রবিবার, ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ফুলের সুবাসে চির-অম্লান

পোস্ট হয়েছে: জুন ১৫, ২০১৬ 

শেখ সা’দীর গুলিস্তান
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
‘গুলিস্তান’ একটি গ্রন্থের নাম। ফারসি ভাষায় লেখা হয়েছে এই গ্রন্থ। তাও সাম্প্রতিককালে নয়, আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৭শ’ বছর আগে। এরপরও এ নামটির সাথে আমরা পরিচিত। বড় সুন্দর মধুর মনে হয় এ নামটি। মনে হয় একান্ত কাছের। অথচ এর লেখক আমাদের দেশি কেউ নন। এদেশেও আসেননি কখনো। তাঁর জন্ম ইরানে। কবি ও গোলাপের নগরী শিরাযে। প্রাচীন পারস্যের রাজধানী শিরায। শিরাযের ফুলের বাগানে বসে কবি শেখ সা‘দী এ কিতাব লেখেন। কালের দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে গ্রন্থটি এখনো সমাদৃত ফারসি সাহিত্যের সোনালি জলসায়। শুধু সমাদৃত নয়, প্রাতঃস্মরণীয়। ইরানের কবি-সাহিত্যিকদের গলার তাবিজ ‘গুলিস্তান’।
প্রশ্ন জাগে, [‘গুলিস্তান’ এর এত খ্যাতির কারণ কী? কারণ, এর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য। ফুলকে সবাই ভালবাসে। ফুলের বাগানে বিচরণ করলে কার না প্রাণ জুড়ায়! শেখ সা’দীর ‘গুলিস্তান’ও যেন ফুলবাগান। ফারসিতে গুল মানে ফুল, স্তানের অর্থ বাংলায় স্থানের মতই। অর্থাৎ ফুলের স্থান, ফুল বাগান। সত্যিই ‘গুলিস্তান’ একটি অক্ষয় ফুলবাগান। সেখানে নিত্য বসন্ত ফুলের সুরভি বিলায়। বরং মানবসভ্যতার বসন্ত নিজেই সৌরভ আহরণ করে সা’দীর ‘গুলিস্তান’ হতে। গুলিস্তানের পরশে মানব বাগানে প্রস্ফুটিত হয় রঙ-বেরঙের ফুল। মানুষের মন হয় সুরভিত, সুবাসিত, গুলে গুলযার।]
আমাদের বাড়ির আঙ্গিনায় যে বাগান, তাতে ফুলের সমারোহ আসে বসন্তে। বছরে একবারের বেশি নয়। বসন্তের প্রস্থানে থাকে না ফুলের সেই সৌরভ, বাগানের জৌলুস। কিন্তু ‘গুলিস্তান’-এ হিকমত, উপদেশ, বাক্যালংকার ও উপমার যে ফুলের জলসা সাজিয়ে রেখেছেন শেখ সা’দী, তাতে নিত্য বসন্ত বিরাজমান। এক মুহূর্তের জন্যও ম্রিয়মাণ হয় না। ‘গুলিস্তান’ পড়ে সজীব হয় মানুষের প্রাণ। পবিত্র আনন্দের শিহরণ আসে হৃদয়-মনে। কাজেই ‘গুলিস্তান’ অবারিতভাবে ফুলের সুষমা বিলিয়ে সমৃদ্ধ করেছে মানবসভ্যতাকে, সমৃদ্ধ করছে আমাদের প্রিয় বাংলাভাষাকেও। ‘গুলিস্তান’ এর এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের প্রতি শেখ সা’দীর নিজেরও সজাগ নজর ছিল। তিনি এর ভূমিকায় বলেন-
বে ছে কা‘র অ‘য়াদাত যে গুল তাবাকী
আয্ গুলেস্তা‘নে মান বেবার ওয়ারাকী।
তোমার কি কাজে আসবে ফুলের স্তবক
আমার গুলিস্তান হতে নাও একটি পল্লব।
গুল হামীন পাঞ্জ রুয ও শীশ বা’শাদ
ওয়ীন গুলিস্তা‘ন হামীশে খোশ বা’শাদ।’
ফুল তো থাকবে কেবল পাঁচ-ছয় দিন,
এই ফুলবন থাকবে প্রাণবান চিরদিন।।
গুলিস্তান থেকে
‘গুলিস্তান’ এর রচনাকাল ৬৫৬ হিজরি। আগের বছর তিনি ‘বূস্তা‘ন’ লিখেন। ‘বূস্তা‘ন’ সম্পূর্ণ পদ্যে। ফারসি সাহিত্যের অনবদ্য কিতাব। ‘গুলিস্তান’ পদ্য ও গদ্যের মিশ্রণে লেখা। যার দৃষ্টান্ত এর আগেকার ফারসি সাহিত্যে নেই। পরে গুলিস্তানের আদলে আবদুর রহমান জামীর ‘বাহারিস্তা‘ন’ এর ন্যায় গ্রন্থ রচনার জন্য অনেক চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনটিই ‘গুলিস্তান’-এর সমকক্ষ হয়নি। ‘বাহারিস্তা‘ন’ ছাড়া কোনটি কাছেও ঘেঁষতে পারেনি। ‘গুলিস্তান’-এর বাচনভঙ্গি অপূর্ব, প্রাঞ্জল, গতিময়, প্রাণচঞ্চল। গদ্যে-পদ্যে শব্দে শব্দে ঝংকার, ভাবের তরঙ্গ, আনন্দের উচ্ছ্বলতা, তত্ত্বের সমাহার। মনে হবে, দুনিয়ার কোন কাব্য বা পদ্য সা’দীর গদ্যের সমকক্ষতায় আসতে পারবে না। কিন্তু যখন গদ্যের মাঝে শ্লোক, খণ্ড-কবিতা প্রভৃতি পদ্যের সুন্দর সংযোজন দেখবেন, মনে হবে পদ্য-গদ্যের সকল সীমা চুরমার করে দিয়েছে ‘গুলিস্তান’। প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি শ্লোক মুখস্ত রাখার মত। তাই ইরানিদের মুখে মুখে চর্চিত ‘গুলিস্তান’ এর এসব বাক্য। কথায় কথায় উদ্ধৃতি টানে সা’দীর উক্তির। অফুরন্ত জ্ঞান, তত্ত্ব ও উপদেশ উপচে পড়ে ‘গুলিস্তান’ এর প্রতিটি বাক্য বিন্যাসে।
হযরত শেখ সা’দী (রহ.) জীবনের শেষ ভাগে, দীর্ঘ সফর ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয় মানবজাতির জন্য সাজিয়ে গেছেন ‘গুলিস্তা‘ন’ ও ‘বূস্তা‘ন’-এ। যেগুলোর আবেদন চিরন্তন। গবেষকদের মতে, ‘গুলিস্তান’ ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের মাইলফলক। প্রাচীন পাহলভী ভাষা থেকে ফারসির রূপান্তরের পর এ ভাষা চিরতারুণ্যে প্রাণবন্ত। ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ রচনার পর দীর্ঘ হাজার বছরে ফারসিতে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি, আসতে দেয়নি ‘গুলিস্তান’, ‘বূস্তা‘ন’, ‘মসনবী’ ও ‘দিওয়ানে হাফেয’ এর মত শত শত কিতাব। ফলে হাজার বছরের পুরনো ফারসি কিতাব পড়লে মনে হবে, সম্পূর্ণ নতুন আধুনিক কোন বই পড়ছি। অন্তত ‘মসনবী’, ‘গুলিস্তান’, ‘বূস্তা‘ন’, ‘দিওয়ানে হাফেয’ এবং নিযামী ও জামীর রচনার বেলায় এ কথা একশ’ ভাগ সত্য।
নিঃসন্দেহে ফারসি ভাষার স্বকীয়তা-নিজস্বতা রক্ষায় এসব গ্রন্থ ও মনীষীর অমূল্য অবদান অবিস্মরণীয়। মাঝখানে ফারসিকে আরবির আধিক্য ও ইসলামি পরিভাষা থেকে আলাদা করার প্রয়াস কম হয়নি। কিন্তু মহীরূহের মত দাঁড়িয়ে ‘গুলিস্তান’ তা বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। কারণ, ‘গুলিস্তান’কে বাদ দিয়ে তো ফারসি সাহিত্য হবে না। আর ‘গুলিস্তান’-এ রয়েছে আরবি, ইসলামি ও নৈতিক শিক্ষার অফুরন্ত ভাণ্ডার।
নজরুল যেভাবে বাংলায় ফারসি-আরবির সুন্দর হৃদয়গ্রাহী মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, শেখ সা’দী তার চেয়েও মোহনীয়ভাবে কুরআন, হাদীসের শিক্ষা ও শব্দ সম্ভারের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন ফারসিতে। ফলে অক্ষয় আল্লাহর তাওহীদের বাণী ও শিক্ষা বুকে ধারণ করায় ফারসি হয়েছে অপরিবর্তনীয়, অক্ষয়। একই সুবাদে ‘গুলিস্তান’ও দাবি করতে পারে কেয়ামত পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠানের। ‘গুলিস্তান’ আমাদের দেশেও পড়ানো হয় মাদ্রাসাগুলোতে। তাও আবার নিচের ক্লাসে। ফলে সাহিত্য ও বাক্যালংকারের রসবোধহীন ছাত্ররা ‘গুলিস্তান’-এর মাধুর্যের কিছুই বুঝতে পারে না। আমাদের দেশে মাদ্রাসায় ‘গুলিস্তান’-এর কিছু কিছু গল্পই বুঝানো হয় ক্লাসে। তাও এখন বিলুপ্তপ্রায়। অথচ এর প্রতিটি বাক্য ও শিক্ষার আবেদন কীরূপ কালজয়ী তা সাহিত্যের বোদ্ধা ছাড়া বোঝা ও বোঝানো অসম্ভব। তাই ইরানে ‘গুলিস্তান’ পড়ানো হয় ফারসি সাহিত্যের বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের।
আট বেহেশতের সংখ্যা সামনে রেখে শেখ সা’দী ‘গুলিস্তান’কে ৮টি ‘বাব’ বা অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথমে রয়েছে ভূমিকা। ফারসিতে বলা হয় দীবাচা। ষোল পৃষ্ঠা জুড়ে দীর্ঘ দীবাচায় শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও রসূলে পাক (সা.)-এর তারিফ। তারপর ‘গুলিস্তান’ রচনার প্রেক্ষাপট বর্ণনাসহ অমূল্য উপদেশ সম্ভার।
এরপর ১৭-৬৬ পৃষ্ঠাব্যাপী প্রথম অধ্যায়ে আছে ‘রাজা-বাদশাহদের জীবনচরিত’। শেখ সা’দী (রহ.) যে যুগের মানুষ সে যুগে কাব্য ও সাহিত্যচর্চা বলতে বুঝাতো রাজা-বাদশাহদের স্তুতিগান ও চাটুকারিতা। শাসকদের বিরুদ্ধে টু শব্দ করার অর্থ ছিল তরবারির সামনে গর্দানটা এগিয়ে দেয়া। শেখ সা’দী সে যুগেই তাঁর ক্ষুরধার লেখনীতে এক অভিনব পন্থায় রাজা-বাদশাহদের সমালোচনা ও সংশোধন করেন। তিনি পূর্ববর্তী রাজা-বাদশাহরা কী কী কারণে ধ্বংস ও পরাজিত হয়েছিলেন, তার সরস বর্ণনার পাশাপাশি ন্যায়পরায়ণ বাদশাহদের প্রশংসা তুলে ধরেন। তারই মধ্য দিয়ে সমকালীন ও অনাগত শাসকদের সংশোধন হওয়ার সুযোগ করে দেন। একই সঙ্গে অধীনস্তদের ওপর যুলুমের করুণ পরিণতি আর ন্যায়-ইনসাফকারীদের জীবনের সৌভাগ্য ও সুনাম-সুখ্যাতি বর্ণনায় গল্পের ছলে মোট ৪২টি উপমা দিয়েছেন এ অধ্যায়ে। মাঝে মাঝে উপদেশনির্ভর কবিতার ব্যঞ্জন তো আছেই।
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘দরবেশদের আখলাক’ সম্বন্ধে। যারা দরবেশ, দুনিয়াবিরাগী, লোভ-মোহ থেকে মুক্ত, পবিত্র জীবনের অধিকারী তাঁদের প্রশংসা করেছেন আর ভণ্ড তাপসদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। ৬৭ থেকে ১০৮ পৃষ্ঠাব্যাপী ৪৮টি উপমার সাহায্যে গদ্য ও পদ্যে তিনটি কাহিনীসহ সাজিয়েছেন এ অধ্যায়।
তৃতীয় অধ্যায় ‘অল্পে তুষ্টির ফযিলত বা মাহাত্ম্য’ প্রসঙ্গে। ১০৯ থেকে ১৪১ পৃষ্ঠায় ৩০টি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে পদ্যে ও গদ্যে অনুপম ভঙ্গিমায় মানবজীবনের অনিবার্য অলংকার ‘কানাআত’ বা অল্পে তুষ্টির পথ দেখিয়েছেন।
চতুর্থ অধ্যায় ‘নীরবতার সুফল’ প্রসঙ্গে। ১৪২ হতে ১৪৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত কম কথা বলা, সময় মত বলা বা বাক্য সংযমের রীতিনীতির সরস বর্ণনা স্থান পেয়েছে এ অধ্যায়ে।
পঞ্চম অধ্যায়ে ১৫০ পৃষ্ঠা হতে ১৭৮ পৃষ্ঠা জুড়ে ‘প্রেম ও যৌবন’ প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। ২১টি উপমার সাহায্যে একটি কাহিনীসহ যৌবন তরঙ্গের নানা আপদ, চারিত্রিক বিচ্যুতির অপকারিতা প্রভৃতির হিকমতপূর্ণ আলোচনা বিধৃত।
ষষ্ঠ অধ্যায় ‘দুর্বলতা ও বার্ধক্য’ সম্বন্ধে। ১৭৯ হতে ১৮৭ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি ছন্দোবদ্ধ কাহিনীসহ ৭টি উপমার সাহায্যে যৌবন ও বার্ধক্যের নানা অভিজ্ঞতার সরস উপদেশ উপস্থাপন করেছেন।
সপ্তম অধ্যায় ‘শিক্ষা-দীক্ষার প্রভাব’ সম্পর্কে। ১৮৮ হতে ২১৬ পৃষ্ঠাব্যাপী এ অধ্যায়ে ১৯টি দৃষ্টান্ত ও একটি দীর্ঘ কথোপকথন স্থান পেয়েছে পদ্য ও গদ্যে।
অষ্টম অধ্যায়ে রয়েছে ২১৭ হতে ২৫৬ পৃষ্ঠায় ‘সাহচর্যের আদব ও শিষ্টাচার’ প্রসঙ্গ। গবেষকদের মতে এ অধ্যায়টি ‘গুলিস্তান’-এর সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী অংশ। কারো কারো মতে, ‘গুলিস্তান’ শেষ থেকে অধ্যয়ন শুরু করে সবশেষে ভূমিকা পাঠ করলেই উত্তম।
‘গুলিস্তান’ শুরু হয়েছে আল্লাহ পাকের প্রশংসা দিয়ে। সৃষ্টিলোকের কোন্ নেয়ামতটির জন্য শেখ সা’দী আল্লাহর প্রশংসা করে অন্তর জুড়াবেন! অসংখ্য-অগণিত নেয়ামতরাজির মধ্যে একটি ছোট্ট নিঃশ্বাসকে বেছে নিয়েছেন তাই। যেন এর মাধ্যমে মানবজীবনের স্বরূপ ও সৃষ্টিরহস্য উদ্ঘাটিত হয়। আর প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ আল্লাহর কী পরিমাণ নেয়ামতে নিমজ্জমান তারও তথ্য ভেসে আসে। গদ্যে ছোট্ট ক’টি বাক্য, অথচ ছন্দ-ঝংকারে ভাব-আবেদন অপরিমেয়।
‘প্রতিটি শ্বাস যা ভেতরে প্রবেশ করে, জীবন বাড়ায় আর যখন বেরিয়ে আসে, দেহমনে স্বস্তি আনে, আনন্দ দেয়। কাজেই প্রতি নিঃশ্বাসে দু’টি নেয়ামত বিদ্যমান আর প্রত্যেক নেয়ামতের জন্য একটি করে কৃতজ্ঞতা কর্তব্য।’ গুলিস্তান, ভূমিকা
