সোমবার, ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

English

ইরানি গণমাধ্যমের চোখে বিশ্ব: দনবাস থেকে পারস্য উপসাগরের রেকর্ড

পোস্ট হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬ 

news-image

পার্সটুডে: ইরানের গণমাধ্যমে আজকের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আঞ্চলিক শক্তির বাস্তব চিত্র। একদিকে ইউক্রেনে যুদ্ধ ও শান্তির নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র দনবাস অঞ্চল, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরে ইরানিদের রেকর্ড গড়া সাফল্য।

সংস্কারপন্থি দৈনিক আরমানে ইমরোজ লিখেছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকার বৈদেশিক নীতির মধ্যে যা আমরা দেখতে পাচ্ছি তা হলো “আধিপত্যের পতন এবং শক্তি প্রদর্শন।”  স্বল্পমেয়াদে এর সুফল সীমিত কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশটির জন্য ভয়াবহ ব্যয় বয়ে আনবে। ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি কোনো সম্মান দেখান না।

দৈনিকটি আরও যোগ করেছে: যদি জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়কার সামরিক হস্তক্ষেপের মডেলকে বলা হতো বুট দিয়ে নতুন গণতন্ত্র, তাহলে ট্রাম্পের নীতিকে বলা যায় বুট দিয়ে নতুন আমলাতন্ত্র। অর্থাৎ, সামরিক শক্তির ওপর ভর করেই বিশ্বরাজনীতিতে নিজের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। এর উদাহরণ হিসেবে পত্রিকাটি ভেনেজুয়েলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জানায়, ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগকে দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

ইরানি ড্রোন ক্যারিয়ার (শহীদ বাহমান বাকেরি)

ইসনা | হরমুজ প্রণালীতে মহড়া: ইরানের প্রতিরক্ষা বার্তা

অন্যদিকে, ইসনা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সাম্প্রতিক যৌথ মহড়া কেবল একটি সামরিক মহড়া নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বার্তা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সাইদ রেজা মিরতাহের বলেন, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ এই মহড়ার মাধ্যমে ইরান মূলত যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির বিরুদ্ধে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও সামরিক প্রস্তুতি প্রদর্শন করছে। এই মহড়ায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতার অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের অবস্থানকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে।

মিরতাহের আরও বলেন, এই মহড়া এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করেছে এবং একইসঙ্গে কিছু ইরানি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তার মতে, এসব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো- আন্তর্জাতিক পরিসরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলাকে নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বৈধতা দেওয়া।

দনবাস: ইউক্রেনে যুদ্ধ ও শান্তির কেন্দ্রবিন্দু

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ইরানি গণমাধ্যমে গভীর বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। মেহের নিউজ এজেন্সি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো তিনপক্ষীয় আলোচনায় বসেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মূল দ্বন্দ্ব এখন আর যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে নয়—বরং ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।

বিশেষ করে পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চল এখন যুদ্ধ ও শান্তির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে একটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ক্ষেত্র।

রাশিয়ার কাছে দনবাস হলো- একটি ভূ-রাজনৈতিক স্বপ্নের প্রতীক, যেখানে প্রভাব বিস্তার মানে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করা। অন্যদিকে ইউক্রেনের কাছে এই অঞ্চল হলো- জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের সীমারেখা। ফলে যতদিন এই ভূমির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হবে, ততদিন ইউক্রেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্ষীণই থেকে যাবে।

ইরানের সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের উপর পশ্চিমাদের ক্ষোভ

জামে জাম | সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণে পশ্চিমের ক্ষোভ

ইরানের অভ্যন্তরীণ ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র নিয়েও পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া আলোচনায় এসেছে। কনজারভেটিভ দৈনিক জাম-ই জাম লিখেছে, ইরানের অডিও-ভিজ্যুয়াল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সাত্রা’র ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রথম দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কারণ এই প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্ত্র নেই, কোনো সামরিক অভিযান নেই এবং এটি সরাসরি নিরাপত্তা কাঠামোর অংশও নয়। কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্তটি পশ্চিমের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

দৈনিকটির মতে, যদি এই নিষেধাজ্ঞাকে IRGC-কে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, তাহলে বোঝা যায় যে পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতিতে নিষেধাজ্ঞা এখন আর কেবল কূটনৈতিক হাতিয়ার নয়, বরং এটি একটি মিশ্রণ যুদ্ধের অস্ত্র। এই যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ, মিডিয়া যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু একসঙ্গে।

পারস্য উপসাগরে রেকর্ড ভেঙেছে ইরানিরা

ফার্স নিউজ | পারস্য উপসাগরে ইরানিদের রেকর্ড

ফারস নিউজ এক নিবন্ধে লিখেছে, পারস্য উপসাগরে ইরান নতুন এক রেকর্ড স্থাপন করেছে। এক মাসে ১.৮ মিলিয়ন টন প্রয়োজনীয় পণ্য খালাস এবং একটি ৭৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ তিন দিনের কম সময়ে খালি করা—এই দুই ঘটনাই ইরানের নৌপরিবহন সক্ষমতার শক্তিশালী চিত্র তুলে ধরে।

ইরানের পোর্টস অ্যান্ড ন্যাভিগেশন অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ১৪০৪ সালের দিওয়েক মাসেই ১.৮ মিলিয়ন টন পণ্য খালাস হয়েছে, যা আগের রেকর্ড ভেঙেছে এবং প্রায় ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যখন পারস্য উপসাগরের নৌপথ নিরাপত্তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো হচ্ছে, তখন বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা—জাহাজ ইরানের বন্দরে আসছে, পণ্য খালাস হচ্ছে এবং লজিস্টিক ব্যবস্থা নির্বিঘ্নে সচল রয়েছে।

সামুদ্রিক পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত নিরাপত্তার মানদণ্ড কোনো শিরোনাম বা প্রচারণা নয়; বরং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতাই হলো প্রকৃত নিরাপত্তার প্রমাণ।#

পার্সটুডে