All posts by dreamboy

একটি ফুল আমি হারিয়ে ফেলেছি

(ইমাম খোমেইনী (র.)-এর শোকানুষ্ঠানে যোগদানকারী দশ বছর বয়সের একটি বালকের অনুভূতির আলোকে রচিত)

সকলের পরিধানেই ছিল কালো পোশাক। যেদিকেই তাকাই না কেন বাড়িঘর আর দালানকোঠা সবই যেন কালো কাপড়ে মোড়া। ফুটপাতের থরে থরে সাজানো ফুলের টব পর্যন্ত। মসজিদের ভেতরে মানুষের ভীড়, বাইরেও মানুষ। সবার চোখে-মুখেই শোকের ছায়া। ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে বাড়ি ফিরে এল হুসাইন। মসজিদ পর্যন্ত পৌঁছতে না পারায় সে খুব অসন্তুষ্ট। সে সিদ্ধান্ত নিল যে, তার বাবা বাড়িতে ফিরে না আসা পর্যন্ত সে বাড়িতেই থাকবে এবং বাবা ফিরে আসলে তার সাথে মসজিদে যাবে। যদিও সে জানে না যে, তার বাবা কখন বাড়ি ফিরে আসবে।

আগের দিন রাতে হুসাইনের বাবা গিয়েছিলেন মোসাল্লায় (তেহরানস্থ নামাযের ময়দান) লাখো-কোটি শোকার্ত মানুষের সাথে ইমাম খোমেইনীর জানাযায় শরীক হতে। বাড়ি থেকে রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে অত্যন্ত দরদমাখা কণ্ঠে হুসাইনের বাবা হুসাইনকে বলেছিলেন : হুসাইন! সম্ভবত আমি আজ রাতে ফিরব না। তুমি তোমার মায়ের কাছে থাকবে এবং আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত কোথাও যেও না।হুসাইনের পিতা খুব শীঘ্রই বাড়ি ফিরে আসবেন এবং সে তাঁর সাথে মসজিদে যাবে একথা চিন্তা করে হুসাইন খুবই আশান্বিত হয়ে থাকল।

অবশেষে পিতা ফিরে এলেন। হুসাইন দৌড়ে তাঁর কাছে গিয়ে বলল : সালাম। হুসাইন তাঁর পিতাকে আগে আর কখনও এ অবস্থায় দেখেনি। হুসাইনের পিতার চোখ ছিল লাল এবং মুখম-লে ছিল শোকের ছায়া।

হুসাইনের বাবা তাঁর কালো জামা থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে নিজ হাতে তা ভালোভাবে ধুয়ে নিলেন। তাঁকে খুবই ক্লান্ত ও শোকার্ত দেখাচ্ছিল। এমতাবস্থায় হুসাইনের বাবা তাকে মসজিদে নিয়ে যেতে রাজি নয়। একথা জানতে পেরে হুসাইন খুবই অস্বস্তি ও উৎকণ্ঠা বোধ করতে লাগল। ইমাম খোমেইনীর মৃত্যু সংবাদ শোনার পর থেকেই হুসাইন নীরবে ও সকলের আগোচরে বহুবার কেঁদেছে। রেডিওতে এই ঘোষণা এবং পবিত্র কোরআন ও শোকসংগীত শুনে শুনে সে খুবই বিমর্ষ ও মর্মাহত। তার পিতা তখনও কাপড় ধৌত করছিলেন। হুসাইন তাঁকে একটি তোয়ালে এনে দিল। হুসাইন হঠাৎ করে বলল : আব্বা! মসজিদে খুব ভীড়। অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভীড়। সেখানে সকলেই ক্রন্দন করছে আর শোক করছে।হুসাইনের পিতা শোকার্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন : আমি জানি বৎস, রাতে খাওয়ার পর আমরা সেখানে যাব।

সমগ্র শহর সেদিন শোক করছিল। হুসাইন ও তার বাবা খুব শান্তভাবে মসজিদের দিকে এগিয়ে গেল। তারা মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে মেহরাবের কাছে এক কোনায় গিয়ে বসল।

মসজিদ ভর্তি মানুষের সেদিনের ক্রন্দন আর আহাজারির শব্দ দেয়াল আর ছাদে আছাড় খেয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল মসজিদের বাইরে। একটি বালক লোকদের কাছে কুরআন শরীফের কপি পৌঁছে দিচ্ছিল আর তাদের মাথায় গোলাপ পানি ছিটিয়ে দিচ্ছিল। এক শোকার্ত কিশোর মাইকে কবিতা আবৃত্তি করছে আর তার চোখ থেকে পানি ঝরছে। শোকে মুহ্যমান মানুষের মাথা ছিল অবনত আর অতিমাত্রায় কান্নার মধ্যে তাদের ঘাড় কাঁপছিল। এমন সময় একজন বৃদ্ধা হুসাইনকে ডেকে বললেন : খোকা! তুমি এখানে এস।হুসাইন জানত যে, এখানে জবাবের কোন প্রয়োজন নেই। সে নিজে থেকেই সাহায্য করতে আগ্রহী ছিল। লোকটি হুসাইনকে গ্লাসসহ একটি পাত্র আনতে বললেন এবং পানির পাত্র আছে এমন আরেক কিশোরের সাথে মিলিত হয়ে লোকদেরকে পানি পান করাতে বললেন।

হুসাইন আগেও বহুবার শুনেছে যে, মসজিদে কোন কাজে সাহায্য করা সওয়াবের কাজ। তাই সে এই কাজ করার সুযোগ পেয়ে খুব খুশি হলো। সে আরো খুশি এজন্য যে, ইমাম খোমেইনীর জন্য সেও কিছু করছে। অবশেষে শোকানুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল এবং শোকার্ত লোকজন ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে গেল। হুসাইন পানির পাত্র ও গ্লাসটি রেখে তার বাবার কাছে ফিরে এল। বাবা হুসাইনকে বললেন : হে পুত্র! তুমি খুব ভালো কাজ করেছ। তুমি ইমামের একজন সৈনিক।এক সময় হুসাইন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে : কেন এমন হবে? কেন ইমাম আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন?’ তার চোখ থেকে পানি ঝরতে লাগল আর তা তার গণ্ডদেশ ভিজিয়ে দিল। সে বিশ্বাসই করতে চাইছিল না যে, ইমাম খোমেইনী (রহ.) চলে গেছেন। কেউই একথা বিশ্বাস করতে পারে না। হুসাইনের তখন সেই শোকার্ত কিশোরের আবৃত্তি করা একটি কবিতার অংশ বিশেষভাবে মনে পড়ল : আমি একটি ফুলকে হারিয়ে ফেলেছি এবং তা খুঁজছি…

ইমামের মৃত্যুজনিত যন্ত্রণা হুসাইনের অন্তরকে ব্যথিত করেছে। সে তাই খুবই শোকাহত। কী অপ্রিয় ও তিক্ত এক সত্যকে আজ মেনে নিতে হচ্ছে, ইমাম আর ইহধামে নেই, তার এবং সকলের শ্রদ্ধেয় ইমাম সকলকে ছেড়ে চলে গেছেন। পরে হুসাইন তার পিতার সাথে মসজিদ থেকে বাড়ি ফিরে এলো। এটিই শেষ শোক নয়, এ হলো শোকের সূচনামাত্র। কেননা, সারা পৃথিবীতেই যেন শোকের পর্দা উন্মোচিত হয়েছে।

(নিউজলেটার, আগস্ট ১৯৯১)

 

হযরত আলী (আ.)-এর বাণী- নাহজুল বালাগা থেকে

হযরত আলী (আ.)-এর নিকট হারিস ইবনে হুত এসে বলেন : আমার সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? আমি উটের যুদ্ধের উদ্যোক্তাদেরকে পথভ্রষ্ট বলে ধারণা করি।উত্তরে হযরত আলী (আ.) বলেন : হে হারিস! নিশ্চয় তুমি নিচের দিকে তাকিয়েছ। তোমার ওপরের দিকে তাকাওনি। তাই হতভম্ব হয়েছে। হককী, তুমি তা অবগত হলে হকপন্থীকে জানতে। তুমিতো হকই জান না। আর বাতিলকী, তা জানলে বাতিলপন্থীকে জানতে পারতে। তুমিতো বাতিল কী, তা-ই জান না। তখন হারিস বললেন : তাহলে সাআদ ইবনে মালিক ও আবদুল্লাহ ইবনে উমরের পথ ধরে স্বতন্ত্র হয়ে থাকি।তখন হযরত আলী (আ.) বললেন : নিশ্চয়ই সাআদ ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর ন্যায়ের সহায়তা করেননি। আর বাতিলকেও নিরুৎসাহিত করেননি।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৪

হযরত আলী (আ.) বলেন : বাদশাহর সহচর বাঘের ওপর আরোহণকারীর ন্যায় হয়ে থাকে। লোকেরা তার অব¯হান দেখে ঈর্ষা করে। সে তার অবস্থানের ভয়াবহতা ভালো করেই জানে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৫

হযরত আলী (আ.) বলেন : অপরের সন্তানের প্রতি করুণা কর। তোমাদের সন্তানদের হিফাজতের ব্যব¯হা তারই ফলে হবে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৬

হযরত আলী (আ.) বলেন : জ্ঞানীদের উক্তি সঠিক হলে ঔষধের কাজ দেয়। আর তা ভুল হলে রোগ সৃষ্টি করে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৭

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : হে বনী আদম! যে দিনটি আসেনি তার চিন্তায় বিভোর হবে না। যে দিনটি এসেছে তার চিন্তা কর। কারণ, তোমার বয়স অবশিষ্ট থাকলে সেই দিনের জন্য আল্লাহ রিযিকের বন্দোবস্ত করবেন।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৯

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : তোমার বন্ধুকে ধীরে ধীরে ভালোবাস। হতে পারে কোন দিন সে তোমার অসন্তোষের পাত্র হয়ে যাবে। আর তোমার নিকট অবাঞ্ছিত ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে ঘৃণা কর। হতে পারে সে কোন দিন তোমার প্রিয়পাত্র হয়ে যাবে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৬০

(নিউজলেটার, আগস্ট ১৯৯১)

