রবিবার, ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং, ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

উম্মে সেলিম- ইসলামের ইতিহাসের এক মহীয়সী নারী

পোস্ট হয়েছে: ডিসেম্বর ৩০, ২০১৩ 

news-image

ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলামী চিন্তাধারা, মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা ও চিরন্তন খোদায়ী হুকুম-আহকামের অনুসারী মহিলারা যথার্থ অর্থেই ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন। এ ধরনের একজন ধর্মপ্রাণ ও স্বাধীনচেতা মহিলা ছিলেন উম্মে সেলিম। সমসাময়িক মহিলাদের জন্য তিনি এক আদর্শ ও অনুসরণীয় প্রতীক হিসাবে বিবেচিত।

উম্মে সেলিমের নাম ছিল সালেহ। মালহানের কন্যা এই ধর্মপরায়ণা মহিলা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ঈমান পোষণ করতেন। উম্মে সেলিম মালেক ইবনে নজরের স্ত্রী ছিলেন। উম্মে সেলিম যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর স্বামী দূরবর্তী এক সফরে ছিল। স্বামী বাড়ি ফিরে উম্মে সেলিমের নতুন ধর্ম গ্রহণ বরদাশত করল না। উম্মে সেলিম তাঁর স্বামীকে বললেন : ‘আমি তোমার সাথে বসবাস করতে পারি, যদি তুমি ইসলাম গ্রহণ কর।’ তাঁর স্বামী ইসলাম ধর্ম গ্রহণকে পছন্দ করল না। সে চলে গেল সিরিয়ায় এবং কিছুদিন পর সেখানেই মারা গেল।

আনাস নামে উম্মে সেলিমের মালেকের ঔরসজাত একজন সন্তান ছিল। বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে তিনি মহানবী (সা.)-এর একজন অনুসারী হিসাবে গড়ে ওঠেন। নানা অসুবিধা ও সমস্যার মধ্যেও তিনি ইসলাম, মুসলমান ও মহানবী (সা.)-এর খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। মালেকের মৃত্যুর খবর শুনে উম্মে সেলিম আনাসকে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাদান করেন। ছেলে পূর্ণবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত উম্মে সেলিম বিয়ে করেননি। একদিন আবু তালহা নামে পরিচিত যায়েদ বিন সাহল নামে মদীনার এক বীর পুরুষ তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। কিন্তু উম্মে সেলিম তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন : ‘আপনি একজন মহান ব্যক্তি বটে। কিন্তু আভাস পেয়েছি যে, আপনি একজন মুশরিক। আপনি যদি মুসলমান হন এবং মানুষের তৈরি পুতুলের পূজা পরিত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদত করেন, তাহলে আমি আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করব। আমি কোন মোহরানাও চাই না, আপনার মুসলমান হওয়াটাই হবে আমার মোহরানা।’

উম্মে সেলিমের এই যুক্তিপূর্ণ কথা আবু তালহার পছন্দ হলো এবং তাঁর এই ইসলামী চিন্তাধারা প্রত্যক্ষ করে তিনি ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারলেন এবং মুসলমান হয়ে গেলেন। ইসলামের ইতিহাসে উম্মে সেলিমই প্রথম মহিলা যিনি ইসলামের এই চিন্তাধারা মোতাবেক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন এবং পাত্রের ইসলাম গ্রহণকেই মোহরানা হিসাবে বিবেচনা করলেন। মুসলিম মহিলাদের জন্য এ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিবাহের পর মদীনায় আবু তালহা ও উম্মে সেলিমের জীবন বেশ সুখেই কাটতে থাকে। উম্মে সেলিম তাঁর স্বামীর আধ্যাত্মিক চেতনা বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একদিকে আবু তালহার নিজস্ব প্রতিভা এবং অপরদিকে উম্মে সেলিমের তত্ত্বাবধান তাঁকে একজন ঈমানদার ও বিশ্বাসী মুসলমানে রূপান্তরিত করে। বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি আল্লাহর ধর্ম ইসলামকে সর্বাত্মকভাবে ভালোবাসতেন। আবু তালহার তীর নিক্ষেপ কৌশল এত প্রখর ছিল যে, তাঁর প্রতিটি তীরে কোন না কোন কাফের নিহত হতোই।

