ইসরায়েলের জন্য যুদ্ধের ৫ ভয়াবহ পরিণতি; ইরানকে নির্মূল করা যাবে না
পোস্ট হয়েছে: জুন ১৮, ২০২৬
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক যুদ্ধেও ইরানকে দমানো যায়নি
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক যুদ্ধ ইরানের শক্তির প্রাচীরে আঘাত করে থেমে গেছে। এই যুদ্ধ শুধু ইরানকে নতজানু করতে ব্যর্থ হয়নি, বরং আঞ্চলিক সমীকরণও তার পক্ষে বদলে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ, অসমমিত কৌশল এবং বহুমাত্রিক প্রতিরোধক্ষমতা ইরানকে এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছে, যাকে আঞ্চলিক সমীকরণ থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
ফার্স নিউজ এজেন্সির আন্তর্জাতিক ডেস্কের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধ শুধু সামরিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করেনি; বরং অঞ্চলটিতে প্রতিরোধক্ষমতা ও কৌশলগত বাস্তবতার নতুন সংজ্ঞা দিয়েছে। এর ফলে ইসরায়েলকে ইরান এবং তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ সংঘাত নিয়ে নিজেদের কৌশলগত ধারণা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে হয়েছে।
আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং প্রতিরোধনীতির নতুন সংজ্ঞা
লেবাননের লেখক ও ইসরায়েল বিষয়ক বিশ্লেষক আলি হায়দার মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ছিল এমন একটি কৌশলগত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে প্রতিটি পক্ষ নিজেদের, প্রতিপক্ষের এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিবেশের সামনে নিজেদের প্রকৃত শক্তির সীমা যাচাই করেছে।
তিনি দৈনিক ‘আল-আখবার’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই ধারণা নিয়ে যুদ্ধে প্রবেশ করেছিল যে তাদের বিপুল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রয়োজনে বড় রাজনৈতিক ফলাফল চাপিয়ে দিতে সক্ষম হবে। কিন্তু গত সাড়ে তিন মাসের অভিজ্ঞতা ওয়াশিংটনকে দেখিয়েছে যে ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকলেই রাজনৈতিক পরিবেশ পুনর্গঠন, আত্মসমর্পণ চাপিয়ে দেওয়া, সরকার পরিবর্তন বা আঞ্চলিক ভারসাম্য নতুন করে সাজানো সম্ভব হয় না।
‘অসমমিত কৌশল’: ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতারও বাইরে
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জানার জন্য ইরানের এই যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না। তাই যুদ্ধের আগেই তারা ‘অসমমিত কৌশল’ গ্রহণ করেছিল। সাম্প্রতিক সংঘাত সেই কৌশলের কার্যকারিতা ও শক্তিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
বাস্তব সংঘর্ষে দেখা গেছে, ইরানের শক্তি শুধু তার পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র বা আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সংঘাতের চারপাশের কৌশলগত পরিবেশে প্রভাব বিস্তার, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক নৌপরিবহনকে কেন্দ্র করে বৃহৎ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকট সৃষ্টি করার সক্ষমতাও এর অন্তর্ভুক্ত। এ সক্ষমতা এসেছে অসমমিত সামরিক উপায় ও ভূ-কৌশলগত সুবিধার সমন্বয় থেকে।
হরমুজ প্রণালী: আমেরিকা ও বিশ্বের জন্য যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শিক্ষা হিসেবে সামনে এসেছে। এই শিক্ষা আমেরিকান ও আন্তর্জাতিক মহলে গভীর ছাপ ফেলেছে এবং দেখিয়েছে যে ইরান সবসময় নিজের জাতীয় নিরাপত্তাকে বৈশ্বিক অর্থনীতির নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম।
তবে এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর, বিশেষ করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের বাস্তব ক্ষমতার সীমা ও পরিসর।
ইরান সম্পর্কে ইসরায়েলের ধারণার ভাঙন
২৮ ফেব্রুয়ারির আগে ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে ধারণা ছিল, তেহরান ও প্রতিরোধ অক্ষের ওপর ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপ সৃষ্টি করলে তা তেলআবিবের পক্ষে বড় এবং সম্ভবত ঐতিহাসিক কৌশলগত পরিবর্তনের পথ খুলে দেবে।
কিন্তু এরপর প্রমাণিত হয়েছে যে ইরানকে উৎখাত করা, তাকে আঞ্চলিক সমীকরণ থেকে সরিয়ে দেওয়া বা কৌশলগতভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নয়; এমনকি যদি যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক শক্তিও যুদ্ধে অংশ নেয়।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধের ৫টি বিপজ্জনক পরিণতি
১. ‘কৌশলগত নিশ্চিততা’র ধারণার অবসান
ইসরায়েলের নিরাপত্তা মতবাদের অন্যতম ভিত্তি ছিল শত্রুর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও নিশ্চিত বিজয় অর্জনের বিশ্বাস। কিন্তু এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে ইরান এমন এক প্রতিপক্ষ, যার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় বা তাকে আঞ্চলিক সমীকরণ থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব।
ফলে ইসরায়েলকে হয়তো ভবিষ্যতে ইরানকে পতনের অপেক্ষায় না থেকে, বরং একটি স্থায়ী ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে মেনে নিয়ে তার সঙ্গে আচরণ করতে হবে।
২. ইরানের ‘বহুমাত্রিক প্রতিরোধক্ষমতা’র বিস্তার
ইসরায়েল ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিরোধক্ষমতাকে ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক শক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখত। কিন্তু এই যুদ্ধ তাকে বুঝিয়েছে যে ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা এখন বহুমাত্রিক।
এটি ইরানের ভূখণ্ড থেকে শুরু হয়ে লেবানন ও প্রতিরোধ অক্ষের অন্যান্য ক্ষেত্র অতিক্রম করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে যেকোনো সংঘাতের মূল্য শুধু সামরিক ময়দানে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
৩. ‘ফ্রন্টগুলোকে আলাদা রাখার’ ধারণার ক্ষয়
ইরান সফলভাবে প্রমাণ করেছে যে বিভিন্ন সংঘাতমঞ্চ পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা, নৌপথের নিরাপত্তা, লেবাননের পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা এসব আর আলাদা বিষয় নয়।
ফলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠবে, কারণ একটি ক্ষেত্রে সৃষ্ট সংকট দ্রুত বহু-মুখী ও বহু-ফ্রন্টের সংকটে রূপ নিতে পারে।
৪. অসামরিক শক্তির ‘ক্ষমতার কার্ড’-এর মূল্য বৃদ্ধি
এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপের উপকরণ অনেক সময় সরাসরি সামরিক শক্তির চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে।
ইসরায়েলের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর ইরানের মতো প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তাদের হাতে নেই।
৫. ইসরায়েলের শক্তির ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন মূল্যায়ন
যেমন এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ভাবমূর্তি নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে, তেমনি ইসরায়েলের শক্তির ধারণাকেও পুনর্নির্ধারণ করেছে।
ফলে মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয় পক্ষকেই ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বাস্তবতা প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা সম্পর্কে নিজেদের পূর্বধারণা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইসরায়েলের সামরিক শক্তি কমে গেছে; বরং এর অর্থ হলো, সেই সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করে বড় রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটানোর সক্ষমতার ওপর আগের মতো আস্থা আর নেই।
সূত্র: ফার্স নিউজ এজেন্সি