All posts by dreamboy

তেহরান পরমাণু চুল্লির সর্বাধুনিক কন্ট্রোল রুম উদ্বোধন

জাতীয় পরমাণু প্রযুক্তি দিবস উপলক্ষে ‘তেহরান পরমাণু চুল্লি’র সর্বাধুনিক কন্ট্রোল রুম উদ্বোধন করা হয়েছে। এটাকে ইরানের পরমাণু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

পরমাণু চুল্লির সর্বাধুনিক কন্ট্রোল রুমটি ইরানেই নির্মাণ করা হয়েছে এবং এটি নির্মাণে প্রায় চার বছর সময় লেগেছে। জাতীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান আলী আকবর সালেহি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, তেহরান পরমাণু চুল্লির কন্ট্রোল রুমের উদ্বোধন পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রে আরেক ধাপ অগ্রগতি।

তিনি বলেন, তেহরান পরমাণু চুল্লির কন্ট্রোল রুমে ব্যবহৃত প্রযুক্তিটি ছিল প্রায় ৫০ বছর আগের। এখানে অ্যানালগ সিস্টেমে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু এখন এনালগ ও ডিজিটাল সিস্টেমের সমন্বয়ে সর্বাধুনিক কন্ট্রোল রুম তৈরি করা হয়েছে। পরমাণু ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য বিভিন্ন অঙ্গনে কাজে লাগানো হবে বলেও তিনি জানান।

রেডিও তেহরান, ১০ এপ্রিল, ২০১৪

সম্পাদকীয়

ইসলামী বিপ্লবের সফল অভিযাত্রার পঁয়ত্রিশ বছর
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ইরানী বর্ষপঞ্জির ১৩৫৭ সালের ২২শে বাহ্মান মোতাবেক খৃস্টীয় ১৯৭৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি মহান দ্বীনী নেতা ওলীয়ে কামেল হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ইরানের ইসলাম-প্রিয় জনগণ আড়াই হাজার বছরের তাগূতী রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও বহিঃশক্তির পদলেহী তৎকালীন শাহের ইসলাম-বিরোধী গণ-দুশমন সরকারকে উৎখাত করে মহান ইসলামী বিপ্লবকে- যা ছিল বিংশ শতাব্দীর, বরং হাজার বছরেরও বেশি কালের বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম গণবিপ্লব- বিজয়ী করেন। এ বিজয়ের অব্যবহিত পরেই ইরানী জনগণ হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি গণভোটে অংশগ্রহণ করে প্রায় সর্বসম্মত রায়ে আল্লাহ্ তা‘আলার আইন এবং হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) ও মাসুম ইমামগণের (আ.) দিকনির্দেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইরানের বুকে একটি পুতপবিত্র আদর্শ দ্বীনী সমাজ ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।
যেহেতু ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা- যা মানুষের ইহ ও পরকালীন উভয় জীবনের সকল ক্ষেত্রের সর্বোত্তম কল্যাণ ও সাফল্য নিশ্চিত করে এবং এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর অর্পিত সেহেতু ইসলামী প্রজাতন্ত্র কেবল ইরানী জনগণের দ্বীনী ও চারিত্রিক উন্নয়নই নিশ্চিত করে নি, বরং দুর্নীতিমুক্ত দ্বীনী সমাজ ও প্রশাসনের বদৌলতে এবং সর্বোপরি আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে আন্তরিকতা ও দৃঢ়তা সহকারে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জন সহ সর্বাত্মক পার্থিব উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে নযিরবিহীন সাফল্যের অধিকারী হয়েছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা সহ ইসলাম ও ইসলামী হুকুমতের দুশমনদের শত্রুতামূলক সর্বাত্মক অপতৎপরতার বাধাবিঘেœর পাহাড় অতিক্রম করে- যা শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্ববাসীর বিস্ময়ের কারণ হয়েছে।
বিগত পঁয়ত্রিশ বছরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সহ সার্বিক ক্ষেত্রে যে বিস্ময়কর উন্নতি ও অগ্রগতি হাসিল করেছে তার সবগুলো শিরোনাম উল্লেখ করাও অত্র সীমিত পরিসরে সম্ভব নয়। এখানে কেবল এতোটুকু উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে, বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি হবার দাবিদার বলদর্পী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যায়নবাদী ও পাশ্চাত্য বিশ্বের রক্তচক্ষু হুমকি উপেক্ষা করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বিশ্বের অন্য সকল রাষ্ট্রের সাথে, বিশেষ করে বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশের সাথে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুধু বজায় রেখেই চলছে না, বরং এ সম্পর্ক দিন দিন অধিকতর শক্তিশালী ও গভীরতর করতে সক্ষম হচ্ছে। এছাড়া ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান বিগত সাড়ে তিন দশক কালে জাতিসংঘ, ন্যাম, ওআইসি, ইসিও ইত্যাদি সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে স্বীয় দৃষ্টিগ্রাহ্য উপস্থিতি বজায় রেখেছে এবং এখনো রেখে চলেছে, বিশেষ করে ন্যামের ইতিহাসের সফলতম সম্মেলনের স্বাগতিক দেশের ভূমিকা পালন করে শত্রু শিবিরকে হতবিহ্বল করে দিয়েছে। ইসলামী ইরান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তিপ্রচেষ্টার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সাক্ষরতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, টেলিফোন ও মোবাইল, বিজ্ঞান গবেষণা, বিশেষতঃ আইটি, পরমাণু বিজ্ঞান ও ন্যানো-টেকনোলজি, সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ, কৃষি, শিল্প, বৈদেশিক বাণিজ্য ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি করেছে এবং এগুলোর মধ্য থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উন্নতির গতি বা হারের দিক থেকে বিশ্বে বা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে শীর্ষস্থান বা তার কাছাকাছি স্থান দখল করতে সক্ষম হয়েছে।
এমনকি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও ইসলামী ইরান অবিশ্বাস্য সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সংস্কৃতির নামে অনৈতিক কার্যকলাপ এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা কঠোরভাবে পরিহার করা সত্ত্বেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে নির্মিত বহু চলচ্চিত্র সারা বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং সার্বিক মানের বিচারে প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থানীয় বিবেচিত হওয়ায় এমনকি পাশ্চাত্য জগতেও বহু পুরস্কার লাভ করেছে- যা প্রমাণ করে যে, ইসলামী মানদ- তথা পরিশীলিত রুচিবোধ বজায় রেখেও সর্বোত্তম শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব।
ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পঁয়ত্রিশতম বার্ষিকীতে আমরা দেশে-বিদেশে অবস্থানরত সকল ইরানী জনগণ, বিশ্বের সকল মুক্তিকামী মুস্তায্‘আফ জনগণ, ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সকল শুভানুধ্যায়ী এবং নিউজলেটারের সকল পাঠক-পাঠিকার প্রতি গভীর আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি এবং এ বিপ্লবের স্থায়িত্ব ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সার্বিক উন্নয়ন তৎপরতায় অধিকতর গতি সঞ্চারের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে একনিষ্ঠভাবে প্রার্থনা করছি।

লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্ব কুস্তি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ইরান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কুস্তি প্রতিযোগিতায় টানা তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইরান। আমেরিকার স্থানীয় সময় রোববার রাতে (ইরান সময় সোমবার ভোর ৫টায়) অনুষ্ঠিত ফাইনাল রাউন্ডে রুশ দলকে ৪-২ পয়েন্টে পরাজিত করে এ গৌরব অর্জন করে ইরান।

শনিবার থেকে শুরু হওয়া বিশ্ব ফ্রিস্টাইল কুস্তি প্রতিযোগিতা রোববার শেষ হয়। শনিবার প্রতিযোগিতার আগের কয়েকটি রাউন্ডে আর্মেনিয়াকে ৮-০ পয়েন্টে, তুরস্ককে ৭-১ পয়েন্টে, যুক্তরাষ্ট্রকে ৫-৩ পয়েন্টে এবং ভারতকে ৮-০ পয়েন্টে পরাজিত করে ইরানি কুস্তি দল।

ফাইনাল রাউন্ডের একক প্রতিযোগিতায় ৫৭ কেজি ওজন বিভাগে ইরানের হাসান রাহিমি রাশিয়ার কুস্তিগির ভিক্টর লেবেদেভের কাছে পরাজিত হন। এরপর ৬১ কেজি ওজন বিভাগে রাশিয়ার মুরাদ নুখকাদিয়েভকে পরাজিত করে ইরানের পক্ষে প্রথম জয় এনে দেন মাসুদ ইমাইলিপুর।

এরপর ৬৫ কেজি ওজন বিভাগে ইরানের পক্ষে পরপর দ্বিতীয় বিজয় ছিনিয়ে আনেন সাইয়্যেদ আহমাদ মোহাম্মাদি। তিনি দারুণ কুস্তিনৈপূণ্য দেখিয়ে তার রুশ প্রতিপক্ষ আলিবেঘাদঝি এমিভকে ঘায়েল করেন। ৭০ কেজি বিভাগে ইরানের মোস্তফা হোসেইনখানি রাশিয়ার খেতিক সাবোলোভকে পরাজিত করেন। এরপর ৭৪ কেজি ওজন বিভাগে রুশ কুস্তিগির আখমেদ গাদঝিমাগোমেদোভ তার ইরানি প্রতিপক্ষ ইজ্জাতুল্লাহ আকবারিকে হারিয়ে দেন।

পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত হয় ৮৬ কেজি ওজন বিভাগের প্রতিযোগিতা। এতে ইরানি কুস্তিগির এহসান লাশকারি তার রুশ প্রতিপক্ষ আনযোর ইউরিশেভকে ধরাশায়ী করেন। এরপর ৯৭ কেজি ওজন বিভাগে ইরানি ফ্রিস্টাইল কুস্তিগির রেজা ইয়াজদানি রাশিয়ার ইউরি বেলোনভস্কিকে পরাজিত করেন। সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় ১২৫ কেজি ওজন বিভাগের কুস্তি। এতে ইরানি প্রতিযোগী কোমেইল কাসেমি তার রুশ প্রতিপক্ষ আনযোর খেযরিয়েভকে হারিয়ে দেন। ফলে সার্বিকভাবে রাশিয়া ইরানের কাছে ৪-২ পয়েন্টে হেরে যায়। চ্যাম্পিয়ন হয় ইরান।

এর আগে ২০১৩ সালে তেহরানের আজাদি স্পোর্টস কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ফ্রিস্টাইল কুস্তি প্রতিযোগিতায় ইরান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। গত বছরের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় রাশিয়া রানার্স আপ ও যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল।

রেডিও তেহরান, ১৭ মার্চ, ২০১৪

তাওহীদ ও আল্লাহপ্রেমের প্রেরণাই মসনবী কাব্যের মূল সুর

প্রিন্সিপ্যাল এ. এ. রেজাউল করিম চৌধুরী

 রুমীর মসনবী আমাদের দেশে একটি জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। আমাদের মাদ্রাসাসমূহে এই মহাকাব্যের পঠন-পাঠন হয়ে থাকে। আমাদের আলেমসমাজ, পীর-মশায়েখ মসনবী থেকে উদ্ধৃতি পেশ করে ওয়াজ-নসীহত করেন। মসনবীর অনেক ছত্র আমাদের ভাষায় প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। মসনবী আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনকে সঞ্জীবিত করে রেখেছে।

ছয়শ’ বছরেরও অধিক কাল ফারসি আমাদের রাষ্ট্রভাষা ছিল। আরবি ও ফারসিমিশ্রিত বাংলাভাষাই আমাদের মাতৃভাষা। মসনবী ফারসি ভাষায় লিখিত অনন্য মহাকাব্য। এই মহাকাব্যকে অনুবাদ এবং এর দর্শনকে অবলম্বন করে আমাদের আত্মার জাগৃতিকে আমরা অব্যাহত রাখতে পারব।

আল্লাহর প্রেমের ওপর এত বড় মহাকাব্য পৃথিবীর অন্য কোন ভাষায় ও সাহিত্যে নেই। কাব্যকলার যত রূপ-আঙ্গিক আছে সবগুলোর সমাহার রুমীর মসনবী, Epic, lyric, ode, elegy, তথা কাব্যের যত রূপ এবং ঋড়ৎস আছে সবই সন্নিবেশিত হয়েছে মসনবীতে। মওলানার ভাষা, ছন্দ, শব্দ চয়ন, উপমা, রূপকল্প, প্রতীক তথা অলংকারশাস্ত্র প্রয়োগ ও ছন্দ প্রকরণে যে নৈপুণ্য দেখা যায় তা আর কোথাও পাওয়া যায় না। তাই সারা বিশ্ব মসনবীর শ্রেষ্ঠত্বে এবং মাহাত্ম্যে এত মুগ্ধ, অভিভূত।

মানবাত্মার ইতিকথা বর্ণনার মধ্য দিয়ে রুমী আমাদের অনন্ত জীবনের সন্ধান দিয়েছেন। তাঁর কাব্যের ছত্রে ছত্রে আমাদের আত্মা জেগে ওঠে, অনন্তের অন্বেষায় আমাদের সত্তা উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। রুমীর কাব্যপ্রেরণা তাওহীদ এবং রেসালাতভিত্তিক। তাই তাঁর কাব্যে সত্যিকার কাশ্ফ, এলকার আভাস পাওয়া যায়। এর সাথে খান্নাস ও শয়তানের প্রেরণালব্ধ কবিতার তুলনা হয় না। তিনি ঈমানদার, নেক আমলের কবি। হেদায়াতের পথকে তিনি সুপ্রশস্ত করেছেন।

আমরা আনন্দিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, প্রতিষ্ঠানে রুমীচর্চা ব্যাপকতা লাভ করেছে। রুমীর মসনবীসঞ্জাত খোদাপ্রেম, বিশ্বপ্রেম এবং মানবপ্রেম যতই জাগ্রত হবে ততই এই হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর হবে। রুমী আমাদের মত পার্থক্য পরিহার করে তাওহীদের মন্ত্রে উজ্জীবিত হবার প্রেরণা দিয়েছেন।

কাব্যকলায় যে Art অবলম্বন করেছেন তা গভীরভাবে প্রণিধানযোগ্য। আল্লাহর প্রতি আমাদের প্রেমকে প্রকাশ করার জন্য তিনি যে পন্থা অবলম্বন করেছেন তা হলো : প্রেমাস্পদের গোপন কথা লুকানো থাকা ভালো, বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে তা বলা যাবে, এসব গোপন রহস্য অন্যের কথাবার্তায় বলা যাবে। তুচ্ছ ঘাসের ওপর পাহাড় রাখা যাবে না, সূর্যকে কাছে আনলে অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। তাই রুমী আল্লাহপ্রেমের এই মহাকাব্যে অসংখ্য বাস্তব, কাল্পনিক কাহিনী, উপকথা, নীতিগল্প, রূপক কাহিনীর সাথে সংযোজিত করেছেন গভীর চিন্তা-চেতনার ¯্রােত যাতে আল্লাহপ্রেমের ঝংকার মানুষ অনুভব করতে পারে।

মসনবীর শুরুতে বাঁশীর রূপকে খোদা থেকে মানবাত্মার বিচ্ছেদ বিরহ যন্ত্রণার সুরকে উচ্চকিত করে মওলানা খোদাপ্রেমের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। এই প্রেমের পথে অন্তরায় নাফ্্সকে চিহ্নিত করে সেই নাফ্্সকে দমনের উপায় শিখেয়েছেন বাদশা বাঁদীর গল্পে।

তোতা এবং সবজি বিক্রেতার গল্পে তিনি আমাদের আল্লাহর ওলীদের নিজের অবস্থায় কেয়াস না করার জন্য সাবধান করে দিচ্ছেন। ইয়াহুদী রাজার খ্রিস্টান নিধন গল্প থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে আল্লাহ যালেমদের অবশ্যই ধ্বংস করে দেবেন যদি ঈমানদারগণ ঈমানের ওপর মজবুত থাকে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই গল্প থেকে আমাদের শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। সিংহ ও খরগোশের গল্পে আমরা তাকদীর-তদবীর সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, আখেরাত ভুলে গিয়ে দম্ভের সাথে দুনিয়ায় বাহাদুরি করতে থাকলে সিংহের মতো কুয়ায় পতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাব। অতি ক্ষুদ্র প্রাণীও বড় প্রাণীকে ধ্বংস করতে পারে যদি তা দাম্ভিক হয়।

ক্ষুদ্র ও দুর্বলকে আল্লাহ পাক এমন হেকমত, কৌশল দান করেন যা সবল এবং বিশাল আকৃতির মধ্যে দেখা যায় না। মৌমাছিকে, রেশম পোকাকে যে হেকমত দেয়া হয়েছে তাতো হাতিকে দেয়া হয়নি। মাটির তৈরি আদমকে ফেরেশতাদের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। বাহ্যিক বস্তুর বিজ্ঞানীরা অনেক কিছু আবিষ্কার করেন, কিন্তু আসল জ্ঞান তাঁদের নেই। মানুষের ছোট অন্তরে যে খোদার প্রেম আছে তা সাগরে-আকাশে নেই। বিজ্ঞানের বস্তুগত সাফল্য অনেক, কিন্তু বিজ্ঞান প্রেম কাকে বলে, জানে না। বিজ্ঞানের কোন প্রক্রিয়ায় প্রেমের বিশ্লেষণ নেই, অথচ খোদার প্রেম ছাড়া জীবনটাই নিষ্ফল।

রুমীর কাহিনীর মাধ্যমে খোদাপ্রেমের বর্ণনায় কেউ অসঙ্গতি দেখলেও তা ভিত্তিহীন। এ সম্পর্কে নিকলসন এবং Gustar বলেন : “To say that ‘The stories follow each other in no order’, is entirely wrong. They are bound together by subtle links and transitions arising from the poets’ development of his theme and each book forms an artistic whole.”

কবি মানবাত্মার খোদাপ্রেমের জাগতিক পরিবেশে বিকাশের ক্ষেত্রে যেসব অন্তরায় এবং সহায় আছে সেগুলোকে গল্পকারে মূর্ত করে এক সূক্ষ্ম চিন্তার সূত্রে অচ্ছেদ্যভাব গ্রথিত করে যে অপূর্ব কাব্যিক সুষমা সৃষ্টি করেছেন, বিশ্বের কাব্যসাহিত্যে তার তুলনা নেই।

মওলানা রুমীর মূল্যায়ন করে Nicholson যে মন্তব্য করেছেন, তা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন : “Today, the words I applied to the author of the Mathnabi thirty five years ago- ‘the greatest mystical poet of any age’ seem to me no more than just.

Where else shall we find such a panorama of Universal existence unrolling itself through time into eternity? And apart from the supreme mystical quality of the poem, what a wealth of satire, humour and pathos what masterly pictures drawn by a hand that touches nothing without revealing essential character.”

আমাদের বিশ্বজনীন অস্তিত্ব, কাল থেকে মহাকালে উত্তরণের যে অপূর্ব চিত্র সমাহার মসনবীতে বিদ্যমান তা পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই।

রুমীর সেই প্রসিদ্ধ উক্তি : ‘আমি প্রস্তররূপ ছিলাম, সেখান থেকে উদ্ভিদ রূপে জন্ম নিলাম, উদ্ভিদরূপ থেকে প্রাণী রূপে জন্ম নিলাম, প্রাণীরূপ থেকে মানুষ হিসাবে জন্ম নিলাম, মানুষ হিসাবে মৃত্যুর পর ফেরেশতা হব, তারপর আমি অনন্তে বিলীন হয়ে যাব।’ Universal Existence -এর কথা মওলানা বলেছেন : ‘আমি সূর্য কিরণের কণা, আমি সূর্যের গোলক, আমি প্রভাতের আলোক, আমি সন্ধ্যার বায়ু।’

মহাকবির মাজারে

আশ্‌রাফ সিদ্দিকী

হজরত ইমাম রেজার পুণ্য নগরী মাশহাদ থেকে

আমরা চলেছি তুস্ নগরীর পথে

হাইওয়ের শুরুতেই শাহনামার অমর কবি ফেরদৌসীর

বিরাট ভাস্কর্য মূর্তি-

প্রশস্ত রাস্তার দুইপাশে সবুজ থেকে সবুজ চিনাব্ তরুর সারি-

দুইদিকে আংগুর, আপেল, কমলা, পেস্তা এবং জাফরানের বাগান

বাতাসে মধুর মধুর গন্ধ…।

 

চাষীরা কাজ করছেন খেতে খামারে

বোরকায় আবৃত তাদের গৃহিণী এবং কন্যারাও আছেন

কখনো বিশ্রাম করছেন গাছের ছায়ায়

হাতে কফি অথবা চায়ের পেয়ালা

অথবা দু’একটি আপেল বা আংগুরের থোকা।

মাত্র ত তিরিশ কিলোমিটার পথ-

আমাদের গাইড চলন্ত বিশ্বকোশ মোহাম্মদ আমেরী-

ব্যাখ্যা করে চলেছে ইরানের ইতিহাস…।

 

সামনে ডাইনে বাঁক নিতেই তুস্ নগরী

এই কি সেই নদী- যার অকাল বন্যা থেকে দেশবাসীকে বাঁচাতে

ছিল তরুণ ফেরদৌসীর শাহনামা রচনার অমর সাধনা

আর সেই একমাত্র আদরিনী কন্যা-

অর্থ প্রয়োজন ছিল যার শুভ বিবাহের জন্য

গাইড আমেরী বলে চলেছে…।

 

জুন মাসের এই সকালে

শত শত দর্শনার্থীতে উপচে পড়ছে স্মৃতিসৌধের প্রান্তর

সামনেই সাতটি বিচিত্র ফোয়ারা

তাতে রামধনুকের সাতটি রঙ

ডাইনেই মহাকবির বিরাট ভাস্কর্য

মুখে মৃদু হাসি দেখছেন ফোয়ারার রঙধনু…।

 

তাঁর সামনেই মাজার

ঘুমিয়ে আছেন তিনি

দেয়ালে দেয়ালে উৎকীর্ণ শাহনামার বিচিত্র সব ভাস্কর্য।

 

সুলতান মাহমুদ গজনী রক্ষা করেন নাই

ষাট হাজার স্বর্ণ মুদ্রার প্রতিশ্রুতি

কিন্তু তিনি কোথায় আজ? কোথায় তার মাজার?

গাইড বলছে সে মাজারে দর্শকদের নেই যাতায়াত।

কে বড়?- কবি না সম্রাট?

কবির স্পর্ধা- না সম্রাটের অহঙ্কার?

 

চিনাব গাছের তলায় মহাকালের প্রতীক এক মহাকবি

আমাদের এসব আলাপ শুনে

দেখি মৃদু মৃদু হাসছেন,

 

চোখে তাঁর মহাকালের ভ্রুকুটি !!

ইসলামের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ

শের কাভান্দ

‘নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণ সহকারে এবং তাঁদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ (সূরা হাদীদ : ২৫)

ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন পর্যায়ে মানবতা নির্দিষ্ট কিছু ভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিকশিত হয়েছে। সংস্কৃতি এই মানবতা থেকেই উৎসারিত। এমন কোন জাতি নেই যাদের কোন সংস্কৃতি নেই। বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এই সকল সংস্কৃতি বেড়ে ওঠে ঠিক যেমন শেকড় থেকে খাদ্য নিয়ে একটি গাছ বড় হয়ে ওঠে।

ইরান দেশটা অনেক সংস্কৃতি, সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার। তবে ইরানে সভ্যতার চরম উৎকর্ষ সাধিত হয় ইসলাম আসার পর। ইসলাম আসে ইরানে মুক্তির বার্তা নিয়ে। ইসলামের আদর্শে প্লাবিত হয়ে ইরান থেকে শ্রেণিবৈষম্য দূর হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং মানবতার উৎকর্ষ সাধিত হয়। তৎকালীন ইরানে ইসলামের আবির্ভাব ছিল শুষ্ক মরুভূমিতে বৃষ্টিপাতের ন্যায়।

সৃষ্টির ঐক্য এবং জাতিসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সৌজন্যবোধের আলোকে ইসলাম দৃপ্ত কণ্ঠে এই ঘোষণা দেয়ার প্রয়াস পায় যে, জাতীয়তাবাদ, সংকীর্ণ দেশাত্মবোধ এবং বর্ণবাদ দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে জাতিসমূহের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ইসলাম এই সকল বাধা অপসারণ করে মানবজাতির মাঝে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং পরস্পরকে আরো গভীরভাবে জানার ও বুঝার জন্য আহ্বান জানায়।

পাক কুরআনে বলা হচ্ছে : ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে। পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার…।’ (সূরা হুজুরাত : ১৩)

ইসলামের এই উদারতা মানব সংস্কৃতির সকল জড়তাকে অপসারিত করে নব সৌরভে প্রস্ফুটিত হয়েছে। তাই আমরা দেখতে পাই, এক ইরানী মুসলিমের হাতে আরবি ব্যাকরণের উন্নয়ন ঘটেছে।

আমরা দেখেছি, মুসলিম স্পেন বা মুসলিম আফ্রিকার বিজ্ঞানীরা জ্ঞান সাধনা এবং জ্ঞান আহরণের জন্য পৃথিবীর দূর-দূরান্তে ছুটে গেছেন। মোটের ওপর আমরা দেখতে পাই, ইসলামের স্বর্ণযুগে সকল মুসলিম দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা করেছেন এবং মানব সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের এই সকল প্রচেষ্টার মূলে ছিল ইসলামের মহানবী (সা.)-এর অনুপ্রেরণা। কেননা, তিনিই বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা সকল মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য।’

আরবি ব্যাকরণের উৎকর্ষ সাধনে সিবোইয়েহ (Sibooyeh), সমাজ বিজ্ঞানের ফয়েজ কাশানী, গাজ্জালী, তূসী, ভেষজ এবং চিকিৎসাবিদ্যায় ইবনে সীনা, রাযী, রাজনীতি ও নীতিবিদ্যায় নাসিরুদ্দীন তূসী, ইতিহাসে ইবনে খালদুন, নৃতত্ত্ব এবং ভূগোলবিদ্যায় যাকারিয়া কাযভিনী, সাহিত্যে ইবনুল আমিদ, হস্তলিপিবিদ্যায় ইবনুল বাভবার, চারুকলায় আবুল ফারাজ ইসফাহানী ও এরমাভী, কাব্যে ফেরদৌসী, সাদী, হাফেজ, রুদাকী, খাকানী এবং আবদুল ফাত্তাহ বাস্তী, দর্শনশাস্ত্রে ফারাজী, আল-কিন্দী, ইবনে সীনা, বিরুনী, সোহরাওয়ার্দী, মোল্লাহ সাদরা এবং আল্লামা তাবাতাবাঈ, স্বৈরতন্ত্র ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল সাইয়্যেদ জামালুদ্দীন আফগানী, আবদুহু কাওকাবী, ইকবাল, শরিয়তী, ইমাম খোমেইনী (রহ.) প্রমুখ এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আরো অনেক বিশ্ববিখ্যাত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ইসলামের কালজয়ী চিন্তাধারায় গঠিত এবং প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। বিশ্বজনীন ইসলামী আদর্শই এই সকল প্রতিভাকে মানবজাতির কাছে উপহার দিয়েছে। ইসলামের মহান শিক্ষা মুসলমানদের চিন্তা, চেতনা ও কর্মপন্থায় প্রকাশ পেয়েছে। ইসলামী সংস্কৃতি মানব প্রকৃতির সাথে এতই সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, মানবতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ইসলাম মিশে আছে। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ নিজেই এর সমন্বয় সাধন করেছেন।

কোন সংস্কৃতিই পৃথিবীর বুকে বিকাশ লাভ করতে পারে না যদি না মানব প্রকৃতির সাথে তার সংগতি থাকে। সংস্কৃতি যতই মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল হবে ততই এটি গুতশীল হয়ে সমকালীন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে এবং মানব সম্পর্কের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে সক্ষম হবে। এখানেই ইসলামী সংস্কৃতি আর অন্যান্য সংস্কৃতির মাঝে পার্থক্য বিদ্যমান।

ইসলামী নীতিমালা, মূল্যবোধ, অন্তর্দৃষ্টি এবং অনুশাসনসমূহ সুস্পষ্টভাবে মানুষের মুক্তির কথাই বলেছে, জ্ঞানচর্চার বিশাল দিগন্ত পানে মানুষকে আহবান জানিয়েছে, মানুষের দৃষ্টিপাতের সকল বাধা অপসারিত করেছে যেন মানুষ এই বিশ্ব রহস্যের উদ্যোগ ও বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে পারে।

ইসলামের আদর্শে স্নাত হয়ে মুক্ত মানুষের মধ্য থেকে জ্ঞানের ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়। তার মাঝে সৃষ্টিশীল প্রেরণা উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। নতুন নতুন শিল্প-সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের উদ্ভাবনে সে ব্রতী হয়। তার সৃষ্টিকর্মে এই পৃথিবী সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

