সোমবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

চির ভাস্বর ইমাম খোমেইনী (রহ.)

পোস্ট হয়েছে: ডিসেম্বর ২৬, ২০১৩ 

news-image

ড. আবদুল করিম সরুশ

ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গ সাধারণত তাঁদের মৃত্যুর পর খ্যাতি অর্জন করেন। কেননা, সাধারণ্যে বাস্তব অবস্থার উপলব্ধি আসতে সময় লাগে। সাম্প্রতিককালের একজন ইতিহাসবিদ মরহুম আব্বাস ইকবাল আসথিয়ানী বলেছেন : ‘একশ বছর অতিবাহিত না হলে কোন ঘটনাই ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত হয় না বা ঐতিহাসিকভাবে আলোচিত হতে পারে না।’ এর অর্থ এই নয় যে, যখন কোন ঘটনা ঘটে তখনকার শাসক মহল তা নথিভুক্ত করা বা প্রকাশ করার অনুমতি দিতে চায় না; বরং প্রকৃত ব্যাপার হলো যে, ঐতিহাসিক সব ঘটনা একত্রে বা তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশিত হয় না। অর্থাৎ গুটানো বা মুড়ানো কাগজের মতো ধীরে ধীরে মেলে যাওয়ার মতো ঘটনাসমূহ প্রকাশিত হতে সময় লাগে, যাতে ভবিষ্যৎ বংশধরগণ তা ক্রমিক পর্যায়ে অবহিত হতে পারে। এই কারণে আজকে আমরাও ইরানে সংঘটিত মহান ইসলামী বিপ্লব এবং এই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিবর্গের বিরাটত্ব স¤পর্কে সঠিক অনুমান করতে পারি না।

তবে আমরা যদি এই বিপ্লব এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ব্যাপারে বিস্মৃত হই তাহলে তা হবে ঐ ব্যক্তির মতো যে কোন ঘটনা একেবারে কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করলো এবং একপেশে হয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারল না।

ধর্মীয় সংস্কারকগণ ধর্মকে পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করেন। এই পুনরুজ্জীবনের অর্থ ও ধরন বিভিন্ন। ধর্মকে যিনি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করবেন তাঁকে ধর্মীয় মানসিকতাসম্পন্ন ও ধর্মের প্রতি যত্নবান হতে হবে এবং কেবল ধর্মের মধ্যেই যে মানুষের উন্নতি ও সমৃদ্ধি নিহিত সে ব্যাপারে বিশ্বাসী হতে হবে।

ধর্মের প্রতি যত্নবান হওয়া ও বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস এবং মানবজীবনের সমৃদ্ধি একেবারে ধর্মের সাথেই জড়িত বিষয় বলে মনকে পুরোপুরি প্রস্তুত করাটাই হলো দীনের তাজদীদ বা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়। এ ব্যাপারে যথাযথ মান অর্জন ও বাধ্যতামূলক কর্তব্যানুভূতি অর্জন করার আগ পর্যন্ত একাজ শুরুই করা যায় না।

মুজতাহিদগণ তাঁদের সমসাময়িককালে দীনের অবস্থা প্রত্যক্ষ করে দীনকে পুনরুজ্জীবনের ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন। নবীর মাধ্যমে আল্লাহপ্রেরিত ধর্ম হিসাবে ধর্মের পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই ধর্ম যখন মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং সময়, স্থান ও ভৌগোলিক-ঐতিহাসিক পর্যায় পেরিয়ে মানুষের দ্বারা প্রচারিত হতে থাকে, তখন তা আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যেতে থাকে। তখনই তাতে পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই বর্তমান পর্যায়ে এক মহান ব্যক্তি তাঁর যুগের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে ধর্ম পুনরুজ্জীবনে সংকল্পবদ্ধ হন এবং অনুসারীদের সাথে নিয়ে পুনরুজ্জীবন ঘটান।

