শনিবার, ১৭ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ২রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

সমঝোতা অনাস্থার দেয়াল ও নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটাবে

পোস্ট হয়েছে: জুন ২২, ২০১৬ 

– প্রেসিডেন্ট রুহানি
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন ড. হাসান রুহানি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প সম্বন্ধে ৬ জাতি ও ইরানের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সমঝোতা উভয় পক্ষের মধ্যে বিরাজমান অনাস্থার দেয়ালের ইটগুলোকে ধীরে ধীরে তুলে নিতে সক্ষম হবে; আমরা কাউকে এ সুযোগ দেব না যে, মিথ্যাচার, অপবাদ ও অনুচিত বক্তব্যের দ্বারা আমাদের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে বিনষ্ট করবে। এ সমঝোতার ফলে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে; স্থগিত হবে না।
প্রেসিডেন্ট রুহানি গত ১৪ই জুলাই (২০১৫) ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান টেলিভিশনের মাধ্যমে ইরানী জনগণের উদ্দেশে প্রদত্ত এক ভাষণে এ কথা বলেন।
বার্তা সংস্থা এন্তেখাব-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট রুহানি তাঁর এ ভাষণে বলেন, আমি ঘোষণা করছি যে, কেউ যদি এ সমঝোতার সমালোচনা করতে চান তাহলে আন্তরিকতার সাথে সমালোচনার অধিকার সকলেরই রয়েছে। কিন্তু দেশের জনগণ এ দেশের যে সমুজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করছে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে এবং দেশের ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার প্রত্যাশা করছে; কেউ যদি মিথ্যাচার, অপবাদ ও অশোভন উক্তির দ্বারা সেসব প্রত্যাশাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করে তাহলে আমরা কাউকে তার অনুমতি দেব না। বস্তুত আজকের দিনটি মহান ইরানী জাতির শেষের দিন নয়, বরং শুরুর দিন- নতুন যাত্রা শুরুর দিন, নতুন আনন্দ-উৎসব শুরুর দিন, নতুন আশার সূচনার দিন, আমাদের তরুণ ও যুব সমাজের জন্য উন্নততর ভবিষ্যৎ শুরুর দিন, আমাদের প্রিয় দেশ ইরানের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে দ্রুততর কর্মতৎপরতা শুরুর দিন।
প্রেসিডেন্ট রুহানি তাঁর এ ভাষণে ৫+১ জাতি ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সম্পর্কে জনগণকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন। ভাষণের শুরুতে তিনি নবী-রাসূলগণ (আ.) ও আল্লাহ্র ওয়ালিগণ (রহ্.), বিশেষ করে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) ও আহ্লে বাইতের পবিত্র ও নিষ্পাপ ইমামগণের (আ.) প্রতি, আরো বিশেষভাবে সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি এবং পারমাণবিক প্রকল্পের খেদমতে নিয়োজিত থাকার কারণে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের সহ সকল শহীদের প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করেন। অতঃপর তিনি ইমামে যামান হযরত ইমাম মাহ্দী (আল্লাহ্ তাঁর আত্মপ্রকাশ ত্বরান্বিত করুন)-এর প্রতি সালাম ও অভিনন্দন পেশ করেন।
তিনি বলেন, পবিত্র মাহে রমযান সব সময়ই কল্যাণ, বরকত ও আল্লাহ্ তা‘আলার নৈকট্য হাসিলের মাস; আমি জানতে পেরেছি, এবারের রমযান মাসে অনেক লোকই তাঁদের দো‘আসমূহে এবং লাইলাতুল্ ক্বাদ্রের সম্ভাব্য রাত সমূহে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক বিষয়ক আলোচনায় অংশগ্রহণকারী দলের সদস্যদের জন্য এবং তাঁরা যাতে একটি উত্তম ও কল্যাণকর সমঝোতায় উপনীত হতে পারেন সে লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে দো‘আ করেছেন। আর আমি এখন মহান ইরানী জাতির খেদমতে আরয করতে চাই যে, আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে তাঁদের দো‘আ কবুল হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, আমরা আজ আমাদের দেশের ও আমাদের বিপ্লবের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকালের এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। আমি বলতে চাই, এ হচ্ছে এমন একটি পরিস্থিতি যে, বিগত বারো বছর ধরে বিভিন্ন শক্তির পক্ষ থেকে অনবরত এক ধরনের দুর্বোধ্যতা ও কাল্পনিক ধারণা তৈরি ও বিশ্ববাসীর মধ্যে প্রচার করা হচ্ছিলÑ যার ফলে বিশ্বজনমত বিভ্রান্ত হচ্ছিল। কিন্তু আজ সে দুর্বোধ্যতা ও বিভ্রান্তির পৃষ্ঠা উল্টানো হয়েছে এবং একটি নতুন পৃষ্ঠা উন্মুক্ত হয়েছে ও তাতে নতুন লেখার সূচনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ নতুন পৃষ্ঠাটিতে যে লেখার সূচনা হয়েছে তার ভিত্তি হচ্ছে এই যে, বিশ্বের বুকে বিরাজমান সঙ্কট ও অচলাবস্থাসমূহের সমাধানের জন্য সংক্ষিপ্ততর ও কম ব্যয়সাপেক্ষ পথও রয়েছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের বিষয়টি একদিকে এমন একটি রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছিল যে, এর ফলে তা জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের সপ্তম অধ্যায়ের আওতায় নিরাপত্তা পরিষদের বেশ ক’টি নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে। অন্যদিকে এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিশ্ব সমাজে ইরান-ভীতি তৈরি হয়েছিল; ধারণা গড়ে উঠেছিল যে, ইরান গণবিধ্বংসী ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এই যে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়টি আমাদের দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অন্যদিকে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আমাদের জন্য একটি জাতীয় গৌরব ও সম্মানের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। আর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে হয় যে, নিষেধাজ্ঞা আরোপকারীরা আমাদের দেশের ওপর যেসব চাপ সৃষ্টি করেছিল তা আমাদের সমাজের জন্য একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। যদিও, ইতিপূর্বেও যেমন উল্লেখ করেছি, এ নিষেধাজ্ঞা কখনোই সফল হয় নি, তবে এতদসত্ত্বেও তা আমাদের জনগণের জীবন যাত্রার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল।
প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, বিশ্বের ছয়টি শক্তির সাথে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ২৩ মাসব্যাপী আলোচনার শেষে আজ আমরা একটি নতুন পয়েন্টে উপনীত হতে পেরেছি। অবশ্য বর্তমান সরকারের জন্য মাহে রমযান সব সময়ই কল্যাণ ও বরকতের মাস এবং ভাগ্য নির্ধারণী মাস ছিল। ইতিপূর্বে দু’বছর আগে ২৫শে রমযান তারিখে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ২৬শে রমযান মজলিসে শূরায়ে ইসলামিতে শপথ গ্রহণ করে। আর আজ ২৭শে রমযান সামগ্রিক যৌথ কর্মসূচির লক্ষ্যে বিশ্বের ছয় শক্তির সাথে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। রাজনৈতিক দিক থেকে আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করার প্রয়োজন ছিল। আমাদের জন্য বিশ্ব জনমতকে এটা জানানোর প্রয়োজন ছিল যে, আলোচনা মানে প্রস্তাব পাঠ করা নয়, বরং আলোচনা মানে হচ্ছে নিতেও হবে, দিতেও হবে। তিনি বলেন, আমরা যে জন্য চেষ্টা করেছি তা হচ্ছে, আলোচনা যেন আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত করে, দেয়া ও নেয়ার বিষয়টি যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে ও ভারসাম্য সহকারে এগিয়ে যায় এবং আমরা যে লক্ষ্যে উপনীত হতে চেয়েছি তাতে যেন উপনীত হতে পারি। আমরা কারো কাছে দান-ভিক্ষা চাই নি যে, কেউ আমাদেরকে তা বিনা মূল্যে দিয়ে দেবে, আর আমরা তা নিয়ে