ খুতবার উপসংহারে আমি মহিলাদের সতীত্বের প্রশ্ন তুলে বলেছিলাম যে, চাকরিরত মহিলাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নটি এভাবে পেশ করা যেতে পারে : চাকরি করেও কি মহিলাদের পক্ষে শালীনতা ও সতীত্ব রক্ষা করা সম্ভব? এ প্রশ্নের জবাবে আমি বলব, হ্যাঁ, অবশ্যই। আমাদের নারী ও পুরুষ- উভয় শ্রেণির লোকেই যদি শালীনতা ও সতীত্বের শর্তগুলো পালন করে চলতে পারেন তাহলে মেয়েদের মাঠে কাজ করতে কোনো বাধা থাকতে পারে না।

শালীনতা ও সতীত্ব রক্ষার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা আমাদের কর্তৃপক্ষের জন্য একটি গুরুদায়িত্ব। যে পরিবারে সতীত্বের কোনো মূল্য নেই, সে পরিবার থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। সতীত্বের প্রতি শ্রদ্ধাহীন কঠোর আইন-কানুন সমাজ সংস্কারের সহায়ক হতে পারে না। আইন-কানুনের শিথিলতা নিয়েও সৎ ও পুণ্যবান সমাজ অনায়াসে এগিয়ে যেতে পারে। কাজেই, মহিলাদের সতীত্বের প্রতি দৃষ্টি রেখেই মহিলাদের কাজের ব্যাপারে আমাদের নীতি নির্ধারণ করতে হবে এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে কাজ বণ্টন করতে হবে।

(নিউজলেটার, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬)

পশ্চিমা বেতারের প্রকৃত চরিত্র

নিজেদের ভবিষ্যৎ লাভের আশায় পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমগুলো মাঝে মধ্যে অথবা বিশ্বের কোনো বিশেষ ঘটনার পাশাপাশি বিশেষ সংবাদ রিপোর্ট পরিবেশন করে। অতঃপর পরবর্তী ফল লাভের জন্য সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে শুরু করে শোরগোল। মূলত এ মায়াকান্না বা গলাবাজি তারাই প্রদর্শন করে যারা পরিস্থিতিকে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চায়। সম্প্রতি (মার্চ ১৯৮৬) ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্বন্ধে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এবং এটি বিশ্বাস করার কারণ আছে যে, তা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত হবে। দুনিয়ার উদ্ধত শক্তিগুলো যখন কোনো আঞ্চলিক বা বিশ্বসমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয় তখন প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, তারা বহু পরীক্ষিত ব্যর্থ বাহানাগুলোকেই ব্যবহার করে।

সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন বিষয় ও ঘটনাবলি যা আমেরিকা, ব্রিটেন ও মিসরের পারস্পরিক সহায়তায় সংঘটিত হয়েছে, যেমন মাল্টা বিমান ঘাঁটিতে ষাটজন নিরপরাধ যাত্রী হত্যা, আমেরিকা ও ব্রিটেনের দালালদের দ্বারা দক্ষিণ আফ্রিকার বঞ্চিত কালো মানুষদের ব্যাপকভাবে হত্যা এবং পরাশক্তিদ্বয় কর্তৃক আফগানিস্তান, চিলি, সালভাদার ও ফিলিপাইনে প্রতিনিয়ত সংঘটিত অন্যান্য অপরাধ- এসবের কারণে বিশ্বজনমতে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে সেটাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্যই তারা আর একবার ইরানে মানবাধিকার অস্ত্র প্রয়োগ করছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের অপরাধগুলো ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সংবাদণ্ডআবরণ সৃষ্টি করা এবং ইসলামি ইরানকে চাপের মধ্যে রাখা।

এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পশ্চিমা মাধ্যমগুলোয় ব্রিটেনের ভূমিকা, বিশেষ করে বেতার কেন্দ্রগুলোর অপপ্রচার। ব্রিটেনের প্রচারসংস্থা বিবিসি এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এ বেতার কেন্দ্রের এক ফরাসি অনুষ্ঠানে ঘোষিত হয় : সম্প্রতি প্রকাশিত ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’-এর এক বিবৃতিতে ইরানি জেলখানায় বন্দিদের হত্যা, তাদের ওপর অত্যাচার ও দুর্ব্যবহার সংক্রান্ত শত  শত ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বন্দি শুধু ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জন্যই গ্রেফতার হয়েছিল।

উক্ত বেতারকেন্দ্র আরও ঘোষণা করে : এ রিপোর্ট অনুযায়ী ১৩ জন প্রত্যক্ষদর্শী যাদের মধ্যে ইরানের একটি বিরুদ্ধবাদী দলের কিছুসংখ্যক সদস্যও রয়েছে তাঁরা বলেছেন যে, আজও পরিকল্পিত উপায়ে ইরানে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, জেলখানায় কয়েদিদের অবস্থাও অসহনীয়।