ধর্মের পুনরুজ্জীবন বা দীনের তাজদীদের অর্থ হলো এর সংস্কার ও সংশোধন। কখনও কখনও দীনের সংস্কারক বা মুজাদ্দিদ প্রত্যক্ষ করেন যে, ধর্ম বলতে জনসাধারণ যা অনুসরণ করছে তার মধ্যে ধর্মের সাথে সংগতিহীন কিছু রসম-রেওয়াজ ও বিদেশী রীতিনীতি ঢুকে পড়েছে এবং প্রকৃত ধর্মীয় ভাবধারা ও চেতনা ঢাকা পড়ে গেছে। আর এসব ভুল-ভ্রান্তি ধর্মের সৌন্দর্যকে মলিন করে তুলছে। এমতাবস্থায় ধর্মের সংস্কারক ধর্মকে সঠিক রূপদানের প্রচেষ্টা শুরু করেন। তিনি পূর্ণ সংকল্প নিয়ে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন এবং কোন কোন বিষয় বাদ দিয়ে আর কোন কোন বিষয়কে পূর্ণ করতে পদক্ষেপ নিতে থাকেন।

কখনও কখনও দীনের কিছু কিছু দিক বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যায়। আর জনসাধারণও একটি বিশ্বাস বা ব্যবস্থার সকল দিক বা শিক্ষাকে একভাবে দেখে না বা ধারণা করে না। সামাজিক, মানসিক ও দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতার কারণে তারা কোন কোনটিকে বেশি পছন্দ করে এবং কোন কোনটিকে এড়িয়ে যায়। ধর্মের ব্যাপারেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না। তাই এর কিছু দিক অজানা হয়ে যায় ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে ধর্ম হয়ে যায় অপূর্ণাঙ্গ, অবহেলিত, বিকৃত ও পরিবর্তিত। দীনের সংস্কারক বা মুজাদ্দিদ এই পর্যায়ে ধর্মকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা শুরু করেন এবং ধর্মের বিলুপ্ত দিক ও বিষয়গুলো পুনরায় চালু করার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে এক কাজ হলো ধর্মকে পরিশুদ্ধ করা এবং অপর কাজ হলো এর পূর্ণাঙ্গ প্রবর্তন। ইমাম গাজ্জালী, মোহাম্মাদ আবদুহু, ফয়েজ কাশানী, শরিয়তী প্রমুখ এ উভয় কাজই সম্পাদন করেছেন। তাঁরা সকলেই শরীয়তের বাগানরক্ষক হিসাবে এর শুকনো ডালপালাগুলো কেটে ফেলেছেন এবং জীবন্ত অংশগুলোর লালন করেছেন।

অবশ্য কখনো কখনো উপরিউক্ত কারণসমূহ ছাড়াও দীনের পুনরুজ্জীবন আন্দোলন শুরু হতে পারে। এরকম সময়ে ব্যক্তি মনে করে না যে, দ্বীন বা ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা বিকৃত হয়েছে অথবা কোন বিদেশী রীতি-নীতি ধর্মের সৌন্দর্যকে বিনষ্ট করেছে। কিন্তু তিনি একথা মনে করেন যে, সমাজ বা সামগ্রিক জীবনে একটি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে যা ধর্মকে অকার্যকর করে ফেলেছে। ভাসাভাসা ভাবে মনে হতে পারে যে, দীনের কোথাও কোন পবিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃতি ঘটেনি, তবে প্রচলিত ব্যবস্থা দীনের কোন কোন চাহিদা পূরণের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে। দীনি পরিস্থিতির এই যে অসামর্থ্য ও অসহায়ত্ব কোন মহান মুজাদ্দিদ ব্যক্তির মনকে আলোড়িত করতে পারে এবং তখন তিনি দীনকে তার পূর্ণ ক্ষমতা ও কার্যকারিতায় ফিরিয়ে আনার জন্য প্রচেষ্টা শুরু করতে পারেন। এধরনের পর্যায়ে চিন্তাশীল ও প্রতিভাবান আলেমগণ তাঁদের দীনি জ্ঞান-ভাণ্ডারের ভিত্তিতে দীনের সমসাময়িক বিভিন্ন দিক ও বিভাগ ও রীতিনীতির ওপর গভীর ইজতিহাদ শুরু করেন এবং দীনকে অভ্যন্তরীরণভাবে পুনর্গঠন করেন।

