সোমবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

শোকবাণী

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ১৬, ২০১৭ 

আয়াতুল্লাহ রাফসানজানির ইন্তিকালে শোকবাণী

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রথম কাতারের নেতা, সাবেক স্পিকার ও দুই মেয়াদে সাবেক প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ হাশেমি রাফসানজানি গত ৮ জানুয়ারী ২০১৭ ইন্তিকাল করেন। তাঁর ইন্তিকালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মহামান্য রাহবার আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী ও প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি পৃথক দু’টি শোকবাণীতে মরহুমের কর্মময় জীবন ও ইসলামি বিপ্লবে তাঁর অবিস্মরণীয় খেদমত ও ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আমরা এখানে উভয় বাণীর হুবহু তরজমা পেশ করছি।

মহামান্য রাহবারের শোকবাণী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন (আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব)
আমার দীর্ঘকালীন বন্ধু, ইসলামি আন্দোলন চলাকালীন অধ্যায়ের সহযোদ্ধা ও সহগামী এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রব্যবস্থার যুগে দীর্ঘ বহু বছরকাল আমার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী জনাব হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন শায়খ আকবর হাশেমি রাফসানজানির আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদে অত্যন্ত দুঃখ ও মর্মবেদনা অনুভব করছি। এমন একজন সহগামী ও সহযোদ্ধাকে হারানো, যাঁর সাথে সহকর্মী ও অন্তরঙ্গ হিসেবে কাজ করার ইতিহাস দীর্ঘ ৫৯ বছর পূর্ণ হয়েছে, সত্যিই অত্যন্ত কঠিন ও হৃদয়বিদারক।
বিগত কয়েক দশকের দীর্ঘ সময়ে কত যে কঠিন ও সমস্যাসংকুল অবস্থা আমাদের উপর দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে এবং নানা পরিস্থিতিতে পারস্পরিক সমচিন্তা ও সহমর্মিতার কত ঘটনা আমাদেরকে একই পথে চেষ্টা-সাধনা, ধৈর্যধারণ ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণে বাধ্য করেছে তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর প্রখর বিচক্ষণতা, নজিরবিহীন আন্তরিকতা সেই বছরগুলোতে তাঁর যারা সহকর্মী, বিশেষ করে আমার জন্য নির্ভরতার স্থলস্বরূপ ছিল। মতপার্থক্য ও ইজতিহাদী বিভিন্নতা এই দীর্ঘ অধ্যায়ে কখনই আমাদের সেই বন্ধুত্বের বন্ধনকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে পারে নি, যার সূচনা হয়েছিল কারবালায়ে মুআল্লার বাইনাল হারামাইনে। দুষ্ট দুরাচারীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অত্যন্ত জোরালোভাবে এই মতপার্থক্য হতে ফায়দা লোটার জন্য যে চেষ্টা করেছিল, তা এই নগণ্যের প্রতি তাঁর গভীর ব্যক্তিগত ভালোবাসায় কোনোরূপ বি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় নি।
তিনি ছিলেন যুলুমশাহীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রথম প্রজন্মের বিরল দৃষ্টান্ত এবং এই বিপদসংকুল ও বিপজ্জনক পথের অন্যতম কষ্টসহিষ্ণু।
বছরের পর বছর কারাবাস ও সাভাকের নির্যাতন সহ্য করা এবং এসবের মোকাবিলায় প্রতিরোধ, তারপর পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধে বিপজ্জনক সব দায়িত্ব পালন, ইসলামি মজলিসে শুরার স্পিকারের দায়িত্ব এবং নেতানির্বাচনী বিশেষজ্ঞ পরিষদের দায়িত্ব পালন প্রভৃতি হচ্ছে এই অভিজ্ঞ সংগ্রামীর চড়াই উৎরাইপূর্ণ জীবনের একেকটি উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
জনাব হাশেমিকে হারানোর পর আমি অন্য কোনো ব্যক্তিত্বকে দেখছি না, যাঁর সাথে এই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের চড়াই উৎরাইয়ে এমন যৌথ ও দীর্ঘকালীন সহযোগিতার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এখন এই অভিজ্ঞ সংগ্রামী আল্লাহর হিসাবের আদালতে বিভিন্নমুখী চেষ্টা ও কর্মপ্রয়াসে পরিপূর্ণ আমল নিয়ে হাজির হয়েছেন। আর এটিই আমরা, সকল দায়িত্বশীলদের শেষ পরিণতি।
তাঁর জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে আল্লাহর কাছে মাগফিরাত, রহমত ও ক্ষমার দরখাস্ত পেশ করছি। তাঁর সম্মানিত স্ত্রী, তাঁর সন্তানগণ ও ভাইগণ এবং অন্যান্য আপনজনের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।
আল্লাহ আমাদেরকে ও তাঁকে ক্ষমা করে দিন।
সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী
১৯ দেই ১৩৯৫ (৮ জানুয়ারি ২০১৭)

