বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুলাই, ২০১৯ ইং, ৩রা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেইনী (র.)-এর ২৯তম মৃত্যুবাষিকী উপলক্ষে সেমিনার অনুষ্ঠিত

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ১৭, ২০১৮ 

‘ইমাম খোমেইনী (র.) একজন প্রজ্ঞাবান দার্শনিক ও দূরদর্শী ইসলামি নেতা ছিলেন’- প্রফেসর ড. এম শমসের আলী

গত ১ জুন ঢাকাস্থ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্যোগে রাজধানীর ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তনে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেইনী (র.)-এর ২৯তম মৃত্যুবাষিকী উপলক্ষে ‘মুসলিম উম্মাহর জাগরণে ইমাম খোমেইনী (র.)-এর চিন্তাধারার প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ও ইসলামি চিন্তাবিদ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ভিসি এবং সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যলয়ের প্রফেসর এমিরিটাস প্রফেসর ড. এম শমসের আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস ভায়েজী দেহনাভী। স্বাগত ভাষণ দেন ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ মূসা হোসেইনী। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক নিউনেশনের সাবেক সম্পাদক ও গ্রীনওয়াচ ঢাকার সম্পাদক জনাব মোস্তফা কামাল মজুমদার। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশেদ আলম ভূঁইয়া এবং বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ হুজ্জাতুল ইসলাম মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন খান।
সভায় ইমাম খোমেইনীর জীবনীর ওপর একটি ঐতিহাসিক ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়।
সভাপতির বক্তব্যে ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান বলেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লব একই সাথে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, রাজতন্ত্র, সমাজবাদ ও ইহুদি যায়নবাদকে ভ্রুকুটি করে স্বতন্ত্র স্বাধীন মেজাজে ইরানের মাটি থেকে অঙ্কুরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দুনিয়ায়। ইরানের ইসলামি বিপ্লব দুনিয়ার মুসলমানের কাছে, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সমগ্র মানবতার কাছে এক নুতন দিগন্ত উন্মোচন করে। কোনো প্রকার পার্থিব স্বার্থের পথে নয়, কেবল খোদায়ী স্বার্থে একটি সামাজিক জাগরণ ঘটেছিল ইরানে যার ফলাফল কেবল ইরানি জাতিই নয়, নানা দেশের জনগণ জাতীয়ভাবে, এমনকি ব্যক্তি-মানুষের বিকাশেও এ বিপ্লবের আলো কার্যকরি ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন দেশে ইসলামের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধনে বিপ্লবের পর ফারসি ভাষা ও সাহিত্য, এর ইসলামি জীবনদর্শনের বিকাশে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা আর বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে স্বতন্ত্র ফারসি বিভাগ চালু ও সেসব বিভাগে গবেষক ছাত্র-শিক্ষক তৈরি করে দিয়ে অনেক দিনের পুরোনো ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে ইরানি কর্তৃপক্ষ সদা সচেষ্ট থেকেছে। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর সুযোগ্য নেতৃত্বে ইরানের ইসলামি বিপ্লব ইসলাম সম্পর্কে অনেক প্রচলিত সংকীর্ণ ধ্যানধারণাকে বদলে দিয়েছে। দলপূজা, গোষ্ঠীতন্ত্র, খণ্ডিত চিন্তাধারার বেষ্টনীতে সীমাবদ্ধ চিন্তাধারাকে নিয়ে গেছে নিঃসীম নীলাকাশের কাছে অথবা বিস্তীর্ণ সমুদ্রের কাছাকাছি।
ইমাম খোমেইনী (র.) তথাকথিত কোনো আলেম ছিলেন না। তিনি ছিলেন একাধারে আলেম, আরেফ, আবেদ, দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতা। ইরফানি শিক্ষার আলোয় তিনি আত্মশুদ্ধির মহান দরজায় প্রবেশ করতে পেরেছেন বলেই তাঁকে আমরা দেখি একজন ইনসানে কামেল আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে। কেবল বস্তুবাদী চিন্তাধারার বিশ্লেষণের কোনো খণ্ডিত ইসলামি ধ্যন-ধারণা তাঁর মাঝে ছিল না। তাঁর ইসলামি চিন্তা-চেতনার গভীরতার ভেতর আমরা প্রকৃত ইসলামের গভীরতা টের পাই। প্রকৃত বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই মিখাইল গর্বাচেভের কাছে তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে এবং সত্যের আহ্বান জানিয়ে তিনি যে ঐতিহাসিক পত্র লিখেছিলেন এতে রয়েছে এই মহান নেতার অপরিসীম দূরদর্শিতার পরিচয় ও তুখর অনুমান শক্তির বাস্তব নমুনা। তিনি বলেছিলেন, কমিউনিজমের ঠাঁই হবে বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসের জাদুঘরে। সত্যি সত্যি তাই হয়েছে। বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছে। ইমাম খোমেইনী (র.) পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র, বিষাক্ত ইসরাইলী নির্মমতা, সমাজতন্ত্রের অসারতার প্রতি যেমন সচেতন ছিলেন তেমনি সচেতন ছিলেন লরেন্স অব অ্যারাবিয়া ও হামফ্রের ষড়যন্ত্রের ফসল ইহুদি ও ব্রিটিশের চক্রান্তে মুসলিম সমাজে ছড়ানো ওয়াহাবি ইজমের কুফল সম্পর্কেও। যা মুসলিম দুনিয়া থেকে মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য বিলীন করে দেয়াসহ আধ্যাত্মিক ও তাকওয়াভিত্তিক আত্মশক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
ইসলাম যে কেবল কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সম্পদ নয় তা ইমাম খোমেইনী (র.)-এর চিন্তাধারা ও ইরানের ইসলামি বিপ্লব থেকে বোঝা যায়। আজকে আমরা বিভিন্ন দল-গোত্র নাম দিয়ে ইসলামের বিশালত্বের ক্ষতি করে ফেলেছি। কেবল ইসলামের নামকরণের নামে নিজেরাই খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে এবং বিভিন্ন বিষয়কে খণ্ড-বিখণ্ড করে কোনো বিষয়কে আত্মীকরণের মাধ্যমে আত্মস্থ ও পরিশোধিত করার পরিবর্তে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। ফলে আমাদের এই পরিণতি হয়েছে যে বলিষ্ঠ শক্তিতে দাঁড়িয়ে থেকে ইয়াযিদি ব্যবস্থা ও স্বৈরতন্ত্র-রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাহসী চিত্তে দাঁড়াতে পারছি না। আত্মশুদ্ধির জায়গা থেকে আমরা সরে গেছি। আর আত্মশুদ্ধির পথ পরিক্রমা অতিক্রম প্রচেষ্টার অভাবযুক্ত নেতৃত্ব থেকে সুবিচার আশা করা যায় না।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. এম শমসের আলী বলেন, বিপ্লবের পূর্বে ও বিপ্লবোত্তর ইরানে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কাজেই দুই সময়ের পার্থক্য নিরূপণ করা আমার পক্ষে সহজ হয়েছে। বিপ্লবের ঠিক পরপর আমি যখন ইরানে গিয়েছিলাম তখন ইরানি জনগণের সমন্বিত ঐক্য সংহতির চিত্র দেখে আমি আশান্বিত হয়েছিলাম। তাদের ঐক্যের যে শক্তি তারা আত্মার ভেতর অর্জন করেছিল তা হচ্ছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা। ইরানের রাজধানী তেহরান একটি বড় শহর। আমি দেখলাম ও শুনলাম প্রতিটি বাড়ির ছাদের শীর্ষে উঠে নারী-পুরুষ শিশু-কিশোর স্লোগান দিচ্ছে ‘আল্লাহু আকবার’। সারা তেহরান প্রকম্পিত করে সেই ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগানটি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হলো। এই একতা ও বিশ্বাসের শক্তিকে দমন করার সাধ্য ছিল না শাহ বা আমেরিকা অথবা ইসরাইলের।
বিপ্লবের আগে ইরানের বৃহত্তর জনগণ সুবিধাবঞ্চিত ছিল। সাধারণ জনগণের সাধ্যের ভেতর ছিল না ভালো খাবার খাওয়ার অথবা উত্তম কাপড় পড়ার। কিন্তু বিপ্লবের পর ইরানি জনগণের মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ হয়েছে। তারা আজ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বিপ্লবের পর ইরানের শিক্ষার অনেক প্রসার ঘটেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় তারা উন্নতি লাভ করেছে। ইরানি সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের দরবারে উজ্জ্বল আসন দখল করে রেখেছে ঐতিহাসিকভাবে। শেখ সাদী, রুমী, জামি, ওমর খৈয়াম, ফেরদৌসীকে কে না জানে! ইরান বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে। অস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার জিতে নিচ্ছে। ইরানের পরমাণু বিজ্ঞান আজ আলোচিত। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সামাজিক কাজে ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। এক্ষেত্রে ইরানের ইসলামি নেতৃবৃন্দ কোনো সংকীর্ণতা দেখায় নি। কারণ, সেটা ইসলামসম্মত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে নারীরাও পুরুষের পাশাপাশি তাদের রান্নাঘর ছাড়াও আরো দায়িত্ব পালন করেছে। ইরানেও আমরা তাই দেখি সকল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে। তারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, আদালত, স্টেশন, বিমানবন্দর, শপিং মলে সব জায়গাই রয়েছে। তাদেরকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখা হয় নি। তারা গাড়িও চালাচ্ছে। তবে তা ইসলামের হিজাবের ভেতর দিয়ে। ইরানি জাতির এই যে ভেতরে বাহিরে অসাধারণ এক পরিবর্তন এলো সেটা এই ক্ষণজন্মা মানুষটির জন্য যিনি ছিলেন হযরত আলীর বংশধর। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের ব্যক্তিত্বের বিশালতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। হযরত আলী ইসলামের ইতিহাসে একজন বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। তিনি মালিক আশতারের কাছে যে প্রশাসনিক পত্র দিয়েছিলেন সেই পত্র ছিল দূরদর্শী তাৎপর্যপূর্ণ যা ইসলামের ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ হিসেবে অক্ষয় হয়ে রয়েছে।
আমরা খণ্ডিত ইসলামের অনুশীলন করে যাচ্ছি। আমরা নামায, রোযা, হজ, ওমরা পালন করে যাচ্ছি, কিন্তু আমাদের দেশ ও সমাজকে আল্লাহর হুকুমমতো পরিচালিত করছি না। ইরান থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে যা আমরা গ্রহণ করতে পারি নি। আজকে পাশ্চাত্য দুনিয়া ইরানের সাথে শত্রুতা করে চলেছে। অথচ আমরা যে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা নয়া বিশ্বব্যবস্থার কথা শুনি, ইরানের সাথে শত্রুতা নিরসন করে নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার সাথে ইরানের অর্জনসমূহ ও ইসলামি নৈতিকতা ও মানুষের সত্যিকার অধিকার প্রদানের বিষয়টি যুক্ত হলে পৃথিবী শান্তির রাজ্যে প্রবেশ করতে পারত।
