রবিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

কারবালার ঘটনাপ্রবাহের ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা : একটি পর্যালোচনা

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ১৫, ২০১৮ 

মাহদী মাহমুদ ঃ

যেকোনো সচেতন এবং বিজ্ঞ শ্রোতা কিংবা পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, কীভাবে এত বিস্তারিতভাবে আমাদের মাঝে কারবালার ঘটনার বিবরণ এসে পৌঁছেছে। এ সম্পর্কিত বিদ্যমান বিভিন্নমুখী বর্ণনাসমূহের সবই কি সত্যি? পাশাপাশি ভিন্ন মতাবলম্বীদের কাছ থেকেও কারবালার ইতিহাসের ব্যাপারে সত্যমিথ্যার মোড়কে সংশয় সৃষ্টির প্রয়াস চালানো হয়েছে।
প্রথম প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়, ইতিহাসের অনেক ঘটনার বর্ণনার মতোই কারবালার ইতিহাসের নামে যা বর্ণিত হয়েছে তার সবই যে সত্য এরকম কোনো কথা নেই। সত্তরের দশকে ইরানের বিখ্যাত বিপ্লবী আলেম আয়াতুল্লাহ মোর্তাজা মোতাহহারী তাঁর এক গবেষণাধর্মী বক্তৃতামালায় কারবালার ইতিহাসের নামে মিম্বরগুলো থেকে যা বলা হয়ে থাকে সেগুলোর কতক বর্ণনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন এবং যুক্তি, বুদ্ধি ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, এককথায় বলতে গেলে, হিস্টরিওগ্রাফিক আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, কারবালার মর্ম¯পর্শী বর্ণনার নামে মিম্বরগুলো থেকে কিছু কিছু কল্পকথাও সংযুক্ত হয়েছে।
মুহররম উপলক্ষে আহলে বাইতের অনুসারীদের মধ্যে মুহররম মাসে ১০ থেকে ১৫ দিনব্যাপী শোক মজলিশের আয়োজনের রীতি আছে। সেগুলোতে ‘মাসায়েব’ নামে একটি পর্ব থাকে, যেখানে ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীসাথিদের মর্ম¯পর্শী শাহাদাতের বর্ণনা এবং শাহাদাত-পরবর্তী তাঁর পরিবার-পরিজনের মজলুমিয়াত বর্ণনা করা হয়Ñ যা শুনে শ্রোতারা ক্রন্দন করে থাকেন। এই মাসায়েব পাঠ করেন একজন আলেম বা যাকের। আলেমরা ইসলামি শাস্ত্রগুলোর ব্যাপারে গভীরভাবে পড়ালেখা করেছেন, অন্যদিকে যাকেররা মূলত বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে বা অন্য কোনো আলেমের মুখে শুনে শ্রোতাদের সামনে কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনাবলি বর্ণনা করেন।
কারবালায় ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের কথা আগাম জানতেন মহানবী (সা.)। আর এই হৃদয়বিদারক শাহাদাতের স্মরণে স্বয়ং নবীজী ক্রন্দন করেছেন। কারবালার শহীদদের স্মরণ করে শোক প্রকাশ, ক্রন্দন করার বিরাট ফযিলত রেওয়ায়াতসমূহে বর্ণিত আছে। আর এই শোকের স্মরণ করে আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতি আকর্ষণ ও শক্তি সঞ্চয় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশেষজ্ঞ আলেমগণের মতে, কারবালার প্রকৃত ও মূল ঘটনাসমূহে সাধারণ বর্ণনাই অত্যন্ত মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক, সচেতনতা সৃষ্টিকারী ও শোক উদ্রেককারী ক্রন্দনময়। এর জন্য অতিরিক্ত কোন কাহিনী বা উপকাহিনী সংযোজন করার প্রয়োজন নেই। যদিও কারবালার শহীদদের স্মরণে শোকানুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করতে, মানুষের ক্রন্দনের পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য যাকেরদের একাংশ কারবালার প্রকৃত ঘটনার সাথে আরো কিছু কল্পিত অনুভূতি ও কাহিনী তুলে ধরেন। প্রাসঙ্গিকভাবে উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, প্রখ্যাত সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের লেখা সুপাঠ্য, কিন্তু সর্বৈব আজগুবি, কাল্পনিক এবং ইমাম হোসাইনের সংগ্রামের দর্শনের প্রতি অবমাননাকর উপন্যাস ‘বিষাদসিন্ধু’র কথা। তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মীর মশাররফ হোসেনের বহু আগে থেকেই বাংলার সাহিত্য, কবিতা, জারী-মর্সিয়া প্রভৃতি শোকগাথাগুলোতে কিছু কিছু উপকাহিনী উপস্থাপন করা হয়েছে।
শৃগাল যেমন ওঁত পেতে থাকে তার শিকারের এক নিমেষের অন্যমনস্কতার জন্য, তেমনিভাবে আহলে বাইতের বিরুদ্ধবাদীরাও কারবালার প্রকৃত ও সতত স্বীকৃত মূল ঘটনাপ্রবাহ ও এর ঐতিহাসিক বর্ণনা ও সেই ইতিহাসকে কেন্দ্র করে এসকল অতিরঞ্জনের সুযোগ নিয়ে, বলতে গেলে, কারবালার সমগ্র ঐতিহাসিক বাস্তবতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে। বিশেষ করে কারবালার ইতিহাসের বিপ্লবী উপাদানগুলোকে শতভাগ অস্বীকার করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।
আহলে বাইতপন্থিদের প্রতি এই গোষ্ঠীটির আরোপিত সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে যে, কারবালার সংগ্রামের যে বিপ্লবী এবং মর্ম¯পর্শী বর্ণনা আহলে বাইতপন্থিরা প্রচার করে সেগুলো নাকি প্রাথমিকভাবে কেবল ‘আবু মেখনাফ লুত বিন ইয়াহিয়া’ নামের এক ব্যক্তি থেকেই এসেছে। তাদের মতে, আবু মেখনাফ একজন অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তি এবং তাঁর সংকলিত কারবালার ইতিহাস নাকি তাঁর ‘ঊর্বর মস্তিষ্কের ফসল’।
এবার আমরা নিবন্ধের মূলভাগে প্রবেশ করব যেখানে আমরা উপরিউক্ত অভিযোগের ব্যাপারে আলোচনা করব, কারবালার বিপ্লবী ইতিহাসের নির্ভরযোগ্যতা নিরূপণের চেষ্টা করব এবং দেখতে চেষ্টা করব কারবালার বিপ্লবী ইতিহাসের বিরুদ্ধবাদীরা তাঁদের সামাজিক এবং স্বার্থগত প্রয়োজনে কীভাবে কারবালার ইতিহাসের নতুন একটি ধারা সৃষ্টি করেছেন।
প্রথমে আমরা দেখব, কারবালার প্রান্তরে যে নৃশংস হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছিল কীভাবে তার ইতিহাস সেই কারবালার প্রান্তর থেকে বহির্বিশ্বে ও প্রজন্মান্তরে প্রচারিত হয়েছেÑ
১. আবু মেখনাফ এবং মাকতাল : আবু মেখনাফ ছিলেন কুফার অধিবাসী ও আয্দ গোত্রের গোত্রপতি। তাঁর পিতার নাম ইয়াহিয়া। তিনি ইমাম আলী (আ.)-এর নেতৃত্বে বিশ্বস্ততার সাথে প্রায় প্রতিটি যুদ্ধ অংশগ্রহণ করেন। আবু মেখনাফের বন্ধু ছিলেন বিখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক হিশাম আল কালবির পিতা মুহাম্মদ ইবনে সাইদ আল কালবি। আবু মেখনাফ বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে জারির তাবারির ইতিহাস বর্ণনার একজন মৌলিক এবং প্রধান তথ্যসূত্র। ইসলামের ইতিহাসের বিতর্কিত সময়সমূহের অত্যন্ত বিষদ বর্ণনাগ্রন্থ রচনা করেন তিনি। তিনি অকুস্থলে থাকা ব্যক্তিদের সাথে সরাসরি সাক্ষাতের মাধ্যমে তাঁর তথ্যসমূহ জোগাড় করতেন। সেসকল রচনার মধ্যে রয়েছে ‘কিতাব আল সাকিফা’, ‘কিতাব আল রিদ্দা’, ‘কিতাব আল