All posts by dreamboy

দূর থেকে অপারেশন করার রোবট উন্মোচন করল ইরান

ইরানের বিজ্ঞানীরা নিজস্ব প্রযুক্তিতে রিমোট বা টেলি সার্জারির কাজে ব্যবহৃত রোবট উন্মোচন করেছেন। তেহরানে চলমান ইরানের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মেলা বা ইনফোটেক্স ২০‌১৫- এ এই রোবটের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

ইবনে সিনা নামের এ রোবট দিয়ে রোগীর সংস্পর্শে না এসেই একজন সার্জন সুনিপূণভাবে রোগী দেহে অপারেশন করতে পারবেন। ইবনে সিনা প্রকল্পের পরিচালক ফারজাম ফারাহ্‌মান্দ এ সম্পর্কে বলেছেন, এ রোবটটি মূলত একটি অত্যাধুনিক রিমোট বা টেলি সার্জারি ব্যবস্থা। একটি মনিটর এবং রোবট নিয়ন্ত্রিত দু’টি বাহুর ভিত্তিতে কাজ করে ইবনে সিনা।

তিনি আরো জানান, তলপেট এবং প্রোস্টেট অপারেশনের কাজে এ রোবট ব্যবহার করা যাবে। অপারেশন পরিচালনকারী সার্জন দূর থেকে ইবনে সিনার বাহু নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং মনিটরের সাহায্যে অপারেশন প্রত্যক্ষ করবেন।

ফারজাম ফারাহ্‌মান্দ আরো বলেন, এ যন্ত্রের মাধ্যমে অপারেশন চালানো হলে রোগী দেহের স্বাস্থ্যকর কোষকলার ক্ষতি এবং রক্তপাত কম হবে। এতে রোগীর সেরে ওঠার প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে।

ইরানি চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা প্রাণীদেহে এ ব্যবস্থা দিয়ে সফল পরীক্ষা করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের ওপর এর পরীক্ষা করার জন্য  যথাযথ অনুমতি নিতে হবে।

 ইরানের শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তেহরান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে।

রিমোট সার্জারি বা টেলিসার্জারি চিকিৎসা জগতের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ক্ষেত্র। এতে  একটি ফাইবার অপটিক কমিউনিকেশন লিঙ্ক এবং একটি রোবটিক সার্জিক্যাল সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক এ ব্যবস্থায় রোগীর সংস্পর্শে না এসেই তার দেহে সফল অস্ত্রোপচার করতে পারেন।

রেডিও তেহরান, ১০ জুন, ২০১৫

ন্যানো-প্রযুক্তি খাতে ইউনেস্কোর পদক পেলেন ইরানি অধ্যাপিকা

ইরানের তাব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা-রসায়ন বিজ্ঞানের অধ্যাপিকা ডক্টর সুদাবেহ দবারান ন্যানো-প্রযুক্তি খাতে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর পদক পেয়েছেন।

ইরানের এই অধ্যাপিকাসহ বিশ্বের ৮ জন বিজ্ঞানী এই পদক পাওয়ার গৌরব অর্জন করলেন।unicef award of Iranian professor

ন্যানো-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণায় অবদান রাখার কারণে সম্প্রতি (গত দশই এপ্রিল) এই বিজ্ঞানীদের পুরস্কার দেয়া হয় ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে। ইউনেস্কো ২০১০ সাল থেকে এই পুরস্কার দিয়ে আসছে।

ডক্টর সুদাবেহ দবারান তাব্রিজ চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা- ন্যানো প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান এবং মেডিসিনাল বায়োম্যাটেরিয়ালস ও চিকিৎসা-ন্যানো প্রযুক্তি বিষয়ের অধ্যাপিকা।

রেডিও তেহরান, ২২ এপ্রিল, ২০১৫

হলুদ থেকে বিষক্রিয়া মুক্ত ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি করল ইরান

ইরানি গবেষকরা হলুদ থেকে ক্যান্সারের ন্যানো ওষুধ তৈরি করেছেন। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এ ওষুধের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা গেছে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিজ্ঞান বিভাগের ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্র এ ওষুধ তৈরি করেছে।

ইরানি গবেষকদের তৈরি পলিমারভিত্তিক ন্যানো বাহকের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কোষকলায় পৌঁছে দেয়া হবে ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ কারকিউমিন। হলুদের এ উপাদানের ক্যান্সার আক্রান্ত কোষকলা ধ্বংস এবং ক্যান্সার প্রতিহত করার ক্ষমতা আছে। এ ছাড়াও, জারণ ও প্রদাহ প্রতিহত করার ক্ষমতাও আছে হলুদের এ উপাদানের।cancer medicine from tarmaric

বিষাক্ত প্রভাবক ব্যবহার না করে এই ন্যানো বাহক তৈরি করা হয়েছে উল্লেখ করে ইরানের ন্যানোটেকনোলজি ইনিশিয়েটিভ কাউন্সিলের ডা. আলীরেজা মোহাম্মদ আলীজাদেহ জানান, পরীক্ষা চলাকালে অনেক রোগীকে এ ওষুধ দেয়ার পর এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় অতি উচ্চমাত্রায় প্রয়োগ করা সত্ত্বেও এ ওষুধের কোনো বিষক্রিয়া রোগীর দেহে দেখা যায় নি। ওষুধরোধী স্তন ও পরিপাক নালীর ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের ওপর চালানো দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

ন্যানো-কারকিউমিন তৈরির মৌলিক সব উপাদানই দেশেই পাওয়া যায় এ কথা উল্লেখ করে ডা. আলীরেজা বলেন, ক্যান্সার বিধ্বংসী এ ওষুধের গণ-উৎপাদন ইরানেই সম্ভব।

রেডিও তেহরান, ২৭ এপ্রিল, ২০১৫

ইরানের নৌবাহিনীতে যুক্ত হতে চলেছে নতুন ডুবোজাহাজ

ইরানের নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল হাবিবুল্লাহ সাইয়্যারি বলেছেন, শিগগিরই নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি নতুন ডুবোজাহাজ যুক্ত হবে ইরানের নৌবাহিনীতে।9737bf74ec27078b0248aec90cb3773b_XL

এ ছাড়া,  ইরান নতুন একটি ডেস্ট্রয়ার নির্মাণের কাজ করছে এবং চলতি ফার্সি মাসের শেষ দিকে তা নৌবাহিনীতে যুক্ত হবে। নতুন এ ডেস্ট্রয়ারে নতুন অস্ত্রসহ নানা সামরিক সরঞ্জাম থাকবে বলেও জানান তিনি।

সাম্প্রতিক বছরগুলো ইরান সামরিক খাতে ব্যাপক উন্নতি করেছে। ইরান সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ডেস্ট্রয়ার জামারানকে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পারস্য উপসাগরে নামিয়েছে।

এ ছাড়া, দেশীয় প্রযুক্তিতে খালিজ-ই ফার্স, মেহরাব, রা’দ, কাদের, নূর এবং জাফার ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সাবমেরিন ও উন্নত ধরনের কমব্যাট হেলিকপ্টার তৈরি করেছে ইরান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক খাতে ইরান চোখা ধাঁধানো উন্নতি করেছে।তবে ইরানের সামরিক শক্তি প্রতিবেশি দেশগুলোর জন্য হুমকি নয় বলে বার বার আশ্বস্ত করে আসছে তেহরান।

রেডিও তেহরান, ১২ এপ্রিল, ২০১৫

যুদ্ধজাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের গণ-উৎপাদন শুরু করেছে ইরান

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যুদ্ধজাহাজ বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গণ-উৎপাদন শুরু করেছে।  নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি কাদির নামের এ ক্ষেপণাস্ত্র খুব নীচু দিয়ে উড়ে গিয়ে লক্ষ্যমাত্রায় নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে।

ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অ্যারোস্পেস শিল্প সংস্থায় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজ (শনিবার) এই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের গণ-উৎপাদন শুরু হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন দেহকান এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

দেহকান এ সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেন, এরই মধ্যে কাদিরের পরীক্ষামূলক নির্মাণ পর্ব ও গবেষণা শেষ হয়েছে। বিমান ও হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকেও এ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানান তিনি। ইরানের তৈরি নতুন প্রজন্মের ৩০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কাদিরের প্রচণ্ড ধ্বংস ক্ষমতা রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে ২০১৪ সালের ২৪ আগস্ট কাদির ক্ষেপণাস্ত্র প্রথম উন্মোচন করা হয়। কয়েকটি কাদির ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র নৌ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

রেডিও তেহরান, ১৪ মার্চ, ২০১৫

ইরানের নৌবহরে যুক্ত হলো ‘দামাভান্দ’ ডেস্ট্রয়ার

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নৌবহরে যুক্ত হয়েছে আরেকটি ডেস্ট্রয়ার। আজ ইরানের উত্তরে কাস্পিয়ান সাগরে দামাভান্দ নামের এ ডেস্ট্রয়ারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।a63582b5129f8bafe1a5fc413921d48b_XL

সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ডেস্ট্রয়ারটিতে রয়েছে অত্যাধুনিক রাডার ও গোয়েন্দা নজরদারির ব্যবস্থা। কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের নৌবন্দর আনজালিতে এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটিকে নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

অন্যান্যের মধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন দেহকান এবং নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল হাবিবুল্লাহ সাইয়্যারি।

অনুষ্ঠানে আলী শামখানি কাস্পিয়ান সাগরকে শান্তি ও বন্ধুত্বের সাগর হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ সাগরের জ্বালানী নিরাপত্তা রক্ষায় ইরান অনন্য অবদান রাখছে।

বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ হিসেবে পরিচিত কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত দেশগুলো হচ্ছে কাজাখস্তান, রাশিয়া, আজারবাইজান, ইরান ও তুর্কমেনিস্তান। এ দেশগুলো কাস্পিয়ান সাগরের জলজ ও জ্বালানী সম্পদের অংশীদার।

দামাভান্দের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইরানের নৌবাহিনীর কমান্ডার অ্যাডমিরাল সাইয়্যারি বলেন, এর আগে ইরানে তৈরি জামারান শ্রেণীর ডেস্ট্রয়ার দামাভান্দে আরো উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়েছে।

ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম ডেস্ট্রয়ার জামারানে রয়েছে আধুনিক রাডার এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সামগ্রী। এটি ১২০ থেকে ১৪০ জন সৈন্য এবং বিভিন্ন ধরনের জাহাজ ও বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। ডেস্ট্রয়ারটিতে একটি হেলিপ্যাডও রয়েছে। এছাড়া, ইরানের তৈরি এই ডেষ্ট্রয়ারটিকে টর্পেডো ও আধুনিক নৌ কামানেও সজ্জিত করা হয়েছে।

রেডিও তেহরান, ৯ মার্চ, ২০১৫

ভূ-কেন্দ্র তথ্য পাঠানো শুরু করেছে ইরানের কৃত্রিম উপগ্রহ

ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত কৃত্রিম উপগ্রহ ‘ফাজর’  মহাকাশ থেকে তথ্য পাঠিয়েছে। ইরানের ইলেক্ট্রনিকস ইন্ডাস্ট্রিস কোম্পানির মহাকাশ প্রকল্পের পরিচালক মেহদি সার্ভি এ কথা জানিয়েছেন।

তিনি জানান, কক্ষপথে স্থাপনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভূ-কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে ‘ফাজর।’  ইরানি কৃত্রিম উপগ্রহটির পরবর্তী মিশনগুলো সম্পন্ন করার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলেও জানান তিনি। ৫২ কিলোগ্রাম ওজনের ‘ফাজর’ দেড় বছর কক্ষপথে অবস্থান করবে এবং উচ্চ মানের চিত্র ধারণ এবং ভূ-কেন্দ্রে প্রেরণ করবে।

সাফির (দূত) নামের ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি রকেটের মাধ্যমে গতকাল সকালের দিকে ‘ফাজর’ কে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। এ কৃত্রিম উপগ্রহে জিপিএস নেভিগেশন ব্যবস্থা রয়েছে। এ নিয়ে সাফির রকেটের মাধ্যমে চতুর্থ কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাল ইরান। এর আগের তিনটি কৃত্রিম উপগ্রহ ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে পাঠিয়েছে ইরান।

এ পর্যন্ত বিশ্বের মোট আটটি দেশ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠিয়েছে। তেহরান মহাকাশে মানুষবাহী উপগ্রহ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে এর আগে ঘোষণা করেছে।

এদিকে, সফল ভাবে ‘ফাজর’ পাঠানোয় সমগ্র ইরানবাসীর প্রতি অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। তিনি বলেছেন, ‘ফাজর’ পাঠানোর মধ্যে দিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছেন ইরানি বিজ্ঞানীরা। মহাকাশ প্রযুক্তি বিকাশের কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে  ইরান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট রুহানি।

রেডিও তেহরান, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

ইউরোপ এবং ইরানের ইসলামী বিপ্লব

ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর সারা বিশ্বে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। পৃথিবীর অন্যান্য এলাকার মতো ইউরোপেও ইসলামী বিপ্লবের বিরাট প্রভাব আমরা দেখতে পাই।

খ্রিস্টীয় বিশ্বে ৬০-এর দশকের শেষের দিক এবং ৭০-এর দশককে ধর্মানুরাগের ক্ষেত্রে ‘অন্ধকার যুগ’ বলা হয়। এই সময়ে খ্রিস্টীয় বিশ্বে উল্লেখযোগ্য হারে ধর্মীয় শিক্ষালয় এবং ধর্মযাজকদের সংখ্যা কমতে দেখা যায়। মানুষের মাঝেও ধর্মের প্রতি উৎসাহ কম দেখা যায়। কিন্তু ৮০-এর দশকে এসে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এ সময়ে আবার জনগণের মাঝে ধর্মানুরাগ বৃদ্ধি পায়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ইসলামী বিপ্লবের পরে কার্ডিনাল র‌্যাটসিং-এর নেতৃত্বে খ্রিস্টবিশ্বের ১২ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ১৯৮৫ সালে এক আন্তর্জাতিক বিৃবতি প্রদান করেন। এ বিবৃতির প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পাদনে চার বছর সময় লাগে। বিবৃতির বিষয়বস্তু ছিল বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুশাসন, আদেশ-নিষেধ এবং উপাসনা। বিবৃতিতে সামাজিক ক্ষেত্রে চার্চের ব্যাপক কর্মকাণ্ডের নিশ্চয়তা বিধান করা হয় এবং খ্রিস্টীয় এই প্রশাসন (ক্যাথলিক) নিজেদেরকে মানবজাতির মুক্তিদাতা হিসাবে ঐ বিবৃতিতে উল্লেখ করে।

ধর্মানুরাগকে নিয়ে ইউরোপে এর আগে অনেক বই লেখা হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। ইতালীয় ভাষায় এরকম একটি  বইয়ের নাম Torento Statement । এই বই সম্পূর্ণ করতে সময় লেগেছিল তিন বছর। তবে এ সকল বই ছিল অঞ্চলভিত্তিক।

ক্যাথলিক পণ্ডিতদের আন্তর্জাতিক বিবৃতিতে চার্চের সামাজিক ভূমিকা রাজনৈতিক পরিমণ্ডল অবধি সম্প্রসারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ পোল্যান্ডের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। খ্রিস্টান ধর্মগুরু পোপ পোল্যান্ডের কম্যুনিস্ট প্রশাসনকে উৎখাত করে ধার্মিক প্রশাসনকে ক্ষমতায় বসাবার জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগানের সাথে সহযোগিতা করেছিলেন।

ইরান বিপ্লবের পর ইউরোপীয় জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধর্মের প্রতি অনুরাগ বৃদ্ধি পায়। ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর পরে অস্ট্রিয়ার প্রেসিডেন্ট কুর্ট ওয়ার্ল্ডহাইম একবার বলেছিলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব তাঁকে একজন ধার্মিক খ্রিস্টান বলে ভাবতে শিখিয়েছে। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পরিপ্রেক্ষিতে অঙ্গ রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘ ৭০ বছরের কম্যুনিস্ট শাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়ে ধর্মের কাছে ফিরে এসেছে।

ধর্মকে বাদ দিয়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের আড়ালে ইউরোপে উৎকট স্বাদেশিকতা আন্দোলন শুরু হয়, যৌন বিকৃতি প্রসার লাভ করে এবং নীতিহীনতা প্রকট হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্য সমাজে এসবই ছিল ধর্মকে প্রতিরোধের জন্য ষড়যন্ত্র।

ঐতিহ্যবাহী ধর্মবিশ্বাসে প্রত্যাবর্তনের ফলে জনসমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সকল প্রকার ধর্মীয় চিন্তাধারা বিকাশ লাভ করছে এবং ইউরোপীয় সমাজে পারলৌকিক জীবনের চেতনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইউরোপীয় সমাজ পার্থিব লোভ-লালসার বাইরে অন্য এক জগতের প্রতি স্বভাবতই আকৃষ্ট হচ্ছে।

ইউরোপীয় সমাজে ইসলামের প্রতি জনগণের আকর্ষণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পূর্ব ইউরোপীয় মুসলমানরা প্রধানত স্বল্প আয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এরা বহু শতাব্দী ধরে এ এলাকায় বসবাস করছে। কিন্তু পশ্চিম ইউরোপে বসবাসরত মুসলিম জনগণ প্রধানত উন্নত জীবনের আশায় মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আগত। এদের বেশির ভাগই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পশ্চিম ইউরোপে অভিবাসী হয়।

পূর্ব ইউরোপের যুগোশ্লাভিয়া, বুলগেরিয়া এবং আলবেনিয়ার মুসলমানদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং তা প্রাক্তন তুর্কি সাম্রাজ্যের সাথে সম্পর্কিত। তুর্কি মুসলমানদের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত এসব এলাকার মুসলমানরা যুগ যুগ ধরে ওখানে বসবাস করছে। এলাকার অন্যান্য জাতির সাথে ওরাও মিশে আছে। কোন কোন এলাকা, যেমন আলবেনিয়া, বোসনিয়া, হার্জেগোভিনায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে থেকেও এখানকার মুসলমানরা তাদের ইসলামী স্বকীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

পশ্চিম ইউরোপের মুসলিম অভিবাসনের ইতিহাস মাত্র ৬০ বছরের পুরোনো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এই এলাকায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের সংখ্যা তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিম ইউরোপে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে অভিবাসী হয়ে আসে।

