বুধবার, ১৭ই জুলাই, ২০১৯ ইং, ২রা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

রাহবার সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী ও বই পাঠ

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮ 

মাহদী মাহমুদ: শায়খ জামালুদ্দিন আফগানী থেকে শায়খ মোহাম্মদ আবদুহ, সাইয়্যেদ কুতুব থেকে সাইয়্যেদ বাকের আল সাদর, আল্লামা তাবাতাবেয়ী প্রত্যেকেই মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে রক্ত দিয়েছেন হাসান আল বান্নাহ, রাগিব হারব প্রমুখ। চলে গিয়েছেন আহলে বাইতের অনুসারীদের এক কাণ্ডারি, ইসলামি বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেইনী। আর তাঁর রত্নসভার রত্নগণ- আয়াতুল্লাহ মুরতাজা মুতাহহারী, বেহেশতী আর বাহোনারসহ অনেক আলোকোজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব একে একে শত্রুর কালো হাতের থাবায় শহীদ হয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদ, উগ্রবাদ তথা বৈশ্বিক হেজিমনি (hegemony) আজ শক্তিশালী ভিত্তির ওপর আবারো উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
আর এমনি এক ক্রান্তিলগ্নে মুসলিম উম্মাহর কাণ্ডারি রূপে বিরাজমান রয়েছেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কঠোরহস্ত, অগ্নিঝড়া কণ্ঠস্বর ইসলামি বিপ্লবের বর্তমান নেতা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী। সাম্রাজ্যবাদ এবং বৈশ্বিক হেজিমনির বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর প্রবলতম অস্ত্র হচ্ছে একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লব যা কর্মগত দিক দিয়ে বৈশ্বিক আর প্রকৃতিগত দিক থেকে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বিপ্লবের সাথে সংযুক্ত।
এই বিদগ্ধ পণ্ডিত এবং বিপ্লবী নেতার ‘বইপোকা’ স্বভাবের কথা আমাদের অনেকের নিকটেই অবিদিত নয়।
আজ আমরা আলোচনা করব বই পড়ার গুরুত্ব ও আবশ্যিকতার ব্যাপারে সাইয়্যেদের উৎসাহ প্রদান এবং দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ ও বক্তৃতাসমূহে তিনি তরুণ সমাজের নিকট প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের যে সকল বিপ্লবী সাহিত্যিকের রচনা তুলে ধরেছেন এবং সেগুলো অনুধ্যান করার তাগিদ দিয়েছেন সে সম্পর্কে।
সরাসরি চলে যাচ্ছি সাইয়্যেদের বক্তৃতামালায়।
“বইয়ের সাথে সম্পর্কহীনতা যেকোনো জাতির জন্যই অপূরণীয় ক্ষতিস্বরূপ। অন্যদিকে বইয়ের সাথে সখ্য, সেগুলো থেকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কিছু শেখা এবং উপকৃত হওয়া যেকোন ব্যক্তির জন্যই একটি বিরাট অর্জন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ঐতিহাসিক একটি ঘটনার পেছনের মূল্য এবং অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সঠিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট নাযিল হওয়া প্রথম আয়াতের প্রথম শব্দেই আল্লাহ বলছেন : ‘পড়’। আর প্রথম আয়াতটিতেই ‘কলম’ শব্দটিকে বিশেষ মর্যাদা এবং প্রশংসার সাথে উল্লেখ করা হয়। ‘পড় এবং তোমার রব বড় মেহেরবান, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন।” (আল কোরআন, সূরা ৯৬, আয়াত ৩ ও ৪), ডিসেম্বর ২৫, ১৯৯৩
বই সভ্যতার নির্যাস স্বরূপ
‘বই হচ্ছে যেকোনো সভ্যতার মা স্বরূপ।’ সেপ্টেম্বর ১২, ১৯৯৫
বই পড়া একটি ধর্মীয় দায়িত্ব
‘বর্তমানে বই পড়া কেবল জাতীয় কর্তব্য নয়; বরং একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা।’- ডিসেম্বর ২৫, ১৯৯৩
এখন সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর পছন্দের কয়েকজন লেখক-ঔপন্যাসিক ও সাহ্যিতিকের ব্যাপারে তিনি কী মন্তব্য করেছেন তাই দেখব।
টমাস কার্লাইল
‘টমাস কার্লাইল, যিনি একজন অমুসলমান কিংবা আরো নির্দিষ্টভাবে বললে একজন খ্রিস্টান পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন, তিনি কোরআন এর সত্যতা খুঁজে পেয়েছিলেন এবং এর আয়াতগুলোর শক্তিশালী গাঁথুনি থেকে উপলব্ধি করেছিলেন যে, সেগুলো সীমাবদ্ধতাসম্পন্ন সত্তা মানুষের তৈরি নয় এবং ফলশ্রুতিতে অখণ্ডনীয়।’- ৬ই মে, ১৯৯২
জওহরলাল নেহেরু
‘আপনাদের উচিত জওহরলাল এর ‘বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গ’ (Glances at World History) বইটা পড়া। ‘ভারতবর্ষে ইংরেজ আগ্রাসন’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক বলেছেন যে, ভারতে যেসকল শিল্প এবং বিজ্ঞান প্রচলিত ছিল সেগুলো কোন অংশেই ইউরোপ, ব্রিটিশ কিংবা পাশ্চাত্যের তুলনায় কম ছিল না… সে সময়ের মানদণ্ডে।’
‘একই কথা অন্যান্য দেশের ব্যাপারেও বলা চলে। আর ইংরেজরা যখন ভারতে প্রবেশ করল তখন তারা সেখানকার প্রচলিত শিল্পগুলো বন্ধ করে দিল… তারা ভারতের কুটিরশিল্প বন্ধ করে দিল। স্থবিরতা সৃষ্টি করল এবং অবনতির দিকে নিয়ে গেল যাতে ভারতীয়রা ইংরেজদের থেকে পণ্য আমদানি করতে বাধ্য হয়। সুপরিকল্পিতভাবে তারা এগুলো করেছিল এবং একই পন্থা অন্যান্য দেশেও তারা ব্যবহার করেছিল। এমনকি ইরানেও।’- জুন ৭, ২০১৭
এছাড়াও ২০১৬ সালের ৫ মে, ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর এবং তারও পূর্বে ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আরো তিনটি ভাষণে সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী জওহরলাল নেহেরু এবং তাঁর উপরিউক্ত গ্রন্থটির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তরুণ সমাজকে এই গ্রন্থটি পড়ার তাগিদ দেন।
তিনি বলেন যে, জওহরলাল নেহেরু একই সাথে একজন বিশ্বস্ত এবং বিদগ্ধ জ্ঞানী লেখক। এরপর তিনি আবারো আমাদের দৃষ্টি নিয়ে যান নেহেরু লিখিত গ্রন্থে ভারতবর্ষে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক বর্ণনায়। রাহবারের বরাতে, ‘নেহেরুর মতে ইউরোপীয় সভ্যতার তুলনায় ভারতবর্ষের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবস্থা আরো উন্নত ছিল। ইংরেজরা ভারতে আধিপত্য বিস্তারের পর তারা তাদের নীলনকশা অনুযায়ী ভারতের কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পগুলো ধ্বংস করে দেয়। ফলশ্রুতিতে ভারতবর্ষ ক্ষুধা ও দারিদ্রের স্বরূপ আক্ষরিক অর্থে অবলোকন করল। একই কথা আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রেও সত্য। তাই দিনশেষে বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী পাশ্চাত্য শক্তি যুদ্ধের পর যুদ্ধই বাধায় নি কেবল, বরং এসব দেশ-জাতি ও সভ্যতার জন্য দারিদ্র্য ডেকে এনেছিল। সভ্যতাগুলোকে শুষে খেয়ে যে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে এই ধনিক শ্রেণিটি সেটা আমাদেরকে ইমাম আলী ইবনে আবি তালিবের একটি উক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়, ‘আমি স¤পদ পুঞ্জিভূত করার এমন কোন নজির দেখি নি, যেক্ষেত্রে অন্য কারো অধিকার ভূলুণ্ঠিত করা হয় নি।’- দেরাছাত ফি নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা ৪০।
যখন তারা অন্য দেশের তেলসম্পদ, কৃষি কিংবা চা সম্পদ লুট করে, যখন তারা দেশগুলোর অর্থনীতিকে করায়ত্ত করে যাতে সেই দেশের মানুষদের নিজের দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না, আর যখন তারা দেশের ন্যায়সংগত জনগণকে দেশজ উৎপাদন, শিল্প এবং জাতীয় উন্নয়নের অন্য ক্ষেত্রসমূহে নিয়ন্ত্রণ নিতে দেয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই জাতি ও রাষ্ট্রগুলো দুর্দশায় পতিত হয়। তারা যুদ্ধ, দারিদ্র এবং অবক্ষয়ের জন্য দায়ী। তারা মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য দায়ী এবং মানুষের মাঝের কামনা-বাসনাকে স্থূলভাবে জাগিয়ে তোলে।- সেপ্টেম্বর ১৭ ২০১৩ তারিখে সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী প্রদত্ত ভাষণ অবলম্বনে।
জন স্টেইনবেক
‘জন স্টেইনবেক যিনি ‘দ্য গ্রেপস অফ রেথ’ এবং একই ঘরানার অন্য যেসকল বিখ্যাত উপন্যাস লিখেছিলেন সেগুলোতে মার্কিন প্রশাসনের চাপে ফেলার নীতির ওপর লিখিত। আমেরিকায় যে কেউ এমন কোন শব্দ ব্যবহার করে যাতে সমাজতন্ত্রের নাম-গন্ধ পাওয়া যায়, সেটা প্রকৃতপক্ষে সমাজতন্ত্র না হোক, কেবল সমাজতন্ত্রের হালকা ঘ্রাণ পাওয়া যায় সে ব্যক্তি সকল প্রকার প্রশাসনিক চাপ-শারীরিক ক্ষতি থেকে চারিত্রিক কালিমার শিকার হয়। আর গণতন্ত্রের তথাকথিত আতুরঘরের হর্তাকর্তারা মানুষের সাথে এভাবেই আচরণ করে।’- ২ মে, ১৯৯৬
তবে পরবর্তীকালে ২০০৩ সালের অপর একটি বক্তৃতায় রাহবার আলী খামেনেয়ী জন স্টেইনবেকের পরবর্তী অবস্থানের সমালোচনা করে বলেন যে, কতিপয় কর্পোরেশন তাঁকে প্রলুব্ধ করেছে এবং বড় অংকের উৎকোচ দিয়েছে, যার ফলে তিনি ভিন্নভাবে লিখছেন।- মে ২৬, ২০০৩
পুনরায় ২০১৬ সালের ১৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, ব্যবস্থাপক এবং সরকারি চাকুরেদের একটি অনুষ্ঠানে ভাষণে তিনি জন স্টেইনবেকের পূর্ব অবস্থানের প্রশংসা করেন এবং তাঁর কালোত্তীর্ণ লেখাগুলো পড়ার উপদেশ দেন।
আইজ্যাক আসিমভ
‘দ্য বাইসেনটেনিয়াল ম্যান’ গল্পটি বর্তমানের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা সমর্থিত নয়। তার মানে এই না যে, এটা অনর্থক উপভোগ করতে হবে; বরং বইটি চিন্তার জগতে নতুন এক দিগন্ত খুলে দেয়, আর সেটি একটি ইতিবাচক দিক। এধরনের বই সবসময়ই ছিল। যখন সেগুলো লেখা হতো সে যুগে কেবল কল্পনা হিসেবে সেগুলো বাস্তবতা পেলেও বর্তমানে সেগুলো বাস্তবতার খুবই নিকটে।’- ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২