জ্ঞানের মূল্যবোধ, তাকওয়া, জিহাদ, আনুগত্য, আত্মোৎসর্গ এবং সহিষ্ণুতা মানুষকে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে সাহায্য করে, যে আন্দোলনের মাধ্যমে সে নতুন মানব সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করে, স্রষ্টার সৃষ্টিকে সুশোভিত করে তোলে। এর ফলে মানুষের প্রার্থনা, তীর্থযাত্রা, শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং শৈল্পিক সৃষ্টিশীলতা স্রোতস্বিনীর মতোই প্রবাহিত হয়। তাওহীদের আশ্রয়ে এটি প্রবহমান হয়ে মানবতা ও মানব পরিচিতির বিকাশ সাধন করে এবং পারস্পরিক বৈষম্য ও হিংসা-বিদ্বেষের সীমারেখাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

ইসলামী সংস্কৃতি উঁচুমানের অর্থাৎ ক্লাসিকধর্মী এই কারণে যে, এতে রয়েছে সংহতি, সুদৃঢ়তা, মানব-শৌর্যের প্রকাশ, জীবনক্ষেত্রে মানুষের কার্যকর ভূমিকা এবং তার অদৃষ্ট সম্পর্কে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস।

ইসলামী সংস্কৃতি রোমান্টিক এই অর্থে যে, এটি বিশ্বাসী জনগণের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং বিশ্বাস দ্বারা তা বিমণ্ডিত।

ইসলামী সংস্কৃতি বাস্তবধর্মী। অর্থাৎ বাস্তবতা ও প্রকৃতিবিবর্জিত সকল বিপথগামী মূল্যবোধের বিরোধী এই সংস্কৃতি। স্বৈরাচার আর নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান ইসলামী সংস্কৃতি সকল দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার। সেটা সামাজিক আনাচারই হোক বা শ্রেণিবৈষম্যই হোক কিংবা বর্ণবৈষম্যই হোক।

ইসলামী সংস্কৃতি সকল প্রকার বিভ্রান্তি ও বিকৃতির বিরোধী। মানুষকে দেবতা জ্ঞান করা, আত্মম্ভরিতা ও স্বার্থপরতা- সকল প্রকার মানসিক, আধ্যত্মিক ও নৈতিক বিকৃতি ইসলামী সংস্কৃতির পরিপন্থী।

বিশ্বজনীন ইসলামী সংস্কৃতির অবকাঠামো দৃঢ় প্রত্যয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে রয়েছে মানবতার সুপ্রকাশ, বিশ্বাস, একত্ববাদ এবং নৈতিকতা। ইসলামী বিপ্লব এই সকল মূল্যবোধ, নীতিমালা ও সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।

ইসলামী সংস্কৃতি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনার প্রয়াস পায়। মানুষ এবং এই বিশ্বজগৎ সম্পর্কে এর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এর মাধ্যমে ভয়-ভীতি অপসারিত হয়ে মানুষের মনে মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মানুষের আত্ম, মন এবং জীবনের পরিশুদ্ধিতে ইসলামী সংস্কৃতির ভূমিকা ব্যাপক। এর মাঝে ধ্বনিত হয় আশার বাণী। এই সংস্কৃতি জাতিসমূহের ওপর চাপিয়ে দেয়া হীনমন্যতা অপসারণে বদ্ধপরিকর। মানুষের সত্যিকারের ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে ভক্তিশ্রদ্ধা, আত্মোৎসর্গ, স্নেহ-মমতা এবং আধ্যাত্মিক প্রেরণা জাগ্রত করে। যার ফলে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী মানুষ সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ পায়।

মোট কথা ইসলামী সংস্কৃতি মানব জীবনের সকল দিকের ওপর আলোকপাত করে। এই সংস্কৃতি প্রাধান্য লাভ করলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে। গ্রন্থাগারগুলো জ্ঞান সাধকদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠবে। লেখকরা সৃষ্টিশীল লেখায় এগিয়ে আসবে। তরুণ প্রজন্ম তাকওয়ার পরিপূর্ণ একটি নতুন উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবে। সমাজে তারা যথাযোগ্য মর্যাদায় আসীন হয়ে দর্শন, শিল্প ও সাহিত্যে তারা মূল্যবান অবদান রাখবে। প্রচুর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে জ্ঞানচর্চার পরিধি বৃদ্ধি পাবে। তখন এই কিংবদন্তীর অপনোদন হবে যে, ‘প্রাচ্যের লোকেরা বই পড়ে না।’

এমনকি ইসলামী সংস্কৃতি পরিচালিত সমাজে নারীদের মর্যাদাও সমুন্নত হবে। লেখাপড়া শিখে পুরুষের পাশাপাশি সমান অধিকার নিয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডে তারাও এগিয়ে আসবে।

ইসলামী সরকার : একটি পর্যালোচনা

হুজ্জাতুল ইসলাম মুহাম্মদ ইয়াজদী

মানুষের মনে করা উচিত আইন হলো মহান আল্লাহর অধিকার। কেননা, আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ এবং কেবল তিনিই তাঁর অমান্যকারীদের যে কোন ধরনের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এই একই কথা ইমামত দর্শনের ভিত্তিতেও বলা যেতে পারে।

নবী-রাসূলগণ খোদায়ী আইন-কানুন দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর নির্বাচিত প্রতিনিধি। এখন এসব আইন-কানুন দুনিয়ার বুকে বাস্তবায়ন এবং তার বিরুদ্ধাচরণকারীদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা নেয়ার জন্য একজন নেতা বা ইমাম থাকা আবশ্যক। অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই নবুওয়াতের নীতিমালাকে ইমামতের নীতিমালা থেকে পৃথক করা সম্ভব নয়। এই কারণেই নবী-রাসূলগণ একই সময়ে নবুওয়াত ও ইমামত প্রাপ্ত ছিলেন অর্থাৎ খোদায়ী আইন-কানুন প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন- এ উভয় ক্ষমতাই তাঁদের হাতে ছিল।

হযরত ইবরাহীম (আ.) ছিলেন এরূপ একজন নবী-ইমাম। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১২৪ নং আয়াতে তাঁর ইমামত সম্বন্ধে বলা হয়েছে :

‘এবং স্মরণ কর যখন ইবরাহীমকে তার প্রতিপালক কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন এবং সেগুলো সে পূর্ণ করেছিল; আল্লাহ বললেন, ‘আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করছি।’ সে বলল, ‘আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও’? আল্লাহ বললেন, ‘আমার প্রতিশ্রুতি জালিমদের প্রতি প্রযোজ্য নয়’।’

উপরোক্ত আয়াত থেকে এটা সুস্পষ্ট হয় যে, ইমামত (শাসনের অধিকার) অত্যাচারী শাসকদের কাছে যেতে পারে না।

ইসলামের পবিত্র নবীও একই সাথে ইমামত ও নবুওয়াতপ্রাপ্ত ছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁকে একই সময়ে আল্লাহর পক্ষ হতে মানবজাতির জন্য দূত ও শাসক হিসাবে মনোনীত করেছিলেন। রাসূল হিসেবে ইসলামে পবিত্র নবীর পদমর্যাদা সম্পর্কিত কুরআনে অনেক আয়াত আছে। ঐসব আয়াতের কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো :

‘মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে পুরুষের পিতা নন, বরং সে আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ (সূরা আহযাব : ৪০)

‘মুহাম্মাদ একজন রাসূল মাত্র; তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে। সুতরাং যদি সে মারা যায় অথবা সে নিহত হয়, তবে তোমরা কি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনও আল্লাহর ক্ষতি করবে না; বরং আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কৃত করবেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)

‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।’ (সূরা মুহাম্মাদ : ২৯)

এরূপ আরো আয়াত আছে যেগুলোতে আল্লাহর রাসূল হিসেবে নবীর পদমর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে :

‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তা স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।’ (সূরা আহযাব : ৩৬)

‘নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর এবং তার পত্নীগণ তাদের মাতা। আল্লাহর বিধান অনুসারে মুমিন ও মুহাজিরদের চেয়ে যারা আত্মীয়, তারা পরস্পরের নিকটতর।’ (সূরা আহযাব : ৬)

‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং সতর্ক হও; যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রেখ যে, স্পষ্ট প্রচারই আমার রাসূলের কর্তব্য।’ (সূরা মায়েদা : ৯২)

‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর যাতে তোমরা কৃপা লাভ করতে পার।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৩২)

‘হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস কর, তবে তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তাদের যারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারী, কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ হলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট উপস্থাপন কর। এটাই উত্তম ও পরিণামে শ্রেয়।’ (সূরা নিসা : ৫৯)

‘লোকে তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্ন করে; বল, ‘যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ এবং রাসূলের; সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (৮ : ১)

‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং যখন তোমরা তার কথা শ্রবণ করছ তখন তা হতে মুখ ফিরিও না।’ (৮ : ২০)

‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে ও নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে; ধৈর্যশীল হবে। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।’ (৮ : ৪৬)

‘আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।’ অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী; এবং তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে, রাসূলের কাজ তো কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।’

‘সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহভাজন হতে পার।’ (২৪ : ৫৬)

‘হে মুমিনগণ! আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের কর্ম বিনষ্ট করো না।’

‘তোমরা কি চুপে চুপে কথা বলার পূর্বে সাদাকা প্রদানকে কষ্টকর মনে কর, যখন তোমরা সাদাকা দিতে পারলে না, আর আল্লাহ তোমাদিগকে ক্ষমা করে দিলেন; অতএব, তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং  আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা সম্যক অবগত।’ (৫৮ : ১৩)

‘আল্লাহর আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল স্পষ্টভাবে প্রচার করা।’ (৬৪ : ১২)

রাসূল (সা.)-এর ইমামতের বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা এ প্রবন্ধে করা হচ্ছে না। তবে পবিত্র হাদীস ও রাসূলের জীবন চরিত থেকে জানা যায় যে, যুদ্ধ, সন্ধি স্থাপন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, শত্রুর বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরির জন্য লোক নিয়োগ, ঐ সময়কার পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ কিংবা যুদ্ধের জন্য তৈরি হওয়ার হুঁশিয়ারি জানিয়ে পত্র লিখন, উসামার সেনাবাহিনী গঠন এবং এরূপ আরো অনেক বিষয়েই রাসূলের আদেশ বস্তুত সরকারি আদেশ ছিল।

রাসূল (সা.) একই সময় নবুওয়াত ও ইমামত প্রাপ্ত হন। মক্কাতে ১০ বছর গোপনে ও প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের পর মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় পৌঁছার পর সেখানে তিনি ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এভাবে মদীনা প্রথম ইসলামী সরকারের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং মদীনায় বসবাসরত ইহুদি ও অন্যান্য কাফের গোত্র একটি চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করে ইসলামী শাসনকে মেনে নেয়।

অতঃপর রাসূলকে মদীনার বাইরে বসবাসরত কাফের ও মুশরেকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। মক্কা বিজয় ও পরিশেষে সমগ্র আরব-ভূভাগে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়া পর্যন্ত এরূপ যুদ্ধ চলে। কাজেই পবিত্র নবীর মক্কা আগমনের পরই প্রথম ইসলামী সরকার তার কাঠামোগত ভিত্তি পায়।

নবী করিম (সা.)-এর আমলের পরবর্তীকালে ইসলামী শক্তি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, সকল অঙ্গনেই তার দৃপ্ত পদচারণার স্বাক্ষর রাখে। হযরত আলী (আ.) তাঁর চার বছরের শাসনামলে ইসলামী সরকারের স্বরূপকে আরো বিস্তৃত পরিসরে ব্যাখ্যা করেন। হযরত আলী (আ.) তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ও রাজনীতিক মালিক আশতারের কাছে রাজ্য শাসনের ওপর যে ঐতিহাসিক সনদ লিখে পাঠান তাতে তিনি একটি ইসলামী সরকারের স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কিত নীতিমালা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন- খুব কম মুসলমান আছে যারা এই ঐতিহাসিক সনদ সম্পর্কে জানেন না।

এটা এমন এক সনদ যাতে ইসলামী সরকারের রূপরেখাকে যথাযথ ও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরা হয়েছে। এটা এমন এক সনদ যার মর্ম উপলব্ধি করে জ্ঞানীরা লাভবান হতে পারেন।

ইসলামী সরকারের নীতিমালা

ইসলামী সরকার দর্শনে মানুষ হলো এক উন্নত চরিত্রসম্পন্ন মর্যাদাশীল প্রাণী। জগতের সবকিছুই মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে। কাজেই সমস্ত পরিকল্পনা কর্মসূচি হবে মানুষের এই উন্নত চরিত্র ও নৈতিকতাবোধকেন্দ্রিক। এভাবেই মানুষ খোদায়ী পরিচিতি এবং তাকে সৃষ্টির উদ্দেশ্যের মর্ম উপলব্ধি করে তার ওপর আরোপিত ঐশী কর্তব্যগুলো সম্পাদন করতে পারে।

এমনকি ইসলামী সরকারাধীন অমুসলিমদের সাথেও এমন ব্যবহার করতে হবে যাতে তাদের মানবীয় মূল্যবোধগুলো চাঙ্গা হয় এবং এক সময় ইসলামের একত্ববাদের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয়। নাস্তিক্যবাদী মুশরিক, এমনকি আহলে কিতাবদের সাথে ইসলামী সরকারের আচরণ সম্পর্কে ইসলামে বিস্তৃত আলোচনা আছে। এ বিষয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের গঠনতন্ত্রের আর্র্টিকেল-১-এ আলোকপাত করা হয়েছে।

(ক) ইসলামী সরকারের ভিত্তি দেশের ইসলামী জনতার ওপর নির্ভরশীল। রাসূলের নবুওয়াত ও ইমামতের প্রতি মুসলিম জনতার বিশ্বাসের ওপরই ইসলামী সরকারের ভিত্তি নিহিত। কেননা, রাসূলের কাছে আসা খোদায়ী বিধানের ভিত্তিতেই ইসলামের পরিচিতি। ইসলামী প্রজাতন্ত্রে সরকার কাঠামো জনতার পছন্দের ধর্মীয় নেতার ওপর নির্ভর করে। এই নেতা আবার ধর্মীয় মাপকাঠির ভিত্তিতে নির্বাচিত হন।

ইসলামী প্রজাতন্ত্রে বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য নির্বাচন, পরামর্শ পরিষদের সদস্য নির্বাচন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং সবধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইসলামী শরীয়তের ভিত্তিতে হয়। গঠনতন্ত্রের চতুর্থ অনুচ্ছেদে এই বিষয়ে উল্লেখ আছে। যেখানে বলা আছে যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সকল আইন-কানুন ইসলামের নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যশীল হতে হবে।

