ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়: যুদ্ধোন্মাদ ট্রাম্পকে মার্কিনিদের স্পষ্ট বার্তা
পোস্ট হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬
২০২৬ সালে মার্কিন জনগণ ইরানের বিরুদ্ধে কোনো নতুন সামরিক দুঃসাহসিক কাজের বিরোধিতায় অভূতপূর্ব দৃঢ়তা দেখিয়েছে এবং ট্রাম্পের যুদ্ধোন্মাদনার প্রতি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
পার্সটুডে জানিয়েছে, বিতর্কিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ওয়াশিংটনের কিছু কট্টরপন্থি রাজনীতিক যখন ইরানের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের কথা বলছেন, তখন জনমত জরিপগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি তুলে ধরছে। ২০০৩ সালের মার্চে ইরাক আক্রমণের সময় যেখানে ৭২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক হামলার পক্ষে ছিলেন (গ্যালাপ জরিপ), এখন সেই সমর্থনের চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। পশ্চিম এশিয়ায় আরেকটি যুদ্ধ শুরু করার প্রশ্নে অধিকাংশ আমেরিকান সরাসরি ‘না’ বলছেন।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং এসএসআরএস-এর যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে পরিচালিত একটি জরিপ অনুসারে, মাত্র ২১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে সামরিক হামলাকে সমর্থন করেন। বিপরীতে ৪৯ শতাংশ স্পষ্টভাবে বিরোধিতা করেছেন এবং ৩০ শতাংশ কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। ২০২৫ সালের জুনের হামলার পর পরিচালিত জরিপগুলোতেও যুদ্ধবিরোধী মনোভাবই প্রধান ছিল। সেই সময় ৮৫ শতাংশ নাগরিক যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক সময়েও এই অনীহা কমেনি।
রিপাবলিকান দলেও এ নিয়ে একমত অবস্থান নেই। যদিও রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে ৪০ শতাংশ সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে মত দিয়েছেন, ২৫ শতাংশ সরাসরি বিরোধিতা করেছেন এবং ৩৫ শতাংশ নিশ্চিত নন। ফলে দলীয় ভেতরেও বিভক্তি স্পষ্ট।
আরও কয়েকটি জরিপ একই প্রবণতা দেখিয়েছে। জানুয়ারির শেষ দিকে দ্য ইকোনমিস্ট ও ইউগভ (YouGov)–এর যৌথ জরিপে ৪৮ শতাংশ আমেরিকান ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন, আর ২৮ শতাংশ সমর্থন জানান। প্রশ্নটি যখন “ইরানের ভেতরের বিক্ষোভকারীদের সমর্থন” প্রসঙ্গে করা হয়, তখন বিরোধিতা আরও বেড়ে ৫২ শতাংশে পৌঁছায়।
একইভাবে, কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে করা এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের “প্রস্তুত ও সশস্ত্র” থাকার হুমকির এক সপ্তাহ পরে, ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয় এবং মাত্র ১৮ শতাংশ হস্তক্ষেপকে সমর্থন করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি এখনো মার্কিন সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে আছে। জর্জ ডাব্লিউ বুশ–এর আমলে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া সেই যুদ্ধের ২০তম বার্ষিকীতে ৬১ শতাংশ আমেরিকান একে বড় ভুল বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে নতুন করে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে জনগণের ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই অনীহা তৈরি হয়েছে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ২০০৩ সালের মতো জনমত গঠনের বড় কোনো প্রচারাভিযান এবার গড়ে উঠেনি। পাশাপাশি রিপাবলিকান দলের ভেতরের মতভেদও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। জনমত জরিপগুলোও নিশ্চয়ই তার রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশে ভূমিকা রাখছে।
মার্কিন জনগণের এই বিরোধিতার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, “অন্তহীন যুদ্ধ” নিয়ে গভীর ক্লান্তি। আফগানিস্তান ও ইরাকে প্রায় দুই দশকের যুদ্ধ আমেরিকার অর্থনীতি ও সমাজে বড় চাপ তৈরি করেছে। এসব যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন। অনেকের মতে, এত ত্যাগের পরও প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা আসেনি। ফলে নতুন করে আরেকটি যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে মানুষ আগ্রহী নয়।
দ্বিতীয়ত, ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ আমেরিকান আশঙ্কা করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ হলে তা দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা—এসব বিষয় জনগণের মনে আশঙ্কা বাড়িয়েছে যে, যেকোনো সংঘাতের সরাসরি মূল্য দিতে হতে পারে মার্কিন সেনা ও তাদের মিত্রদের।
তৃতীয়ত, সরকারের ব্যাখ্যা নিয়ে সংশয়। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারেনি কেন নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ দরকার। একদিকে আগের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি “সম্পূর্ণ ধ্বংস” হয়েছে বলে দাবি করা হয়, অন্যদিকে একই বিষয়কে আবারও সম্ভাব্য হামলার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এই দ্বৈত বক্তব্য অনেকের মনে সন্দেহ তৈরি করেছে। কংগ্রেসে যথেষ্ট আলোচনা বা অনুমোদন ছাড়া সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উদ্বেগের কারণ।
চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় ইস্যু। ভোটারদের বড় অংশ মনে করেন, সরকারের মনোযোগ দেশের ভেতরের সমস্যার দিকে থাকা উচিত। নতুন যুদ্ধের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়কে তারা বাস্তবসম্মত মনে করেন না। এমনকি “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে বিশ্বাসী অনেক রিপাবলিকানও মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।#
পার্সটুডে