প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানির শোক

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
‘এমন কিছুসংখ্যক মানুষ আছে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের উদ্দেশ্যে নিজের জীবনকে বিক্রি করে দিয়েছে। আর আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অতিশয় দয়াপরবশ।’ (আল কুরআন)
হযরত ফাতেমা মাসুমা (আ.)-এর জন্য শোক পালন এবং আমীর কবির মযলুমভাবে শাহাদাত বরণের বার্ষিকীর শোকার্ত দিনগুলোতে ইরান তার যোগ্য অধিনায়কের শোক পালন করছে এবং যুলুম ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জাতীয় বীর আজ মহান প্রভুর দরবারে আত্মসমর্পিত হয়েছেন।
হযরত আয়াতুল্লাহ আকবর হাশেমী রাফসানজানী, যিনি রুহুল্লাহর (ইমাম খোমেইনীর) অবিচল প্রত্যয়ী সন্তান, মহান নেতা রাহবারের দীর্ঘকালীন সঙ্গী ও সহমর্মী, ইসলামি বিপ্লবের উজ্জ্বল অবয়ব ও ইতিহাসের নির্মাতা, জনগণের সত্যিকার দরদি, ত্যাগ-তিতীক্ষা এবং ধৈর্যের পরাকাষ্ঠার দীর্ঘ জীবন শেষে আল্লাহর সাক্ষাতে চলে গেছেন। ইতিহাস কেমন অর্থপূর্ণ দিনক্ষণ নির্ণয় করে রেখেছে। কারণ, ধৈর্য, সহনশীলতা, ঈমান ও ভারসাম্যের এই প্রবাদপুরুষ এমন দিনে আল্লাহর সন্নিধানে চলে গেলেন, যেদিনটি হচ্ছে ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা মহান খোমেইনীর পক্ষে জাতির জাগরণ ও নব উত্থানের সূচনাপর্ব।
হাশেমির ব্যাপারে কথা বলা- বছরের পর বছর যাঁর পাশে ছিলাম, আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন। মহান ইমামের নেতৃত্বে ইরানের জনগণের দীর্ঘ সংগ্রাম চলাকালে তিনি ছিলেন এক সর্বাত্মক বিপ্লবী। বহু বছরকাল নির্যাতন ও কারাভোগ, তাঁকে তাঁর সেই লক্ষ থেকে পৃথক করতে পারে নি। তিনি সবসময়ই ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন। তিনিই ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি কোম থেকে নিয়ে নাজাফ এবং প্যারিস থেকে তেহরান কোথাও তাঁর ইমাম ও প্রাণের মানুষটিকে নিঃসঙ্গ রাখেন নি। হাশেমী ইসলামি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম নির্মাতা। সংবিধান, ইসলামি মজলিসে শুরা (পার্লামেন্ট), নেতা নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ পরিষদ মজলিসে খুবরেগান, প্রেসিডেন্ট, রাষ্ট্রের কল্যাণ নির্ধারণী সর্বোচ্চ পরিষদ, হিজবে জমহুরী ইসলামি পার্টি, ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীদল সেপাহে পাসদারান, দেশগড়ার জিহাদে সাজেন্দেগী সংস্থা ও ইসলামি বিপ্লবের সকল সংস্থা ও সংগঠন এই ভবিষ্যৎদর্শী বীর পুরুষের দূরদর্শী ও বিজ্ঞ নির্দেশনার কাছে ঋণী।
আজ ইসলাম তার এক মূল্যবান সম্পদ, ইরান তার এক মহান আমীর, ইসলামি বিপ্লব এক সাহসী ঝা-াবাহী ও রাষ্ট্র তার বিরল এক ব্যবস্থাপককে হারিয়েছে।
তিনি ছিলেন ইমামের প্রিয়ভাজন এবং জনগণের সেবক। যখানই তিনি কোনো কিছুর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তখনই তা মহান ইমাম, রাহবার ও জনগণের স্বস্তির কারণ ছিল। তিনি ছিলেন এমন শক্তিমান বিশ্লেষক, যিনি বিশ^কে ভালোভাবে চিনতেন। জুমআর নামাযে তাঁর খুতবাসমূহ পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের দিনগুলোতে সবার মনে মনোবল যোগাত। তিনি মযলুম অবস্থায় তাঁর দীর্ঘকালীন সাথি শহীদ বেহেশতীর মতোই অকৃতজ্ঞতাসমূহকে খুব সহজে সহ্য করতেন।
হাশেমি কখনোই যুদ্ধকে ভয় পান নি। কিন্তু সবসময় শান্তিকে সম্মান করতেন। তিনি জিহাদ ও শাহাদতের ময়দানে যেমন বীর অধিনায়ক ছিলেন, তেমনি যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায়ও বীর কেশরী ছিলেন। যে মহান ব্যক্তি সত্যিকার অর্থেই রাষ্ট্রযন্ত্রের পাটাতন ছিলেন, তাঁর সম্পর্কে কথা বলা সহজ বিষয় নয়। তিনি ছিলেন ইমামের একান্ত আপনজন এবং মহান রাহবারের নজিরবিহীন বন্ধুজন। ইরান ও ইরানির জন্য তাঁর আশা-আকাক্সক্ষা ছিল বিশাল। যতদিন প্রাণ ছিল ইসলামি দেশটির উন্নতশির হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়েছেন। নিজের প্রতি বহু অন্যায় বরদাশত করেছেন এবং নিজের পক্ষ হতে বহু ত্যাগ ও বিশ^স্ততার স্বাক্ষর রেখেছেন। ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ রাস্তা হতে বিচ্যুতির ব্যাপারে মোটেও আপোস করেন নি। রাষ্ট্রের কল্যাণের বিষয়টি অন্য যে কোনো কিছুর ঊর্ধ্বে বলে মনে করতেন। ইরানের সমঝদার জনগণ তাদের সেবকদের মর্যাদা খুব ভালোভাবেই চেনে এবং তাদের দেশগড়ার সর্দারের প্রতি তাদের ঋণ পরিশোধ করবে।
হাশেমির নাম এর অনেক ঊর্ধ্বে, চল্লিশের দশক (ইরানি সাল)-এ সংগ্রামের সূচনা থেকে নিয়ে ইসলামি বিপ্লবের বিজয়কাল পর্যন্ত ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাসের পাতায় পাতায় তাঁর প্রভাবশালী ভূমিকা ও কৃতিত্বের স্বাক্ষরসমূহ, পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের ব্যবস্থাপনা থেকে নিয়ে সকল স্পর্শকাতর সময়গুলোতে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত তাঁর উজ্জ্বল ও নজিরবিহীন ভূমিকা এবং ইরানের কৃতজ্ঞ জনগণের অন্তরে তাঁর চিরন্তন আসনের কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে। আমাদের সবার পীর ও প্রাণের মানুষ প্রিয় খোমেইনী- আল্লাহ তার পবিত্র আত্মাকে মহিমান্বিত করুন-বলেছেন যে, ‘বিদ্বেষীরা জেনে রাখুক, হাশেমি জীবিত আছে যতদিন প্রেসিডেন্ট দফতরের তথ্য সরবরাহের দফতর জীবিত আছে।’
আমি তিন দিনের শোক এবং এক দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করে এই জাতীয় বীর, বিরাট ইসলামি চিন্তাবিদ ও ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রব্যবস্থার নজিরবিহীন সম্পদকে হারানো উপলক্ষে হযরত বাকিয়াতুল্লাহ (ইমাম মাহদী)- তাঁর জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গিত হোক, ইসলামি বিপ্লবের মহান রাহবার, সম্মানিত মারজায়ে তাকলিদবৃন্দ, আলেমগণ, ফোযালা, বিপ্লব ও রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ইরানের কৃতজ্ঞ জাতি, বিশেষ করে কেরমান প্রদেশ ও রাফসানজান শহরের জনসাধারণ, তাঁর বন্ধুবান্ধব, ভক্তবৃন্দ, বিশেষত তাঁর সম্মানিত পরিবার, তাঁর মুহতারেমা ও ধৈর্যশীলা স্ত্রী এবং এই আদর্শস্থানীয় মুজাহিদের সন্তানগণ ও ভাইগণের প্রতি আন্তরিক শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। আর আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাচ্ছি, এই মহান ব্যক্তিকে যেন সুউচ্চ মাকাম দান করেন এবং পবিত্র ইমামগণ ও তাঁর প্রাণের মানুষ ইমাম খোমেইনী ও তাঁর সহযোদ্ধা ইসলামি বিপ্লবের শহীদগণের পাশে স্থান দেন। সেই সাথে তাঁর রেখে যাওয়া আপনজনদের সবার প্রতি সবর ও নেকী দানের জন্য আর্জি পেশ করছি।
হাসান রুহানি
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট