বুধবার, ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

শাহনামায় বর্ণিত ফেরদৌসির চিন্তাদর্শন

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ১৭, ২০১৮ 

তারিক সিরাজী :ফারসি সাহিত্যের বিশ্ববিশ্রুত ও বরেণ্য কবি আবুল কাসেম ফেরদৌসি [৯৪০-১০২০/১০২৫ খ্রি. (আনুমানিক)] ছিলেন ইরানের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবগাথার সার্থক রূপকার। বিশ্ববিখ্যাত বীরত্বগাথা শাহনামা রচনার মধ্য দিয়ে তিনি মূলত ইরানিদের জাতিসত্তা ও ফারসি ভাষার মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যকে সংরক্ষণ করেছেন। জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়ার প্রেরণা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে তাঁর এ কালজয়ী বীরত্বগাথা গ্রন্থটি পৃথিবীর প্রসিদ্ধ ভাষাগুলোতে অনূদিত হয়েছে এবং অনেক জাতির কাছেই তা হয়েছে সমাদৃত।ফেরদৌসি তাঁর লেখার মাধ্যমে লুপ্তপ্রায় পারস্যের প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ফারসি ভাষা পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসেন। অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তিনি গোটা পারস্যকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি তাঁর শাহনামার শ্লোকে শ্লোকে জাতীয় অনুভূতি, উপলব্ধি ও চেতনার এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন-যার দ্বারা ইরানি জনগণ ব্যাপকভাবে জাতীয় মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে শাহনামা হলো ভিনদেশি শাসনশৃঙ্খলের বিরুদ্ধে বহুকালের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এবং জাতীয়তার মূর্ত প্রতীক। এ কাব্যগ্রন্থটি যারতুশ্তের (জরাথ্রুস্ট-Zoroater) সময় থেকে আরব সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত ইরানে যে রাজন্যবর্গ ছিলেন তাঁদের চরিত্র অবলম্বনে রচিত হয়েছে।
আমরা জানি যে, মহাকাব্যের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে পৌরাণিক কাহিনীগুলোর বিশ্লেষণ, মহান বীরযোদ্ধাদের গুণ, বৈশিষ্ট্য ও কীর্তি বর্ণনা এবং বিভিন্ন জাতির ভাগ্য নির্মাণে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস তুলে ধরা। পাশাপাশি সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও আত্মউদ্দীপক বিষয়গুলোও এতে সমভাবে অনুরণিত হয়ে থাকে। এছাড়া মাহাকাব্যে ফেলে আসা অতীত যুগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, একটি জাতি প্রতিষ্ঠার ঘটনা ও নিজের প্রসিদ্ধ বীরত্বগাথা বিধৃত থাকে।