তিনি আরো বলেন, ইমাম খোমেইনী (র.) একজন প্রজ্ঞাবান দার্শনিক ও দূরদর্শী ইসলামি নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন সর্বপ্রকার গোঁড়ামিমুক্ত। তাঁর একটি অসাধারণ উক্তি আমার হৃদয়ে বাজে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা যখন ইসলামিক সাইন্স বা ইসলামিক জিউমেট্রির কথা বলি আসলে ইসলামিক সাইন্স বা ইসলামিক জিউমেট্রি বলতে কিছু নেই। বিজ্ঞান বিজ্ঞানই। জিওমেট্রি জিওমেট্রিই। আমরা ইসলামিক সাইন্স বলতে সেটাই বোঝাতে চাই যে, বিজ্ঞানের সাথে নৈতিকতার বিষয়টি জড়িত থাকতে হবে। বিজ্ঞানকে অনৈতিক কাজে ব্যবহার করা যাবে না।’ তিনি তাঁর চিন্তাধারাকে সমাজে বাস্তবায়িত করেছিলেন জনগণকে সাথে নিয়ে। জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. আব্বাস ভায়েজী দেহনাভী বলেন, আমেকিার পুতুল সরকার রেজা শাহ পাহলভীর স্বৈরশাসন থেকে আমরা যখন স্বাধীনতা লাভ করলাম তখন আমাদের অনেক কিছুই ছিল না। আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায়, শিক্ষা ব্যবস্থাপনায়, চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনেক পেছনে ছিলাম। আপনাদের বাংলাদেশ থেকে ডাক্তারদের নিয়োগ দিয়েও আমাদের চিকিৎসাকর্ম চালাতে হয়েছে। আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় বিপ্লবকে মেনে নিতে পারে নি পরাশক্তি আমেরিকা, ইহুদিবাদী ইসরাইলসহ পাশ্চাত্য বিশ্ব। কঠিন যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে ধ্বংস করা হয় নগর, গ্রাম, ধ্বংস করা হয় আমাদের জাতীয় অর্থনীতি। কিন্তু ইমাম খোমেইনী (র.)-এর মহান নেতৃত্বে আমাদের এই পরিবর্তনকে আমরা পুনর্গঠনের সংগ্রামের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকলাম শত্রুদের চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের পরেও। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর অবর্তমানে তাঁর সুযোগ্য ছাত্র রাহবার সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর নেতৃত্বে আমরা ক্রমশ এগিয়ে চলেছি। আল্লাহর রহমতে আমরা এখন পরমাণু শক্তিসম্পন্ন জাতি। আলহামদুলিল্লাহ আমরা আল্লাহর রহমাতে একটা দৃঢ় অবস্থানে নিজেদেরকে দাঁড় করিয়েছি।
আমরা যখন ইমাম খোমেইনী (র.)-এর নেতৃত্বে মহান ইসলামি বিপ্লব সফল করি তখন সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বে, যেমন : মিশর, তুরস্ক, তিউনিশিয়া, মালয়েশিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, এমনকি সৌদি আরবেও একটি পরিবর্তনের হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু সেই আলোকোজ্জ্বল পবিবর্তনের হাওয়াকে সব দেশের জনসাধারণ দুঃখজনকভাবে তাদের অনুকূলে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু আমরা সফল হয়েছি এবং সফলতার পথে এগিয়ে চলেছি।
রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে খণ্ডিত ইসলামচর্চা হয়। ইসলামের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আইনগত দিকগুলো চর্চা হয় না। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় যে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই সমাজের মতো একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্যই ইমাম খোমেইনী (র.) আন্দোলন করেছিলেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের আওয়াজ অনেকে শুনতে পেয়েছেন, অনেকে একে গ্রহণ করেছেন। প্রভাবিত হয়েছেন এর আলোকে। ফিলিস্তিন ও লেবাননের জনগণকে উৎসাহিত করেছে আমাদের জাগরণ। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর ব্যক্তিত্বের বিশালতা, তাঁর তাকওয়া এবং আল্লাহর তরফ থেকে সহযোগিতা প্রাপ্তির ফলে পরাশক্তিসমূহের সকল চক্রান্ত ভেদ করে আমরা দাঁড়িয়েছি। ইনশাল্লাহ আপনাদেরকে নিয়ে ইসলামি বিপ্লবের সফলতার ৪০তম বার্ষিকী উদ্যাপন করতে সক্ষম হব।
কালচারাল কাউন্সেলর জনাব সাইয়্যেদ মূসা হোসেইনী বলেন, ইমাম খোমেইনী (র.) ছিলেন একজন মুজাহিদ, বিশিষ্ট আলেম, মুজতাহিদ, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, ফকিহ, আরেফ, ধর্মীয় নেতা ও ইসলামি বিপ্লবের রূপকার। ইসলামি জাগরণে তাঁর প্রচেষ্টা ও চিন্তা-দর্শনের জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন। তাঁর চিন্তাধারা ছিল বিশুদ্ধ ইসলামি চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ। তিনি মহান আল্লাহর ওপর নির্ভর করে ইরানের জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বিপ্লবের বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন এবং ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর ইসলামি চিন্তার পুনর্জাগরণী দর্শন, অনুপ্রেরণা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বই ইরানের জনগণকে সচেতন ও জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছে। এই বিপ্লবের বড় অর্জন হলো স্বাধীনতা ও মুক্তি এবং ইসলামের ওপর ভিত্তি করে ইরানে একটি সরকার প্রতিষ্ঠা। যার ফলে ইরানে আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়েছে এবং অবসান হয়েছে ইরানি জাতির ওপর থেকে বিদেশী ও সা¤্রাজ্যবাদীদের খবরদারি। ইমাম খোমেইনী (র.) তাঁর চিন্তাধারার মাধ্যমে আজো আমাদের কাছে অমর হয়ে আছেন। ইসলামি বিপ্লবের শত্রুরা এই মহান বিপ্লবকে ধ্বংস ও ইমামের চিন্তা-দর্শনের ওপর কালিমা লেপনের জন্য সব ধরনের অপচেষ্টা করলেও ইমাম খোমেইনী (র.)-এর চিন্তা-দর্শন এখনও জীবন্ত ও প্রগতিশীল দর্শন হিসেবেই বিস্তৃত হচ্ছে। ইসলামি বিপ্লবের পর বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ইসলামি দেশের জনগণের মধ্যকার জাগরণ, বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিভিন্ন স্থানে স্বাধীন, ইসলামি পরিচয় ও রীতিনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ইসলামি চিন্তাচেতনার প্রতি যুবপ্রজন্মের আগ্রহ, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের ক্রমবর্ধমান সফলতা, মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার প্রচেষ্টা এবং নিজের ভাগ্যের ওপর সাম্রাজ্যবাদীদের কর্তৃত্ব খর্ব করার জন্য ইসলামি উম্মাহর এই জাগরণ ইমাম খোমেইনী (র.)-এর বৈপ্লবিক চিন্তার প্রভাব থেকেই হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