(খ) ইসলামী সরকার খোদায়ী বিধান বাস্তবায়নে আপোষহীন। ইসলামী সরকার কোন অবস্থাতেই কোন ইসলামী বিষয়ে ইসলামের শত্রুদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। ইসলাম ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষার্থে, তার উন্নতিকল্পে এবং তা ধরে রাখতে ইসলামী সরকার আত্মরক্ষা, জিহাদ, তাবলীগ (ইসলামের প্রচার), ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণ প্রভৃতি নীতিতে বিশ্বাসী।

বিভিন্ন ইসলামী রচনাবলিতে এসব নীতির বিশদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

(গ) ইসলামী সরকারের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ন্যায়পরায়ণতা এবং এই ন্যায়পরায়ণতা হবে যথার্থ অর্থে। এ প্রেক্ষিতে ইসলামী সরকার দেশের সকল প্রাণী ও বস্তুর ন্যায্য প্রাপ্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হয়। নিশ্চিত সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলো যাতে সকল নাগরিক সমভাবে ভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করে। এরূপ সরকার সর্বদা জনতাকে খোদায়ী পথে পরিচালনায় নিবেদিত থাকে।

ইসলামী সরকারের উদ্দেশ্যাবলি

খোদার নবীর রেখে যাওয়া পথ ও মত অনুসরণই ইসলামী সরকারের মূল উদ্দেশ্য। ইসলামী সরকারের মহান উদ্দেশ্যাবলির কতিপয় উদ্দেশ্য নিচে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো :

-মানুষকে খোদায়ী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা যাতে সে এক উন্নত মানবীয় জীবনযাপন করতে পারে।

-প্রকৃতিকে মানবসেবায় ব্যবহার করা যাতে মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদাদি ব্যবহার করে অধিকতর সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে পারে।

-রক্তপাত, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, হঠকারিতা ব্যাভিচার, বিদ্রোহ এবং এ জাতীয় যাবতীয় পাপকাজের বিরোধিতা করা এবং যে পর্যন্ত এসব পাপাচার ও অনাচার দুনিয়ার বুক থেকে তিরোহিত না হয় সে পর্যন্ত এগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া।

এ পর্যন্ত আমরা যা আলোকপাত করেছি, তা হলো একটি ইসলামী সরকারের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আমরা এখন সংক্ষেপে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সরকার কাঠামোর ওপর সংক্ষেপে আলোকপাত করব।

ইরানের সরকার হলো একটি ইসলামী সরকার। অধিকাংশ জনমতের ভিত্তিতে এরূপ সরকার গঠন করা হয়। ৯৮.২ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক লোক ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোট দেয়। এই একচেটিয়া রায় থেকে এটাই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইরানের জনতা ইসলামী শাসনব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোন শাসনব্যবস্থার অধীনে যেতে রাজি নয়।

এটা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার যে, এই প্রজাতন্ত্রের সিংহভাগ জনতা পবিত্র নবীর রেখে যাওয়া সত্যিকার ইসলামকে গ্রহণ করেছে। তারা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ও পবিত্র আহলে বাইত কর্তৃক বিবৃত ইসলামকেই গ্রহণ করেছে। কাজেই এ ইসলাম কোন বিশেষ গোষ্ঠীর মনগড়া ব্যাখ্যার সংকীর্ণতার বেড়াজালে বন্দি নয়। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের গঠনতন্ত্রে এরূপ ইসলামের কথাই বলা হয়েছে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্রের গঠনতন্ত্রে সরকারের ভিত্তির প্রকৃতি, এর বৈশিষ্ট্যাবলি, উদ্দেশ্যাবলির সারসংক্ষেপ আলোকপাত করা হয়েছে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ১৯৭৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৭৯ সালের ২রা এপ্রিলের গণভোটে প্রজাতন্ত্রের সরকার কাঠামো নির্ধারিত হয়। এই সরকারের মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই)। এই সরকার কাঠামোর মুখ্য উদ্দেশ্য হলো নবুওয়াত, পুনরুত্থান, ইমামত, ইজতিহাদ, (কুরআন-হাদীসের ভিত্তিতে মুজতাহিদ কর্তৃক কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান), বিজ্ঞানের অগ্রগতি থেকে লাভবান হওয়া এবং সব ধরনের অত্যাচারী শাসন, অন্যায়, অনাচার, বিদেশী প্রভাব ইত্যাদির বিরোধিতা করা।

এ সরকার ন্যায়বিচার, সমঅধিকার এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও নিবেদিত। প্রজাতন্ত্রের সকল আইন-কানুন ইসলামী নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যশীল।

তিন হাজার বছরের ইরানী স্থাপত্য শিল্প

অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান

প্রাচীন পারস্যের শিল্প ঐতিহ্য

প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে মিশরীয়, গ্রীক এবং রোমান সভ্যতা যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রাচীন পারসিক সাম্রাজ্য। পুরাতন পৃথিবীতে ইরানীয় মালভূমিতে যে পারসিকরা বসতি করত তারা অনন্যসাধারণ স্থাপত্যকর্মের নিদর্শন রেখে গেছে। এক সময় সভ্যতার রঙ্গমঞ্চে ফেরাউনের প্রতাপ ছিল। তারপরে এল নিনেভা এবং ব্যাবিলনের রাজাদের প্রতাপ। এরপরই আমরা ইরানে একিমিনীয় সাম্রাজ্যের সন্ধান পাই। একিমিনীয় সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ছিল দীর্ঘকাল পর্যন্ত। এই সাম্রাজ্য যে বলিষ্ঠ সংস্কৃতিকে বহন করত সেই সংস্কৃতির নিদর্শনস্বরূপ আমরা প্রাচীন পারস্যে অনেক দুর্গ ও প্রাসাদের নিদর্শন পাই। এই দুর্গ ও প্রাসাদের নিদর্শন থেকে নির্ণয় করতে অসুবিধা হয় না যে, প্রাচীন পারস্যের এই সভ্যতায় বিত্তের অধিকার এবং প্রতাপ ছিল প্রচণ্ড। এর প্রমাণ আমরা পাই বহু বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তাদের ধ্বংসাবশেষের চিহ্নের মধ্যে।

22272499901350544039ইরানের অভ্যুদয় কখন হয় তা আমরা সুস্পষ্টভাবে জানি না। গবেষকগণ অনুমান করেন যে, ‘জেন্দাবেস্তা’য় উল্লিখিত ‘আরিয়ান’ শব্দটি থেকেই ইরান শব্দের উদ্ভব ঘটেছে। ‘জেন্দাবেস্তা’য় উল্লিখিত নামের অর্থ হচ্ছে আর্য জাতির বসতভূমি। ‘পারস্য’ শব্দটিও প্রাচীন। এ শব্দটি এসেছে গ্রীক ‘পারসিস’ শব্দ থেকে। ‘পারসিস’ শব্দের অর্থ ফারস প্রদেশ। প্রাচীন যে একিমিনীয় রাজশক্তির উদ্ভব ইরানে ঘটেছিল তাদের উদ্ভব হয়েছিল ফারস্ প্রদেশ থেকেই। একিমিনীয় রাজ্যের রাজধানী ফারস্ প্রদেশে বলেই বর্তমান পারস্য শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয়। প্রাচীন পারস্যে মিদ এবং  পারসিক- এ দু’টি সম্প্রদায় ছিল আর্য সম্প্রদায়। মিদ সভ্যতাও একটি প্রাচীন সভ্যতা যা পরে পারসিস সভ্যতার সঙ্গে মিশে যায়। মিদ সভ্যতার সঙ্গে অ্যাসিরিয় এবং সিথীয় সভ্যতার সম্পর্ক ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১১০০ অব্দের অ্যাসিরীয় শিলালিপিতে মিদ সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে। এরা ছিল পারস্যের পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসী এবং দীর্ঘকাল এরা অ্যাসিরীয়দের শাসনাধীনে ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দে এরা স্বাধীনতা অর্জন করে। দক্ষিণ পারস্যের অধিপতি কাইরাস খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে মিদ সম্প্রদায়কে পরাভূত করে নিজের সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। তিনি লিদিয়ার রাজা ক্রিসাসকেও পরাজিত করেন এবং সর্বশেষ পর্যায়ে ব্যাবিলনও তার বশ্যতা স্বীকার করে। এ ঘটনাটি ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ অব্দে। এভাবে ব্যাবিলন এবং মিদীয় সাম্রাজ্য অধিকার করে কাইরাস যে বিরাট সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন তা বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে একিমিনীয় সাম্রাজ্য নামে চিহ্নিত। যেহেতু এই সাম্রাজ্যের সম্রাটদের পূর্বপুরুষদের একজনের নাম ছিল একিমিনীয় সেই কারণে কাইরাসের সাম্রাজ্য একিমিনীয় সাম্রাজ্য বলে খ্যাতি পেয়েছে। কাইরাসের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রের রাজত্বকালে একিমিনীয় সাম্রাজ্য মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। কিন্তু এই সাম্রাজ্য চূড়ান্তভাবে বিস্তৃতি লাভ করে দারিয়ুসের সাম্রাজ্যকালে। সময়কাল হচ্ছে ৫২১ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৪৮৬ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত। এভাবে যে সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে সে সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত হয় সমগ্র এশিয়া মাইনর, সিরিয়া, অ্যাসিরীয় ও ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য। ককেশাস ও কাস্পিয়ান অঞ্চল, মিদিয়া, পারস্য ও ভারতবর্ষের সিন্ধু দেশ। এই সাম্রাজ্য খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ অব্দ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল এবং ৩৩০ অব্দেই আলেকজান্ডারের আক্রমণে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

63739505569014036238 এভাবেই ক্রমশ বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড অধিকারের ফলে সামগ্রিকভাবে একিমিনীয় শিল্পকর্মের যে বিকাশ ঘটে তা এককভাবে একিমিনীয় শিল্পরূপ নয়, তার মধ্যে মিশ্রণ ঘটে মিশরীয় শিল্পের, অ্যাসিরীয় এবং গ্রীক শিল্পের। কিন্তু এই শিল্পের সকল প্রকার নিদর্শন আমরা পাই না। আমরা শুধু রাজসিক শিল্পের নিদর্শনস্বরূপ পুরাতন রাজপ্রাসাদগুলোর প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ পাই। তবে এই ধ্বংসাবশেষও একটি অসাধারণ স্থাপত্য শিল্পের অধিকারকে প্রমাণ করে। যখন ৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে কাইরাস ব্যাবিলন দখল করেন তখন ব্যাবিলনের শাসনের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেতিসের নিকটবর্তী শহরগুলো মূল্যহীন হয় এবং নতুন শহর সমৃদ্ধি পায় সুসায়, পার্সিপোলিসে এবং পাসারগাদে। আমরা জানি যে, যে কোন শিল্প দু’টি অবস্থাকে আত্মস্থ করে গড়ে ওঠে অথবা বলা যেতে পারে, নির্ভর করে গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে একটি বাস্তব অবস্থা এবং অপরটি হচ্ছে বোধ এবং বিশ্বাসের অবস্থা। প্রাথমিক অবস্থার ক্ষেত্রে আবহাওয়া এবং প্রাপ্য উপকরণের গুরুত্ব অসীম। দ্বিতীয় অবস্থার জন্য ধর্মবিশ্বাস এবং সামাজিক রীতিনীতির গুরুত্ব অপরিহার্য। একটি দেশের কি ধরনের শিল্প গড়ে উঠবে তা নির্ভর করে সে দেশের অবস্থান এবং প্রাকৃতিক বিন্যাসের ওপর। মহেন-জো-দারোয় পাথর ছিল না। সেখানে সবকিছু ছিল মাটির। তেমনি সুমার দেশেও পাথর ছিল না, কাঠও ছিল না। তাই তারাও তাদের অট্টালিকা মাটি দিয়ে তৈরি করেছিল। কিন্তু পারস্যের অবস্থা ছিল ভিন্ন। পারস্যে পাথর ছিল প্রচুর। তাই সেখানে মাটির তৈরি অট্টালিকার কথা চিন্তাও করা যায় না।

