রবিবার, ২৬শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

English

লাভ থেকে ক্ষতি পর্যন্ত; হরমুজ প্রণালী সম্পর্কে কে সঠিক বলছে?

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২৬, ২০২৬ 

news-image

তেহরান – ইরনা: হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইরানের ব্যবস্থাপনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের পদক্ষেপ এই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি করেছে। ট্রাম্প একদিকে দাবি করেছেন যে ইরান প্রতিদিন এই প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক দুই মাসে ইরান শত শত মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।

ইরানের অর্থনৈতিক প্রতিবেদকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যে নৌ অবরোধ ইরানের বিরুদ্ধে কার্যকর করেছে, তার লক্ষ্য হলো ইরানের তেল রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনা এবং তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অবরোধ পুরোপুরি সফল হওয়া অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।

সম্প্রতি জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সা (Vortexa)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই অবরোধ কার্যকর থাকা সত্ত্বেও ইরান সফলভাবে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবরোধ শুরুর পর থেকে অন্তত ১৯টি তেলবাহী জাহাজ পারস্য উপসাগর ত্যাগ করে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। একই সময়ে প্রায় ১৫টি জাহাজ ইরানের বন্দরের দিকে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র যে পূর্ণ অবরোধের দাবি করছে, বাস্তবে সেখানে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে।

এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উক্ত জাহাজগুলোর মধ্যে অন্তত ৬টি জাহাজ ইরানের নির্ধারিত প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল কাঁচা তেল বহন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তেলের মোট মূল্য প্রায় ৯১০ মিলিয়ন ডলার। তবে এই তথ্য শুধুমাত্র সেসব জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেগুলোর তথ্য সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিতে উল্টো প্রভাব ফেলছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্ড জার্মান ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশনের একটি ফোরামে সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের প্রায় ১৩ শতাংশ তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে শুধু জ্বালানির দামই বাড়বে না, বরং এর প্রভাব খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও পড়বে।

তার মতে, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব সারাবিশ্বে খাদ্য ও কৃষি খাতে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ঘাটতির মাধ্যমে দেখা দেবে। অর্থাৎ এই সংকট ইউরোপসহ তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বহু বছরের প্রভাব ফেলতে পারে এমন পরিণতি

এছাড়া রয়টার্সের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সংঘাত শুরুর পর থেকে বিশ্ব প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের কাঁচা তেল সরবরাহ হারিয়েছে। এর বড় অংশ এসেছে জাহাজ বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, ট্যাঙ্কারের রুট পরিবর্তন এবং আংশিক উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের প্রভাব আগামী মাস বা এমনকি বছরের পর বছরও অনুভূত হবে।

অর্থনীতিবিদ মুসা শহবাজি এ বিষয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে এই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে তেলনির্ভর দেশগুলো যেমন ইরাক, তুরস্ক, ভারত এবং অন্যান্য দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে, যাতে তারা ওয়াশিংটনের অবস্থান সমর্থন করে। তবে ন্যাটোর কিছু সদস্য দেশ ইতোমধ্যেই জানিয়েছে যে তারা এ ধরনের অবরোধে অংশ নেবে না, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু প্রতীকী পদক্ষেপ নিতে পারে, যেমন এক বা দুইটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা, যাতে তারা তাদের সামর্থ্য প্রদর্শন করতে পারে। তবে বাস্তবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে তার নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করেছে।

এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে তারা এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, কিন্তু বাস্তবে এটি পাল্টা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা বাজারকে আরও অস্থিতিশীল, উত্তেজনাপূর্ণ এবং অনিশ্চিত করে তুলবে—যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও অনুকূল হবে না।

ব্যর্থতার পরিণতি

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল যে নৌ অবরোধের মাধ্যমে তারা ইরানকে তার তেল আয়ের উৎস থেকে বঞ্চিত করবে এবং একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো ঘটনা—ইরানি তেল উচ্চ দামে বিক্রি হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়িয়েছে।

এভাবে দেখা যাচ্ছে, এই অবরোধ কৌশল শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালী অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি এবং খাদ্য সংকটকে আরও তীব্র করেছে। অন্যদিকে, ইরান তার তেল ও জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় অব্যাহত রেখেছে। ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ কৌশলের একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সূত্র: আইআরএনএ