প্রবন্ধকার তাঁর প্রবন্ধে বলেন, ইমাম খোমেইনী (র.)-এর চিন্তাধারার প্রভাবের ব্যাপারে আলোচনা করতে হলে তাঁর সময়, পারিপার্শ্বিকতা ও প্রেক্ষিতকে বিবেচনায় আনতে হবে। দুনিয়ার এক প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরানে রয়েছে হাজার বছরের ইসলামি ঐতিহ্য। শেখ সাদী ও জালালউদ্দীন রুমীর মতো কবি-দার্শনিক মধ্যাপ্রাচ্য থেকে পূর্ব ইউরোপ এবং দক্ষিণ এশিয়াকে আালোকিত করে রেখেছেন শত শত বছর ধরে। ইরানেই জন্ম হয়েছে হাফিজ সিরাজী, ফেরদৌসী, ওমর খৈয়ামের মতো মহাকবি-চিন্তাবিদ। উপমহাদেশের আলেম সমাজ এখনো বিখ্যাত ইরানি কবিদের উদ্ধৃতি তাঁদের বয়ানে ব্যবহার করেন। ইমাম খোমেইনী সেই ঐতিহ্যেরই ধারক।
প্রবন্ধকার আরো বলেন, ইমাম খোমেইনী (র.) ইরানের মাটিতে বিপ্লব সফল করার পর দল, মত, মাজহাব, তরীকা নির্বিশেষে সকল মুসলমান ও সকল মানবতার কল্যাণচিন্তায় বিশ্বের নির্যাতিত জাতিসমূহের প্রতি তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করেন। তিনি মুসলমানদের মধ্যে মাজহাবী ঐক্যের নিমিত্তে মহানবী (সা.)-এর জন্মমাস পবিত্র মাহে রবিউল আওয়ালের ১২ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত ঐক্য সপ্তাহ ঘোষণা করেন। মুসলমানদের প্রথম কিবলা বায়তুল মোকাদ্দাস বা আল-কুদসকে যায়নবাদী ইহুদি গোষ্ঠীর থাবা থেকে মুক্ত করার জন্য পবিত্র মাহে রমজানের বিদায়ী জুমা বা জুমাতুল বিদাকে আল-কুদস দিবস ঘোষণা করে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে আল-কুদস মুক্তির চেতনার আগুন ছড়িয়ে দেন।
হুজ্জাতুল ইসলাম মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন খান বলেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লব নির্যাতিত মুসলমানদের মনে আশা সঞ্চার করেছে। ইমাম খোমেইনী (র.) মাহে রমজানের শেষ শুক্রবারকে আল কুদস দিবস ঘোষণা করে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে ও বিশ্ব মানবতার মধ্যে আল কুদস মুক্তি চেতনার প্রেরণা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ফিলিস্তিনে হামাস ও লেবাননে হিজবুল্লাহ নামের এমন দুটি বাহিনী তৈরি করে দিয়েছেন যে, আক্রমণকারী জালিম যায়নবাদী ইসরাইলের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে।
ইরানে ইমাম খোমেইনী বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রগঠন করেছেন ইরানের জনগণকে সাথে নিয়ে। তিনি জোর করে কোনো কিছু চাপিয়ে দেন নি। যা কিছু করেছেন জনগণকে সাথে নিয়ে এবং তাদের সাথে পরামর্শ করেই। তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র করেছেন এবং অভিভাবক হিসেবে বেলায়াতে ফকীহর নেতৃত্ব কায়েম করেছেন। ‘বেলায়াত’ শব্দের অর্থ অভিভাবকত্ব। ‘বেলায়াতে ফকীহ’ অর্থ ফিকাহশাস্ত্রবিদ আলেমদের অভিভাবকত্ব। কিন্তু ইরানে সংসদ রয়েছ্। জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার রয়েছে। সেখানে ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন হয় ও পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্রের কার্যক্রম সংসদ পরিচালনা করে। জাতীয় পর্যায়ে কোনো সমস্যা দেখা দিলে রাহবার সেটির সমাধানে পরামর্শ দান করেন বা ইসলামি বিধানমতে ফতোয়া দেন। ইমাম খোমেইনী অপূর্ব একটি সমন্বয় ঘটিয়েছেন ইসলামের আধ্যাত্মিকতার সাথে প্রজাতন্ত্রের। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর সুযোগ্য উত্তরসূরি রাহবার সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী ইমামের পথ ধরেই বিশ্ব মুসলিমের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন।
জনাব রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, ইমাম খোমেইনী (র.) ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। যাঁর অন্তর ছিল আধ্যাত্মিক শক্তির আলোয় আলোকিত। তাঁর চিন্তা-চেতনা ও স্বপ্নকে তিনি সফল করে দেখিয়েছেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লব ছিল এক স্বতন্ত্র বিপ্লব যা কোনো পরাশক্তির ইন্ধনে প্রতিষ্ঠিত হয় নি। কোনো জাগতিক শক্তির চিন্তাধারাকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়ে তা আবির্ভূত হয় নি; বরং এটা খোদায়ী ইচ্ছার ফসল ছিল। ইমাম পাশ্চাত্য গণতন্ত্র কিংবা সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের চিন্তাধারায় কোনো পরিবর্তন সাধন করেন নি; বরং খোদায়ী ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন এবং খোদায়ী বিধানের আওতায় মানুষের জাগতিক সমস্যার সামাধানে সচেষ্ট হয়েছেন। তিনি মানুষের ওপর ইসলামকে জোর করে চাপিয়ে দেননি। জনগণকে সাথে নিয়েই ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনেকের কাছে ইসলাম মসজিদ, মাদ্রাসা বা খানকায় সীমাবদ্ধ একটি ধর্ম মাত্র। তাঁরা মনে করেন ইসলামে রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতি নেই। রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করার যে প্রবণতা স্যেকুলার গণতান্ত্রিকদের মাঝে দেখা যায় অথবা যা দেখা যায় সমাজতান্ত্রিকদের মাঝে তাদের চিন্তাচেতনাকে ভুল প্রমাণ করে ইমাম দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলাম কেবল ধর্মকেন্দ্রে আবদ্ধ থাকা নিছক কিছু আচার-আচরণ নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা।
সেমিনারে ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী অনূদিত ও ড কে. এম. সাইফুল ইসলাম খান সম্পাদিত ইমাম খোমেইনী (র.)-এর একটি বৃহৎ কাব্য সংকলন ‘দিওয়ানে ইমাম খোমেইনী (র.)’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সভায় ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ইসলামি চিন্তাবিদ ও কবি ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদীকে বিশেষ সম্মাননা পত্র প্রদান করা হয়।
মোড়ক উন্মোচনের প্রাক্কালে ড. ঈসা শাহেদী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, বস্তুত সমকালীন ইতিহাসের সর্বাধিক আলোচিত ইসলামি বিপ্লবের সফল নেতা হিসেবে বিশ্বব্যাপী ইমাম খোমেইনীর পরিচয় তিনি একজন রাজনৈতিক ও বিপ্লবী নেতা। তবে এটিই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়, প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা। কিন্তু ইমাম খোমেইনীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বাইরের দুনিয়া খুব কমই জানে। এর কারণ, তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই সাধারণত ফারসি থেকে অনূদিত হয়ে বাইরে এসেছে। তদুপরি ইমাম খোমেইনীর আরেকটি পরিচয় ১৯৮৯ সালে ৮৮ বছর বয়সে তাঁর ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত খোদ ইরানের মানুষও জানত না। সেটি হলো, তাঁর কবিত্ব। এই বইয়ের ভূমিকা ও তৎসঙ্গে তাঁর পুত্রবধূ ফাতেমার একটি পত্র পাঠ করলে বুঝা যাবে, কীভাবে এই রহস্যটি এতদিন গোপন ছিল এবং কীভাবে কবিত্ব ও কবিতা ইমাম খোমেইনীর নিত্যসঙ্গী ছিল। সুফিবাদের অতলান্তের এই ভাবধারাকে বাংলায় রূপান্তরিত করার দুরূহ কাজটি করতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত।
কবিতার আসরে ইমাম খোমেইনীর পরিচয় তিনি একজন কবি। রাজনীতি, বিপ্লব ও যুদ্ধ এখানে অনুপস্থিত। তাঁর কবিতা পড়ে কেউ আঁচ করতে পারবে না, তিনি দুনিয়া কাঁপানো একটি সর্বাত্মক বিপ্লবের নেতা বা তিনি যখন কবিতা চর্চা করছেন তখন এক সর্বাত্মক প্রতিরোধ যুদ্ধের সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

◊ আমিন আল আসাদ

খুলনায় ইমাম খোমেইনী (র.)-এর মৃত্যুবার্ষিকী পালন

গত ০৪ জুন ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র ও আহলে বাইত (আ.) ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রের আল কাউছার সেমিনার কক্ষে ইসলামি বিপ্লবের মহান স্থপতি হযরত আয়াতুল্লাহ উজমা ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহীম খলিল রাজাভী। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ আলী মোর্তজা, হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ আব্দুল লতিফ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে ‘একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের সফল বিস্ফোরণ’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ শহীদুল হক। তিনি তাঁর প্রবন্ধে ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর শৈশব, শিক্ষা ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ আব্দুল লতিফ বলেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বাক্যের দর্শনে আলোকিত ছিল হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর জীবন। ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর ধর্মীয় তথা রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পদে পদে আমরা এই বাক্যটির বাস্তবায়ন দেখতে পাই। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে তিনি ভয় পেতেন না যা ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি দেখিয়ে গেছেন।
হুজ্জাতুল ইসলাম আলী মোর্তজা বলেন, ইমাম খোমেইনী (রহ.) ছিলেন যুগ-সচেতন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সমাজের ওপরে তাঁর প্রভাব কতখানি তিনি তাঁর বিপ্লবের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহীম খলীল রাজাভী ইমাম খোমেইনীকে আল্লাহর একজন ওলী হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর বেলায়েতে ফকীহ অর্থাৎ ফকীহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার সম্পর্কিত ধারণাটি একটি অনন্যসাধারণ ঘটনা। কারণ, ইসলামি শাসনব্যবস্থায় ফকীহ বা সর্বোচ্চ আলেমের ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। আর সে কারণেই হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) ইরানের বুকে একটি ইসলামি বিপ্লব প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছিলেন। বর্তমান বিশ্বে ওলীয়ে ফকীহ ও মারজাগণ ইসলামকে পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রেখেছেন।

আল কুদ্স দিবস উপলক্ষে সেমিরার ও মানব বন্ধন অনুষ্ঠিত
‘ফিলিস্তিনের সমস্য কেবল ফিলিস্তিনি বা মুসলমানদেরই নয়, বিশ্বমানবতার সমস্যা’- ইরানি রাষ্ট্রদূত

গত ৮ জুন ঢাকার বিএমএ মিলনায়তনে বিশ্ব আল-কুদ্স দিবস উপলক্ষে মুসলমানদের প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করে আল-কুদ্স কমিটি বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে কমিটির সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ীর সভাপতিত্বে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে সাতক্ষীরা এক আসনে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব অ্যাডভোকেট লুৎফুল্লাহ এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মাননীয় রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস ভায়েজী দেহনাভী এবং সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ ন ম মেশকাত উদ্দিন। স্বাগত ভাষণ দেন আল-কুদ্স কমিটি বাংলাদেশের সহ-সভাপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জনাব এ কে এম বদরুদ্দোজা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও দৈনিক আজকের ভোলার সম্পাদক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শওকাত হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন মাসিক মদীনার সম্পাদক মাওলানা আহমদ বদরুদ্দীন খান ও বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ আফতাব হোসেন নাকাভী।
উল্লেখ্য যে, ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেইনী (র.) মুসলমানদের প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস ইহুদিবাদী ইসরাইলের কবল থেকে পুনরুদ্ধার ও ফিলিস্তিনের মুসলিম গণমানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সংহতি ও অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করে বিশ্বমুসলমানদের মাঝে সচেতনতা জাগ্রত করার লক্ষ্যে রমযান মাসের শেষ শুক্রবার তথা পবিত্র জুমআতুল বিদাকে মহান আল-কুদ্স দিবস হিসেবে ঘোষণা করে দিবসটি একযোগে পালনের জন্যে সব দেশের মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানান। সেই থেকে আজ অবধি দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয়ে আসছে। পালিত হয়ে আসছে বাংলাদেশেও।
সেমিনারের প্রধান অতিথির ভাষণে অ্যাডভোকেট লুৎফুল্লাহ এমপি ফিলিস্তিনি সংগ্রামীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ ও লাল সালাম জানিয়ে বলেন, যেখানেই জুলুম-নির্যাতন, যেখানেই সাম্রাজ্যবাদের হিংস্র থাবা, যেখানেই মানবতার পতন সেখানেই আমরা আছি এবং আমরা থাকব। আজকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা আরব মুসলমান ও গণমানুষের ওপর জুলুম করছে। মানবিক ঐক্যের মাঝে ফাটল ধরিয়ে আরব ও মুসলিম সমাজকে বিভক্ত করে শোষণের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। সেজন্যই তারা ইসরাইল নামের কঠিন অপশক্তির বীজ বপণ করেছে। ইহুদি-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা যারা লালন করেন দল-মত নির্বিশেষে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হতাম তবে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীরা দুনিয়ার কোথাও বিপর্যয় ঘটাতে পারত না। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হই তবেই আমাদের ভূখণ্ড, আমাদের অধিকার, আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, আমাদের যা কিছু আছে সবই আমরা পুনরুদ্ধার করতে পারব।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. শাহ কাউসার মুস্তাফা আবুল উলায়ী বলেন, ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা মুসলমানদের প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাসকে পুনরুদ্ধারের জন্য পবিত্র জুমআতুল বিদাকে আল-কুদ্স দিবস ঘোষণা করে দল-মত-মাজহাব-তরিকা নির্বিশেষে সকল মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সেই প্রচেষ্টা তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়া মুসলমানরা এখনো অব্যাহত রেখেছে। আজকে প্রতি বছর মাহে রমযানের শেষ শুক্রবার সারা বিশ্বে দিবসটি একযোগে পালিত হচ্ছে। কিন্ত্র মুসলিম ঐক্য বিনষ্টকারীরা শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব তৈরির জন্য ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আমাদেরকে যে কোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ফিলিস্তিনসহ যে কোনো দেশের মুসলমানই আমাদের ভাই-বোন। তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন হচ্ছে, অথচ ফিলিস্তিনের পাশেরই কোনো কোনো দেশ ইসরাইলের সাথে সখ্য স্থাপন করে চলেছে। ন্যূনতম ইমান থাকলেও তো কোনো মুসলমান এটা করতে পারে না। তিনি আরো বলেন, বিশ্ব আল-কুদ্স দিবস পালনের মধ্য দিয়ে আল-কুদ্স মুক্তির বিপ্লবী আওয়াজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. আব্বাস ভায়েজী দেহনাভী বলেন, ৭০ বছর আগে একটি শয়তানি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যায়নবাদী ইসরাইলের স্বপ্ন ছিল নীল থেকে ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত এক ইহুদি রাজ কায়েম করা। কিন্তু প্রকৃত মুসলমানদের আত্মজাগৃতি ও হামাস ও হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ সংগ্রামের ফলেই সেটা সম্ভব হয় নি। ফিলিস্তিনের মানুষ বছরের পর বছর ধরে নির্যাতিত। রাষ্ট্রদূত বলেন, ইসরাইল রাষ্ট্রটি মুসলিম বিশ্বে একটি ক্যান্সার সদৃশ্য। এর বিস্তৃতি ঘটেছে সাম্রাজ্যবাদীদের সহায়তায় যায়নবাদী ইহুদিদের দ্বারা। এ সমস্যা শুধু ফিলিস্তিনিদের সমস্যা নয়, গোটা মুসলিম উম্মাহর সমস্যা, বরং সমগ্র বিশ্ব মানবতার সমস্যা। এখানে মুসলিম গণমানুষের ওপর অমানবিক নির্যাতন হচ্ছে। কাজেই এটি কেবল ইসলামি ইস্যুই নয়, মানবিক ইস্যুও বটে। খ্রিস্ট সমাজের অনেক মানবতাবাদীও এর প্রতিবাদ করছে, এমনকি ইহুদিরাও যায়নবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সেখানে নিষ্পাপ নারী, শিশু, যুবক, বৃদ্ধকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু তাওরাত বা ইঞ্জিলের কোথাও নেই নির্দোষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে হবে। এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা ও বিশ্বব্যাপী গণজোয়ার সৃষ্টির জন্যই ইমাম খোমেইনী (র.) মাহে রমযানের শেষ শুক্রবারকে কুদ্স দিবস ঘোষণা করেন। অনেক দেশ এটাকে স্বাগত জানায়। অনেক দেশের সরকার স্বাগত না জানালেও জনগণ এর সাথে একাত্ম হয়েছে। আবার অনেক মুসলিম দেশের শাসক কুদ্স দিবসের চেতনার সাথে একাত্ম না হয়ে আমেরিকা ও ইসরাইলকে সহযোগিতা করছে। সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের সহযোগী এসব শাসক শিয়া-সুন্নি ইস্যু তুলে মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত করেছে ও করছে। তারা দায়েশ, আল-কায়দা ও তালেবান নামের সন্ত্রাসী তৈরি করে মুসলমানদের দিয়ে মুসলমানদের ধ্বংস করছে। এই বিভক্তির ফলে ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীরই লাভবান হচ্ছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর ইমাম খোমেইনী (র.) শিয়া-সুন্নি সহ মুসলিম ঐক্যের জন্য নানাভাবে আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানিরা জাতীয়-আন্তর্জাতিকভাবে সেসব চেষ্টা করে গেছে। অনেক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করেছে।
প্রকৃত অর্থেই মুসলমানরা যদি তাদের ঐক্যের প্রতীক কোরআনের পথে থাকত তবে নিজেদের মধ্যে এই হানাহানি বা বিভক্তি থাকত না। মাহে রমযান হচ্ছে কোরআনের মাস। আমাদেরকে কোরআনের পথে আসতে হবে। এ মাসে আমাদের রোযা, নামায, কিয়ামুল লাইল, তাসবিহ-তাহলিল, যিয়ারত ইত্যাদি সব ইবাদতের মাধ্যমে আত্মিক শক্তি অর্জন করতে হবে। আর নিজেরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তবেই বাতিল, শয়তান ও শয়তানি শক্তি পরাজিত হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আ ন ম মেশকাত উদ্দিন বলেন, ফিলিস্তিনের মুসলমানদের ওপর যে অত্যাচার চলছে একমাত্র মানবিক ঐক্যের জোয়ার দ্বারাই একে প্রতিহত করা সম্ভব। মুসলিম হোক, অমুসলিম হোক কোনো মানুষের প্রতিই কোনো প্রকার অত্যাচার মেনে নেয়া যায় না। ইসরাইলের প্রধান মদদদাতা হচ্ছে আমেরিকা। এর পর রয়েছে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। শুধু ফিলিস্তিনেই নয়, মিয়ামনার, ইয়ামেন, ইরাক, আফগানিস্তান, কাশ্মিব, চেচনিয়া, সিরিয়া সবখানেই মুসলমানরা নানা বিপর্যয়ের সম্মুখীন। একসময় বসনিয়ায় নির্যাতন হয়েছে। ফিলিস্তিনে সত্তর বছর যাবৎ হত্যা-নির্যাতন চলছে। বিরতিহীনভাবে চলছে এই নির্যাতন। ইমাম খোমেইনী (র.) বিশ্ব আল-কুদ্স দিবস ঘোষণা করে মুসলমানদের জন্য একটি ঐক্যের প্লাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছেন। দুনিয়ার মুসলমানদের কাছে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মুসলিম দেশসমূহকে তিনি ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে গেছেন। সেই আহ্বানকে স্বাগত জানিয়ে আমাদেরকে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। আর ইসলামি ঐক্যের সাথে সাথে প্রকৃত সমস্যাকে চিহ্নিত করতে হবে। আমাদেরকে বৈজ্ঞানিক ও সামরিক শক্তিতে যেমন বলিয়ান হয়ে তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও প্রতিহত করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
মাসিক মদীনা সম্পাদক আরবের কবি আহমদ শাওকির একটি লাইন উদ্ধৃত করে এর অর্থ করেন যে, ‘আল-কুদ্স মুসলমানের কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদই শুধু নয়, আল-কুদ্স হচ্ছে মুসলমানদের ঈমানের স্তম্ভ। মুসলমানের ঈমান এবং অস্তিত্বের জন্য মক্কা, মদীনা এবং আল-কুদ্স অবিনাশী অংশরূপে অপরিহার্য। এর কোনো একটি মুসলমানের হাতছাড়া হয়ে গেলে মুসলমানদের বিপর্যয়ের সীমা থাকবে না।’
তিনি বলেন, ইহুদিরা হচ্ছে সেই অভিশপ্ত জাতি যারা তাদের নবীদেরকে হত্যা করেছে। যারা আল্লাহকে গালি দেয়। আর যারা তাদের ধর্মগ্রন্থকে বিকৃত করেছে। তারা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পৃথিবীতে বড় বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। একথা কোরআনেও রয়েছে। এই সব ইহুদির অনেক দিনের স্বপ্ন যে বায়তুল মুকাদ্দাস ভেঙে তারা হায়কলে সোলায়মানী বানাবে। তাই তারা এখন আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স-এর সহযোগিতা প্রাপ্তির সাথে সাথে মুসলিম বিশ্বের কিছু ভোগবাদীর রাজা-বাদশাদেরকেও হাত করে ফেলেছে। এই গণবিচ্ছিন রাজা-বাদশাহরা তাদের ক্ষমতার স্বার্থে ইহুদিদের সাথে হাত মিলিয়েছে। ইহুদিদের ব্যাপারে ইসলামের অনেক মনীষী মুসলমানদেরকে সাবধান করে দিয়েছেন। কোরআনেও বলা হয়েছে, তোমরা ইহুদি-নাসারাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। মোজাদ্দেদে আলফেসানী (র.) তাঁর লেখায় ও শাহ নেয়ামতউল্লাহ কাশ্মিরি (র.) তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীতে উল্লেখ করেছেন ইহুদিদের নৃশংসতা ও বর্বরতার কথা। তাঁরা বলেছেন যে, মুসলমানরা যদি নিজেদেরকে ইহুদিতে পরিণতও করে তবু তারা ইহুদি ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচতে পারবে না।
হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ আফতাব হোসেন নাকাভী বলেন, সত্তর বছর যাবৎ ফিলিস্তিনিরা নির্যাতিত হলেও ইনশাআল্লাহ এই নির্যাতনের দিন অচিরেই শেষ হয়ে যাবে। সারা দুনিয়ায় একটি জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর নেতৃত্বে আল-কুদ্সের ঘোষণার পর সেটি বিশ্বের মুসলমানরা গ্রহণ করেছে। এখন আমাদের শুধু দরকার কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার। মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের প্রতিবন্ধক সকল বিষয় দূর করতে হবে। মুসলমানদের মাঝে সঠিক দ্বীনী চেতনা যা আহলে বাইতের মাঝে ছিল সেটার প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হবে। তরুণদেরকে সজাগ করতে হবে ও তাদেরকে দ্বীনী বিষয়ে আগ্রহী করতে হবে যাতে অপসংস্কৃতি তাদেরকে গ্রাস করতে না পারে। তাদেরকে মুসলমানদের প্রকৃত ইতিহাস শেখাতে হবে ও তাদের ভৌগোলিক, ঐতিহ্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। ফিলিস্তিন, মিয়ামনারসহ যে কোনো জায়গায় মুসলমানরা নির্যাতিত হলে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে ও তাদের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে বুলন্দ করতে হবে।
স্বাগত ভাষণে জনাব এ কে এম বদরুদ্দোজা বলেন, ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনি গণহত্যা যেন আজ সেখানকার জনগণের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন সেখানে কোনো না কোনো স্থানে মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। যেমনিভাবে বিশ্বের নানা স্থানে মুসলমানদেরকে হত্যা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইমাম খোমেইনী (র.)-কর্তৃক আল-কুদ্স দিবসের যুগান্তকারী ঘোষণা বিশ্বে সত্যিকার অর্থেই একটা প্রভাব ফেলেছে। যত নির্যাতনই চালাক না কেন ইহুদি যায়নবাদী ইসরাইল নৈতিকভাবে পরাজিতই হচ্ছে। এর বাস্তব প্রমাণ হলো সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল টিম কর্তৃক ইসরাইলি টিমের সাথে প্রীতি ফুটবল ম্যাচকে বয়কট করে দেয়া। শুধু মুসলমানই নয়, ফিলিস্তিনি মানবতার ওপর ইসরাইলি বর্বরতা সকল মানবতাবাদী মানুষেরই ঘৃণা কুড়িয়েছে। আর ইমামের ঘোষিত আল-কুদ্স দিবস সারা বিশ্বে সত্যিকার অর্থেই একটা জাগরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। তাই নেতানিয়াহুর টেলিফোনে অনুরোধ সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা টিম লিডার মেসি সহ পুরো দলের মন গলানো যায় নি। কারণ, এর ভেতর এক ইসরাইলি রাজনৈতিক প্রতারণা লুক্কায়িত ছিল, তা তারা বুঝতে পেরেছে।
তিনি বলেন, আজকে ট্রাম্প-এর প্রচেষ্টায় জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থাপনের চেষ্টায় একটা ধাক্কা খেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেউ জেরুজালেমে তাদের দূতাবাস স্থানান্তর করে নি। পৃথিবীর মানবতাবাদীরা বিবেকের বিচারের ডাকে সাড়া দিয়েছে। সেটি এই আল-কুদ্সের চেতনা সম্প্রসারণেরই ফল।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন লেখক গবেষক অধ্যাপক ড মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান। পবিত্র কালামে পাক থেকে তেলাওয়াত করেন ক্বারী সাইয়্যেদ মোহাম্মদ রেজা রাজাভী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘আল্লাতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান’ শীর্ষক ঈমানী চেতনা জাগানিয়া গানটি গেয়ে শোনান রেডিও তেহরানের সাবেক সংবাদ পাঠক, কবি ছড়াকার ও মর্সিয়া লেখক জনাব শাহনেওয়াজ তাবিব।
সেমিনারের আগে জুমআর নামাযের পর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আল-কুদ্স দিবস উপলক্ষে মানবতার দুশমন ইহুদিবাদী ইসরাইলি বর্বরতার প্রতিবাদ করে ও ফিলিস্তিনি জনতার সংগ্রামের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এক মানব বন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আজকের ভোলা সম্পাদক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শওকাত হোসাইন। মানববন্ধনে বক্তৃতা দেন আল-কুদ্স কমিটি বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল মোস্তফা তারেকুল হাসান, মাওলানা শাখাওয়াত হোসেন, জনাব আবু বকর সিদ্দিক, কবি আমিন আল আসাদ ও মাওলানা মুহিবুল্লাহ প্রমুখ।

আমিন আল আসাদ

খুলনায় আল-কুদস দিবস পালিত

আন্তর্জাতিক আল-কুদ্স দিবস উপলক্ষে আঞ্জুমান-এ-পাঞ্জাতানী ও আহলে বাইত (আ.) ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গত ৮ জুন বাদ জুমা’ নগরীর আঞ্জুমান-এ-পাঞ্জাতানী ইমামবাড়ী হতে এক বিক্ষোভ র‌্যালী বের হয়ে নগরীর আলতাপোল লেন ও সাউথ সেন্ট্রাল রোড প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রে এসে শেষ হয়। র‌্যালীতে ইসরাইলের পতাকা পুড়িয়ে ইহুদিবাদী অত্যাচারী রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা হয়।
র‌্যালী শেষে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহীম খলিল রাজাভী বলেন, বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের ওপরে যে বর্বর অত্যাচার জুলুম নেমে এসেছে সে প্রেক্ষাপটে আজ মুসলমানদের মধ্যে সকল বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। বিশ্ব আল-কুদস দিবস পালন করার উদ্দেশ্য হল ফিলিস্তিনিদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা এবং এটা বোঝানো যে আমরাও তাদের সাথে আছি। সেখানে যে ষড়যন্ত্র চলছে তার স্বরূপটি হলো সিরিয়া ও ইরাকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে উস্কানি দিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে তাদেরকে ব্যস্ত রেখে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানো।