মঙ্গলবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

English

হরমুজগানের উপকূলীয় গ্রাম: সাগর সংস্কৃতি ও সামাজিক পর্যটনের এক অনন্য মেলবন্ধন

পোস্ট হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬ 

news-image

ইরানের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত হরমুজগান প্রদেশ এক স্বপ্নময় ভূখণ্ড, যেখানে মানুষের জীবন প্রাচীনকাল থেকেই সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত সুন্দর সব গ্রাম এ অঞ্চলের বিশেষ পরিচয় বহন করে। এই গ্রামগুলো শুধু বসতি নয়; এগুলো জীবন্ত সাংস্কৃতিক ভাণ্ডার- যেখানে ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের টিকে থাকার গল্প একসূত্রে গাঁথা।

ইরানের ইংরেজি ভাষার স্যাটেলাইট চ্যানেল প্রেস টিভির বরাতে পার্সটুডে জানিয়েছে, হরমুজগান প্রদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন জোয়ার-ভাটার ছন্দে চলমান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিখেছে কীভাবে সমুদ্রের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়- যে সমুদ্র তাদের জীবিকার উৎস, আবার তাদের পরিচয়েরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

উপকূলীয় গ্রাম ও তাদের সম্ভাবনা

হরমুজগানের বেশ কয়েকটি উপকূলীয় গ্রাম তাদের অনন্য প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

কেশম দ্বীপে অবস্থিত লাফত গ্রামটি ঐতিহাসিক বায়ুবাহী টাওয়ার (বাদগির), ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এবং হারা বন-এর নিকটবর্তী অবস্থানের জন্য বিখ্যাত। সাংস্কৃতিক পর্যটন, স্থাপত্য গবেষণা ও ইকোট্যুরিজমের জন্য এ গ্রামটির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

এর কাছাকাছি অবস্থিত সোহেইলি গ্রামটি সম্প্রদায়-ভিত্তিক এবং টেকসই পর্যটনের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃত, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে। ম্যানগ্রোভ বনের নিকটবর্তী হওয়ায় নৌকাভ্রমণ এবং পরিবেশগত শিক্ষা এখানকার প্রধান আকর্ষণ, আর স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে যে অর্থনৈতিক সুবিধা সম্প্রদায়ের মধ্যেই থাকে।

পশ্চিম দিকে, বন্দর-ই মোগাম তার চিত্তাকর্ষক সমুদ্র সৈকত, পাথুরে উপকূল এবং অপেক্ষাকৃত অক্ষত প্রকৃতির জন্য আলাদা। এই অঞ্চলে প্রকৃতি-কেন্দ্রিক এবং দুঃসাহসিক পর্যটনের জন্য উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে যারা কম বাণিজ্যিকীকৃত গন্তব্য খুঁজছেন এমন পর্যটকদের জন্য।

হরমুজ দ্বীপের  ছোট ছোট গ্রামগুলো রঙিন মাটির পাহাড় ও অনন্য উপকূলীয় ভূদৃশ্যের মাঝে গড়ে উঠেছে। হরমুজ এখন সৃজনশীল পর্যটনের প্রতীক—যেখানে শিল্প, প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার।

পূর্ব হরমুজগানে রিকু ও অন্যান্য কম পরিচিত গ্রামগুলো এখনো মূলত ঐতিহ্যবাহী মাছধরা ও স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। অবকাঠামো কম উন্নত হলেও, মৌলিকত্ব ও সংস্কৃতি সংরক্ষণভিত্তিক দায়িত্বশীল ক্ষুদ্র-পরিসরের পর্যটনের জন্য এসব অঞ্চলের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য।

 হরমুজ দ্বীপের লাল সৈকত

সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য

হরমুজগানের উপকূলীয় সমাজের সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সামুদ্রিক বাণিজ্য ও দূরদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রভাবে গড়ে উঠেছে। ইরানি, আরব, আফ্রিকান ও ভারতীয় সংস্কৃতির উপাদান এখানকার আচার-অনুষ্ঠান, সঙ্গীত ও সামাজিক জীবনে মিশে গেছে, যা অঞ্চলটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

অনেক আচার-অনুষ্ঠানই সমুদ্রকে কেন্দ্র করে—শান্ত সমুদ্রের জন্য প্রার্থনা, মাছ ধরার মৌসুম শুরুর উৎসব কিংবা সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার সমবেত আয়োজন। রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বিশেষ করে নারীদের পরিধেয় বস্ত্র, এখনো এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দৃশ্যমান প্রতীক।

সঙ্গীত ও আচার-অনুষ্ঠান

ঐতিহ্যবাহী বন্দরি সঙ্গীত, যা প্রায়ই ‘নেই-আনবান’ (এক ধরনের স্থানীয় বাঁশি, যা ব্যাগপাইপের মতো) ও বিভিন্ন পারকাশন যন্ত্রের সঙ্গে পরিবেশিত হয়, উপকূলীয় জীবনের উচ্ছ্বাস ও প্রাণচাঞ্চল্য তুলে ধরে। উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং প্রজন্মান্তরে চলে আসা মৌখিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহায়তা করে।

‘কালিয়ে-মাহি’—তেঁতুলের স্বাদযুক্ত ঝাল মাছের তরকারি

খাদ্য ও স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি

উপকূলীয় গ্রামগুলোর আরেকটি বড় আকর্ষণ তাদের খাদ্যসংস্কৃতি। তাজা মাছ, চিংড়ি, খেজুর ও সুগন্ধি মসলাভিত্তিক রান্না এখানে জনপ্রিয়।

‘কালিয়ে-মাহি’—তেঁতুলের স্বাদযুক্ত ঝাল মাছের তরকারি এবং ‘হাওয়ারি মেইগু’ (চিংড়ির পদ) স্থানীয় খাদ্যতালিকার প্রধান পদ। ‘বেরেঞ্জ-ই দিশু’—খেজুরের রস দিয়ে রান্না করা ভাত যা কৃষি ও উপকূলীয় জীবনের নিবিড় সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে।

অনেক গ্রামে এখনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি ‘মাহিয়াভে’ (ফারমেন্টেড মাছের সস) ঘরে প্রস্তুত করা হয় এবং স্থানীয় রুটির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। গ্রামীণ পরিবারের সঙ্গে একবেলা খাবার ভাগ করে নেওয়া পর্যটকদের জন্য প্রায়ই স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

মৎস্য শিকার ও সামুদ্রিক জীবিকা

মৎস্য শিকার এখনও উপকূলীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং স্থানীয় পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ।

বন্দর মোগামের মতো গ্রামে এবং কেশম দ্বীপের উপকূল বরাবর, মাছ ধরা শুধু একটি পেশার চেয়ে বেশি কিছু— এটি একটি জীবনধারা যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়েছে। ছোট কাঠের নৌকা, হাতে তৈরি জাল এবং সামুদ্রিক স্রোত ও মৌসুম সম্পর্কে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এখনও মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

এই চর্চাগুলো শুধু স্থানীয় সম্প্রদায়ের জীবন ধারণ করে না, বরং অভিজ্ঞতা-কেন্দ্রিক পর্যটনের জন্যও উচ্চ সম্ভাবনা সরবরাহ করে; যাতে দর্শনার্থীরা ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার পদ্ধতি কাছ থেকে দেখতে বা এমনকি অংশ নিতে পারেন।

হরমুজ দ্বীপের রঙিন মাটি ও প্রাকৃতিক লবণ ব্যবহার করে সৃজনশীল শিল্পচর্চা গড়ে উঠেছে

হস্তশিল্প ও স্থানীয় শিল্পকলা

প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রেখে এখানে হস্তশিল্পের বিকাশ ঘটেছে। খেজুরপাতা দিয়ে ঝুড়ি ও চাটাই বোনা, তালপাতার কাজ এবং সোনালি সুতোয় সূচিকর্ম উল্লেখযোগ্য।

হরমুজ দ্বীপের রঙিন মাটি ও প্রাকৃতিক লবণ ব্যবহার করে সৃজনশীল শিল্পচর্চা গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় উপকরণকে সাংস্কৃতিক গর্ব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দিয়েছে।

আতিথেয়তা ও সামাজিক জীবন

হরমুজগানের উপকূলীয় সমাজে আতিথেয়তা একটি মৌলিক মূল্যবোধ। অতিথিকে ঘরে আপ্যায়ন করা, ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন এবং দৈনন্দিন কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া—এসবই তাদের সামাজিক সংস্কৃতির অংশ।

পর্যটকেরা প্রায়ই মাছধরা, রান্না বা রুটি বানানোর মতো কাজে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পান, যা সাধারণ ভ্রমণের চেয়ে গভীর ও অর্থবহ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অভিজ্ঞতা দেয়।

পর্যটন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজগানের উপকূলীয় গ্রামগুলোর পর্যটনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে সুষম ভারসাম্য রক্ষার ওপর।

অক্ষত প্রাকৃতিক দৃশ্য, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্বতন্ত্র খাদ্যসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প—সব মিলিয়ে এ গ্রামগুলো সাংস্কৃতিক পর্যটন, ইকোট্যুরিজম ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণের জন্য এক আদর্শ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।#

পার্সটুডে