জামাল’, ‘কিতাব আল শুরা’, ‘কিতাব আল সিফফিন’ প্রভৃতি। বালাজুরি, ইবনে আসাকির, ইবনে আল কালবি, ইবনে আসিম, আল ওয়াকিদি, আবুল ফিদা, তাবারীর মত আহলে সুন্নাহর প্রখ্যাত ঐতিহাসিকগণ পরবর্তীকালে আবু মেখনাফের রেখে যাওয়া কিতাবগুলো থেকে তাঁদের ইতিহাস গ্রন্থগুলোকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। যদিও অধিকাংশ সুন্নি ঐতিহাসিকের মতে আবু মেখনাফ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, তদুপরি যাহাবি, ইয়াহিয়া ইবনে মুইন, দারে কুতনি, ইবনে কাসির, ইবনে তাইমিয়া এবং এই শ্রেণির অপরাপর ইতিহাসবিদ ও ইতিহাসবিশারদের নিকটে আবু মেখনাফ ‘শিয়া দোষে দুষ্ট’। তাই তিনি অনির্ভরযোগ্য! এই শ্রেণিই মূলত কারবালার ইতিহাসের ভিন্নতম একটি ধারা রচনা করেছেন যার ব্যাপারে আমরা পরে আলোচনা করব। উল্লেখ্য, আধুনিককালের কথিত ‘সালাফি’ ধারাটিও ওই শ্রেণিটির বিশ্বাস ধারণ করে। যার মধ্যে ইয়াসির কাজি প্রমুখ বিজ্ঞ আলোচকও অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু তাঁরা ভুলে যান যে, যদি আবু মেখনাফ শিয়া হয়েও থাকেন, তবুও বলতে হয়, বুখারি ও মুসলিম শরীফসহ প্রসিদ্ধ সুন্নি হাদিস কিতাবসমূহে অন্তত ১০০ জন শিয়া রাবী থেকে হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে এবং তাঁদেরকে রিজালশাস্ত্রে ‘নির্ভরযোগ্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর বিপরীতে বলা যায়, বিখ্যাত সুন্নি হাদিসবিশারদ আল মিজ্জি তাঁর ‘তাহযিব আল কামাল’ এ উমর ইবনে সাদ, যে ছিল কারবালায় ইয়াযীদের ত্রিশ হাজার সৈন্যের সর্বাধিনায়ক এবং যার প্রত্যক্ষ আদেশে কারবালায় ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তাঁর পরিজনকে হত্যা করা হয় এবং নারীদের পর্দার চাদর ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং দড়িতে বেঁধে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়, তার ব্যাপারে আল ইজিলি নামক আরেকজন সুন্নি হাদিসবিশারদের মত গ্রহণ করেন, যেটি ছিল এমনÑ ‘উমর ইবনে সাদ হোসাইনের হত্যাকারী এবং একজন তাবেঈ এবং একজন নির্ভরযোগ্য হাদিস বর্ণনাকারী।’(?)
তাবারী ‘ইমাম হোসাইনের আন্দোলন’ শীর্ষক অধ্যায়টি স¤পূর্ণভাবে আবু মেখনাফের ‘মাকতাল’ গ্রন্থ থেকে গ্রহণ করেছেন। আর আবু মেখনাফ কারবালার প্রান্তরের বিস্তারিত বর্ণনা গ্রহণ করেছেন ইয়াহিয়া বিন হানি বিন উরওয়া, যুহাইর বিন আবদুর রহমান, সাবিত বিন হুবায়ের, মুহাম্মাদ ইবনে কায়েস, হারিস ইবনে আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবনে আসিম, যাহ্হাক ইবনে আবদুল্লাহ, আবু যানাব আল কালবি, আদি বিন হুরমালা, মুহাম্মাদ ইবনে কায়েস প্রমুখ ইয়াযীদ বাহিনীর সৈন্যদের নিকট থেকে, যারা কারবালার ময়দানে থেকে সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করেছিল।
