সোমবার, ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

শাকির সবুর বাংলা ভাষায় আধুনিক ফারসি কথাসাহিত্য অনুবাদের পথিকৃৎ

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৩ 

news-image

সুজন পারভেজ: বাংলায় ফারসি অনুবাদ সাহিত্য বিষয়টি নিয়ে চিন্তা বা আলোচনা করলে যে সময়ের অনুবাদ সাহিত্যের কথা সর্বপ্রথম আমাদের মনোজগতে নাড়া দেয় তা হলো মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় ফারসি সাহিত্য অনুবাদের বিষয়টি। যে বিষয়ে বাংলা ভাষার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাহিত্য সমালোচক, গবেষক ছাড়াও সাধারণ শিক্ষার্থিগণ ও বাংলা সাহিত্যপ্রেমী পাঠকগণ ভালোভাবে অবগত। যার ভিত রচিত হয় শাহ মুহাম্মদ সগীর কর্তৃক ‘ইউসুফ জোলেখা’, দৌলত উজির বাহরাম খান কর্তৃক ‘লাইলী-মজনু’ এবং আলাওল কর্তৃক ‘হপ্তপয়কার’, ‘সিকান্দারনামা’, ‘সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল’ ও ‘তোহফা’ প্রভৃতি গ্রন্থাবলি অনুবাদের মাধ্যমে।
এরপর চলে আসে আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের ইসলামের ফারসি শেখা ও বাংলা ভাষায় তাঁর হাফিজের গজল এবং ‘রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম’ এর অনুবাদের কথা। তারপর সাড়াজাগানো যে কাজটি হয়েছে তা হল মনিরুদ্দীন ইউসুফ কর্তৃক ফারসি সাহিত্যের মহাকাব্য ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ বাংলায় অনুবাদ। উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর দিকে তাকালে লক্ষ্য করা যায় যে অনূদিত সকল সাহিত্যকর্মই ফারসি ক্লাসিক কবি ও সাহিত্যিকের ক্লাসিক সাহিত্যকর্মের অনুবাদ। যার ফলে বাংলাভাষী পাঠকগণ আধুনিক ফারসি কথাসাহিত্যের সাথে তেমন পরিচিত ছিলেন না।
সর্বপ্রথম যিনি বাংলা ভাষায় আধুনিক ফারসি কথাসাহিত্য অনুবাদের মাধ্যমে পাঠক ও সাহিত্য অনুরাগীদের কাছে তুলে ধরার কাজটি শুরু করেন তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান। যার ছদ্মনাম শাকির সবুর। লেখালেখির জগতে যিনি ‘শাকির সবুর’ নামেই অধিক পরিচিত। শাকির সবুর ১৯৭৫ সালের ১লা জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ও উর্দু বিভাগ থেকে ফারসি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে একই বিভাগ থেকে ফারসি বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ২০০০ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ও উর্দু বিভাগে ফারসির প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষকতা করেন। মূলত শিক্ষক হিসেবে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে যোগদানের মাধ্যমেই পুরোপুরিভাবে অনুবাদে মনোনিবেশ করেন। যিনি গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলায় ফারসি আধুনিক কথাসাহিত্য অনুবাদের কাজটি নিরলসভাবে করে যাচ্ছেন।
