শনিবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৭ ইং, ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

English

নওরোযের উৎসব

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ২৪, ২০১৩ 

The-Nowruz-table-is-the-f-001নওরোযের উৎসব ইরানী জনগণের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রধান অংশ এবং প্রাচ্য সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন। নওরোয উৎসব প্রচলনের সঠিক সন-তারিখ আজও জানা যায় নি। তবে এর নিদর্শনগুলো কয়েক হাজার বছর পূর্বেকার ইরানের হাখামানেশী রাজবংশের শাসনামলের (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৩৩০ অব্দ) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। হাখামানেশী শাসনামল থেকে শুরু করে এ উপলক্ষে যেসব মুদ্রা তৈরি করা হয় তা এখনো মওজূত আছে। প্রাগঐতিহাসিককালের ইরানীরা (প্রকৃতির) জীবনের সমাপ্তি উপলক্ষে ফারসি সালের শেষ এগার দিন (১০ থেকে ২০ মার্চ) শোক পালন করত। নওরোযে প্রকৃতিতে নতুন করে জীবনের আগমনের সাথে সাথে এ শোকের সমাপ্তি ঘটত এবং এ উপলক্ষে আনন্দ উৎসব করা হত। এ কারণে ব্যাপক আগ্রহ-উদ্দীপনা সহকারে এ আনন্দ-উৎসব পালন করা হত।

হাখামানেশী সম্রাটদের যুগে এ উৎসব কীভাবে পালন করা হত সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় নি। আলেকজান্ডারের ইরান আক্রমণ ও তার ফলে সৃষ্ট ধ্বংস এ ব্যাপারে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ লাভের পথে বহুলাংশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও সাসানী রাজবংশের শাসনামলে (২৬২ থেকে ৬৫২ খ্রিস্টাব্দ) নওরোয উৎসব প্রচলিত ছিল বলে বহু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তাখতে জামশীদে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, হাখামানেশীদের পূর্ববর্তী মদ্ রাজবংশের শাসনামলে নওরোযের উৎসব পালিত হত। নওরোযের উৎসব পালন হাজার হাজার বছর ধরে এতটাই ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি লাভ করেছে যে, ইরান, তুরস্ক, আরাক, তাজিকিস্তান, উযবেকিস্তান ও আযারবাইজান, ভারত ও পাকিস্তানের কোন কোন অংশে এবং মধ্য এশিয়ায়ও এ উৎসব পালন করা হচ্ছে। একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী এ উৎসব পালন করে থাকে।

নওরোয উৎসবের কালগত গুরুত্ব এখানে যে, এ উৎসব এমন এক সময় শুরু হয় তখন প্রকৃতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে থাকে; পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে আরেকবার প্রদক্ষিণ শুরু করে।

প্রাচীন ইরানের ফার্স এলাকায় যরথুস্ত্রীরা নববর্ষের সূচনায় বিভিন্ন প্রতীকী বস্ত্ত দ্বারা সাতটি ট্রে পূর্ণ করে আহুর্মায্দা (আল্লাহ তা‘আলা)-এর উদ্দেশে উৎসর্গ করত। এই সাতটি ট্রে ছিল সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ঈমান, সুদপদেশ, সৎকর্ম, সৌভাগ্য এবং ক্ষমা ও অমরত্বের প্রতীক।

অতীতের এসব আনুষ্ঠানিকতা বর্তমানে যে পরিবর্তিত রূপ নিয়েছে তা হচ্ছে এই যে, এ উপলক্ষে বিশেষ ধরনের দস্তরখান বিছানো হয় এবং তার ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী জিনিস অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। এ উপকরণসমূহ হতে হবে বিভিন্ন ধরনের সাতটি উপকরণ যেগুলোর নাম ফারসি বর্ণমালার ‘সীন’ হরফ দিয়ে শুরু হয়েছে। এগুলো হলো ‘হাফ্‌ত সীন্’ যা সাধারণত নিম্নোক্ত উপকরণগুলোর মধ্য থেকে বেছে নেয়া হয়।

সাব্যেহ্ (সবুজাভ) : গম বা ডালের কচি চারার গুচ্ছ যা নওরোযের অব্যবহিত পূর্বে গজিয়েছে। একটা ট্রে বা প্লেটের ওপর বসিয়ে হাফ্ত সীন্ দস্তরখানায় রাখা হয় যা নব জীবনের প্রতীক।

সামানূ : কচি গম, বার্লি বা অন্যান্য শাস্যদানার আটা দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের হালুয়া যা প্রাচুর্য ও নেয়ামতের প্রতীক।

সেনজাদ : এক প্রকার শুষ্ক ফল যা প্রেমের প্রতীক।

সীর (রসুন) : সৌন্দর্য ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক।

সোম্মাগ : মশুরের ডালের চেয়ে সামান্য বড় লাল রঙের টক ফলবিশেষ যা উদীয়মান সূর্যের প্রতীক।

সিরাক : দীর্ঘায়ু ও ধৈর্যের প্রতীক।

সোমবোল : ছোট আকারের পুষ্পময় উদ্ভিদবিশেষ যা বসন্তের আগমন বার্তা বহন করে।

সেক্কেহ্ (কয়েন বা মুদ্রা) : সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

ইতিপূর্বে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, নওরোয উৎসবের উৎপত্তি কবে তা জানা যায় না, কিন্তু সুপ্রাচীন কাল থেকে, এমনকি প্রাগঐতিহাসিক কালেও, ইরান বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে যোগাযোগের ট্রানজিট রুট হিসাবে বিবেচিত হত। ইরান এশিয়াকে ইউরোপ ও আফ্রিকার সাথে সংযুক্ত করেছে। এ দেশে বিভিন্ন রসম-রেওয়াজ ও সংস্কৃতির উদ্ভব ও মিলন ঘটে যা অন্য কোন দেশে পাওয়া দুষ্কর।

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে এবং সুপ্রাচীন কালে ইরানীদের ধর্মবিশ্বাস ও জাতিসত্তায় বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রান্ত হয়। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে এক খোদার ইবাদত এবং শির্ক্ ও বহু দেবদেবীর পূজা প্রতিহতকরণ। যরথুস্ত্রীয় ধর্ম এর অন্যতম দৃষ্টান্ত।

যরথুস্ত্রীয় ধর্মমতে আহুরমায্দার প্রতি বিশ্বাস পোষণ করা হয় যাতে তাওহীদে বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটে।

ইসলামের আবির্ভাব ও অন্যান্য ধর্মের সাথে, বিশেষত ইরানীদের ধর্মবিশ্বাস ও জাতীয় ধ্যান-ধারণার সাথে ইসলামের শন্তিবাদী আচরণের দরুন ইরানীদের ইসলাম গ্রহণ করার পরেও তাদের আগেকার কতক ধ্যান-ধারণা ও রসম-রেওয়াজ অব্যাহত থাকে। অবশ্য ইরান-বিজেতা আরব মুসলমানদের ইরানীদের সাথে সদয় আচরণের কারণেই তারা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে বরণ করে নেয় এবং তাদের আদর্শ ব্যক্তিবর্গ, বীরগণ ও প্রাচীন কাহিনীগুলোকে মহান দীন ইসলামের রঙে রঙিন করে নেয়। প্রাচীন ইরানীদের কিছু কিছু উপলক্ষ ও রেওয়াজ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও জনগণের ধ্যান-ধারণার সাথে মিশে গিয়েছিল। নওরোয এর অন্যতম। সুদীর্ঘ কয়েক সহস্রাব্দের পুরনো এ ঐতিহ্যটি ইরানের মুসলমানদের মনে একটি স্থায়ী আসন তৈরি করে নিয়েছে এবং ইরানের মনীষিগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট লেখালেখি করেছেন। বিশেষ করে আল-বিরূনী (ওফাত ৪৪০ হি.) তঁর গ্রন্থ ‘আতহারুল বাক্বীয়াহ্’তে প্রাচীন ইরানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন। এছাড়া অনেক মুসলিম কাবিই নওরোয ও প্রাকৃতির নব জীবন লাভ নিয়ে কবিতা লিখেছেন। এখনও ইরানের অধিকাংশ লোকই পুরাতন বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আগমন ক্ষণে নতুন পোশাক পরিধান করে মিষ্টি-মধুর আচরণসহকারে পবিত্র স্থানে বা পরিবারের মুরববীদের সাথে কাটাতে পছন্দ করে। সে মুহূর্তে তারা কুরআন তেলাওয়াত করে ও দু’হাত তুলে মহান আল্লাহ্র কাছে নিজেদের ও পরিবারবর্গের জন্য একটি সুন্দর এবং সুস্থতা ও সমৃদ্ধিপূর্ণ বছর কামনা করে।

নওরোযের পছন্দনীয় অন্যান্য রীতির মধ্যে রয়েছে পরস্পরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়, কারও প্রতি রাগ বা ক্ষোভ থাকলে পরস্পরকে ক্ষমা করে দেয়া এবং নববর্ষের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করা। এছাড়া এ দিনে তারা এমন সব ব্যক্তির সাথে দেখা করতে যায় যারা পুরাতন বছরে কোন প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে।

এভাবে নওরোয প্রাচীন ইরান থেকে পর্যায়ক্রমে বর্তমান রূপে এসে দাঁড়িয়েছে এবং ইসলামের পছন্দনীয় রীতি-নীতিগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই ইসলামের মূলনীতির সাথে এর কোন বিরোধ নেই; বরং নওরোয উৎসব ইরানী সমাজের জন্য নৈতিক ও সামগ্রিক শিক্ষার সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

অনুবাদঃ নূরে আলম মা‘রূফ