বুধবার, ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরান ভ্রমণ বিষয়ক সাক্ষাৎকার

পোস্ট হয়েছে: ডিসেম্বর ৮, ২০১৬ 

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে গত ২-২৯ আগস্ট, ২০১৬ সাদী ফাউন্ডেশন ও আল্লামা তাবাতাবায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে মাসব্যাপী ৮৩তম ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের মানোন্নয়ন কোর্সের আয়োজন করা হয়। এ কোর্সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল (এম.এ.), এমফিল এর ছাত্রী মেহজাবিন ইসলাম ও নাজমুন্নাহার অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ৪১টি দেশের দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর মাঝে ছেলেদের ক্যাটাগরিতে মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল প্রথম স্থান, মেয়েদের ক্যাটাগরিতে মেহজাবিন ও নাজমুন্নাহার যথাক্রমে প্রথম ও পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। নিউজলেটারের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল ও মেহজাবিন ইসলামের সাক্ষাৎকার পত্রস্থ করা হল।

প্রশ্ন ১ : ফারসি মানোন্নয়ন যে কোর্সে আপনি অংশগ্রহণ করেছেন তার আয়োজন সম্পর্কে কিছু বলুন।

মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল : ২০০১ সালে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ভ্রমণের প্রচ- ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ছাত্রজীবন অতিক্রম হয়ে গেলেও তা আর হয়ে ওঠে নি। একই বিভাগে চাকুরির বদৌলতে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ভ্রমণের জন্য মনোনীত হলেও নানা কারণে আর যাওয়া হয় নি। ২০১৬ সালে বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান ও বিভাগের অন্যান্য শিক্ষক মহোদয়ের অনুপ্রেরণায় এবং ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মাননীয় কালচারাল কাউন্সেলর জনাব সাইয়্যেদ মূসা হোসেইনীর আন্তরিক সহযোগিতায় এবছর ইরান সফরের ইচ্ছা পূরণ হয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে, এবছর ইরানের ‘সাদী ফাউন্ডেশন’ ও আল্লামা তাবাতাবায়ি বিশ্ববিদ্যালয় ইরানের রাজধানী শহর তেহরানে এ কোর্সের আয়োজন করেছিল। ফারসি ভাষা মানবতার ভাষা। বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক, যেমন, রুমি, জামি, হাফিজ, সাদীসহ আরো অনেকে এ ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন যা বিশ্বব্যাপী বহুল সমাদৃত। বিশ্বের নতুন প্রজন্মের কাছে এ মানবতার ভাষা, ইরানের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ইরান সরকারের সহায়তায় প্রতি বছরের ন্যায় ইরানের ‘সাদী ফাউন্ডেশন’ ও ‘আল্লামা তাবাতাবায়ি বিশ্ববিদ্যালয়’ ৮৩তম কোর্সটি আল্লামা তাবাতাবায়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আয়োজন করে। অন্যান্য বছরের বছরের তুলনায় এ বছরই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী এ কোর্সে অংশগ্রহণ করে। বিশ্বের ৪২টি দেশের (ইউরোপ, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা মহাদেশসহ) ২১২ জন শিক্ষার্থী এবারের কোর্সে অংশগ্রহণ করে।