অনুবাদ ও মৌলিক গ্রন্থ মিলিয়ে তাঁর মোট রচনাবলির সংখ্যা ২৯। তাঁর অনুবাদ গ্রন্থগুলো হলো: জালালে আলে আহমাদের নির্বাচিত ছোটগল্প (ইরানের কথাসাহিত্যিক জালালে আলে আহমাদের ১২টি ফারসি ছোটগল্পের অনুবাদ); ‘একদা একসময়’ (আধুনিক ফারসি সাহিত্যের প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘একি বুদ একি নাবুদ’ এর বাংলা অনুবাদ); ‘ইস্তগাহে গৌরীপুর’ (কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘গৌরীপুর জংশন’ এর ফারসি অনুবাদ); ‘তাঁর চোখগুলো’ (সমকালীন ইরানের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক বুজুর্গে আলাভির ফারসি উপন্যাস ‘চাশমহায়াশ’ এর বাংলা অনুবাদ, এটি ফারসি থেকে বাংলায় অনূদিত প্রথম কোনো উপন্যাস); ‘খোদার চাঁদমুখে চুমু খাও’ (সমকালীন ইরানের খ্যাতিমান কথাশিল্পী মুস্তাফা মাস্তুর এর ফারসি উপন্যাস ‘রুয়ে মাহে খোদাওয়ান্দ রা বেবুস’ এর বাংলা অনুবাদ); ‘অন্ধ পেঁচা’ (ইরানের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক সাদেক হেদায়াতের ফারসি উপন্যাস ‘বুফে কূর’ এর বাংলা অনুবাদ); সাদেক হেদায়াতের ‘নির্বাচিত ছোটগল্প’ (অনুবাদ); সমকালীন ইরানের কবি ও কবিতা (ইরানের সমকালীন ৫০ জন কবির সংক্ষিপ্ত জীবন পরিচিতি ও তাদের ৫০টি কবিতা বাংলায় অনুবাদ); জালালে আলে আহমাদের ‘শ্রেষ্ঠগল্প’ (অনুবাদ); ‘ফিলিস্তিন’ (অনুবাদ)।
এছাড়াও তিনি আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বাংলা থেকে ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন। অনুবাদটি ২০১৩ সালে ‘পয়েট অফ পলিটিক্স’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
অনুবাদ ছাড়াও তাঁর মৌলিক গ্রন্থগুলো হলো: ‘যখন আমি অনেক দূরে’ (উপন্যাস) তাঁর প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ; ‘অনেক দিনের চেনা’ (উপন্যাস); ‘মেঘের আকাশ’ (উপন্যাস); ‘অনাদৃতা’ (উপন্যাস); ‘মধ্যাহ্নের চাঁদ’ (উপন্যাস); ‘কখনো অন্ধকার’ (গল্পগ্রন্থ); ‘পালপাড়ার প্রদীপ’ (গল্প সংকলন)।
তাঁর ইরান ভ্রমণের স্মৃতি নিয়ে নিয়ে ভ্রমণকাহিনীমূলক গ্রন্থ ‘বরফ ও বিপ্লবের দেশে’।
তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থাবলি: ‘আধুনিক ফারসি ছোটগল্প: বিষয়বৈশিষ্ট্য,শিল্পরূপ, চিত্রিত জীবন ও সমাজ’ (পিএইচডি অভিসর্ন্দভ); ‘রবীন্দ্রনাথ ও হাফিজ’ (গবেষণা); ‘ফারসি উপন্যাসে জীবন ও মানবিকতা’ (গবেষণা); ‘বাংলায় ফারসি ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের ইতিহাস’ (গবেষণা); ‘ভারতবর্ষের অসামান্য কাব্য ও সংগীত প্রতিভা আমীর খসরু’ (গবেষণা)।
তাঁর প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননা: সবুজ কলি শিশু-কিশোর সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬); বিএনসিসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কন্টিনজেন্টের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিতর্কে শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরস্কার (১৯৯৩); লেখাপ্রকাশ সাহিত্যে পুরস্কার (২০০৮); ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বর্ণপদক (২০১১); কফি হাউস অনন্য সাহিত্য পুরস্কার, কলকাতা (২০১১); ইরান’স ওয়ার্ল্ড বুক অ্যাওয়ার্ড (২০২২)।
স্যারের পুরো জীবন ও লেখালেখি নিয়ে বিশদভাবে জানার জন্য পাতাদের সংসার ‘শাকির সবুর সংখ্যা’ একটি পূর্ণাঙ্গ বই।
পরিশেষে, যে বিষয়টি না বললেই নয় শাকির সবুরের ‘সমকালীন ইরানের কবি ও কবিতা’ বইটি ২৯তম ইরান ওয়ার্ল্ড বুক অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার পেয়েছে যা শতবর্ষী ফারসি ও সাহিত্য বিভাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নিঃসন্দেহে গৌরবের।
সুজন পারভেজ
শিক্ষার্থী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।