ইরানকে ‘লিবিয়ার পথে’ ঠেলে দেওয়ার মার্কিন-ইসরায়েলি অপচেষ্টা
পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ৮, ২০২৬
ইরানের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে তৎপরতা ও বক্তব্য দেখা যাচ্ছে, তা কেবল কূটনৈতিক উদ্বেগের বিষয় নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত বহন করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে তথাকথিত ‘লিবিয়ার মতো পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ার’ কৌশল—যাকে তারা নিজেরাই Libyanizing Iran বলে আখ্যায়িত করছে। এই কৌশলের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো- ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক আগ্রাসনের জন্য একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও নৈতিক সম্মতি তৈরি করা।
অর্থনৈতিক সংকট ও প্রকৃত জনঅসন্তোষের পটভূমি
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক অবরোধ এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপ ইরানের সমাজ ও অর্থনীতিকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই প্রকৃত ও ন্যায্য অর্থনৈতিক অসন্তোষকে বিদেশি শক্তিগুলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
১২ দিনের যুদ্ধ এবং পশ্চিমা কৌশলের ব্যর্থতা
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বক্তব্য, অবস্থান এবং মিডিয়া কৌশল বিশ্লেষণ করলে একটি সুস্পষ্ট চিত্র সামনে আসে। ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তিনটি কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে দুর্বল করা এবং দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা। বাস্তবতা হলো, এই তিনটি লক্ষ্যেই তারা ব্যর্থ হয়েছে। বরং যুদ্ধ-পরবর্তী মাত্র সাত মাসের মধ্যেই ইরান তার পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
এই দ্রুত পুনরুদ্ধার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং হোয়াইট হাউসে প্রভাবশালী নিও-কনজারভেটিভ গোষ্ঠীর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে, ইরান ইস্যুতে তথাকথিত “সুযোগের জানালা” দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।
নেতানিয়াহুর ফ্লোরিডা সফর ও ‘সবুজ সংকেত’ অনুসন্ধান
এই উদ্বেগেরই প্রতিফলন দেখা যায় নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ফ্লোরিডা সফরে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ একাধিক মূলধারার পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য গাজা যুদ্ধ বা লেবাননের নিরস্ত্রীকরণ নয়; বরং ইরানের শক্তির মূল কেন্দ্রগুলোর ওপর পুনরায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত “সবুজ সংকেত” আদায় করা।
এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, সামরিক পথই এখনো ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কাছে প্রধান বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘লিবিয়া মডেল’: অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে অস্ত্র বানানোর কৌশল
এখানেই “লিবিয়ার মডেল” প্রসঙ্গটি সামনে আসে। লিবিয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে অতিরঞ্জিত করে, গণমাধ্যমের মাধ্যমে সরকার পতনের অনিবার্যতার বর্ণনা তৈরি করে এবং মানবিক হস্তক্ষেপের নামে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে একটি রাষ্ট্রকে কার্যত ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
আজ ইরানের ক্ষেত্রেও অনুরূপ একটি ছক অনুসরণ করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানের অর্থনৈতিক সংকট, জাতিগত বৈচিত্র্য এবং লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক বিভাজনগুলোকে কাজে লাগিয়ে একটি ‘গৃহযুদ্ধসদৃশ পরিবেশ’ সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপকে “ইরানি জনগণের মুক্তির অভিযান” হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
পশ্চিমা গণমাধ্যম ও বর্ণনামূলক যুদ্ধ
এই কৌশলের অংশ হিসেবেই পশ্চিমা গণমাধ্যমে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ানমূলক যুদ্ধ (narrative war) চলছে। একদিকে বাস্তববাদী বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান বিক্ষোভগুলো মূলত অর্থনৈতিক—যার কারণ জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে, পশ্চিমা থিঙ্ক ট্যাংক, কিছু প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এবং প্রবাসী বিরোধী গোষ্ঠী এসব বিক্ষোভকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি সর্বজনীন বিদ্রোহ হিসেবে চিত্রিত করছে।
এমনকি দাবি করা হচ্ছে যে, ইরানি জনগণ পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতন এবং নির্বাসিত রাজপরিবারের উত্তরসূরি রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তন চায়—যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাস্তবতা বনাম অতিরঞ্জিত প্রচারণা
বাস্তবতা হলো, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ও বিক্ষোভের ভৌগোলিক বিস্তৃতি—উভয় দিক থেকেই সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো ২০১৯ বা ২০২২ সালের তুলনায় অনেক সীমিত। তথাপি এই অতিরঞ্জিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যে—ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’-এর চিত্রে উপস্থাপন করা, যাতে দ্বিতীয় দফা সামরিক আগ্রাসনের জন্য রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতা সৃষ্টি করা যায়।
ট্রাম্পের বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। যখন ইরান সরকার ও বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিরা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আলোচনার পথ খুঁজছে, তখন ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social–এ ইরানে সহিংসতার কথা উল্লেখ করে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপমূলক বক্তব্য দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন।
এটি কেবল মানসিক যুদ্ধ নয়; বরং জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ইসরায়েলি প্রভাব
আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। MAGA আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি হস্তক্ষেপ ও ব্যর্থ যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করে আসছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে ট্রাম্পের এই বক্তব্য রিপাবলিকান ভোটারদের কাছে একটি ভিন্ন বার্তা পৌঁছে দেয়—মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে আবারও মার্কিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার ইসরায়েলি লবির হাতে ন্যস্ত হয়েছে।
সংলাপই একমাত্র টেকসই পথ
সবশেষে বলা যায়, ইরানের অর্থনৈতিক সংকট ও জনগণের অসন্তোষ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এই বাস্তব সংকটকে কেন্দ্র করে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে ‘লিবিয়ার পথে’ ঠেলে দেওয়ার যে প্রচেষ্টা চলছে, তা কেবল ইরানের জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্যই মারাত্মক হুমকি।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে— রাষ্ট্র ধ্বংসের নামে পরিচালিত তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কেবল অরাজকতা, সহিংসতা ও দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই বিপজ্জনক কৌশল সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সংকট সমাধানে সংলাপ, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের পথকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা।
লেখক: রাসেল আহমেদ, কোম, ইরান!
পার্সটুডে