All posts by dreamboy

দ্বিতীয় প্রজন্মের এক হাজার সেন্ট্রিফিউজ বসিয়েছে ইরান

ইরান দ্বিতীয় প্রজন্মের আরো এক হাজার সেন্ট্রিফিউজ বসিয়েছে। দেশটির পরমাণু শক্তি সংস্থা-এইওআই’র প্রধান আলী আকবর সালেহি এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নতুন প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজ বসানো হলেও সেগুলোতে ইউএফ-সিক্স গ্যাস প্রবেশ করানো হয়নি। ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে জেনেভা চুক্তির কারণে এসব সেন্ট্রিফিউজে গ্যাস প্রবেশ করানো স্থগিত রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, দ্বিতীয় প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজের জন্য স্থান ও অবকাঠামো বেশি প্রয়োজন হয়।  এ কারণে দ্বিতীয় প্রজন্মের আর কোন সেন্ট্রিফিউজ বসানো হবে না। তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজ পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি। সালেহি বলেন, নতুন প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজ বানানো ইরানের জন্য কঠিন নয়। কারণ দেশটি এরইমধ্যে এ ক্ষেত্রে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেছে। ইরানে বর্তমানে ১৯ হাজার সেন্ট্রিফিউজ রয়েছে।

গত ২৪ নভেম্বর ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের স্বল্প মেয়াদি সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছে। ওই চুক্তিতে পাশ্চাত্য ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইরানও ছয় মাসের মধ্যে নতুন সেন্ট্রিফিউজ চালু না করতে সম্মত হয়েছে। রাশিয়া,চীন,আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানিকে নিয়ে ছয় জাতিগোষ্ঠী গঠিত। ছয় জাতিগোষ্ঠী ৫+১ গ্রুপ নামেও পরিচিত।

তেহরান রেডিও, ১ জানুয়ারি, ২০১৩

দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিশক্তির জন্য একাধিক ভাষার গুরুত্ব

জানুয়ারী ৯, ২০১৪ স্বাস্থ্য সংবাদ ২১৫ বার পঠিত মন্তব্য করুন

যাঁরা অন্তত দুটি ভাষা জানেন, তাঁদের বৃদ্ধ বয়সে স্মৃতিধ্বংসের প্রবণতা একটিমাত্র ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের চেয়ে কম। সম্প্রতি ভারতের একদল বিজ্ঞানী এক গবেষণার পর এই তথ্য দিয়েছেন। স্মৃতিধ্বংস বা ডিমেনশিয়ার প্রবণতা নিয়ে এই গবেষণাটি করা হয় ভারতের হায়দরাবাদে, যেখানে বেশির ভাগ লোক একের অধিক ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত। সেখানে তেলেগু, উর্দু, দক্ষিণী এবং ইংরেজি—এই ভাষাগুলো কম-বেশি সবাই জানে। শিক্ষিত ও অশিক্ষিত দুই ধরনের মানুষের ওপর গবেষণায় দেখা যায়, একাধিক ভাষায় দক্ষ মানুষদের স্মৃতিধ্বংসের প্রবণতা শুরু হচ্ছে গড়ে ৬৫ দশমিক ৬ বছর বয়সে, আর যাঁরা একটি মাত্র ভাষা জানেন, তাঁদের ৬১ দশমিক ১ বছর বয়সে। ভাষা ও নতুন শব্দ শিক্ষা এবং চর্চা মস্তিষ্কের ব্যায়াম ও শ্রম উৎপাদন করে, যা স্মৃতিধারণ ক্ষমতার জন্য ভালো।

ইতিপূর্বে কানাডার অন্টারিওতে একই ধরনের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে বহু ভাষাবিদের অ্যালজেইমারস রোগ হওয়ার প্রবণতা কম। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি নিউরোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

ইউএসএ টুডে।

চিকিতসা বিজ্ঞানে বিশ্বে ১৮তম অবস্থানে ইরান

চিকিতসা সংক্রান্ত জ্ঞান উতপাদনে বিশ্বে ১৮তম অবস্থানে রয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। কয়েকটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কেন্দ্রের পরিসংখ্যানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা বিষয়ক উপ-ব্যবস্থাপক আমির মোহসেন জিয়ায়ি বলেছেন, বিশ্বের ২৩৮টি দেশের মধ্যে ইরান ১৮তম স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে ২০১১ সালে চিকিতসা সংক্রান্ত জ্ঞান তথা উঁচু মানের গবেষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে বিশ্বে ইরান ২৩তম স্থান অধিকার করেছিল। তবে ২০০০ সালেও এ ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান ছিল ৫৩। গত কয়েক বছরে ইরান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছে।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘থমসন রয়টার্সে’র সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান উৎপাদন ও গবেষণায় ইরান বিশ্বে ২০তম স্থান অধিকার করেছে।

ইন্সটিটিউট অব সায়েন্টিফিক ইনফরমেশন- আইএসআই জানিয়েছে, ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোতে ইরান ৬০,৯৭৯টি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান উতপাদনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরানের অবস্থান সবার শীর্ষে। এছাড়া এর আগে ন্যানোটেকনোলজি বিষয়ক গবেষণা কাজে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম ও বিশ্বে অষ্টম স্থান অর্জন করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

তেহরান রেডিও, ৬ জানুয়ারি, ২০১৩

মর্দে মুমিন

মুহাম্মাদ ঈসা শাহেদী

মর্দে মুমিন জাগিল আজ ইসলামের ঐ ঝাণ্ডা নিয়ে

মরণ আঘাত হানিছে দেখ শয়তানের ঐ বক্ষে গিয়ে।

উদিল আজ ইসলামেরই সূর্য পুনঃ দুনিয়া জুড়ে,

নয়া জাহেলী অন্ধকারের বক্ষ চিরে তারই নূরে।

নমরূদের ঐ তখত ভাঙলো , ভাঙলো আশা ফেরাউনের

ইব্রাহীমের বজ্র নিনাদ হাঁকছে দেখো বীর ইরানের।

ডাকে আজ মুসলিম জাগো ইরান থেকে বীর খোমেনী,

ক্রেমলিনে শ্বেত প্রাসাদে কাঁপন এলো ঐ যে শুনি।

জাগল আজি দেখ ইরানে ইমাম মেহদীর বীর সেনারা,

ঝড়ের বেগে যায় এগিয়ে নিপাত যাবে দাজ্জালেরা।

রুশ-আমেরিকা ধ্বংস হউক নিপাত যাক ইসরাঈল,

মজলুম যারা, হোক মুক্ত, হাঁকে আজাদ সিংহদিল।

মোরা মুসলিম, মসজিদে আকসায় পড়ব নামাজ বিজয় বেশে,

দলিয়া মথিয়া ইসরাঈল নাপাক যেতে হবে সেই তীর্থ দেশে।

হবে আফগান মুক্ত মুসলিম হাঁকিতে আজান কণ্ঠ মেলে,

হবে খান খান রুশ-ক্রেমলিন বুখারার যাবে দুয়ার খুলে।

জাগে লেবানন ত্যাগী মুসলিম হানে আঘাত ইহুদী বক্ষে,

শহীদের লহুতে জাগে লাখ গাজী, আল্লাহ আছেন শহীদ পক্ষে।

ফিলিস্তিন ফের হবে মুক্ত, ইসরাঈল সে যাবে নিপাত,

মার্কিন তিলিষ্মা হবে নিঃশেষ হয়ে বীরের বুলেট পাত।

জাগো মুসলিম, ধরো অস্ত্র, পরো রণসাজ, যাও এগিয়ে,

দেখো দুশমন শংকায় তোর কাঁপে ঘনঘন যায় পালিয়ে।

তুমি বীর উন্নত তব শির, আল্লাহর আশীস তোমার পরে,

দেখো ঊর্ধ্বে ফেরেশতা গগনে সাজে রণসাজ তোমার তরে।

এক আল্লাহর সৈনিক তুমি, তোমার বক্ষে পাক কুরআন,

মুখে কলেমা হাতে অস্ত্র, তোমার রক্তে মিশা ঈমান।

বাতিলের যত ঝড়ের মোচড় আছড়ে পড়বে তোমার পায়ে,

বাজায় ডংকা মুক্তি আজান মজলুমেরা ঐ তোমায় পেয়ে।

ওহে মুসলিম ওহে রণবীর ওহুদ বদর তবুকের বীর,

আজি কারবালা খুঁজিছে তোমায়, ডাকে কলকলে ফোরাতের তীর।

(রচনাকাল : ১৯৮৪,  পুনর্মুদ্রিত)

(নিউজলেটার, সেপ্টেম্বর ১৯৯১)

ইসলামী ঐক্য ও ইমাম খোমেইনী

ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব এই যে, তিনি মুসলমানদের ঐক্য সাধনে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছেন। মুসলমানদের মাঝে সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদের গড়া বিভেদপ্রাচীর চুরমার করে তিনি আরব-অনারব, শিয়া-সুন্নি ইত্যাদি নামে বিভক্ত মুসলিম জাতিকে ঐক্যের দিশা দিয়েছেন। ইসলাম ও মানবতার স্বার্থে ইমাম সর্বদাই বিতর্কিত বিষয়কে পরিহার করতেন। তাই তাঁর বাণীতে শোনা যেত, শুধু মুসলমানদেরকেই নয়, বরং প্রতিটি আল্লাহ-বিশ্বাসী মানুষকে শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান। মুসলমানদের সাধারণ স্বার্থে সকলকে উজ্জীবিত করা এবং অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক করা- এটাই ছিল ইমাম খোমেইনীর জীবনের বৈশিষ্ট্য।

এ দৃষ্টিতে ইমামের নিম্নোক্ত বাণীগুলো অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য : ‘…আমি সবাইকে বলছি : একটা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো, সুন্নি-শিয়া, আরব-অনারব, তুর্কি-অতুর্কি কেউ কারো ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে শুধু ন্যায়পরায়ণতা ও খোদাভীতির (তাকওয়া) কারণে। খোদাভীরু ও সৎ স্বভাবসম্পন্ন লোকেরা রাষ্ট্রে ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত থাকলে সকল সুবিধাবাদ ও কায়েমী স্বার্থ নির্মূল হতে বাধ্য। কেউ কারো চেয়ে বড় নয়। সবাইকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে। ইসলাম তাদেরকে সম্মান দিয়েছে। ইসলাম সকল শ্রেণি ও গোত্রকে মর্যাদা দিয়েছে। কুর্দিসহ অন্যান্য ভাষাভাষী সকলেই আমাদের ভাই। আমরা তাদের সাথে আছি এবং তারাও আমাদের সাথে রয়েছে। আমরা সকলে একই ঈমানের সূত্রে বাঁধা একজাতি।’ (ইরানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত বাণী : ৩-৪-৭৯ ইং)

মুসলমানদের এক সম্প্রদায় শিয়া এবং অপর এক সম্প্রদায় সুন্নি নামে পরিচিত। এছাড়া হানাফী, হাম্বলী ইত্যাদি নামেও মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায় দেখা যায়। গোড়া থেকেই এভাবে মুসলমানদের বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত করা ঠিক হয়নি। যে জাতির (উম্মাহ) প্রতিটি মানুষই ইসলামের খেদমত করতে চায় এবং সকলেই যেখানে ইসলামের অনুসারী, সেক্ষেত্রে মুসলিম জাতিকে বিভক্ত করার কোন পরিকল্পনাই গ্রহণ করা উচিত নয়। আমরা সকলে ভাই ভাই এবং সবাই মিলে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি। এটা ঠিক যে, আপনাদের আলেম সমাজ কোন কোন বিষয়ে ফতোয়া দিয়েছেন, আপনারা সে ফতোয়া জেনে নিয়েছেন এবং হানাফী (ইমাম আবু হানিফার অনুসারী) হয়েছেন। অন্যেরা ইমাম শাফেয়ীকে মেনে চলেছেন, আবার কেউ কেউ হযরত ইমাম জাফর আস-সাদিকের ফিকাহ অনুসরণ করে শিয়া মতাবলম্বী হয়েছেন। এসব কিছু আসলে কোন বিরোধের প্রমাণ নয়। আমাদের অবশ্যই একে অপরের সাথে কোন বিরোধ বা বৈপরীত্য থাকা উচিত নয়। আমরা প্রত্যেকেই একে অপরের ভাই। শিয়া ও সুন্নি মুসলিম ভাইদেরকে অবশ্যই পারস্পরিক বিরোধিতা ও মতদ্বৈধতা পরিহার করতে হবে। শুধু শিয়া মতবাদের অবিশ্বাসীদের সাথেই নয়; বরং যারা হানাফী মাযহাব বা অন্য কোন মাযহাব মানতে অস্বীকার করে, এমন ধরনের সকল লোকের সাথেই বর্তমানে আমাদের মতবিরোধ রয়েছে। এসব লোক এপথেও চলতে চায় না বা অন্য কোন পথে যেতেও রাজি নয়। তারা আমাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করতে চায়। আমাদের অবশ্যই হুঁশিয়ার থাকতে হবে। কারণ, আমরা সবাই মুসলমান, আল-কুরআনের অনুসারী, তাওহীদের অনুসারী। পবিত্র কুরআন ও তাওহীদের জন্য আমাদের অবশ্যই কাজ করে যেতে হবে এবং সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে।’ (কুর্দিস্তানের নওশাদ থেকে আগত একটি মুসলিম প্রতিনিধিদলের প্রতি)।

