সোমবার, ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে ইরানের নজরকাড়া সাফল্য

পোস্ট হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৪ 

news-image

আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হবে ইরানের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের ৪৫তম বিজয় বার্ষিকী। আমেরিকার চাপিয়ে দেওয়া দশকের পর দশক ধরে চলমান অবরোধের মধ্যেও বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে দ্রুত ও দৃপ্তগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে দেশটি। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরান বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন উন্নয়ন সূচক শক্তিশালী অবস্থান বলে দিচ্ছে দেশটি কতটা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এখন নেতৃস্থানীয় দেশের তালিকায় রয়েছে ইরান।

সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর একটি বই প্রকাশ করেছে। বইটিতে ইসলামি বিপ্লবের পর বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের সার্বিক উন্নয়নের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

বইটির নাম ‘সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইন ইরান: এ ব্রিফ রিভিউ ২০২৪’। বইটিতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের অর্জনগুলো পাঠকদের জন্য বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

বইটি শুরু করা হয়েছে ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাস দিয়ে। এরপরেই বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে ইরানের জাতীয় নীতি। বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার দিক দিয়ে বিশ্বে ইরানের অবস্থান উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি দেশটির সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পরিসংখ্যানের ওপর একটি পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়।

এক নজরে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে ইরানের সাফল্য- ইরানে ২০২২-২০২৩ সালে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মোট ২০ লাখ ৮৭ হাজার ৫২৪ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে। ২০২১-২০২২ সালে স্নাতকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১৩ হাজার ৮৭০ জন। অন্যদিকে, ২০২২-২০২৩ সালে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৩৭৮ জন। ইরানের নারী শিক্ষার্থীর হার ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ ও পুরুষ শিক্ষার্থীর হার ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে বিজ্ঞান ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষায় দেশটিতে উচ্চ পর্যায়ের লিঙ্গ ভারসাম্য রয়েছে। ২০২১ সালে জ্ঞান নিবিড় কর্মসংস্থানের অনুপাত ছিল ১৯/৯৩ এবং বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে দেশটির অবস্থান ছিল ৭৬তম।

বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচক: দশকের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান দেশ ইরান

ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) প্রকাশিত বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে (জিআইআই) বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ইরান। ২০১৩ সালের ১১৩তম স্থান থেকে লাফিয়ে ২০২৩ সালে ৬২তম স্থানে উন্নীত হয়েছে দেশটি। উদ্ভাবন সূচকে ইরান নিম্ন-মধ্যম আয়ের ৩৭টি দেশের মধ্যে ষষ্ঠ এবং মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ১০টি অর্থনীতির মধ্যে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে।

জিআইআই সূচকে ভারত (৪০তম), ইরান (৬২তম) এবং কাজাখস্তান (৮১তম) মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় যথাক্রমে প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ৬২তম অবস্থান নিয়ে তুরস্কের পরে ইরান আবারও এই অঞ্চলের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি সূচকগুলির মধ্যে রয়েছে সৃজনশীল ফলাফল, জ্ঞান এবং প্রযুক্তির আউটপুট, মানব মূলধন ও গবেষণা এবং ব্যবসায়িক পরিশীলিততার সূচক।

২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইরানের জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানির মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৫৯টিতে। এর মধ্যে স্টার্টআপের সংখ্যা ৬ হাজার ৭৭৯টি, প্রযুক্তি কোম্পানি ৭৯৫টি এবং উদ্ভাবন ফার্ম ১ হাজার ৯৮৫টি। ইরানে ২০১২ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পার্কের সংখ্যা ছিল ৩৩টি, ২০২৩ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪টিতে। ২০১২ সালে ইনকিউবেটর ছিল ১৩১টি, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তা এসে দাঁড়ায় ২৯০টিতে।

চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সৃজনশীল কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৯১৪টিতে, উদ্ভাবন কেন্দ্রের সংখ্যা ৪১৯টি এবং এক্সিলারেটরের সংখ্যা ১৫৯টি। গ্লোবাল নেটওয়ার্ক প্রস্তুতি সূচকে ২০২৩ সালে বিশ্বের ১৩৪টি অর্থনীতির মধ্যে ৮৭তম স্থান লাভ করেছে ইরান।

আইসিটি খাতে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছে ইরান। বর্তমানে দেশটির ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রামীন জনগোষ্ঠী ও শতভাগ নগরবাসী ইন্টারনেট সুবিধা উপভোগ করছে। ২০২২ সালের জুন নাগাদ ইরানের মোবাইল ব্রডব্যান্ড (এমবিবি) ও ফিক্সড ব্রডব্যান্ডে (এফবিবি) অনুপ্রবেশ হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ১১৬ শতাংশ ও ১৩ শতাংশ। পরিসংখ্যান মতে, ২০২৪ সালে ইন্টারনেট অনুপ্রবেশের হার দাঁড়াবে আনুমানিক ৯৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

ই-গভার্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স-২০২২ এ ইরান বিশ্বে ৮৯তম স্থান অধিকার করে। এই র‌্যাঙ্কিংয়ে চীন ৪৩তম, মালয়েশিয়া ৫৩তম, তুর্কিয়ে ৪৮তম ও সৌদি আরব ৩১তম স্থানে রয়েছে।

২০২২-২০২৩ সালে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট ২৭ লাখ ৪ হাজার ৯০২ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত ছিল। ছেলেদের তুলনায় নারীরা উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে রয়েছে। এদের মধ্যে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশই নারী শিক্ষার্থী। অঞ্চলে জেন্ডার ভারসম্যে সবার চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে দেশটি।

বিশ্বসেরা গবেষকদের তালিকায় ৯৩৮ ইরানি, নারী ১৩৫জন

২০২৩ সালে বিশ্বের শীর্ষ এক শতাংশ সর্বাধিক উদ্ধৃত গবেষকের মধ্যে স্থান পান ৯৩৮ ইরানি গবেষক। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রায় ১৩৫ জন নারী স্কলার। ২০২৩ সালে ইরানি সংস্থাগুলির সাথে যুক্ত ৯৩৮ জন শীর্ষ গবেষককে চিহ্নিত করা হয়। আগের বছরের তুলনায় ইরানের শীর্ষ গবেষকের সংখ্যা ১২ শতাংশ বেড়েছে। গত এক দশক ধরেই দেশটিতে উচ্চ-উদ্ধৃত গবেষকের সংখ্যা বাড়ছে।

বৈজ্ঞানিক উৎপাদনে বিশ্বে ১৫তম, ইসলামি দেশগুলির মধ্যে প্রথম

বৈজ্ঞানিক উৎপাদনে ২০২২ সালে বিশ্বে ১৫তম স্থান লাভ করে ইরান। অন্যদিকে ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ৮ হাজার ৬০৯টি ফলিত নিবন্ধ প্রকাশ করে ইসলামি দেশগুলির মধ্যে প্রথম স্থান দখল করেছে দেশটি। ইরানের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এক প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরেছে। সৌদি আরব ৭ হাজার ৭৬২টি নিবন্ধ নিয়ে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।

এদিকে, কৃষি খাতে বৈজ্ঞানিক উৎপাদনের বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে ইরান ১৫তম অবস্থান থেকে দুই ধাপ উন্নতি করে ১৩তম স্থানে চলে এসেছে।

৯৯ ভাগ ওষুধই দেশীয়ভাবে উৎপাদন করে ইরান

ইরানের প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৯৯ শতাংশই দেশীয় কোম্পানিগুলি উৎপাদন করছে। দেশটির খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের প্রধান হেইদার মোহাম্মাদি এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারিকালীন সংকট এবং নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আমরা দেশীয় উৎপাদনের উপর নির্ভর করে ওষুধের ঘাটতি রোধ করতে সক্ষম হয়েছি।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদি বলেছিলেন, ইরান বিশ্বের ৪০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। আর ইরানের ওষুধ রপ্তানি তিনগুণ বেড়েছে।

বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে ইরানের অবস্থান

টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাঙ্কিং ২০২৪ -এ বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে ইরানের ৭৩ টি বিশ্ববিদ্যালয়। এর আগের বছর এই তালিকায় স্থান পেয়েছিল ইরানের ৬৫টি বিশ্ববিদ্যালয়।অপরদিকে লিডেন ২০২৩ র‌্যাঙ্কিংয়ে  বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান ইরানের ৪৬ টি  বিশ্ববিদ্যালয়।

ন্যানো প্রযুক্তিতে ইরানের অসাধারণ উত্থান

ন্যানো প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অর্জন হয়েছে ইরানের। দেশটির বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা এবং ন্যানো পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধি এই ক্ষেত্রে বিশ্ব নেতা হিসেবে ইরানের উত্থান প্রমাণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইরানে যে শিল্পগুলি ভাল প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তার মধ্যে একটি ন্যানো প্রযুক্তি শিল্প। এই শিল্প সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ইরানকে বিশ্বব্যাপী চতুর্থ স্থানে নিয়ে এসেছে।

শীর্ষস্থানীয় ন্যানোটেকনোলজি ওয়েবসাইট স্ট্যাটন্যানোর তথ্যমতে, ইরান ন্যানো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দারুণ অগ্রগতি লাভ করেছে। ন্যানোপ্রযুক্তি প্রকাশনার ক্ষেত্রে দেশটি চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এই র‌্যাঙ্কিং ইরানের উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের প্রমাণ বহন করে। র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে থাকা তিন দেশ হলো- যথাক্রমে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত।