All posts by dreamboy

১৯৯৩ সালের প্রেক্ষাপটে ইসলামী বিপ্লব ও সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান

ন্যায় ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা মানুষের চিরন্তন। একই সাথে মানবজীবনে অন্যায়, অশান্তি, অন্যায্য ও বিপর্যয়ের কারণও মানুষ নিজেই। মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাও প্রয়াশই যাবতীয় অশান্তি ও বিপর্যয়ের মূল কারণ। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাষ্ট্র কিংবা জাতি ইত্যাকার বিভিন্ন নামে একদল মানুষ বরাবরই এ প্রয়াস চালিয়েছে এবং প্রভুত্ব অব্যাহত রেখেছে।

আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন আল-ইসলাম। তাই মানবজীবনের এই মূল রোগেরই চিকিৎসা করেছে সর্বাগ্রে। মানুষের কাঁধের ওপর থেকে আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছুর আধিপত্য-কর্তৃত্ব সরিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ব্যক্তি জীবনে এ ঘোষণার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে হয় ‘মুসলিম’ এবং সামষ্টিক জীবনে এ ঘোষণাকে কার্যকরী ও বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়েই কোনো সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে সম্পন্ন হয় ইসলামী বিপ্লব। ইসলামী বিপ্লবের অন্তর্নিহিত চেতনা ও প্রেরণা তাই স্বাধীনতা- পূর্ণ স্বাধীনতা। মানুষের দাসত্বের নিগ্রহ থেকে মানবাত্মার মুক্তি ও স্বাধীনতা।

শয়তান ও তাগুতী শক্তির কাছে ইসলাম ও ইসলামী বিপ্লব তাই অসহ্য। নবীদের বেলায় এটি যেমন সত্য ছিল এবং যেমন সত্য ছিল শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবনে, তেমনি আজকের যুগেও। ইসলামী বিপ্লবকে যমদূতের মতোই ভয় পায় বিশ্বলুটেরা তথা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। মযলুম ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা জাতির ওপর দিয়ে দাম্ভিকতা প্রদর্শন তথা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অবসান ঘটবে- এটি কিছুতেই মেনে নিতে পারে না শয়তানি শক্তিসমূহ। ইসলামী বিপ্লবের প্রতিরোধে এরা তাই এঁটেই চলে নিত্য নতুন ফন্দি ও ষড়যন্ত্র।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে নব প্রতিষ্ঠিত এ রাষ্ট্রটিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র একের পর এক মোকাবিলা করেই পথ চলতে হয়েছে। বস্তুত ইরানে আজ অবধি ইসলামী বিপ্লবের স্থায়িত্ব ও তার অব্যাহত অগ্রযাত্রার ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অযুত ষড়যন্ত্র মোকাবিলারই ইতিহাস। এ বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন্য বিশ্বলুটেরা ও ক্ষমতাদর্পী শক্তিসমূহ তাদের পক্ষে অবলম্বন করার মতো কোনো উপায়ই বাকি রাখেনি। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের সকল হিসাব-নিকাশ ভুল প্রমাণ করে ইসলামী বিপ্লব আজো টিকে আছে এবং বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মধ্যে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কেন এবং কিভাবে তাদের মরণ সংবাদ প্রত্যক্ষ করে এবং এ বিপ্লবের বিরুদ্ধে তারা এ পর্যন্ত কি ধরনের ষড়যন্ত্র করেছে এবং এখনও ষড়যন্ত্রের জাল বুনেই চলছে, এ প্রবন্ধে এ সম্পর্কেই সামান্য আলোকপাত করা হয়েছে।

ইসলামী বিপ্লব ও নয়া বিশ্ব মানদণ্ড

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল ষড়যন্ত্রের মূল কারণ এ বিপ্লবের বিশিষ্ট চরিত্র ও অনন্য বৈশিষ্ট্য। অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক সকল দিক থেকেই এর বৈশিষ্ট্য সুপ্রমাণিত। ব্যতিক্রমী কায়দায় এ বিপ্লব জন্মলাভ করে, ব্যতিক্রমী এর নেতৃত্ব এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং জন্মলগ্ন থেকেই এ বিপ্লব সর্ববৃহৎ পরাশক্তি থেকে শুরু করে বিশ্বের ছোট-বড়, ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক সকল দাম্ভিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। ঐশী আদর্শে পুষ্ট ও সুশোভিত এ বিপ্লবের চরিত্র চিত্রণ করতে গিয়ে তাই প্রথমে পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রনীতিবিদ এবং সমাজ বিজ্ঞানীরা মহাসংকটে পড়ে। মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট ডি. লী তাই তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন : “The Islamic revolution appears rebellious and mysterious. Egalitarian yet not socialist or democratic, radical but seemingly traditional, xenophobic but scarcely isolationist, it does not mirror the French, the Russian or the American experience. Social scientific theories of modernization, whether Marxist or liberal-capitalist in inspiration, failed to anticipate the upheaval and have yet to explain it satisfactorily.’ (Robert D. Lee: Islamic Revolution and Authenticity) ।

যাই হোক, ইসলামী বিপ্লবের চরিত্র চিত্রণ করতে গিয়ে মার্কিন অ্যাকাডেমিক সার্কেলে মতপার্থক্য থাকলেও তাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গের একথা উপলব্ধি করতে বিলম্ব হয়নি যে, এ বিপ্লব কস্মিনকালেও তাদের অনুকূলে যাবে না। বরং এর শুরু ও বিকাশ, আহ্বান ও তৎপরতা এবং প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সবটাই বিশ্বব্যাপী মার্কিন নীতি ও পরিকল্পনার মুখোমুখি প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ও শক্তিশালী অবস্থান হারায়। বিপ্লব-পূর্ব ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বৃহত্তম ঘাঁটি হিসাবে মনে করা হতো, কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের বঞ্চিত-নিপীড়িতদের এক নম্বর শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়। বিপ্লবের নেতৃত্ব জনগণকে এ ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক করে তোলে। ফলে আমেরিকান কার্টেল ও ট্রাষ্টগুলোর জাল থেকে বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ তেল অঞ্চল বেরিয়ে গেল; মার্কিনীরা হারালো আরো বহু স্বার্থ। এখানেই শেষ নয়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অল্প দিনের মধ্যেই টের পেল যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়, অর্থাৎ পাশ্চাত্যশিক্ষিত টাই-স্যুট পরা ব্যক্তির স্থলে নিছক পাগড়ি ও আলখেল্লা পরিহিত ‘সনাতন’ ধর্মীয় মোল্লা শ্রেণির কর্তৃত্ব লাভই নয়; বরং এ বিপ্লবের রয়েছে আধ্যাত্মিক, দার্শনিক, মানবিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান; রয়েছে জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে নতুন মানদণ্ড ও উপলব্ধি। এ উপলব্ধি একজন ব্যক্তি মানুষকে ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, ভোগবাদিতা, দুনিয়াপূজারি দাম্ভিক শক্তিসমূহের পদলেহনের ও সেবাবৃত্তির পরিবর্তে তাকে দান করে জীবন সম্পর্কে উন্নততর মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি, আধ্যাত্মিকতা, পরমুখাপেক্ষাহীনতা, নির্ভীকতা, স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা। শয়তানি শক্তিকে ভয় করা কিংবা কুর্নিশ করা নয়, বরং তাকে ও তার সকল পৃষ্ঠপোষককে উৎখাত করার মন্ত্র শিখায় ইসলামী বিপ্লব। এ বিপ্লব আপোস করতে জানে না, প্রতিরোধ করতেই ভালোবাসে, কুফ্র ও কুফ্রি শক্তিকে ছাড় দিতে জানে না, জানে কেবল কুফ্রি শক্তির সাথে সরাসরি লড়াই করতে এবং জেহাদের ঝাণ্ডা সর্বক্ষণ সমুন্নত রাখতে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা, বর্তমান দুনিয়ার বিস্ময় ইমাম খোমেইনী (রহ.) শুরু থেকেই সমস্ত মুসলমান এবং বিশ্বের নির্যাতিত জনগণকে আহ্বান জানাতে থাকেন তারা যেন সাম্রাজ্যবাদের অক্টোপাশ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করার জন্য সচেষ্ট হয় এবং যেসব সরকার ও শাসকগোষ্ঠী জনগণের কষ্টার্জিত পরিশ্রমের ফসল বিশ্বলুটেরার হাতে তুলে দেয় সেসব দুষ্কৃতকারী নাপাক শাসকগোষ্ঠীকে যেন দেশ থেকে বহিষ্কার করে। তিনি বলেন : ‘ইসলামের বিধান হচ্ছে কেউ তোমার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে না, তুমিও কাউকে তোমার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে দিবে না।’ ইমাম খোমেইনী সবাইকে ইসলামের গৌরবময় পতাকাতলে সমবেত হয়ে ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে এবং ইসলামী সরকার কায়েম করে দেশে দেশে স্বাধীন সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাবার আহ্বান জানান। তারপর ‘প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য নয়- ইসলাম, কেবল ইসলাম’- এর নীতিকে ঘোষণা করেন ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসাবে। ফলত ইসলামী বিপ্লব তার এ নয়া বিশ্বমানদণ্ড নিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে পার্শ্ববতী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোসহ দুনিয়ার বিভিন্ন অংশের রাষ্ট্র ও জনপদকে। শংকিত হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদ ও তার তাঁবেদার রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ।

বস্তুত ইসলামী বিপ্লবের এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে তা হয়ে দাঁড়ায় চক্ষুশূল। ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়ার জন্য এ কারণেই শুরু হয় চক্রান্ত। বিপ্লবোত্তর দিনগুলোতে ইসলামী ইরানকে ঘরে ও বাইরে এতসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয় যে, এ বিপ্লবের অস্তিত্ব টিকে থাকা সত্যিই এক বিস্ময়কর ব্যাপার। খোদায়ী এ নেয়ামতকে স্বয়ং খোদা তাআলাই হেফাজত করেছেন। পরীক্ষা নিয়েছেন এ বিপ্লবের সংগঠকদের ও এর অনুরক্তদের। ইরানীরা সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা আর শাহাদাতের নজরানা পেশ করে টিকিয়ে রেখেছেন ইসলামী বিপ্লব নামক চারাগাছটিকে। শাহাদাতের রক্ত থেকে রস সিঞ্চন করেই বিপ্লবের এ চারাগাছটি বেড়ে উঠেছে, সুশোভিত হয়েছে। বিপ্লবোত্তর কালে ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে বিশ্বকুফ্র কী কী ষড়যন্ত্র প্লট তৈরি করে এবং কী কী ষড়যন্ত্র সে বাস্তবায়নের সুযোগ পায় এবারে সেসব নিয়ে আমরা সামান্য আলোচনায় যাব।

বিপ্লবোত্তর ইরান : প্রধান প্রধান ষড়যন্ত্র

বিপ্লবের বিজয়ের পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রথমে চেষ্টা চালায় সন্ত্রাস, অন্তর্ঘাতী তৎপরতা, প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে মদদ দান ও গুপ্তহত্যার মাধ্যমে বিপ্লবকে নিশ্চিত করা কিংবা অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য। বস্তুত বিপ্লবের বিজয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন চররা সন্ত্রাসবাদী কাজ শুরু করে। শহরের রাস্তায় রাতের আঁধারে তারা বহু বিপ্লবী রক্ষী খুন করে। তারপর বিপ্লবের প্রথম সারির নেতাদের খুন করার এক মাস্টার প্লান নিয়ে তারা একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মাত্র দু’মাস পরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম চীফ অব স্টাফ লে. জে. কারানী খুনীদের প্রথম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রখ্যাত জ্ঞানবিশারদ আয়াতুল্লাহ মোতাহহারীকে শহীদ করা হয়। শহীদ মোতাহহারী ছিলেন বিপ্লবী পরিষদের প্রধান এবং জ্ঞানরাজ্যের অনন্য দিকপাল। তাঁর হত্যাই প্রমাণ করে দেয়, ইসলামী বিপ্লবী চিন্তাধারা বিপ্লবের শত্রুদেরকে কতটা আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছিল। ড. বেহেশতী, রাজাই, বাহোনার, মোফাত্তেহ, আল্লামা তাবাতাবাঈ- এর মতো প্রত্যেক ব্যক্তিত্বই শাহাদাতপ্রাপ্ত হন কুফ্‌রি শক্তির টার্গেট হয়ে। হাশেমী রাফসানজানী ও আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর প্রাণনাশেরও চেষ্টা চলে। তাছাড়া নেতৃত্বে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা তথা উপদল সৃষ্টি, নেতৃত্ব সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টির অপপ্রয়াসও কম চলেনি। এসব চক্রান্ত রূপায়িত হয়ে তা ইসলামী বিপ্লবের জন্য শোচনীয় পরিণতি বয়ে আনতে পারত। বিপ্লবের সেবায় নিয়োজিত নেতাদের বদনাম করার মাধ্যমে নেতৃত্বে ভাঙন ধরলে তা বিপ্লবকে এতই দুর্বল করত যে, বিশ্বনিপীড়কদের ইরানে প্রত্যাবর্তনের পথ হতো প্রশস্ত। কিন্তু জনতার সচেতনতা এবং নেতৃত্বের সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়।

এখানেই শেষ নয়। ষড়যন্ত্রকারীরা বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় ষড়যন্ত্র করে, চক্রান্ত করে সরকারি দফতরগুলোতে ও সেনাবাহিনীতে। চরমপন্থী বাম সংগঠনসমূহ ও পূর্বতন শাসকগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে সংঘাত বাঁধায়। বিরোধ সৃষ্টি করে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিসত্তার ছদ্মাবরণে। জাতীয় শিল্পব্যবস্থা ভণ্ডুল করার জন্য কল-কারখানায় উসকে দেয় ধর্মঘট। কৃষি উৎপাদন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে কৃষি ক্ষেত্রে সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা। ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করে অর্থনৈতিক অবরোধ। অপপ্রচার, গুজব ও মিথ্যাচারের সয়লাব বইয়ে দেয়া হয় দুনিয়াময়। বিশ্ব থেকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যেই এসব চালিত হয়েছিল।

তারপর ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম সহায়ক স্তম্ভ ইমামের অনুসারী বিপ্লবী ছাত্রবৃন্দ যখন তেহরানের মার্কিন দূতাবাস (আসলে গোয়েন্দা আখড়া বা স্পাই সেন্টার) ঘেরাও করল, তখন সাম্রাজ্যবাদী-ইহুদিবাদী প্রচার মাধ্যমসমূহ প্রচারণা শুরু করল যে, ‘গোয়েন্দা আস্তানা’ দখলের বিপ্লবী কাজটি বেআইনি এবং তা সকল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু তারা একথার জবাব কখনই দেয়নি যে, কোনো দূতাবাসে গুপ্তচরবৃত্তি ও সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের সরঞ্জাম আইনসিদ্ধ কিনা। উল্লেখ্য, তাদের প্রচারণার মুখে ইরানকে নতজানু করতে ব্যর্থ হয়ে আমেরিকা ১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করে এবং ১৯৮০ সালের ৩০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ব্যাংকসমূহে ইরানী সম্পদ আটক করে। এসব ষড়যন্ত্রেও ইরান নতজানু না হওয়ায় আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপের পথ ধরে।

১৯৮০ সালের ২৫ এপ্রিল ৩ হাজার কমান্ডো, মোটর সাইকেল, সামরিক জীপগাড়ি, প্রচুর গ্রেনেড, কামান ও মেশিনগান নিয়ে ১৮টি পরিবহন বিমান ও ২০টি হেলিকপ্টার লুকিয়ে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং খোরাসান প্রদেশের তাবাস শহরের কাছে এক মরুভূমিতে অবতরণ করে। স্পাই সেন্টারে আটক কূটনীতিক নামধারী ক্রিমিন্যালদের উদ্ধার এবং পাহাড়াদার মুজাহিদ ছাত্রদেরকে খুন করাই ছিল এ অভিযানের উদ্দেশ্য। কিন্তু আল্লাহপাকের কী মহিমা! কী তাঁর গায়েবী সাহায্য! এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে মার্কিন ক্রুরা কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। ফলত তাদেরকে তাবাস মরুভূমিতে ৬টি হেলিকপ্টার, একটি বিমান, কয়েকটি জীপ, ৬টি মোটর সাইকেল, ৩০ হাজার ফাটানো গ্রেনেড এবং কয়েকজন অগ্নিদগ্ধ আমেরিকান কমান্ডোর লাশ ফেলে ইরান ত্যাগ করতে হয়। প্রসঙ্গত সূরা ফীলে কুরআনের ভাষ্যে অনুরূপ এক ঘটনার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ইসলাম আগমনের পূর্ব সময়ের আরবে হস্তিসজ্জিত এক বিশাল বাহিনী পবিত্র কাবা ধ্বংস করতে আসে। তারা মক্কা আক্রমণ করে। কিন্তু ঐ বাহিনীর সকলেই খুব উঁচু থেকে অসংখ্য ছোট ছোট পাখির ফেলা ক্ষুদ্র প্রস্তর খণ্ডে ধ্বংস হয়। ইরানী জাতি দেখল, আল্লাহর ইচ্ছায় তাবাস মরুভূমিতে বালুকণা বাতাসে উড়তে থাকে, এতে অন্ধ হয়ে পড়ে শত্রু ও তার হেলিকপ্টারগুলো।

একদল প্রতারিত সেনা ও পলাতক চরের সাহায্যে ইসলামী সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোই ছিল ইরানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের পরবর্তী চক্রান্ত। এ দায়িত্ব বখতিয়ারের ওপর অর্পণ করে আমেরিকা সরকার। প্রয়োজনীয় সবকিছুর সরবরাহও করা হয়। কিন্তু আল্লাহপাক ইসলামী বিপ্লবকে হেফাজত করেছেন। ইসলামী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ১৯৮০ সালের ৯ জুলাই রাতে অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগে চক্রান্ত সংশ্লিষ্ট চরদের গ্রেফতার করে। এ অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় অভ্যুত্থানের উদ্যোক্তারা তেহরান ও কোমে, বিশেষত ইমাম খোমেইনীর বাড়িতে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বোমা  বর্ষণের পরিকল্পনা করেছিল। এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মধ্যে ছিল মজলিস ও বিপ্লবী রক্ষী কেন্দ্রসমূহের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো।

এতসব কেলেংকারিজনক প্রচেষ্টা ও পরাজয়ের পর আমেরিকা ইরানে একটি উদারনৈতিক (অন্য কথায় মার্কিনীদের অনুগত) সরকার গঠনের আশা পোষণ করতে থাকে। বনি সদরকে দিয়েই তারা এ লক্ষ্য হাসিল করতে চেয়েছিল। সত্যি বলতে কি Bani Sadar Phenomenon ছিল মার্কিনী Super Conspiracy-এর একটি দৃষ্টান্ত। কত সূক্ষ্ম যে হয় মার্কিনী চাল, কত বহুমুখী তাদের কূটকৌশল- এ ঘটনা থেকেই তার প্রমাণ মেলে। দুনিয়ার দেশে দেশে তারা সরকার ও সরকারবিরোধী উভয় মহলেই লোক নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করে। প্রয়োজনমতো উপযুক্ত ব্যক্তিকে ব্যবহার করে উদ্দেশ্য হাসিল করে থাকে। কিন্তু বনি সদর, কুতুবযাদেহকে দিয়ে মার্কিনীরা যা করতে চেয়েছিল তা বেশিদূর এগুতে পারেনি। ইসলামী বিপ্লবকে বিচ্যুত করা ও ইরানের নির্বাহী ব্যবস্থার উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে ভর করে ইরানে আমেরিকা সরকারের পুনঃপ্রবেশের সকল পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তেহরানে আমেরিকান গোয়েন্দা আস্তানা থেকে উদ্ঘাটিত দলিল-দস্তাবেজ থেকে সব ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে পড়ে। বনি সদর ও তার সহযোগীদের পদচ্যুতি ঘটে। বিশ্বাসঘাতকতার উপযোগী শাস্তি তাদেরকে পেতে হয় অল্প সময়ের মধ্যেই। মুজাহেদীনে খালক-এর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা হয়, কোথাও কোথাও পূর্বাহ্নেই ফাঁস হয়ে পড়ায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

১৯৮২ সালের এপ্রিলে ইরানী সেনাবাহিনীর ইসলামী বিপ্লবী আদালত ইসলামী প্রজাতন্ত্রী ব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে পরিচালিত আরেকটি বড় ধরনের ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন করে। এ ষড়যন্ত্রের প্রধান পরিচালক ছিল সাদেক কুতুবযাদেহ। গ্রেফতারের পরে টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে কুতুবযাদেহ স্বীকার করে যে, তার সন্ত্রাসবাদী সাংগঠনিক ব্যবস্থা ইমাম খোমেইনী, সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদের সদস্যবর্গকে (প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ও সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদের সভাপতি আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী, ইসলামী মজলিস শুরার স্পীকার ও সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদে ইমামের তৎকালীন প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম হাশেমী রাফসানজানীসহ) হত্যা করার মতলব আঁটে। ইমাম খোমেইনীর বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ও জামারানে গোলাবর্ষণ করে এটা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সাম্রাজ্যবাদের ঘাপটি মেরে বসে থাকা চররা এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে ইমাম খোমেইনী ও সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদের সদস্যবর্গ ছাড়াও জামারানের দশ সহস্রাধিক লোক সে সময়ে মারা যেত। আল্লাহ পাকের অসীম রহমতে ষড়যন্ত্র পূর্বাহ্নেই ফাঁস হয়ে যায় তাদেরই লোকের মাধ্যমে।

এভাবে একের পর এক ষড়যন্ত্র ও আঘাতের ধারা অব্যাহত রাখার এক পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরাককে দিয়ে ইসলামী ইরানের ওপর একতরফাভাবে চাপিয়ে দেয় এক আকস্মিক ও সর্বাত্মক যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দাম্ভিক পরাশক্তি ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো অনেকটা প্রকাশ্যেই ইরাককে সমর্থন করে এবং অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে থাকে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এ সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। তারা ইরাকের এ হামলা বন্ধের জন্য কোনো প্রচেষ্টাই চালায়নি। ফলে হামলাকারীরা একেবারেই বাঁধাহীন থেকে গেছে। ইরাকের বিরুদ্ধে তখন কোন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়নি এবং ইরানী ভূখণ্ড ও সীমান্ত থেকে ইরাকী বাহিনীর নিঃশর্ত প্রত্যাহার দাবিও কেউ তোলেনি। উপরন্তু বিভিন্ন উপলক্ষে বিভিন্ন মহল থেকে ইরাকী আগ্রাসনের শিকার ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধেই কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এ ছিল এমন এক সময় যখন ইরানী সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। ইরানী সৈন্যরা ছিল অসংগঠিত। সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে ধর্মঘট, বিভিন্ন বিষয়ে অস্পষ্টতা, সংঘাত ও নানারকম অস্থিতিশীলতা ছিল, সামরিক শৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে সমরাস্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতি দেখা দেয়। বিদেশী সামরিক বিশেষজ্ঞদের বরখাস্ত করার পাশাপাশি বিরাজিত বিশৃঙ্খলা প্রকৃতপক্ষে সর্বক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক স্থবিরতার সৃষ্টি করে। সে সময় ইরানী বাহিনীর পক্ষে প্রকৃত অর্থে কোন প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শন করা ছিল একেবারেই অকল্পনীয় ও অপ্রত্যাশিত। কুফ্্রি শক্তির মদদপুষ্ট হয়ে সাদ্দাম হোসেন এ সময়টিকেই ইরানের ওপর হামলার জন্য বেছে নেয়।

হামলার সূচনাকালে ইরাকীরা কিছুটা সাফল্য অর্জন করলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে এ যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। ইরান ‘আত্মরক্ষার’ (Defensive) পর্যায় থেকে নিজেদেরকে সামনে নিয়ে ‘আক্রমণাত্মক’ (offensive) পর্যায়ে চলে আসে। আর তখনি শত্রুদের অশুভ উদ্দেশ্য আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ইহুদি, সোভিয়েত প্রতিক্রিয়াশীলরা সে সময় শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি জানায় এবং একই সাথে ইরানের বিরুদ্ধে ইরাককে সাহায্য জোরদার করে। এ সময় পারস্য উপসাগর দিয়ে উড়ে যাওয়াকালে ইরানী যাত্রীবাহী বিমানের ওপর হামলা করা হয়, ইরানের আবাসিক এলাকায় বোমা বর্ষণ করা হয় এবং ইরানের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। ইরাকী বাহিনী এক পর্যায়ে পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করে এবং পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে বিদেশী সৈন্যের উপস্থিতি দেখা দেয়। এক পর্যায়ে শান্তির স্বার্থেই জাতিসংঘের ৫৯৮ নং প্রস্তাব মেনে নিয়ে ইরান তাতে স্বাক্ষর করে। ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসে ইরাকী প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতা ও প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এ চিঠির প্রেক্ষিত ইরাক ও ইরানের মধ্যে বেশ কিছু পত্র বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে ইরাকী প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে ইরানের সাথে বিরোধ অবসানের কথা ঘোষণা করেন।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ইরান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের গোলামি হতে তার বিপ্লব ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লব এ কারণে আজো বিশ্বের মযলুম মানুষকে মুক্তির হাতছানি দিয়ে ডাকতে সক্ষম হচ্ছে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব নিম্নোক্ত বিষয়সমূহের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ : স্বৈরতন্ত্র, উপনিবেশবাদ ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়া; সকল বঞ্চিত ও নিপীড়িত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা, তাদেরকে আশা দান করা এবং তাদের সকলকে সংগ্রামে সমবেত করা, যুলুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সকলের দায়িত্ব হিসাবে গণ্য করা, এক্ষেত্রে নীরবতা বা নির্লিপ্ততাকে বিশ্বাসঘাতক মনোভাব হিসাবে বিবেচনা করা; জনগণের মধ্যে জিহাদের ও সংগ্রামের উদ্দীপনা সঞ্চার করা, উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিশেষ করে সকল জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য দুনিয়া জুড়ে শক্তি সৃষ্টি করা। ইরান ইসলামী বিপ্লবী মতাদর্শ হিসাবে মনে করে যে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও বঞ্চিতকে রক্ষা করা ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব। তাই এ বিপ্লবের প্রতি দাম্ভিক অপশক্তির ষড়যন্ত্র আর আক্রমণেরও শেষ নেই।

ষড়যন্ত্রের তালিকায় সাম্প্রতিক সংযোজন

সাম্প্রতিককালে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার মুরুব্বি সোভিয়েত ইউনিয়নে ও তার পক্ষপুটে আশ্রিত পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহে সমাজতন্ত্রের পতন এবং সোভিয়েত সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্নায়ুযুদ্ধের ঘটে অবসান। কিন্তু এ প্রেক্ষাপেট মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার নয়া ‘বিশ্বব্যবস্থার’ ছদ্মাবরণে দুনিয়াময় একক আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হয়ে উঠেছে। কমিউনিজমের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ইসলামী পুনরুজ্জীবন আন্দোলনসমূহকে বিশেষ করে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে টার্গেট করে ষড়যন্ত্রের নতুন জাল বুনে চলছে। উত্তেজনা সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য নতুন নতুন  ইস্যু তৈরি করছে পারস্য উপসাগরীয় এলাকায়। আবিষ্কার করছে আগ্রাসনের নতুন নতুন প্লট।

বস্তুত ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অব্যাহত অগ্রযাত্রা, নবতর শক্তি হিসাবে তার অভ্যুদয়ে কুফ্রি শক্তি আরো বেশি বিচলিত হয়েছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের তালিকায় তাই নতুন সংযোজন হচ্ছে আবু মুসা দ্বীপ। বিশ্বকুফ্‌রি শক্তি ইরানের সাথে আরব আমীরাত ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের বিরোধ উসকে দেয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগরের আবু মুসা দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে যথেষ্ট এবং ঐতিহাসিকভাবে এটি ইরানী ভূখণ্ডের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের একটি চুক্তিতে আবু মুসা দ্বীপের ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হয় এবং সেখানেকার নিরাপত্তা রক্ষায় ইরানের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। চুক্তিতে বলা হয়, কেবল প্রশাসন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও তেল আহরণের কাজ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমীরাত যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করবে। দ্বীপটিতে কারো অনুপ্রবেশজনিত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার হুমকি মোকাবিলা করার লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। অবশ্য ইরানের এ উদ্যোগকে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো ভিন্নভাবে দেখছে এবং এ নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমীরাতের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। এরই সুযোগ নিতে চাচ্ছে পশ্চিমা শক্তিবর্গ যারা প্রতিবেশীদের সাথে ইরানের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটুক- এটা মেনে নিতে পারে না এবং চায় পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা লেগে থাকুক যাতে তাদের নাক গলাবার সুযোগ ঘটে এবং হস্তক্ষেপও করতে পারে। আবু মুসা দ্বীপ প্রসঙ্গে তারা আরব নেতৃবৃন্দকে এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করে থাকে যে, ইরান আরব দেশগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ। এ বিরোধের সাথে জড়িত পক্ষগুলোর যেখানে করণীয় হচ্ছে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং নিজেদের সম্পর্কের উন্নয়নে প্রয়াস চালানো, সেখানে আবু মুসা দ্বীপের ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে এবং আরব লীগ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের বৈঠকে সংযুক্ত আরব আমীরাতের দখলিস্বত্বের পক্ষে একতরফা প্রস্তাব উত্থাপন এবং ইরানকে আবু মুসাসহ তিনটি দ্বীপ থেকে সরে পড়ার আহ্বান পরিস্থিতিকে জটিলতর করারই ইঙ্গিতবহ। নিকট অতীতের ইতিহাস যেখানে সুস্পষ্ট সাক্ষী হয়ে রয়েছে, এ অঞ্চলের প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের বিরোধ এদের কারো জন্যই ক্ষতি বই কল্যাণ বয়ে আনে না।  লাভবান হয় কেবল বাইরের ইন্ধনদাতা মতলববাজ পশ্চিমা কুফ্‌রি শক্তি।

সম্প্রতি ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে নিরাপত্তা অঞ্চল গঠনের পেছনেও রয়েছে মার্কিনী দুরভিসন্ধি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে, এ এলাকায় ইরাকের বামপন্থী সরকার কর্তৃক পাইকারি হারে শিয়াদের হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকা এ পদক্ষেপ গ্রহণে তাড়িত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা ভিন্ন। বরং আমেরিকা তার নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্যই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উল্লেখ্য, ১৮ মাসেরও অধিককাল ধরে এ এলাকার জনগণ যখন বুলেট, বোমাসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল তখন কিন্তু পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমগুলো নীরব ভূমিকা পালন করে আসছিল। সম্প্রতি হঠাৎ করে তাদের মানবাধিকার চেতনা এতটা উপচে পড়ার কারণ কি? বোসনিয়া-হারজেগোভিনায় মুসলমানদের পর সার্বীয়দের দ্বারা নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ব্যাপারে মার্কিনীরা তৎপর হয় না কেন? ভারতে মুসলিম হত্যার ব্যাপারেও তো তাদেরকে কোনো উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় নি? বরং উল্টো ভারতের সাথে মার্কিনীরা যৌথ সামরিক সহযোগিতা পাততে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আসলে মার্কিনীদের ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে ‘নো ফ্লাই যোন’ গঠন করা এবং ইরাকের ওপর সাম্প্রতিক সামরিক অ্যাকশনে যাবার পেছনে যেসব মতলব কাজ করছে তা হচ্ছে :

১. ইসরাইলী সরকার কর্তৃক চার শতাধিক ফিলিস্তিনী অন্যায়ভাবে দেশ থেকে বহিষ্কার এবং নো-ম্যানস ল্যান্ডে তাদেরকে মানবেতর অবস্থায় ফেলে রাখা এবং বোসনিয়া-হারজেগোভিনায় মুসলিম হত্যা ও নারী নির্যাতনের পাশবিকতা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও মার্কিনীদের কোনো কার্যকর ভূমিকা না থাকার ব্যাপারটাকে আড়াল করা।

২. সাদ্দামের পতনের পর সম্ভাব্য ক্ষমতার ভারসাম্য এবং এ এলাকায় আমেরিকা ও তার মিত্রদের স্বার্থ রক্ষার্থে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের মন জয় করার প্রচেষ্টা।

৩. সাদ্দামের পতনকে আমেরিকা তার নিজস্ব স্ট্র্যাটেজির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করে না এবং বিশ্ববিবেকের চাপের মুখে এবং  পারস্য উপসাগরীয় এলাকার শাসকদের সন্তুষ্টি অর্জন এবং সাদ্দামবিরোধী ইরাকীদের মন জয় করার একটা কৌশল হিসাবে গ্রহণ করেছে।

সত্যি বলতে কি, ঠিক এ মুহূর্তেই সাদ্দামের পতন আমেরিকা নিজেই চায় না। আমেরিকা বর্তমান যা কিছু করছে তা এক ধরনের নাটক। আমেরিকা আসলে যা চাচ্ছে তা হচ্ছে সাদ্দামের একটি বিকল্প ব্যক্তিত্বের সন্ধান। সম্ভবত সে এখনও তেমন ধরনের ব্যক্তিত্বের সন্ধান পায়নি। আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে তার জন্য অনুকূল এমন একটি সময়েই সাদ্দামের পতন হওয়া উচিত যাতে সে বিশ্ববাসীর  দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় যে, সে সাদ্দামের নির্যাতনের হাত থেকে ইরাকী জাতিকে রক্ষা করেছে এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়কে সামনে রেখে ফায়দা লুটতে পারে। উত্তর ইরাকের পর দক্ষিণ ইরাকে নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন ও সামরিক অ্যাকশনের পেছনে ইরাককে খণ্ডিত করা ও সমগ্র এলাকাকে একটি মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন করার পাঁয়তারা কাজ করছে।

কমিউনিস্ট শাসনের লৌহ প্রাচীর ভেঙে এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলো নিয়েও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শুরু করেছে ষড়যন্ত্র। বস্তুত সাম্প্রতিককালে আজারবাইজান, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান প্রজাতন্ত্রগুলো স্বাধীনতা লাভ করলে এসব প্রজাতন্ত্রের মুসলমানগণ মস্কোর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় নীতি অনুসরণের সুযোগ পায়। উল্লেখ্য যে, এ অবস্থা কেবল মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলোর মধ্যেই সীমাবন্ধ থাকল না, বরং অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্রও নিজেরা নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে চাইল। এসব অঞ্চলে ইসলামী পুনর্জাগণের কিছু সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় এবং ইসলামী বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় কোনো কোনো রিপাবলিক কিছুটা এগিয়ে যাওয়ায় মৃতপ্রায় কমিউনিস্টরা সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামী শক্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তাজিকিস্তানে এ অপশক্তি যে তাণ্ডবলীলা ও অমানবিকতা প্রদর্শন করছে তার তুলনা কেবল বোসনিয়ায় সার্বীয় বাহিনীর পৈশাচিকতার সাথেই করা চলে। এখানে আরো একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, যে ইয়েলৎসিন রাশিয়ায় বসে কমিউনিস্টদের মোকাবিলা করেছেন তিনিই কিন্তু তাজিকিস্তানে নিজস্ব বাহিনী পাঠিয়ে কমিউনিস্টদেরকে সাহায্য করছেন মুসলিম হত্যাযজ্ঞে এবং ইসলামী পুনর্জাগরণ ঠেকাতে। ‘আল-কুফ্রু মিল্লাতুন ওয়াহিদাহ’ অর্থাৎ দুনিয়ার সকল কুফ্র আসলে একই মিল্লাত বা সম্প্রদায়- এর আরেক জ্বলন্ত উদাহরণ মুসলমানরা এখানে প্রত্যক্ষ করল। বস্তুত একই কারণে বিশ্বের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও মধ্য এশিয়ার এ বর্বরতায় নিশ্চুপ। স্ট্যালিনীয় স্টাইলের বর্বরতাও তাদের ‘মানবাধিকার’ চেতনাকে স্পর্শ করে না।

ইসলাম, মুসলিম জাতি ও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে পাশ্চ্যাত্যের আরেকটি ষড়যন্ত্র হচ্ছে ইসলামের মহান নবী (সা.)-এর ওপর অবমাননাকারী বিশ্ব নিন্দিত গ্রন্থ ‘দি স্যাটানিক ভার্সেস’- এর কুখ্যাত লেখক সালমান রুশদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ রদ করার জন্য ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের ফন্দি-ফিকির। উল্লেখ্য, ইমাম খোমেইনী রুশদীর এ দণ্ড বিশ্বসমক্ষে ঘোষণা করেছিলেন। এ জন্য সাম্রাজ্যবাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই কুখ্যাত লেখককে ব্রিটেনের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় সফর করানো এবং বক্তৃতা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। রুশদীর এসব বক্তৃতার বিষয় একটাই। তা হলো ইরানের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা এবং কিছু মহল তার বক্তৃতা-বিবৃতি এমনভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করেছে যাতে আসল বিষয়কে আড়াল করা যায়। শয়তান রুশদীর পক্ষে ওকালতিকারী সংবাদ মাধ্যমসমূহ যে বিষয়টি বেমালুম চেপে যায় তা হচ্ছে বিশ্বের একশ কোটি মুসলমানের বিশ্বাস ও আবেগ-উপলব্ধির ওপর শয়তান রুশদীর আঘাতের বিষয়টি। তারা এটিও উল্লেখ করেন না যে, এ নরাধম কর্তৃক মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসের ওপর  আঘাতের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বহু মুসলমানকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদের অনুচররা কেবল ইসলামী আইন অনুযায়ী ইমাম খোমেইনী কর্তৃক রুশদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে এবং এহেন অভিমত পেশের চেষ্টা করে যে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সংগতিহীন। কি অপূর্ব তাদের কৌশল! মোট কথা, সাম্রাজ্যবাদের অনুচররা এবং তাদের প্রচারমাধ্যমসমূহ শয়তান রুশদীর ক্ষমাহীন অপরাধের প্রসঙ্গে না গিয়ে বরং এটিকে ইসলামী ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসাবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। তাদের ধারণা এর মাধ্যমেই ইউরোপীয় দেশসমূহের সাথে ইরানের সম্পর্ক সৃষ্টি ঠেকানো যাবে, ইরানকে কিছুটা ‘একঘরে’ করা যাবে। অথচ আজকে পাশ্চাত্যে যারা শয়তান রুশদীকে আদর আপ্যায়ন করছে, তার পক্ষে ওকালতিতে নামছে, তাদের এ কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, এ শাস্তি যথোচিত যা এ নরাধমের প্রাপ্য এবং সারা মুসলিম দুনিয়া এ দণ্ডাদেশের পক্ষে রায় ঘোষণা করেছে। কাজেই যে পথে উপরিউক্ত মহল পা বাড়িয়েছে তাতে এ উদ্দেশ্য সফল হবে না যে, মুরতাদ রুশদীর দণ্ড মওকুফ হবে কোনোদিন। তবে পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অন্য কোনো মতলব হয়তো হাসিল করতে পারে, তা হচ্ছে ইসলামী ইরানের সাথে বিরোধিতাকে নবরূপ দেয়া, চাঙ্গা করা এবং আনুষঙ্গিক কিছু জটিলতা সৃষ্টি করা। এতে আর বিস্মিত হবারই কি আছে। নব্য ক্রুসেড তো ইউরোপীয়রা অনেক জায়গায়ই শুরু করে দিয়েছে, এটি হয়তো তার সাথে নবতর সংযোজন হবে।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার আসনে নতুন ব্যক্তি সমাসীন হয়েছেন। তৃতীয় বিশ্বের অতি উৎসাহী এবং সঠিক তথ্য সম্পর্কে অনবগত কিছু ব্যক্তি নির্বাচনের পূর্বে যা-ই আশাবাদ ব্যক্ত করে থাকুন না কেন নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় গিয়ে শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, “…The Leadership of America changes, but the policies do not.” ‘পলিসি’ বলতে এখানে বিল ক্লিনটন মৌলিক পলিসির কথাই বুঝিয়েছেন। একেবারেই সত্য কথা। তবে হ্যাঁ, পরিবর্তন যদি সামান্য হয়ও তা হবে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকে আরো তীব্রতর করার লক্ষ্যেই। কৌশলগত পদক্ষেপে নতুন নতুন মাত্রা সংযোজন করা হবে হয়ত। তারই পূর্বাভাষ পাওয়া যায় পাশ্চাত্যেরই সংবাদমাধ্যম রয়টার্স পরিবেশিত খবরে। তাতে বলা হয়েছে : ‘বিল ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট হবার পর মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন কৌশলগত অবস্থান ইরাকের থেকে ইরানের দিকে পরিবর্তিত হতে পারে। ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপ অধিকাংশ আরব সন্তুষ্ট নয়। তারা মনে করে আরবের আধুনিকপন্থী ও মার্কিন মিত্রদের (তাঁবেদার) ভবিষ্যতের জন্য ক্রমবর্ধমান সমস্যা হচ্ছে ইরানী ধাঁচের ইসলামী শক্তি।’ এ পর্যবেক্ষণ পরিষ্কার করে দিচ্ছে আমাদের পূর্বের আলোচনার সারবত্তাকে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের প্রশাসনের শেষ সময়কার বক্তৃতা-বিবৃতি থেকেও আভাষ পাওয়া যাচ্ছিল মার্কিনীরা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার পথ খুঁজছে। ইরান অস্ত্র কিনছে, ইরান পারমাণবিক সরঞ্জামাদি কিনছে ও তৈরি করছে ইত্যাকার অভিযোগ বুশ প্রশাসনের নিত্যদিনকার বুলিতে পরিণত হচ্ছিল। অথচ ইসরাইলের অস্ত্র কেনা ও পারমাণবিক ক্ষমতায় মার্কিনীরা কোনো দোষ খুঁজে পায়  না।

বস্তুত ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও তার অব্যাহত অগ্রযাত্রা ইরানের সমৃদ্ধি ও প্রভাব সারা দুনিয়ার সামনে আজকে একটি জ্বলন্ত বাস্তবতা। এ বিপ্লব দুনিয়ার সামনে এমন এক দর্শন উপস্থাপন করেছে, দুনিয়াকে এমন এক পথ দেখিয়েছে যা বিশ্বশোষক ও লুটেরাদের হাত থেকে মযলুম মানবতাকে মুক্তির সন্ধান দিতে পারে। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যেখানেই নিপীড়িত মানুষের ক্রন্দন শোনা যায়, সেখানেই ইসলামী বিপ্লবের আহ্বান পৌঁছে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র সেখানেই সাহায্যের হাত প্রসারিত করে। এই বিশেষ কারণটির জন্যই বিশ্বসাম্রাজ্যবাদ ইসলামী বিপ্লবের প্রতি খড়গহস্ত। তারা ভালো করেই জানে যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অগ্রযাত্রার মধ্যেই নিহিত রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী কুফ্‌রি শক্তির মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি। ইসলামী বিপ্লব সম্প্রসারণের মধ্যেই রয়েছে বিশ্বের সকল যালেম শক্তির প্রতি লেজ গুটিয়ে সরে পড়বার নির্দেশনামা। তাইতো মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রের চোখের ঘুমও উধাও হয়েছে। তাদের মসনদ হাতছাড়া হবার ভয়ে তারা শঙ্কিত এবং সাহায্যের আশায় আরো বেশি করে সাম্রাজ্যবাদের পদযুগল চুম্বন করছে। এ কথা আজ দিবালোকের মতোই পরিষ্কার যে, শুধু মধ্যপাচ্যে নয়, দুনিয়ার দেশে দেশে মুসলমানদের নিদ্রাভঙের জন্য ইরানের ইসলামী বিপ্লব আজানের কাজ করেছে। এ আওয়াজকে স্তব্ধ করে এ শক্তি কারো নেই। এ বিপ্লব মযলুম মানবতার জন্য মুক্তি ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবে- এটি কেবল আজকের প্রত্যাশা নয়, এ আমাদের প্রত্যয়। বিশ্বের তাবৎ যালেমের ওপর আমরা মযলুমদের বিজয়ের প্রহরই গুণছি।

(নিউজলেটার, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩)

বিশিষ্টজনদের দৃষ্টিতে ইরানের ইসলামী বিপ্লব

হুজ্জাতুল ইসলাম বাকের আনসারী

‘ইসলামী বিপ্লব সফল হওয়ার আগে না মুসলিম আর না বিশ্বদাম্ভিকরা কল্পনা করত যে, আধুনিক বিশ্বে আবার ইসলামের পুনর্জাগরণ হবে। আজ সন্দেহাতীতভাবে এ কথা সত্য যে, এ ইসলামী বিপ্লব বঞ্চিত মানবতার মাঝে ও ইসলামী বিশ্বে এক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আর এই বিপ্লবের রয়েছে এক নজিরবিহীন সাংস্কৃতিক ভিত্তি।

ড. হামিদ আলগার

এ বিপ্লব বর্তমান শতাব্দীর অন্যান্য বিপ্লব থেকে স্বতন্ত্র, কেননা, ইতিহাসের গভীরে এর শিকড় প্রোথিত। ইরানীদের আবশ্যকীয় ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সাথে সাথে আকস্মিক কোন পরিবর্তন এটা নয়; বরং এ ছিল সুদীর্ঘ বহু বছরের রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের একটি অব্যাহত প্রয়াসের ফলশ্রুতি।…

আমাদের ঘাড়ে চেপে বসা রাজনৈতিক ভূতের দৃষ্টিভঙ্গিতে আলেম সমাজকে বিচার করা হলে সত্যের অপলাপ হবে। মনে রাখতে হবে যে, আলেমগণ শুধু শিয়া মাযহাব বা ইরানেই নয় বরং সারা দুনিয়াতে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষা ও আচারের এক বিশেষ দিকের সংরক্ষণ ও প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। এটাই শেষ পর্যন্ত সমগ্র সমাজ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়। আমরা যদি ইরানের শিয়া মাযহাবের বিশেষ দিকের প্রতি তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, ষোড়শ শতকের সাফাভী আমল থেকেই আলেমগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়াশুনা ও জ্ঞানচর্চা করেছেন। তাঁদের বিচরণ শুধু কুরআন, হাদীস, তাফসীর, ফিকাহ বা অনুরূপ বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না- ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ দর্শন, বিশেষত শিয়া মাযহাবের অধ্যাত্মবাদের ওপরও তাঁদের দখল ছিল। বস্তুত আমরা যদি আয়াতুল্লাহ খোমেইনী এবং তাঁর মহান অবদানের প্রতি তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, ইরানের শিয়া আলেমদের সুদীর্ঘ ঐতিহ্যেরই চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছেন তিনি। শুধু রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাপারে অসাধারণ, ব্যাপক এবং অবিসংবাদিত ভূমিকা পালন করেছেন বলেই যে তিনি এ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তা নয়। শিয়া ঐতিহ্যের খাঁটি ও সার্থক অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের বিকাশও তাঁর মধ্যে ঘটেছে। মোট কথা এ ক্ষেত্রেও তিনি একজন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব।…

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দেশে ফিরে আসলেন। কিন্তু তিনি সাথে করে কোন সম্পদ নিয়ে এলেন না। কোন রাজনৈতিক দলও তিনি গঠন করেননি। কোনো গেরিলা যুদ্ধও পরিচালনা করেননি। কোন বিদেশী শক্তির সাহায্য তিনি নিলেন না। অথচ এর মধ্যেই তিনি ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের তর্কাতীত নেতৃত্বে সমাসীন হলেন।…

আয়াতুল্লাহ খোমেইনীর ক্ষেত্রে ‘বিপ্লব’ কথাটির অর্থ হচ্ছে এই যে, একজন বিপ্লবী নেতা হিসাবে তিনি নিছক জ্ঞানে ও আবেগে কোন বিশেষ লক্ষ্যের প্রতি শুধু নিবেদিতই নন, বরং তিনি এর সাথে একাত্মও। এক্ষেত্রে ‘বিপ্লব’ শব্দটিকে অবশ্য ইরানী প্রেক্ষাপটেই বুঝতে হবে। তিনি ছিলেন পুরোপুরি আপোসহীন। কিন্তু কেন? কারণ, তিনি নিছক ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে প্রচলিত অর্থে কোন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। পক্ষান্তরে, তিনি কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য খোদা নির্ধারিত পথে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন মাত্র।…

আয়াতুল্লাহ খোমেইনী তাঁর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক গুণাবলি দ্বারাই মহান ও অতুলনীয় ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর গুণাবলি এমনকি ইসলামবিরোধীরাও অস্বীকার করতে পারে না। একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যে, বিপ্লবের সময় যাঁরা ইসলামের প্রতি নিবেদিত ছিলেন না তাঁরাও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইসলাম খুঁজে পেলেন। আয়াতুল্লাহ খোমেইনীর আধ্যাত্মিক ও শক্তিশালী নৈতিক গুণাবলি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরাও বিপ্লবের তথা ইসলামের প্রতি নিবেদিত হলেন। এটা অনস্বীকার্য যে, তিনি এমনই এক ব্যক্তিত্ব যিনি আত্মকেন্দ্রিকতা ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে থেকে কেবল ইরানী জাতির অন্তরের অন্তঃস্থলে নিহিত আশা-আকাক্সক্ষারই প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।…

আমাদের এ কথা কিছুতেই ভুলে গেলে চলবে না যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিবাদের জন্য যে মারাত্মক বিপর্যয় এনেছে তা যে কোন যুদ্ধে প্যালেস্টাইনীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম কিংবা আরব রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক গৃহীত যে কোন সামরিক মাধ্যমে অর্জিত সমস্ত সফলতার চাইতেও বেশি। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে যে, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে, এমনকি সকল মুসলিম দেশের হাতে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও ইহুদিবাদ যে প্রাথমিক পরাজয় বরণ করেছে তা সম্ভব হয়েছে একমাত্র ইরানের ইসলামী বিপ্লবের কারণে।

এ বিপ্লবের মধ্যেই এমন শক্তি নিহিত রয়েছে যা সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের কল্যাণে আসতে পারে। সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত দেশসমূহ যথা আরব রাষ্ট্রগুলো আফগানিস্তান ও অন্য সব দেশের মুসলমানদের উচিত এ বিপ্লবের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা এবং একে এগিয়ে নেবার জন্য সব রকমের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করা।

ড. কালিম সিদ্দিকী

ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে ভালোমন্দ যার যা-ই ধারণা থাক না কেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো এই বিপ্লবের আধ্যাত্মিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উৎস পুরোপুরিভাবেই ইসলামের গভীরে নিহিত রয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাধারার সাথে জড়িত সকল প্রতিষ্ঠান ও ধ্যান-ধারণা এবং ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ বাইরে এই বিপ্লব অবস্থান করছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগ পর্যন্ত এটা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে, ইরানে (শাহের ইরানে) রীতিমতো ইসলামী নেতৃত্বের উৎস বিরাজ করছে এবং তাঁরা তখন পর্যন্ত পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা দ্বারা সংক্রমিত হননি। সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত শিয়া ধর্মতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ববিদ ও তাঁদের প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং উসুলী আলেম সম্প্রদায়ই সমসাময়িক ইস্যুগুলোর ওপর সক্রিয়ভাবে ইজতিহাদে আত্মনিয়োগ করেন। এর ফলে ঔপনিবেশিক আমলের মুসলিম রাজনৈতিক ভাবধারা এবং এর প্রতিষ্ঠানসমূহের আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজনীয় ধ্যান-ধারণা এবং নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটে।

ইসলামের শক্তির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো মুসলিম সর্বসাধারণ বা জনতা। মুসলিম জনতাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপনিবেশিক আমলের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা দ্বারা সংক্রমিত ছিল না। জাতীয়তাবাদী আবেগের প্রতি জনতার বিপুল সাড়া পাওয়া যায় যখন ১৯৫১ সালে অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পৃথিবীর অন্যান্য এলাকায়ও জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ নিজেদের পৃষ্ঠপোষক উপনিবেশিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে জনতাকে সাময়িকভাবে সংঘবদ্ধ করতে কম-বেশি সফল হয়েছিল। কিন্তু এর আগে কোন সময় পৃথিবীর কোন অঞ্চলে সর্বসাধারণ মুসলিম রাজতন্ত্র হতে স্বাধীন এবং উপনিবেশিক আমলের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার বাইরে কোন ইসলামী নেতৃত্বের ছোঁয়া পায়নি। ইরানের মুসলিম জনতার মাঝে উলামা বা ইসলামী শক্তির এক অতলান্ত উৎসের সন্ধান পেয়েছিলেন যা ইতিপূর্বে কোন ইসলামী আন্দোলন আবিষ্কার করতে পারেনি। ইরানে উলামা আর মুসলিম জনতার সম্মিলন (fusion) ইসলামের অনুপম আর অজেয় শক্তির স্ফূরণ ঘটিয়েছিল। এই শক্তির স্ফূরণ প্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচারকে পরাজিত করেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিপ্লববিরোধী উৎসগুলো নির্মূল করেছে, বিদেশী সামরিক ও অর্থনৈতিক মাতব্বরিকে খামোশ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক দুশমনদের একটি যৌথ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এই শক্তি এখন প্রলম্বিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামের এই অনবদ্য শক্তি একটি নতুন রাষ্ট্রও স্থাপন করেছে। এই রাষ্ট্রের রয়েছে একটি নতুন সংবিধান এবং উপনিবেশিক রাজনৈতিক চিন্তা কাঠামোমুক্ত সম্পূর্ণ নতুন ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহ। এভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের দোসরদের তিনশ’ বছরের অধিককালের কষ্টার্জিত আধিপত্য ব্যবস্থাকে ইসলামী বিপ্লব নাস্তানাবুদ করে ফেলল।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো শাসক ও শাসিতের মধ্যকার এই চির প্রসারমান ব্যবধানে সুদৃঢ় সেতুবন্ধ রচনা। এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে ইসলামের মূল ভূখণ্ডে জনগণ ও উলামাদের মধ্যে স্থিতিশীলতা, শক্তিমত্তা, পারদর্শিতা ও তাকওয়ার নতুন নতুন কেন্দ্র চালু করার মাধ্যমে এবং উপনিবেশবাদ প্রভাবিত জাহেলিয়ার ভূত যা এতদিন পরগাছার মতো ইরানে শেকড় গেঁড়ে বসেছিল তা উপড়ে ফেলার মাধ্যমে।

(নিউজলেটার, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩)

সাংস্কৃতিক বিনিময় বনাম সাংস্কৃতিক আধিপত্য

সংস্কৃতি হলো একটি গতিশীল বিষয়। মানবজাতির সমগ্র ইতিহাসই সংস্কৃতির এই চিরন্তন পরিবর্তনশীল বা গতিশীলতার অনড় সাক্ষী। সংস্কৃতির এই আবহমান পরিবর্তনশীল প্রকৃতির কারণেই একটি সংস্কৃতির মৃত্যু এবং আর একটি সংস্কৃতির জন্ম হয়। তবে সবসময় যে এই পরিবর্তনগুলো একটি নতুন সংস্কৃতির জন্ম দেবে, এমন কথা নয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হয়ও না। ইসলামী সংস্কৃতিও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলাম তার চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসে এরূপ অনেক জোয়ার-ভাটা প্রত্যক্ষ করেছে। তবে একথাও সত্য যে, নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকূলতার পরও ইসলামী সংস্কৃতি তার স্বকীয়তায় বিদ্যমান থেকে নিজস্ব গতিতে এগিয়েও চলছে।

বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীতে বর্তমান সংস্কৃতি ও সভ্যতাগুলোও কম-বেশি এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এগুলো বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেরিয়েই বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। এগুলোর মধ্যে যেগুলো এসব ধকল বা প্রতিকূলতা সামলিয়ে উঠতে পারেনি, সেগুলো কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে।

যে তিক্ত বিষয়টি বর্তমান বিশ্বের সবাইকে কম-বেশি ভাবিয়ে তুলেছে তা হলো ‘পশ্চিমা মার্কিন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’, বিশেষ করে ‘মার্কিন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদের মাধ্যমেই পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ গড়ে উঠেছে। তারা তাদের চাপিয়ে দেওয়া অপসংস্কৃতির ফাঁদে ফেলে অন্যান্য জাতির বিশ্বাস ও মূল্যবোধে ধস নামানোর হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এক্ষেত্রে তারা তাদের প্রচারণামূলক কাজে বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমগুলোকে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করছে।

পশ্চিমাদের এরূপ আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক নীতির কারণেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ব্যবধান ও দ্বন্দ্ব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমিত না থেকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। কেননা, বিশ্বের মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে অন্যান্য সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতি পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই এবং অন্যান্য সংস্কৃতি ও সভ্যতার উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করাই তার মূল উদ্দেশ্য। সে জন্য অন্যান্য সংস্কৃতির সাথে পশ্চিমা সংস্কৃতির বিনিময় দ্বি-পাক্ষিক না বলে বরং এক তরফা বলা চলে। পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতার সমৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতি ও প্রাচ্যের সংস্কৃতির বিনিময়ের বেলায় এই দর্শন অকার্যকর; বরং সেখানে বিনিময়টা হয় একপেশে বিনিময় নীতির ভিত্তিতে।

ইতিহাসের আলোকে বলা যায়, পৃথিবীর অন্যান্য সংস্কৃতি থেকে একটি বিশেষ সংস্কৃতির বিচ্ছিন্নতা তাকে লাঞ্ছনা ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এটাকে আমরা মূল থেকে বিচ্ছিন্ন একটি গাছের সাথে গণ্য করতে পারি।

কাজেই কোন সংস্কৃতি যদি তার স্বকীয়তা নিয়ে টিকে থাকতে চায় এবং যথাযথ মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা পেতে চায়, তাহলে তাকে যথাযথ অর্থে ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ দর্শনে বিশ্বাসী হতে হবে এবং কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এ ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ হতে হবে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এবং সৌহার্দমূলক পরিবেশে। অন্যথায় এই ‘সাংস্কৃতিক সম্পর্ক’ উন্নয়নের বিষয়টি কেবল একটি ‘স্বগতোক্তি’র মতোই হয়ে থাকবে। বাস্তবতায় এর কোন প্রতিফলন থাকবে না। উপরন্তু তা কিছু বাড়তি সমস্যার সৃষ্টি করবে যা জাতিসমূহের সাংস্কৃতিক সত্তার জন্য বয়ে আনবে ভীতিকর দুর্দশা।

বর্তমান বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো যদি ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ কিংবা ‘যোগাযোগ বিপ্লব’ প্রভৃতি স্লোগানের আলোকে সবকিছু চিন্তা-ভাবনা করে, তবে এটা দিবালোকের মতো সত্য যে, তারা বলতে চায়, ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ প্রতিষ্ঠিত আছে এবং তা এই বৃহৎ শক্তিগুলো বনাম অন্যান্য দেশের মধ্যে। কিন্তু ইতিমধ্যে বাস্তবে আমরা যা দেখতে পেয়েছি তা হলো এই তথাকথিত বিনিময়ের নামে এই ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ একপেশে এবং এক তরফা বিনিময়ে পরিণত হয়েছে। এই বিনিময় ব্যবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ঐসব তথাকথিত বৃহৎ শক্তির কাছ থেকে সংবাদ, তথ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি প্রভৃতি গ্রহণ করবে, কিন্তু তারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করবে না। কাজেই এই একতরফা ‘সংস্কৃতি-বিনিময়কে’ আমরা আর যা কিছু বলতে পারি অন্তত একে ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ বলতে পারি না।

এই প্রেক্ষিতে ঐসব তথাকথিত বৃহৎ শক্তির সর্তক হওয়া উচিত। কেননা, তারা যদি মনে করে যে, তারা তাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতা দিয়ে বিশ্বের সব মানুষের চিন্তা-চেতনাকে প্রভাবিত করে তাদের স্বমতে নিয়ে আসতে পারবে, তবে তা হবে একটি বিরাট ভুল চিন্তা। কেননা, অতীতেও অনেক স্বৈরাচারী শক্তি এরূপ চিন্তা করেছিল এবং তা বাস্তবায়নে সম্ভাব্য সব ধরনের পন্থাও অবলম্বন করেছিল; কিন্তু তাদের সব চিন্তা-চেতনা ও প্রয়াস ভেস্তে গিয়েছিল। কোন সংস্কৃতিই তার স্বকীয়তা পুরোপুরি হারায় না এবং কালের ¯্রােতে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ফিরে আসে। এই একই কারণে এই নব্য শক্তিরাও তাদের অপসংস্কৃতি দ্বারা অন্যান্য বিশুদ্ধ সংস্কৃতির মূলোৎপাটন করতে সক্ষম হবে না।

এসব তথাকথিত শক্তিকে সর্তক করা এই লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং এই প্রেক্ষিতে মুসলমানদের করণীয় কী তাই স্মরণ করিয়ে দেওয়াই আমাদের এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য। মুসলমানদের উচিত ইসলামের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে যথাযথভাবে অনুধাবন করে তা বিশ্ববাসীর কাছে প্রচার করা। কেননা, পবিত্র কুরআনের মতে, পশ্চিমা সংস্কৃতিকে সাগরের ঢেউয়ের চূড়ায় যে ফেনা থাকে তার সাথে তুলনা করা যায় যা ঢেউ সরে গেলে সাগরের বুকে বিলীন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে ইসলাম ও ইসলামী সংস্কৃতিকে একটি প্রশান্ত সাগরের স্থির পানির সাথে তুলনা করা যায় যা অনন্ত ও স্থায়ী।

স্মার্ট ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উদ্বোধন করল ইরান: বাড়বে যুদ্ধ ক্ষমতা

অত্যাধুনিক স্মার্ট ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উদ্বোধন করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হয়েছে এবং ব্যালিস্টিক এ ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞরা এ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছেন। এর পাশাপাশি নতুন ধরনের সাঁজোয়াযান উদ্বোধন করা হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন দেহকান, সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হাসান ফিরোজাবাদি এবং অন্য শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।স্মার্ট ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ফলে নৌ ও স্থলযুদ্ধে ইরানের নির্ভুল হামলার সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। একইসঙ্গে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করবে।

এ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সফলতার পর ইরান এখন হাতে গোণা কয়েকটি দেশের তালিকায় স্থান করে নিল যারা কৌশলগত অস্ত্রের ক্ষেত্রে এই বিশেষ প্রযুক্তির অধিকারি।এছাড়া, নতুন যে সাঁজোয়াযান তৈরি করা হয়েছে তা স্টিল কোর এন্টি আর্মর বুলেট প্রতিরোধ করতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এ যান তৈরি করা হয়েছে।

রেডিও তেহরান, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

ব্যালিস্টিক ও লেসার গাইডেড মিসাইলের পরীক্ষা চালালো ইরান

নতুন প্রজন্মের ব্যালিস্টিক ও লেসার গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ৩৫তম বিজয় বার্ষিকী উদযাপনের প্রাক্কালে এসব পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন দেহকান।

তিনি জানান, ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একইসঙ্গে বহুসংখ্যক ওয়ারহেড বহন করতে পারবে। আর লেসার গাইডেড মিসাইল হচ্ছে বিমান থেকে ভূমিতে আবার ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপ করা যাবে। দু’টি ক্ষেপণাস্ত্রেরই পরীক্ষা সফল হয়েছে বলে জানান তিনি। লেসার গাইডেড মিসাইলের ফার্সি নাম দেয়া হয়েছে বিনা।

হোসেইন দেহকান জানান, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি নতুন দু’ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে এবং একইসঙ্গে বহুসংখ্যক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারবে। তিনি জানান, লেসার গাইডেড মিসাইল ভূমি থেকে আবার আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা যাবে।

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সেতু, ট্যাংক এবং শত্রুর কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করতে সক্ষম। তিনি বলেন, ইরানের এসব অর্জন থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইসলামি বিপ্লব সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

রেডিও তেহরান, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সিমুলেটর উদ্বোধন করল ইরান

নিজস্ব প্রযুক্তিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা উদ্বোধন করল ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সেনাবাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে শাহীন ও অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।সিমুলেটরগুলো তৈরি করছে খাতামুল আম্বিয়া বিমান ঘাঁটির প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা। তরুণ বিমানসেনাদের প্রশিক্ষণে এসব সিমুলেটর ব্যবহার করা হবে।

গতকাল (মঙ্গলবার) এক বিবৃতিতে খাতামুল আম্বিয়ার কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফারজাদ ইসমাইলি তেহরানে বলেন, ইরানের তৈরি এসব সিমুলেটর অনেক বেশি আধুনিক, দ্রুত গতির ও মূল ব্যবস্থার চেয়েও অনেক নিখুঁত।

তিনি  বলেন, “এসব সিমুলেটরের নকশা প্রণয়ন ও তৈরির আগে আমাদের সম্পূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা স্থাপন করতে হত। এমনকি, প্রায় দেড়শ’ কর্মী মোতায়েন করতে হত যেন অন্যরা প্রশিক্ষণের কাজে তা ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু, এখন এসব সিমুলেটরের মাধ্যমে আমরা অনেক বাস্তবসম্মতভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারব।”

এসব সিমুলেটর আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কর্মীদের দক্ষতা আরো বাড়াবে। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষকরা আকাশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোনকে টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন বলেও জানান কমান্ডার।

রেডিও তেহরান, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৪

হযরত আলী (আ.)-এর বাণী- নাহজুল বালাগা থেকে

একদিন হযরত আলী (আ.) এক আস্তাকুঁড়ের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করার সময় বলেন : ‘এ হচ্ছে সে জিনিস যা নিয়ে কৃপণগণ কার্পণ্য করত।’

আর অন্য একটি বর্ণনা মতে তিনি বলেন : ‘এ হচ্ছে জিনিস যার ভালোবাসা ও লিপ্সায় গতকাল পর্যন্ত তোমরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিলে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৮৬

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : ‘যে সম্পদ তোমার জন্য উপদেশ রেখে গিয়েছে, তা বিনষ্ট হয়নি।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৮৭

হযরত আলী (আ.) বলেছেন : ‘মানুষের দেহ যেমন অবসন্ন বা ক্লান্ত হয়। অতএব, অন্তরের অবসন্নতা দূর করার জন্য জ্ঞানের বিষয়সমূহ অন্বেষণ কর।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৮৮

হযরত আলী (আ.) বলেন : ‘প্রত্যেক লোকের সাথে দু’জন ফেরেশতা রয়েছেন তাঁরা তাকে হেফাজত করে থাকেন। আর যখন অলঙ্ঘনীয় তাকদীর এসে পড়ে তখন ফেরেশতাগণ তাকে ছেড়ে চলে যান। আর মানুষ তথা কোন প্রাণীর জন্য ‘নির্ধারিত সময়কাল’ হচ্ছে একটি সুরক্ষিত বর্ম।’ (অর্থাৎ মানুষের যখন অন্তিমকাল এসে যায় তখন তার সঙ্গের ফেরেশতাদ্বয় তাকে ছেড়ে চলে যান এবং তাকদীর অনুযায়ী তার জীবনের অবসান ঘটে।)- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৯২

হযরত আলী (আ.) লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন : ‘হে লোক সকল! আল্লাহকে ভয় কর যিনি শোনেন যখন তোমরা কথা বল আর তোমার কোন কিছু গোপন করলে তিনি তা জানেন। আর মৃত্যুর পূর্বে নেক কাজে অগ্রসর হও। মৃত্যুর নিকট থেকে পলায়ন করলে মৃত্যু তোমাদেরকে ধরে ফেলবে। আর দাঁড়িয়ে থাকলেও মৃত্যু তোমাদের ধরে ফেলবে। তোমরা মৃত্যুকে ভুলে গেলে মৃত্যু তোমাদের স্মরণ করবে।’- নাহজুল বালাগা, উক্তি নং ১৯৪

(নিউজলেটার, ডিসেম্বর ১৯৯১)

অমর শহীদ- ড. মুহাম্মদ মুফাত্তেহ

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে শহীদদের সারিতে একটি বিশেষ নাম হচ্ছে ড. মুহাম্মদ মুফাত্তেহ (রহ.)। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গুপ্তচরেরা প্রখ্যাত আলেম ইসলামী বিপ্লবের অকুতোভয় সৈনিক হুজ্জাতুল ইসলাম ড. মুহাম্মদ মুফাত্তেহ হামেদানীকে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামী বিজ্ঞান অনুষদের চত্বরে শহীদ করে। ইসলামী বিপ্লব সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিশেষত তেহরানের ওলামা সমাজের কেন্দ্রীয় পরিষদের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তেহরানের জনণকে তিনি পরিচালিত ও সংগঠিত করার কাজে বিশেষ অবদান রাখেন। শাহের জল্লাদ বাহিনী সাভাক দ্বারা তিনি বহুবারই আক্রান্ত ও বন্দি হয়েছিলেন।

ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর শহীদ আয়াতুল্লাহ মোতাহহারীর সুপারিশক্রমে তাঁর ওপর তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামী বিজ্ঞান অনুষদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন : যখন উক্ত অনুষদের দায়িত্ব গ্রহণ করার ব্যাপারে আমি আপত্তি তুলি তখন আয়াতুল্লাহ মোতাহহারী আমাকে সাহায্যের অঙ্গীকার করেন। তাঁর সাহায্য না পেলে কাজের চাপে আমার শিরদাঁড়া ভেঙে যেত।তাঁর সারল্য, ক্ষমাশীলতা, সাধুতা, দায়িত্ববোধ এবং ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের দক্ষতা তাঁকে অমর করে রেখেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তিনি একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।

(নিউজলেটার, ডিসেম্বর ১৯৯১)

ড. মুদাররেস- অমর শহীদ

ইরানে শাহের আমলে যাঁরা অন্যায়, অসত্য, যুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, অকুতোভয় সৈনিকের মতো সাধারণ মানুষের মনে প্রাথমিক পর্যায়ে বিপ্লবের বীজ বপন করেছেন তাঁদের অন্যতম হচ্ছেন শহীদ সাইয়্যেদ হাসান মুদাররেস (রহ.)। তিনি ১৮৭১ সালে ইরানের ইসফাহান প্রদেশের আরদিস্তানের একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ধর্মীয় বিষয়ে প্রগাঢ় জ্ঞানের অধিকারী শহীদ মুদাররেস পরপর বেশ কয়েকবার মজলিসের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রথমবার মজলিসের সদস্য হওয়ার পর মজলিসের সংখ্যাগরিষ্ঠদের নেতা নির্বাচিত হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি ১৯১৯ সালের চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যুগপৎ দুটি দায়িত্বই পালন করতেন। একদিকে মজলিসের সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক দায়িত্ব, অন্যদিকে শিক্ষকতার দায়িত্ব। তিনি মজলিসের প্রতিনিধি হিসেবে সাহসিকতা, দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও মনোবলের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং মজলিসকে ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালনা করার চেষ্টা করেন। মজলিসে সবসময় অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণে রেযা খান তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে চান আর এজন্য চালানো হয় ষড়যন্ত্র। এর ফলে পূর্ববর্তী নিবার্চনগুলোতে তিনি সর্বোচ্চ ভোট পেলেও সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি কোন ভোট পাননি। রেযা খান তাঁকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার উদ্দেশ্যে খোরসানে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘ আট বছর নির্বাসনে থাকার পর তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় এবং কোমরের বেল্ট দিয়ে ফাঁসিতে লটকিয়ে রেখে আত্মহত্যার কথা প্রচার করা হয়।

শহীদ হাসান মুদাররেসের রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তিনি ক্ষমতার ভারসাম্যের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন, যাকে বর্তমানে আমরা প্রাচ্যও নয়, পাশ্চাত্য নয়নীতি হিসেবে অভিহিত করে থাকি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, স্বাভাবিক কারণেই মানুষের জন্য স্বাধীনতা এবং বন্ধনমুক্তি প্রয়োজন। এজন্যই তিনি বলতেন : যে কেউ সাম্রাজ্যবাদীদের নীতির প্রতি ঝুঁকে পড়বে, সে আমাদের জনগণের সমর্থন হারাবে। চাই সে ঝোঁক প্রবণতা রাশিয়া, ব্রিটেন অথবা অবশিষ্ট পৃথিবীর যে কারো প্রতিই হোক। আমরা জোটনিরপেক্ষই থাকতে চাই।তিনি বিশ্বাস করতেন ইসলামী জীবনাদর্শের বাস্তবায়ন ছাড়া জাতির ও দেশের কোন কল্যাণ হতে পারে না। তিনি বলতেন : আমাদের প্রকৃত মূলনীতি হচ্ছে আমাদের ধর্ম। যারা আমাদের বিরোধিতা করবে, আমরাও তাদের বিরোধিতা করব- তারা যারাই হোক না কেন।তাঁর একটি কথা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলতেন : আমাদের রাজনীতি হচ্ছে আমাদের ধর্ম আর আমাদের ধর্মই হচ্ছে আমাদের একমাত্র রাজনীতি।

শহীদ মুদাররেস সম্পর্কে ইমাম খোমেইনী (রহ.) বলেন : রেযা শাহ মুদাররেসকে এত ভয় করত যে, সে বিদ্রোহী তথা সশস্ত্র দস্যুদেরকেও এত ভয় করত না। মুদাররেস রেযা খানকে অনেক বীভৎস ও ঘৃণ্য কাজ থেকে বিরত রেখেছেন, অবশেষে রেযা খান তাঁকে গ্রেফতার করেছে এবং হত্যা করেছে।

(নিউজলেটার, ডিসেম্বর ১৯৯১)

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য

ইসলামী বিপ্লবের পথিকৃত ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমামে উম্মত আয়াতুল্লাহ আল-উজমা খোমেইনী (রহ.) ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ইরানের খোমেইন শহরে এক প্রসিদ্ধ ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোস্তফা মুসাভী একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন। তাঁর মাতাও ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতার সন্তান। মহান ইমামের পূর্ব পুরুষগণ কাশ্মীরের অধিবাসী ছিলেন।

হযরত ইমাম (রহ.)-এর আসল নাম রুহুল্লাহ এবং পারিবারিক উপাধি মোস্তফাভী। কিন্তু ধর্মীয় নেতা হিসাবে খ্যাতিলাভের সাথে সাথে তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী খোমেইন শহরের অধিবাসী হিসাবে তিনি খোমেইনী হিসাবে সমধিক পরিচিত লাভ করেন। এছাড়া তাঁর নামের দ্বিতীয় অংশ মুসাভীএকথাই নির্দেশ করে যে, তিনি আহলে বাইতের সপ্তম ইমাম হযরত মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর বংশধর। উক্ত ইমামের ডাক নাম ছিল হযরত ইমাম মূসা কাজিম (আ.)। মহান ইমামের পিতামাতা তিন ছেলে এবং তিন মেয়ের অধিকারী ছিলেন। ইমামের বড় ভাইয়ের নাম আয়াতুল্লাহ পাছান্দিদেহ। তিনি একজন মুজতাহিদ ফকীহ। তিনি এখনো জীবিত আছেন। তাঁর ছোট ভাই আয়াতুল্লাহ হিন্দিও একজন মুজতাহিদ ফকীহ।

প্রাথমিক জীবন

শৈশবকালেই ইমামের পিতা দুষ্কৃতকারীদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন এবং পনের বছর বয়সে তাঁর মাতাও তাঁকে রেখে ইন্তেকাল করেন। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁর বড় ভাইয়ের নিকট প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি আরাক শহরের দীনী শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি হন। তারপর ধর্মীয় নগরী কোম-এ এসে তিনি জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি স্বীকৃতি মুজতাহিদ পর্যায়ে উন্নীত হতে সক্ষম হন। আরবি, ব্যাকরণ, আরবি সাহিত্য, দর্শন, উসূল, হাদীস, ফিকাহ, জ্যোতির্বিদ্যা এবং তাসাউফে তিনি বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। অতঃপর তিনি কোমের দীনী শিক্ষাকেন্দ্রে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৬৪ সনে দেশ থেকে নির্বাসিত হবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানে অধ্যাপনা অব্যাহত রেখেছিলেন।

হযরত ইমাম খোমেইনী ২৭ বছর বয়সে বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রী বেগম বাতুল সাকাফীও এক ধর্মীয় পরিবারের কন্যা। তাঁরা দুই পুত্র এবং তিন কন্যা মোট পাঁচ সন্তানের অধিকারী হন। ইমামের প্রথম পুত্র আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেইনী বিপ্লবের প্রায় দেড় বছর পূর্বে সাভাক এজেণ্টদের হাতে ইরাকে শহীদ হন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমিন সাইয়্যেদ আহমদ খোমেইনী ইরানে এবং বিশ্বের মাঝে একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ইমামের প্রথমা কন্যা বেগম যাহরা মোস্তাফাভী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মহিলা সমিতির সভানেত্রী।

আন্দোলন ও নেতৃত্ব

ইরানের ওলামায়ে কেরামগণের সংগ্রামী ঐতিহ্য বহুদিনের পুরানো। বিশেষ করে ইরানে দীনী শিক্ষাকেন্দ্রগুলো সর্বদা সহকারী নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকায় এবং ইসলাম সম্পর্কে ওলামাদের ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান থাকায় আলেম সমাজের এক বিরাট অংশ সবসময়েই স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামমুখর ছিলেন। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) নিজেও জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানসাধনার পাশাপাশি দেশে সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টি রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতেন।

এ সময় ইরানের ব্রিটিশ এজেন্ট রেযা খানের স্বৈরশাসন চলছিল। রেযা খান দেশ থেকে ইসলামী মূল্যবোধ অপসারণ করতে এবং পশ্চিমা ভাবধারা চালু করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এ কাজে একদল পশ্চিমা এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এগিয়ে আসে। এরা আদর্শিক, সাংস্কৃতিক এবং চিন্তাগত দিক থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। বিশেষ করে ওয়াহাবী চিন্তাধারার আশ্রয় নিয়ে তারা ইসলামের বহু মৌলিক বিষয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে থাকে। ইসলামের বিরুদ্ধে এরূপ আদর্শিক আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য হযরত ইমাম (রহ.) কাশফুল আসরার’ (গোপন রহস্যের ফাঁস) নামে একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। বইটি ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থ প্রকাশের ফলে পাশ্চাত্যপন্থী বুদ্ধিজীবীদের আদর্শিক, সাংস্কৃতিক আক্রমণ সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে যায়। এর ফলে জনগণ যে তাদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিল শুধু তাই নয়; বরং জনগণের কাছে এরা ইসলাম ও দেশের দুশমন এবং বহিঃশক্তির তাঁবেদাররূপে চিহ্নিত হয়ে যায়।

ইতিমধ্যে দেশের অভ্যন্তরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়ে যায়। যেমন : ইংরেজরা রেযা খানকে সরিয়ে তার পুত্র মোহাম্মদ রেযাকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে এবং মোহাম্মদ রেযাকে শাহউপাধিতে ভূষিত করে। এরপর ১৯৫৩ সালে ইরানে শাসনতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। ঐ সময়ে পার্লামেণ্টের স্পীকার ছিলেন আয়াতুল্লাহ কাশানী। তখন দেশে তেল সম্পদের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে গণ অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক তেল জাতীয়করণের জন্য পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করেন। পার্লামেন্ট কর্তৃক এ বিল গৃহীত হয়। পরিস্থিতির জটিলতায় ভীত হয়ে শাহ দেশ থেকে পলায়ন করেন। এমতাবস্থায় ইংরেজরা ইরানের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার আর কোন সম্ভাবনা না দেখে ইরানকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করে। এর ফলে সি.আই.এ দ্বারা পরিচালিত এক সামরিক অভ্যুথানে মোসাদ্দেক সরকার উৎখাত হয় এবং শাহ আবার দেশে ফিরে আসেন। তখন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান মার্কিন স্বার্থের পাহারাদারে পরিণত হয়। শুধু তাই নয়, আমেরিকা ইরানের তেল সম্পদ আত্মসাতের পাশাপাশি দেশটিকে মার্কিন ভোগ্যপণ্যের বাজারে পরিণত করে। আর এ লক্ষ্যে আমেরিকা শাহের সরকারের প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গ্রাম্য জনগণকে শহরে টেনে আনতে শুরু করে। ফলে ইরানের কৃষি ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এ সময়ে ইরানের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং ওলামায়ে কেরাম এসব অশুভ ষড়যন্ত্র এবং পাশ্চাত্যের আদর্শিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ককরণের দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকেন। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁদের অন্যতম ছিলেন।

এ সময়ে হযরত আয়াতুল্লাহ বুরুজেরদী (রহ.) ছিলেন কোমের জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের প্রধান। তিনি তখন সারা দেশের ওলামায়ে কেরামেরও নেতা ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি ইন্তেকাল করলে ওলামায়ে কেরাম হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্তরূপে বরণ করে নেন। তখন থেকেই ইমাম খোমেইনী (রহ.) জাতীয় দীনী নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

ঐ একই বছর মন্ত্রিসভা প্রাদেশিক ও নগর কাউন্সিল বিলনামে একটি বিল তৈরি করে। এতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য সংবিধানে উল্লিখিত পবিত্র কোরআন নিয়ে শপথ করার শর্ত তুলে দেওয়া হয়। আর তার পরিবর্তে যে কোন ধর্মগ্রন্থ নিয়ে শপথ করার প্রস্তাব করা হয়। এটি ছিল পরিপূর্ণ ধর্মহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি চাতুর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। কোমের আলেমগণ সমস্বরে এ বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন। হযরত ইমাম খোমেইনী প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রেরিত এক তারবার্তায় এহেন বিলের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন এবং সেই সাথে জনগণকে এ বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে আহ্বান জানান। এ ব্যাপারে সাধারণ ধর্মঘটের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী অন্য কোন উপায় না দেখে বিলটি প্রত্যাহার করে নেন।

ইরানকে মার্কিন ভোগ্যপণ্যের বাজারে পরিণত করা এবং সে লক্ষ্যে কৃষি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সরকার একটি শহরমুখী সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এর নাম দেয়া হয়েছিল শ্বেত বিপ্লব’, ‘শাহ এবং জনগণের বিপ্লব। কিন্তু সারাদেশের আলেমগণ এর বিরোধিতা করেন। এ রকম অবস্থায় শাহ এক প্রতারণামূলক ভোটের আয়োজন করে। ১৯৬৩ সালের ২৬ জানুয়ারি গণভোটের দিন ধার্য করা হয়েছিল। ইমাম খোমেইনী এ গণভোট বর্জন করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ফলে নির্ধারিত দিনে দেখা গেল শাহের গুপ্ত পুলিশ সাভাকের লোকজন এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্য ব্যতীত সাধারণ জনগণের আর কেউ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। ফলে শাহের এ ষড়যন্ত্র ভণ্ডুল হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকারি প্রচারমাধ্যমসমূহ সংস্কার পরিকল্পনার সপক্ষে জনগণ কর্তৃক বিপুল ভোটদানের কথা প্রচার করে। এর কয়েকদিন পর ইমাম খোমেইনী (রহ.) ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রদত্ত এক ভাষণে শাহ সরকারের পাশ্চাত্যের তাঁবেদারি, মার্কিন ও ইসরাইলের প্রতি নতজানু এবং গণবিরোধী নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য জনগণের কাছে আহ্বান জানান। শাহের আমলে বল্গাহারা আমোদ-প্রমোদের মধ্য দিয়ে তের দিনব্যাপী ইরানী নববর্ষের উৎসব পালন করা হতো। কিন্তু ঘটনাক্রমে ঐ বছর নববর্ষ উৎসবের দ্বিতীয় দিন ছিল ২৫ শাওয়াল। ২৫ শাওয়াল হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর শাহাদাত লাভের দিন। এ উপলক্ষে ইমাম খোমেইনী (রহ.) নববর্ষ উৎসব বন্ধ রাখার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

জনগণ ইমামের এ আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিল। এর ফলে শাহের ক্রোধ ভীষণ বেড়ে গেল। উপরন্তু নববর্ষের দিনে (২২ মার্চ, ১৯৬৩) ইমামের আহ্বানে হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে কোমে এক বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সমাবেশকে ভণ্ডুল করার লক্ষ্যে শাহের সাভাক এবং সেনাবাহিনীর লোকেরা কোমের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা-ই-ফয়াজিয়াতে আলেমদের এবং জনতার ওপর হামলা চালিয়ে বহুসংখ্যক লোককে শহীদ ও আহত করে। ইমাম খোমেইনী তাঁর ভাষণে এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি আমেরিকার প্রতি শাহের নতজানু নীতির স্বরূপ ফাঁস করে দেন এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য জনগণকে ডাক দেন। এছাড়া এ ব্যাপারে জনমত গঠনের জন্য সকল আলেমের প্রতি আহ্বান জানান।

৫ই জুনের গণঅভ্যুত্থান

ইমাম খোমেইনীর আহ্বানে আলেমগণ তাঁদের বক্তৃতা, ভাষণ ও খুতবায় শাহী শাসনের ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী চেহারা জনগণের সামনে তুলে ধরতে শুরু করেন। সেই সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ষড়যন্ত্র তুলে ধরলেন তাঁরা। এমতাবস্থায় শাহের সরকার মাদ্রাসা-ই-ফয়জিয়াতে ইমাম খোমেইনীর জন্য বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ইমাম এ ঘোষণার প্রতি কর্ণপাত করলেন না। তিনি আশুরার দিন বিকালে মাদ্রাসা-ই-ফয়জিয়াতে এক বিশাল জনসমাবেশ ভাষণ দেন। সে ভাষণে তিনি শাহের ইসলামবিরোধী সরকারকে প্রতিরোধ করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান করেন। সেই রাতেই ইমামকে গ্রেফতার করা হয় এবং কোমে নিয়ে আসা হয়। পরদিন ৫ই জুন শাহী সরকারের বিরুদ্ধে এবং ইমামের মুক্তির দাবিতে কোমে এবং তেহরানে এক গণঅভ্যুত্থান হয়। শাহের সরকার এ ঘটনা মোকাবিলার জন্য সামরিক আইন জারি করে এবং সেনাবাহিনীর সাহায্যে এ বিক্ষোভ দমনের পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু জনগণ সামরিক আইনকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসে। সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। সেনাবাহিনীর গুলিতে সেদিন কোম ও তেহরানে প্রায় সাড়ে পনের হাজার লোক শহীদ হয়।

শাহী সরকার নিষ্ঠুর পন্থায় গণঅভ্যুত্থানের মোকাবিলায় আপাতত সফল হলেও সর্বত্র বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ এবং চাপা গণ-অসন্তোষ অব্যাহত থাকে। তাই পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য সরকার কয়েক মাসের মধ্যেই ইমামকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ইমাম খোমেইনী আবার কোমে ফিরে আসেন। ইতিমধ্যে ফয়জিয়া মাদ্রাসার হত্যাকা-ের বার্ষিকী উপস্থিত হয়। ইমাম খোমেইনী মাদ্রাসা-ই-ফয়জিয়াতে গণসমাবেশ এক জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে শাহের ইসলামবিরোধী নীতি, আমেরিকার নিকট তার তাঁবেদারিত্ব এবং ইসরাইল-প্রীতির বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক করে দেন।

এরই মধ্যে সরকার মার্কিন নাগরিকদেরকে কতকগুলো বিশেষ সুবিধা প্রদান করে আইন প্রণয়ন করে। এসব দেয় সুবিধার মধ্যে সর্বাধিক ক্ষতিকারক বিষয় ছিল এটা যে, ইরানে বসবাসকারী কোন মার্কিন নাগরিক ইরানের মাটিতে কোন অপরাধ করলে ইরানী আদালতে তার বিচার করা যাবে না। ইমাম খোমেইনী এ আইনের বিরুদ্ধে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রচারপত্র আকারে বিবৃতিটির হাজার হাজার কপি সারাদেশে বিতরণ করা হয়। ফলে জনগণ এ আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।

তুরস্কে নির্বাসন

শাহের সরকার এ সকল ঘটনাপ্রবাহ থেকে এ উপসংহারে উপনীত হলো যে, ইমাম খোমেইনী (রহ.) যতদিন দেশে থাকবেন ততদিন জনগণের মধ্য থেকে সরকারবিরোধী মনোভাব দূর করা সম্ভব হবে না। তাই ১৯৬৪ সালের ৪ঠা নভেম্বর কোম থেকে ইমামকে গ্রেফতার করে সরাসরি তেহরানের মেহেরাবাদ বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সময়ে অন্য নেতৃবৃন্দকেও গ্রেফতার অথবা গৃহবন্দি করা হয়। ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোস্তফা খোমেইনীকে দুই মাস কারাগারে রাখার পর তাঁকেও তুরস্কে নির্বাসন দেয়া হয়।

কিন্তু ইমাম খোমেইনীকে নির্বাসিত করার পরও ইরানী জনগণের আন্দোলনে মোটেই ভাটা পড়েনি। ইতিমধ্যে ইসলামী আন্দোলনের জনৈক কর্মী প্রধানমন্ত্রী হাসান আলী মনসুরকে হত্যা করেন। অন্যদিকে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের নিকট চিঠি পাঠিয়ে শাহী সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইমামকে বেআইনিভাবে নির্বাসিতকরণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এছাড়া তুরস্ক সরকার ইমামের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলে তাঁরা এ কাজেরও প্রতিবাদ জানান। অতঃপর ইরান ও তুরস্কের সরকারদ্বয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে ইমামকে ইরাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ সময় ইরাক সরকার এবং ইরান সরকারের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না। তাই ইরাক এ শর্তে তাঁকে গ্রহণ করতে রাজি হয় যে, তিনি ইরাকে অবস্থানকালে তাঁর মর্যাদা ও তৎপরতা সম্পর্কে ইরান সরকারের  কোন বক্তব্য থাকবে না। ইরাকের কারবালা, নাজাফ, সামেরা, কাজেমিন, ও কুফা এ চারটি শহর দীনী জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এছাড়া এ শহরগুলো শিয়া মাজহাবের লোকদের কাছে ধর্মীয় গুরুত্বের অধিকারী। আর তাই ইরাকই ছিল ইমাম খোমেইনীর জন্য সর্বোত্তম জায়গা।

ইরাকে ইমাম খোমেইনী (রহ.)

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) তুরস্কে বছরখানেক ছিলেন। সেখান থেকে ইরাকে এসে তিনি ইরাকের সবচেয়ে বড় দীনী জ্ঞানকেন্দ্র ধর্মীয় নগরী নাজাফে অবস্থান গ্রহণ করলেন। এখানে থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান বিতরণ ও গ্রন্থ রচনা করলেন এবং ইরানী জনগণের আন্দোলনের পথনির্দেশনা প্রদানের কাজ অব্যাহত রাখলেন। নাজাফে অবস্থানকালেই তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বিলায়াতে ফকিহ’ (ফকিহদের শাসন) রচনা করেন। এ গ্রন্থই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করে। কারণ, বিলায়াতে ফকিহ বা মুজতাহিদ ফকিহর শাসনের অপরিহার্যতার অর্থই হচ্ছে ফকিহ নয় এমন শাসকের শাসনব্যবস্থা অবৈধ এবং অগ্রহণযোগ্য- তা রাজতন্ত্রই হোক অথবা অন্য যে কোন সরকারই হোক।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) বাণীবদ্ধ ক্যাসেট প্রেরণের মাধ্যমে ইরানী জনগণকে পথনির্দেশ প্রদান করতেন। বিদেশে অবস্থানরত ইরানী জনগণও একই পদ্ধতিতে পথনির্দেশনা লাভ করতেন। এতে তিনি ইসলামী হুকুমতের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেন। এ বিষয়টিকে তিনি অপরিহার্য দীনী দায়িত্ব হিসাবে উপস্থাপন করেন। ইমাম খোমেইনীর এসব মহান বাণী গোপনে হাজারো কপি হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ত। এছাড়া ইমামের অনুসারী আলেমগণও দ্বীনী অনুষ্ঠানাদিতে বেলায়েত ফকিহ বা ইসলামী হুকুমত সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকেন।

ইমাম খোমেইনী ইসলামী আন্দোলনের সাধারণ পথনির্দেশন প্রদান করা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতেও জনগণের উদ্দেশ্যে বাণী পাঠাতেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় ইরানী রাজতন্ত্রের আড়াই হাজার বার্ষিকী উপলক্ষে শাহ এক বিরাট ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এ উপলক্ষে শুধু তেহরানেই ৮০ কোটি রিয়াল (তৎকালীন হারে প্রায় তিন কোটি ডলার) ব্যয় করা হয়। জনগণের সম্পদের এহেন অপচয় অপব্যবহারের বিরোধিতায় কঠোর সমালোচনা করে ইমাম এক বাণী প্রেরণ করেন। এছাড়া শাহ তথাকথিত আধুনিক গণতন্ত্রের সাইবোর্ড লাগাবার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের দ্বারা রাস্তখিজ’ (গণজাগরণ বা পুনরুত্থান) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করলে ইমাম তাঁর বাণীতে গণবিরোধী এ দলে যোগদান করতে তাদেরকে নিষেধ করেন।

বিপ্লব

শাহের সরকার আন্দোলনের অবসান ঘটাবার লক্ষ্যে তার গুপ্ত পুলিশ বাহিনী সাভাকের মাধ্যমে ইমাম খোমেইনীকে হত্যা করার পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু এ পরিকল্পনা কার্যকর করতে শাহ ব্যর্থ হন। তবে  ১৯৭৭ সালের ২৩ অক্টোবর সাভাকের এজেণ্টদের হাতে ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেইনী শাহাদাত বরণ করেন। এতে ইরানী জনগণের মধ্যে ক্ষোভের মাত্রা আরো ধুমায়িত হয়ে উঠল। এর কিছুদিন পর এমন একটি ঘটনা ঘটল যা বারুদের গুদামে জ্বলন্ত দিয়াশলাই নিক্ষেপের সমান ছিল।

১৯৭৮ সালের ৭ জানুয়ারি তেহরানের একটি দৈনিক পত্রিকায় ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর অবমাননা করে প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে সারা ইরান বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। বিশেষ করে কোম এবং তাবরীজে প্রচ- গণবিক্ষোভ হয়। এসব বিক্ষোভের বিরুদ্ধে দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতির উত্তপ্ততা স্থায়ীরূপ ধারণ করে। অর্থাৎ বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে নিহতদের জন্য শোক মিছিল হয় এবং মৃত্যুর চল্লিশতম দিনেও প্রথা অনুযায়ী শোকানুষ্ঠান হয়। এসব শোক মিছিল ও শোকানুষ্ঠান সহজেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভ-সমাবেশ ও বিক্ষোভ-মিছিলে পরিণত হয়। এর জন্য নতুন দমনমূলক পদক্ষেপ নিলে আবারো নতুন হত্যাকা- হয়। এর ফলে আবারো শোক-বিক্ষোভ হয়। এভাবে একটার পর একটা চলতে থাকে। ১৯৭৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে তেহরানের জালেহ স্কয়ারে (বর্তমানে শুহাদা স্কয়ার) এক গণবিক্ষোভে সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রায় পাঁচ হাজার লোক শহীদ হয়।

ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হলে শাহের সরকার ইমাম খোমেইনী (রহ.)-কে অবাধ তৎপরতার সুযোগ না দেয়ার জন্য ইরাক সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ইতিমধ্যে ১৯৭৫ সালে ইরানের শাহী সরকার এবং ইরাকের বাথপন্থী সরকারের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তাই ইরাক সরকার ইরানকে খুশি করার জন্য নাজাফে হযরত ইমাম খোমেইনীকে গৃহবন্দি করে। এর ফলে ইরানী জনগণ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ইরাকী সরকারের এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও আপত্তি ওঠে। অগত্যা ইরাক সরকার ইমামের নজরবন্দির আদেশ তুলে নেয়, কিন্তু নানাভাবে তাঁর তৎপরতায় বাঁধা সৃষ্টি অব্যাহত রাখে। ইরানী জনগণ ইমামকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাতে থাকে। কিন্তু শাহ সরকার এতে রাজী হয়নি। অগত্যা ইমাম তৃতীয় কোন দেশে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ১৯৭৮ সালের ৪ অক্টোবর নাজাফ থেকে কুয়েত রওয়ানা হলেন, কিন্তু কুয়েত সরকার তাঁকে সেদেশে প্রবেশের অনুমতি না দিলে তিনি পুনরায় নাজাফ প্রত্যাবর্তন করেন। দুদিন পর তিনি প্যারিস যাত্রা করেন।

ইমামের প্যারিস আগমনের ফলে একদিকে যেমন ইরানী জনগণের আন্দোলনের খবরাখবর আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, অন্যদিকে বিদেশে বসবাসকারী ইরানীরা ইমামের নিকট আসা-যাওয়া করতে থাকে। আর এদিকে ইরানে শাহের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান ও ইমামকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে উপর্যুপরি বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।

জনগণকে শান্ত করার লক্ষ্যে শাহ একের পর এক রাজনৈতিক চালবাজির আশ্রয় নিতে থাকেন। তিনি দমননীতি, বহিঃশক্তির তাঁবেদারি এবং ইসলামবিরোধী কার্যকলাপের দায়িত্ব এড়াবার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী হোভেইদাকে পদচ্যুত ও কারাগারে নিক্ষেপ করেন। রাস্তখিজ দল ভেঙে দেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলসমূহের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। রাজবন্দিদের মুক্তি দেন, মিছিল-সমাবেশের অনুমতি দেন। সাইরাস ক্যালেন্ডার বাতিল করেন এবং বাতিলকৃত হিজরি সৌর-ক্যালেন্ডার পুনঃপ্রবর্তন করেন। শাহ এরকম আরো অনেক চালবাজি করেন। কিন্তু ইমাম খোমেইনী এসব রাজনৈতিক চালবাজিতে না ভুলে শাহের পতন ও ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ফলে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।

নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী জাফর শরীফ ইমামী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় শাহ তাঁকে সরিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান আজহারীকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। আজহারী সামরিক শাসন জারি করেও ব্যর্থ হলে শাহ তাঁকে সরিয়ে আমেরিকাপন্থী শাপুর বখতিয়ারকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। বখতিয়ারও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। এমতাবস্থায় ১৬ জানুয়ারি ১৯৭৯ তারিখে শাহ দেশত্যাগ করেন। দেশত্যাগের সময় তিনি সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী, সেনাবাহিনী প্রধান ও প্রধান বিচারপতি সমন্বয়ে একটি রাজ পরিষদ গঠন করে যান। কিন্তু পরিষদের সভাপতি, প্রধান বিচারপতি প্যারিস গিয়ে ইমামের নিকট আনুগত্য ঘোষণা করেন।

ইমামকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য জনগণের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে, কিন্তু বখতিয়ার এ দাবিকে উপেক্ষা করেন। এমতাবস্থায় বখতিয়ারের অনুমতি ছাড়াই ইমাম দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। অতঃপর ১৯৭৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এ উপলক্ষে মেহেরাবাদ বিমানবন্দর থেকে শহীদদের গোরস্তান বেহেশতে যাহরা পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। অন্তত পঞ্চাশ লাখ নারী-পুরুষ ইমামকে অভ্যর্থনা জানায়। বিশ্বের ইতিহাসে ইতিপূর্বে অন্য কোন নেতা এতবড় অভ্যর্থনা পাননি।

বেহেশতে যাহরায় জনগণের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি সরকার গঠন করবেন। কয়েকদিন পর তিনি বজারগানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। বজারগান মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এর পাশাপাশি ইমাম একটি বিপ্লবী পরিষদও গঠন করেন। ফলত দেশে দুটি সরকার হলো। বখতিয়ার সরকারের কার্যত দেশের ওপর কোনই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ছিল না। তবু তিনি সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করলেন, সামরিক আইন জারি করলেন। ইমাম জনগণের ওপর সামরিক আইন অমান্য করার নির্দেশ দিলেন। ফলে দশই ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলো। বিমানবাহিনী আগেই ইমামের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিল, এবার সেনাবাহিনীও বিভক্ত হয়ে পড়ল। ফলে সেনাবাহিনীর অফিসাররা শীঘ্রই সৈন্যদেরকে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। এভাবে ১১ই ফেব্রুয়ারির প্রভাতে শাহ নিয়োজিত বখতিয়ার সরকারের পতন ঘটল। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হলো।

বিপ্লবোত্তর কালে : ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে একটি মুহূর্তের জন্যও ভিতর ও বাইরের ইসলামবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র ও নাশকতা থেকে মুক্ত থাকেনি। বিপ্লবকে ধ্বংস বা এর গতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে আমেরিকা এবং তার এজেন্টরা বহুমুখী ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা অব্যাহত রাখে। বহু শীর্ষস্থানীয় দীনী ব্যক্তিত্বকে তারা হত্যা করে। সুকৌশলে নিজেদের এজেন্টকে প্রেসিডেন্ট পদে পর্যন্ত বসাতে সক্ষম হয়। মহান ইসলামী চিন্তাবিদ আয়াতুল্লাহ মোতাহহারীকে শহীদ করে, ইমামের পরে প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ তালেকানীকে বিষ প্রয়োগে শহীদ করে। বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ইমামের প্রিয় শিষ্য প্রধান বিচারপতি আয়াতুল্লাহ বেহেশতীসহ দেশের ৭৩ জন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে শহীদ করে। আরেক বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট রাজায়ী ও প্রধানমন্ত্রী বাহোনারকে শহীদ করে। বর্তমান নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীকে হত্যার ব্যর্থ প্রয়াস পায়। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে এবং আমেরিকার ব্যাংকসমূহে গচ্ছিত ইরানী সম্পদরাশি আটক করে, ইরাকের মাধ্যমে ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়, কুর্দিস্তানে বিদ্রোহের সৃষ্টি করে, মাদকদ্রব্য বিস্তারের ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ রকম অসংখ্য সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে।

চির বিদায়

ইসলামী বিপ্লবের পর অনেক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বিপ্লবের ভাগ্য নির্ধারণী প্রতিটি সমস্যার মোকাবিলা করে এবং সমস্ত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে এ বিপ্লব টিকে গেছে। বিপ্লবের নেতা-কর্মীদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এখন আর এ ভয় নেই যে, এ বিপ্লবকে কেউ ধ্বংস বা পথচ্যুত করতে পারবে। তাই এবার ইমামের জন্য সেই মুর্হূতটি এসে হাজির হলো যে মুহূর্তটির জন্য তিনি দীর্ঘ দিন যাবৎ প্রহর গুণছিলেন। এবার তাঁর প্রিয় সন্নিধান থেকে ডাক এলো। ৩রা জুন ১৯৮৯, রাত দশটা বিশ মিনিটের সময় তিনি এ ধূলির ধরণী ছেড়ে আলমে মালাকুত পানে উড্ডয়ন করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

ইমামের ইন্তেকাল ইরানী জনগণ এবং সারাবিশ্বের ইসলামী বিপ্লবকামী ও মুস্তাযআফ (নির্যাতিত) জনগণ শোকে ভেঙে পড়ে। শুধু তেহরানেই এক কোটি মানুষ ইমামের নামাযে জানাযা ও দাফন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। বিশ্বের ইতিহাসে কোনদিন কোন ব্যক্তির ইন্তেকালে এত মানুষের অশ্রু ঝরেনি। মহান আরেফ হযরত ইমাম খোমেইনীর মাযার এখন দেশ-বিদেশের মুসলমানদের যিয়ারতগাহ। জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন বিশ্বের বিপ্লবী মুসলমান ও মুস্তাযআফ জনতার জন্য প্রেরণার উৎস, মৃত্যুর পরে কবরে শায়িত থেকেও তিনি সে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন- তাঁর মাযারে গিয়ে ইরানের ও বিশ্বের বিপ্লবীরা ইসলামী বিশ্ববিপ্লবের শপথ নিয়ে শয়তানি পরাশক্তিবর্গ ও তাদের তাঁবেদারদের বিরুদ্ধে নবতর উদ্যমে আপোষহীন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

(নিউজলেটার, ডিসেম্বর ১৯৯১)