অবশ্য এ প্রচেষ্টায় কেউ কেউ সহজতর পথ অনুসরণ করেন। বিশেষ করে যখন তাঁরা নিজের ধর্মের সামর্থ্য সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন, তখন উপযুক্ত হোক আর না হোক, অন্য বিশ্বাস বা ধর্ম থেকে এনে কিছু বিষয় জুড়ে দিয়ে নিজ ধর্মের অসামর্থ্যকে দূর করে সামর্থ্যবান করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত রাস্তায় ধর্মকে পরিশুদ্ধ ও সামর্থ্যবান করার স্বপ্ন পূরণ হবে না। এভাবে তাঁরা কেবল ধর্মে কিছু সংযোজনই করতে পারেন, তা উপযুক্ত হোক আর না হোক এবং মনে করতে থাকেন যে, তাঁরা ধর্মের জন্য অনেক কিছু করে ফেলেছেন। এটাই হলো আমাদের ধর্মীয় ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ।

তবে কখনও কখনও এমনও ঘটেছে যে, ধর্ম স্বয়ং অকার্যকর হয়ে যায়নি, কিন্তু তার অনুসারীরা অমনোযোগী বা উদ্যমহীন হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় দীনের মুজাদ্দিদ মুজতাহিদগণ ধর্মের অনুসারীদেরকে জাগ্রত ও পরিশুদ্ধ করেন এবং নতুন চেতনা ফিরিয়ে আনেন। এর একটি দৃষ্টান্ত সাইয়্যেদ জামাল উদ্দীন (আসাদাবাদী) আফগানীর আন্দোলন। এমন কখনই হতে পারে না যে, কোন ব্যক্তি দীনের অনুসারীদেরকে জাগ্রত ও সচেতন করার প্রচেষ্টা চালাবেন, অথচ তিনি নিজে দীনের নীতি-আদর্শ সম্পর্কে সম্যক অবহিত হবেন না। এ দুটি বিষয় একটি অপরটির পরিপূরক। তবে কখনও একটিকে এবং কখনও অপরটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়। সাইয়্যেদ জামাল-এর ছাত্রগণ ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনের ব্যাপারে সকল ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছেন, উস্তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ ব্যতিরেকে কেউ রাজনীতির অঙ্গনে ও রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হতে পারে না।

মরহুম ইমাম খোমেইনী (রহ.)ও দীনি চিন্তাধারার পুনরুজ্জীবন এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে জাগ্রত করার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দীর্ঘদিন থেকে আমাদের ধর্মীয় চিন্তাধারার জগতে কিছু সমস্যা বিরাজ করছে। এক শ্রেণির সূফি সম্প্রদায় প্রধানত এর জন্য দায়ী। এর একটি হলো যে, তাঁরা সকল ইসলামী শিক্ষার ব্যাপারে একটি রহস্যবাদী ব্যাখ্যা উপ¯হাপনের চেষ্টা করেন। দ্বিতীয়ত এসব রহস্যবাদী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমাদের ইজতিহাদের বিষয়সমূহকে বিঘ্নিত করেছে। ইমাম খোমেইনী এ দুটি দিক সম্পর্কে সদা সচেতন ছিলেন। কুরআন সম্পর্কে সূফিদের লেখা কিছু ব্যাখ্যা ও মন্তব্য পাঠ করলে দেখা যাবে যে, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন একজন দরবেশ এবং তিনি মক্কার খানকায় বসে তাঁর অনুসারীদেরকে কেবল সূফিবাদ বা রহস্যবাদের শিক্ষা দিয়েছেন। অবশ্য একথা সত্য যে, আমাদের সূফি সম্প্রদায় মহানবী (সা.)-কে একটি পবিত্রতার প্রতিচ্ছবি হিসাবেই উপস্থাপন করেছেন। ইসলামী শিক্ষায় কোন পরিবর্তন আনা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁরা আসলে তাঁদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ধর্মীয় শিক্ষার সর্বোত্তম ও উৎকৃষ্ট ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ইমাম খোমেইনীও কোন কোন ক্ষেত্রে সূফিবাদী চিন্তাধারা অনুসরণ করেছেন এবং এই চিন্তাধারা সম্পর্কে সতর্কতাও অবলম্বন করেছেন। সূফিবাদের ওপরে মহিউদ্দিন আল-আরাবীর লেখা গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘ফুসউস আল-হিকাম’ হচ্ছে একটি কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। ইমাম খোমেইনী তাঁর এই বই সম্পর্কে একটি মন্তব্য লেখেন। তাঁর অন্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে ‘সারহে দোয়ায়ে সাহর’, ‘মিসবাহুল হেদায়া’ ও ‘মেরাজুস সালেকীন’। ইমাম (রহ.) মাওলানা রুমীর প্রতি বেশি আকৃষ্ট ছিলেন। ইমাম খোমেইনীর একজন আত্মীয় বলেছেন, ইমাম খোমেইনী তুরস্কে থাকাকালে একবার রুমীর মাজার যিয়ারত করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তুর্কি আইন মোতাবেক ধর্মীয় পোশাক পরিধান করে সেখানে যেতে বাধা থাকায় তিনি মাজার যিয়ারত করতে পারেননি। পরে তিনি সে ব্যাপারে খুবই দুঃখ প্রকাশ করেন। এ থেকে বুঝা যায়, ইমাম খোমেইনী মওলানা রুমীর চিন্তাধারার ওপর কতখানি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। জানা গেছে, সোভিয়েট নেতা মিখাইল গরবাচেভের কাছে তিনি  যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে তাঁকে মহিউদ্দিন আল-আরাবীর মতো সূফি লেখকদের বই পাঠ করতে বলেছিলেন।

এসব ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইমাম খোমেইনী নিঃসন্দেহে একজন সূফিবাদী ছিলেন এবং সে কারণে তিনি সূফিদের জীবন-যাপন প্রণালিকে ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। তবে প্রাচীন সূফিদের চিন্তাধারার সাথে তাঁর চিন্তাধারায় পার্থক্য ছিল। তিনি মনে করতেন যে, সূফি হওয়ার জন্য একজনকে আরেকজন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রাচীন সূফিগণ তাঁদের কার্যকলাপের মাধ্যমে জনমনে যে ধাঁধাঁ সৃষ্টি করেছিলেন তারও তিনি সমাধান করেন।

১৯৭৯ সালে একদল আলেম ও ধর্মীয় নেতার উদ্দেশ্যে এক ভাষণে ইমাম খোমেইনী (রহ.) বলেছিলেন : ‘সূচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত ইসলাম অজানা রয়ে গেছে। এই সমাজের সদস্যদের অনেকেই এর সাথে যথাযথভাবে পরিচিত হয়নি। লোকেরা সব সময়ই এর অংশগুলোকে বাছাই করে নেয় এবং অন্য অংশগুলোকে  উপেক্ষা করে বা চাপা দিয়ে চলে। দীর্ঘকাল যাবৎ আমরা সূফিদের হাতে দুঃখভোগ করছি। ইসলামও তাদের দ্বারা কাঠিন্যের সম্মুখীন হয়েছে। তারা জনসাধারণকে ভালোভাবেই সেবা করেছে, কিন্তু সবকিছুই অন্যদিকে ফিরিয়ে দিয়েছে। মোল্লা আবদুর রাজ্জাক প্রণীত তাফসীরে কুরআন এর একটি উদাহরণ। তিনি একজন বিরাট আলেম ছিলেন বটে, কিন্তু সবকিছুই ব্যাখ্যা করেছেন একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে। আবারো আমরা অপর একটি দলের শিকার হয়েছি, যারা একটি বিপরীত ধাঁচে আমাদের আধ্যাত্মিকতা পরিবর্তন করে দিয়েছে।’

এক্ষেত্রে ইমাম খোমেইনীর চিন্তাধারার এটি একটি সুন্দর উদাহরণ যে, প্রাচীন সূফিদের সব চিন্তাকেই তিনি সত্য বলে মেনে নেননি।

কবি হাফিজের মতো ব্যক্তিত্ববর্গের উদাহরণ সামনে রেখে তাঁদের চিন্তাধারার প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ সত্ত্বেও তাঁদের গ্রন্থরাজির ওপর সমালোচনা করেছেন এবং তাঁদের কিছু কিছু সংকীর্ণ মানসিকতার ব্যাপারে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, প্রাচীন সূফিদের চিন্তাধারা শতকরা একশ ভাগ সঠিক নয়। বর্তমান সময়ে আমাদের চিন্তা করা আবশ্যক যে, তাঁরা যে পথ ও মূল্যবোধ উপস্থাপন করে গেছেন, তার সাথে কিছু ভালো দিকও রয়েছে। আর এই মূল্যবোধকে সংরক্ষণের মাধ্যমে আমরা নতুন চেতনায় শাণিত একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পারি। এক কথায়, বিশেষ বিশেষ জামানায় এক ব্যক্তিকে একাধারে সূফি ও আইনজ্ঞ হতে হবে। যাঁরা সূফিবাদী চিন্তা-চেতনার আলোকে জনসাধারণ ও তাদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন তাঁরা তাঁদেরকে শাসনও করতে পারেন।  তবে ক্ষমতা ও সম্পদের জন্য তাঁদের ভালোবাসা অর্জন ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর এভাবেই দুনিয়া থেকে দোযখের আগুন নিভিয়ে ফেলা যাবে।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি আরো সুন্দর আলোকপাত করেছেন। এতে বলা হয়েছে : ‘যা অনুমোদিত নয় তা হলো শয়তানি নির্যাতনমূলক ও স্বৈরাচারী সরকার। সম্পদ কুক্ষিগত করা, ক্ষমতালিপ্সা ও অত্যাচারী কার্যকলাপের প্রতি ঝোঁক অর্থাৎ এক কথায় এসব পার্থিব বিষয় মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।’

‘যে স্বৈরাচারী পুঁজিবাদ নির্যাতিত ও অবহেলিত মানুষকে বঞ্চিত করে, ইসলাম তা অনুমোদন করে না। উপরন্তু পবিত্র কিতাব ও হাদিসসমূহে এর তীব্র নিন্দা করা হয়েছে এবং পুঁজিবাদ বিরোধিতাকে সমাজিক সুবিচার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।’

‘ইসলাম ব্যক্তি মালিকানাকে অস্বীকারকারী এবং কঠোর ও স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে সামষ্টিক মালিকানা প্রতিষ্ঠাকারী মার্কসবাদী ও লেনিনবাদী সরকারবিরোধী।’

পরিশেষে, ইমাম খোমেইনী লিখিত একটি মোনাজাতের উল্লেখ বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করে দেবে। ইমাম খোমেইনী ৩৮ বা ৪০ বছর বয়সে তাঁর ‘মেরাজুস সালেকীন ওয়া সাল্লাতুল আরেফীন’ গ্রন্থের শেষদিকে লিখেছেন : ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে একটি সমৃদ্ধ সমাপ্তি দান কর। আমাদেরকে অন্তর্নিহিত শক্তি ও আল্লাহকে পাওয়ার শিক্ষা দান কর। আমাদের অন্তরে বিরাজমান শয়তানের হাত কেটে দাও। আমাদের অন্তরে তোমার ভালোবাসার অংশ দাও। আমাদের অন্তরে যেন পার্থিব বিষয়ের পরিবর্তে তোমার চিন্তা বিরাজ করে। আমাদের অন্তরকে তোমার ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দাও। আমাদের অবশিষ্ট জীবন দিয়ে অতীত জীবনের ক্ষতি পূরণ করার তৌফিক দাও। তুমিই সকল দানের উৎস।’

(নিউজলেটার, জুন ১৯৯১)