ইরানিদের বিদ্রোহে উস্কানি দিতে ইসরায়েলের ‘এআই’ প্রোপাগান্ডা
পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ৪, ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা জবাব দিতে ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ তথা পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে আছে। এর জবাবে তেহরান সতর্ক করেছে যে, যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ইতিমধ্যে অশান্ত এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করবে।
ইরানের তলানিতে ঠেকে যাওয়া অর্থনীতি ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে শুরু হওয়া অস্থিরতা এখন ব্যাপক রূপ নিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। রিয়ালের মূল্য পতন ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই সপ্তাহে প্রথম প্রাণহানির ঘটনায় কমপক্ষে ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত রবিবার তেহরানে দোকানদারদের ধর্মঘটের মাধ্যমে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও তা দ্রুত অন্তত ১৫টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২২ সালের দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার জন্য এটিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে সরাসরি চরমপত্র দিয়েছেন। তিনি লেখেন, “ইরান যদি তাদের চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় এবং তাদের হত্যা করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত এবং ব্যবস্থা নিতে মুখিয়ে আছি।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরানের নেতৃত্ব। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি সতর্ক করে বলেছেন, আমেরিকার হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।
এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে লারিজানি বলেন, “ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের অর্থ হলো পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করা এবং আমেরিকার স্বার্থকে ধ্বংস করা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের উচিত তাদের সৈন্যদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রাখা।”
অন্যান্য কর্মকর্তারাও একই সুর মিলিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বিক্ষোভকারীদের ‘উদ্ধার’ করার ট্রাম্পের প্রস্তাবকে উপহাস করেছেন। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইরানের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে বাঘাই বলেন, “ইরানিরা আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই তাদের সমস্যার সমাধান করবে এবং কোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করবে না।”
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উপদেষ্টা আলী শামখানি বলেছেন, ইরানের নিরাপত্তা একটি ‘রেড লাইন’ (চরম সীমা) এবং হস্তক্ষেপকারী যেকোনো হাত ‘কেটে ফেলা হবে’।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক পোস্টে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হস্তক্ষেপ করে তবে পুরো অঞ্চলে থাকা সমস্ত আমেরিকান ঘাঁটি ও বাহিনী বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে ইসরায়েল
ওয়াশিংটনের পাশাপাশি তেহরানকে ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রচারণারও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ইসরায়েলি সরকারি অ্যাকাউন্ট এবং কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের উৎসাহিত করছেন এবং এই অস্থিরতাকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের শুরু হিসেবে চিত্রিত করছেন।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অফিসিয়াল ফারসি অ্যাকাউন্ট থেকে সোমবার পোস্ট করা হয়েছে: “সবাই রাস্তায় নেমে আসুন। এখনই সময়। আমরা শুধু দূর থেকে বা কথায় নয়, আমরা আপনাদের সাথে সরাসরি মাঠেও আছি।”
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্স-এ একটি কার্টুন পোস্ট করেছে যেখানে প্রাক-বিপ্লব আমলের ইরানের প্রতীক ‘সিংহ ও সূর্য’ বর্তমান শাসনের প্রতীককে পিষে ফেলছে। সেখানে লেখা ছিল, “অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়তে ইরানি সিংহ ও সিংহীদের উত্থান। অন্ধকারের ওপর আলোর জয়।”
ইসরায়েলের উদ্ভাবন বিষয়ক মন্ত্রী গিলা গামলিয়েল একটি ভিডিও শেয়ার করে বলেন, “বাবা-মায়েদের এই বিক্ষোভ ন্যায়সঙ্গত।” প্রবাস বিষয়ক মন্ত্রী অ্যামিচাই চিকলি সিংহ ও সূর্যের পতাকা হাতে এক বিক্ষোভকারীর ছবি পোস্ট করেন। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের শেয়ার করা অনেক বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসরায়েলি অ্যাকাউন্টগুলো থেকে পোস্ট করা বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরিবর্তন করা হয়েছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পোস্ট করা একটি ছবি এআই-এর মাধ্যমে তৈরি বা বিকৃত করা হয়েছে বলে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি তেহরানকে এই অস্থিরতার জন্য ‘জায়নবাদী’ ষড়যন্ত্রের দোহাই দেওয়ার কোনো সুযোগ দিতে চান না।
ইনকিলাব