মঙ্গলবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৭ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ১২, ২০১৭ 

ড. মোহাম্মদ ইকবাল হোছাইন
অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

সংস্কৃতি আসলে একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। একটি জীবনবোধ বিনির্মাণের কলাকৌশল। এটি মানুষের জীবনের একটি শৈল্পিক প্রকাশ, সমাজ জীবনের স্বচ্ছ দর্পণ যা ধীরে ধীরে জাতি গঠনের উপাদান তৈরি করে। এ সকল অর্থের বিবেচনায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে সত্যিকার অর্থে সাংস্কৃতিক না সামাজিক বিপ্লব বলে অভিহিত করা হবে এ নিয়ে গবেষকদের বিতর্ক থাকলেও আত্মম্ভরিতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজমের বিপরীতে ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্কের মূল্যমানের উপর এটি এক সার্থক (আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতি) গণবিপ্লব তাতে সন্দেহ নেই। বিপ্লবের মহানায়ক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনী এমন এক খোদায়ী সংস্কৃতির ছায়াতলে আবদ্ধ হয়ে ইরানি জাতির মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন যেখানে ব্যক্তির খেয়াল-খুশি ছিল নিয়ন্ত্রিত। একদিকে শাহানশাহ উপাধি নিয়ে সারা শরীর স্বর্ণখচিত অহংবোধের পরিচ্ছদে মুড়ানো অত্যাচারী শাসক রেজা শাহ, অপরদিকে খোদার প্রতি অনুগত আত্মত্যাগী এক বান্দা, যিনি সারাদিন মানবতার কল্যাণে জীবন বিলাতে ব্যস্ত, অপরদিকে সারারাত ইবাদাতে মাশগুল থেকে রাব্বুল ইজ্জতের করুণাপ্রার্থী। জনগণ নিশ্চয়ই আত্মত্যাগীকেই বেছে নিবে। তাই হয়েছে রুহুল্লাহর ক্ষেত্রে। তিনি তো ক্ষমতা চাননি, নেনওনি। চেয়েছেন খোদাভীরু ইরানি এক মহান জাতি। এ জন্যই পৃথিবীর ইতিহাসে তিনি ইমাম, আবেদ ও রূপকথার তুল্য ব্যক্তিত্ব। আর ইরানি জাতির কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ী এক মহান নেতা। প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ ফুকো ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্ব ও জীবনবোধে বিমোহিত হয়েছেন। বলেছেন, ‘আয়াতুল্লাহ খোমেইনীর ব্যক্তিত্ব কিংবদন্তি ও রূপকথার তুল্য।… পৃথিবীর অনেক ব্যক্তিত্ব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ক্ষমতায় পৌঁছতে পেরেছেন বৈকি, কিন্তু জনগণের সাথে এত গভীর ও শক্তিশালী সম্পর্ক রাখার দাবি করতে পারেন না।’ তাঁর দার্শনিক তত্ত্বের সার্থকতা এখানেই যে, বিপ্লবের ৩৮ বছর পরেও তিনি জাতির হৃদয়ের মণিকোঠায় আধ্যাত্মিক উস্তাদ হিসেবে নির্দেশনা দিচ্ছেন। পৃথিবীর আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের দর্প চূর্ণকারী রাসূলের মহান এ অনুসারীকে নির্মোহ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে পৃথিবীর লক্ষ-কোটি ভক্ত ও অনুসারী। সমসাময়িক পৃথিবীর বাস্তবতায় তাঁর ত্যাগী ও নির্মোহ আদর্শ শুভ্রতা ছড়াচ্ছে প্রতি মুহূর্তে আর অপরদিকে তাঁর সমালোচনাকারী বিদ্বেষীরা ইতিহাসের বিপরীত পাতায় নাম লেখাচ্ছে আর হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
ইসলাম চেতনাগতভাবে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) ‘উম্মাতে ওয়াসাত’ চেতনায় দ্বীনের দাওয়াত থেকে শুরু করে সকল কর্মকাণ্ডে সাবলীল মানবতাবাদী পরিবার ও সমাজ নির্মাণে মগ্ন হয়েছিলেন। মক্কায় ইবাদতের সময় অত্যাচার, তায়েফের আক্রমণ, মদীনা সনদ, চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে ডিফেন্সিভ অবস্থান, হুদায়বিয়ার সন্ধি অথবা বিভিন্ন দেশের শাসকদেরকে চিঠির মাধ্যমে ইসলামের আমন্ত্রণ মধ্যমপন্থা ও সহাবস্থানের বিষয়কে নির্দেশ করে। রাসূল (সা.) এর সুমহান সিরাতের সংস্কৃতির প্রভাব ছিল আয়াতুল্লাহর উপর। সাম্রাজ্যবাদী যখন সারাবিশ্বে দখলস্বত্ব নিয়ে লড়ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানবতাবিধ্বংসী সংস্কৃতির নোংরামিতে ব্যস্ত তখন তিনি মানবতাকে সাজানোর কাজে ব্যস্ত হলেন, লেখলেন ‘কাশ্ফ আল-আসরার’ (Uncovering Secrets)। পৃথিবীর ভাঙা-গড়ার সংস্কৃতির বিপরীতে তিনি দক্ষ খোদাভীরু মানুষ তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তুললেন। তাঁর ‘স্বপ্নিল সমাজ’ ভঙ্গুর ইরানি সমাজে কাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পাবে এ প্রশ্নের জবাব তিনি ষাটের দশকের শিশুদের দিকে ইশারা করে বলেছিলেন, ‘এরা আমার প্রাণশক্তি। সম্ভাব্য বিপ্লবের সিপাহসালার’। মজার ব্যাপার হলো, এরা যখন সত্যিকার তারুণ্যদীপ্ত তখন এল মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৭৯ সাল, এল বিপ্লবের ডাক। আর তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল এ তরুণরাই। হিলাল হাফিজের প্রত্যয়ী কথা সত্যিই সুন্দর- ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। শ্রেষ্ঠ যুব সমাজকে ইসলাম সর্বদাই স্বাগত জানায়। আর এ স্বাগতের মধ্যে আছে নিজ ও ধরীত্রিকে গড়ার এক সম্মোহনী শক্তি। এজন্য ইসলামি বিপ্লব ও আয়াতুল্লাহর ত্যাগ, তাকওয়ার জিন্দেগি একই সুতোয় গাঁথা। মালাতেই যেন মালীর পরিচয়।
নীতিভ্রষ্ট পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ও কতিপয় ভ্রান্ত মানুষের কবলে পড়া সাম্যবাদী পৃথিবী ভাবতেই পারেনি হাজার বছরের সভ্যতার ইরান ‘শ্বেত বিপ্লবের’ স্লোগানে পশ্চিমা দাসত্ব মেনে নেবে না। কেননা, তৃতীয় বিশ্বের ক্ষমতা পরিবর্তনে পশ্চিমাদের আশীর্বাদ অঘোষিত বিধানে রূপ নিয়েছিল। দীর্ঘ পাঁচ হাজার বছরের ধারাবাহিক সভ্যতার ধারক ও বাহক পারস্য- আজকের ইরান ইসলামকে স্বাগত জানিয়ে যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিল, বিপ্লবোত্তর বিশ্ব পরিস্থিতিকে মানিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রেও ইরান বিজ্ঞোচিত সিদ্ধান্তের পরিচয় দিয়েছে। বিপ্লবের পরপরই পার্লামেন্ট ভবনে হামলা, ইরাক-ইরান যুদ্ধে সাদ্দামকে পশ্চিমাদের অব্যাহত কাপুরোষিত উস্কানিমূলক সমর্থন, কোন কিছুই ইরানকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। একটি প্রবাদ আছে- ‘রাগলেন তো হেরে গেলেন’, এ কাজটি ইরানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কোন ক্ষেত্রেই বিপ্লবী সরকার প্রয়োগ করেনি। বিপ্লব ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে সুযোগের ব্যবহার করে বিপ্লবকে ধ্বংস করতে বারবার ইরানে সরাসরি আক্রমণের অনুরোধ সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদী এবং তার দোসররা তা করেনি। কারণ, তারা ভিয়েতনাম যুদ্ধে যে শিক্ষা পেয়েছে তা ভুলে যায়নি। আর ইরানের বিপ্লবতো ছিল খোদায়ী চেতনার। এখানে সরাসরি সংযুক্তি কেবল আরো ধ্বংসই ডেকে আনবে, এটা তাদের গবেষকদের কাছে দিবালোকের মত স্পষ্ট ছিল। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের জন্যে দুঃখের হল ইরানকে ধ্বংস করার জন্যে ভাড়া করা হয়েছিল কিছুসংখ্যক মুসলমানকে, নিজেদের রক্ত নিয়ে নিজেরা হোলি খেলেছে। অত্যন্ত ধৈর্যের সংস্কৃতির কারণে এ পরীক্ষায়ও ইরান উৎরে গিয়েছিল। আর লজ্জায় ডুবেছিল সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাভিলাসী ও তাদের দোসর নামধারী কিছু মুসলমান। পশ্চিমাদের এ ষড়যন্ত্র দূর থেকে অবলোকন ও নীরব সমর্থনের জন্যে বিপ্লবের সিপাহসালার আয়াতুল্লাহ সাম্যবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি খুশি ছিলেন না। তবে বৈশ্বিক সম্পর্কে এর কোন প্রভাব পড়তে দেননি। সত্যকে সত্য বলে মেনে না নেওয়ায় সমাজতন্ত্র তখন অনেকটা অসার হয়েছিল বলেই আয়াতুল্লাহ তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্টকে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনার জন্য বিশেষ দূতের মাধ্যমে আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও ইসলামি আদর্শের গ-ির মধ্যে থেকে এ আহ্বান করে তিনি পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এ তাক লাগানোর সংস্কৃতি কেবল ইরানি বিপ্লবই বর্তমান পৃথিবীকে উপহার দিতে পেরেছে। সমাজতন্ত্রের প্রতি দুর্বল বলে যারা ইরানি বিপ্লবকে অভিযুক্ত করতেন, বিশ্ব মুসলিম ও মানবতার স্বার্থে একই সাথে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের বিপরীতে ইরানের অবস্থান তাদের ধারণায় চপেটাঘাত করেছে বৈকি!
স্যামুয়ের হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনের’ পৃথিবী অনেক বেশি জটিল ও অনেকটাই মানবতার বিপরীতে অবস্থান করছে। বর্তমানে অনেকের মুখে মানবতার কথা শুনলেও তাদের অস্ত্রের বাজেট দেখলে এর বিপরীতে রাক্ষুসে চরিত্র ফুটে ওঠে। পৃথিবীর প্রথম সারির ১০টি দেশের এক বছরের প্রতিরক্ষা বাজেট দিয়ে জাতিসংঘের ৭৫০ বছরের বাজেট তৈরি করা যায়। কেবল ভিয়েতনাম যুদ্ধে যে অস্ত্র ও বিলিয়ন টন বোমা ফেলা হয়েছে তাতে দেশটির করুণ কথা না হয় বাদই দিলাম, আক্রমণকারীদের অর্ধলক্ষ সৈন্যের মৃত্যু, হাজার হাজার লোকের পঙ্গুত্ব তাদেরকে কী দিয়েছে? একবার কি তারা ভেবেছে? ভাবার তো সুযোগ নেই। কারণ, মানবতার নাম করে এরা মানুষের গ্রাস কেড়ে অস্ত্রের রসদ যোগায়। এরা ক্ষুধার্তকে অন্ন যোগানোর পরিবর্তে জঙ্গিদের অস্ত্র দিতে বেশি পছন্দ করে। বর্তমান সিরিয়া পরিস্থিতির জন্যে আইরিশ বংশোদ্ভূত ককবার্ণ স্পষ্টতই পশ্চিমাদের অদূরদর্শী নীতি ও অস্ত্র রাজনীতিকে দায়ী করেছেন। বিপ্লবোত্তর ইরানকে সন্ত্রাসের সাথে মেলানোর অনেক প্রচেষ্টা খোদায়ী গায়েবি মদদ ও ইরানের ধৈর্যের সংস্কৃতিই সাফল্যের সাথে মোকাবিলা করার প্রেরণা যুগিয়েছে। উপসাগরীয় যুদ্ধে সা¤্রাজ্যবাদীদের একসময়ের দোসরদের কাউকে ধ্বংস করে অস্ত্র তাক করা হয় ইরানের দিকে। তাদের নাকি পারমাণবিক অস্ত্র আছে! সুতরাং এবার যায় কোথায়? খাঁচায় বন্দি হল পাখি। তাদের শায়েস্তা করার নামে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হল, অবরোধ আরোপ করা হল। আরো কত কী? কিন্তু ঐশী চেতনায় ভাস্বর ইরানকে কি তাতে টলানো যায়? পশ্চিমাদের ‘স্ট্র ইনদা উইন্ড’ পলিসি এখানেও মার খেল। ইরান ধৈর্যের পরিচয় দিল। সকল হুমকি ধমকি ব্যর্থ হওয়ায় ছয় জাতি কনসোর্টিয়াম চুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়। কেননা, তারা জানে ইরানকে কাবু করার মত আত্মিক ও বৈষয়িক শক্তি এখন আর তাদের নেই। এখানেও ধৈর্যের সংস্কৃতির কল্যাণে পাশ করল ইরানের সফল কূটনীতি। ইরানের পারমানবিক কর্মসূচী একেবারেই শান্তিপুর্ণ। তাদের পারমাণবিক শক্তি সম্পর্কে স্লোগান হল: ‘Neuclear energy fo all, Neuclear weapon for none.’ তাদের শান্তিপূর্ণ এ কর্মসূচীতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও ওআইসিও সমর্থন জানিয়েছে। ঠিক একইভাবে বিপ্লবোত্তর ইরানে সফল হয়েছিল বিপ্লবী নেতৃত্ব। যারা ইসলামি বিপ্লবীদের উপর সীমাহীন অত্যাচার করেছিল, বিপ্লবের পর ইমাম আয়াতুল্লাহ খোমেইনী কম্বোডিয়ার পলপটের ন্যায় তাদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারতেন। মেকং নদীর ন্যায় রক্তগঙ্গা বইয়ে পারস্য উপসাগর লাল করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে সবাইকে কাছে টেনে নেন এবং বিপ্লবোত্তর ইরানে গণভোটের মাধ্যমে ৯৮% লোকের সমর্থন নিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। সুতরাং পশ্চিমা কোন কোন সোসিওলজিস্টের বিপ্লব হাইজ্যাক করার অভিযোগ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যাত।
বিপ্লবোত্তর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। বিপ্লবকে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিতে কেবল বিপ্লবের বন্দনায় সাধারণ মানুষকে সন্তুষ্ট রাখা যাবে না, নেতৃবৃন্দ তা বুঝতে বেশি দেরী করেন নি। এজন্য বিপ্লব-পরবর্তী নেতৃত্ব কর্মমুখী স্বাবলম্বী ও সক্ষমতার নতুন বিপ্লবের ডাক দিলেন। সাড়াও পেলেন আশাতীত। যুদ্ধ ও শত প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের কল্যাণমূলক কাজ প্রত্যন্ত ও নিভৃত অঞ্চল পর্যন্ত নাড়া দিয়ে ওঠে। শিক্ষা একসময় এলিটদের ভূষণ থাকলেও বিপ্লবোত্তর ইরানে সাধারণ ও প্রান্তিক জনমানুষকে এর আওতায় নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে ইরানে শিক্ষার হার শতভাগ। ইসলামপূর্ব পারস্যে পনডারে নিক (Correct Thought) গুফতারে নিক (Correct Talk) ও রাফতারে নিকের (Correct Behavior) ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে ইসলামের চেতনায় ঐশী আলোয় আলোকিত হয়। ইসলামি ইরানের শিক্ষা একসময় ইবন সিনা, আল-তুসী, জামী, ওমর খাইয়্যাম ও হাফিজের মত ক্ষণজন্মা বুদ্ধিজীবীদের জন্ম দিয়েছে যার প্রভাব পশ্চিমা বস্তুবাদী শিক্ষায় হারিয়ে যাচ্ছিল। বিপ্লবের পরপরই ঐশী আলোয় শিক্ষাধারা শুরু করার নিমিত্তে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও শিক্ষা সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি আয়াতুল্লাহর পরামর্শে এমন এক ধারা চালু করে যে, তা ইরানকে তো বটেই বরং সারা পৃথিবীর সচেতন ও আলো প্রত্যাশিত মানুষকে আরো সুন্দরের দিকে নিয়ে যায়। চেতনা ও সংস্কৃতির এ বৈশ্বিক প্রভাব ইরান ও ইসলামকে জানার ও বুঝার নতুন নতুন দিক উন্মুক্ত করছে প্রতিনিয়ত।
ইরানে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নওরোজসহ সকল স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচ্ছন্ন ও জোরালো উদ্যাপন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পরিচ্ছন্ন নওরোজ উদ্যাপন এটাই প্রমাণ করে, অপসংস্কৃতির বেড়াজালমুক্ত কোন স্থানীয় সংস্কৃতি ইসলামবিরোধী নয়। শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সমাজের সকল স্তরে নারীর সরব উপস্থিতি প্রসঙ্গে ইসলাম ও ইরান সম্পর্কে বৈশ্বিক বিরোধীরাও নমনীয়। ২০১২ সালের ইউনেস্কোর এক হিসেবে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় ইরানের মেয়েরা পৃথিবীর যে কোন দেশের চেয়ে এগিয়ে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বহুলাংশে নারীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাজে নারীর অবস্থানে যে কোন মুসলিম দেশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত এগিয়ে। ইরানি নারীদের শালীন পোশাক আর হিজাব তো এখন প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সংস্কৃতির অংশ। হিজাবের এ সফ্ট উদ্ভাবন বিশ্বের অসংখ্য নারীকে এ শালীন পোশাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। অনেক অমুসলিমও নিজেদের নিরাপত্তায় এ পোষাককে সমর্থন জানিয়েছে।
ইরানি নাটক, সিরিয়াল, আর্টফিল্ম, সিনেমা আজ একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর সকল ফিল্ম ফেস্টিভালে দাপটের সাথে বিচরণকারী ইরানি চলচ্চিত্রকে অস্ট্রেলিয়ান ফিল্মমেকার মিশেল হেনেক ও জার্মান ফিল্মমেকার ওয়ার্নার হারজক One of the world most important artist Cinema হিসেবে অভিহিত করেছেন। ১৯৯২ সালে চীনে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছিল ইরানি চলচ্চিত্র। বাংলাদেশের সকল ফেস্টিভালে ইরানি চলচ্চিত্রের সাবলীল বিচরণ এবং বাংলায় ডাবিংকৃত ইরানি চলচ্চিত্র মানেই টিভি সেটের সামনে পুরো পরিবারের উপস্থিতি যা সুস্থ সংস্কৃতির প্রতি সমর্থনেরই পরিচায়ক। এসব কিছু কিন্তু বিপ্লবের দর্শনে বিশেষ কোড মেনেই হচ্ছে। এতে সিনেমার শিল্পমান ও ইমোশান ক্ষুন্ন হয়নি। নৈতিকতা, মানবিকতা, প্রকৃতি ও শিশুদের ব্যাপক উপস্থিতি ইরানি চলচ্চিত্রে লক্ষ করা যায়। Sex ও Violence এর স্থানকে তারা বিভিন্ন উপাদান দিয়ে পূরণ করেছে। আরেকটি দিক এখানে বলতেই হবে, এসব চলচ্চিত্রে ধর্মীয় কোন নির্দেশনা বা ডায়ালগ আমার চোখে পড়েনি। তবে উপন্যাস ও চরিত্রনির্ভর প্রতিটি ফিল্ম থেকে মানুষ কিছু না কিছু শিক্ষা গ্রহণ করে যা পৃথিবীর অনেক বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি বিশ্বকে দিতে পারে নি। পেইন্টিংস, কালিগ্রাফি, ফটোগ্রাফি, মিউজিক ইত্যাদি ক্ষেত্রকে বিপ্লব ধারণ করেছে এবং লালন করছে। মুসলিম বিশ্বে আর্ট ও পেইন্টিং-এর যে স্বতন্ত্র ধারা চালু হয়, এর অনেকটার কৃতিত্ব ইরান দাবি করতেই পারে। তাদের এ ধারা বিশেষ কোন প্রকারে সীমাবদ্ধ নয় বরং Classical, Traditional, Revolutionary & Modern সকল ক্ষেত্রেই সমানভাবে বিরাজমান।
আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে ক্রীড়া ও বিনোদনের ক্ষেত্রেও। অলিম্পিকসহ ক্রীড়ার সকল ক্ষেত্রে শারয়ী কোড মেনে অগ্রসর হচ্ছে দেশটি। ইসলামিক গেম্স্ আয়োজন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল ইরান। আমার ইরান যাওয়া হয়নি, তবে যাঁরা ভ্রমণ করেছেন এবং পত্র-পত্রিকার বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী সারাদেশে হাজার হাজার পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক পার্ক ও ব্যায়াম কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, বিশেষায়িত পার্ক, ওয়াটার পার্ক, জীববৈচিত্র পার্ক, ফুলের পার্ক, প্রাণি পার্কসহ অসংখ্য বিশেষায়িত পার্ক ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা কোন কোন ক্ষেত্রে অনেক ট্যুরিস্ট ফ্রেন্ডলি দেশকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যে কারণে দেশটিতে ভ্রমণকারীর সংখ্যা প্রতিদিনই ঊর্ধ্বমুখী। আন্তর্জাতিক আকর্ষণের কারণেই দেশটি এখন বিভিন্ন ফেস্টিভাল, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, এক্সপো ও আন্তর্জাতিক কার্নিভালের কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
টেকনলজির উদ্ভাবন, ব্যবহার ও এর যৌক্তিক মাত্রা নির্ণয়ে স্বর্ণযুগের পর থেকে মুসলমানদের পশ্চাদপদতা মোটা দাগে চোখে পড়ার মত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গতিপথ নির্ণয়ের ধারণায় মক্কা ও মদীনা শরীফের পর, কখনো দামেশক, কর্ডোভা, বাগদাদ ও কায়রোর দিকে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বারবার ফিরে যায়। তেহরান কেন্দ্রীক মধ্য-এশিয়ার অবদানও কম নয়। তবে বিজ্ঞান গবেষণায় বিপ্লবোত্তর ইরানের অগ্রগতি এককথায় বিস্ময়কর। একের পর এক যুদ্ধ, অবরোধ, পাশ্চাত্যের অসহযোগিতা, হুমকি ও সর্বশেষ সাম্প্রতিক বিশেষ অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতার নির্দেশে ইরানের বিজ্ঞানীরা চরম আত্মত্যাগ ও সাধনার পরিচয় দেয়ায় দেশটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শনৈ শনৈ উন্নতি করছে । বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে ইরানের বিজ্ঞানীদের অগ্রগতি বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের বিজ্ঞানীদের গড় অগ্রগতির ১১ গুণ দ্রুততর (Fastest)। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে স্বল্পতম সময়ে তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্বের প্রথম ৫টি দেশের মাঝে স্থান করে নেবে। বিজ্ঞান জার্ণাল প্রকাশে দেশটি মুসলিম বিশ্বে শীর্ষে অবস্থান করছে। দু:খজনক হলেও সত্য এসব পজিটিভ সংবাদ ইহুদী ও সা¤্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় স্থান পায় না। সত্যের বিপরীতে ইরানকে তারা অন্যভাবে পোট্রেইট করতে চায়। অবশ্য এখন তা আর সম্ভব নয় কেননা তথ্য-প্রযুক্তি এবং মিডিয়ার ক্ষেত্রে ইরান যে কোন সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।
আইন মান্য করার সংস্কৃতি বিপ্লবোত্তর ইরানের একটি বড় অর্জন। একথাটি এখানে এজন্য সংযুক্ত করেছি দু’একটি দেশ বাদে কেন জানি মুসলিম বিশ্বে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে না। অথচ কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের জন্যে তা খুবই প্রয়োজন। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না, সা¤্রাজ্যবাদীরা কেউ কেউ এ কাজটি নিজেদের জনগণের জন্যে করতে পেরেছে। মুসলিম বিশ্বে ইরান এক্ষেত্রে মডেল হতে পারে। গ্লোবালাইজেশনের এ যুগে সামাজিক নিরাপত্তা একটি বড় ইস্যু। সাইবার ক্রাইম, নৈতিকতার অবক্ষয়ের কবলে পতিত জাতিগুলো জেনে অবাক হবেন, শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, লুটপাট, খুন-খারাবি ও সাইবার ক্রাইম থেকে ইরান অনেকটা মুক্ত। নারী ও পুরুষদের বৈবাহিক বন্ধনকে উৎসাহদান, উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে নৈতিকতার সংরক্ষণসহ সকল কার্যক্রমে ইরানের ইনডেক্স সত্যিই অনুপ্রেরণার জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। স্বল্প সংখ্যক সংখ্যালঘুর অধিকার সংরক্ষণে ইরান সচেষ্ট। আমেরিকার রিলিজিয়াস রিপোর্টেও তা ফুটে উঠেছে। মাইনরিটিদের মধ্য থেকে এমপি আছেন এবং তাদের বিশেষায়িত হাসপাতালসহ চাহিদা মাফিক প্রয়োজনীয় সকল কিছুর আঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে। বিপ্লবের পর কিছু ইহুদি কমে যাওয়ার ব্যাপারে অভিযোগ উঠলে ইহুদিদের মধ্য থেকেই এর প্রতিবাদ উঠেছে এবং কম-বৃদ্ধি আসলে গতানুগতিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। এতে বিপ্লবের কোন ভূমিকা নেই। ইরানের সংবিধানের ১৩ ও ১৪ নং আর্টিকেলে তাদের অধিকারের ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা আছে।
বিশ্বে ইরানি সংস্কৃতির প্রভাবের কথা বলতে গেলে শিয়া-সুন্নি সম্পর্কের কথা এড়িয়ে গেলে আলোচনা অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাবে। মৌলিক আকীদার প্রশ্নে কাছাকাছি এ দুটি ধারার বর্তমান বিপরীত অবস্থান অনেকটাই পীড়াদায়ক। মাসয়ালার বৈপরীত্য ইসলামের অনন্য সৌন্দর্য ও মতামত প্রকাশের মৌলিক স্বীকৃতি। এ স্বীকৃতিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লব ধারণ করে। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনী ভিন্নতার মধ্যে ঐক্য খুঁজেছেন এবং বিশ্বমুসলিমের সমর্থন পেয়েছেন। এখানে শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আল-কুদস্ দিবস ও সালমান রুশদীর ব্যাপারে ইমাম খোমেইনীর ঘোষণা মুসলিম বিশ্বে যে প্রভাব ফেলেছে তাতে কি শিয়া-সুন্নি বিভেদ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? সুতরাং বর্তমানে এ বিরোধকে কারা উস্কে দিচ্ছে তা সন্তর্পণে বিশ্লেষণ করতে হবে এবং উভয় দিকের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে সমস্যা সমাধানে অগ্রসর হতেই হবে। পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে এর বিকল্প নেই।
গ্লোবাল সন্ত্রাস বর্তমান বিশ্বের এক মূর্তিমান আতংক। একসময় ইরানকে সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ধর্মের নামে যে সন্ত্রাস মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র সভ্যতাকে গ্রাস করতে চাচ্ছে তার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান তার স্পষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ এজন্য যে, ইসলামের সাথে সন্ত্রাসবাদের কোন সম্পর্ক নেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে তাঁরা বিশ্বাস করেন। যে ধর্ম অন্যায়ভাবে একজন মানুষ হত্যাকে সমগ্র মানবতার হত্যার সাথে তুলনা করেছে সে ধর্ম কি খেয়ালখুশির হত্যাকে সমর্থন করতে পারে? অবশ্যই না। এ বিষয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি সমর্থিত, তবে এতে আরো বেশি করে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে সংশ্লিষ্ট করলে ফলাফল আরো দ্রুত পাওয়া যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এ বিষয়ে বিশ্বের শান্তিপ্রয়াসী জাতিসমূহকে জাগ্রত করতে ইরান সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুুযায়ী ইরান ইতোমধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে এবং সর্বশেষ সম্মেলনে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমের মাননীয় খতিবসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বগণ অংশগ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ ও ইরানের সাংস্কৃতির সম্পর্কের গভীরতা ভবিষ্যতে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে, সর্বোপরি আধ্যাত্মিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করবে বলে প্রত্যাশা রাখি। পরিশেষে আল্লামা রুমীর একটি কথা দিয়ে শেষ করতে চাই। ‘লাইট কেমন বা কোন ধরনের তা বিবেচ্য নয়; বরং কেমন আলো ছড়াচ্ছে তাই বিবেচ্য।’
সকলকে ধন্যবাদ।