যুদ্ধ পরবর্তীকালে ইউরোপে জনশক্তির চাহিদার কারণে অনেক বিদেশী সহজেই ইউরোপে আসার সুযোগ পায়। বর্তমানে অভিবাসী মুসলমানরা ইউরোপীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পর এখন সামাজিকভাবে বেশ সক্রিয়। নিজ দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি নিয়েও তারা বেশ সজাগ। এ ব্যাপারে ইউরোপীয়দের মাঝেও একটি ভয় ঢুকেছে যে, মুসলমানদের সচেতনতায় ইউরোপে নব্য নাজী ও ফ্যাসিস্ট আন্দোলন বৃদ্ধি পেতে পারে। ইসলাম এবং মুসলমানদের সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণে ইউরোপে মুসলমানদের প্রতি এরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে।

মাতৃভূমির যে কোন প্রকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ইউরোপের অভিবাসী মুসলমানদের মাঝে বিরাট প্রভাব রাখে। এরকম একটি ঘটনা হলো ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর ইউরোপে এর বিরাট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

ইউরোপীয় মুসলমানদের মাঝে ইসলামী চেতনায় ফিরে যাওয়ার যে প্রবণতা তার সাথে ইউরোপীয় সরকারগুলোর দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং ফ্রান্সের স্কুলে ইসলামী পর্দা ও ইসলামী আচার-আচরণের বিরোধীতা শুরু হয়। বিভিন্ন দেশে ইসলামী পুনর্জাগরণ এবং ইউরোপের সংখ্যালঘু মুসলমানদের মাঝে তার প্রভাব এ বিরোধকে আরো জাগিয়ে তোলে। কুখ্যাত ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ গ্রন্থের প্রকাশনা এবং ইসলামী বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেইনী (রহ.) কর্তৃক এ গ্রন্থের লেখক সালমান রুশদীকে মৃত্যুদ- প্রদান প্রভৃতির কারণে ইউরোপীয় মুসলমানদের ইসলামী মানসিকতায় বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়। ইসলামী পুনর্জাগরণের চেতনায় এরা উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে।

ইউরোপে ইসলামী চেতনার উন্মেষ, ইসলামী ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠা, মসজিদ নির্মাণ, ব্রিটেনে মুসলিম পার্লামেন্ট গঠন, মুসলিম রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীর ইসলাম গ্রহণ, যেমন রজার গারোদী (ফ্রান্স), মনসুর মন্টি (ফ্রান্স), আহমদ হোবার (অস্ট্রিয়া) প্রভৃতি; বিভিন্ন ইসলামী সম্মেলনের আয়োজন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামী সাময়িকী ও দৈনিকের আত্মপ্রকাশ, ইসলামী টিভি এবং রেডিও স্টেশন প্রতিষ্ঠা প্রভৃতিকে ইউরোপে ইসলামী চেতনার বিকাশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বলা যায়।

তৃতীয় বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনের প্রসারে ইউরোপের উৎকণ্ঠা : ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ধর্মের কাছে ফিরে আসার আহ্বান সারা পৃথিবীতে বিরাট আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। খ্রিস্টবিশ্বও এ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। ল্যাটিন আমেরিকায় ও আফ্রিকায় ধর্মতাত্ত্বিক স্বাধীনতার উন্মেষ এ প্রভাবেরই ফলশ্রুতি।

ধর্মতাত্ত্বিক স্বাধীনতাকে তৃতীয় বিশ্বের জনগণের সাম্য ও ন্যায়ের জন্য ঐতিহাসিক দাবি হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত কতিপয় ধর্মতাত্ত্বিক ব্যক্তিত্বের উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য, ‘খরভব‘Life Cannot Exist Only for Me’ গ্রন্থের লেখক নাইরোবীতে অনুষ্ঠিত খ্রিস্টীয় চার্চের এক কনফারেন্সে উল্লেখ করেন, ‘জনগণ এখনও এমন একটি সমাজের প্রত্যাশী যেখানে সকলেই ন্যায়বিচার ভোগ করবে। খোদায়ী মুক্তির এই ঐতিহাসিক পথ ধরেই আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত।’

‘The History of Church in Latin America’ এবং ‘The Libaration Philosophy’ গ্রন্থের প্রণেতা এটরিক ডে সেল বলেন, ‘মার্কসবাদের আগেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন বজায় ছিল, এর পরেও তা থাকবে।’

‘বেকারত্ব এবং পরিবেশ সংরক্ষণ প্রভৃতির মতো তৃতীয় বিশ্বের ইস্যুগুলোর ব্যাপারে পুঁজিবাদ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ কারণেই আমার মতে ধর্মতাত্ত্বিক মুক্তির চিন্তা বিকাশ লাভ করেছে।’

এল সালভাদরের জনৈক লেখক জন সুপারনিও থিওলডগ বলেন, ‘স্বাধীনতার সাথে শোষণ-বঞ্চনার একটি সম্পর্ক রয়েছে। তৃতীয় বিশ্বে শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়-অবিচার দীর্ঘদিন থেকে বিকশিত হয়ে আসছে। ধনী এবং দরিদ্র দেশসমূহের ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে। এখন বঞ্চিতদের আহাজারি আগের চেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে। বর্তমানে ধর্মতাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে এর সমাধান খুঁজে বেড়াচ্ছে মানুষ এবং এর অর্থই হলো ধর্মতাত্ত্বিক মুক্তি।’

ধর্মতাত্ত্বিক মুক্ত চিন্তা খ্রিস্টীয় চার্চের কর্তৃপক্ষের মাঝে সাড়া জাগাতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে এই মুক্ত চিন্তা চার্চের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে।

অপরদিকে তৃতীয় বিশ্বে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী আন্দোলনের ফলে এ সকল দেশে এবং ইউরোপে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার বিষয়ে পাশ্চাত্যের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়ের প্রতি পাশ্চাত্যের অসহযোগিতা, সেখানকার সামরিক জান্তার প্রতি ইউরোপের সমর্থন প্রভৃতি ইসলামী জাগরণের প্রতি ইউরোপের বিরূপ মনোভাবেরই পরিচায়ক।

ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী জাগরণের প্রতি ইউরোপের বিরোধিতা সুস্পষ্ট। নিম্নলিখিত কর্মকাণ্ডগুলোর মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়। যেমন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরোধিতা করে একে ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দেয়া, বিভিন্নভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, মধ্য এশিয়ার স্বাধীনতার পথে অগ্রসরমান মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় চেতনা যাতে জাগতে না পারে সেজন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, আফগানিস্তানের শান্তি-শৃঙ্খলা যাতে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সে উদ্দেশ্যে সেখানকার বিভিন্ন দল-উপদলের মাঝে বিরোধ লাগিয়ে দেয়া। পাকিস্তানে, ভারতে এবং লেবাননে ধর্মান্ধতাকে জাগিয়ে দেয়া, মুসলমানদের মাঝে জাতীয় বিরোধ সৃষ্টি করে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়া, ইসলামী আন্দোলনগুলোকে দমন করার জন্য স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল ও তাঁবেদার দলগুলোকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্য ধর্মাবলম্বীদের উসকে দেয়া, যেমন বাবরী মসজিদ ষড়যন্ত্র। পারস্য উপসাগরে এবং আফ্রিকা শৃঙ্গে ন্যাটো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি, সুদানের ওপর চাপ প্রয়োগ, ফিলিস্তিনে এবং লেবাননে ইহুদি যুলুম-নির্যাতনের প্রতি অব্যাহত সমর্থন প্রদান, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং মিশরের দালাল সরকারগুলোর প্রতি সমর্থন দান প্রভৃতি।

উপরিউক্ত কর্মকাণ্ডগুলো থেকেই প্রমাণিত হয় ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের প্রভাবে ইউরোপ ও পাশ্চাত্যে ইসলামের বিরোধিতা কত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে! সেই সাথে এটাও প্রমাণিত হয় ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর সারা বিশ্বে প্রকৃত ইসলামের পুনর্জাগরণের জোয়ার শুরু হয়েছে।

ইসলামী নৈতিকতা পুনরুজ্জীবনে ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর অবদান

ড. এম এ আনজালদুস মোরেলিস

মানব জীবন ও ইতিহাসের ওপর ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর প্রভাব চলতি শতাব্দী এবং এর পূর্বেকার বহু শতাব্দীর যে কোন ব্যক্তিত্বের তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী। আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি যে, তাঁর আবির্ভাবের পূর্ব ও পরবর্তীকালে মানব সমাজের অবস্থা বহু দিক বিচারে অভিন্ন নয়।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, আচরণ, রাজনীতি, নেতৃত্ব ও যুদ্ধবিগ্রহ ইত্যাদিসহ বিভিন্ন দিকে মান নির্ণয় করে গেছেন। অবশ্য এই মান নতুন কিছু নয়। তিনি তা নতুনভাবে আবিষ্কারও করেননি। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের এসব মান মহানবী (সা.) সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত ও নির্দেশিত করে গেছেন। তিনি আল্লাহ তাআলার প্রত্যাদিষ্ট ও কুরআনে প্রকাশিত নির্দেশাবলি মান্য করে চলতেন।

ইদানীং সমগ্র বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম সমাজ ইসলামী মূল্যবোধ, রীতিনীতি ও মানদণ্ড ভুলে গেছে বা সেগুলোর ব্যাপারে অজ্ঞতার মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। আর এসবের জায়গায় স্থান নিয়েছে উপনিবেশবাদী পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেয়া মানদণ্ড। এই পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা ইসলামী বিশ্বকে জবর দখল করেছে, এর সম্পদরাজি লুণ্ঠন করেছে, এর বাসিন্দাদের দাসে পরিণত করেছে এবং এর মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির ধ্বংসসাধন করেছে। আর নির্লজ্জভাবে চার হাতপায়ে নতজানু হয়ে শাসকদের পদচুম্বনকারী, হাদীস বিকৃতকারী এবং প্রভুদের খেয়ালখুশি মোতাবেক কুরআনের ব্যাখ্যা প্রদানকারী দরবারি আলেমদের দ্বারা তাদের এসব কার্যকলাপকে ন্যায়সঙ্গত বলে সমর্থন করিয়ে নিয়েছে।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) ইসলামী উম্মাহকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, তাদেরকে ইসলামী মূল্যবোধ ও রীতিনীতি শিক্ষা দিয়েছেন এবং পরাশক্তি বলে কথিত পশ্চিমা ও বস্তুবাদীদের প্রাধান্য খর্ব করেছেন। সকল প্রকার ষড়যন্ত্র, সমস্যা ও বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে প্রমাণ করে তিনি দেখিয়ে গেছেন যে, একটি জাতি কিভাবে টিকে থাকতে পারে। কেননা, ইসলামী জীবনযাপনই হচ্ছে আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করার একমাত্র পন্থা। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : ‘কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনও কবুল করা হবে না এবং সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা আলে ইমরান ; ৮৫) পবিত্র কুরআনের এই বাণী মোতাবেক কেউ সাফল্য অর্জন করলে শয়তান অসন্তুষ্ট হয়, তাই সবসময় সে বান্দার ধ্বংস সাধনের চেষ্টা করে।

নৈতিকতা একটি সমাজে সুখের জন্য অপরিহার্য। আর মহানবী (সা.) প্রদত্ত শিক্ষা এবং ইমাম খোমেইনী (রহ.) কর্তৃক পুনরুজ্জীবিত ইসলামী নৈতিকতা সঠিক জীবন যাপনের একমাত্র পন্থা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা যে আদেশ দিয়েছেন, হাদীসের মাধ্যমে মহানবী (সা.) যে বাণী প্রকাশ করে গেছেন এবং আহলে বাইতগণ যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন সে মোতাবেক যে জীবন্ত ইসলামী নীতিবিধান তৈরি হয়েছে ইসলামী নৈতিকতা তা ছাড়া আর কিছু নয়।

নৈতিকতা খোদা ও তাগুতের মধ্যে পার্থক্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। সততা বা ভালো কর্মের স্বীকৃতি দিতে হবে, তার আনুকূল্য দান করতে হবে এবং তার বিকাশ ঘটাতে হবে। পক্ষান্তরে অসৎ বা মন্দ কর্মকে চিহ্নিত করতে হবে, তার নিন্দা করতে হবে এবং মানব জীবনের সকল কর্মকাণ্ড ও বিষয়াদিতে তা নিষিদ্ধ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সকল নবী-রাসূলের মাধ্যমে মানব সমাজের কাছে এই পার্থক্য তুলে ধরেছেন এবং একটি নৈতিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনামূলক নীতি তাদের মনে জাগরুক রেখেছেন। এছাড়া, মহানবী (সা.)-এর পরে যেহেতু আর কোন নবীর আবির্ভাব হবে না তাই আল্লাহ তাআলা জনসাধারণকে নৈতিকতা সম্পর্কে সজাগ রাখার জন্য ইমামদেরকে নিয়োগ করেন।