শহীদ জাভেদ বাহোনার- ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল

শহীদ প্রধানমন্ত্রী হুজ্জাতুল ইসলাম জাভেদ বাহোনার ১৯৩৩ সালে কেরমান শহরে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পবিত্র কুরআনের ওপর প্রাথমিক কোর্স সম্পন্ন করার পর কেরমানের মাসুমিয়াহ স্কুলে ধর্মতত্ত্ব বিজ্ঞানের ওপর অধ্যয়ন করেন। কোমে ধর্মতত্ত্বের ওপর পড়াশুনা শেষে তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখান থেকে তিনি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি এবং শিক্ষাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

ড. বাহোনার সবসময় তাঁর লেখা ও বক্তৃতায় ইসলাম প্রচার করতেন। তিনি ইসলামী তাওহিদী কেন্দ্রনামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। রাফাহ স্কুল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬২ সালে তিনি ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে ইসলামী এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেন।

১৯৬৩ সালে ১৫ই খোরদাদের ঘটনার প্রেক্ষাপটে কয়েকটি স্থানে বক্তৃতা দেয়ার পর তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৭৮ সালে ড. বাহোনার ইমাম খোমেইনীর আদেশে আলী খামেনেয়ী, আবদুল করিম মুসাভী আরদেবিলি এবং হাশেমী রাফসানজানীর সহযোগিতায় বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত করার দায়িত্ব পান। তিনি ইসলামী রিপাবলিকান পার্টি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সহযোগিতা করেন।

ইসলামী বিপ্লব সফল হওয়ার পর ড. বাহোনার ইসলামী বিপ্লবী পরিষদের সদস্য, খসড়া শাসনতন্ত্র বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য, পার্লামেন্টের সদস্য, রাজাই মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী, ইসলামী রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রধানমন্ত্রী প্রভৃতি পদ অলংকৃত করেন।

মোহাম্মদ আলী রাজাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৮১ সালের ৫ আগস্ট ড. বাহোনার প্রধানমন্ত্রী হন। এর মাত্র কয়েকদিন পরই ৩০ আগস্ট তিনি প্রেসিডেন্ট ভবনে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টদের পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে শহীদ হন। তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত কর্মী, কর্মঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি আমাদের জন্য নিষ্কলুষ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

(নিউজলেটার, আগস্ট ১৯৯১)

হযরত আলী (আ.)-এর বাণী- নাহজুল বালাগা থেকে

হযরত আলী (আ.)-এর নিকট হারিস ইবনে হুত এসে বলেন : আমার সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? আমি উটের যুদ্ধের উদ্যোক্তাদেরকে পথভ্রষ্ট বলে ধারণা করি।উত্তরে হযরত আলী (আ.) বলেন : হে হারিস! নিশ্চয় তুমি নিচের দিকে তাকিয়েছ। তোমার ওপরের দিকে তাকাওনি। তাই হতভম্ব হয়েছে। হককী, তুমি তা অবগত হলে হকপন্থীকে জানতে। তুমিতো হকই জান না। আর বাতিলকী, তা জানলে বাতিলপন্থীকে জানতে পারতে। তুমিতো বাতিল কী, তা-ই জান না। তখন হারিস বললেন : তাহলে সাআদ ইবনে মালিক ও আবদুল্লাহ ইবনে উমরের পথ ধরে স্বতন্ত্র হয়ে থাকি।তখন হযরত আলী (আ.) বললেন : নিশ্চয়ই সাআদ ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর ন্যায়ের সহায়তা করেননি। আর বাতিলকেও নিরুৎসাহিত করেননি।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৪

হযরত আলী (আ.) বলেন : বাদশাহর সহচর বাঘের ওপর আরোহণকারীর ন্যায় হয়ে থাকে। লোকেরা তার অব¯হান দেখে ঈর্ষা করে। সে তার অবস্থানের ভয়াবহতা ভালো করেই জানে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৫

হযরত আলী (আ.) বলেন : অপরের সন্তানের প্রতি করুণা কর। তোমাদের সন্তানদের হিফাজতের ব্যব¯হা তারই ফলে হবে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৬

হযরত আলী (আ.) বলেন : জ্ঞানীদের উক্তি সঠিক হলে ঔষধের কাজ দেয়। আর তা ভুল হলে রোগ সৃষ্টি করে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৭

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : হে বনী আদম! যে দিনটি আসেনি তার চিন্তায় বিভোর হবে না। যে দিনটি এসেছে তার চিন্তা কর। কারণ, তোমার বয়স অবশিষ্ট থাকলে সেই দিনের জন্য আল্লাহ রিযিকের বন্দোবস্ত করবেন।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫৯

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : তোমার বন্ধুকে ধীরে ধীরে ভালোবাস। হতে পারে কোন দিন সে তোমার অসন্তোষের পাত্র হয়ে যাবে। আর তোমার নিকট অবাঞ্ছিত ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে ঘৃণা কর। হতে পারে সে কোন দিন তোমার প্রিয়পাত্র হয়ে যাবে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৬০

(নিউজলেটার, আগস্ট ১৯৯১)

nhiZ Avjx (Av.)-Gi evYxÑ bvnRyj evjvMv †_‡K

 

nhiZ Avjx (Av.)-Gi wbKU nvwim Be‡b ûZ G‡m e‡jb : ÔAvgvi m¤c‡K© Avcbvi AwfgZ Kx? Avwg D‡Ui hy‡×i D‡`¨v³v‡`i‡K c_åó e‡j aviYv Kwi|Õ Dˇi nhiZ Avjx (Av.) e‡jb : Ô†n nvwim! wbðq Zywg wb‡Pi w`‡K ZvwK‡qQ| †Zvgvi Ic‡ii w`‡K ZvKvIwb| ZvB nZf¤^ n‡q‡Q| ÔnKÕ Kx, Zywg Zv AeMZ n‡j nKcš’x‡K Rvb‡Z| Zywg‡Zv ÔnKÕB Rvb bv| Avi ÔevwZjÕ Kx, Zv Rvb‡j evwZjcš’x‡K Rvb‡Z cvi‡Z| Zywg‡Zv evwZj Kx, Zv-B Rvb bv| ZLb nvwim ej‡jb : ÔZvn‡j mvAv` Be‡b gvwjK I Ave`yjøvn Be‡b Dg‡ii c_ a‡i ¯^Zš¿ n‡q _vwK|Õ ZLb nhiZ Avjx (Av.) ej‡jb : ÔwbðqB mvAv` I Ave`yjøvn Be‡b Dgi b¨v‡qi mnvqZv K‡ibwb| Avi evwZj‡KI wbiærmvwnZ K‡ibwb|Õ- bvnRyj evjvMv, Dw³ bs 254

nhiZ Avjx (Av.) e‡jb : Ôev`kvni mnPi ev‡Ni Ici Av‡ivnYKvixi b¨vq n‡q _v‡K| †jv‡Kiv Zvi Ae¯nvb †`‡L Cl©v K‡i| †m Zvi Ae¯’v‡bi fqvenZv fv‡jv K‡iB Rv‡b|Õ- bvnRyj evjvMv, Dw³ bs 255

nhiZ Avjx (Av.) e‡jb : ÔAc‡ii mšÍv‡bi cÖwZ KiæYv Ki| †Zvgv‡`i mšÍvb‡`i wndvR‡Zi e¨e¯nv ZviB d‡j n‡e|Õ- bvnRyj evjvMv, Dw³ bs 256

nhiZ Avjx (Av.) e‡jb : ÔÁvbx‡`i Dw³ mwVK n‡j Jl‡ai KvR †`q| Avi Zv fyj n‡j †ivM m„wó K‡i|Õ- bvnRyj evjvMv, Dw³ bs 257

nhiZ Avjx (Av.) e‡j‡Qb : Ô†n ebx Av`g! †h w`bwU Av‡mwb Zvi wPšÍvq we‡fvi n‡e bv| †h w`bwU G‡m‡Q Zvi wPšÍv Ki| KviY, †Zvgvi eqm Aewkó _vK‡j †mB w`‡bi Rb¨ Avjøvn wiwh‡Ki e‡›`ve¯Í Ki‡eb|Õ- bvnRyj evjvMv, Dw³ bs 259

nhiZ Avjx (Av.) e‡j‡Qb : Ô†Zvgvi eÜz‡K ax‡i ax‡i fv‡jvevm| n‡Z cv‡i †Kvb w`b †m †Zvgvi Am‡šÍv‡li cvÎ n‡q hv‡e| Avi †Zvgvi wbKU AevwÃZ e¨w³‡K ax‡i ax‡i N„Yv Ki| n‡Z cv‡i †m †Kvb w`b †Zvgvi wcÖqcvÎ n‡q hv‡e|Õ- bvnRyj evjvMv, Dw³ bs 260

(wbDR‡jUvi, AvM÷ 1991)

উম্মে সেলিম- ইসলামের ইতিহাসের এক মহীয়সী নারী

ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলামী চিন্তাধারা, মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা ও চিরন্তন খোদায়ী হুকুম-আহকামের অনুসারী মহিলারা যথার্থ অর্থেই ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন। এ ধরনের একজন ধর্মপ্রাণ ও স্বাধীনচেতা মহিলা ছিলেন উম্মে সেলিম। সমসাময়িক মহিলাদের জন্য তিনি এক আদর্শ ও অনুসরণীয় প্রতীক হিসাবে বিবেচিত।

উম্মে সেলিমের নাম ছিল সালেহ। মালহানের কন্যা এই ধর্মপরায়ণা মহিলা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ঈমান পোষণ করতেন। উম্মে সেলিম মালেক ইবনে নজরের স্ত্রী ছিলেন। উম্মে সেলিম যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর স্বামী দূরবর্তী এক সফরে ছিল। স্বামী বাড়ি ফিরে উম্মে সেলিমের নতুন ধর্ম গ্রহণ বরদাশত করল না। উম্মে সেলিম তাঁর স্বামীকে বললেন : ‘আমি তোমার সাথে বসবাস করতে পারি, যদি তুমি ইসলাম গ্রহণ কর।’ তাঁর স্বামী ইসলাম ধর্ম গ্রহণকে পছন্দ করল না। সে চলে গেল সিরিয়ায় এবং কিছুদিন পর সেখানেই মারা গেল।

আনাস নামে উম্মে সেলিমের মালেকের ঔরসজাত একজন সন্তান ছিল। বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে তিনি মহানবী (সা.)-এর একজন অনুসারী হিসাবে গড়ে ওঠেন। নানা অসুবিধা ও সমস্যার মধ্যেও তিনি ইসলাম, মুসলমান ও মহানবী (সা.)-এর খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। মালেকের মৃত্যুর খবর শুনে উম্মে সেলিম আনাসকে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাদান করেন। ছেলে পূর্ণবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত উম্মে সেলিম বিয়ে করেননি। একদিন আবু তালহা নামে পরিচিত যায়েদ বিন সাহল নামে মদীনার এক বীর পুরুষ তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। কিন্তু উম্মে সেলিম তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন : ‘আপনি একজন মহান ব্যক্তি বটে। কিন্তু আভাস পেয়েছি যে, আপনি একজন মুশরিক। আপনি যদি মুসলমান হন এবং মানুষের তৈরি পুতুলের পূজা পরিত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদত করেন, তাহলে আমি আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করব। আমি কোন মোহরানাও চাই না, আপনার মুসলমান হওয়াটাই হবে আমার মোহরানা।’

উম্মে সেলিমের এই যুক্তিপূর্ণ কথা আবু তালহার পছন্দ হলো এবং তাঁর এই ইসলামী চিন্তাধারা প্রত্যক্ষ করে তিনি ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারলেন এবং মুসলমান হয়ে গেলেন। ইসলামের ইতিহাসে উম্মে সেলিমই প্রথম মহিলা যিনি ইসলামের এই চিন্তাধারা মোতাবেক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন এবং পাত্রের ইসলাম গ্রহণকেই মোহরানা হিসাবে বিবেচনা করলেন। মুসলিম মহিলাদের জন্য এ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিবাহের পর মদীনায় আবু তালহা ও উম্মে সেলিমের জীবন বেশ সুখেই কাটতে থাকে। উম্মে সেলিম তাঁর স্বামীর আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একদিকে আবু তালহার নিজস্ব প্রতিভা এবং অপরদিকে উম্মে সেলিমের তত্ত্বাবধান তাঁকে একজন ঈমানদার ও বিশ্বাসী মুসলমানে রূপান্তরিত করে। বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি আল্লাহর ধর্ম ইসলামকে সর্বাত্মকভাবে ভালোবাসতেন। আবু তালহার তীর নিক্ষেপ কৌশল এত প্রখর ছিল যে, তাঁর প্রতিটি তীরে কোন না কোন কাফের নিহত হতোই।

ওহুদ ও হোনায়নের যুদ্ধে তিনি অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। ঐসব যুদ্ধে তিনি অন্তত বিশজন শত্রুসেনাকে হত্যা করেন এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র গনীমত হিসাবে আটক করেন। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পরেও ইসলাম ও পবিত্র কুরআনের পথে তাঁর ত্যাগ ও সংগ্রামী ভূমিকা অব্যাহত থাকে। বার্ধক্যকালেও তাঁর অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এতই গভীর ছিল যে, একদিন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ সংক্রান্ত পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াতের সময় তিনি এতই অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন যে, ছেলে-মেয়েদের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি তাদেরকে এই বলে দমিয়ে দেন যে, ‘আল্লাহ যুবা-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকলকেই তাঁর পথে জিহাদে যেতে বলেছেন। অতএব, আমি তার ব্যতিক্রম হতে পারি না।’ এ ব্যাপারে সূরা তাওবার ৪১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : ‘অভিযানে বের হয়ে পড়, হালকা হোক অথবা ভারী অবস্থায় এবং সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে তোমাদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝ।’

যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পথে আবু তালহা ইন্তেকাল করেন। হ্যাঁ, উম্মে সেলিম তাঁর সচেতনতা, বিশ্বাস, দৃঢ়তা ও ইসলামী আখলাক দ্বারা এককালের একজন মূর্তিপূজা কাফেরকে একজন জীবনোৎসর্গকারী মুজাহিদে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আল্লাহর ওপর উম্মে সেলিমের নির্ভরতা ছিল অত্যন্ত প্রবল। আবু তালহার সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবনে তিনি একটি পুত্রসন্তান লাভ করেন। পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল আবু আমর। সে সর্বদাই তার পিতার কাজে সহায়তা করত। একদিন সকালে দেখা গেল যে, আমরের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর উঠেছে এবং সে মারাত্মকভাবে অসুস্থ। আবু তালহা কার্যব্যপদেশে বাড়ির বাইরে যাবার কিছুক্ষণ পরই অসুস্থ আবু আমরের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় উম্মে সেলিম খুব দুঃখ পান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করেন এবং তাঁর ইচ্ছাকে মেনে নিয়ে নিজেকে সংযত করেন। এ ব্যাপারে এভাবেই তিনি আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি মানসিক অস্থিরতা বিদূরিত করলেন এবং অজু সম্পাদন করে আবু আমরের লাশ দাফন করলেন। তিনি জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে বললেন : ‘কেউ যেন আবু তালহাকে তাঁর পুত্রের মৃত্যু সংবাদ না জানায়। আমি নিজেই তাঁর সাথে কথা বলব।’

অল্প কিছুদিন পর আবু তালহা বাড়ি ফিরে আসলে উম্মে সেলিম তাঁকে হাসিমুখে স্বাগত জানান। তিনি স্বাভাবিকভাবেই আবু তালহাকে স্বাগত জানান এবং পরে তাঁকে বিশেষ এক ভঙ্গিতে একটি প্রশ্নের মাধ্যমে পুত্রের মৃত্যুর সংবাদ জানান। আবু তালহার কাছে উম্মে সেলিমের প্রশ্ন ছিল : ‘যদি কোন প্রতিবেশী আপনার কাছে কিছু জিম্মা রাখে এবং কিছু সময় পর সে তা ফেরত নিতে আসে তাহলে আপনি কি তা তৎক্ষণাৎ ফেরত দিবেন না?’ আবু তালহা তখন বললেন : ‘হ্যাঁ, অবশ্যই দিব।’ উম্মে সেলিম তখন বললেন : ‘আল্লাহ আমাদের কাছে যে পুত্রকে জিম্মা রেখেছিলেন তা ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।’ একথা শোনর পর আবু তালহা তাঁর শোক ও মর্মবেদনা সংযত করলেন এবং দোয়া ও মুনাজাতে রত হলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি মহানবী (সা.)-এর কাছে গেলেন এবং তাঁর পুত্রের মৃত্যু ও এ ব্যাপারে তাঁর স্ত্রীর কর্মকাণ্ডের কথা জানালেন। মহানবী (সা.) উম্মে সেলিমের ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রশংসা করলেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করলেন।

কিছুদিন পর আল্লাহ রাবুল আলামীন উম্মে সেলিম ও আবু তালহার ঘরে আরো একটি পুত্রসন্তান দান করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাম রেখেছিলেন আবদুল্লাহ। বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে আবদুল্লাহ ঈমান, ইলম ও তাকওয়ার এক উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হন এবং মহানবীর একজন বিশ্বস্ত অনুসারী হিসাবে পরিগণিত হন।

উম্মে সেলিম এমনিভাবে ইসলামের শিক্ষা মোতাবেক তাঁর সচেতনতা, ঈমান, ইলম, তাকাওয়া ও সহনশীলতার সাহায্যে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক অনন্যসাধারণ অবদান রেখে গেছেন। আশা করা যায় যে, আধুনিক সমাজের মহিলারাও ইসলামের ইতিহাসের মহীয়সী নারীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাদের সমাজকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন এবং একটি খোদাভীরু ও সত্যানুসন্ধিৎসু বংশধর গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করবেন।

(নিউজলেটার, জুলাই ১৯৯১)

হযরত আলী (আ.)-এর বাণী- নাহজুল বালাগা থেকে

হযরত আলী (আ.) কুমায়েল ইবনে যিয়াদকে লক্ষ্য করে বলেন : ‘হে কুমায়েল! নিজ পরিবারবর্গকে হুকুম কর তারা যেন প্রত্যুষে উত্তম গুণাবলি অর্জন করে। আর ঘুমন্ত ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণে রাতের অন্ধকারে গমন করে। যে সত্তার কর্ণ আওয়াজসমূহকে আয়ত্তে রাখে তাঁর কসম করে বলছি, কোন ব্যক্তি কারো অন্তরে আনন্দ সঞ্চার করলে অবশ্যই আল্লাহ তাআলা তার কল্যাণে সেই আনন্দের পরিবর্তে করুণা সৃষ্টি করেন। এরূপ ব্যক্তির ওপর কোন বিপদ আপতিত হলে সেই করুণা পানি প্রবাহিত হওয়ার ন্যায় বিপদের প্রতি প্রবাহিত হয়। ফলে অপরিচিত উটকে যেভাবে বিতাড়িত করা হয় সেই করুণাও বিপদকে অনুরূপভাবে তাড়িয়ে দেয়।- নাহজুল বালাগা, উক্তি ২৪৯

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : ‘যখন সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হবে তখন দান-খয়রাত করে আল্লাহর সাথে ব্যবসা করবে।’- নাহজুল বালাগা,  উক্তি নং ২৫০

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : ‘বিশ্বাস ভঙ্গকারীর সাথে বিশ্বাস রক্ষা করা আল্লাহ তাআলার নিকট বিশ্বাস ভঙ্গের শামিল। আর বিশ্বাস ভঙ্গকারীর সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করা আল্লাহর নিকট বিশ্বাস রক্ষা করার নামান্তর।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫১

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : ‘করুণা প্রদর্শন করে অনেককে অবকাশ দেয়া হয়। আবরণ এঁটে অনেককে ধোঁকায় ফেলা হয়। অনেককে উত্তম বাক্য বলে ফিতনায় ফেলা হয়। অন্যায়ে অবকাশ দান করার ন্যায় আর কাউকে আল্লাহ তাআলা পরীক্ষা করেননি।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৫২

(নিউজলেটার, জুলাই ১৯৯১)

ইমামের স্মরণে- ইমামের পথে

হুশাং আলী মাদাদী

১৯৮৯ সালের ৩রা জুন ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি ইমাম খোমেইনী (রহ.) বিশ্বের নির্যাতিত জাতিগুলোকে মুক্তির পথ প্রদর্শন করে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চিরবিদায় গ্রহণ করেছেন।

দুটি বছর চলে গেল… হ্যাঁ, এমন দুটি বছর অতিক্রান্ত হলো যার প্রতিটি দিন ছিল ব্যথা-বেদনায় ভরা। দুঃখ, অনুতাপ, শোক ও মাতমে আকীর্ণ। অশ্রু আর আর্তনাদ ছিল- ছিল অশ্রু আর অশ্রুই…

এখনো আমাদের বিশ্বাস হয় না যে, হযরত ইমাম আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন, আমাদের ইয়াতীম করে ফেলে গেছেন-

দুটি বছর এভাবেই কেটে গেল। আমরা বিশ্বাস করতে পারি না যে, ঈমান, ভালোবাসা, সাধনা ও ইরফানের প্রতিচ্ছবি ও বিপ্লবের মহান নেতার হৃদয়বিদারক ইন্তেকাল ঘটেছে।

দুটি বছর পার হয়ে গেল…

আধ্যাত্মিক অথৈ সাগরের কাণ্ডারি আর মারেফাতের মুর্শিদের ইন্তেকালের পর দুটি বছর পার হলো। এই দুটি বছরের প্রতিটি দিনই ছিল হাজারো দিনের সমান। যেদিন ইমামে উম্মত ইসলামী দেশ ইরানে পদার্পণ করেন, সেদিন জনতার বিশাল তরঙ্গমালা তাঁকে অভিবাদন জানিয়েছিল প্রাণের আকুতি দিয়ে। যেদিকেই দৃষ্টি যেত শুধু লোক আর লোক। জনতার অথৈ সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ আছড়ে পড়েছিল কূলভাঙ্গা জোয়ারে। তাদের নেতা ও ইমাম ফিরে এসেছেন, তাই আনন্দের এত জোয়ার। বসন্তের ছোঁয়ায় আশার বাগানের একমাত্র কিশলয়টি পল্লবিত হাওয়ায় সেদিন আন্দোলিত সুরভিত হয়েছিল বিপ্লবী চেনতায় স্পন্দিত জনতার গোলাপ কানন। তাই তাদের আনন্দের জোয়ার ছিল স্বাভাবিক ও স্বতঃ¯ফূর্ত। আনন্দে বুক ফেটে বেরিয়ে আসছিল স্লোগানের পর স্লোগান…

সেই ঐতিহাসিক দিনে, সেই সমারোহের দিবসে আশার ফল্গুধারায়, বসন্তের সমীরণে বাগানের নতুন সাজের দিনে সবার পরনে ছিল সফেদ পোশাক। তাদের চেহারায় ছিল জগতের সকল আনন্দ, উদ্দীপনা আর খুশির সমারোহ…

তারপর… তারপর দশটি বছর অতিক্রান্ত হবার পর আজ থেকে দুবছর পূর্বে আমাদের ঘর-বাহিরে শহর-পল্লির সর্বত্র আবার জনতার ঢল নেমেছিল। কিন্তু এ ঢল আনন্দের নয়, ছিল অশ্রুর। শোক ও মাতমে মূর্ছা প্রায়, কালো পোশাকে আচ্ছাদিত, বক্ষে ও ললাটে আঘাতরত ব্যথিতপ্রাণ মানুষের ঢল। বেদনায় ভারাক্রান্ত ও বিপন্ন মানুষেরা সেদিন হয়েছিল নিথর, বাকহারা। কান্নার জন্য ছিল না তাদের নয়নে অশ্রুবারি। ইমামকে চিরবিদায় দেয়ার অনুষ্ঠানে, ইমামের জানাযায় শরীক কোটি মানুষের এ ছিল অবস্থা…

হ্যাঁ, ইমামের দেহ আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছে। কিন্তু তাঁর চিন্তা-দর্শন ও দিক-নির্দেশনা চিরন্তন হয়ে রয়েছে। তাই প্রিয় ইমামের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বেদনাতুর হৃদয়ের সমুদ্রসম বিরহগাথার কয়েকটি কথা আপনাদের জন্য ব্যক্ত করতে চাই।

৯১ বছর আগে জমাদিউস সানীর ২০ তারিখে, রাসূলে পাকের প্রাণপ্রিয় কন্যা আমাদের মা সিদ্দিকা কুবরা হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.)-এর জন্মদিনে তাঁরই বংশের এক সন্তান জন্মগ্রহণ করেন ইরানের খোমেইন শহরে। এই নবজাতকই প্রদীপ্ত চন্দ্র আর সমুজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো নবী বংশের (আহলে বাইতের) নিষ্পাপ ইমামগণের উত্তরসূরিরূপে উদ্ভাসিত হন। আর এটাও ছিল হযরত ফাতেমা (আ.)-এর বরকত ও মাহাত্ম্যের আশীর্বাদস্বরূপ। শত শত সালাম ও দরূদ আরজ করছি তাঁর প্রতি। ১৩২০ হিজরির যে দিনটিতে হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.)-এর জন্মদিবস উদযাপিত হচ্ছিল সেদিনই এমন এক সন্তানের জন্ম হয়, যে সন্তান তাঁর সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের জটিল ও ভয়াবহ আবর্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং দুশমনদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করেন।

হ্যাঁ, ১৩৩৮ বছর পর সেই দিনটিতে হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.)-এর বংশধারায় এমন শিশুর আগমন হলো, পরবর্তীকালে যিনি হলেন ইতিহাসের ব্যতিক্রম, দ্বীনের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা, যুগের দেদীপ্যমান সূর্য, স্বাধীন মানুষের সিপাহসালার ও তরিকতের পথিকদের মুর্শিদ। রুহুল্লাহ ঐ দিনই মায়ের কোল উদ্ভাসিত করেন। তাঁর জন্মের মধ্য দিয়ে নতুন এক ইতিহাসের সূচনা হয়।

রুহুল্লাহ কে?

রুহুল্লাহ সেই মহান আরেফ, যাঁর ইরফান ও আধ্যাত্মিকতার সুরাহী  থেকে প্রেমের সুধা পান করে তৃপ্তিলাভের জন্য আরেফ ও প্রেমিকগণ আকুল। রুহুল্লাহ সেই মহাপুরুষ যাঁর অস্তিত্বের ছায়াতলে দুনিয়ার চিন্তাবিদ ও মনীষীরা আশ্রয় চান আর তাঁর মাহাত্ম্য ও জ্ঞানগরিমার অসীম সমুদ্র থেকে এক অঞ্জলি পানি পান করার জন্য অধীর হয়ে থাকেন।

রুহুল্লাহ সেই মহান ব্যক্তিত্ব যাঁর প্রশংসা ও গুণগরিমা বর্ণনায় যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীরাও ক্লান্ত; যাঁর সম্মান ও মর্যাদার খ্যাতি আকাশের দিগন্ত ছাড়িয়ে গেছে, মানুষের মন ও সমাজে আশীর্বাদের বৃষ্টির মতো বর্ষিত হয়েছে এবং মানব মুক্তির চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রকে ফুল ও ফলে সজ্জিত করেছে।

রুহুল্লাহ সেই মূর্তিনাশী, যিনি ইবরাহীম (আ.)-এর আদর্শ অনুসরণে অজ্ঞতা, শক্তিমদত্ততা, শোষণ ও উপনিবেশবাদের মূর্তিগুলো ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন এবং খোদাপ্রেমের পথে ইসমাঈলদের (বিপ্লবের মহান শহীদদের) কোরবানি করেছেন। যিনি কালেমাতুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর বাণীকে মহীয়ান আর আল্লাহর দুশমনদের বাণীকে পদানত করেছেন।

রুহুল্লাহ সেই মহান নিশানবরদার যিনি আপন পূর্বপুরুষদের ন্যায় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর ঝাণ্ডা কাঁধে নিয়ে খাঁটি মুহাম্মাদী ইসলামের আওয়াজকে সারা বিশ্বে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত করেছেন। যিনি শতাব্দীকাল ধরে অপমানিত, লাঞ্ছিত ও নিপতিত মুসলমানদের হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধার করেছেন আর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জাহেলিয়াতের পর্দা ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছেন। যিনি ক্ষুরধার তরবারি, ¯পষ্ট ভাষণ, বলিষ্ঠ লেখনি ও সংগ্রাম সাধনার মাধ্যমে স্বীয় পূর্বপুরুষ মহানবী (সা.)-এর দ্বীনের সীমান্তকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রক্ষা করেছেন। যিনি বিস্তীর্ণ, কণ্টকাকীর্ণ গোমরাহির অমানিশার মধ্যে ইসলামের সত্যিকার পথকে চিহ্নিত করে মুসলমানদের চিন্তার ভূমিতে খাঁটি ইসলামের পবিত্র বৃক্ষের চারা রোপন করেছেন। যদিও এ পথে তিনি অনেক আঘাত সহ্য করেছেন, অনেক হৃদয়ের রক্ত ঝরতে দেখেছেন এবং বুজুর্গের বেশধারী আহমকদের পক্ষ থেকে আরোপিত অনেক অপবাদ ও দুর্নাম সহ্য করেছেন। কিন্তু সবকিছুকে তিনি অম্লান বদনে একমাত্র আল্লাহর জন্য সহ্য করেছেন; তিনি খাঁটি মুহাম্মাদী ইসলামের দিকে তাক করা যে কোন বিষাক্ত তীরকে বুক পেতে নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি দুর্নাম আর গুজবকে মোটেও ভয় করেননি; বরং অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচলচিত্তে প্রেমের পথে এগিয়ে গেছেন, অবিচল পর্বতের ন্যায় যুগের সকল ভয়াবহতাকে উপেক্ষা করেছেন এবং মুহূর্তের জন্যও সংকুচিত হননি। যদিও তিনি হীন চরিত্রের ধর্ম ব্যবসায়ীদের হাত থেকে সমসাময়িক সকল দায়িত্বপরায়ণ লোকের চাইতে অধিক দুঃখ কষ্ট ও আঘাতের সম্মুখীন হয়েছেন; কিন্তু এ বৈশিষ্ট্য তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ রাসূলে পাক (সা.)-এর কাছ থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন, যিনি বলেছেন, ‘আমাকে যেরূপ কষ্ট দেয়া হয়েছে, সেরূপ কষ্ট আর কোন নবীকেই দেয়া হয়নি।