নেব। আমরা সব সময়ই এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছি যে, এ আলোচনায় কোনোরূপ হার-জিত থাকবে না। কারণ, আলোচনা যদি হার-জিতের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয় তাহলে সে আলোচনা থেকে কোনো স্থায়ী সুফল পাওয়া যাবে না। কেবল এমন আলোচনা ও সমঝোতার ফলই টেকসই ও স্থায়ী হতে পারে যা উভয় পক্ষের জন্যই জিত বা লাভ নিয়ে আসবে। আমরা এ বিষয়টি ইতিপূর্বেই আমাদের জনগণের সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলাম, আর আমাদের আলোচকগণ তেইশ মাস আগে এর ভিত্তিতেই কাজ শুরু করেন এবং আলোচনায় বসেন।
ড. রুহানি বলেন, আলোচনায় সাফল্যের অধিকারী হওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় মতৈক্য থাকা অপরিহার্য। অবশ্য এটা সুস্পষ্ট যে, আমাদের দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং দল ও গ্রুপসমূহ সকলে অভিন্ন চিন্তা ও অভিন্ন মত পোষণ করেন না। তবে সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, আমরা আমাদের দেশের মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে- পারমাণবিক প্রকল্পের বিষয়টি যে তিনটি ক্ষেত্রের সাথেই জড়িত- মতৈক্যে উপনীত হতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্বে আসার অনেক আগেই অর্থাৎ বারো বছর আগে আমাদের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়ার পর প্রথম দিনেই আমাদের মহান রাহ্বারের মতামতের ভিত্তিতে আলোচনার পন্থা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং সেভাবেই আলোচনা চলে আসছিল। আমরা তখন থেকেই কখনো তেহরানে, কখনো আমাদের প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের রাজধানীগুলোতে এবং কখনো ইউরোপীয় ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে দেখেছি এবং আমরা আলোচনায় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখি। তবে আমাদের জনগণ দু’বছর আগে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেন। ঐ সময় জনগণ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, আমরা এমন একটি সরকার চাই যে সরকার পারমাণবিক ক্ষেত্রের অর্জন সমূহের ওপর শান্তি সহকারে এবং দেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন তৎপরতা ও জনগণের কল্যাণ সহকারে গুরুত্ব আরোপ করবে। আর বর্তমান সরকার সে পথই বেছে নেয় এবং সে পথে চলতে শুরু করে।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন রুহানি বলেন, অবশ্য মহান ইরানী জাতি সব সময়ই একটি ভদ্র জাতি এবং যৌক্তিক পন্থা অনুসরণকারী জাতি। আর আমি যেদিন শপথ গ্রহণ করি আমার দায়িত্ব গ্রহণের সেই প্রথম দিনেই আমি বলেছিলাম, পাশ্চাত্য কেবল তখনি আমাদের সাথে আন্তঃক্রিয়া করতে সক্ষম হবে যদি তারা আমাদেরকে হুমকি প্রদান ও তুচ্ছ করার পন্থা বর্জন করে চলে এবং সম্মান প্রদর্শনের পথ অনুসরণ করতে শুরু করে। আজকে যৌথ পদক্ষেপের লক্ষ্যে যে সামষ্টিক কর্মসূচিতে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছে তার মূল কারণ হচ্ছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পক্ষ থেকে আন্তঃক্রিয়া এবং ৫+১ জাতির পক্ষ থেকে ইরানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন; এ দু’টি বিষয় না হলে আমরা আজ এ বিষয়ে কোনো অর্জনের অধিকারী হতে পারতাম না।
