মঙ্গলবার, ১৩ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

English

ট্রাম্পের ইন্ধনে ইরানে বিক্ষোভ

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ১২, ২০২৬ 

news-image

ইরানজুড়ে শনিবার রাতেও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষও হয়েছে। সর্বশেষ তিন দিনে দুপক্ষের সংঘর্ষে কয়েক শ বিক্ষোভকারী নিহত বা আহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির বরতে এবিসি নিউজ জানিয়েছে, চলমান বিক্ষোভে ১১৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২ হাজার ৬শর বেশি লোককে আটক করা হয়েছে।

এদিকে শনিবার বিক্ষোভকারীদের হুশিয়ার করে ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ বলেছেন, ‘যারা বিক্ষোভ করছেন, তাদের আল্লাহর শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।’ ইরানে এ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আইনত মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েই যাচ্ছেন। শনিবারও ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ইরান ‘স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে’ এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘সহায়তা দিতে প্রস্তুত’।

তবে যুক্তরাষ্ট্রকে হুশিয়ার করে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তা হলে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানবে তেহরান। বিবিসি, রয়টার্স ও জেরুজালেম পোস্ট। গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়।

এর পর দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে, কিন্তু দ্রুতই তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। প্রতিবাদকারীদের কেউ কেউ এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র শেষ করার ডাক দিচ্ছেন। তেহরানের চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে শনিবার মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, রাজধানীর মাত্র ছয়টি হাসপাতালে অন্তত ২১৭ বিক্ষোভকারীর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এসব হাসপাতালে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই গুলিবিদ্ধ ছিলেন। হাসপাতালগুলোতে হতাহত ব্যক্তিদের ভিড় উপচে পড়ছে।

ইরানে চলমান বিক্ষোভ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার পশ্চিম লন্ডনে ইরানের দূতাবাস প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিন কয়েক শ বিক্ষোভকারী দূতাবাস ভবনের বাইরে জড়ো হন। তাদের হাতে ছিল ইরানের পতাকা। তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন। এ সময় একজন দূতাবাস ভবনের বারান্দায় উঠে ইরানের পতাকা নামিয়ে ফেলেন।

লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ বলেছে, প্রতিবাদের সময় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনুপ্রবেশের অভিযোগে কর্মকর্তারা অন্য একজনকে খুঁজছেন।

যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে ইরান

ইরানে কোনো হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ রবিবার সংসদে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তা হলে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করবে ইরান এবং সেখানে আঘাত হানবে।

এ বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং ওয়াশিংটন থেকে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। একই প্রেক্ষাপটে, ইসরায়েলও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের পদক্ষেপ বা হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা এবং ইরানের হামলার কথা মাথায় রেখে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। দেশটির নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। ইরানে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সরকারবিরোধী বড় ধরনের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ হতে পারে কিনা- সে বিষয়ে ইসরায়েল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক দিনে একাধিকবার ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। বিক্ষোভ দমনে শক্তি প্রয়োগ না করতে তেহরানের শাসকদের সতর্ক করেছেন। শনিবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ইরান ‘স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে’ এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘সহায়তা দিতে প্রস্তুত।’

গত সপ্তাহে ইসরায়েলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বৈঠকে উপস্থিত থাকা সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানায়, সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়ে ইসরায়েল সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে বাস্তবে সতর্ক অবস্থানের অর্থ কী- এ বিষয়ে তারা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। তবে গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং ওই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিমান হামলা চালানোর প্রেক্ষাপটে ইরান ঘিরে যে কোনো নতুন সমীকরণে দ্রুত জড়িয়ে পড়তে পারে অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি- এটা ইসরায়েলি উদ্বেগের বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে, শনিবার এক ফোনালাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে দাবি করেছে একটি ইসরায়েলি সূত্র। কথোপকথনে উপস্থিত ওই সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গ ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা নেতানিয়াহু ও রুবিওর মধ্যে ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আলোচ্য বিষয়গুলো কী ছিল সে বিষয়ে কিছু জানাননি।

ইরানে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী

দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। আইআরজিসি ইরানের সেনাবাহিনী থেকে পৃথক একটি বিশেষ বাহিনী। শনিবার আইআরজিসি বলেছে, তারা দেশের নিরাপত্তা ও ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের অর্জনগুলো রক্ষা করবে।

এই বাহিনীর অভিযোগ, দুই রাত ধরে ‘সন্ত্রাসীরা’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থার ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে, সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মীদের হত্যা করছে এবং সম্পত্তি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও বলেছে, তারা জাতীয় স্বার্থ, দেশের কৌশলগত অবকাঠামো ও জনসম্পত্তি রক্ষা করবে এবং সুরক্ষা দেবে। আইআরজিসির মতো ইরানের সেনাবাহিনীও দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীন পরিচালিত হয়। অন্যদিকে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

একটি ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে সম্ভবত একদিনের বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ আছে। শনিবার সকালে সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে নেটব্লকস বলেছে, ‘সূচকগুলো বলছে, ৩৬ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দেশব্যাপী (ইরান) ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি আছে।’

সূত্র: আমাদের সময়