ওহুদ ও হোনায়নের যুদ্ধে তিনি অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। ঐসব যুদ্ধে তিনি অন্তত বিশজন শত্রুসেনাকে হত্যা করেন এবং বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র গনীমত হিসাবে আটক করেন। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পরেও ইসলাম ও পবিত্র কুরআনের পথে তাঁর ত্যাগ ও সংগ্রামী ভূমিকা অব্যাহত থাকে। বার্ধক্যকালেও তাঁর অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এতই গভীর ছিল যে, একদিন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ সংক্রান্ত পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াতের সময় তিনি এতই অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন যে, ছেলে-মেয়েদের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি তাদেরকে এই বলে দমিয়ে দেন যে, ‘আল্লাহ যুবা-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকলকেই তাঁর পথে জিহাদে যেতে বলেছেন। অতএব, আমি তার ব্যতিক্রম হতে পারি না।’ এ ব্যাপারে সূরা তাওবার ৪১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : ‘অভিযানে বের হয়ে পড়, হালকা হোক অথবা ভারী অবস্থায় এবং সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে তোমাদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝ।’

যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পথে আবু তালহা ইন্তেকাল করেন। হ্যাঁ, উম্মে সেলিম তাঁর সচেতনতা, বিশ্বাস, দৃঢ়তা ও ইসলামী আখলাক দ্বারা এককালের একজন মূর্তিপূজা কাফেরকে একজন জীবনোৎসর্গকারী মুজাহিদে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আল্লাহর ওপর উম্মে সেলিমের নির্ভরতা ছিল অত্যন্ত প্রবল। আবু তালহার সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবনে তিনি একটি পুত্রসন্তান লাভ করেন। পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল আবু আমর। সে সর্বদাই তার পিতার কাজে সহায়তা করত। একদিন সকালে দেখা গেল যে, আমরের শরীরে প্রচণ্ড জ্বর উঠেছে এবং সে মারাত্মকভাবে অসুস্থ। আবু তালহা কার্যব্যপদেশে বাড়ির বাইরে যাবার কিছুক্ষণ পরই অসুস্থ আবু আমরের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় উম্মে সেলিম খুব দুঃখ পান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করেন এবং তাঁর ইচ্ছাকে মেনে নিয়ে নিজেকে সংযত করেন। এ ব্যাপারে এভাবেই তিনি আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি মানসিক অস্থিরতা বিদূরিত করলেন এবং অজু সম্পাদন করে আবু আমরের লাশ দাফন করলেন। তিনি জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে বললেন : ‘কেউ যেন আবু তালহাকে তাঁর পুত্রের মৃত্যু সংবাদ না জানায়। আমি নিজেই তাঁর সাথে কথা বলব।’

অল্প কিছুদিন পর আবু তালহা বাড়ি ফিরে আসলে উম্মে সেলিম তাঁকে হাসিমুখে স্বাগত জানান। তিনি স্বাভাবিকভাবেই আবু তালহাকে স্বাগত জানান এবং পরে তাঁকে বিশেষ এক ভঙ্গিতে একটি প্রশ্নের মাধ্যমে পুত্রের মৃত্যুর সংবাদ জানান। আবু তালহার কাছে উম্মে সেলিমের প্রশ্ন ছিল : ‘যদি কোন প্রতিবেশী আপনার কাছে কিছু জিম্মা রাখে এবং কিছু সময় পর সে তা ফেরত নিতে আসে তাহলে আপনি কি তা তৎক্ষণাৎ ফেরত দিবেন না?’ আবু তালহা তখন বললেন : ‘হ্যাঁ, অবশ্যই দিব।’ উম্মে সেলিম তখন বললেন : ‘আল্লাহ আমাদের কাছে যে পুত্রকে জিম্মা রেখেছিলেন তা ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।’ একথা শোনর পর আবু তালহা তাঁর শোক ও মর্মবেদনা সংযত করলেন এবং দোয়া ও মুনাজাতে রত হলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি মহানবী (সা.)-এর কাছে গেলেন এবং তাঁর পুত্রের মৃত্যু ও এ ব্যাপারে তাঁর স্ত্রীর কর্মকাণ্ডের কথা জানালেন। মহানবী (সা.) উম্মে সেলিমের ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রশংসা করলেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করলেন।

কিছুদিন পর আল্লাহ রাবুল আলামীন উম্মে সেলিম ও আবু তালহার ঘরে আরো একটি পুত্রসন্তান দান করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাম রেখেছিলেন আবদুল্লাহ। বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে আবদুল্লাহ ঈমান, ইলম ও তাকওয়ার এক উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হন এবং মহানবীর একজন বিশ্বস্ত অনুসারী হিসাবে পরিগণিত হন।

উম্মে সেলিম এমনিভাবে ইসলামের শিক্ষা মোতাবেক তাঁর সচেতনতা, ঈমান, ইলম, তাকাওয়া ও সহনশীলতার সাহায্যে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক অনন্যসাধারণ অবদান রেখে গেছেন। আশা করা যায় যে, আধুনিক সমাজের মহিলারাও ইসলামের ইতিহাসের মহীয়সী নারীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাদের সমাজকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন এবং একটি খোদাভীরু ও সত্যানুসন্ধিৎসু বংশধর গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করবেন।

(নিউজলেটার, জুলাই ১৯৯১)