প্রথমত বিবিসি প্রচার করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে হত্যা ও অত্যাচারের শত শত ঘটনার উল্লেখ আছে। পরবর্তী পর্যায়ে এসে বলে যে, এ রিপোর্টের ভিত্তি হচ্ছে তেরজন বিরোধী প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য। শেষ পর্যায় বলে : এ ছাড়া জাতিসংঘের একজন বিশেষ প্রতিনিধির লক্ষ্য ছিল এ বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি করার। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, তাঁকে ইরানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

স্ববিরোধী ও চাতুর্যপূর্ণ বিবৃতির এটাই প্রথম ঘটনা নয়। ১৯৮২ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের উদ্যোগে জাতিসংঘ থেকে ইহুদিবাদীদের উৎখাতের যে চেষ্টা চলছিল তার পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কিত এক ব্যাপক রিপোর্ট প্রচার করে এবং বর্ধিত ফল লাভের জন্য ভয়েস অব আমেরিকা ও বিবিসি’র সাথে সাথে ইসরাইল বেতারও তাদের প্রোগ্রামসমূহের অর্ধেকটাই দীর্ঘ কয়েকদিনের জন্য এ প্রসঙ্গটির মধ্যেই সীমিত রেখেছিল।

সে সময়ে পশ্চিম জার্মানিস্থ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত তথাকার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ডিরেক্টর জেনারেল হেলমুট ফোর্টিজকে এ বিষয়ে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য আবেদন রেখে এক পত্র লিখেন। মি. হেলমুট ফোর্টিজ তিন মাস বিলম্বের পর শেষাবধি এক সংক্ষিপ্ত উত্তরে ইরানি দূতাবাসকে লিখেন : ইরানের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হত্যা সম্পর্কে আমি কোনো তথ্য বা দলিল পাইনি। আমি আশা করি, উত্তর দিতে পারব; ভবিষ্যৎ কোনো এক সময়ে যোগাযোগ করুন। অতঃপর দীর্ঘ তিন বছর অতিক্রম হওয়ার পরও তিনি তাঁর আশা পূর্ণ করতে পারেননি এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও গ্রহণযোগ্য কোনো দলিল পেশ করেনি; বরং তারা ইরানের বাইরে অবস্থানরত কিছুসংখ্যক ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরোধীর কিছু বক্তব্যকেই উপস্থাপিত করেছে।

আমরা অবশ্য এ ধরনের সংস্থাগুলোর প্রকৃতি এবং পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমগুলোর প্রচারণার লক্ষ্য সম্বন্ধে অবহিত। পিটার নিসন নামক জনৈক ব্যক্তির সহায়তায় ১৯৬১ সালে লন্ডনে এ সংস্থার জন্ম। এ সংস্থা ঘোষণা করে যে, নির্যাতন, হত্যা, বেআইনি গ্রেফতার, গুম ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো এর লক্ষ্য। কিন্তু সংস্থাটির তৎপরতা প্রমাণ করে যে, এটি দুনিয়ার বঞ্চিত মানুষের বিপ্লবী তৎপরতার বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করার যন্ত্র হিসেবেই কাজ করে। পরাশক্তিকে সমর্থনদান এবং তাদের অপরাধকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করাই এর লক্ষ্য। পরাশক্তিসমূহের অপরাধী নোংরামুখ এ সংস্থার শান্তি ও মানবতার স্লোগানের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে।

বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর এ ধরনের স্ববিরোধী বিবৃতিকে তাদের প্রচারণার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে। এভাবে তারা ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্বন্ধে মিথা ছড়াচ্ছে। বিবিসি তার আরবি প্রোগ্রামেই এ বিষয়টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

এ সংস্থার মানবাধিকার কমিটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যে রিপোর্ট পেশ করেছে সেখানে উল্লেখ আছে, ১৯৮৪-৮৫ সালে ৩০০ ইরানিকে হত্যা করা হয়েছে।

এবারের রিপোর্ট তারা কিন্তু নিজেদের দাবির যথার্থতা প্রমাণের জন্য কোনো দলিলের কথা উল্লেখ করেনি। রিপোর্টে শুধু বলা হয়েছে যে, জাতিসংঘ প্রতিনিধি ইরানের বাইরে অবস্থানরত তের জন বিরুদ্ধবাদী ইরানির সঙ্গে আলাপ করেছেন। শত শত হত্যা ও হাজার হাজার অত্যাচারের ঘটনার অস্তিত্ব কিভাবে বোঝা গেল, কেনই বা সরকারবিরোধী ১৩ জনের সাক্ষ্যকেই তাঁরা নির্ভরযোগ্য বলে মনে করলেন? অথচ ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে যখন ইরিক, স্পিথ ও ব্রীচ নামক তিনজন জেলার ব্রিটেনের উইংগ্রিন জেলখানায় ব্যারী প্যারাসো নামক একজন বন্দিকে করুণভাবে হত্যা করে তার তলপেট টুকরো টুকরো করে ফেলে তখন তারা টু শব্দও করেনি। যাক, লন্ডনে অবস্থিত যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সে সংস্থাটিও এ ব্যাপারে একটি ক্ষুদ্র বিবৃতিও প্রচার করেনি এবং বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও রেডিও ইসরাইল এ প্রসঙ্গে কোনো কথাই বলেনি।