আবু মেখনাফের ‘মাকতাল’ প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হিশাম আল কালবি তাঁর লেখনির মধ্যে সংরক্ষণ করেন। হতে পারে, সেখান থেকেই পরে তাবারী ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের আবু মেখনাফ রচিত অধ্যায়টি গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, আবু মেখনাফ ছিলেন ইমাম যাইনুল আবেদীন (আ.), তাঁর পুত্র ইমাম বাকের (আ.) ও তাঁর পুত্র ইমাম জাফর সাদেক (আ.)-এর সমসাময়িক। যদি আবু মেখনাফ কারবালার ইতিহাস রচনায় কোন অতিরঞ্জন করতেন, তবে অবশ্যই নবীবংশের ইমামগণ তাঁর প্রতি কঠোর হতেন, তাঁকে সংশোধন করে দিতেন। অন্যদিকে এই তিনজন ইমাম এবং তাঁদের বংশের নারিগণ নিয়মিতভাবে শোক মজলিশের আয়োজন করতেন এবং কারবালার ঘটনা বিবৃত করতেন (উল্লেখ্য, ইমাম যাইনুল আবেদীন কারবালায় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ইমাম পরিবারের নারীরা প্রায় সকলেই কারবালা থেকে মদিনায় ফিরে এসেছিলেন)। যদি আবু মেখনাফ ইয়াযীদ বাহিনীর সৈন্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে ইমামদের বর্ণনার গরমিল দেখতেন তবে অবশ্যই তিনি ইমামদের মতটাই গ্রহণ করতেন।
আমরা এ প্রবন্ধে বার বার ‘মাকতাল’ শব্দটি উল্লেখ করেছি। ‘মাকতাল’ শব্দের প্রচলিত অর্থ ‘কতল করার স্থান’, কিন্তু হোসাইনি আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ‘শাহাদাতের ঘটনাবলি’ অর্থে ব্যবহৃত হয়।Ñ অুড়ঁন, গ. (১৯৮৭), জবফবসঢ়ঃরাব ংঁভভবৎরহম রহ ওংষধস: অ ংঃঁফু ড়ভ ঃযব ফবাড়ঃরড়হধষ ধংঢ়বপঃং ড়ভ অংযঁৎধ রহ ঞবিষাবৎ ঝযর’রংস (ঞযব ঐধমঁব: গড়ঁঃড়হ)
উল্লেখ্য,বিরুদ্ধবাদীরা যেরূপ বলে থাকে যে, আবু মেখনাফের ‘মাকতালু ইমাম হোসাইন’ কারবালার ইতিহাসের বিপ্লবী ও মর্ম¯পর্শী বর্ণনার সর্বপ্রথম রচনা, কথাটি সত্য নয়; বরং ইতঃপূর্বে ইমাম আলী (আ.)-এর বিশ্বস্ত ও বিখ্যাত সাহাবি আসবাগ বিন নুবাতা এবং আবু মেখনাফের প্রায় সমসাময়িক সময়ে যাবের বিন ইয়াযীদ আল জুফি ইমাম হোসাইনের ‘মাকতাল’ কিতাব রচনা করেন। আবু মেখনাফের ‘মাকতাল’ আমাদের হাতে আজ অবধি আংশিক ভাবে থাকলেও অপর দুজনেরটা নেই। কিন্তু তাঁদের ঠিক পরের যুগের ‘মাকতাল’ লেখকগণ ঐসকল ‘মাকতাল’ থেকেও সাহায্য গ্রহণ
করেছেন।
পরবর্তী সময়ে আরো অনেক ঐতিহাসিক অনেক ‘মাকতাল’ লিখেছেন, যাঁদের মধ্যে শিয়া এবং সুন্নি উভয় মতাবলম্বীই রয়েছেন। যেমন, ইবনে সাদ এর ‘মাকতাল’ (মৃত্যু ২৩০ হিজরি), বালাজুরির ‘মাকতাল’ (২৮৩ হিজরি), দিনাওয়ারির ‘মাকতাল’, ইবনে আসামের (৩১৪ হিজরি) ‘মাকতাল’, ইবনে তাউসের ‘মাকতাল’। এছাড়াও প্রাথমিক যুগেই ওয়াকিদি, মুয়াম্মার আল মুসান্না, নাস্র বিন মুযাহাম, ইয়াকুবি প্রমুখ ইমাম হোসাইনের মাকতাল রচনা করেন। তবে তাঁদের মাকতালসমূহ প্রথমোক্তগণের মত আজ আর অস্তিত্বশীল নয়।
তবে সবচেয়ে বিখ্যাত ‘মাকতাল’টির সংকলকের নাম শেখ সাদুক (মৃত্যু ৩৩১ হিজরি)। যদিও আজ আর তাঁর ‘মাকতাল’টি সরাসরি পাওয়া যায় না। তবে তাঁর ‘মাকতাল’ থেকে বিভিন্ন কিতাবে কারবালার ইতিহাস এত বেশি উদ্ধৃত হয়েছে যে, সেগুলো কেটে কেটে নিয়ে ‘মাকতালু শেখ সাদুক’ এর বিরাটাংশ পুনরুদ্ধার করা গিয়েছে। এই ‘মাকতাল’টির বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে, শেখ সাদুক সরাসরি মাসুম ইমামগণ তথা রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইত-বংশধরগণের মুখনিঃসৃত বর্ণনা থেকে তাঁর ‘মাকতাল’টি রচনা করেন। (ঞযব গধয়ঃধষ এবহৎব: অ চৎবষরসরহধৎু ওহয়ঁরৎু ধহফ ঞুঢ়ড়ষড়মু; চৎড়ভ. উৎ. গঁযধসসধফ-জবুধ ঋধশযৎ-জড়যধহর উবঢ়ধৎঃসবহঃ ড়ভ ঊহমষরংয, টহরাবৎংরঃু ড়ভ ছড়স, ছড়স, ওৎধহ)
এভাবে প্রমাণিত হয় যে, আহলে বাইতের অনুসারীরা ইমাম হোসাইনের সংগ্রামের বিপ্লবী বর্ণনা কেবল আবু মেখনাফ থেকে বর্ননা করেন নি; বরং প্রত্যেক যুগের আহলে বাইতপন্থি ঐতিহাসিকগণ আগের যুগের ‘মাকতাল’ এর বর্ণনা রাসূল (সা.)-এর সুযোগ্য বংশধর এবং তাঁদের শুভাকাক্সক্ষীদের মতামতের ভিত্তিতে রচনা করেছেন।
২. পরবর্তী যুগের মাকতাল লেখক, ইতিহাসবিদগণ সরাসরি আহলে বাইতের নারীদের কাছ থেকে ও কারবালায় নবীপরিবারের বাইরেরও যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের পরিবারের নারী সদস্যগণ, যাঁরা কারবালায় উপস্থিত ছিলেন তাঁদের কাছ থেকে বর্ণনার বরাত দিয়ে কারবালার ঘটনা উল্লেখ করছেন। যেমন, যুহাইর বিন কাইনের স্ত্রী দাইলামের কাছ থেকে ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে ইমামের শাহাদাতের পরে কারবালার ময়দানে ইমাম-পরিবারের দুর্দশা এবং সামগ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতির মর্মন্তুদ বর্ণনা পাওয়া যায়। অন্যদিকে ইমাম হোসাইনের বোন যায়নাব এর নিকট থেকে ঠিক ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের সময়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম আলীর কন্যা হযরত যায়নাবই সেই নারী, যিনি কারবালার ময়দানে ইমাম হোসাইন ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাত কিংবা তার পরের মহামুসিবতের সমগ্রটা নিকটতম দূরত্ব থেকে প্রত্যক্ষ করেন। কারবালার ঘটনার পর হযরত যায়নাব যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি প্রতিনিয়ত কারবালার ঘটনা স্মরণ করে শোক মজলিশের আয়োজন করতেন এবং কারবালার ময়দানের ঘটনাবলি বিবৃত করতেন।
অনুরূপভাবে কারবালার ময়দানে বেঁচে থাকা ইমাম হোসাইনের পুত্র ইমাম যাইনুল আবেদীন (আ.) থেকে সরাসরি মাকতাল লেখকদের নিকট, আবার ইমাম যাইনুল আবেদীন থেকে নবীবংশের পরবর্তী ইমামদের নিকট কারবালার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
কারবালায় ইমাম হাসানের ছয়জন সন্তান শহীদ হন, অপর একজন হাসান আল মুসান্না আহত অবস্থায় বেঁচে যান এবং কারবালার ঘটনার পর বেঁচে ছিলেন। তাঁর থেকেও কারবালার ইতিহাস জনসাধারণের নিকট প্রকাশিত হয়।
৩. কারবালার ময়দানে উপস্থিত ছিল ইয়াযীদের নিয়োজিত বেতনভুক্ত প্রতিবেদক হামিদ বিন মুসলিম। কারবালার প্রতিটি ঘটনা, প্রত্যেকজন শহীদের যুদ্ধের ধরন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নির্মম অবস্থা সে অত্যন্ত ঠা-া মাথায় তাৎক্ষণিকভাবে লিপিবদ্ধ করে ফেলে। যেমন,ইমামের শরীরে ঠিক কতটি তীর বিদ্ধ হয়েছিল কিংবা কে ইমাম হোসাইনকে হত্যা করেছিল। ইমাম হোসাইনকে কে হত্যা করেছিলÑ শিমর বিন জিল জাওশান নাকি সিনান বিন আনাস, এই নিয়ে বিতর্ক দেখা যায়। হামিদ বিন মুসলিম এই বিতর্কের কারণটিও ব্যাখ্যা করে। সে বলে, ইমাম হোসাইনের জীবনের শেষ মুহূর্তে যখন তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলেন তখন তাঁর শরীরে এত বেশি তীর বিদ্ধ হয়েছিল যে, তাঁকে দেখে সজারুর কথা মনে হবে। এমতাবস্থায়, ইয়াযীদ বাহিনীর সব সৈন্য সম্ভ্রমে দূরে সরে গেল। কেউই ইমাম হোসাইনকে হত্যা করার অপরাধের ভাগী হতে চাচ্ছিল না। কিন্তু এই অবস্থায় শিমর এবং সিনান মিলে হোসাইনের দেহকে আঘাত করতে লাগলো। এমনকি তারা ইমামের পবিত্র দেহ মোবারকের বা পাঁজরের ওপরে উঠে লাফাতে লাগল। এরই মধ্যে এবং মরুভূমির ধুলা-ঝাপসা বাতাসে দু’জনের মধ্যে কে শেষ আঘাতটা হেনে ইমাম হোসাইনের শরীর থেকে তাঁর পবিত্র মাথা বিচ্ছিন্ন করলো তা আর বোঝা সম্ভব হলো না।
কারবালার ঘটনার পর কিছুদিনের মধ্যেই হামিদ বিন মুসলিম প্রচ- অনুতপ্ত হলো, কিন্তু কারবালার বিভীষিকা তার মন-মস্তিষ্ক থেকে গেল না, ধীরে ধীরে স্মৃতিলুপ্ত, অপ্রকৃতস্থ হয়ে পড়ল সে।
৪. কারবালার ঘটনার কিছুদিন পর কুফার অধিবাসী মুখতার বিন সাকাফির নেতৃত্বে আহলে বাইতপন্থিরা বিদ্রোহ করেন। এই বিদ্রোহীরা সাময়িকভাবে সরকার গঠন করে মুখতারের নেতৃত্বে। অতঃপর কারবালার ঘটনায় সরাসরি জড়িত প্রত্যেক জালেমকে ধরে এনে তাদের মুখ থেকে প্রকাশ্য জনসমাবেশে কারবালায় তাদের জুলুমের কাহিনী শোনেন এবং তাদেরকে হত্যা করেন। মুখতারের এই কর্মকা-ের মাধ্যমেও কারবালার ইতিহাসের ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
৫. আহলে বাইত তথা রাসূল (সা.)-এর অষ্টম বংশধর ইমাম রেযা (আ.)-এর মজলিশে দেবেল বিন আলী আল খুযায়ী থেকে অনেকগুলো কবিতা পাওয়া যায়, যেগুলোতে কারবালার বিভীষিকা ও মাজলুমিয়াত ফুটে উঠেছে। এই কবিতাগুলো দেবেল ইমাম রেযার সামনে পাঠ করে শুনাতেন, ইমাম রেযা যেহেতু তাতে আপত্তি করতেন না, তাই ধরে নেয়া যায়, মাকতালের সাথে স¤পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ এই কবিতাগুলো প্রকারান্তরে নির্ভরযোগ্যভাবে কারবালার মজলুমিয়াতের সাক্ষ্য বহন করছে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, কারবালার ইতিহাসের ব্যাপারে কেবল আবু মেখনাফ নয়; বরং আরো বহু সূত্র থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্যাদি ও বিবরণ পাওয়া গিয়েছে যেগুলো একত্র করে নিরীক্ষণ এবং পুনঃনিরীক্ষণের (পযবপশ ধহফ পৎড়ংং পযবপশ) এর মাধ্যমে আধুনিক লেখকগণ কারবালার ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিক রূপ দান করেছেন। এ প্রসঙ্গে শেখ আব্বাস কুম্মি রচিত ‘নাফাসুল মাহমুম’ গ্রন্থটির কথা বলা যায়। এই গ্রন্থটিতে বলতে গেলে লেখক আবু মেখনাফের থেকে কারবালার ঘটনা ততটা বর্ণনা করেন নি; বরং শেখ মুফিদের ‘আল ইরশাদ’, ইবনে তাউসের ‘লুহুফ’, ইবনে আসিরের ‘তারিখে কামিল’, আবুল ফারায ইসফাহানি যায়েদির ‘মাকবাতিলুল তালিবিঈন’, মাসউদির ‘মুরুজুয যাহাব’, সিবতে ইবনে জাওযির ‘তাযকিরাতুল খাওয়াস’, মুহাম্মাদ বিন তালহার ‘মাতালিবুস সাউল’, ইবনে সাব্বাগ মালিকির ‘ফুসুলুল মুহিম্মাহ’, ঈসা ইরবিলির ‘কাশফুল গুম্মাহ’, ইবনে আব্দ রাব্বাহ এর ‘ইকদুল ফারিদ’, তাবারসির ‘আল ইহতিজাজ’, ইবনে শাহর আশোবের ‘মানাকিবে আলে আবি তালিব’ প্রমুখ গ্রন্থ থেকে কারবালার প্রায় সবচেয়ে প্রাঞ্জল, নির্ভরযোগ্য, যুক্তিভিত্তিক এবং পরিষ্কার ঘটনাপ্রবাহ রচনা করেছেন। অর্থাৎ আহলে বাইতপন্থিরা কখনোই কারবালার ইতিহাসের ক্ষেত্রে আবু মেখনাফের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল নন।
এখন সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করতে চাই যে, আহলে বাইপন্থিদের বিরুদ্ধবাদীরা ইমাম হোসাইনের আন্দোলনের বিপ্লবী ও মর্ম¯পর্শী ইতিহাসের বিপরীতে নতুন ধারার ইতিহাসের মাধ্যমে কোন্ স্বার্থসিদ্ধি করতে চাচ্ছেন?
এই ধারার ইতিহাসের রচয়িতা মূলত ইবনে কাসির এবং তাঁর গুরু এবং শিষ্যগণ। হালের ইয়াসির কাজিও একই মতবাদ প্রচারের প্রয়াস চালাচ্ছেন। তাঁরা বলতে চান, ইমাম হোসাইনের ‘আবেগ তাঁর যুক্তিবোধ’কে তমসাচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তাঁদের মতে, ইমাম হোসাইন (আ.) সেই যুগে যিনি তাঁর চেয়েও জ্ঞানী ছিলেন সেই আবদুল্লাহ ইবনে উমরসহ প্রত্যেক জ্ঞানী-গুণী সাহাবির কথা অমান্য করে কুফাবাসীদের মাধ্যমে মুসলিম-জাহানের ক্ষমতার মসনদে আরোহণের চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হন। অন্যদিকে জ্ঞানী সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উমর এই সময়ে ‘না ইয়াযীদ, না হোসাইন’ এইরকম মধ্যপন্থা অবলম্বন করে তাঁর ধীশক্তির প্রমাণ দেন। মুসলিম উম্মাহ ইতিমধ্যেই যথেষ্ট রক্ত ঝরিয়েছে। ইমাম হোসাইনের উচিত ছিল রাজনীতির অঙ্গনে না ঢুকে বরং ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজি থাকা। এইসব দুনিয়াবি হানাহানি, ঝগড়া-বিবাদের চেয়ে আল্লাহর যিক্র করা শ্রেয়তর। আর ইমাম হোসাইনকে হত্যার পেছনে সিংহভাগ দায় কুফাবাসীদের, যার জন্য অনুতপ্ত হয়ে ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের পর তারা তাঁর খুনের বদলা নিতে বিদ্রোহ করে এবং তাদের নাম ছিল ‘তাওওয়াবুন’Ñ যারা আজ অবধি প্রতি মুহররমে ক্রন্দন আর মাতমের মাধ্যমে নিজেদের অনুতাপ প্রকাশ করে। (ইউটিউবে দেখুন :ঞযব গধংংধপৎব ড়ভ কধৎনধষধ:অ ঐরংঃড়ৎরপধষ অহধষুংরং-উৎ. ণধংরৎ ছধফযর)
অর্থাৎ তাঁদের কথার সারকথা এটাই যে, ১. সমাজে জুলুম-নির্যাতন, অশ্লীলতা, অনাচার, পুঁজিবাদ প্রকট আকার ধারণ করুক কিংবা ফাসেক শাসক হালালকে হারাম আর হারামকে হালাল করুক তবুও এর প্রতিবাদ জানানো যাবে না। সেটা করলে রাজনীতি করা হবে। উল্লেখ্য, ইমাম হোসাইন (আ.) মদীনা থেকে মক্কায়, মক্কা থেকে কুফায় যাত্রাপথে বিভিন্ন মঞ্জিলে বক্তব্যে বার বার সু¯পষ্টভাবে বলেছেন যে, তিনি ক্ষমতার লোভে নয়; বরং ‘সৎ কাজের নির্দেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা’র জন্য আন্দোলনে নামছেন। তিনি তাঁর নানার দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সংগ্রাম করছেন। (২) তাঁদের মতে, হক আর বাতিলের লড়াইয়ের সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করাটা অধিক জ্ঞানের লক্ষণ। এমনকি মুসলিম জাহানের শাসক যদি রাসূল (সা.)-এর মিম্বরে বসে তাঁর রেসালাতে অবিশ্বাস করে, ব্যাঙ্গ-বিদ্রƒপ করে, তাও সেটার বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়িয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে! উল্লেখ্য, ইয়াযীদ বলেছিল, ‘বনি হাশেম ক্ষমতা নিয়ে খেলছে। না কোন নির্দেশ এসেছে আল্লাহ থেকে, আর না কোন ওহি নাযিল হয়েছে।’ (তারিখে তাবারী, আরবি খ- ১৩, পৃষ্ঠা ২১৭৪।
তাজকিরাতুল খাওয়াস সিবতে ইবনে আল জাওযি, পৃষ্ঠা ২৬১) (৩) আহলে বাইত এর মর্যাদা কেবল বংশীয়। তাঁদের আর কোন বিশেষ দায়িত্ব নেই। সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। আহলে বাইতের শান আগের পারস্য কিংবা গ্রিক বংশীয় অভিজাততন্ত্রের মত কিংবা বর্তমানের নখদন্তহীন ব্রিটিশ রাজপরিবারের মত। এমনকি রাসূল (সা.)-এর বংশধর হিসেবে তাঁর আনীত দ্বীনের হেফাযতে কিয়াম করাও তাঁদের ভুল, অনভিজ্ঞতা এবং বোকামি। (৪) কুফাবাসী আহলে বাইতপন্থিদেরকে তাঁরা সামগ্রিকভাবে দায়ী করেছেন। তাঁরা যেন ভুলেই গিয়েছেন যে, এই কুফাবাসীদের মধ্যে থেকেই হানি বিন উরওয়া, মাইসাম বিন তাম্মারসহ আরো অনেকেই ইমাম হোসাইন ও আহলে বাইতের সম্মান রক্ষার জন্য শাহাদাত বরণ করেন। মুসলিম বিন আওসাজা, হাবিব ইবনে মাজাহের, বুরায়র ইবনে খুজায়ের আল হামেদানি প্রমুখ কুফাবাসী ইমামের জন্য কারবালার ময়দানে শাহাদাত বরণ করেন। কুফাবাসী আহলে বাইতপন্থি মুখতার বিন সাকাফি এবং তাঁর দল শাহাদাত-পরবর্তীকালে কারবালার ময়দানের জালেমদের একজন একজন করে ধরে বিচার করে এবং তাদের হত্যা করেন। অবশেষে জালিম সরকারের হাতে প্রাণ ত্যাগ করেন। (৫) তাঁরা ভুলে যান ‘তাওওয়াবুন’ বা অনুতাপকারীদের মানসিকতার সাথে অতীত কিংবা বর্তমানের আহলে বাইতপন্থিদের শোক পালনের দর্শনের বিন্দুমাত্র মিল নেই। যেমন, তাওয়াবুনরা ইমাম হোসাইনকে সাহায্য না করার ফলে ইমাম অসহায় অবস্থায় শহীদ হন, এই বেদনায় ক্রন্দন করতো। আর প্রকৃত আহলে বাইতপন্থিরা ক্রন্দন করে হযরত যায়নাব আর ইমাম যাইনুল আবেদীনের ক্রন্দন, আহাজারি, মর্সিয়া-মাতমের বিপ্লবী সংস্কৃতিকে অনুসরণ করেন। পবিত্র কোরআনের সূরা শুরার ২৩ নং আয়াতে মহান আল্লাহ রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘(হে রাসূল!) তুমি বলে দাওÑ আমি এর জন্য (আল্লাহর বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া) তোমাদের নিকট হতে আমার পরমাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চাই না।’ রাসূলের কুরবা (পরমাত্মীয়, রক্তজ বংশধর) হচ্ছেন হযরত ফাতেমা, আলী, হাসান, হোসাইন। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ইমাম হোসাইনের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আহলে বাইতপন্থিরা ক্রন্দন করেন। মাতম করেন। কারবালার মাজলুমিয়াত এর ইতিহাসকে অজ্ঞ ও মৃত আত্মা জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই শোকমিছিল করেন এবং শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আহলে বাইতপন্থিদের বিপ্লবী ও মর্ম¯পর্শী ‘মাকতালে ইমাম হোসাইন’ তাদেরকে এই শিক্ষাই দেয়।