বুধবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

পৈশাচিকতার সাক্ষী খুররম শহর

পোস্ট হয়েছে: ডিসেম্বর ২৬, ২০১৩ 

news-image

দুনিয়ায় যুদ্ধ হয়েছে অনেক। অনেক যুদ্ধেই সংঘটিত হয়েছে পৈশাচিক বর্বরতা। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের যুদ্ধ-বর্বরতা ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। যুদ্ধবন্দিদের প্রতি ইরাকী বাহিনীর ব্যবহার, এক বিরাট সংখ্যক ইরাকী যুদ্ধবন্দির দেশে প্রত্যাবর্তন না করার ইচ্ছা প্রকাশ এবং হালাবজায় ইরাকী রাসায়নিক বোমা বর্ষণের এই পৈশাচিকতার প্রমাণ মিলে। নিউজ লেটারের পাঠকদের অবগতির জন্য এখানে খুররম শহরে ইরাকী বর্বরতার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো। খুররম শহর ইরানের খুজিস্তান প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বন্দর। আবাদান শহর থেকে এর দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। ইরাকের বসরা বন্দরের বিপরীত পার্শ্বে আরভান্দ ও কারুন নদীর তীরে এর অবস্থান। বসরা ও খুররম শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে আরভান্দ নদী। ইরান-ইরাক যুদ্ধের পূর্বে এই সীমান্ত শহরের লোকসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার। বেসামরিক এলাকায় হামলা করা যুদ্ধের নীতিবিরোধী হওয়ার সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকী আগ্রাসন শুরুর প্রথম দিন থেকেই এ শহরটি ইরাকী হামলার শিকার হয়। দুশমনের কামানের গোলা ও রকেটসমূহ প্রথম দিন থেকেই শহরটিকে ক্ষত-বিক্ষত করে। এরপর ইরাকী বিমান বাহিনীর ছত্রছায়ায় এবং ইরাকী নৌবাহিনীর সহায়তায় ইরাকী ট্যাংকবহর খুররম শহরে পৌঁছে। বলাবাহুল্য, সে সময় ইরানের বড় ধরনের হামলা মোকাবিলার মতো কোন প্রস্তুতি ছিল না। ইরাকী বাহিনী যখন শহরটিতে প্রবেশ করে তখন তারা এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ইরাকী বাহিনী কেবল তাদের আগ্রাসনে প্রতিরোধ সৃষ্টিকারীদেরই হত্যা করেনি; বরং একই সাথে হত্যা করেছে অসংখ্য অসহায় মানুষকে। ওদের হাত থেকে মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিন ও মুসল্লি সাধারণ কেউই রেহাই পায়নি। ধ্বংসের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং সাজ-সরঞ্জামও ব্যবহার করে। এই ধ্বংসযজ্ঞ হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসযজ্ঞকেও হার মানায়।

খুররম শহরের ২৩ হাজার গৃহের মধ্যে ১২০টি মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা, ১০০টি স্কুলগৃহ, ২টি কলেজ ভবন, ৪টি বড় বড় হাসপাতাল ও বেশ কিছু স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ আট হাজার ভবন মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল। ইরাকীরা ১৫ হাজার ভবন এমনভাবে ধ্বংস করে যে, সেগুলো আর মেরামতযোগ্য নয়। বিরাট সংখ্যক দোকানপাট লুট করা হয় এবং আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। ৫০ থেকে ৬০টি বিদেশী জাহাজ এবং একশটি ইরানী জাহাজ হয় ডুবিয়ে দেয়া হয় অথবা ধ্বংস করা হয়। ইরাকী বাহিনীর ঐ পৈশাচিকতা এত ব্যাপক ছিল যে, একটি গাছও তারা অক্ষত রাখেনি। এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় স্বজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় এবং এজন্য ব্যবহার করা হয় বিস্ফোরক, ধ্বংসাত্মক উপাদান ও ইঞ্জিনিয়ারিং যন্ত্রপাতি। ইরাকী বর্বরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, আত্মসমর্পণ করা ইরানী স্বেচ্ছাসেবক ও অন্যদের পুড়িয়ে মারা হয়।

অবশেষে পশুশক্তির পতন হয়। ১৯৮২ সালের ২৪ মে ‘বায়তুল মোকাদ্দাস অপারেশন’ চালিয়ে ইরানের বীর মুজাহিদরা খুররম শহর মুক্ত করে। খুররম শহর তখন পরিণত হয়েছিল এক ধ্বংসপুরিতে। অবশ্য ইরানের ইসলামী সরকার ও দেশপ্রেমী জনতার সহায়তায় খুররম শহর আবার তার পূর্ব সৌন্দর্য ফিরে পেয়েছে। ফিরে এসেছে নতুন প্রাণ-প্রবাহ।

(নিউজলেটার, মে ১৯৯১)