উন্নত অ্যান্টি-ট্যাংক ব্যবস্থা ‘পিরুজ’; শত্রুর সাঁজোয়া শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর এক বিধ্বংসী অস্ত্র
পোস্ট হয়েছে: মে ১০, ২০২৬
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পে যে খাতগুলো সবচেয়ে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার মধ্যে অ্যান্টি-আর্মার বা সাঁজোয়া যান বিধ্বংসী অস্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং উৎপাদনে দেশটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পে যে খাতগুলো সবচেয়ে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার মধ্যে অ্যান্টি-আর্মার বা সাঁজোয়া যান বিধ্বংসী অস্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং উৎপাদনে দেশটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এই খাত শুধু ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কৌশলগত চাহিদা পূরণেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে না, বরং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারেও রপ্তানির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই অগ্রযাত্রার অংশ হিসেবেই ২০১৭ সালে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে ইরান তাদের অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ট্যাংক ও দুর্গভেদী অস্ত্রব্যবস্থা “পিরুজ” আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করে। এটি মূলত “দেহলাভিয়ে” অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম এবং আধুনিক ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি সমন্বিত যুদ্ধব্যবস্থা। পুরো সিস্টেমটি “আরাস” নামের একটি কৌশলগত সামরিক যানবাহনের ওপর স্থাপন করা হয়েছে, যদিও প্রয়োজনে এটি অন্যান্য সাঁজোয়া যান, কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম কিংবা নৌযানেও সংযোজন করা সম্ভব।
ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিশেষজ্ঞদের হাতে নির্মিত “পিরুজ” বর্তমানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর স্থল ইউনিটে সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর সংযোজন বাহিনীর অগ্নিশক্তি, গতিশীলতা এবং সাঁজোয়া লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলার সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও নির্ভুল আঘাত হানার যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, “পিরুজ” সেই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই অস্ত্রব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্রুত ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ সক্ষমতা। আধুনিক ট্যাংকগুলোতে ব্যবহৃত সক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Active Protection System) সাধারণত আগত ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে তা ধ্বংস বা বিচ্যুত করতে সক্ষম। তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর পুনরায় সক্রিয় হতে সিস্টেমটির সামান্য সময়ের প্রয়োজন হয়। “পিরুজ” সেই ক্ষণিকের ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত দ্রুত দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে, যা লক্ষ্যবস্তুকে কার্যকরভাবে ধ্বংস করার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই ব্যবস্থায় দুই অক্ষবিশিষ্ট একটি উন্নত লঞ্চিং প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ চারটি “দেহলাভিয়ে” ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করা সম্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অত্যাধুনিক ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল প্রযুক্তি, তাপীয় ক্যামেরা, নাইট ভিশন এবং লক্ষ্যবস্তুতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক করার সুবিধা। ফলে দিন-রাত, ধূলিঝড় কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও এটি সমান কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।
“পিরুজ”-এর নকশায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে টিকে থাকার সক্ষমতা ও কৌশলগত নিরাপত্তাকে। এর লঞ্চার প্রয়োজনে গাড়ির ভেতরে ভাঁজ হয়ে ঢুকে যেতে পারে, যা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে অবস্থানকালে অস্ত্রব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখে এবং যুদ্ধ চলাকালেও বাহক যানটিকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রদান করে। “আরাস” কৌশলগত যানবাহনে স্থাপনের ফলে এর গতিশীলতা ও দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আধুনিক গতিশীল যুদ্ধপরিবেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অপারেটর সম্পূর্ণ নিরাপদ অবস্থান থেকে—অর্থাৎ গাড়ির অভ্যন্তরে বসেই—ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে পারেন। এর ফলে শত্রুপক্ষের সরাসরি হামলার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
“পিরুজ” মাত্র ০.৪ সেকেন্ডের ব্যবধানে ধারাবাহিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম, যা একে আধুনিক ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করেছে। শুধু স্থল লক্ষ্যবস্তু নয়, উন্নত লক্ষ্যনির্ধারণ প্রযুক্তির কারণে এটি হেলিকপ্টার ও ড্রোনের মতো আকাশ লক্ষ্যবস্তুকেও প্রায় ২ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে। ব্যবহৃত “দেহলাভিয়ে” ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন অনুযায়ী এর কার্যকর পাল্লা ৫ থেকে ৮ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে “পিরুজ” ইরানের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির প্রতীক। বহুমুখী ব্যবহার, উচ্চ গতিশীলতা, আধুনিক লক্ষ্যনির্ধারণ প্রযুক্তি এবং উন্নত অ্যান্টি-আর্মার সক্ষমতার কারণে এটি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে একটি কার্যকর ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।#
পার্সটুডে