জর্জ সার্টন
‘জর্জ সার্টন, যিনি Introduction to the History of Science নামে বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে একটি বই লেখেন যেটা আপনাদের সকলেই হয়তো পড়ে থাকবেন, সেখানে একটি বাক্য লেখা আছে, ‘ইরানি পণ্ডিতগণ সভ্যতার পথে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন।’- ১১ নভেম্বর, ২০১৫
হাওয়ার্ড ফাস্ট
‘প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্ট লিখিত ‘দ্য আমেরিকান’ উপন্যাসটি পড়লে একজন উপলব্ধি করতে পারবেন নির্বাচন (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে) কাকে বলে! নির্বাচনে যাঁদের ন্যূনতম ভূমিকা নেই তারা হচ্ছে জনগণ! যাঁরা ব্যালটে ভোট দিয়ে আসেন! যাঁরা ব্যালট বাক্সে ভোট দিতে আসেন, তাঁদেরই বিন্দুমাত্র ভূমিকা নেই মার্কিন নেতা নির্বাচনে।’- ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯
ভিক্টর হুগো
‘আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, অন্য সব উপন্যাসের চেয়ে ‘লা মিজারেবল’ উপন্যাসটি অন্যরকম-বিস্ময়কর। আমি বার বার তরুণদেরকে এই উপন্যাসটি পড়ার জন্য তাগিদ দেই। এটাকে সমাজবিজ্ঞানের একটি শৈল্পিক প্রদর্শন হিসেবে বলা যায়, এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। এটি একটি তাৎপর্যবহ বই। ঐশ্বরিকতা, দয়া-মায়া এবং ভালোবাসার বিষয়ে একটি বই। এটি ভিক্টর হুগোর একটি অনবদ্য সৃষ্টি- যেখানে নেপোলিয়ানের যুদ্ধের একটা অংশ উঠে এসেছে। আমার মতে, ভিক্টর হুগো সবচেয়ে মুনশীয়ানার সাথে চিত্রগুলো তুলে ধরেছেন। ভিক্টর হুগো একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, নেহায়েত একজন লেখকই নন। আমরা মুসলমানরা যে শব্দটা ব্যবহার করি সেই অর্থেই ভিক্টর হুগো একজন হাকিম। আর ‘লা মিজারেবল’ হলো তাঁর হেকমতের নিদর্শন।’- ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৩
রজার মারটিন দ্য গার্ড
তেহরান আন্তর্জাতিক বইমেলা সফরকালে নিলুফার প্রকাশনীর স্ট্যান্ড পরিদর্শনে আসেন রাহবার আলী খামেনেয়ী। তিনি বিক্রেতাদের অভিবাদন জানান এবং নতুন প্রকাশিত বইগুলোর ব্যাপারে জানতে চান। এর মধ্যে একটি বই তাঁর কাছে আকর্ষণীয় লাগে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘এটা কি সেই পুরানো চার খণ্ডের বইটিই এক মলাটে বের করা হয়েছে?’ বিক্রেতা হ্যা-সূচক জবাব দিলেন। তিনি অনুবাদকের নাম জানতে চাইলেন। তারা জানালো, ‘আবুল হাসান নাজাফি’।
রাহবার খামেনেয়ী স্মৃতিচারণ করলেন, “আহ! আবুল হাসান নাজাফি। আবুল হাসান নাজাফি, মরহুম হাবিবি এবং আরো কয়েকজন সাহিত্যবোদ্ধা আমাদের সাথে দেখা করতে আসেন একবার। আমি নাজাফিকে জিজ্ঞাস করলাম, ‘আপনি কি থিবল্টের (Thibaults) অনুবাদক?’ আমি এই উপন্যাসের নাম জানি দেখে জনাব নাজাফি যার পর নাই অবাক হলেন। আমি উপন্যাসটি পছন্দ করেছিলাম এবং এর একটি ক্রিটিক জানালাম অনুবাদক নাজাফিকে। জনাব নাজাফি আরো বেশি অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, ‘আপনি আসলেই পুরো চার খ- পড়েছেন? আমি ভাবতেই পারি নি যে, আপনি এমনকি এটার নাম জানবেন’!”