images (4)একিমিনীয় শিল্প-সম্ভারের একমাত্র নিদর্শন হচ্ছে তাদের প্রাচীন স্থাপত্যের ভগ্নাবশেষগুলো। যেমন অ্যাসিরীয় রাজারা নিজেদের সৌভাগ্য এবং প্রতাপ চিহ্নিত করার জন্য রাজপ্রাসাদ এবং দুর্গ নিমার্ণ করেছিলেন, তেমনি একিমিনীয়রা রাজার প্রতাপ এবং প্রতিপত্তি চিহ্নিত করার জন্য বিরাট মহিমাময় এবং আড়ম্বরপূর্ণ রাজপ্রাসাদ নিমার্ণ করেছিলেন। যেহেতু একিমিনীয় সাম্রাজ্য বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং যাকে আমরা সেকালীন সভ্যতার সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য বলে আখ্যায়িত করতে পারি, তাই  বিরাট সাম্রাজ্যের উপযোগী স্থাপত্য নির্মাণের প্রয়োজন তারা অনুভব করেছিল। এই প্রাসাদগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিরাট ছিল পার্সিপোলিসের প্রাসাদ। যার ধ্বংসাবশেষ আজো আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। পার্সিপোলিসের প্রাসাদের যে দীর্ঘ স্তম্ভগুলো আজো বিদ্যমান রয়েছে সেগুলোর উচ্চতা ছিল ৭০ ফুটের মতো। প্রাসাদের ভিত্তিভূমি-সিঁড়ি, বিভিন্ন দেয়াল, প্রবেশদ্বার এবং উচ্চ কলামগুলো প্রমাণ করে যে, সেকালের শিল্পীরা এমন একটা কিছু করতে চেয়েছিলেন তা দেব-দুর্লভ এবং অনন্যসাধারণ। পার্সিপোলিসের দীর্ঘ কলামগুলোর পাশে মানুষ যদি দাঁড়ায় তাহলে মানুষগুলোকে ক্ষুদ্রাকায় বামনের মতো দেখাবে। এই প্রাসাদ ছিল মানুষের স্বাভাবিক পরিমাপবোধের বাইরে। পৃথিবীর কোন সভ্যতায়ই এত বিরাট এবং বিপুলায়তনের চিহ্ন আমরা খুঁজে পাই না। এই রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়েছিল পাহাড়ের সানুদেশে এবং সে যুগের স্থপতিরা পাহাড়ের মহিমাময় এবং বলিষ্ঠ ব্যঞ্জনার প্রেক্ষাপটে রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন একটি অপরূপ দৃশ্যমান সঙ্গতিতে। আমরা দেখেছি যে, স্থাপত্যশিল্পে কলাম বা স্তম্ভ প্রাচীনকালে প্রাধান্য পেয়েছিল। এই প্রাধান্যের সূত্রপাত গ্রীকযুগ থেকে। গ্রীক শিল্পীরাই প্রথম মনোরম, বলিষ্ঠ, সুদৃশ্য কলাম নির্মাণ করেছিলেন। একিমিনীয়রা গ্রীকদের কাছ থেকেই এই কলামের ব্যবহার পায়। কিন্তু একিমিনীয়রা এই কলামকে একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। পার্সিপোলিসের যে সমস্ত কক্ষ এবং প্রকোষ্ঠ নির্মিত হয়েছিল সেগুলোকে ধারণ করার জন্য মোট ৫৫০টি কলাম নির্মিত হয়েছিল। এটি এক ধরনের অবিশ্বাস্য অতিরিক্ততা বলা যায়। এত বেশি কলামের শৈল্পিক দিক থেকে কোন প্রকার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পারসিকরা এক প্রকার মহিমা সৃষ্টির জন্যই হয়ত এগুলো নির্মাণ করেছিলেন। শৈল্পিক দিক থেকে স্থাপত্য শিল্পে কলামকে একটা মোটিফ বলতে পারি। একটি মোটিফের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে পার্সিপোলিসের স্থপতিরা একটি  অলংকরণের ব্যবস্থা ঘটিয়েছিলেন।পার্সিপোলিসের দেয়ালগাত্রে অথবা অধিরোহণীর পার্শ্বে উৎকীর্ণ মূর্তিগুলো দর্শককে অভিভূত করে। প্রাচীন পারসিকদের ধর্মবিশ্বাসে ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে সংগ্রামটি  সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সৎবুদ্ধি, ন্যায় এবং সৌন্দর্যের প্রতীক হচ্ছে ‘আহুর মাজদা’ এবং পাপ ও অসত্যের প্রতীক হচ্ছে ‘আহরিমান’। বিভিন্ন চিত্রে আহরিমানের পরাজয় এবং বিনাশ দেখানো হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বুঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে যে, পৃথিবীতে কল্যাণ কর্মে ন্যায়ের জয় হবেই এবং যথার্থ সংগ্রামে অন্যায় এবং পাপ বিমূঢ় হবে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। একটি চিত্রে দেখানো হয়েছে যে, ড্রাগনকে হত্যা করা হয়েছে। ড্রাগন সেখানে হিংস্রতা এবং ধ্বংসের প্রতীক। পারসিকদের শিল্পে আমরা প্রথম ঘোড়সওয়ারের মূর্তি দেখি। পরবর্তীকালে খ্রিস্টজগতের বিভিন্ন আইকনে ঘোড়সওয়ারের মূর্তি আমরা দেখতে পাই। এটা পারসিকদেরই দান। পাপ এবং পুণ্যের মধ্যে এভাবে ঘোড়সওয়ার মূর্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে। ঘোড়সওয়ার বর্শার সাহায্যে বিরোধী শক্তিকে দমন করছে এই দৃশ্য পার্সিপোলিসে দেখা যায়। শিল্পসৌকর্য এবং দক্ষতার বিচারে আক্রমণরত ঘোড়সওয়ারের মূর্তিটি বিশিষ্ট শিল্প কৌশলের প্রমাণ বহন করে। ঘোড়ার গ্রীবাভক্তি এবং অশ্বপৃষ্ঠে অশ্বারোহীর আনত ভঙ্গি দু’টির মধ্য দিয়েই দক্ষ শিল্প কুশলতার পরিচয় পাওয়া যায়।

পারসিকদের ধর্মবিশ্বাসে পাপ এবং পুণ্যের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা এবং বিভেদ চূড়ান্ত পর্যায়ে আনা হয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে চূড়ান্ত বৈপরীত্য বিদ্যমান ছিল। ইংরেজিতে যাকে বলে পোলারিটি, পারসিক ধর্মে পাপ এবং পুণ্যকে দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থিত বলে গণ্য করা হতো। আর্যদের দেবতা ছিল আলো। আলোর অধিকার হচ্ছে অন্ধকারকে দূর করা। এই আলোর  অভিষেকের উদ্দেশে পারসিকরা বহু দেবতার কল্পনা করেছিল। অথবা সত্যের রক্ষক হিসাবে জ্বীনদের কথা কল্পনা করেছিল। পার্সিপোলিসের দেয়ালগাত্রে এই সমস্ত দেবতা এবং জ্বীনের মূর্তি উৎকীর্ণ দেখা যায়। এ সমস্ত উৎকীর্ণ মূর্তির বাহুল্য পার্সিপোলিসে স্থাপত্যগত অলংকরণের একটি বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করেছিল। সিংহ একটি ষাঁড়কে পরাভূত করছে- এ রকম দৃশ্য পার্সিপোলিসে আছে। এই দৃশ্যের অর্থ হচ্ছে সূর্য দেবতা ‘মিথরা’ অশুভ শক্তিকে পরাজিত করছেন।

একিমিনীয়দের শৈল্পিক নিদর্শনের মধ্যে সমাধি মন্দিরটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সমাধি মন্দিরগুলো তারা একটি সুস্পষ্ট স্থাপত্যগত উচ্চারণে বিমণ্ডিত করেছে। পাসারগাদের অঞ্চলে কাইরুসের সমাধি মন্দির একটি দর্শনীয় স্থাপত্য নিদর্শন। নাসখ-ই-রুস্তমে এবং পার্সিপোলিসে যে সমস্ত সমাধি মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলোর কারুকর্ম বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নাসখ-ই-রোস্তমে সম্রাট প্রথম দারায়ুসের সমাধি মন্দিরটি পাহাড় খনন করে নির্মাণ করা হয়েছে। সমাধিগাত্রে উৎকীর্ণ কিছু রিলিফ মূর্তি আছে যা সে যুগের শিল্প কুশলতার পরিচয় বহন করে। এ সমস্ত সমাধি মন্দিরে মিশরীয়দের মতো অনেক দামি তৈজসপত্র, মূল্যবান দ্রব্যাদি এবং অলংকার মৃতের সঙ্গে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। এই মন্দিরগুলো অতীতে লুণ্ঠিত হয়েছে বহুবার। মনে হয় পারসিকরা মৃত্যুর পরের একটি জীবনে বিশ্বাস করত। অর্থাৎ তাদের বিশ্বাস ছিল যে, মৃত্যুর পর একটি বিশেষ সময় অতিক্রান্ত হলে মৃত ব্যক্তি পুনর্জাগরিত হবে। এই কারণেই প্রাচীন পারসিকরা বিশ্বাস করত যে, মানুষ যদি জীবিতকালে সৎগুণের চর্চা করে তাহলে পরবর্তী জীবনে তার মূল্য পাবে। এই কারণে পরবর্তী জীবনের অবস্থান এবং সাফল্যকে নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে সমাধি মন্দিরগুলোকে মহার্ঘ করে তারা নির্মাণ করত। নাসখ-ই-রুস্তম এবং পার্সিপোলিসের সমাধি মন্দিরগুলো প্রমাণ করে যে, পারসিকরা মনে করত যে, মৃত্যুর পরেও একটা জীবন আছে এবং সে জীবনের জন্য মৃতের সঙ্গে জীবন-যাপনের উপকরণ দিয়ে দেয়া প্রয়োজন। নাসখ-ই-রুস্তমের একটি সমাধিতে দেখা যায় যে, সম্রাট একটু উচ্চস্থানে দণ্ডায়মান রয়েছেন যেন তিনি পৃথিবীতে তাঁর অধিকারের দিকে দৃষ্টিপাত করে  আছেন। আরো মজাদার হলো যে সমস্ত উৎকীর্ণ শিলাচিত্র আমরা পাই তাতে দেখা যায় তাঁর সমগ্র মুখাবয়বের চতুর্দিকে একটা বৃত্তের বেষ্টনী আছে। এই বৃত্তটি অনন্তকালীনতার প্রতীক বহন করছে। মনে হয় প্রাচীন মিশরীয়দের দ্বারা একিমিনীয় পারসিকরা প্রভাবিত হয়েছিল। মিশরেও যেটা ছিল পাখাসংযুক্ত গোলাকার বৃত্ত, একিমিনীয়দের কাছে সেই বৃত্তটাই এসেছিল। কিন্তু পাখা দু’টি আসেনি।

যে যুগের কথা বলেছি সে যুগে পারসিক সাম্রাজ্য ছিল বিপুল বিস্তার এবং  সমৃদ্ধির সাম্রাজ্য। এই বিপুল বিস্তার এবং সমৃদ্ধিকে চিহ্নিত করার জন্য পার্সিপোলিসের দেয়ালগাত্রের বাস-রিলিফ-এ অজস্র মানুষের মূর্তি উৎকীর্ণ আছে। এই মূর্তিগুলো দেখে মনে হয় এগুলো যেন পটভূমির মধ্যে প্রায় প্রোথিতভাবে নির্মিত। এটাকে আমরা উঁচু উৎকীর্ণতা বলতে পারি। সম্রাট জীবিতকালে যে সমারোহের মধ্যে এবং অত্যুজ্জ¦ল দীপ্তির মধ্যে সিংহাসনে বসে রাজকার্য পরিচালনা করতেন শিল্পীরা এ সমস্ত উৎকীর্ণ মূর্তির সাহায্যে তারই একটা পরিচয় দেবার চেষ্টা করেছেন। অ্যাসিরীয়দের উৎকীর্ণ শিল্পচিত্রে আমরা একটি বীভৎসতা এবং নিষ্ঠুরতার পরিচয় পাই। সেখানে সম্রাটকে দেখা যায় ভোজসভায় আহার করছেন এবং তার সামনে শত্রুদের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। পারসিকদের বাস-রিফিল-এ কোন প্রকার বীভৎসতার চিহ্ন নেই। সেখানে দেখা যায় যে, অলংকৃত ফ্রিজগুলোতে রাজার অমাত্যগণ রাজাকে উপঢৌকন দেবার জন্য বহুবিধ সামগ্রী বহন করে নিয়ে চলেছে। এই ফ্রিজগুলোতে টেবলোর যে দৃশ্যগুলো আমরা পাই তাতে দেখা যায় যে, মূর্তিগুলো একে অন্যের হাত ধরে আছে, কেউ যেন ঘাড় ফিরিয়ে পিছনের লোকের সঙ্গে কথা বলছে অথবা কেউ সামনের মানুষের ঘাড়ে হাত রেখেছে। এই দৃশ্যগুলো অপরূপ দক্ষতায় উৎকীর্ণ করা হয়েছে। প্রাচীনকালে এর সমতুল্য উৎকীর্ণ আর কোন সভ্যতার শিল্পসাধনায় আমরা পাই না। ফ্রিজের সব মূর্তি পার্শ্ব-অবস্থানে উৎকীর্ণ। কোন মূর্তির সম্মুখীন অথবা পশ্চাদের চিত্র আমরা পাই না। তবে এ সমস্ত দেয়ালগাত্রে নতুন নতুন দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

পারসিকদের অন্য একটি প্রাচীন নগরী হচ্ছে সূসা। সূসা নগরীর অবস্থিতি এমন একটি পটভূমিতে ছিল যেখানে কোন পাথর ছিল না। এর ফলে সেখানকার বাড়িঘর ছিল পোড়ামাটির ইটের এবং উৎকীর্ণ মূর্তিও ছিল পোড়ামাটির। এখানে আমরা রং এর ব্যবহার পাই। রং এর সাহায্যে মূর্তিতে চকচকে ভাব আনা হয়েছে। নানাবিধ রং এর ব্যবহার তারা করেছিল। তাদের উৎকীর্ণ মূর্তিতে আমরা অদ্ভুত আকৃতির নানা ধরনের জীবজন্তুকে পাই এবং তীর নিক্ষেপরত ধনুকধারীকে পাই। তাছাড়া নানা আকৃতির পাখাযুক্ত মূর্তিকে পাই। এ সমস্ত কিছুই যেন স্বপ্নের জগৎ থেকে বাস্তবে রেখাঙ্কিত হয়েছে। উৎকীর্ণ মূর্তিগুলো ছাড়াও সূসায় পূর্ণকায় বিভিন্ন মূর্তিও পাওয়া গিয়েছে, যেমন ব্রোঞ্জনির্মিত সিংহ অথবা স্ফিংক্স? পার্সিপোলিসের মতো সূসাতেও  বহু রাজকীয় প্রহরীর উৎকীর্ণ মূর্তিও আমরা পাই। পার্সিপোলিসে এগেুলো ছিল পাথরের ওপর উৎকীর্ণ। কিন্তু সূসাতে এগুলোকে পাচ্ছি পোড়ামাটির ইটের গায়ে। যে সমস্ত রং আমরা সূসায় পাই, সেগুলো হচ্ছে উজ্জ্বল নীল গিরি মাটির রসুন এবং হলুদ। এগুলো এখনও এত উজ্জ্বল যে, রৌদ্রের আলোতে জ্বলজ্বল করে ওঠে। পরবর্তীকালে পারস্যের ইসফাহানে মসজিদের উজ্জ্বল নীল টালির সঙ্গে প্রাচীন যুগের নীল রং-এর সঙ্গতি পাওয়া যায়। এই নীল রংটি পারসিক স্থাপত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রাচীন পারসিক সভ্যতার শিল্পসম্ভার আজও আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। মহিমময়তায়, ঔজ্জ্বল্যে, সূক্ষ্ম কারুকার্যে বিবিধ রং-এর বৈশিষ্ট্যময় ব্যবহারে প্রাচীন পারস্যে স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য অনন্যসাধারণতার চিহ্ন বহন করছে। প্রাচীন বিভিন্ন সভ্যতার শিল্পচাতুর্যকে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় আপন শিল্পসত্তার অঙ্গীভূত করে তাঁরা যে নিদর্শনগুলো রেখে গেছেন, মহাকালের প্রেক্ষাপটে তা চির উজ্জ্বল থাকবে। সুমেরীয় রাজারা ছিলেন দেবতাদের প্রতিনিধি। ব্যাবলনীয় রাজারা ছিলেন সকল বস্তুর অধিকর্তা, কিন্তু প্রাচীন পারস্যে রাজারা ছিলেন রাজাদের রাজা। প্রাচীন পারসিকদের কল্পনায় রাজাকে রাজত্ব করার অধিকার দিয়েছিলেন আহুর মাজদা। যিনি রাজাদের রাজা হতেন তিনি হতেন বিরাট সাম্রাজ্যের অধিপতি, যাঁর থাকত প্রচুর সৈন্য-সামন্ত এবং প্রচুর অশ্ব। রাজার রাজা ছিলেন ন্যায়াধি। তার রাজত্বে অগ্নি ছিল সমস্ত কিছু শুদ্ধিকরণের উজ্জ্বল উপাদান। সর্বাংশে না হলেও সেই প্রাচীন সাম্রাজ্যো ভগ্নাবশেষের মধ্যেই আমরা অভূতপূর্ব মহিমার নিদর্শন পাই।

