যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নৃশংস হত্যাকাণ্ড , বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা কনস্যুলেট অফিসের ব্যর্থতা
পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২৮, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যার ঘটনা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে।
প্রশ্ন উঠেছে গত ১৬ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশি ওই দুই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিত্য কার্যক্রমে অনুপস্থিত ও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকার পরেও ফ্লোরিডায় অবস্থিত বাংলাদেশের কনস্যুলেট অফিস থেকে কোনো ব্যবস্থা বা উদ্যাগ নেয়া হয়নি। এমনকি তারা শায়ের নামক এক ব্যক্তির দেয়া তথ্য পাওয়ার পরেও কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শেষে লিমনের লাশ উদ্ধারের পর কনস্যুলেট অফিস তাদের তৎপরতা শুরু করে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর প্রবাসী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, সামাজিক সম্পর্ক এবং নগর জীবনের চাপের বহুমাত্রিক সংকটকে সামনে এনে দিয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে বলেছেন, ওয়াশিংটনসহ যুক্তরাষ্ট্রের সকল দূতাবাসের অফিসগুলোকে এ ব্যাপারে তৎপর থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, আমি নিজেও নিহত দু’জনের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেছি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নিহত ওই দু’জনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করা হয়েছে। নেটিজেনরা বলছেন, এটি কেবল একটি অপরাধ নয়; বরং দু’জনই ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডায় পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১৬ এপ্রিল থেকে হঠাৎ জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নামে ওই দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়। শায়ের নামে এক ব্যক্তি প্রথমে এই নিখোঁজের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। দ্রুত তা একটি রহস্যময় ও সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে রূপ নেয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, ফোন বন্ধ থাকা এবং নিয়মিত কর্মকাণ্ড থেকে হঠাৎ অনুপস্থিতি সব মিলিয়ে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে।
পরবর্তীতে ঘটনাটি আরো ভয়াবহ মোড় নেয়, যখন একজনের লাশ উদ্ধার হয় এবং অন্যজনকেও নিহত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তদন্তে সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য তাদেরই এক রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহ-এর বিরুদ্ধে দুইটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। পরিচিত একজনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠা ঘটনাটিকে আরো জটিল ও আলোচিত করে তোলে।
মার্কিন তদন্ত সংস্থার মতে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মোটিভ এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত না হলেও কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রথমত, একই বাসস্থানে বসবাসরত ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ বা মানসিক চাপ কখনো কখনো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। দ্বিতীয়ত, সম্পর্কগত জটিলতা বা আবেগজনিত দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করতে পারে। তৃতীয়ত, তদন্তে যে পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তা ঘটনাটিকে আকস্মিক নয় বরং পূর্বপরিকল্পিত অপরাধ হিসেবে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।
বাংলাদেশে এই ঘটনা গভীর শোক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও শোকের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা এবং আবাসিক পরিবেশের মান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মার্কিন তদন্ত সংস্থার তথ্য মতে, এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত রিপোর্ট করা হয়েছিল। শায়ের নামে একজন ব্যক্তির দ্রুত পদক্ষেপের ফলে তদন্ত দ্রুত শুরু হয়, যা ভবিষ্যতে এমন ঘটনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে তাহলে ফ্লোরিডায় অবস্থিত কনস্যুলেট অফিস তাহলে কী করেছে। তারা লিমনের লাশ উদ্ধারের পর তৎপরতা শুরু করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও গত ২৬ এপ্রিল প্রথম এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়ে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল এই হত্যাকাণ্ড। একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করে চলেছি। একজনের লাশ উদ্ধার হলেও আরেক জনের দেহের খ-িত অংশ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। খুনিকে চিহ্নিত করে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অনেক তথ্য মিলেছে। সুতরাং এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্য উদঘাটন এখন সময়ের অপেক্ষা।
সর্বশেষ তথ্য বলছে, লিমনের লাশ একটি সেতু এলাকা এবং বৃষ্টির দেহের খ-িত অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহ-কে গ্রেফতার করার পর তার দেয়া তথ্য মতে খুনের আলামত পাওয়া গেছে। অন্যদিকে নিহত বৃষ্টির দেহের খ-িত অংশ উদ্ধারের পর তাকে নিখোঁজ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ডিএনএ টেস্টের পর তাকে শনাক্ত করা হবে। গ্রেফতারকৃত হিশাম আবুগারবিয়েহ-এর বিরুদ্ধে দুটি পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে এই ঘটনা পরিকল্পিত। তদন্তে পাওয়া গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘটনার আগে সন্দেহজনক অনলাইন অনুসন্ধান করেছিল। তার রুম থেকে রক্তের আলামত ও ভিকটিমদের জিনিসপত্র উদ্ধার হয়েছে।
এই ঘটনাটি দেশজুড়েও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর বা আশপাশে এমন ঘটনা বিরল। এ কারণে প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে। ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিহতদের লাশ দেশে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিহত বৃষ্টির গ্রামের বাড়িতে ডিসি-ইউএনও
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে হত্যার শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার ও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব। গতকাল দুপুর ২টার দিকে বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায় গিয়ে তারা এ সমবেদনা জানান।
সূত্র: ইনকিলাব