ইমাম খামেনেয়ি বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র কোনো বিদেশি শক্তির দালালিকে মেনে নেবে না।
পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ১১, ২০২৬
তাসনিম বার্তা সংস্থার রাজনৈতিক বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আজ সকালে ১৩৫৬ হিজরি শামসি সালের ১৯ দেই (৯ জানুয়ারি ১৯৭৮) ক্বুম শহরের জনগণের ঐতিহাসিক ও বিজয়ী গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকীতে, এই শহরের হাজারো ঈমানদার ও উদ্দীপ্ত মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতে বলেন— দুর্নীতিগ্রস্ত পাহলভি শাসনব্যবস্থা এবং তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের মারাত্মক ভুল হিসাবই ইরানি জাতির হাতে তাদের পরাজয়ের মূল কারণ ছিল।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আজও ইরানি জাতি—যারা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বরকতে নৈতিকতা, আদর্শিক শক্তি (সফট পাওয়ার) ও সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা (হার্ড পাওয়ার)-এর দিক থেকে সে সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী—ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও ভুল হিসাবের শিকার আমেরিকাকে পরাজিত করবে। কয়েক লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী ইসলামী ব্যবস্থা, যারা নির্বুদ্ধিতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তাদের সামনে কখনো মাথা নত করবে না।
ইসলামী বিপ্লবের নেতা দেশের সাম্প্রতিক কিছু ধ্বংসাত্মক ঘটনার প্রসঙ্গে বলেন, কিছু লোক আছে যাদের কাজই ধ্বংস করা। যেমন গত রাতে তেহরান ও আরও কয়েকটি জায়গায় একদল ধ্বংসকারী নিজেদের দেশেরই ভবন ভাঙচুর করেছে—শুধু আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে খুশি করার জন্য।
আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি বলেন, সে (আমেরিকার প্রেসিডেন্ট) এতে খুশিই হয়, কিন্তু পারলে নিজের দেশটা সামলাক—যে দেশ নানা সংকটে জর্জরিত। ১২ দিনের যুদ্ধে তার হাত এক হাজারেরও বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। সে নিজেই স্বীকার করেছে যে হামলার নির্দেশ সে দিয়েছিল এবং যুদ্ধের নেতৃত্বও সে দিয়েছিল। এরপর সেই একই ব্যক্তি বলে, “আমি ইরানের জনগণের পক্ষে।” আর কিছু অমনোযোগী ও চিন্তাহীন লোক তা বিশ্বাস করে তার ইচ্ছামতো ডাস্টবিনে আগুন লাগায় ও এ ধরনের কাজ করে।
তিনি আবারও বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র কয়েক লক্ষ সৎ ও মর্যাদাবান মানুষের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত, এবং ধ্বংসকারীদের কাছে কখনো নতি স্বীকার করবে না। ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিদেশি শক্তির দালালি সহ্য করে না, আর ইরানের জনগণ—যেই হোক না কেন—বিদেশি দালালকে প্রত্যাখ্যান করে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে তিনি বলেন, যে লোক অহংকার ও দাম্ভিকতার সঙ্গে সারা দুনিয়ার বিচার করতে বসে, তার জানা উচিত—ইতিহাসে নমরুদ, ফেরাউন, রেজা খান ও মোহাম্মদ রেজা পাহলভির মতো স্বৈরাচারীরা যখন চরম অহংকারে ছিল, তখনই পতনের শিকার হয়েছে। সেও পতিত হবে।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি ক্বুমের ১৯ দেই-এর আন্দোলনকে ইরানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক ঘটনা—১৫ খোরদাদ ৪২ (১৯৬৩) থেকে ইমাম খোমেইনির বক্তব্য ও চিন্তাবিদদের প্রচেষ্টায় জনগণের মন ও আত্মায় সঞ্চিত ইসলামী আন্দোলনের চিন্তাকে এক সামাজিক বিস্ফোরণে রূপ দেয়। এটি বজ্রপাতের মতো পাহলভি স্বৈরাচারী ও আমেরিকা-নির্ভর শাসনের বিরুদ্ধে জাতির ক্ষোভ ও ঘৃণাকে জ্বালিয়ে তোলে এবং ধারাবাহিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের পতন ঘটায়।
তিনি পাহলভি শাসনকে আধুনিক যুগের সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসন বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, সেই দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ধ্বংস হওয়ার পর, ইমামের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আমেরিকা, জায়নবাদ ও বিশ্বের রাজনৈতিক গুন্ডাদের ওপর নির্ভরশীল শাসনের বদলে ইরানে একটি স্বাধীন সরকার গড়ে ওঠে।
তিনি বলেন, পাহলভি সরকার ও আমেরিকার ভুল নীতি ও ভুল হিসাবই ক্বুমের গণঅভ্যুত্থানের মতো প্রবল ঘটনার জন্ম দেয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ক্বুমের আন্দোলনের মাত্র দশ দিন আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তেহরানে এসে ইরানকে “স্থিতিশীলতার দ্বীপ” বলে অভিহিত করেছিল—যা প্রমাণ করে তারা ইরানি জাতিকে চিনত না।
ইতিহাসের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমেরিকার এই গভীর ভুল হিসাবই সেদিন তাদের পরাজিত করেছিল এবং আজও তাদের ভাগ্যে পরাজয় ছাড়া আর কিছু নেই।
ক্বুমের আন্দোলনের বিজয়ের শিক্ষা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সে সময় ইরানি জাতির কাছে ট্যাংক বা কামানের মতো অস্ত্র ছিল না, কিন্তু তাদের কাছে ছিল নির্ধারক শক্তি—আদর্শিক ও নৈতিক শক্তি।
ইসলামে বিশ্বাস, ধর্মীয় আত্মসম্মান, দায়িত্ববোধ ও ইরানের প্রতি ভালোবাসাকে তিনি জাতির সেই আদর্শিক শক্তির উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, জনগণ দেখছিল—আমেরিকানরা, তাদের দালালরা ও জায়নবাদীদের সহযোগীরা দেশ শাসন করছে, যা তাদের ক্ষুব্ধ ও বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল।
তিনি বলেন, আজ ইরানি জাতি আদর্শিক ও নৈতিক দিক থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও প্রস্তুত; আর সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তির দিক থেকেও বর্তমান পরিস্থিতি সেদিনের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
তিনি বলেন, যারা আমেরিকার মোকাবিলায় ইরানি জাতির অবস্থানে অস্বস্তি বোধ করে, তারা আসলে গাফেল। কারণ আমেরিকাই প্রথমে এই জাতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে—যেহেতু ইসলামী প্রজাতন্ত্র জনগণের শক্তিতে ভর করে ইরানের বিপুল সম্পদ তাদের হাত থেকে বের করে এনেছে।
তিনি লাতিন আমেরিকার উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমেরিকা কীভাবে দেশগুলোর সম্পদ দখলের চেষ্টা করে—একটি দেশকে অবরোধ করে প্রকাশ্যেই বলে, “তেলের জন্য করেছি।” যেমন বিপ্লবের আগে ইরানের তেল ও সম্পদ ছিল তাদের হাতেই।
তিনি বলেন, আল্লাহর কৃপায় ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিদিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং শত্রুদের সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে; আজ তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিশ্বে শক্তিশালী, মর্যাদাবান ও সম্মানিত।
তিনি শত্রুর ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থাকে উল্লেখ করেন এবং বলেন, যদি ইরানে কোনো পশ্চিমা-নির্ভর, রাজতান্ত্রিক বা দুর্বল সরকার থাকত, তবে এই চাপ সহ্য করতে পারত না।
ইরান নাকি একঘরে—এই দাবি তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, আজকের ইরান একটি স্বাধীন, সাহসী ও ভবিষ্যতসমৃদ্ধ দেশ।
তিনি যুবসমাজকে দেশের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, শত্রুর অপপ্রচারের বিপরীতে ইরানি যুবকরা ধর্মপ্রাণ, সচেতন, সাহসী এবং সব জাতীয় ও ধর্মীয় কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত।
শেষে তিনি যুবসমাজকে উদ্দেশ করে বলেন,
“প্রিয় যুবকরা! তোমাদের ধর্ম, রাজনৈতিক সচেতনতা, ঐক্য ও দেশের উন্নয়নে নিষ্ঠা ধরে রাখো। ঐক্যবদ্ধ জাতি সব শত্রুর ওপর বিজয়ী হয় এবং ইনশাআল্লাহ শিগগিরই বিজয়ের অনুভূতি ইরানের সব হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়বে।”
সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি