বুধবার, ১৬ই আগস্ট, ২০১৭ ইং, ১লা ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

মুসলিম উম্মাহর যেদিকেই তাকানো যায় দেখা যায় শুধু জখমের চিহ্ন: সর্বোচ্চ নেতা

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ৫, ২০১৭ 

news-image

সম্প্রতি সারাবিশ্বের মতো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানেও যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। রাজধানী তেহরানে সর্বোচ্চ নেতার ইমামতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের প্রধান ঈদের নামাজ।

এই নামাজের খুতবায় আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ইরানসহ মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে মূল্যবান দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন। তাঁর ভাষণের প্রধান অংশগুলো তুলে ধরা হলো।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ঈদের নামাজের খুতবায় ইরানি জনগণের পাশাপাশি গোটা মুসলিম উম্মাহকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানান। গত কয়েক বছরের মতো এ বছরের মাহে রমজানেও গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরতাপের মধ্যে অনেক কষ্ট সহ্য করে রোজা রাখায় তিনি ইরানি জনগণকে মুবারকবাদ জানান এবং বলেন, মহান আল্লাহর কাছ থেকে যেদিন আপনারা এই ইবাদতের পুরস্কার লাভ করবেন সেদিন এই কষ্ট স্বার্থক হবে।  সর্বোচ্চ নেতা মসজিদগুলোর পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায়, অলি-গলিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইফতার বণ্টনকে একটি মূল্যবান ঐতিহ্য ও দামী অভ্যাস হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ আল্লাহ তায়ালার কাছে ভীষণ প্রিয়। ইরানি জনগণ এই মাসে ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি অনিচ্ছাকৃত অপরাধে কারাবরণকারী ব্যক্তিদের মুক্তি এবং রোগীদের চিকিৎসা সেবার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করেছেন। আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: যে মাসে এ ধরনের বরকতময়  কাজ সংঘটিত হয় সেটিই প্রকৃত রমজান মাস হয়ে ওঠে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শবে কদরের রজনীগুলোতে মুমিন মুসলমানদের ইবাদত ও আল্লাহর দরবারের কান্নাকাটির কথা উল্লেখ করে বলেন: ‘এই রজনীগুলোতে যে অশ্রু ঝরেছে, আল্লাহর ক্ষমা লাভের জন্য যে আর্তনাদ করা হয়েছে, মানুষ নিজের অন্তরে আল্লাহর যে অস্তিত্ব উপলব্ধি করেছে তার মূল্য অপরিসীম। এসব বিষয়ই একটি জাতির আধ্যাত্মিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে দেয় যা তাকে কঠিন দিনগুলোতে পথ চলতে সাহায্য করে।’

রমজানের শেষ শুক্রবার বিশ্ব কুদস দিবস পালন সম্পর্কে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন: এই দিবসের শোভাযাত্রায় অংশ নিতে মানুষ দলে দলে রাজপথে নেমে এসেছেন, এমনকি অনেকে তাদের শিশুদের নিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছেন। বিশ্ব কুদস দিবসের এই শোভাযাত্রাকে তিনি ইরানের মুসলিম জাতির ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল বীরত্বগাথা হিসেবে উল্লেখ করেন।  মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা আল-আকসা মসজিদ ইহুদিবাদীদের কবল থেকে মুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে প্রতি বছর রমজানের শেষ শুক্রবার ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিবসটি পালিত হয়।

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী জনগণকে পবিত্র রমজান মাসে অর্জিত তাকওয়া বা খোদাভীতি সারাবছর ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা এই মাসে যা কিছু অর্জন করেছেন তা আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে পাওয়া ঐশী সম্পদ। এই সম্পদকে রক্ষা  করুন। পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত বন্ধ করবেন না, নামাজের এই একাগ্রতা যেন ছুটে না যায়। এই মাস ছিল তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস। এই প্রশিক্ষণের সর্বোচ্চ ব্যবহার করুন। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে আপনারা সবাই আল্লাহ তায়ালার রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবেন।’

ঈদের নামাজের দ্বিতীয় খুতবায় সর্বোচ্চ নেতা মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের চলমান ঘটনাপ্রবাহের প্রতি ইঙ্গিত করে ইরানি জনগণকে উদ্দেশ করে বলেন, রমজান মাস শুরুর কয়েকদিন আগে আপনারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল সংখ্যায় অংশ নিয়ে বিশ্ববাসীকে নিজেদের উপস্থিতির জানান দিয়েছেন। বিশ্ব কুদস দিবসের মিছিলে অংশগ্রহণ ছিল আরেকটি বিশাল উদ্যোগ। তেহরানে দায়েশের সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় সিরিয়ায় এই জঙ্গি গোষ্ঠীর আস্তানায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভুয়সী প্রশংসা করে সর্বোচ্চ নেতা বলেন: এটি ছিল একটি বিশাল কাজ যার জন্য ইরানি জনগণ হিসেবে আপনাদের গর্ব করা উচিত। তিনি এসব বিষয়কে ইরানি জনগণের সামাজিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন বলেন, মাহে রমজানের আধ্যাত্মিক অর্জনের মতো এই অর্জনকেও মূল্যবান সম্পদ হিসেবে রক্ষা করতে হবে। আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন: এই অর্জন তখনই রক্ষিত হবে যখন জনগণ নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখবে এবং ইসলামি বিপ্লবের মহান লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নকে নিজেদের সব কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে স্থান দেবে।

তেহরানের ঈদের নামাজের খুতবায় সাংস্কৃতিক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়ে সর্বোচ্চ নেতা বলেন: শত্রুরা সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে আগ্রাসন চালাতে পারে- ইরানে এমন অনেক লক্ষ্যবস্তু রয়েছে। এই আগ্রাসন রোধ করার কাজে সরকারের যেমন দায়িত্ব রয়েছে তেমনি সাধারণ মানুষের দায়িত্বও কম নয়। ঈদের নামাজের আগে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে সর্বোচ্চ নেতা যুব সম্প্রদায়কে সফট ওয়ার বা নরম যুদ্ধের প্রধান সৈনিক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন: সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কিছু নাজুক উপাদানের কথা বিবেচনা করে যুব সমাজকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ‘স্বনিয়ন্ত্রিত যোদ্ধা’ হিসেবে উপস্থিত থাকতে হবে।  স্বনিয়ন্ত্রিত যোদ্ধা তাদেরকে বলা হয় যাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হয়। যুদ্ধের পরিস্থিতি উপলব্ধি করে তারা কমান্ডারের নির্দেশের অপেক্ষা না করেই শত্রুর বিরুদ্ধে আঘাত হানতে পারে।

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ সম্পর্কে বলেন: সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্বনিয়ন্ত্রিত যোদ্ধার অর্থ এই অঙ্গনে স্বতঃস্ফুর্তভাবে পরিচ্ছন্ন কাজ করা। আমি যেটা বলতে চাই তার অর্থ হলো- সারাদেশে যুবসমাজ, চিন্তাবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীরা নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তারা এই অঙ্গনের আগ্রাসী শক্তিকে চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেবেন। স্বনিয়ন্ত্রিত যোদ্ধার অর্থ মূল্যহীন চিন্তাধারার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে অবৈধ, অশ্লীল ও দুষ্কর্ম  করা নয়। এ ধরনের কাজ দেশের ইসলামি বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থি এবং শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী আরো বলেন: বিপ্লবী যোদ্ধাদেরকে ইসলামি শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন ও শান্তি বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিকে যেন শত্রুরা কোনোভাবেই কাজে লাগাতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

মুসলিম বিশ্বে বিরাজমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন: গোটা মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের সমতুল্য।  বর্তমানে এই দেহের যেদিকেই তাকানো যায় দেখা যায় শুধু জখমের চিহ্ন। ইয়েমেন পরিস্থিতি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ।  বাহরাইনের চলমান পরিস্থিতিও তার থেকে ভিন্ন নয়। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য সংকটেরও একই অবস্থা। মুসলিম উম্মাহর উচিত ইয়েমেনের জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং পবিত্র রমজান মাসেও যে আগ্রাসী ও জালেম শক্তি দেশটির জনগণের ওপর ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। মুসলিম জাতিগুলোর উচিত ইয়েমেনের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা। বাহরাইন ও কাশ্মিরের জনগণের ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর একই পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সর্বোচ্চ নেতা বলেন: এক্ষেত্রে ইরান হতে পারে মুসলিম উম্মাহর আদর্শ। ইরান যেমন বিশ্বের যেকোনো বিষয়ে নিজের অবস্থান সুস্পষ্ট করে দেয় তেমনি মুসলিম বিশ্বের আলেম সমাজের উচিত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেয়া। এর মধ্যেই রয়েছে কল্যাণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি; কাজেই এ কাজ করতে গিয়ে কোনো দাম্ভিক শক্তি ক্ষুব্ধ হলো কিনা তা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এই দোয়াটি পাঠ করে তাঁর ঈদের নামাজের খুতবা শেষ করেন: ‘হে পরওয়ারদেগার!বিশ্বনবী ও তাঁর বংশধরদের প্রতি সালাম ও দরুদ পেশ করে বলছি, মুসলিম উম্মাহর ক্ষমতাকে দিনকে দিন বাড়িয়ে দিন। আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে আমাদেরকে আরো বেশি সচেতন করে তুলুন।’সূত্র: পার্সটুডে।