প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, এ আলোচনায় অংশগ্রহণের পিছনে আমাদের চারটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল। আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল এই যে, আমরা আমাদের পারমাণবিক সামর্থ্য ও পারমাণবিক প্রযুক্তিকে সংরক্ষণ করব এবং এমনকি পারমাণবিক কর্মতৎপরতাকেও দেশের অভ্যন্তরে অব্যাহত রাখব। আমাদের দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল ভ্রান্ত, অন্যায় ও মানবতাবিরোধী নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটাব। আমাদের তৃতীয় লক্ষ্য ছিল এই যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক আমাদের দেশের বিরুদ্ধে গৃহীত যেসব প্রস্তাব আমাদের দৃষ্টিতে বেআইনি সেগুলোর কার্যকরিতার অবসান ঘটাব। আর আমাদের চতুর্থ লক্ষ্য ছিল, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প সংক্রান্ত ফাইলটিকে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের সাত নং অধ্যায়ের আওতা থেকে এবং মূলগতভাবে নিরাপত্তা পরিষদের আওতা থেকে বের করে আনব। আজ যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলো এবং যৌথ পদক্ষেপের যে সামগ্রিক কর্মসূচি গৃহীত হলো তার ফলে আমাদের এ চারটি লক্ষ্যের সব ক’টিই অর্জিত হয়েছে। অবশ্য আমরা যাতে রেড লাইন অতিক্রম না করেই আমাদের লক্ষ্য সমূহে উপনীত হতে পারি সে জন্য বিগত তেইশ মাস যাবৎ আলোচনা চলাকালে আমাদের দেশের কূটনীতিকগণ, আইনজীবিগণ, অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ এবং সেই সাথে পারমাণবিক বিজ্ঞানিগণ সর্বান্তকরণে তাঁদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন।
ড. রুহানি বলেন, আলোচনার প্রথম দিকের দিনগুলোতে আমাদের প্রতিপক্ষ বলছিল যে, পারমাণবিক সীমাবদ্ধতার মেয়াদে-আজকের সমঝোতায় যার মেয়াদ আট বছর নির্ধারিত হয়েছে- ইরান মাত্র একশ’ সেন্ট্রিফিউজের অধিকারী থাকতে পারবে। অনেক আলোচনার পরে তারা এক হাজার সেন্ট্রিফিউজের ব্যাপারে সম্মত হয়। কিন্তু আমাদের দিক থেকে ব্যাপকভাবে প্রতিরোধের ফলে শেষ পর্যন্ত তারা চার হাজার সেন্ট্রিফিউজের ব্যাপারে সম্মত হয় এবং বলে যে, এর আর পরিবর্তন হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আজকের সমঝোতায় তা ছয় হাজার সেন্ট্রিফিউজের ওপরে উন্নীত করা হয়েছে- যার মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি সেন্ট্রিফিউজ নাত্বান্জ্ পারমাণবিক প্রকল্পে এবং এক হাজারের বেশি সেন্ট্রিফিউজ ফারদো পারমাণবিক প্রকল্পে থাকবে। এছাড়া নাত্বান্জ্ পারমাণবিক প্রকল্পের সমস্ত সেন্ট্রিফিউজের সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, এছাড়াও তারা বলছিল যে, আমাদের ওপর আরোপিতব্য সীমাবদ্ধতার মেয়াদ হবে প্রথম ধাপে বিশ বছর এবং এর পরের ধাপে আরো পঁচিশ বছর। পরে তারা বলে যে, এ মেয়াদ হবে যথাক্রমে ২০ বছর ও ১০ বছর। সবশেষে বলে, ২০ বছর এবং এটাই শেষ কথা। কিন্তু আমরা নতি স্বীকার করি নি। সবশেষে, শেষের দিককার দিনগুলোর আলোচনায় তা হ্রাস করে আট বছরে নির্ধারিত হয়।
প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, গবেষণা ও উন্নয়ন সম্পর্কে তারা বলছিল যে, ইরানের পক্ষে কেবল আইআর-১-এ তা আঞ্জাম দেয়া সম্ভবপর। বস্তুত এ ছিল একটি হাস্যকর ও অর্থহীন কথা। কারণ, এটা তো আমাদের ছিলই এবং এ ক্ষেত্রে গবেষণা ও উন্নয়নের কথাটির কোনো অর্থ ছিল না। পরে তারা বলে যে, আইআর-২-এ। কিন্তু আমরা এ বিষয়ে যে সমঝোতা চেয়েছিলাম আলোচনার শেষ দিনে তা-ই হলো; আমরা চেয়েছিলাম যে, আইর্আ-৮-এ গ্যাস ইনজেক্ট করার কাজ শুরু হবে এবং আমরা তা-ই অর্জন করেছি। তিনি বলেন, তারা আরাক-এর পারমাণবিক প্রকল্প সম্পর্কে বলত, সেখানে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর থাকবে, কিন্তু হেভি ওয়াটার থাকার কোনো মানে হয় না, আর এটাই হচ্ছে চূড়ান্ত রেড লাইন। কিন্তু আজ এমন এক অবস্থায় সমঝোতা হয়েছে যে, যৌথ সমঝোতায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আরাকের পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরে হেভি ওয়াটারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর সমঝোতায় উল্লিখিত সেই বৈশিষ্ট্য সমূহ সহকারেই- সেই হেভি ওয়াটারের প্রকৃতি সহকারেই- এ রিঅ্যাক্টর পূর্ণতা লাভ করবে। আর ফারদো পারমাণবিক প্রকল্প সম্পর্কে তারা বলত, ফারদো (যার মানে ‘আগামী কাল’) নামটি উচ্চারণ করা কঠিন এবং তা শুনতেও আরো বেশি কঠিন, তাই না আপনারা এ নামটি বলবেন, না আমরা এটি শুনব। পরে তারা বলে, ফারদো প্রকল্পে কোনো সেন্ট্রিফিউজ থাকবে না, বরং এটা হবে কেবল একটি গবেষণা কেন্দ্র। পরে তারা বলে, এখানে আইসোটোজি গবেষণার কাজ করা যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আজকের সমঝোতা অনুযায়ী এতে এক হাজারেরও বেশি সেন্ট্রিফিউজ থাকবে। আর ফারদো প্রকল্পের অংশবিশেষ টেকসই আইসোটোজি সম্পর্কে গবেষণা ও তার উন্নয়নের কাজে ব্যবহৃত হবে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, নিষেধাজ্ঞা সম্বন্ধে তারা বলত, কয়েক মাস সময় নেয়া হবে; প্রথমে আমাদের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি হতে হবে, এরপর ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হবে, পরোপুরি তুলে নেয়া হবে না; আপনারা তুলে নেয়ার কথা বলবেন না। তারা বলল, কয়েক বছর পর আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) যদি ইতিবাচক রিপোর্ট দেয় এবং আমাদের মধ্যে যদি আস্থা সৃষ্টি হয় তাহলে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে। কিন্তু আমি আজ মহান ইরানী জাতির সামনে ঘোষণা করছি যে, প্রতিষ্ঠিত সমঝোতা অনুযায়ী, সমঝোতা কার্যকর হওয়ার দিনেই অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাসহ সমস্ত রকমের নিষেধাজ্ঞা, এমনকি মিসাইল নিষেধাজ্ঞাও- ঠিক যা যা নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তে অন্তর্ভুক্ত আছে তার সবই- উঠে যাবে। আর্থিক, ব্যাঙ্কিং, বীমা সংক্রান্ত, যোগাযোগ ও পরিবহন, পেট্রো-রসায়ন সংক্রান্ত, মূল্যবান ধাতব সংশ্লিষ্ট, এক কথায়, সমস্ত রকমের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে যাবে, স্থগিত হবে না। এমনকি অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামাদির ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে; অবশ্য এ ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের জন্য এক ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকবে, এরপর তা পুরোপুরি উঠে যাবে। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেগুলো সম্পর্কে তারা বলে, আপনারা তো এগুলো মেনেই চলেন নি, এমতাবস্থায় কীভাবে আমরা এগুলো তুলে নেব? বলল, অন্তত ছয় মাসের জন্য এগুলো কার্যকর করুন। কিন্তু আজকে যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলো তার ভিত্তিতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি নতুন প্রস্তাব পাশের মাধ্যমে ইতিপূর্বে ইরানের বিরুদ্ধে গৃহীত ছয়টি প্রস্তাবের সবগুলোকেই তুলে নেবে। আর ইরানবিষয়ক ফাইল চিরদিনের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আওতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তারা বলছিল যে, এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে এবং আইএইএ যদি ইতিবাচক রিপোর্ট দেয় তাহলে এটা করা হবে এবং এ জন্য তারা প্রথমে বিশ বছর পরে করার কথা বলে ও পরে পনর বছর পরে করার কথা বলে। কিন্তু আজ যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলো তাতে আইএইএ-র রিপোর্টের শর্তারোপ ছাড়াই সমঝোতা কার্যকর হবার দশ বছর পর ইরানবিষয়ক ফাইল পুরোপুরিভাবে নিরাপত্তা পরিষদের আওতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, আপনারা হয়তো প্রশ্ন করবেন যে, এ সমঝোতা কি ৫+১ জাতির ওপর আস্থার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারণ, তা-ই যদি হয়ে থাকে তাহলে দীর্ঘ তেইশ মাস যাবৎ আলোচনা চলার, বিশেষ করে বিগত আঠারো দিন যাবৎ দিন-রাত অবিরত আলোচনার কোনোই প্রয়োজন ছিল না। এ প্রশ্নের জবাবে জানাতে চাই, আমাদের দিক থেকে সমঝোতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আস্থার বিষয়টি একটি পরীক্ষা। কারণ, এ সমঝোতা যদি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ও ভালোভাবে বাস্তবায়িত হয় তাহলে ধাপে ধাপে এ সমঝোতার বাস্তবায়ন ধীরে ধীরে অনাস্থার দেয়ালের ইটগুলো তুলে নিতে পারে। কারণ, এটা সুস্পষ্ট যে, যেসব দেশ ইরানের প্রতি অত্যন্ত মন্দ মনোভাব প্রদর্শন করতো ও যেসব দেশ ইরানের প্রতি মন্দ মনোভাব প্রদর্শন না করলেও ভালো মনোভাব প্রদর্শন করে নি তাদের ওপর আস্থা রাখা ছাড়াই আমরা পরিপূর্ণ সতর্কতা সহকারে ও সমঝোতার প্রতি দৃষ্টি রেখে আমাদের কাজকর্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। তিনি বলেন, অবশ্য এ সমঝোতা হচ্ছে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা। আমরা সমঝোতার এক দিকে কষ্টি পাথর স্থাপন করি, আর তা ছিল ইতিপূর্বে জেনেভায় প্রতিষ্ঠিত সাময়িক সমঝোতা এবং এর ভিত্তিতে আমরা চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য পদক্ষেপ নেই। আর আজ সমঝোতার বাস্তবায়নের বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক। তারা যদি এ সমঝোতার যথাযথ অনুসরণ করে তাহলে আমরাও সমঝোতার যথাযথ অনুসরণ করব। আর ইরানী জাতি তার ইতিহাসে সব সময়ই যখনই কোনো অঙ্গীকার করেছে ও চুক্তি সম্পাদন করেছে তখন তাতে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছে। সুতরাং এ চুক্তির ক্ষেত্রেও আমরা আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেব, তবে শর্ত হচ্ছে এই যে, আমাদের প্রতিপক্ষকেও এর প্রতি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে। তিনি বলেন, অবশ্য এ সমঝোতার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। আজ ছিল এর প্রথম পর্যায় অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট সাতটি দেশের সকলেই সমঝোতার মূল পাঠ (টেক্সট্) ও এর পাঁচটি সংযোজনীর ব্যাপারে মতৈক্যে উপনীত হয়েছে ও তা গ্রহণ করে নিয়েছে। পরবর্তী পর্যায় হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে এ সমঝোতার টেক্সট্ এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের জন্য যে টেক্সট্ তৈরি করা হবে তা নিরাপত্তা পরিষদে পাশ হতে হবে। এরপর, সংশ্লিষ্ট দেশ সমূহের যেসব পর্যায় রয়েছে সেসব ক্ষেত্রে এ পর্যায় সমূহ অব্যাহত থাকবে। এসব পর্যায় অতিক্রম করার পর যে দিনটি আসবে সে দিনটির নাম হবে সমঝোতার দিন। প্রকৃতপক্ষে আজকের দিনটি ছিল যৌথ বিবৃতির দিন। আর কয়েক দিন পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যখন তার প্রস্তাব পাশ করবে সে দিনটি হবে এ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হবার দিন। মোটামুটি দুই মাস পরে আমরা সমঝোতার দিনে উপনীত হব। সমঝোতার দিনটি হবে এমন একটি দিন যে দিনে ইউরোপ ও আমেরিকা তাদের ইরানবিরোধী সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করবে। তখন থেকে ইরানের পক্ষ থেকে নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু হবে- যাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। সম্ভবত এ সময়টি দুই মাসেরও বেশি হবে। সেই দিনটিই হবে সমঝোতা বাস্তবায়নের দিন অর্থাৎ আগামী কয়েক মাস পর সমঝোতার পূর্ণ বাস্তবায়নের দিন আসবে।