ঐক্য হচ্ছে এমন একটি আদর্শ যার দিকে পবিত্র কুরআন মানুষকে নির্দেশনা দিয়েছে এবং মহান ইমামগণও মুসলিমদের ঐক্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মূলত ইসলামের প্রতি আহ্বান মানেই হচ্ছে ঐক্যের প্রতি আহ্বান, জনগণকে ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান। আপনারা জানেন যে, তারা (ইসলামের দুশমনরা) এ ধরনের ঐক্যকে বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোতে তারা কঠোরভাবে চেষ্টা করেছে যাতে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিরোধের আগুন প্রজ্বলিত হয়, কেননা, তাদের বিশেষজ্ঞগণ বুঝতে পেরেছে যে, যদি বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ সংহত ও ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তাহলে কোন শক্তিই তাদের মোকাবিলা করতে ও তাদের ওপর শাসন চালাতে সক্ষম হবে না। তাই তাদের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য তাদের সামনে একমাত্র বিকল্প হচ্ছে বিভিন্ন ইসলামী দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে অনৈক্যের বীজ বপন করা।’ (গিলান প্রদেশ ও রাস্ত শহরের জুমআর ইমামদের উদ্দেশে প্রেরিত বাণী থেকে)

‘…ইসলাম আসার উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্ত জাতি- তা আরব হোক, তুর্কি, ইরানী বা যা-ই হোক না কেন, সবাইকে নিয়ে দুনিয়ার এক মহান সম্প্রদায় গড়ে তোলা যার নাম মুসলিম উম্মাহ। তাদের সংখ্যা-শক্তির কারণে ইসলামী কেন্দ্র ও সরকারসমূহ এবং মুসলিম দেশসমূহে তাদের সেবাদাসরা মুসলিম জনগণকে বিভক্ত করার ও তাদের প্রতি মহান আল্লাহর নির্দেশিত ভ্রাতৃত্বকে বিনষ্ট করার পরিকল্পনা করে আসছে। এ সমস্ত পরিকল্পনার লক্ষ্য হচ্ছে তুর্কি জাতি, কুর্দি জাতি, আরব জাতি ও ইরানী জাতি প্রতিষ্ঠার ছদ্মাবরণে প্রকৃতপক্ষে মুসলিম জাতিকে বিভক্ত করা। তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের বিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যা মূলত ইসলাম ও মহান গ্রন্থ কুরআন নির্দেশিত পথের সম্পূর্ণ বিপরীত। সমস্ত মুসলমানই ভাই ভাই ও সমান এবং কেউই একে অন্য থেকে পৃথক নয়। সমস্ত মুসলমানকেই ইসলাম ও তাওহীদের পতাকাতলে সংঘবদ্ধ হতে হবে।’ (খুজিস্তান প্রদেশের আরব গোত্রপ্রধানদের উদ্দেশে বাণী)

‘…ইসলামের অভ্যুদয়ের পর থেকেই মুসলিম পণ্ডিত ও চিন্তাবিদগণ মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালিয়ে আসছেন যাতে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। একজন মুসলমান তিনি যেখানেই বসবাস করুন না কেন, তাঁর উচিত অন্য মুসলমানদের সাথে পারস্পরিক সমঝোতা বৃদ্ধি করা। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ মানুষকে সেই পথে ধাবিত হতে নির্দেশ দিয়েছেন। মহানবী (সা.) এবং ইমামগণ (আ.)ও এ ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এসব নির্দেশ ও উপদেশের প্রেক্ষিতে সচেতন আলেমগণ মুসলমানদেরকে তাওহীদ ও ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।’ (পাকিস্তানী অভ্যাগতদের উদ্দেশে প্রদত্ত বক্তব্য থেকে, ৭-১১-৮১ ইং)

‘…প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিশ্বশোষকদের জন্য প্রধান ভীতির কারণ হচ্ছে ইসলাম। কেননা, ইসলামই হচ্ছে এমন শক্তি যা দুনিয়ার মুসলমানদেরকে তাওহীদের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম। ইসলামই পারে মুসলিম দেশসমূহ ও দুনিয়ার বঞ্চিত মানুষের ওপর থেকে বিশ্বঅপরাধীদের হস্তকে ধ্বংস করতে। ইসলামই পারে বর্তমান পৃথিবীর সামনে এক ঐশী প্রগতিশীল ও উচ্চতর চিন্তাধারা  ও ব্যবস্থা উপস্থাপন করতে।’ (হজযাত্রীদের প্রতি প্রদত্ত বাণী, ৬-৯-৮১)

‘…আমাদের বিরোধীরা মযলুম জনগণের মধ্যে, ইসলামী বা অনৈসলামী দেশ যাই হোক না কেন, অনৈক্যের বীজ ছড়ানোর চেষ্টা করছে এবং তারা চায় মুসলিম জাতিসমূহকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে। এজন্যই তাদের মুসলিম নামধারী মুখপাত্ররা, যারা প্রকৃতপক্ষে ইহুদিবাদের সঙ্গে গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ তারা চেষ্টা চালাচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করতে। এসব হচ্ছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও কৌশল, যা পরাশক্তিবর্গ উদ্ভাবন করছে যাতে মুসলিম দেশগুলোতে তাদের সেবাদাসরা তা প্রয়োগ করতে পারে।’ (দেশ গড়ার অভিযানের সদস্যগণের উদ্দেশে প্রদত্ত বাণী)

‘… মুসলমানদের মধ্যে যেসব বিরোধ ও জটিলতা রয়েছে সেগুলোরে উৎস সম্পর্কে আমরা স্বীকার করি যে, এসব ব্যাপারে গোপন হাত রয়েছে। শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে কাফের ও মুশরিকদের মোকাবিলায় যে পরিমাণ ঐক্য থাকা প্রয়োজন তা নেই। এ সমস্ত হাত এখনও সক্রিয় রয়েছে। কেননা, এখনও অনেক বিরোধ পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ ও অন্যান্য অঞ্চলে বিরাজমান। একথা স্পষ্ট যে, এসব বিরোধও মুসলমানদের দুর্বল করছে এবং আধিপত্যবাদীদেরকে শক্তিশালী করছে। আমরা আশা করি, তাঁরা (ঐ সমস্ত দেশের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ) তাঁদের নিজ নিজ দেশে ও পার্শ্ববতী সরকারগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ দূর করার জন্য কঠোর প্রচেষ্টা চালাবেন যাতে মুসলমানরা কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।

বিশ্বজোড়া যালেম সম্প্রদায় চায় ইসলামকে ধ্বংস করতে যাতে আমাদের ইসলামী গুণাবলি বিনষ্ট হয়ে যায়। এখন আমাদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করা উচিত নয়, যেখানে মুসলমানদেরকে কাফের, মুশরিক ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হচ্ছে। যদি একশকোটি মুসলমান তাদের বিরাট এলাকাসহ রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয় এবং একই ফ্রণ্টে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে উপনিবেশবাদীর পক্ষেও নিশ্চিতভাবে কোন মুসলিম দেশ আক্রমণ করা সম্ভব নয়।’ (বাংলাদেশী কয়েকজন মুসলিম নেতার উদ্দেশে বাণী, ১-৯-৮২ ইং)

ইসলামী দেশসমূহে যেসব নাপাক লোকজন শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে, তারা শিয়াও নয়, সুন্নিও নয়; বরং তারা হলো সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল, যারা ইসলামী দেশসমূহকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়।

(নিউজলেটার, সেপ্টেম্বর ১৯৯১)

হযরত আলী (আ.)-এর বাণী- নাহজুল বালাগা থেকে

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : ‘দুনিয়াতে দু’ধরনের কার্য স¤পাদনকারী মানুষ রয়েছে : এক শ্রেণির মানুষ দুনিয়া হাসিল করার জন্য দুনিয়াতে কাজ করে। তাদেরকে দুনিয়ার ভাবনা আখিরাতের বিষয়ে গাফেল করে ফেলেছে। এরা পরবর্তী সন্তান-সন্ততির দরিদ্র হওয়ার ব্যাপারে শঙ্কাগ্রস্ত। নিজের ক্ষতি সাধন করে এরা পরবর্তীগণকে নিরাপদ করে। ফলে এরা অন্যের স্বার্থে নিজের জীবন নিঃশেষ করে দেয়। আর অন্য এক প্রকার কার্য সম্পাদনকারী দুনিয়াতে থেকে পরকালের জন্য কাজ করে। এদের নিকট কর্ম প্রেরণা ছাড়াই দুনিয়ার যেটুকু এদের জন্য নির্ধারিত তা পৌঁছে যায়। ফলে এরা এক সঙ্গে দুটি হিস্যা পেয়ে যায়। আর ইহ ও পরকালের মালিক হয়ে যায়। এরা আল্লাহ তাআলার নিকট সম্মান পায়। এরা আল্লাহর নিকট যে কোন প্রয়োজনের জন্য কিছু চাইলে তিনি তা অবশ্যই পূরণ করে দেন।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৬১

এরূপ বর্ণিত আছে যে, হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে কাবা গৃহে সঞ্চিত মালামাল (অলংকারাদি) অধিক হয়েছে বলে তাঁর নিকট আলোচনা করা হয়। কিছুসংখ্যক  লোক হযরত উমরকে বলে : ‘এ মালামাল নিয়ে যদি আপনি মুসলমানদের সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন তাহলে অধিক পুণ্যের কাজ হবে। অলংকার দিয়ে কাবা ঘর কি করবে?’ তখন হযরত উমর তা-ই করতে ইচ্ছা করেন। আর এ ব্যাপারে হযরত আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.)-কে তিনি জিজ্ঞাসা করেন। আমীরুল মুমিনীন তাঁকে বলেন : ‘নবী করিম (সা.)-এর প্রতি কুরআন নাযিল হওয়ার কালে চার প্রকার মাল ছিল : (১) মুসলমানদের ব্যক্তিগত মাল; তা তিনি ওয়ারিসগণের মাঝে ফারায়েযের (উত্তরাধিকার) আইন মোতাবেক বণ্টন করেছেন। (২) যুদ্ধলব্ধ মালামাল। এ মাল তিনি প্রাপকগণের মধ্যে বিতরণ করেছেন। (৩) যুদ্ধলব্ধ মালামালের পঞ্চমাংশ। আল্লাহ এ মাল যে খাতের জন্য রেখেছেন তিনি সে খাতেই তা ব্যয় করেছেন। (৪) সাদাকাত। আল্লাহ সাদাকাতকে যে খাতে রাখার ইচ্ছা করেছেন সে খাতেই রেখেছেন। তখনও কাবাগৃহে অলংকার মজুদ ছিল। আল্লাহ তাআলা এ সম্পদ যথা অবস্থায় রেখেছেন। তিনি ভুল করে এরূপ করেননি। আর আল্লাহর জন্য কোন স্থানই অজানা থাকে না। তাই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল যে অবস্থায় এই মাল রেখেছেন আপনিও তা-ই করুন।’ তখন হযরত উমর বললেন : ‘আপনার উপস্থিতি না হলে আমরা লজ্জা পেয়ে যেতাম।’ অতঃপর তিনি এই মালামাল পূর্বাবস্থায় রেখে দেন।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৬২