মহাকাব্যের রচয়িতাগণ এ ধরনের সাহিত্যকর্মে নিজ জাতি ও মানব সভ্যতার আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকেন এবং তাঁদের ভিতরের রহস্যকে নিজদের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে উন্মোচিত করেন। তাঁরা মনে করেন জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও বীরত্ব জানার মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয় লাভ করা যায় এবং উৎসাহ-উদ্দীপনা ও জাতীয় আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠায় উজ্জীবিত হওয়া যায়। মহাকাব্যে বিধৃত বীরদের কাহিনী থেকে শিক্ষা নিয়ে অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতি ও দেশকে ধ্বংস থেকে রক্ষার উপায় ও অবলম্বন অন্বেষণ করা যায়। বিশ্বে যে কয়টি নির্ভরযোগ্য মহাকাব্য রয়েছে সেগুলোর মূল বক্তব্য ও বিষয় অনেকটা একই বলে প্রতিভাত হয়। সমৃদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মহাকাব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে :
১. গিলগামেশ (Gilgamesh) প্রায় খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার সালে ব্যবিলনীয় ভাষায় রচিত হয়েছে এবং এর বিষয়বস্তু ছিল বীরদের জন্য এক ধরনের মৃতসঞ্জীবনী উদ্ভিদ অন্বেষণ এবং পরাজিত সৈনিকদের কাহিনী বর্ণনা করা। ২. ইলিয়াড (Iliad) খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতকের মধ্যভাগে হোমার কর্তৃক গ্রিক ভাষায় রচিত হয়েছে-যার বিষয়বস্তু ছিল ট্রয় নগরীর দশ বছরব্যাপী যুদ্ধ কাহিনী। ৩. ইনেইড (Aeneid) শীর্ষক মহাকাব্যটি ভার্জিল কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায় রচিত হয়েছে। এটি রচনা করতে ভার্জিলের খ্রিস্টর্পূব ২৯ থেকে ১৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দশ বছর সময় লেগেছিল। এ মহাকাব্যের বিষয়বস্তু ছিল ট্রয় নগরীর ধ্বংস এবং রোম জাতির প্রতিষ্ঠার পর বন্ধুদের সাথে ইনের ভ্রমণ বৃত্তান্ত বর্ণনা করা। এছাড়া এতে উল্লেখ রয়েছে শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতীক হিসাবে খ্যাত ট্রয়ের জনগণ এবং শক্তিমত্তার প্রতীক হিসাবে প্রসিদ্ধ ল্যাটিন জনগণের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিষয়াবলি। ৪. মহাভারত (Mahabharata) খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছে। ৫. রামায়ণ (Ramayana) খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় অথবা চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে বাল্মীকি কর্তৃক রামচন্দ্রের জীবন কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে। ৬. ফেরদৌসির শাহনামা খ্রিস্টীয় দশম শতকে ফারসি ভাষায় রচিত হয়েছে।
ফেরদৌসি ৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে শাহনামা রচনা শুরু করেন এবং ১০১০ খ্রিস্টাব্দে ৭৫ বছর বয়সে তা সমাপ্ত করেন। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ফেরদৌসির শাহনামায় যে বিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে তা হচ্ছে, বীরদের মানসিকতা, প্রচেষ্টা, জ্ঞান ও বিদ্যা, আল্লাহর আনুগত্য, ন্যায়পরায়ণতা, রাজনীতি, জাতীয় ঐক্য ও সংহতি। এতে শিক্ষণীয় অনেক বিষয়ের উল্লেখের পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বদর্শন।