মেহজাবিন ইসলাম : আমি মেহজাবিন ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে এখন এম.ফিল প্রোগ্রামে গবেষক হিসেবে নিয়োজিত আছি। এ বছর ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ৮৩তম উচ্চতর মানোন্নয়ন কোর্সটি ২ আগস্ট থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়। একমাসব্যাপী বুনিয়াদে সাদী (সাদী ফাউন্ডেশন) ও আল্লামা তাবাতাবায়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের এ উচ্চতর মানোন্নয়ন কোর্সে বাংলাদেশ থেকে আমরা তিনজন অংশগ্রহণ করি। আমার অপর ২ জন কোর্স সঙ্গী হলেন মোঃ ইব্রাহীম খলিল ও মোছাঃ নাজমুন নাহার। উল্লেখ্য যে, এ বছর ৫টি মহাদেশের ৪২টি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ., এম.ফিল, পি.এইচ.ডি-এর প্রায় ২১২ জন শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হয় এ কোর্স। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো হলÑ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, কলম্বিয়া, আর্মেনিয়া, ইউক্রেন, জর্জিয়া, তুরষ্ক, সিরিয়া, ইরাক, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, তুর্কি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, আলজেরিয়া ও আজারবাইজানসহ অন্যান্য দেশ। আমাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক মানের কোর্সে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ায় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোঃ আব্দুস সবুর খান ও ঢাকাস্থ ইরানিয়ান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সম্মানিত কালচারাল কাউন্সেলর জনাব সাইয়্যেদ মূসা হোসেইনীকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই।

প্রশ্ন ২ : কোর্সে অন্তর্ভুক্ত বিষয়াবলি, প্রশিক্ষণের ধরন, শিক্ষকদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলুন।
মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল : এবারের কোর্সে অন্যান্য বছরের কোর্স থেকে একটু ভিন্নধর্মী আয়োজন ছিল। এবারের কোর্সে পড়ালেখার পাশাপাশি গান, কবিতা, কৌতুক, যুব দিবসের আয়োজন, নারী দিবসের আয়োজন, হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ, ক্যালিগ্রাফি ও বিখ্যাত নিদর্শনসমূহের স্বচক্ষে পরিদর্শন ও বাস্তব জ্ঞান আহরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদানরত বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী শিক্ষকদেরকে এ কোর্সের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। তাঁরা তাঁদের আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাঁদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমলব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দ্বারা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছেন। এছাড়াও ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষকগণও এ কোর্সে পাঠদান করেন। এ কোর্সের পাঠদান পদ্ধতি দেখে আমার মনে হয়েছে, যে কোনো ভাষার অন্তঃনির্হিত জ্ঞানার্জনের জন্য সে ভাষার শিক্ষক আবশ্যক।

মেহজাবিন ইসলাম : ৮৩তম ফারসি ভাষার মানোন্নয়ন কোর্সটি আল্লামা তাবাতাবায়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা ও হিসাবরক্ষণ অনুষদে সম্পন্ন হয় এবং এ বিশ্ববিদ্যালয়ের (خوابگاہ سلامت شمالی) দক্ষিণ সালামত হলে আমাদের আবাসনের ব্যবস্থা ছিল। কার্যক্রমটি ২টি অংশে বিভক্ত ছিল। প্রথমটি ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক পাঠদান ও অপরটি নানাবিধ সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও প্রতিযোগিতার আয়োজন। এ শিক্ষাকার্যক্রমের প্রথম অর্থাৎ মূল অংশের বিষয়াবলি হচ্ছে ফারসি পদ্য ও গদ্যের বিভিন্ন সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য, ইরান স্টাডিজ, ফারসি ভাষার ইতিহাস, ফারসি ব্যাকরণ পদ্ধতি, ফারসি কথপোকথন, ফারসি লিখনপদ্ধতি, ক্যালিগ্রাফি প্রশিক্ষণ, পারস্য স্টাইলের হস্তশিল্প বুনন পদ্ধতি ইত্যাদি। এ শিক্ষাকার্যক্রমের দ্বিতীয় ভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল ফারসি কবিতা আবৃত্তি, কাব্যিক ছন্দের খেলা, গান, কৌতুক, টেলিভিশন লাইভ শো, যুব দিবস বিতর্ক, খেলা, পত্রিকা অফিসে সাক্ষাৎকার প্রদান ও নারী দিবসে গল্প বলার ইভেন্ট। অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, এই দ্বিতীয় অংশটি এবারই প্রথম ফারসি ভাষার মানোন্নয়ন কোর্সে সংযুক্ত করা হয়েছিল এবং আমি প্রায় প্রত্যেকটি ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেছিলাম ও কবিতা আবৃত্তির জন্য সর্বমহলে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হই।
একমাসব্যাপী এ কোর্সে প্রতি ক্লাসে ৮ জন করে শিক্ষক মোট ৬০টি ক্লাস নেন যার সময়সীমা ছিল প্রায় ৭২ ঘণ্টা। বুনিয়াদে সাদী এ শিক্ষাকার্যক্রমের জন্য ইরানের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে অত্যন্ত দক্ষ ও জ্ঞানী শিক্ষকবৃন্দকে নির্বাচিত করেন। আর এ শিক্ষকম-লী দক্ষতার সাথে ভিন্ন ভাষাভাষী শিক্ষার্থীদেরকে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষা দেন। উল্লেখ্য যে, ফারসি কথপোকথনের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও বুনিয়াদে সাদী প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে সহযোগী নিযুক্ত করেন। এসব সহযোগী সার্বক্ষণিক আমাদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। কখনো কোর্স সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে আবার কখনো পাঠদান করে। আমি এ সকল বন্ধুপ্রতিম সহযোগী ও শিক্ষক, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এ কোর্সটি সফল হয়েছে তাঁদের প্রতি আমার হৃদয় নিংড়ানো ধন্যবাদ জানাচ্ছি ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

প্রশ্ন ৩ : এই কোর্সে পরিবেশ থেকে ফারসি শিক্ষার কোন কার্যক্রম ছিল কি- যেমন শিক্ষাসফর, স্থান পরিদর্শন, সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ ইত্যাদি?

মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল : এ কোর্সে শিক্ষাসফরও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইরানের বিখ্যাত ও প্রাচীন শহর ‘ইসফাহান’ ভ্রমণ এ কোর্সের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমরা সেখানে ৩ দিন অবস্থান করে বিখ্যাত জায়গাগুলো দেখে বাস্তব জ্ঞান লাভ করেছি। ইসফাহানকে ‘নেসফে জাহান’ অর্থাৎ অর্ধেক দুনিয়া বলার কারণ স্বচক্ষে উপলব্ধি করেছি। এছাড়া প্রতিদিন ক্লাসের শেষে এবং ক্লাস ছুটির দিনগুলোতে রাজধানী শহর তেহরান ও এর আশেপাশের বিখ্যাত স্থানগুলো আমরা তাঁদের তত্ত্বাবধানে ভ্রমণ করেছি। আমরা অল্প ক’দিনে ইরানের এতো বিখ্যাত স্থান ভ্রমণ করেছি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক জনাব মোঃ মুমিত আল রশিদ- যিনি ইরানের ‘শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ে’ পিএইচডি অধ্যয়নরত আছেন তিনি এ স্থানগুলোর বর্ণনা শুনে বলেন, ‘আমি ৪ বছর তেহরান আছি, আমিও এত স্থান ভ্রমণ করিনি।’ আমি আর একটি বিষয় লক্ষ করেছি যে, ইরানিরা খুবই সংস্কৃতিমনা। সুযোগ পেলেই তারা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। যেমন কোর্স শুরুর প্রথম দিনÑঅনেকেই তখনো ইরানে এসে পৌঁছায় নিÑতারা ইরানের নারী দিবস উপলক্ষে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে ফারসি ভাষায় বিভিন্ন পর্ব ছিল। গান, গল্প, কবিতা, অভিনয় ইত্যাদি। আমি সেখানে কৌতুক পর্বে অংশগ্রহণ করে সুনাম অর্জন করি। প্রথম দিনের কৌতুকেই আমি বাংলাদেশকে সবার কাছে পরিচিত করে তুলি।