ড. রুহানি বলেন, তবে আজকের দিনটি হচ্ছে বিগত বারো বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। কারণ, বিশ্বের বৃহৎ দেশসমূহ ও শক্তিবর্গ তাদের ইতিহাসে আজকের এ দিনটিতে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক কর্মতৎপরতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অতঃপর বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে আমরা সমঝোতার দিনে উপনীত হব। তিনি বলেন, দীর্ঘ বারো বছর পর বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো ঘোষণা করেলো যে, তারা পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ও আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে সাহায্য করবে। আজকে হচ্ছে এমন একটি দিন যেদিন বৃহৎ শক্তিবর্গ ঘোষণা করলো যে, ইরানের ওপর আরোপিত সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে এবং ইরানের সাথে সাধারণ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক শুরু হবে। বস্তুত আজ হচ্ছে একটি সমাপ্তির দিন ও একটি শুরুর দিন। আজকের দিন হচ্ছে মহান ইরানী জাতির প্রতি অন্যায় এবং ভ্রান্ত ও অসঙ্গত অপবাদ সমূহের অবসানের দিন এবং বিশ্বে সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন প্রক্রিয়ার সূচনার দিন। আজকের দিনে যেহেতু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর একের পর এক আরোপিত নিষেধাজ্ঞার শৃঙ্খল ছিন্ন হতে চলেছে সেহেতু আজকের দিনটিতে কেবল শীরায, ইসফাহান, তাবরীয, খোরাসান, আহ্ওয়ায, তেহরান, কেরমান ও ইরানের অন্যান্য শহরের তথা সমগ্র ইরানের জনগণই আনন্দিত নয়, বরং জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের অধিবাসী ফিলিস্তিনি জনগণ, গাযার জনগণ, কুদ্সের জনগণ এবং লেবাননের জনগণও আনন্দিত। কারণ, ফিলিস্তিনগ্রাসী যায়নবাদী সরকার বিগত তেইশ মাস যাবৎ যে অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিল তা ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে। আজকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জনগণও আনন্দিত। কারণ, ইরান পারমাণবিক বোমা বানাতে চায়- এ মর্মে ভিত্তিহীন বাহানা তুলে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের ওপরে বিভিন্নভাবে যুলুম-নির্যাতন করা হয়েছিল এবং চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল; আজ সে বাহানার অবসান ঘটছে।

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন রুহানি বলেন, ৫+১ জাতির কতক দেশ যদি ঘোষণা করে, আমরা ইরানকে পারমাণবিক বোমা বানানো থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছি তাতে কিছু আসে-যায় না, কারণ, সারা দুনিয়ার মানুষ জানে যে, ইসলামী বিপ্লবের মহান রাহ্বারের ফতওয়া অনুযায়ী পারমাণবিক বোমা তৈরি করা একটি ভ্রান্ত ও মানবতাবিরোধী হারাম কাজ এবং এ কারণে বৃহৎ শক্তিবর্গের সাথে সমঝোতা হোক বা না-ই হোক এবং সমঝোতা হবার পর তা বাস্তবায়ন হোক বা না-ই হোক, কোনো অবস্থায়ই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করবে না। তাই সকলের উচিত এ সমঝোতার প্রকৃত অর্জন সম্পর্কে কথা বলা, তা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আজ একটি নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছেÑ যার ফলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ও সমগ্র বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার সম্প্রসারণ ঘটবে।

এ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিবসে উপনীত হবার জন্য যাঁরা ভূমিকা পালন করেন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. রুহানি তাঁর ভাষণে তাঁদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তিনি বিগত বারো বছর যাবৎ বিভিন্ন ধরনের অন্যায় ও ভ্রান্ত চাপের মোকাবিলায় প্রতিরোধের পরিচয় দেয়ার জন্য ইরানী জাতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তিনি মহান রাহ্বারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেন, জাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনি সব সময়ই কঠিন পরিস্থিতিতে যথাযথ পথনির্দেশ প্রদান করে জনগণ, দেশ, ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও সরকারকে সাহায্য করেছেন এবং এ চলার পথে তিনি তাঁর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ সহকারে স্বীয় স্কন্ধে এক বিরাট ভারী বোঝা বহন করেছেন। প্রেসিডেন্ট রুহানি এ ব্যাপারে সব সময় জনগণ, ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সরকারকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের কারণে মজলিসে শূরায়ে ইসলামী (পার্লামেন্ট), মজলিসের স্পিকার, বিচার বিভাগ এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী সমূহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সেই সাথে তিনি রাষ্ট্রীয় কল্যাণ নির্ধারণ পরিষদ, নেতা নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ পরিষদ, দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্র সমূহের ছাত্র-শিক্ষকগণ, দ্বীনী নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ছাত্র-শিক্ষকগণ, ওলামা ও বুদ্ধিজীবিগণ, যুবসমাজ, মহিলাগণ ও সর্বোপরি দেশের সর্ব স্তরের জনগণের প্রতিÑ যাঁরা সব সময়ই স্বীয় দৃঢ়তা সহকারে হাসিমুখে এ ব্যাপারে সরকার ও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সমর্থন করেছেন ও আশার বাণী শুনিয়েছেন, তাঁদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইরানী জনগণকে সম্বোধন করে বলেন, মহান ইরানী জনগণ! আজকের দিন হচ্ছে শুরুর দিন- একটি নতুন তৎপরতা শুরু করার দিন, নতুন আনন্দের শুরুর দিন, নতুন আশার শুরুর দিন, আমাদের তরুণ ও যুবসমাজের জন্য উন্নততর ভবিষ্যৎ শুরুর দিন, আমাদের প্রিয় দেশের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে দ্রুততর কর্মতৎপরতা শুরু করার দিন।
তিনি বলেন, আমি সবশেষে বলতে চাই যে, মধ্যপ্রাচ্যের জাতিসমূহ তথা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো যেন ইরানী জাতির অকল্যাণকামীদের ও যায়নবাদী সরকারের অপপ্রচার দ্বারা প্রতারিত না হন। বস্তুত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শক্তি সব সময়ই কার্যত আপনাদেরই শক্তি। আমরা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের নিরাপত্তাকে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তা বলে মনে করি। আমরা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের দেশ সমূহের স্থিতিশীলতাকে আমাদের নিজেদের স্থিতিশীলতা বলে মনে করি। আমাদের দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন আমাদের প্রতিবেশীদের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে। ইরান কখনোই গণবিধ্বংসী অস্ত্র হস্তগত করার জন্য চেষ্টা চালায় নি। ইরান কখনোই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সমূহের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে নি এবং কখনো করবে না। আমি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের দেশ সমূহের উদ্দেশে বলতে চাই, আমাদের ও আপনাদের মধ্যকার সম্পর্ক আজ একটি নতুন সূচনার অধিকারী। আমরা আরো বেশি আন্তরিকতা, আরো বেশি ঘনিষ্ঠতা, আরো বেশি ভ্রাতৃত্ব, অধিকতর ঐক্য এবং সম্পর্কের অধিকতর সম্প্রসারণ চাই।
প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এই বলে তাঁর ভাষণ শেষ করেন : মহান ইরানী জনগণ! আপনাদের প্রচেষ্টা, কর্মতৎপরতা ও আনন্দের প্রত্যাশা করে এবং সরকারের ওপর আপনাদের আস্থা প্রত্যাশা করে আমরা পারস্পরিক সহযোগিতায় পথের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সাফল্যের সাথে চলা অব্যাহত রাখব। ওয়াস্-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহ্মাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।

অনুবাদ : নূর হোসেন মজিদী