হিজরি ষষ্ঠ শতকে শাহনামা মূলত দু’টি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল একটি জর্জিয়ান ভাষায় আর অপরটি আরবি ভাষায়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এ দুইটি অনূদিত গ্রন্থ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। আসিরুল মামালিক নিশাবুরি প্রথম আরবি ভাষায় শাহনামা অনুবাদ করেন। তিনি হিজরি পঞ্চম শতকের শেষভাগে এবং ষষ্ঠ শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। তবে কাওয়াম উদ্দিন ফাতেহ বিন আলি বিন মুহাম্মাদ বুন্দারি ইস্পাহানি কর্তৃক আরবি ভাষায় অনূদিত কপিটিই হচ্ছে শাহনামার সবচেয়ে পুরাতন অনূদিত কপি যা এখনো সংরক্ষিত আছে। অনুবাদক বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক তথ্যগুলোই তুলে ধরেছেন এবং বর্ণনাধর্মী বিষয়গুলো পরিহার করেছেন।
১০৩০ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় যে ভাষায় শাহনামা অনূদিত হয়েছিল তা ছিল ওসমানি তুর্কি ভাষায়। শাহানামা কাব্যগ্রন্থটি যেসকল ভাষায় অনূদিত হয়েছে এর অন্যতম হলো আরবি, জার্মানি, উর্দু, ইংরেজি, বাংলা, ইতালি, পশতু, তুর্কি, রুশ, জাপানি, হিন্দি, কুর্দি ইত্যাদি। ধারণা করা হয় যে, শাহনামা কাব্যগ্রন্থটি প্রায় ২৮টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, শাহানামার প্রথম অনুবাদটি সুলতান ঈসা বিন মুলকে কামেল আবু বকর এর নির্দেশে বুন্দারি সম্পন্ন করেছেন যা ছিল ইতিহাসনির্ভর। অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই যে, জার্মান ভাষায় যখন শাহানামা অনূদিত হয় তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আবার মনিরউদ্দিন ইউসুফ ১৯৭১ সালে যখন বাংলা ভাষায় শাহনামা অনুবাদ করছিলেন তখন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। মহাকাব্য শাহনামা অনুবাদের এ প্রেক্ষাপট পর্যালোচনার দাবি রাখে। তাই বলা যায় যে, মনিরউদ্দিন ইউসুফ বাংলা ভাষায় শাহনামা শীর্ষক মহাকাব্য অনুবাদের মধ্য দিয়ে মূলত কবি ফেরদৌসির আত্মরহস্য উদঘাটন করতে চেয়েছেন।
ফেরদৌসির যুগে আনুষ্ঠানিকভাবে গল্প বলা ও শোনার একটা প্রচলন ছিল। কারণ, সে সময় বেশিরভাগ লোকই পড়তে ও লিখতে জানতো না। এ ধরনের গল্প পাঠের আসরে পরিবেশন করা হতো ধর্মীয় ও পৌরাণিক কাহিনী। পুরাণপাঠের এ কাজটিকে বলা হয় নাক্কালি আর যিনি কাহিনীগুলো পাঠ করে শোনান বা উপস্থাপন করেন তাকে বলা হয় নাক্কাল বা পুরাণপাঠকারী। তাঁর হাতে থাকত একটি লাঠি যা দিয়ে তিনি চরিত্র চিত্রায়ণ করতেন। বলা যায় ঠিক আমাদের দেশের পুঁথি পাঠের ন্যায়। অনেকের অভিমত পুরাণপাঠকারীর গল্প বলার কাজটিকে সহজতর ও প্রাণবন্ত করার লক্ষ্যেই ফেরদৌসি সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় পৌরাণিক কাহিনীগুলো রচনা করে তা শাহানামা কাব্যগ্রন্থে তুলে ধরেছেন। কবি নিজেই শাহনামা গ্রন্থ রচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন :
‘আমি উড়ন্ত ঝলধর, কিন্তু পদযুগ বিন্যস্ত করেছি
সেই ছায়াচ্ছন্ন দেবদারুর উন্নত শাখায়।
কারণ, যশস্বী নরপতিগণের এই ইতিকথা
দুনিয়ায় আমার স্মারক হয়ে থাকবে।
তুমি একে অলীক কাহিনী বলে মনে করো না,
গণ্য করো না তাকে যুগ-চিত্তের উৎসার মাত্র বলে।
এর কিছু কাহিনীতে রয়েছে বুদ্ধি ও জ্ঞানের দীপ্তি,
অন্যরা নিজেদের মধ্যে বহন করছে রহস্যময় তাৎপর্য।
অতীত কালে ছিল পূরাকীর্তি সম্বলিত এক গাথা,
তার মধ্যে সন্নিবেশিত ছিল অনেক উপাখ্যান।
প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির মুখে মুখে তা ছড়িয়েছিল,
সেগুলো থেকে তারা সংগ্রহ করত প্রজ্ঞা ও তত্ত্বের সম্পদ।
কোন নিভৃত গ্রামাঞ্চলের এক বীর সন্তান
বর্ষীয়ান সাহসী জ্ঞানী ও দানশীল-
আদিম যুগের সেই ইতিকথার খোঁজে তৎপর হোল,
কাহিনীগুলোর উদ্ধার মানসে সে ঘুরে বেড়ালো বহুদিন।
ফিরলো সে বহু নগরীর পথে পথে,
ফলে সংগৃহীত হোল এই গাথা।
সেই বীর-জ্ঞানী তাঁদের কাছ থেকে জেনেছে অতীতের সব কীর্তি,
তারপর সেই সংগ্রহ থেকে রচিত হয়েছে এক মহান পুরাণ কথা।
জগতে সেই গাথাই হয়ে আছে অতীতের স্মৃতি,
সর্বত্র জ্ঞানী ও ধর্মবেত্তা জানিয়েছে তাকে স্বাগতম।’ (মনিরউদ্দীন ইউসুফ অনূদিত)
সাহিত্যামোদিদের নিকট কবি ফেরদৌসির গুরুত্ব ও আবেদন কেবল তাঁর ভাষার লালিত্য ও মাধুর্যের মধ্যেই নিহিত নয়, বরং তাঁর জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় চেতনার মাঝেও বিদ্যমান রয়েছে। তাঁর রচিত শাহনামা গ্রন্থের পরতে পরতে গল্পের কাহিনীগুলো এমনিভাবে বিধৃত রয়েছে যে প্রতিটি চরিত্রই যেন একেক জন পর্যবেক্ষক হিসাবে কাজ করছে। যে কারণে এ মহাকাব্য সাহিত্যের একটি উচ্চমার্গে পৌঁছেছে। তিনি প্রচলিত সাহিত্যরীতির বিপরীতে অন্তর্নিহিত বর্ণনার দিকে অগ্রসর হয়েছেন আর এটি ছিল তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবিত শৈলী। এ ধরনের সাহিত্যশৈলী ফারসি সাহিত্যে বিরল। তিনি তাঁর শাহনামা কাব্যগ্রন্থকে ধ্বনি, শব্দ চয়ন, এমনকি ব্যাকরণসহ সকল স্তরে একটি সুশৃঙ্খল গঠন কাঠামোর মাধ্যমে বিন্যস্ত করেছেন। যার ফলে এটি ভাষাতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত অবস্থানে রয়েছে।
ফেরদৌসি তাঁর শাহনামা কাব্যগ্রন্থে প্রাচীন পারস্যের ইতিহাস-ঐতিহ্য বর্ণনার মাধ্যমে চরিত্র গঠন, বীরত্ব,পাণ্ডিত্য, বিচক্ষণতা ও জ্ঞানের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। জ্ঞানের যে বিশাল শক্তি রয়েছে সে বিষয়ে তিনি বলেন :
توانا بود هر که دانا بود ز دانش دل پير برنا بود
যে জ্ঞানী সেই শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান,
আর জ্ঞানসমৃদ্ধ বৃদ্ধের হৃদয় চির যৌবন থাকে।

জ্ঞান ও প্রজ্ঞা যে অমূল্য সম্পদ সে সম্পর্কে কবি ফেরদৌসি অন্যত্র বলেন :
‘বিশ্ব-প্রভুর দানের মধ্যে জ্ঞান সব চাইতে বেশী মূল্যবান,
জ্ঞানের গুণকীর্তন বদান্যতার পথে শ্রেষ্ঠ উপায়ন।
জ্ঞান সম্রাটদেরও সম্রাট,
জ্ঞান সম্মানিতগণের অলঙ্কার।
জ্ঞান অন্ধকার ও জড়ত্বকে দান করে আলো ও চলমানতা
কাল উৎফুল্ল হয় না জ্ঞানের স্পর্শ না পেলে।’ (মনিরউদ্দীন ইউসুফ অনূদিত)
ফেরদৌসি শাহনামা রচনা করে ফারসি ভাষাকে নিশ্চিহ্ন হওয়া থেকে রক্ষা করেন। এ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি প্রতিরোধের মানসিকতা, আল্লাহর আনুগত্য, স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতার শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু শাহনামার বড় পরিচয় হচ্ছে ফারসি ভাষার অস্তিত্বের সনদ হিসাবে।
কবি ফেরদৌসি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জীবিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ভৌগোলিক ও ভাষাগত জাতীয়তায় বিশ্বাসী। যে কারণে তাঁর কাব্যগ্রন্থে আরবি ভাষার আধিক্য দেখা যায় না। তাঁর বর্ণিত দেশের জন্য আত্মত্যাগের বীরত্বপূর্ণ কাহিনী সকল জাতির কাছে সমভাবে সমাদৃত হয়েছে। তিনি বলেন :
چون ايران نباشد تنِ من مباد بدين بوم و بَر زنده يک تن مباد
همه سربسر تن به کشتن دهيم از آن به که کشور به دشمن دهيم
যখন ইরান থাকবে না, তখন আমার এ দেহ থাকবে না,
এই দেশ, মাটি এমনকি একটি দেহও বেঁচে থাকবে না।
দেশকে শত্রুর হাতে তুলে দেয়ার চেয়ে
আমাদের সকলের দেহ শত্রুর কাছে বিলিয়ে দেয়াই উত্তম।
ফেরদৌসি শাহনামা কাব্যগ্রন্থে যুদ্ধ ও বীরত্বপূর্ণ কাহিনী বর্ণনার পাশাপাশি তথ্যপূর্ণ উপদেশাদি, ন্যায়পরায়ণতা, বদান্যতা, মহত্ত্ব ও নৈতিক কর্তব্যাদি সম্পর্কে বক্তব্য দিতেও সচেষ্ট ছিলেন। শাহনামায় বর্ণিত এমনি উপদেশ সম্পর্কিত কয়েকটি পঙ্ক্তি নিচে তুলে ধরা হলো :
بيا تا جهان را به بد نسپريم به کوشش، همه دست نيکي بريم
نماند همي نيک و بد پايدار همان بِه، که نيکي بود يادگار
نه گنج و نه ديهيم و کاخ بلند نخواهد بدن مر ترا سودمند
فريدون فرخ فرشته نبود ز مُشک و ز عنبر سرشته نبود
بِه داد و دهش يافت اين نيکويي تو داد و دهش کن فريدون تويي
এসো, এ পৃথিবীকে যেনো আমরা অকল্যাণের দিকে ঠেলে না দেই,
প্রচেষ্টার মাধ্যমে একে সামগ্রিক কল্যাণে পরিণত করবো।
ভালো-মন্দ কিছুই স্থায়ী রবে না,
তবে কল্যাণকর স্মৃতি ধরে রাখাই উত্তম।
সুউচ্চ প্রাসাদ, ধন-সম্পদ ও ঐশ্বর্য
তোমার কোনো কল্যাণেই আসবে না
ফরিদুন কোনো ফেরেশতা ছিলো না,
কিংবা কোনো মৃগনাভি বা কস্তুরী দ্বারাও সৃষ্ট নয় সে।
সেতো ন্যায়পরায়ণতা ও বদান্যতা দিয়ে এ মহত্ত্বের অধিকারী হয়েছে,
তুমিও ন্যায়পরায়ণতা ও বদান্যতা অর্জন কর, তবেই তুমি ফরিদুন হবে।
ফেরদৌসির শাহনামা কাব্যগ্রন্থে তাঁর জ্ঞানের গভীরতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি মনে করেন এ ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে মনুষ্যত্বই শ্রেষ্ঠ আর জ্ঞান ছাড়া সে মনুষ্যত্ব অজির্ত হয় না। সৎ ও সততার দ্বারাই কেবল সকলের মাঝে সাম্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। কবি বলেন :
دگر گفت روشن روان آن کسي که کوتاه گويد به معني بسي
چو گفتار بيهوده بسيار گشت سخنگوي در مردمي خوار گشت
هنر جوي و تيمار بيشي مخور که گيتي سپنج است و ما برگذر
ز دانش چو جان ترا مايه نيست بِه از خاموشي هيچ پيرايه نيست

সে (বুজুর্গ মেহের নুশিরওয়ানকে) বললো: সে-ই আলোকিত আত্মার অধিকারী
যে সংক্ষেপে অধিক অর্থপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলে।
যদি বক্তব্য বহুলাংশে অনর্থক হয়ে ওঠে
তবে লোকদের কাছে বক্তা তুচ্ছে পরিণত হয়।
জ্ঞান অন্বেষণ কর আর দুঃখকে প্রশ্রয় দিও না
এ পৃথিবী ক্ষণিকের, আর আমাদের চলে যেতেই হবে।
যদি জ্ঞানসমৃদ্ধ আত্মা তোমার নাই বা থাকে
তবে মৌনতা ছাড়া তোমার আর কোনো ভূষণ নেই।

পুরো শাহনামাই চিত্রকল্পে ভরপুর। যুদ্ধ-বিগ্রহের চিত্র এবং এর চরিত্রগুলো প্রাণবন্তভাবে এ গ্রন্থে চিত্রায়িত হয়েছে এবং পাশাপাশি এতে জীবনঘনিষ্ঠ নানা উপদেশ ও বাণী এমনিভাবে বিধৃত রয়েছে যে, পাঠক সহসাই তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। আর এতেই শাহনামার বিশ^জনীনতার প্রমাণ মেলে। এ গ্রন্থের আবেদন পাঠক হৃদয়ে যুগ যুগ ধরে অক্ষুণ্ণ থাকবে। পরিশেষে ফেরদৌসির জ্ঞানসঞ্জাত একটি বাণী তুলে ধরা হলো।

‘কি হবে, যদি পৃথিবী তোমাকে প্রতিপালিত করে মধু ও পানীয় দ্বারা
আর তোমার কানে না শোনায় জ্ঞানের বাণী?
কিন্তু জেনে রাখ, একদিন যখন ছড়িয়ে পড়বে বাণীর সম্পদ-
তখন আমাদের উপর উদিত হবে সফলতার সূর্য।
তোমরা সবাই তখন সুখী হয়ো, ও আনন্দ লাভ করো এই বাণী থেকে,
উন্মুক্ত করো, তোমাদের হৃদয় জ্ঞানের দ্বারা।
অমূল্য এক অবদান বলে মনে করো সেই বস্তুকে-
যা তোমার হৃদয় থেকে ঝরায় রক্ত।
এই দুনিয়া বড় অস্থায়ী,
এখানে তুমি সৎকর্মের বীজ ছাড়া আর কিছুই বপন করো না।’ (মনিরউদ্দীন ইউসুফ অনূদিত)

তথ্যসূত্র
১. আবদুল মওদুদ (১৯৮০ খ্রি.): মুসলিম মনীষা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা।
২. আহমাদ তামিমদারি (২০০৭ খ্রি.): ফার্সী সাহিত্যের ইতিহাস, আলহুদা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা, ইরান।
৩. তারিক জিয়াউর রহমান সিরাজী (২০১৪ খ্রি.): ফারসি সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, বাড পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
৪. ফেরদৌসী (১৯৭৭ খ্রি.) : শাহনামা (মনিরউদ্দীন ইউসুফ অনূদিত), বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
৫. সাদেক রেযা যাদে শাফাক (১৩৫২ সৌরবর্ষ): তারিখে আদাবিয়্যাতে ইরান (ইরানি সাহিত্যের ইতিহাস), এনতেশারাতে দানেশগাহে পাহলাভি, ইরান।
৬. হরেন্দ্র চন্দ্র পাল (১৩৬০ বঙ্গাব্দ): পারস্য সাহিত্যের ইতিহাস, প্রকাশক অজিত চট্ট ঘোষ, শ্রী জগদীশ প্রেস, কলকাতা।
৭. নিউজ লেটার, (ঢাকাস্থ ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মুখপত্র), ৩য় সংখ্যা, মে-জুন, ২০১৩।
লেখক : ড. তারিক জিয়াউর রহমান সিরাজী
অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়