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : ‘যুদ্ধের এ পিচ্ছিল অবস্থানে আমার পদযুগল টিকে গেলে বহু (বিকৃত) বিষয় আমি পরিবর্তন করে ফেলব।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ২৬৬

হযরত আলী (আ.) আত্মপ্রীতির অনিষ্ট সম্পর্কে বলেছেন : ‘নিজেকে উত্তম বলে ধারণা করলে অগ্রগতি ব্যাহত হয়।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৫৮

দুনিয়া এবং দুনিয়াবাসীদের মায়ামমতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে না যাওয়ার জন্য হযরত আলী (আ.) বলেছেন : ‘পরলোক গমনের নির্দেশ অতীব নিকটে। আর বন্ধু-বান্ধবের সাহচর্য হচ্ছে ক্ষণিকের ব্যাপার।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৫৯

হযরত আলী (আ.) আরও বলেছেন : ‘চক্ষুষ্মান ব্যক্তির জন্য ঊষা আলোকময়।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৬০

(অর্থাৎ একজন চক্ষুষ্মান জ্ঞানী ব্যক্তির নিকট সত্যিকারের দীন এবং সঠিক পথ দিবালোকের মতো উজ্জ্বল এবং সে কখনো অন্ধের মতো সে ব্যাপারে সন্দিগ্ধ ও কপটাচারী হবে না)

হযরত আলী (আ.) আরো বলেছেন : ‘লোকেরা যে বিষয়ে জানে না অর্থাৎ অবগত নয়, তার প্রতি বৈরীভাব পোষণ করে থাকে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৬৩

(অর্থাৎ সাধারণত কোন জিনিস যদি লোকদের হস্তগত না হয় তাহলে তারা তা অস্বীকার করে থাকে)।

হযরত আলী (আ.) আরো বলেছেন : ‘সত্যের (হক) পরিচয় লাভের পর সে বিষয়ে আমার সন্দেহ সৃষ্টি হয়নি।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৭৫

(অর্থাৎ পবিত্র ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়সমূহ ও শাখা-প্রশাখার ক্ষেত্রে জ্ঞান লাভের পর সে বিষয়ে আমার আর কোন সংশয় সৃষ্টি হয়নি।)

(নিউজলেটার, সেপ্টেম্বর ১৯৯১)

ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর দুটি বাণী

ইমাম জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আস-সাদিক (আ.) বলেছেন : ‘যার মধ্যে পাঁচটি পর্যায় রয়েছে সে সর্বোত্তম ব্যক্তি : ভালো কিছু করে আনন্দ পাওয়া, খারাপ কিছু করলে কষ্ট পাওয়া, আল্লাহর তরফ থেকে কিছু পেয়ে কৃতজ্ঞ হওয়া, আল্লাহর পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করা এবং অন্যায় বা ভুল করে ক্ষমা প্রার্থনা করা।’

‘খাঁটি ঈমানদার উত্তেজিত হয়ে তাকাওয়ার সীমা লঙ্ঘন করে না, কারো স্বার্থে বা অনুকূলে অন্যায় কিছু করে না এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিজের প্রাপ্য অংশের বেশি নেয় না।’

(নিউজলেটার, সেপ্টেম্বর ১৯৯১)

মরহুম আয়াতুল্লাহ তালেকানী- ইরানে ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ

ইরানে ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ অনলবর্ষী বক্তা, আদর্শ প্রচারক, আপোসহীন সংগ্রামী সংগঠক, তেহরানের জুমআর জামায়াতের প্রথম ইমাম এবং ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর একজন বিশ্বস্ত সহকর্মী আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মাহমুদ তালেকানীর ১০ সেপ্টেম্বর। ১৯৭৯ সালের এই দিনে ৬৯ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেইনী বলেছিলেন : ‘জনাব তালেকানী যাপন করেছেন আলোক ও হেদায়াতপ্রাপ্ত এবং জিহাদী জিন্দেগি। তিনি এমন এক চরিত্রের অধিকারী ছিলেন যে, জেল থেকে জেলে স্থানান্তরিত হয়েছেন এবং একটির পর একটি দুর্ভোগ তাঁকে পোহাতে হয়েছে, কিন্তু কখনই নিজের দৃঢ়তার ক্ষেত্রে এতটুকু শৈথিল্য প্রদর্শন করেননি। বন্ধুরা একের পর এক হারিয়ে যাবেন আর তিনি সেটা দেখার জন্য বেঁচে থাকবেন- এমনটি তাঁর অভিপ্রায় ছিল না। ইসলামের জন্য তিনি ছিলেন এক আবু যার। তাঁর বাচনভঙ্গি ও কণ্ঠস্বরে ছিল মালিক আশতারের তরবারির তীক্ষ্ণ ধার ও আক্রমণ ক্ষমতা।’

ইসলামী বিপ্লবকে চূড়ান্ত সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার পিছনে যেসব আলেমের দুঃখ-কষ্ট, সংগ্রাম ও অবদান সবচেয়ে বেশি তাঁদের অন্যতম হলেন আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মাহমুদ তালেকানী। কোম থেকে ধর্মীয় শিক্ষা সমাপ্ত করে ইজতিহাদী যোগ্যতা অর্জন করার পর তালেকানী তেহরানে তৎপরতা শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নির্দেশেই পাহলভী শাসকগোষ্ঠী দেশের যুবক ও বুদ্ধিজীবীদের কুরআনের শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে প্রায় সফল হয়েছিল। আয়াতুল্লাহ তালেকানী যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন যে, কুরআন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিতদের মধ্যে দূরত্ব কমাতে হবে।

১৯৪১ সালে তিনি তেহরানে কানুন-ই-ইসলাম নামে একটি ইসলামী কেন্দ্র স্থাপন করেন। জনগণকে জ্ঞান দানের জন্য নিয়মিত সেখানে বক্তৃতা দানের ব্যবস্থা ছিল। কেন্দ্রটির পক্ষ থেকে ‘দানেশে ইমরুজ’ নামে একটি ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হতো। পরে যখন তালেকানী তেহরানের হেদায়াত মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন তখন কুরআন ক্লাস আরো সম্প্রসারিত হয়।

১৯৫৩ সালে সিআইএ পরিকল্পিত সামরিক অভ্যুথানের পর হেদায়াত মসজিদ পাহলভী শাসকগোষ্ঠীর বিরোধীদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত জাতীয় মোর্চা যাঁরা গঠন করেছিলেন সেই জাতীয় নেতৃবৃন্দও তাঁদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। শাহের নির্দেশে কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেয়া হলে তালেকানী তাঁর বন্ধু ও ভক্ত ছাত্রদের গৃহে অবস্থান করেই স্বীয় সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন।

আয়াতুল্লাহ তালেকানী ১৯৫০ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত মুসলমানদের বিশেষ বৈঠকে এবং ১৯৫৭ ও ১৯৫৯ সালে অনুষ্ঠিত কুদ্স সম্মেলনে ইসলামী দুনিয়ার সামনে ঘোষণা দেন যে, ইরানের জনতা ইহুদিবাদ ও মুসলিম দেশগুলোর তাঁবেদার শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী।

১৯৬২ সালে ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর নেতৃত্বে কোম ও তেহরানে জনতার যে অভ্যুথান ঘটে, আয়াতুল্লাহ তালেকানী সেক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় শাহের গোয়েন্দা সংস্থা সাভাকের লোকেরা তাঁকে গ্রেফতার করে। পরবর্তী বছর মুক্তি পেয়ে তিনি শাহের বিশ্বাসঘাতকতা প্রসঙ্গে জনতাকে সচেতন করতে থাকেন। ১৯৬৩ সালে সাভাকের লোকেরা তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করে। আদালত তাঁকে ১০ বছরের কারাদ- দেয়। প্রহসনমূলক বিচার চলাকালে আদালত ও তাঁর বিচারের বিষয়টিকে ইসলামবিরোধী ঘোষণা দিয়ে তিনি এজলাসে কোন কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। সে ঘোষণার পর তিনি পাক কুরআনের সূরা ফাজ্র তেলাওয়াত করেন এবং আদালতের নিরাপত্তা রক্ষীদের উদ্দেশ্য বলেন : ‘যাও এবং তোমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বল যে, আমরা নই, তোমরাই ধ্বংসপ্রাপ্ত।’  মাত্র ১৬ বছর পরই তাঁর কথা বাস্তবরূপ গ্রহণ করল। তিনি যে সূরা ফাজ্র তেলাওয়াত করেছিলেন, সেটাই ইসলামের বিজয়ের এবং ‘প্রভাতের দশ দিনের’ ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হলো।

১৯৬৭ সালে পাহলভী শাসকচক্র চাপে পড়ে এক পর্যায়ে আয়াতুল্লাহ তালেকানীকে মুক্তি দেয়। ১৯৭১ সালে তিনি আবার বন্দি হন এবং কিছুকাল পরে তাঁকে দক্ষিণ ইরানে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ১৯৭৫ সালে আয়াতুল্লাহ তালেকানীকে শেষবারের মতো গ্রেফতার করা হয় এবং ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

ইসলামী বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭৮ সালে পাহলভী শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে জেলখানার দ্বার খুলে দেয়। আয়াতুল্লাহ তালেকানী অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দির সঙ্গে শাহের কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আয়াতুল্লাহ তালেকানীকে যে কোন সময়ের তুলনায় অধিকতর তৎপর দেখা গেছে এবং ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত ইসলামী বিপ্লবে তিনি তাঁর সকল সময় ব্যয় করেছেন। আয়াতুল্লাহ তালেকানীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, শাহবিরোধী সকল দলই তাঁর প্রশংসা করত। তিনি ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র। ইসলামী বিপ্লবের স্বল্পকাল পূর্বে অনুষ্ঠিত তাসুয়া (মুহররমের নবম দিন) ও আশুরায় তিনি অতুলনীয় যোগ্যতার সাথে তাঁর ভূমিকা পালন করেন।

সামরিক আইন জারি হওয়া সত্ত্বেও আয়াতুল্লাহ তালেকানী আজাদী চত্বরে পৌঁছার লক্ষ্যে শোভাযাত্রা আহ্বান করেছিলেন এবং জনগণকে সে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়ার জন্য ডাক দেন। সে আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ সাড়া দেয় এবং সকাল বেলায়ই তাঁর ছোট বাড়ির সম্মুখস্থ রাজপথ লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। সেদিন ছিল ৯ মুহররম, তাসুয়া। পূর্ব ঘোষিত সময় অনুযায়ী তিনি জনতার সামনে হাজির হলেন। এ ঘটনার মধ্যেই তাঁর সে অভূতপূর্ব কৃতিত্বের পরিচয় মিলে।

ইরানী জাতি তাঁকে স্মরণ করবে এজন্য যে, তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি দশ লক্ষাধিক লোকের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সেদিন ইরানী জনতার এতদিনের গোপনে ও সাবধানে বলা কথাগুলো ব্যক্ত করেছেন এবং সোচ্চার কণ্ঠ হয়েছেন।

‘বল, শাহ ধ্বংস হোক’- এ কথাটি তালেকানী সেদিন বার বার সোচ্চার কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন। কিছুক্ষণ পরপরই বুলন্দ আওয়াজ তুলে তিনি বলেছেন : ‘বল, শাহ ধ্বংস হোক।’

আয়াতুল্লাহ তালেকানী শাহ ও তার মার্কিনী প্রভুদের বিরুদ্ধে ৪০টি বছর দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রাম চালিয়েছেন। সেদিন ‘শাহ ধ্বংস হোক’ বুলন্দ আওয়াজ তোলার পর সে স্লোগান অধিকতর বুলন্দ আওয়াজে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে শুনে অবশ্যই তিনি আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকবেন। পরবর্তী পর্যায়ে অবশ্য এটি ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ যথার্থ এ স্লোগানে রূপান্তরিত হয়।

(নিউজলেটার, সেপ্টেম্বর ১৯৯১)

শহীদ রাজাই- ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল

৩০ আগস্ট হচ্ছে ইরানের শহীদ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ আলী রাজাই এর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টদের চক্রান্তে প্রেসিডেণ্ট ভবনে এক বোমা বিস্ফোরণে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

বিভিন্ন গুণের অধিকারী প্রেসিডেণ্ট রাজাই পার্থিব এবং শয়তানি লোভলালসা থেকে নিজেকে মুক্ত করে তাঁর ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর মধ্যে ছিল আধ্যাত্মিকতা, বিনয়, আন্তরিকতা এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসা। তিনি জনগণের মধ্য থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃশ্যপটে এসেছিলেন। ধৈর্য, সহনশীলতা, অধ্যাবসায়, নিরলস প্রচেষ্টা, দৃঢ় সংকল্প এবং মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের কারণে তিনি ফুটপাতের সাধারণ ফেরিওয়ালা থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেণ্ট নির্বাচিত হতে পেরেছিলেন। তিনি বহু কষ্ট, সমস্যা এবং বাধার মোকাবিলা করেছেন। তিনি কখনো কোন প্রতিবন্ধকতার মুখে থেমে পড়েননি।

ইসলামের এই মহান সৈনিক শহীদ রাজাই ১৯৩৩ সালে কাজভিনের এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বয়স যখন মাত্র ৪ বছর তখন তিনি পিতৃহারা হন। তাঁর মা অনেক কষ্টে তাঁকে লালন-পালন করেন। প্রথমে তিনি বাড়ির নিকটবর্তী একটি স্কুলে ভর্তি হন এবং ইলিমেণ্টারি গ্রেড পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। পরে তাঁর চাচার দোকানে চাকরি নেন এবং এক বছর পর তেহরান চলে যান। সেখানে তিনি একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে ফেরিওয়ালার চাকরি নেন। তিনি সেই দোকানের জিনিসপত্র ফেরি করে বিক্রি করতেন। 

এক সময়ে তিনি বিমান বাহিনীতে ভর্তি হন। বিমান বাহিনীতে প্রবেশের কয়েকমাস পরই তিনি ফেদাইনে ইসলামের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরে এতে যোগ দেন এবং এর গোপন বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। বাজারে কাজ করার সময় রাজাই নৈশকালীন ইসলামী শিক্ষা ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর শিক্ষক ছিলেন শহীদ আমানী। বিমান বাহিনীতে থাকাকালেও তিনি প্রচুর পড়াশুনা করতেন। ১৯৫৫ সালে বিশেষ কারণে তিনি বিমান বাহিনী থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে তিনি তেহরানের টিচার্স ট্রেনিং কলেজে পরীক্ষা দেন এবং পাস করেন। বিমান বাহিনীতে যোগদান করার সময় মোহাম্মাদ আলী রাজাই আয়াতুল্লাহ তালেকানীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং প্রতি বৃহস্পতিবার হেদায়াত মসজিদে সমবেত হতেন এবং প্রতি শুক্রবার তালেকানীর খানে আবাদে বেকার হাউসে একটি প্রশিক্ষণ বৈঠকে বসতেন। যেখানেই মরহুম তালেকানীর কোন ট্রেনিং অধিবেশন থাকত সেখানেই তিনি অংশ নিতেন এবং তা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতেন। তাঁর কথায় উদ্বুদ্ধ হয়েই তিনি শিক্ষকতা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।

এক সময় তিনি পরিসংখ্যান বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রি ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে রাজাইকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। কিছুদিন পর তিনি মুক্তি পান। তিনি কামাল হাইস্কুলে ৫ বছর শিক্ষকতা করার পর তেহরানের পাহলভী হাই স্কুলে বদলি হন। ১৯৭৪ সালে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেন।

১৯৬৭ সালে জনাব রাজাই জালালউদ্দিন ফারসি ও জাভেদ বাহোনারসহ কতিপয় বন্ধুর সঙ্গে মিলিত হয়ে সংযুক্ত গ্রুপনামে একটি দল গঠন করেন। সংযুক্ত গ্রুপের প্রধানদের সমন¦য়ে জুমা নামাযের সদর দফতর গঠন করা হয়। জনাব রাজাই শফিক, জাভেদ বাহোনার এবং তাঁর কতিপয় বন্ধুসহ ইসলামী কল্যাণ এবং পারস্পরিক সাহায্য ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থার দায়িত্বশীল ছিলেন। জনাব রাজাই ১৯৬২ সালে বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন ধর্মের ওপর দৃঢ় আস্থাশীল মহিলা।

তিনি রাফাহ স্কুলে এক বছর কাজ করার পর বিদেশে গিয়ে জামালউদ্দিন ফারসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং এক মাস পর ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ইরান প্রত্যাবর্তন করেন। ইরানে পৌঁছে তিনি দেখতে পেলেন রাফাহ স্কুলের সকল পুরুষ শিক্ষক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন।

১৯৭৪ সালে ড. আয়াতুল্লাহ বেহেশতীর একটি গোপন ট্রেনিং অধিবেশন থেকে ফেরার পথে সাভাকের এজেন্টরা জনাব রাজাইকে গ্রেফতার করে ও কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে তাঁর ওপর চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। একটানা ১৪ মাস তাঁর ওপর এভাবে নির্যাতন চালানোর পর বিচারের জন্য তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। বিচারে তাঁর ৫ বছরের কারাদ- হয়। বিচারের পর কাউকে নির্যাতন করার নিয়ম না থাকলেও সাভাকের এজেন্টরা রাজাইয়ের মুখ থেকে কথা বের করার জন্য অমানুষিক নির্যাতন চালায়।

মুক্তি পাওয়ার পর তিনি টিচার্স ইসলামিক এসোসিয়েশনে যোগদান করেন। বিপ্লবের সময় বিপ্লবের কেন্দ্র রাফাহ স্কুলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। বিপ্লবের সাফল্যের পর তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। এক পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীও নির্বাচিন হন।

প্রেসিডেণ্ট পদ থেকে বনি সদরকে বহিস্কারের পর জনাব রাজাই ৩ সদস্যের প্রেসিডেন্সিয়াল পরিষদের সদস্য হন। ১৯৮১ সালের ২রা আগস্ট তিনি ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি ভোট পেয়ে ইরানের দ্বিতীয় প্রেসিডেণ্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। পূর্ববর্তী প্রেসিডেণ্ট সম্পর্কে জনগণের দুঃখজনক অভিজ্ঞতা ছিল। এজন্য তারা এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট বানাল যিনি তাদের মধ্য থেকে এসেছেন, আমেরিকা ও শাহ কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে অন্ধকার সেলে কারাজীবন কাটিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টরা জনাব রাজাইকে বরদাশত করতে পারেনি। তাই প্রেসিডেণ্ট হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার অল্প কিছুদিন পর ১৯৮১ সালের ৩০ আগস্ট প্রেসিডেণ্ট ভবনে এক বোমা বিস্ফোরণের ফলে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

শহীদ রাজাই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

(নিউজলেটার, আগস্ট ১৯৯১)

নাসিবাহ বিনতে কাব- ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় মহিলা

ইসলামের ইতিহাসের একজন প্রখ্যাত মহিলা নাসিবা বিনতে কাবের দুঃসাহসিকতা ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের উদ্দীপ্ত ও মুগ্ধ করত। তারা একসঙ্গে বসে নাসিবাকে ওহুদের যুদ্ধে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পাশে থেকে তিনি কিভাবে যুদ্ধ করেছেন তা বর্ণনা করার জন্য অনুরোধ করত।

ওহুদের যুদ্ধের কিছু সময় পূর্বে মুসলমানরা প্রথম নাসিবার নাম শুনতে পায়। ইসলাম প্রচার হওয়া সত্ত্বেও তখনো পর্যন্ত অধিকাংশ মহিলা আইয়ামে জাহেলিয়াতের আচার-আচরণের নিগড়ে বন্দি ছিল। ঐ সময় মহিলাদের অস্থাবর সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করা হতো এবং তারা নিজেরাও এর বেশি ভাবত না। ঠিক ঐ সময়ে ওহুদের যুদ্ধে অংশ নেয়ার ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর কাছে একদল মানুষের নেএী হিসাবে ওয়াদাবদ্ধ হতে দেখা গেল একজন মহিলাকে। সত্যিই এটা আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর ব্যাপার। সেই মহিলার নাম নাসিবা। তিনি স্বামী, দুই পুত্র ও আরো কিছুসংখ্যক লোককে নিয়ে মহানবী (সা.)-এর কাছে এলেন এবং তাঁর প্রতি অনুগত্য ঘোষণা করলেন ও যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। দলের মুখপাত্র হিসাবে নাসিবা মহানবী (সা.)-এর কাছে কিছু বললেন এবং তাঁকে দোয়া করার অনুরোধ করলেন যাতে বেহেশতে আল্লাহর রাসূলের পাশে তাঁদের স্থান হয়। একথা শোনার পর মহানবী (সা.) হাত তুললেন এবং তাঁদের বাসনা যাতে পূর্ণ হয় সেজন্য দোয়া করলেন।

ওহুদের ময়দানে যুদ্ধ শুরু হলো। নাসিবা কাঁধে তুলে নিলেন পানিভর্তি চামড়ার একটি বড় ব্যাগ। যুদ্ধের ময়দানে ঘুরে ঘুরে তিনি পিপাসার্ত সৈনিকদের পানি পান করাতে থাকলেন নিরলসভাবে। দুই পক্ষের তুমুল যুদ্ধের মধ্যে তিনি আহতদের পাশে গিয়ে হাজির হলেন অকুতোভয়ে এবং সেবা করতে থাকলেন অবিশ্রান্তভাবে। জিহাদের ময়দানে মুসলমানরা লড়াই করতে থাকলেন সাহসিকতার সঙ্গে। তাঁরা প্রথমদিকে বিজয় লাভও করলেন। কিন্তু আইনান পাহাড়ে মোতায়েন একদল মুসলমানের অবহেলা ও ভুলের কারণে তাঁদের সেই বিজয় ধুলায় লুণ্ঠিত হলো। পাহাড় অরক্ষিত রেখে মুসলমানের দলটি ময়দানে চলে এলো। এতে শত্রুরা পিছন দিয়ে পাল্টা হামলা চালানোর সুযোগ পেল। দুই দিক থেকে আক্রমণের শিকার হয়ে মুসলিম বাহিনী দিশাহারা হয়ে পড়ল। এসময় গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) নিহত হয়েছেন। এতে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটল। এসময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি ও যুদ্ধক্ষেত্রের বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখে নাসিবা একটি তারবারি হাতে তুলে নিলেন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করতে থাকেন এবং শত্রুবাহিনীর ওপর কয়েক দফা প্রচ- আঘাত হানেন। তিনি মুসলিম বাহিনীর অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হন। এক পর্যায়ে নাসিবা মারাত্মকভাবে আহন হন। তিনি কাঁধে আঘাত পান। তাঁর জখমের স্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে দেখে মহানবী (সা.) নাসিবার এক পুত্রকে ডাকলেন এবং তার মায়ের জখম স্থানে ব্যান্ডেজ করতে বললেন। ইতিমধ্যে তাঁর অপর পুত্রও শত্রুবাহিনীর হাতে আহত হয়। নিজের আহত স্থানের প্রচ- ব্যথা নিয়েও তিনি তাঁর ছেলের জখম স্থানে দ্রুত ব্যান্ডেজ করে দেন এবং তাকে পুনরায় যুদ্ধ করতে পাঠান। মহানবী (সা.) নাসিবার পুত্রের ওপর হামলাকারী শত্রুসৈন্যকে চিহ্নিত করলেন এবং নাসিবা তার ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ও মরণ আঘাত হানলেন।

যুদ্ধ শেষ হলে মহানবী (সা.) নাসিবার অবস্থা সম্পর্কে খবর নেয়ার জন্য এক ব্যক্তিকে তাঁর আবাসস্থলে পাঠান। তিনি নাসিবা সম্পর্কে এতই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, নাসিবা বেঁচে আছেন এ খবর শুনেই তিনি খুশি হন। তবে নাসিবার জখম এতই গুরুতর ছিল যে, পরিপূণ সুস্থ হয়ে উঠতে একটি বছর লেগে যায়।

একজন গৃহবধূ ও দুই সন্তানের জননী নাসিবা বিনতে কাব অসীম সাহস ও দৃঢ় বিশ্বাসের জন্য সকলের কাছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন মুসলিম নারীর সত্যিকার কাজ হচ্ছে আরব সংস্কৃতিতে প্রচলিত ভ্রান্ত বিশ্বাসকে নির্মূল করতে সাহায্য করা।

(নিউজলেটার, আগস্ট ১৯৯১)