উক্ত ঘটনা ঘটছে ১৯৮০ সালে যখন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট অনুযায়ী এল-সালভাদরে বিনাবিচার চৌদ্দ সহস্র লোকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করা হয়। এল-সালভাদরের অপরাধের কথা বলা হলেও কোনো মানবাধিকারের প্রবক্তাই ব্রিটেনের ঘটনার ব্যাপারে কোনো কিছু বলার প্রয়োজন মনে করেনি। ১৯৭০ সালের প্রথমদিকে মার্কিন ভাড়াটিয়াদের দ্বারা হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হলো নাইজেরিয়ার বায়াফ্রাতে। অথচ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং মানবাধিকারের সমর্থকদের মানবতাবোধ এ ব্যাপারে আদৌ জাগ্রত হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকা, আফগানিস্তান, ফিলিপাইন, চিলি, এল-সালভাদর এবং নিকারাগুয়ায় হাজার হাজার বঞ্চিত মানুষ নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে, কিন্তু এ সংস্থা কর্তৃক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সে সম্পর্কে কোনো রিপোর্ট প্রেরিত হয়নি। আসলে যখন আফগানিস্তানে আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেনের অপরাধ বিশ্ববিবেককে স্পর্শ করেছে, তখনই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্য কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে হৈচৈ শুরু করেছে। আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গটি হচ্ছে পশ্চিমা বেতার কেন্দ্রগুলোর একান্ত উপযোগী উপকরণ। এ সকল বেতার কেন্দ্র ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলে কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জন করে, কিন্তু ইরাকে গণহত্যার বিষয়ে নীরব থাকে। কিছুদিন আগে দুনিয়ার মুসলিম জনতার অভিমতের চাপে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইরাকে বন্দিদের অবস্থা ও নির্যাতন সম্বন্ধে একটি অসম্পূর্ণ রিপোর্ট তৈরি করেছিল। ১৯৬৮ সালের অভ্যুত্থানের পর এটাই ছিল ইরাকের ব্যাপারে বিশ্ববাসীর দাবির প্রথম প্রতিফলন। আজকে বিশ্বসমাজকে অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে যে, দুনিয়ার গর্বিত শক্তিগুলো আবার কোন উদ্দেশ্যে সেই পুরাতন অস্ত্র ইসলামি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য টেনে আনছে!

(সূত্র : নিউজলেটার, এপ্রিল ১৯৮৬)

মুসলিম কালো আদমি ও মার্কিন মুল্লুকে ইসলাম

চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আমেরিকার কালো আদমি সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইসলামের পরিচয় ঘটে এমন এক পরিবেশে, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামকে একটি পশ্চাৎপদ ধর্ম প্রমাণের জন্য বিকৃতভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছিল। কারণ, শয়তান জানত যে, পশ্চিমাজগতেও সত্যধর্ম ইসলামের অভ্যুদয় ঘটবে। এ জন্যই যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যজগতে এর প্রবেশের পূর্বেই ইসলামকে বিকৃত করে বিতর্কিত আবেদনহীন বানাবার চেষ্টা করা হয়। এতদ্ভিন্ন ইউরোপীয়রা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কালো আদমিদের বুঝাতে চেষ্টা করে যে, যিশুখ্রিস্ট একজন কোকেশিয়ান ছিলেন, তাঁর আঁখিযুগল ছিল নীল, ঈষৎ স্বর্ণাভ রং-এর ছিল কেশদাম। মার্কিন কালো আদমিদের প্রভাবান্বিত করার জন্য তারা যে পন্থা উদ্ভাবন করেছিল তা হচ্ছে এমনি প্রচারণা যে, ঈশ্বর হচ্ছেন একজন উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মানুষ, যাঁর চোখদ্বয় ছিল সবুজাভ নীল রঙের এবং যিনি নিজেকে ‘আল্লাহ্’ বলে পরিচয় দেন এবং নিজেকে কালো আদমিদের শ্রেণিভুক্ত মনে করেন।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কোকেশিয়ান জালিমরা একজন উজ্জ্বল বর্ণের সবুজাভ নীল চোখের মাস্টার র্ফ্দা মুহাম্মাদকে অনুমতি দিল ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার নামে ইসলামের একটি বিকৃত রূপ উপস্থাপনের জন্য- যে নিজেকে আমেরিকায় ‘আল্লাহ্’ বলে দাবি করত। তাদের আশা ছিল কালো আদমিদের মধ্যে একটি বিভেদের নীতি, একটি আশঙ্কা ও একটি গোপন জুলুম বিরাজমান রাখা, লক্ষ্য ছিল অন্যান্য দেশ থেকে আগত মুসলমানদের সঙ্গে আগত ইসলামের স্বীকৃতি যেন কালো আদমিরা না দেয়।

এ ইষৎ তামাটে বর্ণের লোকটি যুক্তরাষ্ট্রে এলেন এবং বুঝালেন যে, তিনি কালো আদমি এবং তিনিই আল্লাহ্। এলিজা পুল যিনি পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তন করে হয়েছেন এলিজা মুহাম্মাদ, তাঁকে নবী হিসেবে ঘোষণা করা হলো। এলিজা এ ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করলেন এবং এমন অনেক অনুসারী সংঘবদ্ধ করলেন, যাদের ধারণা হলো তারা মুসলমান। কেননা, তারা তো ইসলামেরই দর্শন গ্রহণ করেছে। কালো আদমিরা, বিশেষ করে সে যুগ থেকেই মাস্টার ফার্‌দ মুহাম্মাদ, এলিজা মুহাম্মাদ, এমনকি মন্ত্রী লুই ফারাখানের শিক্ষানুযায়ী এই ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে নিপতিত হয়ে আছে যে, মনুষ্য সমাজের এবং বিশ্বজগতের অধিপতি হচ্ছেন কালো আদমি।

একটি সমস্যা সৃষ্টি হলো। খ্রিস্টান কালো আদমিদের পক্ষে যেখানে পূর্ণ সম্ভাবনা ছিল সত্যিকার ইসলাম গ্রহণের সেখানে তারা তথাকথিত ইসলাম ত্যাগ করল এবং মুসলমান হওয়ার চিন্তাও তাদের মধ্য থেকে উঠে গেল। যার ফলে বিকৃত খ্রিস্টবাদের মধ্যেই তাদের তৃপ্ত থাকতে হলো।

কালো আদমিদের নবতর চেতনার ফলে অনেক তথাকথিত মুসলমান ভাবতে শুরু করল যে, খোদা ও যিশুখ্রিস্ট হচ্ছেন কালো আদমিদের অন্তর্ভুক্ত এবং স্বর্গ ও নরক পৃথিবীতেই ঘটে থাকবে।

অর্থনৈতিক মুনাফার জন্য ইউরোপীয়রা ও ইহুদিরা আরবি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞতাবশত যে ভ্রান্তির সমাবেশ ঘটিয়েছে তাদের তথাকথিত ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে সেটিও ভুল ধারণা ও অসামঞ্জস্য সৃষ্টিতে যথার্থ ভূমিকা পালন করেছে। স্বার্থপ্রণোদিত ও বিকৃত তথ্যের ভিত্তিতে রচিত এ সকল বিকৃত পুস্তক ছাত্রদেরকে প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে এবং প্রকৃত ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে তাদেরকে অজ্ঞ রাখার জন্য আজও কলেজের এবং পাঠাগারের তাকের মধ্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রকৃত ইসলামের দুশমনদের দ্বারা ইসলামের এ ধরনের বিকৃত উপস্থাপনার নিদর্শন আজও দেখা যায়।

ইসলামের সত্যতার যে নিদর্শন কোরআনে ও বিভিন্ন ইসলামি পুস্তকে রয়েছে, যেগুলোর অনুবাদ মুসলমানরাই করছে সেগুলো আজও সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে আছে। আর অমুসলমান, ইসলামের শত্রু এবং অজ্ঞ লোকদের দ্বারাই ইসলামের ঘটনাবলি বিকৃত হয়েছে। বিষয়টির অবনতি ঘটাবার জন্য আমেরিকার কালো আদমি এলিজা মুহাম্মাদ একজন প্রতারক খ্রিস্টান ধর্মগুরুর সহায়তায় মাস্টার ফার্‌দ মুহাম্মাদ এর তথাকথিত ‘ইসলাম’-এর ভ্রমাত্মক তত্ত্ব কালো আদমিদেরকে শিক্ষাদানের সুযোগ গ্রহণ করেন, যার ফলশ্রুতি হচ্ছে কালো আদমিদের জাগৃতি সংস্থার উদ্ভব। সেটিকে সাধারণত ইসলামি জাতির প্রথম পুনরুত্থান বলে অভিহিত করা হয়।

কালো আদমিরা পূর্ব হতেই শোষিত হয়ে আসছিল এবং কোকেশিয়ান জালিমদের বর্ণবাদ, জুলুম ও বৈষম্যের মোকাবিলা করার একটি পথ তারা খুঁজছিল। এ কারণে এ দুই ব্যক্তি এমন অনেক অনুসারী পেল যারা নিজেদের জন্য নতুন পরিচিতি অম্বেষণ করছিল এবং সাদা আদমিদের থেকে নিজেদেরকে একটি পৃথক জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত মনে করছিল। এ নতুন সংস্থার কর্মকর্তাগণ এবং এর বেশ কিছু সমর্থক জানতেন যে, এলিজা এবং মাস্টার ফারদের লোভী প্রশংসাকারী অনুসারী লুই ফারাখান, যিনি নেশন অব ইসলাম অর্গানাইজেশন-এর বিখ্যাত কর্মকর্তা, তাঁর হাতেই ইসলামের মুনাফার চাবিকাঠি।