ইসলামী শিল্পকলা

‘ইরান সর্বদাই চেষ্টা করেছে তার জাতীয় স্বকীয়তা নির্মাণকর্মের মধ্যে প্রস্ফুটিত করতে। এই স্বকীয়তাএসেছে তার অতীত থেকে। যে অতীতের ধর্মীয় চেতনাকে সে অস্বীকার করেছে, কিন্তু তার নির্মাণশিল্পকে গ্রহণ করেছে এবং সম্মান করেছে।’

৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে আরব অশ্বারোহীরা পূর্ণ বিক্রমে সাসানীয় সাম্রাজ্য আক্রমণ করল এবং ইরানের সমগ্র মালভূমি তাদের অধিকারে আনল। এক সময় মহামতি আলেকজান্ডরের হাতে একিমিনীয় সাম্রাজ্য পরাভূত হয়েছিল, তেমনি আরবদের  হাতে সাসানীয় শক্তি নিশ্চিহ্ন হলো। দেশের দখল বিদেশীদের হাতে চলে গেল, কিন্তু তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধ্বংস হতে দিল না। ইসলাম ধর্ম তারা গ্রহণ করল। কিন্তু আরবদের ভাষাকে গ্রহণ করল না, তারা ফারসি ভাষাকেই তাদের জীবনে প্রচলিত রাখল।

ইসলামের বিজয়ের প্রাথমিক দিকে আরবরা ইরানে মসজিদ শিল্পের প্রতিষ্ঠা ঘটায়। উমাইয়াদের সময় যে ধরনের মসজিদ তৈরি হতো অবিকল সেই ধরনের মসজিদ ইরানে তৈরি হতে লাগল। উমাইয়া মসজিদের বিশেষত্ব ছিল যে, সেখানে একটি বিরাট অঙ্গনের চতুর্দিকে পোর্টিকোর ব্যবস্থা ছিল এবং নামাজের জন্য একটি আবরিত কক্ষের ব্যবস্থা ছিল। নবম শতকে আব্বাসী আমলে যে সমস্ত মসজিদ তৈরি হয়েছিল, সেগুলো সবই এ ধরনের ছিল। প্রথম প্রথম ইরানের দামগানে এবং নাঈনে এ ধরনের মসজিদ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যে তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে মসজিদ নির্মাণের সূত্রপাত ঘটাতে লাগল। ইরান তার অতীতের স্থাপত্যের নিদর্শন থেকে অনেক উপমা এবং ভাষা গ্রহণ করল। স্থাপত্যের ভাষায় যাকে ‘কীয়স্ক’ বলে প্রাচীন অগ্নিপূজার বেদীর থেকে তার নির্মাণকৌশল গ্রহণ করল এবং সাসানীয় যুগের অর্ডিয়েন্স হলকে ইসলামের প্রয়োজনে রূপান্তরিত করল। এই সংযোগটি রাজপ্রাসাদ-মসজিদ এবং মাদ্রাসার মধ্যে একটি সেতু-বন্ধন নির্মাণ করল। ইরানীয় রাজপ্রাসাদের এবং পরবর্তীকালে মাদ্রাসার মাঝখানে একটি চতুষ্কৌণিক কোড থাকত যার চতুর্দিকের অভ্যন্তরীণ দেয়ালে আইভান বা অর্ডিয়েন্স হলগুলো থাকত। একে অনেকটা ক্রুশাকার বা ‘ক্রুশিফর্ম প্ল্যান’ বলা হয়ে থাকে। ইরানীয়রা অতীতের পদ্ধতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে সমর্থ হয়। মসজিদের মধ্যে কেবলা নির্দিষ্ট হয় এবং একটি ‘নিশ’ এর আকারে মেহরাব সংযুক্ত হয়। এক প্রকার বক্র খিলানের মধ্যে মেহরাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইরানীয় মসজিদ-স্থাপত্যে ভোল্ট এর ব্যবহার অনন্যসাধারণ। অনেক প্রকার খিলানের পারস্পরিক সংযোগে বিরাট খিলানের ভোল্ট-এর সৃষ্টি তারা করেছিল।

ইরান সর্বদাই চেষ্টা করেছে তার জাতীয় স্বকীয়তা নির্মাণকর্মের মধ্যে প্রস্ফুটিত করতে। এই স্বকীয়তা এসেছে তার অতীত থেকে। যে অতীতের ধর্মীয় চেতনাকে যে অস্বীকার করেছে, কিন্তু তার নির্মাণশিল্পকে গ্রহণ করেছে এবং সম্মান করেছে। অতীতের এই নির্মাণশৈলীর বৈশিষ্ট্য ছিল তার অগ্নিপূজার বেদীভূমির কৌশলগত নির্মাণ, সাসানীয় সাম্রাজ্যের অর্ডিয়েন্স হল এবং গম্বুজ শিল্প। ইরান ইসলামী শিল্পকলার ক্ষেত্রে নতুন ভঙ্গিতে এবং নতুন ভাষায় প্রাচীনকালের নির্মাণ পদ্ধতিকে গ্রহণ করেছে। আমরা লক্ষ্য করি যে, ইসলামী স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ইরান গম্বুজকে নানাভাবে ব্যবহার করেছে এবং বহু খিলানের সমন্বিতরূপে ভোল্টের ব্যবহারকে প্রবল করেছে। ইরানকে অন্য কোন দেশ থেকে গম্বুজের কলাকৌশল গ্রহণ করতে হয়নি। ইটের তৈরি গম্বুজ ইরানে পূর্বেও ছিল, এমনকি বাসগৃহেও ছিল। ইতিহাস বলে, প্রার্থীয় এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যের সময় গম্বুজের ব্যবহার নানাভাবে বিস্তৃত হয়। রাজপ্রাসাদ এবং মন্দিরের চূড়ায় গম্বুজের ব্যবহার ছিল। ইসলামের আগমনের পর ইরানের মুসলমান স্থপতিরা গম্বুজ এবং ভোল্টের ব্যবহার নতুনভাবে বিশুদ্ধ করেছে এবং এসব ক্ষেত্রে অসাধারণ উৎকর্ষ লাভ করেছে। পূর্বেকার গম্বুজগুলো চতুষ্কৌণিক ভিত্তির ওপর নির্মিত হতো। ইসলামের আগমনের পরে এই চতুষ্কৌণিক ভিত্তি বৃত্তাকারে পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তন সাধনের ফলে গম্বুজের যেমন দৃশ্যগত পরিবর্তন সাধিত হয়, তেমনি নির্মাণগত পরিবর্তন সাধিত হয়। ইরানের শিল্পীরা জ্যামিতিক সূক্ষ্ম বিচারের সাহায্যে তাদের গম্বুজ, খিলান এবং ভোল্টের উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন। আমরা জানি, তাঁরা জ্যামিতিক কৌশলে বৃত্ত, অর্ধ বৃত্ত, চতুষ্কোণ এবং বহুবিধ কৌণিক ব্যঞ্জনা অট্টালিকার নির্মিতির মধ্যে অসাধারণ বৈচিত্র্য সম্পাদন করেন। প্রাচীন গ্রীকরাও জ্যামিতিকে গ্রহণ করেছিল, কিন্তু তারা জ্যামিতির সাহায্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে সক্ষম হয়নি। তারা ত্রিভুজের ব্যবহার করেছে এবং লম্ব রেখার ব্যবহার করেছে। ইরানের মুসলমান শিল্পীরা এ দু’টি ব্যবহারে সন্তুষ্ট থাকেননি। তাঁরা সমান্তরাল রেখা, লম্বরেখা, বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত, বক্ররেখা এবং নানাবিধ আকৃতি নিয়ে বিস্ময়কর পরীক্ষা করেছেন। এসব পরীক্ষার ফলস্বরূপ যে শিল্পস্বভাবের পরিস্ফুটন দেখি তা অতুলনীয়।

এভাবে ডোম এবং ভোল্ট নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজিতে যাকে বলে ‘পেনডেনটিভ’ এবং ‘স্ট্যালাকটাইট’- সেই সমস্ত সূক্ষ্ম কারুকার্যের সম্মোহনী বিন্যাস ঘটিয়ে ইরান যে অসাধারণ শিল্প চাতুর্যের নিদর্শন সৃষ্টি করেছে তা আজও পরিশীলিত স্থপতি-বিজ্ঞানীদের কাছে অসাধারণ নির্মাণ-কৃতি হিসাবে পরিগণিত হয়। প্রাচীন গুহায় ছাদ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ে শুকিয়ে যেভাবে ঝুলন্ত দণ্ডের সৃষ্টি হয় তাকেই ‘স্ট্যালাকটাইট’ বলা হয়। ইরান তার মসজিদ এবং অন্যান্য ভবন নির্মাণ কাজের মধ্যে নানা রকম ‘স্ট্যালাকটাইট’ সৃষ্টি করেছিল। তাছাড়া মৌমাছির মধুচক্র বা চাকের মতো ছিদ্রবহুল ছোট ছোট খোপের সাহায্যে অদ্ভুত সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছিল। এগুলো ছিল নিছক সৌন্দর্যের জন্য, ব্যবহারের প্রয়োজনে নয়।

ইরানের ইসলামী শিল্পকে যদি আমাদের পরীক্ষা করতে হয়, তাহলে ইসফাহান শহরের দিকে আমাদের দৃষ্টিপাত করতে হবে। ইসফাহান শহরটি একটি পরিকল্পিত শহর ছিল এবং এ শহরের মসজিদ পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে নগরের চতুর্দিকে বিস্তৃতি ঘটেছিল। একাদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ইসফাহান নগরের স্থাপত্যগত বিকাশ ঘটে। সেলজুকদের আমলে এবং সাফাভীদের আমলে ইসফাহান ছিল ইরানের রাজধানী। ইসফাহানের প্রধান মসজিদই হচ্ছে ‘মসজিদ-ই-জামি’। সেলজুকদের আমলে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। মালিক যখন সম্রাট, তখন ১০৭৩ থেকে ১০৯২ সালের মধ্যে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। যথার্থ ইরানীয় পদ্ধতিতে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। সাফাভীদের আমলে ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইসফাহান যখন পুনরায় ইরানের রাজধানীতে পরিণত হয় তখন সম্রাট শাহ আব্বাস ইসফাহানকে স্থাপত্যকলার দিক থেকে নতুন করে পুনর্গঠিত করেন। তিনি ‘মায়দান-ই-শাহ’ নামক একটি বিরাট রাজকীয় কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। উক্ত কমপ্লেক্সে চল্লিশটি কলাম বা পিলারের ওপর একটি প্রাসাদ নির্মিত হয় এবং ‘আলী কাপু’ নামক অন্য একটি প্রাসাদ ময়দানের নিকটে নির্মিত হয়। এই কমপ্লেক্সে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিল শেখ লুৎফুতউল্লাহ মসজিদ। অন্য একটি মসজিদ ছিল যাকে ‘শাহের মসজিদ’ বলা হতো। এই ‘শাহের মসজিদ’ হচ্ছে ইরানের একটি অনন্যসাধারণ স্থাপত্য কীর্তি। এই মসজিদের মধ্যে একটি চতুষ্কৌণিক আয়তক্ষেত্র ছিল যার চারপাশে ভোল্ট আকৃতির ৪টি মেহরাবের মতো নির্মিতি ছিল। এই নির্মিতিগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত। মসজিদ এলাকার অভ্যন্তরে মাদ্রাসার জন্য দু’টি স্থান নির্দিষ্ট ছিল। শিল্পকলার দক্ষ এবং কৌশলগত অভিনিবেশ এই মসজিদকে শুধু ইরানের কেন, সমগ্র বিশ্বের একটি অলোকসামান্য কীর্তি হিসাবে গণ্য করা যায়। ময়দানে শাহের অভ্যন্তরে মসজিদ-ই-শাহ একটি অনন্যসাধারণ স্থাপত্য কীর্তি। ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদের নির্মাণ কাজ আরম্ভ হয় ইরানের নিজস্ব স্থাপত্য ভাষায়। মাঝখানে একটি আয়ত ক্ষেত্র যাকে ইংরেজিতে ‘কোর্ট’ বলে এবং চারপাশে ‘পোর্টিকো’। পোর্টিকোগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে ৪টি আইভানের দ্বারা। এই পদ্ধতিটা ইরানের নিজস্ব পদ্ধতি। এই পদ্ধতিটি বহাল রেখে বহুবিধ কারুকার্য সম্পাদন করা হয়েছে। এসব কারুকার্যের দ্বারা বুঝা যায় যে, সাফাভীরা স্থাপত্যে অলংকরণের ক্ষেত্রে সকল কুশল প্রয়োগ করেছিল। এই মসজিদের সমগ্র নির্মাণকর্মটি এমনভাবে সম্পূর্ণ করা হয়েছে যাতে একটা পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য অনুভব করা যায়। নির্মিতিটি সকল দিক থেকেই সমভাবে এবং সুসমঞ্জস পূর্ব ও পশ্চিম দিকের দুই আইভান অবিকল এক রকম এবং প্রতিটি আইভান দিয়ে অগ্রসর হয়ে আমরা একটি  করে গম্বুজের ছাদবিশিষ্ট একটি করে কক্ষ পাই। দক্ষিণ দিকের আইভানটি অন্য দু’টি আইভানের চেয়ে বড় এবং এই আইভান দিয়ে আমরা উপাসনা-গৃহের পবিত্রতম অংশে প্রবেশ করি। এই অংশেই মেহরাব অবস্থিত এবং এই অংশের গম্বুজটি তার বেইজ থেকে ক্রমশ প্রসারিত হয়ে ওপরে মিলিত হয়েছে কিছুটা ঘোড়ার খুরের নালের মতো। উপাসনা কক্ষের দু’টি উন্মুক্ত কক্ষ রয়েছে। প্রধান আইভানের দু’পাশে দু’টি মিনার উঠে গেছে। সামগ্রিকভাবে নির্মাণ কৌশলের দিক থেকে এ মসজিদটি একটি সমগ্রতা, একটি সম্পন্নতা, ভারসাম্য এবং দক্ষ বিভাজনে একটি অপূর্ব মহত্ত্বব্যঞ্জক সৃষ্টি। এই মসজিদের ভিতরকার মিনা করা কারুকার্যগুলো আলোকসম্পাতে অসাধারণ দীপ্তিমান হয়ে দেখা দেয়। মিনা কারুকার্যের মধ্যে উজ্জ্বল নীল, ফিরোজা এবং হলুদের ব্যবহার খুবই সুন্দর। লতানো কারুকার্যগুলো বিচিত্র শোভার সৃষ্টি করেছে। গম্বুজের বেষ্টনীতে ‘কুফী’ হরফে কুরআন শরীফের আয়াত লিখিত হয়েছে। মসজিদের মূল গম্বুজের ওপরের বেষ্টনীতে নীল, হলুদ লতাপাতাগুলো পরস্পর সংলগ্ন হয়ে একটি চমৎকার দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। গম্বুজের মধ্যভাগের সামগ্রিক বেষ্টনীতে নীলের ওপর সাদা ব্যবহার করে কুরআন শরীফের আয়াত খচিত আছে। গম্বুজের সর্বনিম্নভাগ কয়েকটা খণ্ড খণ্ড অংশে বিভক্ত করে আল্লাহর বিভিন্ন নামে অলংকরণ নির্মাণ করা হয়েছে। গম্বুজের বহির্বিভাগটি যেমন সুন্দর, অভ্যন্তরীণ কারুকার্যও তেমনি সুন্দর। অভ্যন্তরভাগে একবারে ওপরের ছাদে চক্রাকারে একটি ফুলের পুনরাবৃত্তি তৈরি করা হয়েছে এবং তার নিম্নে মৌমাছির ঝুলন্ত কারুকার্য আমাদের অভিভূত করে। ইটের সাহায্যে অসাধারণ অভিনিবেশের সাহায্যে মৌচাক সদৃশ আকৃতিগুলো বিন্যস্ত করা হয়েছে।

এই মসজিদের ভোল্টগুলো অনেকগুলো খিলানের সাহায্যে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে মনে হয় যে, একটি আটমুখী তারা ভোল্টের ৮টি দিকে তার আলো ছড়িয়েছে। ভোল্টের জ্যামিতিক বিন্যাস এবং বিস্তার নিয়ে আমি এখানে আলোচনা করব না। শুধু এ কথা বললেই যথেষ্ট হবে যে, এই ভোল্টগুলো একই সঙ্গে স্থাপত্যগত দক্ষতা এবং শিল্পগত মনোজ্ঞ বিন্যাসের পরিণতি। যেভাবে খিলানগুলো পরস্পরের সংলগ্ন হয়ে একটি আচ্ছাদন নির্মাণ করেছে তাতে একই সঙ্গে ভারসাম্য এবং দক্ষ নির্মিতি-কৌশলের পরিচয় দেয়। ভোল্টের অভ্যন্তরে আলোর বিকিরণের ব্যবস্থাও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। আইভানের শেষের দিকে যে অর্ধ গম্বুজের ভোল্টিং রয়েছে তা পারস্যের স্থপতিদের সুচারু দক্ষতার পরিচয় দেয়। একটি গম্বুজকে মাঝখানে কেটে দু’খ- করলে যে অর্ধবলয় নির্মিত হয় সে আইভানটি এমনভাবে গঠিত যে, দর্শকের জন্য তা বিস্ময়-বিমূঢ়তার সৃষ্টি করে। এই অর্ধগম্বুজ নির্মাণের ক্ষেত্রে পারস্যের স্থপতিরা বহুবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে তাদের সামনে অজস্ত্র বিকল্প ছিল- এই প্রমাণ আমরা পাই নানাবিধ আইভানের মধ্যে। আইভানগুলো সবই এক রকমের নয়।

শাহ আব্বাস যে সমস্ত স্থপতি নিযুক্ত করেছিলেন, এক কথায় তাদের বলা যায় ‘মাস্টার বিল্ডার্স’, সাধারণ ভাষায় অসাধারণ দক্ষ নির্মাণকারী। নির্মাণের ক্ষেত্রে যে সমস্ত জটিল সমস্যার সম্মুখীন তাঁরা হয়েছিলেন সেগুলোর সমাধান তাঁরা করেছিলেন বিচিত্রভাবে। এ সমস্ত নির্মাণগত সমস্যা ছিল অত্যন্ত জটিল। তাঁরা এই সমস্ত জটিল সমস্যার সমাধান করে নির্মাণগত ‘ভার্চুয়াসিটি’ অর্থাৎ আঙ্গিকগত দক্ষতার যে পরিচিতি দিয়েছেন তা আজকের বৈজ্ঞানিক যুগের নির্মাতাদের কাছেও অভূতপূর্ব মনে হয়। খিলানের সভঙ্গ আকৃতিগুলো যে জটিল যুক্তি বিচারে একে অন্যের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে ওপরের ছাদ নির্মাণ করেছে তা অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ।

গম্বুজ আকৃতির নির্মিতি আমরা অনেক দেখেছি বাইজানটাইন শিল্পে। গম্বুজের আকৃতি অসাধারণ শোভনতা এককালে প্রকাশিত হয়েছিল আমরা জানি। ওসমানীয় তুর্কীরা বাইজানটাইন শিল্প প্রকৃতি অবলম্বন করে গম্বুজধারী বহু মসজিদ নির্মাণ করে গেছেন। সে সমস্ত গম্বুজ নির্মাণগত দিক থেকে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় বহন করে। ইরানের গম্বুজ কিন্তু কোনক্রমেই তুর্কী গম্বুজের দ্বারা প্রভাবিত নয়। বহুকাল ধরে ইরানের মানুষ তাদের বাসগৃহে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য একপ্রকার গম্বুজ ব্যবহার করে এসেছে। সুতরাং গম্বুজটা ইরানের নিজস্ব ভার্নকুলার বা শিল্পভাষার অন্তর্গত। ইরান নিজস্ব ঐতিহ্য থেকেই গম্বুজের ধারণা পেয়েছে এবং তাদের মসজিদে সেই গম্বুজ তারা ব্যবহার করেছে। দৃশ্যত বাইজানটাইন গম্বুজ এবং ইরানী গম্বুজের মধ্যে পার্থক্য আছে। নির্মাণ পদ্ধতিতে এদের উভয়ের জটিলতা ব্যাখ্যা না করে বলা যায় যে, এই দুই গম্বুজ রীতিগতভাবে ভিন্ন প্রকৃতির।

ইরানে মসজিদের অলংকরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মিনার কাজ অত্যন্ত সুন্দর। এই  মিনার কাজের সাহায্যে যে সমস্ত আকৃতি গঠিত হয়েছে সেগুলো উজ্জ্বল চাকচিক্যে অসাধারণ কুশলতার পরিচয় বহন করে। পাকা ইটের ওপর মিনার কাজ করা হয়েছিল। সেলজুক যুগে রং এর ব্যবহার তেমন প্রবল ছিল না। কিন্তু আব্বাস তাঁর শিল্প সচেতনতার সাহায্যে অট্টালিকায় মিনার চাকচিক্যের বৈচিত্র্যে আনলেন। আইভানের খিলানগুলো এবং গম্বুজগুলো নানা রং-এর মোজাইকে তিনি অলংকৃত করলেন ঘন নীল, ওকার বা হালকা হলুদ এবং হলুদ। এই রং এর কাজগুলোর ওপর কালো এবং সাদা রং-এর আরবি অক্ষরগুলো লেখা হয়েছিল। ‘পলিক্রম’ বা বহুবর্ণের ব্যবহার সাফাভী আমলে মসজিদগুলোতে এত সম্পন্ন এবং সম্পূর্ণভাবে করা হয়েছে যে, মসজিদের দেয়াল, মেঝে, গম্বুজের অভ্যন্তর, আইভানের অভ্যন্তর এবং পোর্টিকোতে কোথাও রংবিহীন খালি জায়গা নেই। এক্ষেত্রেও বাইজানটাইন এবং রোমের মোজাইক থেকে তা ভিন্নতর। রোম এবং বাইজানটাইনে রং-এর ব্যবহার ছিল অসম্ভব সীমাবদ্ধ, কিন্তু সাফাভীদের রং-এর ব্যবহার এত সমগ্র এবং সম্পূর্ণ যে, দর্শকের মনে এক প্রকার মোহগ্রস্ততা এবং তন্ময়তা সৃষ্টি করে। সাফাভীদের আমলে তৈরি ইসফাহানের ইটের অট্টালিকাগুলো সামগ্রিকভাবে বহুবর্ণের পরিমার্জনীয় উজ্জ্বল। পৃথিবীতে কোন যুগে কোন দেশে স্থাপত্যকর্মের ইতিহাসে পলিক্রমের এমন সামগ্রিক ব্যবহার আর নেই। স্থাপত্যের  নিদর্শনের দিক থেকে ইসফাহান লালিত্যে, মাধুর্যে এবং মহার্ঘতায় একটি চিরকালীনতার স্বাক্ষর রেখেছে যা অতুলনীয় এবং অনন্যসাধারণ।

ইসফাহানের এই গৌরব দীর্ঘকাল পর্যন্ত ছিল এবং এখনও আছে। এখন ইসফাহান বিখ্যাত তার কার্পেট শিল্পে, হস্তশিল্পে এবং ছাপ-চিত্রে। ইসফাহানের এই সমস্ত ছাপ-চিত্রশিল্পীকে ‘কলমকর’ বলা হয়। এই ‘কলমকরগণ’ তাঁদের সুনিপুণ হস্তশিল্পের কারুকার্যে বিশ্ববিখ্যাত। সেজন্যই সৌন্দর্য-পিপাসু শিল্প-রসিকরা ইসফাহানেরকে ‘অর্ধ পৃথিবী’ বলে থাকেন। ইসফাহানের অট্টালিকায় রৌপ্যধাতুর অভ্যন্তরীণ সজ্জায় প্রস্তরগুলো বিভূষিত এবং বিচিত্রিত হয়েছে।

পারস্য শিল্প বিশেষ করে স্থাপত্য শিল্প আজও তার প্রাচীন ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। আধুনিক সময়ের একটি দাবি হচ্ছে, নির্মিত গৃহকে বাসযোগ্য করা অর্থাৎ প্রয়োজন সিদ্ধতাই বর্তমানে স্থাপত্য শিল্পে আদর্শ। এর ফলে আধুনিককালে সকল দেশেই একটা চেষ্টা চলছে। বর্তমানকালের ব্যবহারিক জীবন এবং দ্রুতগতি সময়ক্ষেপণের সঙ্গে সমন্বিত করা। কিন্তু ইরানই একমাত্র দেশ যে তার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করছে এবং আধুনিককালেও তার প্রবাহকে বিদ্যমান রাখছে। দু’টি ক্ষেত্রে ইরান তার প্রাচীন সংস্কার এবং কৌশলকে পূর্ণ মর্যাদায় সংরক্ষিত রাখছে। এ দু’টি ক্ষেত্র হচ্ছে সমাধি মন্দির এবং মসজিদ। আচ্ছাদিত গম্বুজধারী অলংকৃত সমাধি-মন্দির আজও ইরানে তৈরি হচ্ছে। ইমাম খোমেইনীর মুসলিয়ামটি এর একটি প্রকৃষ্ট নিদর্শন। তবে অতীতের মতো সম্ভ্রান্ত এবং মহার্ঘ বিপুলায়তনে মসজিদ নির্মাণ এখন আর হচ্ছে না। সেটা আর সম্ভবপর নয়। মসজিদের নির্মাণ কৌশলের মধ্যে একটি সহজতা এসেছে এবং ‘মিনার’ কাজ থাকলেও তা ব্যাপক নয়। তবে ইরান তার সকল পুরানো মসজিদ এবং মুসলিয়ামগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে যাচ্ছে এবং লক্ষ্য করে যাচ্ছে যাতে তাদের পুরানো সৃষ্টির গৌরব এবং ঔজ্জ্বল্যের অবক্ষয় না ঘটে।

ফিলিস্তিন- কবিতা

আমিন ইবনে করিম

ফিলিস্তিন! হে ফিলিস্তিন!

সবর কর আসবে সুদিন।

আসবে ফিরে স্বপ্ন ঘিরে

তোমার নীড়ে লাল আবিরে,

একটি যুবক মুক্ত স্বাধীন

ফিলিস্তিন! হে ফিলিস্তিন!

 

ফিলিস্তিন! হে ফিলিস্তিন!

সবর কর আর ক’টা দিন।

যায়নবাদের ধারক যারা

ডাকাত তারা দেশ লুটেরা,

ফুরিয়ে যাবে ওদের দিন

ওই দেখ ওই আসছে নবীন।

 

ফিলিস্তিন! হে ফিলিস্তিন!

সবর কর আর ক’টা দিন।

এক জামাতে সকল মুমিন

এক সাথে হাত রাখবে যেদিন।

শাহাদাতের নেশায় পাগল

খালিদ তারিক মুসার বেশে,

আসবে ছুটে ভাঙতে আগল

ফৌজে খোদা মরুর দেশে।

স্বাধীনতা আসবে ওদিন

রইবে না আর ওদের অধীন,

আসবে ফিরে আসবে সুদিন,

ফিলিস্তিন! হে ফিলিস্তিন!

সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ

এরভিন চ্যারগাফ

 (এরভিন চ্যারগাফ একজন আধুনিক জার্মান দার্শনিক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। সাধারণত জার্মান ভাষাতেই তিনি লিখেন। কিন্তু ইংরেজি ভাষাতেও তাঁর চর্চা বেশ প্রশংসিত। চ্যারগাফ ইংরেজি ভাষায় ‘সিরিয়াস ম্যাটারস’ (Serious Matters) নামক একটি প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ করেন। এই বইয়েরই একটি রচনার সার সংক্ষেপ আমরা এখানে তুলে ধরলাম)।

কিছুদিন আগে ফরাসি সংস্কৃতি মন্ত্রীর একটি বক্তৃতা পড়েছিলাম। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ’ এর জন্য অভিযুক্ত করেছেন। আমি জানি না, এই ধরনের কোন কিছুর অস্তিত্ব আছে কি নেই। তবে গ্রেশামস’ ল (Gresham’s Law)-এর কথা আমি জানি। গ্রেশামের আইন মতে কালো টাকা বাজারে এসে সাদা টাকাকে অচল করে দেবে। এটা একটি সত্য যে, মানুষ আর ঘোড়ার মধ্যে তফাৎ রয়েছে, আগেকার মানব প্রজ্ঞা বর্তমান আমি’র চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ ছিল। তা থেকে আমার উপলব্ধি হয়েছে, মানুষ ঘোড়াকে পানির কাছে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু জোর করে পানি খাওয়াতে পারে না। কিন্তু আমার স্থির বিশ্বাস, মানুষের বেলায় এই দু’টি কাজই সম্ভব। আমাদের রয়েছে প্রচার-প্রপাগান্ডার প্রভূত হাতিয়ার এবং উত্তেজনাকর বিবিধ শিল্পকলা। মিষ্টি-মধুর গানবাদ্য ছাড়াও এ ক্ষেত্রে যদি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তাহলে মানুষকে মূত্রপান করতেও বাধ্য করা যেতে পারে। এটা কিভাবে সম্ভব? অর্থাৎ যদি দুই বা একজন চলচ্চিত্র তারকা মঞ্চে দাঁড়িয়ে এ কাজটির (মূত্রপান) ভান করে, তাহলেই লোকেরা তা করবে। তবে আমার মনে হয় না, এই ধরনের ব্যবসায়িক ফন্দি-ফিকিরে কেউ টাকা কামাতে পারবে। তাই যদি হতো তাহলে এতদিন আমরা একটি ‘আমেরিকান মূত্র কোম্পানির’ American Urine Company-A.U.C মুখ দেখতে পেতাম।

লর্ড রোজবেরী (১৮৯৯) একবার মন্তব্য করেছিলেন, ‘যৌক্তিক সাম্রাজ্যবাদ বৃহত্তর ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদে রূপ লাভ করে।’

‘যৌক্তিক’ বা ‘বিজ্ঞতাপূর্ণ’ এমন একটি বিষয়, যা নিকৃষ্টতম বর্বরতার বেলায়ও প্রযোজ্য হতে পারে।

উপনিবেশিত জনগণের প্রতি উপনিবেশবাদী প্রভুরা পশুর ন্যায় আচরণ করত। কারণ, ব্রিটিশ জাতীয়তাবাদ এবং ‘বিজ্ঞতা’র অভাবে এসব স্থানীয় লোক দুর্ব্যবহার পাওয়ারই যোগ্য ছিল। তাই প্রভুদের মতে উপনিবেশিত জনগণকে ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যাওয়াতে অন্যায় কিছু হয় না।

সাম্রাজ্যবাদই শুধু নয়, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আরো একটি শব্দ তাদের রয়েছে। তা হলো মোড়লিপনা বা hegemony;  ইদানীংকালে চীন দেশে এর বেশ ব্যবহার দেখা যায়। যাদের সাথে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ভালো সম্পর্ক নেই তাদেরকে চীন এই বিশেষণে আখ্যায়িত করে থাকে।

সাম্রাজ্যবাদ বা আধিপত্যবাদের ওপর ব্যাপক রচনা সম্ভার রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে লেনিন এবং অটো বাভের (Ott Baver) এর মতো কম্যুনিস্ট চিন্তানায়করা আধিপত্যবাদকে পুঁজিবাদেরই অস্ত্রসজ্জিত একটি শাখা হিসাবে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। সমাজতন্ত্রীদের ক্ষমতা লাভের পর আধিপত্যবাদের এই কঠোর সংস্থার রূপ পাল্টে যায়। আমি মনে করি, মানুষ যখন কোন কিছু করতে অক্ষম বোধ করে তখন মান-মর্যাদার দিকেই ফিরে তাকায়। মানুষের মধ্যে একদল আছে যারা সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপেই লিপ্ত থাকে। আর একটি দল সেই কার্যকলাপকে লেখনির মাধ্যমে তুলে ধরে। এভাবে ইতিহাসে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো পাওয়া যায়। কিছুকাল আগের ফকল্যান্ড দ্বীপমালার ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রাক্তন রাজতন্ত্রের মিথ্যা স্বপ্নগরিমা ধীরে ধীরে বিস্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনা কার্ল মার্কস এর সেই উক্তিরও সত্যতা বিধান করে যখন কার্ল মার্কস বলেছিলেন : ‘হেগেল বলেছেন, ‘সকল ঐতিহাসিক ঘটনার দ্বিতীয়বার পুনরাবৃত্তি ঘটে’। কিন্তু তিনি এটা বলতে ভুলে গেছেন যে, এ সকল ঘটনা একবার বিয়োগান্ত রূপ লাভ করে এবং তারপর হাস্যকর রূপে পর্যবসিত হয়।’

অবস্থার যখন পরিবর্তন ঘটে এবং প্রচলিত কোন শব্দ যখন উপযুক্ততা হারিয়েছে বলে আমরা মনে করি তখন সেই শব্দের প্রারম্ভে সাধারণত আমরা একটি উপসর্গ জুড়ে দেই, যেমন ‘নতুন’ বা ‘পরবর্তী’ ইত্যাদি। আধিপত্যবাদের এ রকম এক নতুন রূপ হলো নয়া উপনিবেশবাদ (New Colonialism)। এর আভিধানিক অর্থ খুঁজলে পাওয়া যায়, অন্য দেশ ও জনগণের ওপর পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে বৃহৎ শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পদ্ধতি।

এই সূত্রে আমেরিকার সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের উদ্দেশ্যে হলো অন্য দেশে পরোক্ষভাবে তার সংস্কৃতির চালান দেয়া। তবে এই ‘সংস্কৃতি’ শব্দটার অর্থ কী তা আমাদের জানা উচিত। Raymond Williams এর বিশ্ববিখ্যাত আভিধানিক গ্রন্থ KEY WORDS-এ বলা হয়েছে ইংরেজি ভাষায় ‘Culture’ অর্থাৎ সংস্কৃতি শব্দটার ব্যাখ্যা করা খুবই জটিল। এই সংস্কৃতির আওতায় অনেক বিষয়ই আসতে পারে, যেমন সাহিত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সংগীত, নাটক, সিনেমা ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের যুগে এই সংখ্যাকেও খুব সংক্ষিপ্ত মনে হয়। আমার মতে উচ্চতর শিক্ষা, অধ্যয়ন, গবেষণা প্রভৃতিও সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তা ছাড়া জাতীয় ভাষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়াও সংস্কৃতির অঙ্গ। শিশুসন্তান এবং গাছপালার যে রকম যত্ন নেয়া হয় তেমনি ভাষারও যত্ন নেয়া উচিত। তবে সংস্কৃতির সংজ্ঞায়িতকরণে আমি অবশ্যই গণমাধ্যম ও অন্যান্য ভাবপ্রবণতা জাগানো উপাদানকে বাদ দেব। কারণ, এগুলো জনমতকে বিকৃত ও বিভ্রান্ত করায় ওস্তাদ। চিত্তবিনোদন শিল্পগুলোকেও আমি সাংস্কৃতিক অভিধায় আখ্যায়িত করতে চাই না।

রফতানি করতে হলে রফতানি করার মতো কিছু আপনার থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আদৌ কি তেমন কোন সংস্কৃতি রয়েছে যা সে অন্যদের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চাপাতে পারে? আমি বলব, নেই। বস্তুসামগ্রীর উৎকৃষ্ট মানের কারণে রফতানি করা হয়, তা ভাবা হাস্যকর হবে। সাম্রাজ্যবাদীরা প্রায়ই কোন গুণাগুণ বিচার ছাড়াই তাদের দ্রব্যসামগ্রী রফতানি করে থাকে। তবে তাদের মারণাস্ত্রগুলো বেশ উন্নতমানের হয়।

ফরাসি সংস্কৃতি মন্ত্রী যদি প্যারিস নগরীর দেয়ালগুলোর দিকে লক্ষ্য করেন, তাহলে কী দেখতে পাবেন? যদি কান পেতে দেন, তাহলে কী শুনতে পাবেন? তিনি দেখতে পাবেন আমেরিকান ধাঁচের ড্রাগ স্টোর, তিনি দেখতে পাবেন প্যারিসের যুবকেরা আমেরিকান ব্লু জীন্‌স পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমেরিকান সংগীতের তালে তালে নাচছে এবং আমেরিকান কোকাকোলায় চুমুক দিচ্ছে। তিনি আরো দেখতে পান প্যারিস নগরীর সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে কুৎসিত সব গগনচুম্বী অট্টালিকার কারণে। তিনি দেখতে পান সিনেমা হলগুলোয় হলিউডি মারদাঙ্গা সিনেমার দৌরাত্ম্য, টিভিতে একই রকম এক ঘেঁয়েমিপূর্ণ সিরিয়ালের আধিপত্য। তিনি যখন রেস্তোরাঁয় ঢোকেন তখন টেবিলে টেবিলে খাবারের আমেরিকান নামের বহর দেখে অবাক হয়ে যান। এসব কিছুই আধিপত্যবাদের নমুনা। তবে এসবকে কালচার অর্থাৎ সংস্কৃতি বলা যাবে কিনা- এ ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

শিশুবেলায় ভিয়েনায় থাকতে আমি দেখেছি ফ্রান্স বা ব্রিটেন থেকে যা কিছুই আসত তা প্রশংসনীয় ছিল। যদিও হাঙ্গেরী, রোমানিয়া, পোল্যান্ডে ভিয়েনার জিনিসপত্র প্রশংসনীয় ছিল। ঠিক তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল সকলের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু আমি মনে করি গত ৩০ বছর এই সুনাম সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।

আধিপত্যবাদ বা অ-আধিপত্যবাদ যাই হোক, আমি মনে করি, সংস্কৃতি হিসাবে তুলে ধরার মতো যুক্তরাষ্ট্রের কিছুই নেই। যতদূর জানি, যুক্তরাষ্ট্রে লেখকদের লেখার মান অত্যন্ত নীচু প্রকৃতির, সংগীত এবং  সুকুমার কলার অবস্থাও তথৈবচ। শুধু সিনেমা এবং সম্ভবত নৃত্যশিল্পকে কিছুটা উন্নতমানের বলা যায়। অথচ ৭০ বছর পিছনে ১৯২২ সালে যদি আমরা ফিরে যাই, তাহলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র আমাদের সামনে ফুটে উঠবে। তখন আমেরিকান সমাজে বড় বড় ঔষধ, কবি, সাহিত্যিক, চিত্রকর, ভাস্কর এবং সংগীত বিশারদের প্রাচুর্য…। অথচ সেই সময়েও কালচার হিসাবে উপস্থাপন করার মতো যুক্তরাষ্ট্রের তেমন চমকদার কিছু ছিল না, তবে একটা জিনিস ছাড়া- তা ছিল জ্যাজ সংগীত। তাও আবার ছিল নিগ্রোদের অবদান।

এর পরে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের আওতায় বাকি থাকে শুধু গবেষণা এবং বিজ্ঞান। বর্তমানে এই দু’টি বিষয় সম্পূর্ণভাবে কতিপয় বিশেষজ্ঞের হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে। কল-কারখানায় উৎপাদিত বস্তুসামগ্রীর মধ্যেই বিজ্ঞান ও গবেষণাকে তারা আবদ্ধ করে রেখেছে। অর্থাৎ সাধারণ জনগণের কাছ থেকে তা বিচ্ছিন্ন। এই গবেষণা ও বিজ্ঞানের আমেরিকান ব্রান্ডকে অপপ্রচারকারীরা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অন্যতম উপাদান হিসাবে জাহির করে।

নিজেদের অনিচ্ছা বা অক্ষমতার কারণে আমেরিকানরা অন্য কোন ভাষা শিখতে পারে না। এ জন্য নিজেদের ভাষাকে গোটা পৃথিবীর ঘাড়ে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার বদ মতলব তাদের স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রেও গ্রেশামের নীতি কাজ করে।

স্লোগান হলো আধিপত্যবাদের একটি বড় হাতিয়ার। তবে এই স্লোগানকে সংস্কৃতি বলা যাবে কিনা আমার সন্দেহ। ইদানিং আমেরিকান জীবনধারা একটি প্রভাবশালী স্লোগান। আমি মনে করি এই জীবনধারা ‘রিয়েল এস্টেট’ ব্যবসার রঙিন পুস্তিকা এবং টিভি পর্দাতেই নিহিত। নিউইয়র্কে আমি অনেকদিন কাটিয়েছি। ওখানকার অধঃপতিত অবস্থা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছে। এখনো আমি বুঝতে পারি না, প্রাচ্য দেশগুলোর প্রচার সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো কেন তাদের লোকজনদের নিউইয়র্কের অলিগলি, ব্রংস-এর দক্ষিণভাগ এবং ব্রুকলিনের মহল্লাগুলোকে পরিদর্শনের জন্য পাঠায় না? তাহলে প্রকৃত অবস্থাটা তাদের চোখে পড়ত। কিন্তু আমি জানি, এই প্রশ্নটা একেবারে সাদামাটা গুরুত্বহীন একটা প্রশ্ন। কেননা, অধিকাংশ এশিয়াবাসীই যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় লাভের জন্য লালায়িত। আমার কাছে যা বাজে কুঁড়ে ঘর, তাদের কাছে তা স্বাধীনতার সোনার রথ।

‘মুক্তি’ শব্দটা ব্যবহার করে খুব শক্তিশালী স্লোগান বানানো যায়। এই শব্দটার উচ্চমূল্য রয়েছে। মুক্তি শব্দের বিচার করতে গেলে স্বাধীনতা শব্দটাও এসে যায়। এ দু’টি শব্দ যেমন সমার্থক, তেমনি আবার ভিন্নার্থকও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার যখন তাঁর নাগরিক স্বাধীনতার বেলুন উড়িয়েছিলেন তখন সেগুলো নিউইয়র্কেও গগনচুম্বী অট্টালিকাগুলোকেও ছাড়িয়ে ওপরে উঠে গিয়েছিল। নাগরিকদের মুক্তির নামে কি তিনি সেই কাজ করতে পারতেন? আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমার মতে মুক্তি হলো স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপ। মুক্তির পরিসংখ্যানগত দিক থাকতে পারে, কিন্তু স্বাধীনতা এমন জিনিস যা হতাশ হয়ে মানুষ খুঁজে বেড়ায়।

কিংবদন্তী সৃষ্টির মহান প্রক্রিয়াতেই এসব স্লোগানের শক্তি নিহিত। স্লোগান অবাস্তব স্বপ্ন কল্পনারই প্রতিফলন। নিজের অর্ধমুক্ত ভাগ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এসব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সচেষ্ট। এ ধরনের আধিপত্যবাদের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এর বহির্মুখী রূপকে বিশ্বাস করা। আমাদের সময়ের কোটি কোটি নির্যাতিত অবহেলিত জনগণের কানে রাতদিন ঢোল পিটিয়ে এই অবাস্তবতা ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। তারা যদি শেষ পর্যন্ত এসবের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে তাহলে এই বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই সময় থাকতেই আমাদের সাবধান হয়ে যাওয়া উচিত।