রাহবার হাসি হাসি মুখে তাঁর স্মৃতিচারণ অব্যাহত রাখলেন, ‘আমি তাঁকে জানালাম, আমি সেটি পড়েছি। মরহুম নাজাফির রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। ‘থিবল্ট’ আসলেই একটি চমৎকার উপন্যাস, কিন্তু দুঃখের বিষয় এটি এর যোগ্য মূল্যায়ন পায় নি।’ – ১১ মে, ২০১৮
‘দ্য থিবল্ট’ (লাস থিবল্ট) ফরাসী লেখক রজার মারটিন দ্য গাডর্ রচিত একটি সুদীর্ঘ উপন্যাস। এটিতে ইউরোপের বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিককার ইতিহাস আলোচিত হয়েছে এবং একই সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসও উঠে এসেছে। এতে একটি ফরাসি উচ্চবিত্ত বুর্জোয়া পরিবার-দ্য থিবল্ট-এর কাহিনী চিত্রায়িত হয়।
আনাতোলি রাইবাকভ (‘চিল্ড্রেন অফ দ্য আরব্যাট’ এর লেখক)
(লেখকের নিজের মত অনুসারে) এটি একটি স্তালিনবিরোধী উপন্যাস। রাহবার আলী খামেনেয়ীর বর্ণনায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগে সোভিয়েত দেশের ভেতরকার তিক্ত ঘটনাবলির কিছু কিছু বাইরে বের হতো, আর সেগুলোর কোন কোনটা আবার ফারসিতে প্রকাশ হতো। সেগুলো রাহবার পড়তেন। তেমনই একটি উপন্যাস এটি। সোভিয়েত ইউনিয়নের কম্যুনিস্ট বাহিনী দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবলতম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। নিজের নাগরিকদের ওপর প্রবল চাপ প্রয়োগ করে। সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। জনগণের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়। বিপ্লব প্রথম থেকেই ধীরে ধীরে ভিন্ন পথে চলে যায়। বিপ্লবের মুল উদ্দেশ্য কখনই সফল হয় নি।- ২০ অক্টোবর ১৯৯১ এবং ১০ আগস্ট ২০১১ সালের বক্তৃতা অবলম্বনে
লিও তলস্তয়
‘কোন জাতির কঠিন সময় যেমন যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা রাজনৈতিক চাপের সময় তাদের সত্যিকার শক্তি এবং সক্ষমতা উপলব্ধি করা যায়। এতে একটি জাতির টিকে থাকার যোগ্যতাও অনুধাবন করা যায়। আর তাই দেখা যায়, এরকম কঠিন সময়েই শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মগুলো আত্মপ্রকাশ করে। লক্ষ্য করে দেখুন সবচেয়ে মিষ্টি এবং একই সাথে সবচেয়ে সৃষ্টিশীল শিল্পকর্মগুলো তখনি প্রকাশ পায় যখন একটি জাতি একটি বড় দায়িত্ব হাতে তুলে নেয়। তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ তেমনি একটি রচনা। নেপোলিয়ানের বিরুদ্ধে রুশ জাতির অভূতপূর্ব প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাস উঠে এসেছে।’
‘তলস্তয় আরো অনেকগুলো প্রন্থ রচনা করেছেন, তবে আমার কাছে এটিই তাঁর শ্রেষ্ট সৃষ্টি; কেননা, এতে রুশ জাতির প্রতিরোধের উদ্দীপনার প্রকাশ পাওয়া গিয়েছে।’
মাইকেল জিভাকো
‘মাইকেল জিভাকো একজন বিখ্যাত ফরাসি লেখক যিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। আমি অতীতে তাঁর প্রায় সকল উপন্যাস পড়েছি। আমি সবসময় বই পড়তে ভালোবাসতাম। আমাদের ঘরে অনেক বই ছিল। আমার বাবার একটি বড় ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ছিল, যেখানের বইগুলোর অনেকগুলোই আমার জন্য ছিল চমৎকার। অবশ্য আমার নিজেরও ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহ ছিল। এছাড়াও আমি মানুষের থেকে বই ধার নিতাম। আমাদের বাড়ির পাশেই একটি ছোট বইয়ের দোকান ছিল- যারা বই ধার দিত। মূলত উপন্যাস আর অন্য বইও আমি সেখান থেকে ধার নিতাম। পরবর্তীকালে আমি মাশহাদে অবস্থিত অস্তানে-কুদ্স রাযাভি লাইব্রেরিতে যেতাম। সেটি ছিল অত্যন্ত চমৎকার! আর তখন আমি হাওযার প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করছিলাম এবং আমার বয়স ছিলো পনের কি ষোল। মাঝে মাঝে আমি পুরো দিন সেখানে কাটাতাম। যেহেতু সেটা হেডকোয়ার্টারের খুব নিকটে ছিল তাই আজানের ধ্বনি সেখানে প্রবেশ করত। কিন্তু আমি বইয়ের মধ্যে এতটাই বুঁদ হয়ে থাকতাম যে, সেটা শুনতে পেতাম না। আরেকজন ঘোষক নিকট থেকেই নামাযের জন্য ডাক দিতেন যেটি লাইব্রেরির দেয়ালে প্রতিধবনিত হতো গমগম করে। সময়টা তখন দুপুরআমি বই ভালোবাসতাম। আর এখন যখন আমার বয়স প্রায় ষাট বছর,যখন আমি তোমাদের অনেকের পিতা কিংবা দাদা-নানার বয়সী, তখনো আমি যে পরিমাণ বই পড়ি তত বই তোমাদের পরিচিত খুব কম কিশোরও পড়ে থাকে। আমি তরুণদের নিকট অতিরিক্ত বই এবং উপন্যাসের পরিচয় করাতে চাই না, তবে কয়েক জন লেখকের কথা বলতে পারি। যেমন, প্রখ্যাত ফরাসি লেখক মাইকেল জিভাকো, যিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। এছাড়া আমি ভিক্টর হুগোর কথা বলতে পারি। আমি তরুণ বয়সে তাঁর ‘লা মিজারেবল’ এর কিছুটা পড়েছিলাম,পরবর্তীকালে সেটা পুরোটা কয়েকবার করে পড়েছি।’-৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮, শিশু-কিশোরদের সাথে একটি আন্তরিক মিলনমেলায়।
রাহবার সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর বইয়ের তালিকা সুদীর্ঘ। মাত্র একটি পর্বে এবং এতটা ছোট কলেবরে সেগুলো স¤পর্কে তাঁর মতামত তুলে ধরা এক কথায় অসম্ভব। তাই এবারের মতো শেষ করতে চাই মুসলিম উম্মাহর ও মানবতার ঐক্যের সুউচ্চ কণ্ঠস্বর ইমাম সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর আরো দুটি মুল্যবান বাণী উদ্ধৃত করে।
‘মানবজাতির দুনিয়াবি এবং পরকালীন উভয় জীবন-এই দেহ এবং আত্মা-বইয়ের মাধ্যমে পুষ্টি লাভ করে এবং সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠে। মানবীয় পূর্ণতা অর্জিত হয় বই পড়ার মধ্য দিয়েই।’-১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫
‘আমরা যত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাব বইয়ের প্রয়োজনীয়তা ততই বৃদ্ধি পাবে। যেরকম ধারণা করা হয় যে, নতুন নতুন যোগাযোগের প্রযুক্তি মাধ্যম গড়ে ওঠার সাথে সাথে বইয়ের প্রয়োজনীয়তা সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে, এটা একেবারেই ভুল। বই মানব সমাজে ক্রমান্বয়ে আরো কেন্দ্রীয় অবস্থান দখল করবে। নতুন নতুন প্রযুক্তির আগমন, খুব বেশি হলে বইয়ের বণ্টনকে সহজতর করবে।’- জুলাই ২০, ২০১১।
আল্লাহ আমাদেরকে ভালো বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে দিন।