উপরিউক্ত সব কারণে দি নেশন অব ইসলাম তখনও যেমন কোনো ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করত না, আজও তা করে না। এটা এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার ভিত্তি হচ্ছে বাইবেল ও কোরআনের চিন্তাধারা। এদের কোরআনের ব্যাখ্যার লক্ষ্য ছিল আমেরিকান কালো আদমিদের জাগৃতি। বিপরীত পক্ষে, সত্যিকারের ইসলাম হচ্ছে এমন একটি ধর্ম পবিত্র কোরআনের নির্দেশ মোতাবেক যে এটি শিখে এবং জীবনে বাস্তবায়িত করে সে যেই হোক না কেন, কালো হোক বা অন্য কিছু, সবার জন্যই এটি কল্যাণ বয়ে আনে।

হযরত ঈসা (আ.)-এর মিশন শেষ হওয়ায় প্রায় ৬০০ বছর পর হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগমন ঘটে। তিনি ছিলেন শেষ পয়গম্বর, আজ থেকে ১৪০০ বছর পূর্বে যাঁর ওপর কোরআন নাযিল হয়েছে। কিন্তু সে কোরআনে বর্ণিত প্রকৃত ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে দি নেশন অব ইসলামের আদর্শের রয়েছে বিরাট বৈপরীত্য। ইসলামের আর্বিভাব পূর্বেকার তথা মূসা (আ.)-এর কিতাব ও ঈসা (আ.) বর্ণিত শিক্ষার পরিসমাপ্তি ঘোষণা এবং সেগুলোর সত্যতা প্রমাণ করে। আদম, নূহ, ইবরাহীম, লূত, ইউসুফ, ইয়াকুব এমনি হাজার হাজার নবী ও আল্লাহ্‌র পছন্দনীয় ব্যক্তির মাধ্যমেই যে আল্লাহ্্র সব শিক্ষা এসেছে সে বিষয়টি নিশ্চিত করে।

ঈসা (আ.)-এর জন্মের বহু পূর্বে মনুষ্য সমাজের জন্মলগ্ন থেকেই ইসলামের অভ্যুদয় ঘটেছে যা হচ্ছে মানুষের আদি ধর্ম। ইসলামের অর্থ হচ্ছে একজনের ‘ইচ্ছাশক্তিকে’ পূর্ণভাবে আল্লাহ্‌র সমীপে সমর্পণ করা। আর আল্লাহ্ তো অদৃশ্য- না তিনি মনুষ্যজীব, না তার সন্তান। প্রথম মানব, আল্লাহ্‌র নবী আদম (আ.)-এর বিশ্বাস ছিল এটাই। আল্লাহ্‌র কাছ থেকে হযরত আদমের কাছে যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে সে তো ইসলামই। নবিগণের সামনে সকল বিশ্ববাসীর তরে একই ধর্মীয় নির্দেশ প্রেরিত হয়েছে আর ধরণির বুকে মানুষের মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটা চলবে। আল্লাহর নবীরা সবাই সে মহা ঐশী শক্তির আধার কর্তৃকই অনুমোদিত। তাঁদের কেউই পশ্চিম গোলার্ধ থেকে আবির্ভূত হননি, এমনকি তাঁরা পশ্চিম গোলার্ধ ভ্রমণও করেননি। অথচ তাঁদের বাণী সারা জাহানে সকল মানুষের জন্য প্রচারার্থে নির্দিষ্ট হয়েছে। আল্লাহ্‌র সকল নবীই প্রাচ্যে পদার্পণ করেছেন।

মাস্টার ফার্‌দ মুহাম্মাদ এলিজা মুহাম্মাদকে যে দর্শন শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হচ্ছে কালো আদমিদের জাগরণ সম্পর্কিত। আমেরিকায় কালো আদমিদের সেই সংকটকালে তৎকালীন প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে যে দার্শনিক ব্যাখ্যা তাদের সম্মুখে উপস্থাপন করা প্রয়োজন ছিল সেটাই উপস্থাপন করা হয়েছিল। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য যে, ম্যালকম এক্স, যিনি শাহাদাতের পূর্বে সত্যিকারের ইসলামকে বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর মাধ্যমে এবং বিগত কয়েক দশকে আমেরিকায় বহিরাগত মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে এখন কালো আদমিরা ইসলামের সত্যিকারের শিক্ষা এবং প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে উচ্চতর ধারণা লাভ করেছে। এতসবের পরেও একটি শিক্ষা তথা ব্যক্তিসত্তাকে জুলুমের হাত থেকে রক্ষা করার বিষয়টি বরাবর ভাবনার অন্তরালে থেকে যাচ্ছে।

অনেক মুসলমান যারা প্রথম পুনরুত্থানের সঙ্গে জড়িত তারা ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলে যে, শয়তান গোরা (সাদা) আদমিভুক্ত এবং তারা তাকে আজও সম্বোধন করে, ‘নীল নয়না শয়তান’ বলে। এই যে বিশ্বাস, এটা আজও অনেকে সমুন্নত করে রাখছে। কারণ, ইতিহাসের সারাটি সময়ে সাদা আদমিরা এমন সব কাজ করেছে যেটা শয়তানিরই নামান্তর। এদদ্ভিন্ন এ জাগরণ এমন একটা সচেতনতা সৃষ্টি করেছিল যা সামাজিক বিভিন্ন খারাবি থেকে কালো আদমিদের ব্যক্তিসত্তাকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল। যাক, এটা সত্য যে, আধ্যাত্মিক জ্ঞানী ও ইসলামের সত্যিকারের শিক্ষা তাদের জন্য অদ্যাবধি প্রয়োজন।

এলিজা মুহাম্মাদ নিজের এবং দি নেশন অব ইসলামের সমর্থনে এসকল বিকৃত ইসলামি বক্তব্য ব্যবহার করতেন, উদ্দেশ্য ছিল ভয়াবহ নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য কালো আদমিদের সচেতন করা। তাঁর অনেক আত্মনিবেদিত অনুসারী ছিলেন। যেমন শাহাদাত লাভের পূর্বে ম্যালকম এক্স, ফারাখান, এলিজার পুত্র ওয়ালেক দীন মুহাম্মাদ- যিনি পরবর্তী পর্যায়ে নাম পরিবর্তন করে নামধারণ করেছিলেন ওয়ারিস (যার অর্থ হচ্ছে উত্তরাধিকারী)। মৃত্যুর পূর্বে ম্যাকলম এক্স কোরআনভিত্তিক ইসলামের সত্যিকার শিক্ষার বিষয়ে কঠোর অধ্যাবসায় নিয়ে অধ্যয়ন করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত হন। আল্লাহ্‌র অপার কৃপায় গুপ্তঘাকতের হাতে নিহত হওয়ার পূর্বে তিনি সত্যিকারের ইসলামকে চিনতে পেরেছিলেন এবং ভুল পথে পরিচালিত মুসলমানদেরকে জাগাতে চেষ্টা করেছিলেন। এটি ছিল এমনি এক জাগতিক প্রচেষ্টা যা তাঁর জন্য শাহাদাত ডেকে আনে। ধূলি-ধূসরিত বসুন্ধরা ত্যাগের পূর্বে মুসলমান হিসেবে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এক দায়িত্ব হজ সমাপনের জন্য আরবের মক্কায় গমনের সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেছিলেন। সে সময়ই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন প্রকৃত ইসলামের পরিচয়।

তাঁর এ সত্য উপলব্ধি সমসাময়িক মুসলিম কালো আদমিদের সংস্থার জন্য বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত হলো। কিছু কিছু লোক ভাবল ম্যালকম এক্স ক্ষমতালাভের প্রত্যাশী ছিলেন। তারা ভেবেছিল যে, তিনি নেতা হতে চাইছেন। অন্যরা সরলতার সঙ্গে বিশ্বাস করছিল যে, তিনি উন্মত্ততায় ভুগছিলেন। কারণ, তিনি এলিজার শিক্ষা অনুসরণে বিরত হয়েছিলেন। তবে কিছু কিছু লোক এটা বুঝতে পেরেছিল যে, যা সত্য সেটাই তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছেন, কিন্তু তারা চাচ্ছিল না যে, মুসলিম কালো আদমিরা সেটা জ্ঞাত হোক। হকের বিরোধী শক্তির লালসা চরিতার্থ করার জন্য কালো আদমিদের অজ্ঞতার অন্ধকারে রেখে তাদের শোষণ করার হীন অভিপ্রায়ে রচিত এটা ছিল আর এক ধরনের ষড়যন্ত্র।

জুলুম এবং জাহেলিয়াতের মোকাবিলায় ইসলাম সচেতন করে তোলে। ইসলাম মানবসন্তানদের সত্যের আলো ও আধ্যাত্মিক চেতনার দিকে ঐক্যবদ্ধ করে। আর সে আলো সে চেতনা তো আল্লাহ্‌র নূরের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়।

এলিজার মৃত্যুর পর মুসলিম কালো আদমিরা শতধাবিভক্ত হলো। সঠিক হোক আর না হোক কেউ কেউ এলিজার শিক্ষায় দৃঢ় রইল, কেননা, তারা তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে বুঝতে পেরেছিল যে, কালো আদমিদের জাগরণ ও স্ব-সহায়তার মধ্যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যাক এটা অবশ্যই হৃদয়ঙ্গম করতে হবে, মুসলমানদের প্রথম পুনরুত্থানের দর্শন ‘চক্ষু উন্মোচন’ মাত্র, সেটা কোনো ধর্ম নয়, যদিও সেটার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসলাম’ এবং তার অনুসারীদের বলা হয় ‘মুসলমান’। কোরআনের স্পষ্ট জ্ঞান না থাকার দরুন ভবিষ্যতেও তারা নিজেদেরকে ইসলামের অনুসারী এবং মুসলমান বলে ভাববে। কিন্তু প্রথম পুনরুত্থান-এর সমর্থকগণ ম্যালকম এক্স-এর নেতৃত্ব নতুন ধ্যান-ধারণা গ্রহণ করল।