মেহজাবিন ইসলাম : এই শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা ফারসি ভাষার জন্মভূমি ইরানের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন, শিক্ষাসফর, সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে বিশেষ করে ফারসি ভাষাভাষী মানুষের সাথে মিশে তাদের কাছ থেকে ফারসি ভাষা শিক্ষার একটা বড় সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার কাছে এ পুরো কোর্সটিই একটি শিক্ষাসফর বলে মনে হয়েছে। আমরা তেহরান ও ইসফাহানের প্রায় ৩৮টি দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করি। তেহরানের দর্শনীয় স্থানগুলোর অন্যতম হল : সুউচ্চ মিলাদ টাওয়ার, ইরানের জাতীয় গ্রন্থাগার, বইয়ের শহর, আজাদী মিউজিয়াম, সা’দ অ’বা’দ রাজপ্রাসাদা, পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ মিউজিয়াম, সিনেমার উপশহর, জামারানে ইমাম খোমেইনী (র.)-এর বাড়ি, তাজরীশ বাজার, মিউজিক মিউজিয়াম, জাতীয় বোটানিকাল গার্ডেন, তেহরানের আসমাননামা, কাচ ও সিরামিক মিউজিয়াম, গুলিস্তান ও আর্ট গ্যালারি ও নবাব গোসলখানা, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, ৩০ তীর সড়ক, জাতীয় জাদুঘর ও হযরত মারইয়াম গির্জা, পা’লা’দিউম শপিং মল, তেহরান নভো থিয়েটার, অলিম্পিক সিনেমা হল।
এ সমস্ত দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের মাধ্যমে আমরা ইরানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করি, যার জ্ঞান একজন ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন ৪ : আপনার ফারসি ভাষার মান এ কদিনে কেমন উন্নত হলো বলে আপনি মনে করেন? আপনার অর্জন-সাফল্যের অনুভূতি জানতে চাই। এ মানকে অগ্রসরমাণ রাখতে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন।

মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল : সত্য বলতে, আমি ফারসির ছাত্র হিসেবে খুব ভালো ছিলাম না। ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে আমার জ্ঞান খুবই অপ্রতুল। তবুও এ অল্প ক’দিনে ফারসির দেশে ফারসি ভাষাভাষী জনগণের সাথে থেকে তথা ফারসির মধ্যে থেকে (যেহেতু কোর্সে অংশগ্রহণকারী সবাই ফারসি বলতো) আমার ফারসি জ্ঞান অনেক এগিয়েছে। আমি এখন ইরানিরা কথা বললে সবই বুঝতে পারি, হয়তো পরিপূর্ণভাবে সব কথার উত্তর দিতে পারি না। আসলে কোনো ভাষা শিখতে হলে সেই ভাষার লোকদের সাথে কথা বললে অনেক সুবিধা হয়। আমরা যেহেতু সেখানে অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছি, আলোচিত হয়েছি, টিভিতে সরাসরি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছি, বিভিন্নœ পত্র-পত্রিকায় আমাদের ছবিসহ খবর ছাপানো হয়েছে, আমাদের বাংলাদেশকে উপস্থাপন করে সকলের কাছে পরিচিত করতে পেরেছি এতে আমরা অনেক আনন্দিত ও উৎসাহিত হয়েছি। আমি এ অর্জন থেকে উৎসাহিত হয়ে সামনে ফারসি ভাষার ওপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে চাই। এছাড়া ইরানে আরো এ ধরনের আরো কোর্সে অংশগ্রহণ করে ফারসি চর্চার এ ধারা অব্যাহত রাখতে চাই।

মেহজাবিন ইসলাম : ফারসি ভাষা পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষা ও সাহিত্যগুলোর অন্যতম। এ ভাষায় রয়েছে সুদীর্ঘকালের ইতিহাস, জ্ঞান, বিজ্ঞান, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অমূল্য রতœরাজি। জীবন্ত, সাবলীল ও কবিতার ভাষা হিসেবে পরিচিত এ ফারসি ভাষাকে বিশেষ করে এ ভাষার বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠিত বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেছিলাম। ফারসি ভাষার প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে এ ভাষাকে আরো ভালোভাবে জানার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পড়া-লেখার পাশাপাশি আমি ইরানি কালচারাল সেন্টার থেকে জুনিয়র ও ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে সিনিয়র, ডিপ্লোমা ও হায়ার ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করি। উল্লেখ্য যে, স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ফারসি বিষয়ক এ চারটি কোর্সেই আমি ১ম বিভাগে ১ম স্থান অধিকার করি। এরই স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ডিন্স অ্যাওয়ার্ড’ও পাই। এত সাফল্যের পরেও দীর্ঘদিন থেকে মনের গভীরে ইরান দেখার ও ইরানের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ফারসি শোনার একটি বাসনা বিরাজ করছিল। আর আমার এই বাসনা পূর্ণতা পায় এ বছর আগস্টে ইরানের ৮৩তম ফারসি কোর্সে অংশগ্রহণ ও ভালো ফলাফলের মাধ্যমে।
বুনিয়াদে সাদী কর্তৃক আয়োজিত এ কোর্সটি ভিন্ন ভাষাভাষী ফারসি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর আমার কাছে এ কোর্সের গুরুত্ব অবর্ণনীয়। এ কয়েকদিনে আমার ফারসি কথপোকথনে ও ফারসি সাহিত্যের ব্যাখ্যা প্রদানে এক অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। ক্লাস, ক্লাস পারফরম্যান্স, সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম, ভ্রমণ, স্থান পরিদর্শন এক কথায় সবকয়টি ইভেন্টে আমার শতভাগ উপস্থিতি ছিল এবং আমি সর্বাধিক পুরস্কারপ্রাপ্ত হই। আমার অর্জন ও সাফল্য সেদিনই পূর্ণতা পেয়েছিল, যেদিন আমার শ্রেণিশিক্ষক জনাব নাভিদী (آقای نویدی) স্যার বলেন, ‘উপমহাদেশে ভিন্ন ভাষাভাষী ফারসি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মধ্যে বাংলাদেশীরা সবচেয়ে বেশি দক্ষ ও পারদর্শী এবং তুমি ফারসিতে আরও অনেক ভালো করবে, তোমাকে আবারও ইরানের মাটিতে দেখতে পাব।’
একথা শোনামাত্র একদিকে যেমন আনন্দে উদ্ভাসিত হয়েছিলাম, অন্যদিকে তেমনি আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করেছি বাংলাদেশী হিসেবে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার যে মহান দায়িত্ব নিয়ে আমি ইরানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলাম, তা সফলতার সঙ্গে পালনে সক্ষম হওয়ায়।
ফারসি ভাষার এ মানকে অগ্রসরমাণ রাখতে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হল, বেশি বেশি ফারসি বই পড়া, গবেষণার কাজে নিয়োজিত থাকা, ফারসি বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ করা, ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদের কাজ করা, কবিতা আবৃত্তি করা, ফারসি সিনেমা দেখা, গান শোনা ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা, বেশি করে ফারসি শব্দভা-ার ও ব্যাকরণ আয়ত্ত করা এবং ফারসি কথপোকথনের চর্চা রাখা। এছাড়া এ কোর্সের বদৌলতে যে সমস্ত ইরানি শিক্ষক ও বন্ধু পেয়েছি তাঁদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা। ফারসির এ উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখতে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.ফিল প্রোগ্রাম শেষে ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় অথবা আল্লামা তাবাতাবায়ি বিশ্ববিদ্যালয়ে পি.এইচ.ডি পর্যায়ে পড়াশুনা করব ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন ৫ : এ কদিনে রাষ্ট্র হিসেবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে কেমন দেখলেন কিছুটা খুলে বা বর্ণনা করে বলুন।

মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল : ইরান একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে একটি দেশের যে সকল বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন ইরানের আছে বলে আমার মনে হয়েছে। ইরানে নারীদের যেমন চলাফেরার স্বাধীনতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। এখানে নারী-পুরুষ সবাই সবার অধিকার সম্পর্কে সচেতন। এখানে জনগণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপনে বিশ্বাসী। সেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি লক্ষণীয়। ইরানিরা দিনে-রাতে যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং করে রাখে। কোনো গাড়িরই কিছু হয় না। রাস্তায় চলতে, বাসায়-বাড়িতে গেলে ইরানিদের আতিথেয়তা লক্ষণীয়। অফিস-আদালত, ব্যাংকে প্রায় প্রতিটি টেবিল বা ডেস্কে চকলেটের ব্যবস্থা রয়েছে। কেউ গেলে প্রথমে তাকে এ চকলেট দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়। এছাড়া ইরানিরা খুবই হৃদয়বান। কাউকেই তারা বিপদে ফেলতে চায় না। আবার কেউ বিপদে পড়লেও তাকে উদ্ধারে তারা এগিয়ে আসে। ইতিহাসে দেখা যায় যে, ইরানে যতগুলো হামলা হয়েছে সেগুলোর একটিতেও ইরানিরা আগে কাউকে হামলা করে নি। এ থেকে বুঝা যায় যে, ইরানি একটি ভদ্র জাতি। ইরানিরা খুবই পরিশ্রমী জাতি। এখানে নারী-পুরুষ সবাই খুব পরিশ্রম করেন। এ কারণেই তারা দিনের পর দিন উন্নতির শিখরে পৌঁছার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মেহজাবিন ইসলাম : ইরান দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বত ও মরুভূমি ঘেরা বন্ধুর দেশ ইরান। এখানে হিমালয়ের পরেই এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ দামাভান্দ অবস্থিত। আধুনিক ফারসি ইরানের সরকারি ভাষা। দেশটির জনগণ জাতিগত ও ভাষাগতভাবে বিচিত্র হলেও এরা প্রায় সবাই মুসলিম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলটি ইসলামের শিয়া মতাবলম্বীদের কেন্দ্র। পারস্য বা ইরান প্রাচীনকাল হতে একটি গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার লীলাভূমি হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান দখল করে আছে। ইরানের জনগণ উন্নত রুচিবোধ ও সংস্কৃতিবহুল জীবনে অভ্যস্ত। ইরানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভা-ার রয়েছে। পারস্য উপসাগরের অন্যান্য তেলসমৃদ্ধ দেশের মতো ইরানেও তেল রপ্তানি বিশ শতক থেকে দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লব গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটায় এবং ইরানে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র স্থাপন করে। সৌদি আরবের পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। ১৬,৪৮,০০০ বর্গকিলোমিটার আয়তন ও ৩০টি প্রদেশে বিভক্ত এ বিশাল দেশটির মাত্র ৩টি প্রদেশ যথাক্রমে- রাজধানী তেহরান, ইসফাহান ও কোম শহর দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। আমি মনে করি, আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা কম হওয়ায় ও আইনের শাসন বলবৎ থাকায় ইরানের লোকজন খুবই স্বাচ্ছন্দে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে, যানজটমুক্ত পরিবেশে ও নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে জীবন-যাপন করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানকে আমার কাছে সুসজ্জিত দেশ বলে মনে হয়েছে। ইরান উন্নয়নশীল দেশ হলেও এ সমস্ত বিবেচনায় উন্নত দেশের মতই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি খাতে ইরান অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে। যেমন- সামরিক খাত, চিকিৎসা খাত, পারমাণবিক খাত, আধুনিক বিজ্ঞান, খেলাধুলা ও সংবাদমাধ্যম ইত্যাদি। আর এ উন্নতি ও অগ্রগতির ধারা সূচিত হয়েছিল মূলত ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমেই। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক অবরোধ প্রত্যাহার করায় দেশটি ভবিষ্যতে উন্নয়নশীল আয়ের থেকে উন্নত আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে আশা করা যায়।

প্রশ্ন ৬ : ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণ ও নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?
মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল : ইরানের জনগণ স্বাধীনতাপ্রিয়। স্বাধীনভাবে চলাফেরায় তারা স্বাচ্ছন্দবোধ করে। তবে তারা অপরের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। তারা কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করে না। তবে যদি কেউ তাদের ওপর অন্যায়ভাবে কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে চায় তখন তারা খুবই কঠোর হয়। ইরানের নেতৃবৃন্দ খুবই সহজ-সরল। তাঁরা নিজেদের স্বার্থকে প্রাধ্যান্য দেন না। তাঁরা নিজেদেরকে জনগণের সেবক বলে মনে করেন। তাঁদের মধ্যে কোনো গর্ব-অহংকার নেই। এখানে সবাই নিজের কাজ নিজেই করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এ কারণেই প্রতিটি পরিবারে একাধিক গাড়ি থাকলেও কোনো ড্রাইভার নেই। এখানে মন্ত্রী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিও নিজে গাড়ি চালিয়ে অফিসে আসেন। সব মিলিয়ে এই বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে ইরান একটি শান্তির দেশের প্রতিচ্ছবি।

মেহজাবিন ইসলাম : ইরানের রাজনীতি একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে গৃহীত সংবিধান এবং ১৯৮৯ সালের সংশোধনী ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করেছে। আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী বর্তমানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও ড. হাসান রুহানি দেশটির নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। আরও আছে ২৯০জন সদস্যবিশিষ্ট একপাক্ষিক আইনসভা।
এই কোর্সের মাধ্যমে আমার ইরানের নেতৃস্থানীয় দুজন ব্যক্তি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করার সৌভাগ্য হয়েছে। একজন হলেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক ও ইরানি জাতির পথপ্রদর্শক ইমাম খোমেইনী ও ইরানের সাবেক স্পিকার হাদদাদ আদেল; যিনি বুনিয়াদে সাদীর প্রধান। ইমাম খোমেইনী তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে ইরানি জাতির নিকট চিরজীবন লাভ করেছেন। ইমাম খোমেইনীর বসবাসের জায়গা, ব্যবহৃত আসবাবপত্র দেখে তাঁর অতি সাধারণ জীবন-যাপন আমাকে মুগ্ধ করেছে। জানতে পেরেছি, ইসলামের অনুশাসন ও নিয়ম-শৃঙ্খলায় পরিবেষ্টিত ছিল তাঁর সমগ্র জীবন। হাদদাদ আদেল একজন শিক্ষিত, ভদ্র, রুচিশীল, পরিমার্জিত, দায়িত্বশীল, সাহিত্যপ্রেমি ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। তাঁর স্বরচিত কবিতা ও বক্তৃতা আমাকে ম্গ্ধু করেছে। তিনি আমার গাওয়া হাফিযের গজল শুনে নিম্নোক্ত বেইতটির অবতারণা করেন:
باھر ستارہ ای سرو کارست ھر شبم
از حسرت فروغ رخ ھمچو ماہ تو
শুধু ইরানের নেতৃবৃন্দ নয়, ইরানের সাধারণ জনগণও অত্যন্ত সভ্য ও দায়িত্বশীল, অতিথিপরায়ণ, ধর্মপরায়ণ, কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান, আন্তরিক ও সৌজন্যবোধসম্পন্ন।

প্রশ্ন ৭ : এই কোর্স চলাকালীন ইরান অবস্থানকালে আপনার একটি স্মরণীয় স্মৃতি জানতে চাই।

মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল : ইরানে অবস্থানকালে দিনগুলো খুবই আনন্দে ও কর্মতৎপরতায় কেটেছে। প্রতিদিন সকালে উঠে রেডি হয়ে ক্লাসে যাওয়া, ক্লাস শেষে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, রাতে হোস্টেলে ফিরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া এসবের মধ্যেই বেশি সময় কেটেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন স্থান ভ্রমণে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। প্রতিদিনই যেন এক একটি স্মৃতির দিন। এর মধ্যে অনেক বিশেষ স্মৃতিও রয়েছে। যেমন একদিন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে গিয়েছি। সেখানে সবাইকে পরিচয়পত্র দেখিয়ে প্রবেশ করতে হয়। আমাদের গাইড বললেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার আসছেন। আমরা তাকিয়ে আছি। এর মধ্যে একটি গাড়ি আসতে দেখলাম। গাড়িটি গেটে এসে থামলো। দারোয়ান বসে আছে। তারপর গাড়িতে থাকা ভদ্রলোক গাড়ির জানালা খুলে হাত উঁচু করে দারোয়ানকে আইডি কার্ড দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। আমি গাইডের কাছে জানতে চাইলাম, ভিসি স্যার কোথায়? তিনি বললেন, উনি নিজেই ভিসি। এখানে সবাইকে আইন মানতে হয়। ভিসিও এর বাইরে নয়। তিনি আরো বললেন, কিছুদিন আগে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে দারোয়ানের রিপোর্ট মোতাবেক পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

মেহজাবিন ইসলাম : কোর্স চলাকালীন ইরানি যুবদিবস পালনের জন্য মিলাদ টাওয়ারে এক জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রথম ১৫ দিনে ছাত্র-ছাত্রীদের ফারসির মানের উন্নতির ওপর ভিত্তি করে প্রথম ১০ জনকে ক্রেস্ট প্রদান ও পুরস্কৃত করা হয়। নাম ঘোষণার সময় যখন আমি আমার নাম শুনতে পাই, একপ্রকার বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলাম; নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কেননা, এ ব্যাপারে আমাকে আগে থেকে কিছুই বলা হয়নি। এ ঘটনাটিই আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয়, যা কখনো আমার স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে না।

প্রশ্ন ৮ : বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি ভাষার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ফারসির মানোন্নয়নে করণীয় সম্পর্কে কিছু বলুন।
মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল : আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে যখন মুসলিম শাসকগণ ছিলেন তখন প্রায় ছয়শ’ বছর এ অঞ্চলের দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফারসি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকাল শুরু হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে এ ভাষার চর্চা কমে যায়। বর্তমানেও শুধু কয়েকটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি চর্চা অব্যাহত রয়েছে। কয়েক বছর আগেও এ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ছাত্র ছিল হাতেগোনা। কিন্তু দিনদিন এর পরিসর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন অন্যান্য বিষয়ের মতো ফারসি বিভাগেও অনেক ছাত্রছাত্রী পড়ালেখা করে। তাই ফারসি যাঁরা পড়ান বা পড়েন সকলেরই আন্তরিক হওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলব, যে কোনো ভাষায়ই দক্ষতা থাকলে ভবিষ্যতে সেটা কাজে আসবে। যেহেতু ফারসি বিভাগে তোমরা পড়ালেখা করছ, তাই ফারসির প্রতি আন্তরিক হয়ে ভালোভাবে পড়ালেখা কর, একদিন সফলকাম হবেই। সময় সুযোগ হলে ইরান ঘুরে আসতে পার। তাতে তোমার ফারসি জ্ঞানের উন্নতি হবে।

মেহজাবিন ইসলাম : আমি মনে করি, খুব ধৈর্যসহকারে নিয়মিত অধ্যাবসায়ের মাধ্যমেই যে কোন ভাষাকে আয়ত্ত করা সম্ভব। ফারসি ভাষা শিক্ষা পৃথিবীর যে কোন ভাষা শিক্ষা থেকে সহজ। তাই ফারসি শব্দভা-ার, ব্যাকরণপদ্ধতি ভালোভাবে জানতে হবে এবং কথপোকথনের ওপর জোর দিতে হবে। এজন্য বেশি বেশি ফারসি বই পড়া, সিনেমা দেখা, গান শোনা ও কবিতা আবৃত্তি করা উচিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আমার একটাই অনুরোধ, তারা যেন অন্তত একবার ইরানে অনুষ্ঠিত এই কোর্সে অংশগ্রহণ করে। এই কোর্সটি একদিকে যেমন তাদেরকে ফারসি শিখতে সাহায্য করবে, অপরদিকে নিজেকে মূল্যায়নের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে, যা পরবর্তীকালে তাকে ফারসির মানোন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সহায়ক হবে।