অবশ্য, ইদানীং মানুষ ধর্মের মৌলিক নীতিমালার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করছে, সৎকর্মের বিরোধিতা করছে এবং অসৎকর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে নৈতিক উৎকর্ষ উপেক্ষিত হচ্ছে এবং নৈতিকতাসম্পন্ন ও ধর্মপ্রাণ মানুষকে উপহাস ও অবজ্ঞা করা হচ্ছে। অপরদিকে কপট, দুর্নীতিপরায়ণ ও মিথ্যাবাদী লোকেরা প্রশংসিত হচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মের আদর্শ নমুনা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই নৈতিক অবক্ষয় একান্তভাবে কেবল অমুসলিম দেশে সংঘটিত হচ্ছে তাই নয়, সকল মুসলিম সমাজেই নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ছে এবং এর গতি অমুসলিম দেশসমূহের তুলনায় মুসলিম দেশসমূহেই বেশি। এর কারণ কী? অমুসলিমরা তো সত্যের সকল দিক সম্পর্কে অবগত নয় এবং যেহেতু তাদের সামনে সমগ্র বিষয়টি উদ্ভাসিত করা হয়নি, সেহেতু তারা সকল কিছু প্রত্যাখ্যানও করেনি। অথচ মুসলমানরা তো চৌদ্দশত বছর ধরে চূড়ান্ত সত্যকে জেনে আসছে এবং সে মোতাবেক তাদেরকে জীবন যাপন করতে আদেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং তারা যখন এটি প্রত্যাখ্যান করে তখন তা সচেতনভাবেই করে এবং খোদা ও তাঁর শিক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করার মানসেই করে। আর এই নৈতিক অবক্ষয়ের মাধ্যমেই তারা আনয়ন করে খোদার অভিশাপ। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি; কারণ, তারা মিথ্যাচারী। তাদেরকে যখন বলা হয়, ‘পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করো না’, তারা বলে, ‘আমরাই তো শান্তি স্থাপনকারী।’ সাবধান! এরাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, কিন্তু এরা বুঝতে পারে না। যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘যেসব লোক ঈমান এনেছে তোমরাও তাদের মতো ঈমান আন’, তখন তারা বলে, ‘নির্বোধ যে রকম ঈমান এনেছে আমরাও কি সে রকম ঈমান আনব?’ সাবধান! এরাই নির্বোধ, কিন্তু এরা বুঝতে পারে না। যখন তারা মুমিনদের সংস্পর্শে আসে তখন বলে, ‘আমরা বিশ্বাস করেছি’, আর যখন তারা নিভৃতে তাদের শয়তানদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, ‘আমরা তো তোমাদের সাথেই রয়েছি; আমরা শুধু তাদের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করে থাকি।’ আল্লাহ তাদের সাথে তামাশা করেন, আর তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ দেন। এরাই হেদায়াতের বিনিময়ে ভ্রান্তি ক্রয় করেছে। সুতরাং তাদের ব্যবসা লাভজনক হয়নি, তারা সৎপথেও পরিচালিত নয়।’ (সূরা বাকারা : ১০-১৬)

আমরা যদি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অনুশীলন করতে মনোযোগী না হই এবং আমাদের যদি বাহ্যিক ও মাঝামাঝি পর্যায়ের চিন্তা থাকে তাহলে আমরা মুসলমান হওয়ার দাবি করতে পারি না। আমরা কি আমাদের প্রতিবেশীদের সম্মান করি? মহানবী (সা.) বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে ঘুমাতে চায় সে মুমিন নয়।’ জ্ঞান অর্জনের তাকিদ দিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন : ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অনুসন্ধান করো।’

আমরা কোন হারাম বা নিষিদ্ধ কাজ করি না- এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের প্রতিটি কাজকে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। হারাম নয় অথচ হারামের দিকে প্ররোচিত এমন কিছুও আমাদেরকে অবশ্যই পরিহার করতে হবে। যেমন- খারাপ পরিবেশ, খারাপ সংস্পর্শ ও খারাপ উদ্দেশ্য।

প্রতিদিন আমাদের আত্মবিশ্লেষণ করতে হবে এবং অনুসন্ধান করে দেখতে হবে যে, আমরা ছোট মনে করি এমন কোন পাপ সেখানে বিরাজ করছে কিনা। কেননা, এসব ছোট ছোট পাপ বড় বড় পাপের রূপ নিয়ে বিস্তার লাভ করতে পারে, তাই অবশ্যই তা পুরোপুরি পরিহার করা দরকার। ছোট ছোট পাপ আত্মার অসুস্থতা সৃষ্টি করে, বড় বড় পাপের দিকে প্ররোচিত করে এবং ঈমান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অহমিকা, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা, ক্রোধ, আলস্য, লোভ ও মাত্রাতিরিক্ত পানাহার ইত্যাদি বড় পাপ এবং এসব মানুষকে অসৎকর্মের দিকে প্রলুব্ধ করে। ইসলামের নিম্নোক্ত নৈতিক গুণাবলির মাধ্যমে সেগুলোর মোকাবিলা করা যায়। যেমন- বিনয়, প্রেম, পরোপকার, সুধারণা, ধৈর্য, সৎকর্ম, মিতব্যয় ইত্যাদি।

পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা এসব সদগুণ শিক্ষা দিয়েছেন। ইমাম খোমেইনী (রহ.) বিশ্বের সামনে এইসব সদগুণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং দেখিয়ে গেছেন যে, বর্তমান বিশ্বেও এর প্রয়োজনীয়তা কত তীব্র! তিনি কেবল কথা ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখনী ও সাহিত্যের মাধ্যমেই এ শিক্ষা দেননি; বরং দৃষ্টান্তের মাধ্যমে এ শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তাঁর ধৈর্য ছিল দৃষ্টান্তমূলক ও প্রভাব বিস্তারক। সে কারণে ইরানের জনগণ নানা প্রতিকূলতা ও বিপর্যয়ের মধ্যেও অধিকতর ধৈর্যশীল হতে পেরেছে। ইমাম খোমেইনী (রহ.) ও তাঁর ইরানী জাতি কারবালার শহীদদের এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়। ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও অনুসারিগণ যেভাবে ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন সেভাবেই ইমাম খোমেইনী (রহ.) ও তাঁর জনগণ হামলা, আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জানমালের ক্ষতি, মিথ্যা অপবাদ ও সমালোচনা ইত্যাদির সম্মুখীন হয়।

মানবতার প্রতি ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর ভালোবাসা ছিল প্রচুর। সকল মানুষের জন্যই তিনি ভালো আনয়ন করেন, কেবল ইরানীদের জন্য নয়। ইমাম খোমেইনীর কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষ উপকৃত হয়েছে। ইরান, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, আফ্রিকা তথা বিশ্বের সকল নির্যাতিত মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করে এবং তাঁর থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে। তিনি সকলের জন্য দোয়া করতেন। গোটা মানবতার জন্য তিনি ছিলেন এক আশীর্বাদ।

ইমাম খোমেইনীর উত্তম চরিত্র ও খোশমেজাজ সম্পর্কে সকলেই ছিলেন সম্যক অবহিত। শিশু ও দরিদ্র কৃষক থেকে শুরু করে সুশিক্ষিত পণ্ডিত ও বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করত। ইমাম খোমেইনী ছিলেন অত্যন্ত দয়ার্দ্র হৃদয়, কিন্তু দৃঢ়চেতা। তাঁর শত্রু ও আক্রমণকারীদের বেলায়ও তাঁর এই বৈশিষ্ট্যের ব্যত্যয় ঘটতো না।

যে কোন লোকের তুলনায় ইমাম খোমেইনী বেশি পরিশ্রম করতেন। তিনি তাঁর দেশবাসী ও মুসলিম বিশ্বের সমস্যার ব্যাপারে সবসময় মনোযোগী থাকতেন। তিনি কখনই ব্যক্তিগত বৈষয়িক সুবিধা অর্জন করেননি; বরং একটি অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। তাঁর বাসগৃহ ছিল সাধারণ ইরানীদের বাসগৃহের চেয়েও সাধারণ। তিনি কখনই বিলাস পছন্দ করতেন না এবং সবসময় তোষামোদ ও পার্থিব সম্মান এড়িয়ে চলতেন। তিনি দেখিয়ে গেছেন যে, সকলেরই সুখে থাকার প্রয়োজন রয়েছে এবং ইসলামে তাই বলা হয়েছে। তিনি বস্তুবাদী মানুষদের থেকে সত্যনিষ্ঠ মানুষদের পৃথক করার একটি রেখাচিহ্ন এঁকে গেছেন। তাঁর অনুসারীদেরকেও তাঁর মতো হতে হবে এবং ধনী ও শক্তিশালী লোকদের টেবিল থেকে পতিত হাড় ও রুটির টুকরো নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হওয়া উচিত হবে না।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) সবসময় কেবল ইসলামের বাণী প্রচার করে গেছেন তাই নয়, তিনি ইসলামের সত্যকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসতেন। ইসলামী সত্যের একজন প্রেমিক হিসাবে তিনি ইসলামের সেবা করতে গিয়ে কোন ত্যাগ স্বীকারে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। তিনি এই প্রেমে তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। যুবক বয়সে ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁর এক চাচাকে তাঁর জন্য একটি মেয়ের সাথে বিয়ের আয়োজন করতে বলেন। কেননা, কিশোর বয়সেই ইমাম খোমেইনীর পিতৃবিয়োগ ঘটে। মেয়েটিকে যখন বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়, তখন মেয়েটি এই প্রস্তাব এই বলে অপছন্দ করে যে, তিনি (ইমাম খোমেইনী) ধর্মকে খুব বেশি ভালোবাসেন। তাই সে এই বিয়ের মাধ্যমে সুখী জীবন যাপন করতে পারবে না। সে রাতে স্বপ্ন দেখে যে, মহানবী (সা.) তাঁকে বলছেন : ‘তুমি কেন আমার সন্তানকে অস্বীকার করছ?’ পরের দিন সকালে সে তার পিতামাতাকে বলে : ‘আমি তাঁকে বিয়ে করব।’ এই মহিলাই ছিলেন ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর সারা জীবনের প্রিয় সঙ্গিনী এবং তিনি  সমগ্র জীবন ধরে তাঁর সঙ্গে সত্যের সন্ধানে যাবতীয় কষ্ট ও কাঠিন্য ভোগ করেছেন।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধকে জাগ্রত করে গেছেন এবং সমগ্র বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন যে, কোন ব্যক্তি ইসলাম অনুযায়ী সুখী জীবন যাপন করতে পারে এবং ইসলামই হচ্ছে সকল যুগের সকল মানুষের জন্য সঠিক জীবনপন্থা। তিনি আমাদেরকে সকল নবী-রাসূলের মাধ্যমে প্রেরিত এবং পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে চিরতরে প্রতিষ্ঠিত খোদার শাশ্বত ও সত্য আইন স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর রুহকে রহমত দ্বারা সিক্ত করেন, তাঁর কর্মপ্রচেষ্টা কবুল করে পুরস্কার ও সান্ত্বনা দান করুন, তাঁর অনুসারীদের তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ এবং তাঁর উত্তরাধিকারকে রক্ষা ও সাহায্য করার অনুপ্রেরণা দান করুন এবং তাঁর সাধনার ফল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে হেফাজত করুন।

হযরত আয়াতুল্লাহ আল উযমা আরাকী (রহ.)

হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা শায়খুল ফোকাহা মুহাম্মাদ আলী আরাকী ছিলেন ইরানের প্রখ্যাত আয়াতুল্লাহদের অন্যতম। ইল্ম, তাকওয়া, একনিষ্ঠতা ও জ্ঞান সাধনায় তাঁর ন্যায় ব্যক্তি দুর্লভ। ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা ছিল। তিনি বিপ্লবোত্তর তেহরানের জামারান এলাকায় গিয়ে ইমাম খোমেইনীর সাথে দেখা করেন। আর তাঁকে সালাম করতে গিয়ে ভক্তিভরে বলেছিলেন : ‘আসসালামু আলাইকা ইয়া ওয়ালিআল্লাহ’ অর্থাৎ হে আল্লাহর ওয়ালি! আপনার প্রতি সালাম। হযরত আয়াতুল্লাহ আরাকী বয়সে ইমাম খোমেইনী (রহ.) হতে দশ বছর বড় ছিলেন। আর তাঁরা উভয়ে হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা হায়েরী (র.)-এর ছাত্র ছিলেন। তবু তিনি ইমাম খোমেইনীর ব্যক্তিত্ব ও ইসলামী খেদমতের জন্য তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। লোকমুখে শোনা যায় তিনি ইমাম খোমেইনীর হাত চুম্বন করতে চাইলে ইমাম খোমেইনী তা করতে দিতেন না। বলতেন : ‘আপনি হলেন পুণ্যবান লোকদের অবশিষ্ট ব্যক্তি। আপনার অবস্থান পৃথিবীর জন্য কল্যাণের নিদর্শন।’

ইমাম খোমেইনীর ইন্তেকালের পর মরহুম আয়াতুল্লাহ আরাকী তাঁকে এক ‘মহামানব’ বলে আখ্যায়িত করেন। আর তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার জন্য বাণী প্রেরণ করেন। তিনি তাঁর বাণীতে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জোরালো ভাষায় আবেদন জানান। বাণীতে তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের হিফাযত করাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে বর্ণনা করেন।

আয়াতুল্লাহ উজমা মুহাম্মাদ আলী আরাকী (র.)-এর যোগ্যতা ও গুণাগুণ বর্ণনা করতে গিয়ে ইমাম খোমেইনীর প্রতিনিধি জনাব আয়াতুল্লাহ সানিয়ী বলেন : ইমাম খোমেইনীর ইন্তেকালের পর তাঁর তাকলীদ করা যাবে বলে মরহুম আয়াতুল্লাহিল উজমা আরাকী ফতোয়া দিয়েছিলেন। সাধারণত শিয়া আলেমগণ মুজতাহিদের মৃত্যুর পর তাঁর তাকলীদ করা যাবে না বলে মতপ্রকাশ করেন। কিন্তু ইমাম খোমেইনী (র.) এর ব্যতিক্রম ছিলেন বলে হযরত আয়াতুল্লাহ আরাকী ফতোয়া প্রদান করেন। ইমাম খোমেইনীর ব্যক্তিত্বের চুলচেরা বিশ্লেষণের পর তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন- যা ইরানের অন্যান্য আয়াতুল্লাহ সমর্থন করেছিলেন।

হযরত আয়াতুল্লাহ আরাকী ‘শায়খুল ফোকাহা ওয়াল মুজতাহিদীন’ খেতাবে ভূষিত হন। অর্থাৎ তাঁকে মুজতাহিদ ও ফকীহদের পুরোধা বলা হতো। তিনি পনেরো খোরদাদ থেকে একচল্লিশ বছর পূর্বে ‘আল-উরওয়া’ গ্রন্থের টীকা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এ কাজ তখন কঠিন ছিল। কারণ, তখনো ‘আল-উরওয়া’ গ্রন্থের সূত্র উল্লেখ করে কোন গ্রন্থ রচিত হয়নি। এমতাবস্থায় সূত্রহীন আল-উরওয়া গ্রন্থের ওপর ইজতিহাদ করে মাসয়ালা-মাসায়েল বের করা কঠিন ব্যাপার ছিল। এ কঠিন কাজ তিনি অনায়াসে সম্পাদন করেন। ফিকাহ শাস্ত্রে আয়াতুল্লাহিল উজমা আরাকীর পাণ্ডিত্যের এটি একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

তিনি শুধু ফিকাহ শাস্ত্রের পণ্ডিত ছিলেন না। তিনি ফিকাহ তথা ব্যবহারিক শাস্ত্রের বিধান রচনার মূলনীতি-বিশারদ ব্যক্তি ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য প্রতিভার পরিচয় মেলে। ফিকাহবিদদের মধ্যে তাঁর ন্যায় ব্যক্তি অতি বিরল। তিনি অত্যন্ত পরহেজগার-মুত্তাকী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর দোয়া কবুল হতো। একবার কোম নগরে অনাবৃষ্টির দরুন ভয়াবহ অবস্থা দেখা দেয়। বৃষ্টির জন্য নামাযের আয়োজন করা হয়। হযরত আয়াতুল্লাহিল উযমা আরাকী বৃষ্টির জন্য নামায পড়ান আর দোয়া করেন। ফলে বৃষ্টি বর্ষিত হয়ে শহরে শান্তি নেমে আসে। আর ফিকাহ শাস্ত্রে তাঁর বুৎপত্তিতে সমসাময়িক আলেমগণ তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পার্থিব বস্তুতে তাঁর অনাসক্তি ও তাকওয়ার স্বীকৃতি দিয়েছেন সমসাময়িক বিদ্বানগণ। তিনি কোনদিন ‘মারজা’ বলে দাবি করেননি। ধর্মের বিধান জানার জন্য যাঁর প্রতি মুসলমানগণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাঁকে ‘মারজা’ বলা হয়। লোকেরা এক বাক্যে মারজার প্রতি অনুগত থাকে। ধর্ম-কর্মের মর্যাদা নিরূপণে এটি একটি উঁচু স্থান। এ পর্যায়ে কদাচই কেউ উপনীত হন। আল্লামা আয়াতুল্লাহিল উযমা বরুজারদী এবং আল্লামা আয়াতুল্লাহিল উযমা  খোনসারী মরহুম মারজা ছিলেন। তাঁদের ওফাতের পরও তিনি মারজা হওয়ার দাবি করেননি। আয়াতুল্লাহিল উযমা খোনসারীর ওফাতের পর তাঁর অনুসারীরা হযরত আয়াতুল্লাহিল উযমা আরাকীর প্রতি আকৃষ্ট হন। তবু তিনি মারজা হওয়ার কল্পনা করেননি। কিন্তু ইসলামের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও ইসলামের হিফাজতের প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি একমাত্র ইসলামের স্বার্থে মারজা পদে অলংকৃত হন। একমাত্র ইসলামের স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

তাঁর ইলম, তাকওয়া, পরহেজগারী ও বুজর্গীর দরুন তাঁর পেছনে বড় বড় আলেম এক্তেদা করে নামায পড়তেন। তিনি বহুদিন যাবৎ মাদ্রাসা-ই ফায়যিয়ায় নামাযে ইমামতি করেন। কোম নগরে যে কোন পর্যায়ের আলেমের আগমন হয়েছে তাঁরা হযরত আয়াতুল্লাহ আরাকীর পেছনে নামায পড়ার গৌরব অর্জন করেন। হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা শায়খুল ফোকাহা মুহাম্মাদ আলী আরাকী ১৯৯৪ সালের ২৯ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন।