রবিবার, ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের দারাক, যেখানে মরুভূমি মিশে গেছে সাগরে

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ১৮, ২০১৯ 

news-image

উপকূলীয় গ্রাম দারাক, ইরানের ঠিক দক্ষিণে যার অবস্থান। এরপর আর কিছু নাই, আছে ওমান সাগরের বিস্তৃত জলরাশি। যেখানে মরুভূমি আর সাগর মিশে গেছে একে অপরের সাথে। সাগর আর মরুভূমির মিলনে গড়ে উঠেছে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য। এখানেই অবস্থিত ইরানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আদি সৈকত। যার বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে পারেন না এখানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা।

দারাক মূলত একটি সম্ভাবনাময়ী পর্যটন এলাকা যেখানে পাহাড়, বালুয়াড়ি আর প্রবাল সৈকত মিশে গেছে একে অপরের সাথে। স্থানীয় ভাষায় দারাক বা দারাগ অর্থ সাগর তীরবর্তী স্থান। এটা এমন একটা জায়গা যেখানে মুক্ত পানির আলিঙ্গনে বাস করে জ্বলন্ত বালু। এর উপকূলরেখায় ওমান উপসাগর ও ভারতীয় মহাসাগরের পানি টক্কর খায়। বালুময় উপকূলরেখা আর তাল গাছ তৈরি করেছে এক বিস্ময়কর দৃশ্য।

ভৌগোলিক অবস্থান :

দারাক ইরানের সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশের একটি গ্রাম। কোনারাক সীমান্তে জারাবাদ কাউন্টির একটি অংশ গঠন করেছে এই গ্রামটি। জারাবাদের প্রধান শহর জোহলু থেকে ১৯কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। পূর্ব দিক থেকে উপকূলীয় গ্রাম জোদের সাথে দারাকের সংযোগ রয়েছে। এর ঠিক পশ্চিম দিকে পোশতি গ্রাম। গ্রামটির উত্তর দিকে এসে মিশেছে পর্বত আর দক্ষিণ দিক থেকে এসে মিশেছে সাগর।

এখান থেকে সাধারণ রুট দিয়ে পর্যটকরা যেতে পারেন সিস্তান ও বালুচিস্তানের পথে। আবার পর্যটকরা চাইলে সাধারণ রুট বাদ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে অজানা রুট ধরেও সেখানে পৌঁছতে পারেন। মাঝপথ দিয়ে অবিরাম ধীর গতিতে দৌড়ে বালুকাময় উপকূলে পৌঁছা যাবে। সেখানে চোখে পড়বে এক অনন্য দৃশ্য। দৃষ্টিনন্দন প্রকৃতিতে চোখ আটকে যাবে পর্যটকদের। মন জুড়িয়ে যাবে প্রকৃতি জয়ের আনন্দে।

গ্রামটি দক্ষিণাঞ্চলীয় দুই গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর চাবাহার ও বন্দর আব্বাসের মধ্যে অবস্থিত। এটা এমন একটা স্থান যেখানে বালুময় পাহাড়, উপকূল, প্রবাল, পাথর, পর্বত ও পরিবেষ্টিত বন এবং গুছানো ও ঘরোয়া প্রকৃতির দেখা মেলে একসাথে। এখানকার আদিবাসী ও কর্মকর্তাদের প্রশংসনীয় প্রচেষ্টায় গ্রামটির স্বচ্ছতা ও সৌন্দর্য আজও ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। মজার বিষয় হলো ইরানি মানচিত্রে এই গ্রামটিকে দেখা যায় না। আপনাকে এটা ইংরেজি মানচিত্রে খুঁজতে হবে অথবা ইংরেজিতে দারাক কোস্ট নামে অনুসন্ধান করতে হবে। অথবা দারাক বিচ নামে অনুসন্ধান করলে এর ভৌগোলিক অবস্থান খুঁজে পাওয়া যাবে।

দর্শনীয় স্থান ও বিনোদন কেন্দ্র

দারাকের একটি আদিম উপকূলরেখা রয়েছে। অসাধারণ সৈকতের কারণে এটি পর্যটকদের কাছে বেশ সুপিরিচিত। তবে দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্য যাই হোক না কেন এখানকার পর্যটক সম্ভাবনা কখনই কাজে লাগানো হয় নি। এ পর্যন্ত পর্যটন উন্নয়নের জন্য কোনো পদক্ষেপের বিষয়েও ভাবা হয় নি। দারাক যেন উপকূলরেখার অকৃত্রিম আকর্ষণীয় একটি জায়গা। পর্যটকরা নিজে থেকেই যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকেন। যারা একবার ঘুরে এসেছেন তাদের দৃশ্যপট থেকে যেন কখনও মুছে যাবার নয়।

বালিয়াড়ি আর সম্প্রসারিত উপকূলের যুতসই সমন্বয়ে এলাকাটি সাইক্লিং-প্রিয়দের জন্য উপযুক্ত স্থানে রূপান্তরিত হয়েছে। এই অঞ্চলের রাস্তাঘাটগুলো অবসরকালীন মোটরযান চালানোর জন্যও বেশ উপযুক্ত। দারাক গ্রামে চাবাহার সড়ক সংলগ্ন এমন কিছু অস্থায়ী চিহ্ন রয়েছে যা স্পষ্টতই ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি হতে পারে ইরানের অন্যতম সুন্দর উপকূল। সড়কটি দিয়ে যাতায়াতকারীদের চোখে পড়ে প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য। ফলে নিজে থেকেই পর্যটকরা আকৃষ্ট হয়ে থাকেন।

সাগর এলাকার সবচেয়ে উপভোগ্য বিনোদন সাঁতার। সারফিং থেকে ডাইভিং, পানির ভেতরে খেলাধুলা করা যায় এমন যে কোনো ধরনের কার্যক্রমের জন্য এটা অত্যন্ত ভালো জায়গা। কিন্তু এখানেও কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করা হয় নি। তাই এখানকার অপার পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এটা সুসজ্জিত করার কোনো বিকল্প নেই।

পিকনিক, ফটোগ্রাফি ও হাইকিং

গ্রামটি এমনিতেই নয়নাভিরাম। তাই সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে তালগাছের ছায়ায় পিকনিক করতে ভুলবেন না। দীর্ঘপথ যারা পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে চান তাদের জন্যও উপকূলীয় পথটি আদর্শ। চারিদিকে বন আর সারিবদ্ধ তালগাছে ঘেরা পথ দিয়ে যাওয়ার সময় আকাশে তাকালে যেন অন্যরকম দৃশ্য ফুটে ওঠে। পুরো পথ জুড়ে সবসময় চোখে পড়ে বালি ও প্রবাল উপকূলের দৃশ্য। সূর্যাস্তের দৃশ্যও এখানকার অনন্য সৌন্দর্য। এই দৃশ্য দেখে বিমোহিত হবেন না এমন পর্যটক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

সিস্তান ও বালুচিস্তান ইরানের অন্যতম উষ্ণতম একটি প্রদেশ। এখানে কদাচিৎ বৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খরা পরিস্থিতি দেখা গেছে। তবে যাই হোক না কেন দারাক গ্রামে বছরের অধিকাংশ সময় বসন্তকালীন আবহাওয়া বিরাজ করে। এসময় ভারত মহাসাগর থেকে বেয়ে আসে সতেজ বাতাস। যে বাতাস পাহাড়সম ক্লান্তি দূর করে মন ভরিয়ে দেয় উৎফুল্লে।

দারাক ভ্রমণের সর্বোত্তম সময় বসন্তকাল। বিশেষ করে বসন্তের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময়। বসন্তের পরেই ইরানের ঋতুতে দেখা মিলবে গ্রীষ্মের। ফলে গ্রীষ্মের খরতাপ আপনার ভ্রমণের তৃপ্তিতে অনেকটা ভাটা ফেলতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে সাধারণত গ্রীষ্মকালে কম পর্যটকই ভ্রমণ করে থাকেন।

শরতের শুরুতেও এই প্রদেশে উষ্ণতা বিরাজ করে। মৌসুমি বায়ুতে চাবাহার ও উপকূলীয় এলাকাতে একটু বেশিই সতেজতা পাওয়া যায়। দারাক গ্রাম পরিদর্শনের জন্য শীতও একটি ভালো মৌসুম। এসময়ই অনেক পর্যটক ঘুরতে আসেন।

দারাকের অধিবাসী

দারাকের অধিবাসীরা বালুচ জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যারা বালুচ ভাষায় কথা বলে। পুরুষেরা সালওয়ার কামিজ পরিধান করে। বালুচিরা দেখতে অনেকটা বস্তার মতো ঢিলেঢালা প্যান্ট পরে থাকে। দীর্ঘ হাতাওয়ালা কামিজও বেশ ঢিলেঢালা ও লম্বা হয়ে থাকে। এখানকার বাসিন্দারা আফগানিস্তানের মতো একই স্টাইলে সালওয়ার কামিজ পরিধান করে।

বালুচি মেয়েরা হেডস্কার্ফ, লম্বা পোশাক ও সালওয়ার পরে থাকে। তারা রঙিন নকশার ঢিলেঢালা পোশাক ব্যবহার করে। সুন্দর নকশার কারণে পোশাকগুলো বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ।

দারাকের বাসিন্দাদের প্রধান পেশা মাছ ধরা। এছাড়া দ্বিতীয় পেশা হিসেবে কৃষি কাজ করে থাকে। এখানকার মানুষজনের উদারতা প্রবাদতুল্য। দর্শনার্থী ও পর্যটকদের আনন্দদায়ক স্থানীয় খাবার উপভোগ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ঐতিহ্যবাহী মশলা দিয়ে এসব খাবার পাকানো হয়। গ্রামের মেয়েরা বংশানুক্রমিক এমন পদ্ধতিতে রান্না করে যা স্বাদে অতুলনীয়। সর্বশেষ পরিসংখ্যন মতে দারাক গ্রামে প্রায় শ পাঁচেক মানুষ বসবাস করে। যাদের বসতবাড়ি আছে শ খানেকের ওপরে। সূত্র: তেহরান টাইমস।