রুহুল্লাহ সম্মান ও মর্যাদার উচ্চ শৃঙ্গ, দুনিয়ার বঞ্চিত, নির্যাতিত (মুস্তাজয়াফ) মানুষের আশার প্রদীপ। তিনি সেই সুন্দর মানুষ, যিনি ইবাদত-বন্দেগি, সাধনা ও পবিত্রতা, তাকওয়া-পরহেজগারি, খোদাভীতি, ন্যায়নিষ্ঠা, বিনয় ও নম্রতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে শুধু সমসাময়িক যুগেই নয়, নিষ্পাপ ইমামদের পর প্রায় সকল যুগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।

রুহুল্লাহ জ্ঞান ও দূরদর্শিতার প্রতিচ্ছবি, জিহাদ ও শাহাদাতের ময়দানের বীর সেনানী, দুনিয়ার বঞ্চিত, নির্যাতিত মানুষ ও মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতা, হতাশাগ্রস্ত অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল। যিনি যুলুমবাজ, শোষকশ্রেণি, অর্থগৃধনু, ক্ষমতাদর্পী, ছদ্মবেশী আলেম, সাম্রাজ্যবাদের দোসর এবং তাদের সব রকমের অনুসারীর বিরুদ্ধে দৃঢ়চিত্তে সংগ্রামের পতাকা উড্ডীন করেছেন এবং ওহী ও রেসালতের পথ ধরে আসা আমানতকে যুলুম ও অজ্ঞতা পরিহার করে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে বহন করেছেন।

হ্যাঁ, ইমাম তাঁর পার্থিব জীবনের অল্প সময়ে আল্লাহর প্রতি তাঁর দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করেছেন। তিনি তাঁর বরকতময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য সাধ্যমত সর্বোত্তম পন্থায় খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। তিনিই নির্ভীকচিত্তে দুনিয়ার সমস্ত শক্তিমদমত্ত বিশ্বগ্রাসীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দুই পরাশক্তির দম্ভ ও ভাবমূর্তি চূর্ণ করেছেন।

তিনিই ইসলামী বিপ্লবের ভিত্তি মূলকে সুদৃঢ়  করেছেন এবং এ বিপ্লবকে দুশমনদের সব রকমের চক্রান্ত ও নীলনকশা থেকে রক্ষা করেছেন।

তিনিই ছিলেন সেই অসীম সাহসী পুরুষ, যিনি মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে ভয় করেননি এবং ভর্ৎসনাকারীদের তিরস্কার তাঁকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি পশ্চিমা পুঁজিবাদের ফেতনা ও অপকীর্তি এবং প্রাচ্য কম্যুনিজমের আগ্রাসন ও অন্তঃসারশূন্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও লড়াই থেকে মুহূর্তের জন্যও বিরত থাকেননি। প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য নয়স্লোগানকে তিনি ইসলামী বিপ্লবের এক অপরিবর্তনশীল স্লোগানে পরিণত করেছেন এবং এর বরখেলাপ করা অমার্জনীয় অপরাধ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। বস্তুত আল্লাহর সেই মহান বান্দা বঞ্চিত নির্যাতিত মানুষের বন্ধু, যালিমদের ত্রাস, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী, আল্লাহ ও রাসূলের দুশমনদের মৃত্যুদ- দানকারী ব্যক্তিত্ব ইমাম রুহুল্লাহ আল-মুসাভী আল- খোমেইনী ছাড়া আর কে হতে পারেন?

মূলত তিনি একজন ব্যক্তিই ছিলেন না; বরং একাই ছিলেন এক বিরাট জাতি, বীরত্ব, সাহসিকতা, ধৈর্য, অল্পে তুষ্টি, পুতপবিত্রতা এবং সর্বোপরি বঞ্চিত নির্যাতিত মানুষের প্রতি দায়িত্ব সচেতনতা প্রভৃতি মানবীয় গুণের সমষ্টি। এজন্য তিনি কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুরক্ত ও প্রেমিকদের হৃদয় জগতে অমর হয়ে থাকবেন। আর আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো- যদি আমরা দুনিয়া ও আখেরাতের সম্মান ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষী হই, তাহলে আল্লাহর প্রেমিকদের এই কাফেলা থেকে যেন কেউ পেছনে পড়ে না থাকি।

আসুন, আজ আমরা এই মহান ব্যক্তিত্বকে হারানোর বার্ষিকীতে ইসলামী বিপ্লবের নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ও দুনিয়ার সকল মুসলমানের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাই।

মহান ইমাম দৈহিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, তবু তাঁর চিন্তাধারা ও উপদেশবাণী আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। আমাদের একান্ত কামনা আল্লাহ পাক আমাদেরকে সাহায্য করবেন, যাতে তাঁর বরকতময় জীবনের বৈশিষ্ট্যাবলি অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে পারি, ইনশাআল্লাহ…।

 (নিউজলেটার, জুন ১৯৯১)

বিশিষ্টজনদের দৃষ্টিতে ইমাম খোমেইনী (রহ.)

মুসলমান এবং বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের নেতা, ইসলামী ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর ইন্তেকাল তাঁর কোটি কোটি অনুসারীকে শোকাকূল করে তোলে। যারা ইমামের পথ ও তাঁর আদর্শিক নীতি অনুসরণ করত এবং আন্তরিকভাবে ভালোবাসত তারা তাঁর মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ইসলামী বিপ্লবের নেতার মৃত্যুতে তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচিত বিশ্বে শোকের ছায়া নামে। সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিত্বরা তাঁর সম্পর্কে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে মন্তব্য করেন। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কিছু শত্রুও লজ্জিত হয়। এখানে ইমামের মহান ব্যক্তিত্ব এবং ইসলামী চিন্তাধারার পুনরুজ্জীবন ও বিশ্বব্যাপী ইসলামী বিপ্লবে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কিছু মতামত তুলে ধরা হলো। এসব মতামতের মধ্যে কোন কোনটি ইমামের মৃত্যুর আগেই করা হয়েছিল।

লেবানন এবং সারা বিশ্বের মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, বিশ্বের দাম্ভিক শক্তিসমূহের আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বকে অনুসরণ করতে হবে। বিশ্বের নির্যাতিত জনগণ ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ওপর তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ন্যস্ত করেছে।’- আহমদ জাকি তাফাহি, লেবাননী চিন্তাবিদ

ইমাম খোমেইনী শুধু তাঁর জাতির ইতিহাসের ধারাই পরিবর্তন করেননি, তিনি ২০ শতকের শেষার্ধের ইতিহাসে তার প্রত্যক্ষ প্রভাবও রেখেছেন।’- ইরানে নিযুক্ত আরব সাহারা প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদূত (১৯৯১)

ইমাম খোমেইনী একজন খাঁটি মুসলমান। তিনি আমাদের দ্বীনি ভাই। তিনি আমাদের মতোই ইসলামের পতাকাতলে থেকেই সামনে অগ্রসর হচ্ছেন।’- আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শায়েখ, মিশর।

বর্তমান বিশ্বে একটি মাত্র ইসলামী সরকার আছে এবং সেটা হচ্ছে ইমাম খোমেইনীর সরকার। কারণ, এই একমাত্র সরকারই ইসলামী শরীয়ার প্রতিটি বিধান বাস্তবায়ন করেছে। অবশিষ্ট আর কোন সরকারই ইসলামী সরকার নয়। ফিলিস্তিনী চিন্তাবিদরা বিশ্বাস করেন, ইমাম খোমেইনী একজন বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও সাহসী মুজাহিদ নেতা, যিনি বিশ্বের মুসলমানদের নেতৃত্ব দিতে পারেন।’- শেখ ইউসুফ জিরাইল, ফিলিস্তিনী চিন্তাবিদ

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনী ইসলামী উম্মাহর ইমাম হওয়ার যথেষ্ট দাবি রাখেন। আমার মতে, তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি বর্তমান মুসলিম বিশ্বের সকল নেতার চেহারা থেকে অপমান, সংকীর্ণতা ও অলসতার চিহ্ন মুছে ফেলেছেন। তিনি মুসলিম ও অমুসলিম জাতিসমূহের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করেছেন। নিশ্চয়ই ইতিহাস এসব বিষয় চিরকালের জন্য রেকর্ড করে রাখবে। তিনি ইমাম আলী (আ.)-এর জীবন্ত উদাহরণ।’- আলজেরিয়ার শিক্ষা ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী (১৯৯১)

এটা নিঃসন্দেহ যে, বিপ্লবের নেতা-যিনি একজন আলেম-ইরানী বিপ্লবের বিজয় অর্জনের মূল ব্যক্তি। বিশ্বের সকল মুক্তিকামী ও নির্যাতিত মানুষের হৃদয়ে তিনি আলোড়ন তুলেছেন। তিনি শুধু ইরানের নন, সারা বিশ্বের মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নির্যাতিত মানুষের নেতা। তারা তাঁকে একজন মুক্তিদূতরূপে গণ্য করে।কাপুচি, ফিলিস্তিনী আর্চ বিশপ।

পাকিস্তানের মুসলমানরা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বলিষ্ঠ সমর্থক। পাকিস্তানের সভা সমাবেশগুলোতে ইমাম খোমেইনী ও বিপ্লব আলোচনার দুটি প্রধান বিষয়। বিশ্বের দাম্ভিক শক্তিসমূহ এটা ভালো করে জানে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব এবং ইমাম খোমেইনীর প্রতি বিশ্বের নির্যাতিত জাতিসমূহের সমর্থন রয়েছে।’- আল মোন্তাজেরী ধর্মীয় কেন্দ্রের প্রধান, পাকিস্তান

ইরানের ইসলামী বিপ্লব সত্যিকারের মানুষ ও সমাজের একটি নয়া দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। ইরানের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য জগতের শত্রুতার এটাই কারণ। ইমাম খোমেইনী ইরানীদের জীবনকে নতুন করে অর্থবহ করে তুলেছেন।’- রজার গারুদী, ফরাসী বুদ্ধিজীবী

ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে সংঘটিত ইরানের মহান ইসলামী বিপ্লব আমাদের জন্য মহা শিক্ষা নিয়ে এসেছে। এখনও যদি আমরা ঘুম থেকে না জাগি তাহলে শত্রুরা আমাদের মতবিরোধকে কাজে লাগাবে এবং আমাদের ওপর নির্যাতন চালাবে।’- মাওলানা আতাহারী, কাশ্মীরের একজন সুন্নি মুফতি।

কেবল ইসলাম ও ইমাম খোমেইনীর পথ অনুসরণ করলেই ফিলিস্তিনী বিপ্লব সাফল্য লাভ করবে। ইসলামী বিপ্লব থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে এবং অঞ্চলের নতজানু ও প্রতিক্রিয়াশীল নেতাদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ফিলিস্তিনী বিপ্লব এখনও সাফল্য লাভ করেনি, যদিও হাজার হাজার শহীদ তাঁদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন।… আমরা ঘোষণা করছি, ইমাম খোমেইনী হচ্ছেন সারা বিশ্বের মুসলমানদের, বিশেষ করে অধিকৃত অঞ্চলের নেতা… আমরা তাঁর প্রতি আবারো আনুগত্য প্রকাশ করছি। আল-কুদস মুক্ত করা এবং ফিলিস্তিনী জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টারত মুসলমানদের জন্য ইরান হচ্ছে আজ একটি শক্তিশালী ঘাঁটি।’- শেখ ইউসুফ সানি, জুমআর জামায়াতের ইমাম, ফিলিস্তিন।

আমি ইরানীদের অনুরোধ করছি, তারা যেন বিপ্লবের প্রতি সর্বাত্মক যত্নবান থাকেন। ইমাম উপ¯হাপিত এই বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যাতে সাফল্য লাভ করে সে বিষয়টির প্রতি আপনারা পরিপূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে দৃষ্টি রাখবেন এবং সেগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেবেন। এই বিপ্লবকে সংরক্ষণ করা, এমনকি আপনাদের নিজেদের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করতে হবে। কোন ব্যক্তির জীবনের চেয়েও এই বিপ্লবের গুরুত্ব অনেক বেশি বলে এর প্রতি যত্নবান হতে হবে। কারণ, একজন ব্যক্তির আশা-আকাক্সক্ষা থাকে তার নিজের মাঝেই সীমাবদ্ধ।’- মুনির শফিক, ফিলিস্তিনী ইসলামী চিন্তাবিদ।

ইমাম খোমেইনী এবং ইরানী জাতি একটি মহান ঐতিহাসিক কাজ করেছেন। আমার মতে, একজন পশ্চিমা ও অমুসলিম ব্যক্তি হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আজকের দুনিয়ার এভাবে একটি ধর্মীয় আদর্শভিত্তিক বিপ্লব সংঘটিত হওয়া এক অলৌকিক ঘটনা।’- রবার্ট কালসন, কানাডীয় বিজ্ঞানী

ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সহায়তায় ও ইমামের নেতৃত্বে ইরানী জাতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। এই দায়িত্ব পালন করে যদি তারা মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা কায়েমে সফল হয় তা হলে মুসলিম দেশসমূহ তাদের পথ অনুসরণ করবে।’- হামিদ আলগার, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

আয়াতুল্লাহ খোমেইনীর নীতিবোধ থেকে উৎসারিত আওয়াজের কারণেই ইরানের ইসলামী বিপ্লব মর্যাদার দাবিদার।’- উইলিয়াম ওয়ারসি, মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক

ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের আশ্রয়হীন লোকদের আশ্রয়স্থল এবং ইমাম খোমেইনীই হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিপীড়িত ও বঞ্চিতদের পক্ষে। তিনি যালিমদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলেন। ইমামের প্রতি আকর্ষণ এ রকম যে, শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সকল মুসলমান তাঁর সত্যবাদিতায় বিশ্বাস করেন।’- হায়দার আলী, হায়দরাবাদ জুমআর জামায়াতের ইমাম, পাকিস্তান।

ইমাম খোমেইনী শুধু ইরানের নেতাই নন, তাঁর নাম শুনে দক্ষিণ আফ্রিকার নির্যাতিত জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশ্বের জেনে রাখা উচিত, ইমাম খোমেইনী দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।’- আবদুল্লাহ বিদাত, দক্ষিণ আফ্রিকার মুসলিম যুবনেতা।

বর্তমানে ইমাম খোমেইনীর শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের সুখ্যাতি আমেরিকা, এমনকি শিশুদের মধ্যে সম্ভবত এ কারণে ছড়িয়ে পড়েছে যে, তিনি বিশ্বের সামনে ইসলামের শক্তি এবং পাশ্চাত্যের দুর্বলতা প্রমাণ করেছেন। ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বের বদৌলতে এবং মুসলিম ইরানী জাতির সাহস ও প্রতিরোধের ফলেই ইরানে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্য অর্জিত হয়েছে।’- শেখ মুহাম্মাদ জাভেদ আলশারী, জুমআর জামায়াতের ইমাম, ডেট্রয়েট, যুক্তরাষ্ট্র

তাঁর দেশে এবং বিশ্বের বিশাল এলাকায় তিনি (ইমাম খোমেইনী) যে কাজ করেছেন তা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও গভীর চিন্তায় রেখে তাঁর সম্পর্কে কারো মতামত প্রকাশ করা উচিত।’- পোপ দ্বিতীয় জন পল।

ইমাম খোমেইনী গৌরব নিয়ে এ পৃথিবীতে বেঁচেছিলেন এবং গৌরবের সঙ্গেই এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তিনি বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের সামনে বিশ্বাস, দয়া ও সহজ সরলতার শ্রেষ্ঠতম দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।’- হাফিজ আল-আসাদ, সিরিয়ার প্রেসিডেণ্ট (১৯৯১)

ইমাম খোমেইনীর নাম ইরানের ইতিহাসে নয়া অধ্যায়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।’- এরিক হোনেকা, জার্মানি

ইমাম খোমেইনীর মৃত্যু বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষকে শোকাভিভূত করেছে।’- আর্নেস্টো কার্ডিনাম, নিকারাগুয়ার যুদ্ধবিশারদ

(নিউজলেটার, জুন ১৯৯১)

ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর সংগ্রামী জীবন

প্রতিটি আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।মানবতার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলার এই বাণী ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর জান্নাত যাত্রার উদ্দেশ্যে পৃথিবী থেকে বিদায়ের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেইনী (রহ.) রাজনীতি ও সংগ্রামের ক্ষেত্রে কেবল একজন অনন্য বিশ্বনেতাই ছিলেন না; বরং আইনবিজ্ঞান, দর্শনশাস্ত্র, সূফিতত্ত্ব ও নীতিশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ হিসাবেও ইসলামী বিশ্বের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি এসব ক্ষেত্রে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন এবং ইসলামী নীতির অনুশীলন ও ধর্মীয় ঐতিহ্য মেনে চলার ব্যাপারে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

ইমাম খোমেইনীর জ্ঞান, ঈমান, দৃঢ়তা, অভ্যন্তরীণ চারিত্রিক সৌন্দর্য এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর ধারণা এতই গভীর ছিল যে, তা সংক্ষিপ্ত কোন নিবন্ধে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একটি বিখ্যাত কবিতায় যেমন বলা হয়েছে : সমুদ্র থেকে আমরা পানি তুলতে পারি না, কিন্তু তৃষ্ণা তো মেটাতে পারি নিশ্চয়ই।এই নিবন্ধ তেমনই এক প্রচেষ্টা মাত্র।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) ১৩২০ হিজরির ২০ জমাদিউস সানী ইরানের খোমেইন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তারিখটি হযরত ফাতিমা (আ.)-এর জন্মদিন। তিনি ৮৯ বছর বয়সে ১৪০৯ হিজরি মোতাবেক ১৯৮৯ সালের ৩রা জুন ইন্তেকাল করেন।

তাঁর পিতা শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুস্তফা মুসাভী ছিলেন একজন বিখ্যাত আলেম আল্লামা সাইয়্যেদ আহমদ মুসাভীর পুত্র।

ইমাম খোমেইনীর মাতা হাজেরা একটি ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও ইসলামী জ্ঞানের অধিকারী ও ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন। মোহতারেমা হাজেরার পিতা ছিলেন মরহুম আয়াতুল্লাহ মির্জা আহমদ। তিনি তদানীন্তন সময়ের একজন বিশিষ্ট আলেম ছিলেন।

অত্যাচার ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের দায়ে সাইয়্যেদ মুস্তফা মুসাভীর শাহাদাতের পর তাঁর বোন সাহিবা এই শিশুর অভিভাবক হন। মাত্র পাঁচ মাস বয়স থেকেই ইমাম খোমেইনী তাঁর প্রিয় ফুফু ও মায়ের কাছে লালিত-পালিত হন। এছাড়া খাভের নামে তাঁর একজন ধাত্রী ছিল। তাঁরা তাঁকে সার্বিকভাবে গড়ে তোলেন।

যুগস্রষ্টা মানুষেরা সর্বদাই দুঃখ-কষ্ট, মানসিক চাপ, একাকিত্ব, নির্বাসন ও বিদ্রোহের সম্মুখীন হন এবং এভাবেই তাঁরা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হওয়ার ভাগ্য লাভ করেন। ইমাম খোমেইনী তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁর ফুফু সাহিবা ইন্তেকাল করেন। এর কিছুদিন পর ১৩৩৬ হিজরিতে তাঁর মাতা হাজেরা ইন্তেকাল করেন। এসব দুঃখ ও শোক ইমাম খোমেইনীকে সহায়হীন ও পিছপা করার পরিবর্তে আরো অভিজ্ঞ ও মহৎ আত্মশক্তির অধিকারী করে তোলে। তিনি সকল পরিস্থিতি সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করেন এবং আত্মবিশ্বাস ও নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে অগ্রগতি, পরিশুদ্ধি, সুশিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন করেন।

অত্যন্ত উন্নত প্রতিভার অধিকারী ইমাম খোমেইনী শিশুকালে মির্জা মাহমুদ নামের একজন শিক্ষকের কাছে বাড়িতেই তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু করেন। পরে তিনি মক্তবে ভর্তি হন। মক্তবের প্রধান ছিলেন মোল্লা আবুল কাশেম। পরে তিনি নব প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। শেষ পর্যায়ে মাত্র পনের বছর বয়সে তিনি ফারসি ভাষা শেখার কাজ শেষ করেন। এর পর তিনি তাঁর ভাই সাইয়্যেদ মুর্তাজার (আয়াতুল্লাহ পাছান্দিদের) কাছে যুক্তিশাস্ত্র, আরবি ভাষা ও ব্যাকরণসহ ইসলামী বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু করেন। ইমাম খোমেইনী আরো অধ্যয়নের জন্য ইসফাহানের ধর্মতত্ত্ব স্কুলে গমন করেন। তিনি খোমেইন অবস্থান করেন ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত। ১৩৩৯ হিজরিতে তিনি আরাক যান। ঐ সময় সেখানে (মরহুম) হাজী শেখ আবদুল করীম হায়েরী বসবাস করতেন। সেখানে তিনি অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকম-লীর কাছে সাহিত্য শিক্ষা শুরু করেন। ১৩৪০ হিজরিতে আয়াতুল্লাহ হায়েরী আরাক থেকে কোমের ধর্মতাত্ত্বিক মাদরাসায় বদলী হলে ইমাম খোমেইনীও সেখানে যান এবং মুতাওয়াল-এর ওপর (আরবি শিক্ষা গ্রন্থ) অধ্যয়ন ও গবেষণা শুরু করেন।

কোম নগরীতে মুতাওয়াল-এর ওপর ব্যাপক অধ্যয়ন, গবেষণা ও নিরলস সাধনার ফলে ইমাম খোমেইনী ১৩৪৫ হিজরিতে অধিক সাফল্যের সাথে তাতে কৃতকার্য হন।

মরহুম হাজী শেখ আবদুল করীম হায়েরীর ক্লাসসমূহে যোগদানের মধ্য দিয়ে তিনি বিজ্ঞান ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভিত্তি রচনায় প্রভূত অগ্রগতি অর্জন ও ইজতিহাদের যোগ্যতা লাভ করেন। ১৩৫৫ হিজরিতে আয়াতুল্লাহ হায়েরী ইন্তেকাল করলে ইমাম খোমেইনী একজন মুজতাহিদ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। কোমের ধর্মতাত্ত্বিক মাদরাসায় তিনি বিশেষজ্ঞ শিক্ষক হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

আইন শাস্ত্রের ওপর উচ্চতর জ্ঞানের পর্যায় অর্জন করা ছাড়াও ইমাম খোমেইনী (রহ.) জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন ও সূফিতত্ত্বেও ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেন।

আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জনের জন্য ইমাম খোমেইনী ছেলেবেলা থেকেই ইসলামী শিক্ষাচর্চার মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালান। স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি উচ্চতর আধ্যাত্মিক পর্যায় অর্জন করেন এবং সে সময়ের খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ববর্গের মধ্যে একজন হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জনের পর থেকে তিনি ইমাম হিসাবে নেতৃত্বে সমাসীন হন। তিনি কখনই নিজের মর্যাদার ভাব প্রকাশ করেননি এবং কখনই জনসাধারণের দানের অর্থ নিজের জন্য ব্যয় করেননি। সত্যিকার অর্থে তিনি পদমর্যাদাকে অপছন্দ করতেন এবং সর্বদা এ ধরনের বিষয় থেকে দূরে থাকতেন। এটা এই কারণে যে, তিনি মনে করতেন, ইসলাম, ইসলামী সমাজ বিপদাপন্ন। একে রক্ষা করতে হবে এবং এ উদ্দেশ্যে বিক্ষিপ্ত জনগণকে নেতৃত্ব দিতে হবে।

সকল দিক ও বিষয়ে ইমাম খোমেইনীর জীবন ছিল খুব সুশৃঙ্খল। এমনকি অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির তুলনায়ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপনে তিনি ছিলেন অনন্য। সমকালীন যুগে এমন ব্যক্তির কথা না শোনা গেছে, না দেখা  গেছে। তিনি শৃঙ্খলার সাথে তাঁর সকল কাজ সম্পাদন করতেন। ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ইত্যাদি সকল কাজের ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য। তাঁর জীবন এতই সুশৃঙ্খল ও নিয়মানুবর্তী ছিল যে, তাঁর পরিবারের সদস্যরা অনায়াসে বলতে পারত তাঁর কর্মতৎপরতা সম্পর্কে।

এটা বিস্ময়কর যে, ইমাম খোমেইনী তাঁর চলাফেরা বা নড়াচড়ার ক্ষেত্রেও একটি বিশেষ শৃঙ্খলা মেনে চলতেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি যখন উঠে দাঁড়াতে চাইতেন তখন বাম হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতেন। যখন বাড়ি, স্কুল বা মসজিদে প্রবেশ করতেন তখন ডান পা আগে দিয়ে প্রবেশ করতেন। রাস্তায় তিনি সব সময় ডান পাশ দিয়ে হাঁটতেন। তিনি হাঁটার সময় সৈনিকের মতো মাথা ও ঘাড় সোজা করে অগ্রসর হতেন।

ইমাম খোমেইনী ১৩৪৮ হিজরি পর্যন্ত একাকী জীবন যাপন করেন। ঐ বছরই তাঁর বিবাহের ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং তিনি আয়াতুল্লাহ হাজী মির্জা মুহাম্মাদ সাকাফী তেহরানীর কন্যা খাদিজাকে বিবাহ করেন।

ইমাম খোমেইনীর পরিবারে দুই পুত্র ও তিন কন্যা জন্মগ্রহণ করে। তাঁর প্রথম পুত্র হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমীন হাজী সাইয়্যেদ মোস্তফা এবং দ্বিতীয় পুত্র হুজ্জাতুল ইসলাম হাজী সাইয়্যেদ আহমদ। তাঁর তিন কন্যা হলেন : সিদ্দিকা, ফরিদা ও ফাতিমা। এদের মধ্যে ড. যাহরা মুস্তফাভী (ফরিদা) তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপিকা এবং ইরানের মহিলা সমিতির প্রধান (১৯৯১ সাল)।

দর্শনশাস্ত্র ও সূফিতত্ত্বের ওপর গবেষণার ক্ষেত্রে ইমাম খোমেইনীর অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে কোমের ধর্মতত্ত্ব শিক্ষাকেন্দ্রে একজন অসাধারণ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকে পরিণত করে। এই কারণে বিপুলসংখ্যক আলেম ও ছাত্র তাঁর কাছে জ্ঞানচর্চা করতে আসেন। এক কথায় বলা  চলে যে, কোমের ধর্মতাত্ত্বিক মাদরাসার অধিকাংশ শিক্ষকই তাঁর ছাত্র ছিলেন।

ইমাম খোমেইনী তাঁর ছাত্রদেরকে আত্মার পরিশুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শক্তি অর্জনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করতেন। এ কারণে তিনি দর্শন ও সূফিতত্ত্বের শিক্ষাদান ছাড়াও ছাত্রদের জন্য হেদায়াতের ক্লাস চালু করেন।

ঐ ক্লাসগুলো এতই আকর্ষণীয় ও গভীর জ্ঞানপূর্ণ ছিল যে, অল্পদিনের মধ্যেই শত শত ধর্মীয় আলেম ও কোমবাসী তাতে অংশগ্রহণ করতে থাকে।

ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং তাঁর ক্লাসসমূহে যোগদানকারীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ইরানের তদানীন্তন শাসক শাহ রেজা খান পাহলবী ও তাঁর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভীত করে তোলে। সে কারণে তারা তাঁকে বাধা দেয়ার প্রচেষ্টা শুরু করে। কিন্তু তারা সম্মুখীন হয় ইমাম খোমেইনী দৃঢ়তা এবং নজিরবিহীন প্রতিরোধ আন্দোলনের।

ইমাম খোমেইনী কোমের ধর্মতাত্ত্বিক মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের মাঝে বিজ্ঞান শিক্ষার অগ্রগতি বিষয়েও এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নির্বাসন ইরানে ইসলামী ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর ছিল আঘাতস্বরূপ। শত শত আলেম তাঁর নির্বাসনের ফলে জ্ঞান আহরণ ও বিজ্ঞানচর্চা থেকে বঞ্চিত হন।

নাজাফের আলেমগণও ইমাম খোমেইনীর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার থেকে আলো গ্রহণ করেছেন এবং তাঁর ক্লাসসমূহে যোগদানের সুযোগ গ্রহণ করেছেন। নাজাফের ধর্মতাত্ত্বিক বিদ্যালয়ের আলেমদের এমন কথা বলতে শোনা যায় : আয়াতুল্লাহ খোমেইনী নাজাফে আসার আগে আমরা বুঝতে পারিনি যে, ইসলামী বিজ্ঞানের জগতে নতুন তথ্য রয়েছে। কিন্তু তিনি যখন নাজাফে আগমন করলেন এবং ক্লাস নেয়া শুরু করলেন, তখন আমরা মূল্যবান বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি সম্পর্কে জানতে পারলাম যা আগে কখনও শুনিনি।

বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে অনন্য মর্যাদা ও পর্যায় অর্জন করা ছাড়াও তিনি আইন, দর্শন ও সূফিতত্ত্বেও বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। কবিতা রচনায়ও তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি নীতিশাস্ত্র, তত্ত্ববিদ্যা ও অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে বেশকিছু গ্রন্থ সংকলন করেছেন। ২৭ বছর বয়সে ইমাম খোমেইনী তাঁর মিসবাহুল হিদায়াতগ্রন্থটি সংকলিত করেন। এ গ্রন্থটি খোদায়ী শিক্ষার এক অনন্য উদাহরণ। ২৯ বছর বয়সে তিনি রমযান মাসের ফজরের নামাযশীর্ষক একটি পুস্তক রচনা করেন। এই পুস্তকে ইমাম খোমেইনীর বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতার প্রমাণ মেলে। তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ের ৭টি হাদীস ও নীতিনৈতিকতা বিষয়ক ৩৩টি হাদিসের ব্যাখ্যা সম্বলিত আরবায়ীন হাদিসনামে আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেন। ইমাম খোমেইনী সংকলিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : ইসলামী সরকার বা বেলায়েতে ফকীহএবং নাফসের বিরুদ্ধে জিহাদ বা জিহাদে আকবর

ইমাম খোমেইনীর জনপ্রিয়তায় মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) এবং ইহুদিবাদী ও ইসলামবিরোধী শাহের সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা যখন দেখতে পেল যে, তাদের লুণ্ঠন ও ঔপনিবেশিক স্বার্থ বিপন্ন হয়ে পড়ছে তখন তারা ইমামের নেতৃত্ব থেকে ইসলামী জাতিকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে তাঁর কাছ থেকে জনগণকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য নানা পন্থা অবলম্বন করে। ইরানে কেউ যদি ইমামের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য নিয়ে কথা বলে তাহলে তাকে গ্রেফতার, অত্যাচার, কারাগারে প্রেরণ বা নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়। কেউ তাঁকে অনুসরণ (তাকলিদ) করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তাঁর রিসালাহ্ (ধর্মীয় আইনশাস্ত্রের বই) বাজার থেকে তুলে নেয়া হয় এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। শাহের ভাড়াটেরা ইসলামী ও আরব দেশসমূহে ইমাম খোমেইনী সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা জোরদার করে। এসব দেশের জনগণ ইরানের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না।

ইমাম খোমেইনী ইরানী সমাজের সকল ক্ষেত্রে গবেষণা চালানোর ফলে বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইরানের মুসলিম জনগণকে প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাধারা থেকে উদ্ধার ও মুক্ত করার একমাত্র পথ হচ্ছে গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লব আর এটা পরিচালনা করতে হবে মারজায়ে তাকলিদের মাধ্যমে (মারজা হচ্ছেন কোন অনুসরণযোগ্য মুজতাহিদ ব্যক্তিত্ব)। তিনি যখন জানলেন কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে সংগ্রাম ও বিপ্লব সৃষ্টি করা এবং তার মধ্যে কাজ করছে একটি বিপ্লবী চেতনা, তখন বিপ্লবের কাজ শুরু করলেন। তিনি বিপ্লবী পদ্ধতি প্রয়োগ করে তাঁর আন্দোলন শুরু করলেন এবং কী হতে যাচ্ছে তা তিনি ছাড়া আর কেউ জানত না।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল প্রয়োগ এবং বিপ্লবের সাথে তাঁর গোপন সংশ্লিষ্টতা ছিল এক অসাধারণ কর্মপ্রচেষ্টা, যা ইমাম খোমেইনীর মতো একজন মানুষের পক্ষেই চালানো সম্ভব হয়েছে। শাহের সরকার ও তাঁর দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এসব কর্মকাণ্ড দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। এতসবের মধ্যেও ইমাম খোমেইনী জনসাধারণ ও সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জানতে না দিয়ে তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনসুরের পুতুল সরকার ইরানী পার্লামেন্টে ক্যাপিটিউলেশন বিলনামে এক কুখ্যাত আইন পাশ করে। উক্ত আইনে ইরানে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের এমন কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়, যা পৃথিবীর কোন দেশে কোন বিদেশী নাগরিক পেতে পারে না। এ আইন পাশের খবর ইমামের কানে পৌঁছলে তিনি এর বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন। তেহরানে ইমাম খোমেইনীর সমর্থকবৃন্দ দশ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ৪০ হাজার ঘোষণাপত্র বিলি করেন। ঘোষণাপত্রটি কুখ্যাত ক্যাপিটিউলেশন আইন সম্পর্কে ইমামের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। ঘোষণাপত্রের সারসংক্ষেপ ছিল নিম্নরূপ : আমাদের অভাব-অভিযোগ, দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব। এহেন অপমানের প্রতিবাদ করার ভার এখন ইসলামী মুবাল্লিগ ও বক্তাদের ওপরই ন্যস্ত। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে দেশের স্বাধীনতার জন্য কলম ধরতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কদের উচিত পার্লামেন্টে গৃহীত সিদ্ধান্তের পিছনে কী রহস্য নিহিত রয়েছে সে সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা। এ  সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি সর্বসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ইসলাম ও কুরআনের গৌরব বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট হওয়া এবং একই মুসলমানদের সমর্থনে কাজ করা উচিত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শাহী সরকারের নতজানু মনোভাব সম্পর্কে মন্তব্য প্রসঙ্গে ইমাম বলেন : আমেরিকার কোন সৈনিকের কুকুর যদি শাহকে কামড়ায় তাহলেও শাহের প্রতিকার চাওয়ার মতো কোন আইনগত ভিত্তি নেই।

এছাড়াও এসময় সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করার উদ্দেশ্যে শাহ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দুশ’ মিলিয়ন ডলারের এক চুক্তি করে। ইমাম খোমেইনী সুস্পষ্টভাবে বলেন : শাহের এ চুক্তি অনুমোদন করে মজলিসে যে ভোট প্রদান করা হয়েছে তা অবৈধ ও সুস্পষ্টভাবে কুরআনের নীতিবিরোধী।তিনি ইরানী সেনাবাহিনীর প্রতি এক আবেদনে তাদেরকে জেগে উঠতে বলেন এবং শাহের শাসন উৎখাত করার আহ্বান জানান। তিনি একইভাবে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান তারা যেন এ স্বৈরতন্ত্রকে অদৌ বরদাশত না করে, যা ইরানকে পুরোপুরি দাসত্বের শৃঙ্খখলে আবদ্ধ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। শাহ বুঝতে পারলেন, এ হচ্ছে তাঁর ক্ষমতার প্রতি সারাসরি হুমকি। তিনি চিন্তাভাবনা করে দেখলেন, যতদিন ইমাম খোমেইনী দেশে আছেন ততদিন জনগণের স্বার্থের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করা যাবে না। ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি জনগণের সমর্থন তাঁর সরকারের কাছে ছিল অসহনীয়। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, জনগণের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার বিকাশ ঘটলে তারা বিপ্লবের মাধ্যমে উপনিবেশবাদকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে। লক্ষ মানুষের আন্দোলনকে দুর্বল করার জন্য শাহ তাই ইমামকে নির্বাসনে পাঠানোর কথা ভাবলেন।

ইসলামী কর্তব্য পালনের তাগিদে ইমাম খোমেইনী (রহ.) ইরানী জাতির বিরুদ্ধে রেযা খানের কৃত অপরাধ ও বিশ্বাসঘাতকতার কথা প্রকাশ করেন। তিনি ইরানের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে রেযা খানের অমার্জনীয় অপরাধ ও ষড়যন্ত্রের কথা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করেন।

সেসময় ইরানের পরিস্থিতি সম্পর্কে ইমাম খোমেইনীর পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি ও সচেতনতা সকলের মনন ও চিন্তাশক্তিকে আলোড়িত করে এবং সকলে পূর্ণভাবে সজাগ হয়।

(নিউজলেটার, জুন ১৯৯১) 

ইমামের সুযোগ্য উত্তরসূরি রাহবার আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর বেদনাদায়ক ইন্তেকালের পর আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী ১৯৮৯ সালের ৪ জুন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নতুন নেতা নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি প্রেসিডেণ্ট হিসাবে দীর্ঘ ৮ বছর ইসলামী প্রজাতন্ত্রের খেদমত করেন। প্রেসিডেণ্ট হিসাবে তিনি পাকিস্তান, ভারত, লিবিয়া, সিরিয়া, মোজাম্বিক, অ্যাংগোলা, তানজানিয়া, জিম্বাবে, যুগোশ্লাভিয়া, রোমানিয়া, উত্তর কোরিয়া, চীন প্রভৃতি দেশ সফর করেন। আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ১৯৩৯ সালের ১৫ জুলাই ইরানের খোরাসান প্রদেশের রাজধানী পবিত্র মাশহাদের এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর তিনি কোম-এর ধর্মতাত্ত্বিক কেন্দ্রে গমন করেন এবং হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসেন। ১৯৬২ সালে তিনি ইমামের নেতৃত্বে পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনে যোগদান করেন। পরবর্তী বছর তৎকালীন সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ১৯৭৮ সালে মাশহাদে ফিরে আসেন এবং ইসলামী বিপ্লব জয়লাভ না হওয়া পর্যন্ত তিনি তার নেতৃত্ব দেন। বিপ্লবের অব্যবহিত পর ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে তিনি বিপ্লবী পরিষদের একজন সদস্য মনোনীত হন। আগস্ট (৭৯) মাসে তিনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন। অতঃপর ডিসেম্বর মাসে তিনি ইসলামী বিপ্লবী রক্ষিবাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত হন। ১৯৮০ সালের ১৯ জানুয়ারি ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁকে তেহরান নগরীর জুমআর নামাযের ইমাম নিযুক্ত করেন। ১৫ মার্চ তিনি মজলিস (পার্লামেন্ট)-এর ডেপুটি নির্বাচিত হন। তার আগে ১১ মার্চ তিনি প্রতিরক্ষা পরিষদের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইমাম খোমেইনী তাঁকে দক্ষিণাঞ্চলীয় রণাঙ্গনে প্রেরণ করেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ১৯৮০ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে শতকরা ৯৫ ভাগ ভোট পেয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালের ২০ আগস্ট তিনি পুনরায় দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।

জনাব আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ফারসি ছাড়াও আরবি, তুর্কি প্রভৃতি ভাষায় বিশেষ পারদর্শী। তিনি ইসলামী আদর্শ ও ইতিহাসের ওপর বেশ কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে আয়েন্দাহ দার কালাম রুয়ে ইসলাম’, ‘আদদায়ানামাহ আলাইহে তামাদ্দুনে গারব’, ‘সুলহে ইমাম হাসানপ্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

(নিউজলেটার, জুন ১৯৯১)