কিছু কিছু অনুসারী আবার বিভ্রান্ত  হলো। তারা তাদের অনেক ধর্মীয় এবং আচার-অনুষ্ঠানই ত্যাগ করল এবং গাফেল থাকল সত্যিকার ইসলাম থেকে, অথচ এরপরও তারা মুসলমানত্বেরই দাবিদার। অপর পক্ষে, অনেকেই হেদায়াত লাভের জন্য প্রার্থনা করছিল এবং সঠিক ইসলামি পথও তারা পেয়েছিল। ম্যালকম এক্স-এর শাহাদাতপ্রাপ্তির পর অনেকেই নিজেদের ঈমান ও কোরআনি শিক্ষার ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। এটা সম্ভব হয়েছিল কোরআনে গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণার ফলেই। বিদ্যার্জন ও ব্যবসায়িক কারণে অনবরত যারা আমেরিকায় পদার্পণ করছিল তাদের সংস্পর্শে এসে মুসলিম কালো আদমিদের অনেকের মধ্যকার বিভ্রান্তি ও গলদ দূর হয়ে যায়।

ম্যালকম ও এলিজার তিরোধানের পর মুসলিম কালো আদমিদের অধিকাংশ এলিজার পুত্র ওয়ারিস দি মুহাম্মাদের নেতৃত্বাধীনে চলে যায়। এটা ছিল ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের প্রারম্ভ। যাক, তিনি ছিলেন পশ্চাৎপদ ইসলামের অনুসারী। সাম্প্রতিককালে তাঁর অনেক অনুসারী মার্কিন জাতীয়তাবাদের মোকাবিলায় টিকতে পারছে না এবং ইসলামি পরিচয় সমুন্নত রাখতেও চাইছে না, অনেক অঞ্চলে তারা ইসলামের অটল অনড় জীবনপ্রণালি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এটা এজন্য হতে পারে যে, ওয়ারিস উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর পিতার কাছ থেকে নেতৃত্ব লাভ করেছেন। তাই আপোসের পথ ধরেছেন যা একজন জন্মগত নেতৃপ্রতিভাধর ব্যক্তির প্রকৃতির বিপরীত স্বভাব। কিন্তু এটা অন্ধ আনুগত্যের দোষ থেকে কাউকে রেহাই দিচ্ছে না।

ম্যালকম এক্সের শিক্ষা এবং প্রায় প্রত্যহ আগত মুসলিম অভ্যাগত ও ইসলামি পুস্তকাদি থেকে অধিকাংশ লোক প্রকৃত ইসলামকে জানতে পারে। বিভেদ এবং অনৈক্যের কারণে ওয়ারিস দি মুহাম্মাদের অনেক অনুসারী মার্কিন জাতীয়তাবাদের শিকারে পরিণত হলো এবং এর ফলশ্রুতিতে শয়তানের ওয়াসওয়াসায় প্রতারিত হলো। এভাবে আজও কোনো লোক ফারাখানের শিক্ষার এবং তথাকথিত প্রথম পুনরুত্থানের অনুসারী। আবার কেউ বা ওয়ারিস দি মুহাম্মাদের দ্বিতীয় পুনরুত্থান দর্শনের সমর্থক। এমন অনেক আমেরিকান মুসলমান আছে যারা এ দুদলের কোনোটির অন্তর্ভুক্ত নয়। এ সকল মুসলমান আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে নিজেদের অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে ইসলামের মধ্যে সত্যতা খুঁজে পেয়েছে এবং এটিকে তাদের জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করেছে।

প্রথম পুনরুত্থানের শিক্ষা কালো আদমিদের মধ্যে অধিকতর আত্মশক্তি ও আত্মবিশ্বাস অর্জনে সহায়তা করেছে এবং এর ফলে তারা বুঝতে পেরেছিল যে, তারা ছিল অত্যাচারিত। তখন তারা এর বিরুদ্ধে গঠনমূলক কিছু করা শুরু করল। এটা একটা সৌভাগ্য, কেননা, তখনও অগণিত কালো আদমি নৈরাশ্যের শিকার হয়ে অত্যাচারিতের জীবনকেই বরণ করে নিয়ে চলছে। তারা না নিজেরা কিছু করেছে, না তাদের সন্তানদেরকে সে শিক্ষা দিয়েছে- যে শিক্ষার বলে উত্তর আমেরিকার কালো আদমিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জুলুম থেকে তারা রেহাই পেতে পারে।

ইসলামকে জানতে হলে অবশ্যই পবিত্র কোরআনের শব্দরাজি অধ্যয়ন ও হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। তিনি পুরুষ হোন আর নারীই হোন, সত্যিকারের মুসলমান হতে গেলে কোরআনের শিক্ষাকে তাঁর জীবনে বাস্তবায়িত করতে হবে। এটা ফারাখান অথবা ওয়ারিস দি মুহাম্মাদের মধ্যস্থতা ছাড়াও সম্ভব। কেউ যদি ইসলাম সম্বন্ধে অধ্যয়ন করেন তবে সে অবশ্যই অধুনা প্রচলিত বাইবেলের মিথ্যা ও ভুল-ত্রুটিগুলো আবিষ্কার করতে পারবেন। এখন সেটার শিক্ষাও কিছু নির্দিষ্ট শোষকের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য বিকৃত করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআন আল্লাহ্‌র প্রেরিত সর্বশেষ গ্রন্থ। এর আদি ভাষা পরিবর্তিত হয়নি। যার জন্য এতেই রয়েছে প্রভুর স্পষ্ট পথনির্দেশ।

বিশেষ করে হযরত ঈসা (আ.)-এর পরবর্তীকালে, অন্ধকার যুগে যখন কোনো পথনির্দেশ ছিল না তখন সকল খ্রিস্টান ও তথাকথিত আনুগত্যশীলদের জন্য খ্রিস্টপূর্ব এবং পরবর্তীকালীন প্রত্যাদেশসমূহের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ব্যাপারে এ কিতাব ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। ইহুদিগণ এ সময়টিতে নিজেদের দুষ্ট স্বভাবের দরুন যিশুখ্রিস্টের বাণীসমূহ গোপন করে ফেলে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের কিতাবের বাণীই সমাজে প্রচলন ও প্রচার করবে এবং আজও তারা তাই করছে। এ জন্য আজ ৯৫ ধরনেরও বেশি বাইবেলের অনুবাদ দৃষ্ট হয়, কিন্তু পবিত্র কোরআন একটিই এবং মনুষ্যসমাজের সম্মুখে একটি নিদর্শন রাখার জন্য পবিত্র কোরআনে কোনো বিকৃতি ঘটতে দিবেন না আল্লাহ্ তাআলা। এটা হচ্ছে শেষ অবতীর্ণ কিতাব। আর কোনো কিতাবও আসবে না, অন্য কোনো নবীরও আগমন ঘটবে না।

মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন ইসলামের বিধান ও মৌল বিষয়গুলোর অনুসরণ এবং ঈমান, ইসলামি চেতনাবোধ বৃদ্ধি করা ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করা। তিনি যে ব্যক্তিই হোন না কেন, যদি ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা না দেন তবে তাঁকে অনুসরণের কোনো প্রয়োজন নেই। আর সে ব্যাখ্যা তো হবে শেষ ঐশী বাণীসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল যা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।

আজ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে মুসলমানদের নেতা হিসেবে ইমাম খোমেইনীর অভ্যুদয় ঘটেছে। তিনি পবিত্র কোরআন মুতাবিকই নির্দেশ দিচ্ছেন, যদিও অনেকের পক্ষে তা হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হচ্ছে না। কেউ কেউ বলছেন, যেহেতু তিনি ইরানবাসী এবং কালো আদমিদের অন্তর্ভুক্ত নন (এখানে যে নেতৃত্বের কথা বলা হচ্ছে তা হচ্ছে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার মুক্তি ও কল্যাণের পথনির্দেশ দেওয়ার নেতৃত্ব, কোনো বিশেষ ইসলামি দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে ইরানের সঙ্গে একদেহে লীন হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে না), অতএব, তিনি কালো আদমিদের নেতা হতে পারেন না। কিন্তু এ ধরনের মন্তব্য অজ্ঞতা থেকেই উদ্ভূত।

এটা ভেবে দেখলে অনেকের জন্য সহায়ক হতে পারে যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিনিধি ৪ কোটি আমেরিকাবাসীর দুরবস্থার বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং মার্কিন সমাজে এ জুলুম ও বৈষম্যের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে উত্থাপন করেছেন। ইনসাফকামী ইরানি জনতা যারা নিজেরাই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত, এরপরও তারা অপর মজলুম ভাইয়ের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে, যে ভাইয়েরা আশায় বুক বেঁধে আত্মসাহায্যের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

উপসংহারে বলতে চাই, বিচারের দিনে আমরা অবলোকন করব কে অপরাধী ছিল। আল্লাহ্ তো আমাদের স্বেচ্ছাকৃত পাপের জন্যই শাস্তি বিধান করবেন, অনিচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য নয়। এখন যেহেতু আমরা ইসলাম সম্বন্ধে অবহিত, এজন্য অবশ্যই আমাদেরকে কোরআন পাক অধ্যয়ন করতে হবে, এর নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে এবং সাবধান থাকতে হবে যে, শয়তান যেন আমাদের ওয়াসওয়াসা দিতে না পারে। আল্লাহ্‌র কাছে পথনির্দেশ প্রার্থনা করুন। তিনি হচ্ছেন রাহমানুর রাহীম। সর্বশ্রেষ্ঠ মার্জনাকারী আমাদেরকে সত্যিকারের শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন।

(সূত্র : নিউজলেটার, এপ্রিল ১৯৮৬)