স্বীকার করতেই হয়, ‘গুলিস্তান’ থেকে যথার্থভাবে ভাষান্তরের ক্ষমতা বাংলার নেই। অন্য কোন ভাষারও নেই। ভাষার চাইতেও বড় কথা অনুবাদক। নজরুলের মত শক্তিমান কোন কবির পক্ষেই এ ক্ষেত্রে কৃতকার্য হওয়ার আশা করা সম্ভব। কাজেই এই দুর্বল কলমের অনুবাদ পড়ে কেউ আশাহত হলে ক্ষমার আর্জি জানানো ছাড়া উপায় নেই।
প্রতি মুহূর্তে আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস নেই। কিন্তু আমরা কি এত গভীরে গিয়ে চিন্তা করেছি, যেমনটি শেখ সা’দী (রহ.) করেছেন। যুক্তির বিচারে প্রতিটি নেয়ামতের জন্য একটি করে শোকরিয়া-কৃতজ্ঞতা জানানো কর্তব্য। একদিকে আল্লাহর অপরিসীম নেয়ামতের স্বীকৃতি, অপরদিকে মানবজীবনের স্বরূপ ও খোদানির্ভরতার প্রতি প্রাজ্ঞ দৃষ্টিপাত।
আরো সুন্দর সাবলীল ছন্দোময়-প্রাণোচ্ছল সাহিত্যিক বর্ণনার পর তিনি আবার বলছেনÑ
‘আব্র ও বা’দ ও মা’হ ও খোরশীদ ও ফলক দরকা’র আন্দ
তা’ তো না’নী বেদাস্ত অ’রী ওয়া বেগফ্লাত ন খোরী’
মেঘ-বৃষ্টি, চাঁদ-সূর্য, আকাশ কর্মে নিয়োজিত
যেন রুটি রুজি হাতে পাও, না খাও অবহেলায়।
হামে আয বাহরে তো র্সাগাশতে ও ফরমা’ন বরদা’র
শর্তে ইনসাফ ন বা’শদ কে তো ফরমা’ন ন বরী
সবাই দিশেহারা তোমার সেবায়, ব্যস্ত আজ্ঞাবহ,
বড় বেইনসাফী হবে যদি তার আদেশ অমান্য কর । গুলিস্তান,ভূমিকা
মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা হচ্ছে সমস্ত সৃষ্টির সম্মিলিত প্রয়াসে। মানুষের খেদমতেই নিয়োজিত রেখেছেন আল্লাহ তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকে। কাজেই অবহেলা-গাফিলতির মধ্যে যেন মানুষ ডুবে না যায়।
শেখ সা’দী রসূলে পাক (সা.)-এর প্রশস্তি গেয়ে গদ্য ও পদ্য রচনা করেছেন অসংখ্য। কিন্তু ‘গুলিস্তান’-এর ভূমিকায় আরবিতে লেখা ১টি পঙ্ক্তিমালা যে স্বীকৃতি ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে তা বিশ্বসাহিত্যে অতুলনীয়। আরব-অনারব তাবৎ কবি-সাহিত্যিক, মনীষী হৃদয়ের সকল ভালবাসা উজাড় করে বহু রাসূল প্রশস্তি লিখেছেন। কিন্তু সবই যেন ‘গুলিস্তান’-এর এই পঙ্ক্তিমালার সামনে নি®প্রভ। কারণ, শেখ সা’দী প্রতিটি ছত্রে ভাব, ছন্দ, সুর, আবেগ ও রাসূলে পাকের পরিচয়ের যে প্রকাশ ঘটিয়েছেন তা অতুলনীয় অবর্ণনীয়। এ কারণেই এ দু’টি ছত্র ইরানের সীমা পেরিয়ে সাড়ে ৭শ’ বছর পরও আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষের কণ্ঠে ভক্তি ও বিশ্বাসে, প্রেম ও ভালবাসার আবেগে শ্রদ্ধাভরে পঠিত, উচ্চারিত হয়-
‘বালাগাল উলা বিকামা’লিহী
কাশাফাদ দুজা বিজামা’লিহী
হাসুনাত জামিয়ু খিসা’লিহী
সাল্ল¬ুু আলাইহি ওয়া আ’লিহী। গুলিস্তান,ভূমিকা
এই অনুপম পঙ্ক্তিমালার যথার্থ অনুবাদের অনেক চেষ্টা বাংলা ভাষায়ও হয়েছে। কিন্তু কেউ দাবি করতে পারেননি সঠিক ও যথার্থ অনুবাদ হয়েছে বলে। মোটামুটি এভাবে তার অনুবাদ করা যায়-
সুউচ্চ শিখরে সমাসীন তিনি নিজ মহিমায়
তিমির-তমসা কাটিল তাঁর রূপের প্রভায়,
সুুন্দর আর সুন্দর তাঁর স্বভাব-চরিত্র তামাম
পড়ো তাঁর ও তাঁর বংশের ‘পরে দরূদ-সালাম।
‘গুলিস্তান’-এর ভূমিকায় বিধৃত এই পঙ্ক্তিমালা শত শত বছর ধরে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় মাহফিলগুলোতে রাসূলে পাকের আশেকগণ ভক্তি ও শ্রদ্ধায় অবনত কণ্ঠে সমস্বরে পাঠ করে অনাবিল তৃপ্তি ও নির্মল আনন্দ পান।
বাংলায় আমরা বলি সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। মাওলানা রূমী (রহ.) বলেছেন,
‘সোহবতে সা’লেহ্ তোরা’ সা’লেহ কুনাদ
সোহবতে তা’লেহ্ তোরা’ তা’লেহ কুনাদ।’
সৎলোকের সাহচর্য তোমাকে সৎ বানাবে
মন্দের সাহচর্য তোমাকে হতভাগা করবে।
এই নীতিবাক্যটি বিশ্বের প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষায় থাকতে পারে, থাকবে। কিন্তু শেখ সা’দী বিষয়টিকে যেভাবে পেশ করেছেন তার তুলনা বিশ্বসাহিত্যে আছে কিনা আমার জানা নেই। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের একটি কবিতা ছোট বেলায় স্কুল-জীবনে পড়েছিলাম। কবিতাটির কয়েকটি ছত্র সম্ভবত এরূপ ছিল-
একদা স্নান আগারে পশিয়া
হেরিনু মাটির ঢেলা।
হাতে নিয়ে তারে শুকিয়া দেখিনু
রয়েছে সুবাস মেলা।
কহিনু তাহারে কস্তুরি তুমি,
তুমি কি আতর দান?
তোমার গায়েতে সুবাস ভরা
তুমি কি গুলিস্তান।

এই কবিতার আসল রচয়িতা শেখ সা’দী এবং বাংলা ভাষ্যটি এর অনুবাদ। শেখ সা’দী (রহ.)-এর ‘গুলিস্তান’-এর ভূমিকার এই কবিতাটিই সত্যেন বাবু অনুবাদ করেছেন। দেখুন, ফারসি ভাষায় সাড়ে ৭শ’ বছর আগের লেখা শেখ সা’দীর এ কবিতা এখনো কত আধুনিক, প্রাণবন্ত ও রসাত্মক! একে কবিতায় অনুবাদের সাহস আমার নেই। তাই ভাষার অলংকার না হলেও ভাব ও আবেদনের ঐশ্বর্য তুলে ধরার প্রয়াস পাব-
একদা হাম্মামে একটি সুগন্ধ ঢেলা
এক বন্ধুর হাত হয়ে আসল আমার হাতে।
বললাম তাকে, তুমি কি মেশক নাকি আম্বর?
তোমার প্রাণস্পর্শী সুবাসে মাতাল হলো অন্তর?
বলল, আমি ছিলাম অতি তুচ্ছ কাদামাটি
তবে কিছুকাল কাটিয়েছি হয়ে ফুলের সাথি।
আপন সাথির পূর্ণতার গুণে আমি প্রভাবিত
নচেৎ আমি তো সেই মাটি, এখনো পতিত। (গুলিস্তান,ভূমিকা)
কী চমৎকার দৃষ্টান্ত! অপূর্ব অনবদ্য ছন্দোভঙ্গি যদিও ভাষান্তরিত হয়নি, তবুও কবিতার ভাব ঐশ্বর্যে চমৎকারিত্বে হৃদয়গ্রাহীতায় আঁচ করা যায় তার আবেদন কত কালজয়ী!
সত্যিই জীবনকে সুন্দর, সার্থক, সুবাসিত করতে হলে ফুলের মত সুন্দর যাঁদের জীবন তাঁদের সাহচর্য চাই। আল্লাহর অফুরন্ত রহমত বর্ষিত হোক শিরাযের সাদিয়ায় শেখ সা’দীর পবিত্র কবরের ওপর।