সোমবার, ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

রমজানের শুভ উদ্বোধনী শবে বরাত

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ৭, ২০২৩ 

news-image
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী : শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে বলা হয় শবে বরাত, মুক্তির রাত। এই মহিমান্বিত রাতকে ‘লাইলাতুল মোবারাকা বা বরকতময় রাত বলেও অভিহিত করা হয়েছে। কোরআন মজিদের সুরা দুখানের শুরুতে লাইলাতুল মোবারাকা নামকরণের তাৎপর্য সম্পর্কে দুটি মত রয়েছে। প্রথম মত হলো, এর অর্থ লাইলাতুল কদর। অপর মত অনুযায়ী এটি শবে বরাত। শবে বরাত নামকরণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে : এ রাতকে লাইলাতুল মোবারকা নামে অভিহিত করার কারণ হচ্ছে, ‘এই পুণ্যরাতে বিশিষ্ট ফেরেশতারা দুনিয়াতে আগমন করেন, দুনিয়াতে আল্লাহর রহমতের বারিধারা বর্ষিত হয়। মানুষের আর্ত-ফরিয়াদ রাব্বুল আলামিনের দরবারে মঞ্জুর করা হয় এবং ইবাদত-বন্দেগির মর্যাদা ও গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। অথবা এর কারণ, এ রাতে মানুষের ধন-সম্পদ, জীবিকা ও জীবন-মৃত্যুসহ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির বার্ষিক বাজেট নির্ধারিত হয়। আর এই রাতে আল্লাহর দরবারে উম্মতের গোনাহ মুক্তির জন্য হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কৃত সুপারিশ সম্পূর্ণভাবে মনজুর করা হয়। এই শেষোক্ত অর্থে একে লাইলাতুল বরাত বা মুক্তির রাত বলা হয়েছে।’ (তাফসিরে রহুল মাআনি সুরা দুখানের ৩নং আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গ)।
তাফসিরে খাজেনে হজরত ইকরামা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : লাইলাতুল মোবারাকা অর্থ হচ্ছে ১৪ শাবান দিবাগত রাত। এই রজনীতে সারা বছরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির ফয়সালা করা হয় এবং জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের বাদ দেয়া হয়। অতপর, তাতে কোনোরূপ বৃদ্ধিও করা হয় না বা কমানোও হয় না। ইমাম বাগবি নিজস্ব বর্ণনাসূত্রে বর্ণনা করেন, হজরত নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন : এক শাবান থেকে অপর শাবান মানুষের পুরো ১ বছরের হায়াতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তাতে এমনকি এক ব্যক্তি যে বিবাহশাদী করবে এবং তার সন্তান-সন্তুতি হবে তাও নির্ধারিত হয়।’ হজরত ইবনে আব্বাসত (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা নিসফে শাবান (মধ্য শাবান) রাতে দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ের বার্ষিক বাজেট ও ফয়সালা নির্ধারণ করেন এবং শবে কদরের রাতে সেগুলো সংশ্লি­ষ্ট দায়িত্বশীলদের ওপর ন্যস্ত করেন।’ (তাফসিরে খাজেন)।
কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনাভঙ্গি ও বুজুর্গানে দ্বীনের কর্মজীবনের দৃষ্টান্তগুলো পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, শবে কদরের পর বছরের সর্বাধিক সম্মানিত ও বরকতপূর্ণ রাত হলো শবে বরাত। অন্যদিকে শবে কদর পরম সম্মানিত ও তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ায় আল্লাহতায়ালা সেই রাতকে সৌভাগ্যশালী বান্দাদের জন্য লুকায়িত রেখেছেন। অর্থাৎ, শবে কদর কোন দিন হবে নির্ধারিত নেই। শুধু আল্লাহর অনুগ্রহশীল বান্দারাই তা লাভ করতে পারে। কিন্তু শবে বরাতের রাত সুনির্দিষ্ট ও সবার জানা আছে এবং শাবান মাসের মধ্যগগণে চতুদর্শী চন্দ্রের প্রবল জোছনা ধারায় সমুজ্জ্বল। প্রত্যেক মুসলমান নরনারী এই রহমতের জোছনা প্লাবনে অবগাহন করে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত পবিত্র হতে পারে। আল্লাহর দরবারে আর্তি ফরিয়াদের মাধ্যমে আপন ভাগ্যলিপিকে স্বীয় চাহিদাদ মাফিক লিপিবদ্ধ করানোর সুযোগ লাভে সক্ষম হয়। এই মহিমান্বিত পবিত্র রজনীর মহাত্ম্য ও তাৎপর্য সম্পর্কে এখানে খুব সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই। হাদিস শরিফে এরশাদ হয়েছে-
হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : একদা রাতে আমি রাসুলুল্লাহ (স)-কে শয্যাপাশে পেলাম না। (তখন তালাশে বের হয়ে) দেখি, তিনি বাকি নামক (মদিনাবাসীদের) কবরস্থানে আছেন। (তিনি আমাকে দেখে) বললেন, আয়েশা! তুমি কি মনে করেছ যে, আল্লাহ এবং তার রাসুল তোমার প্রতি অবিচার করবেন? আয়েশা বলেন, আমি বললাম : ইয়া রাসুলাল্লাহ! (সত্যিই) আমি ধারণা করেছিলাম যে, হয়তো আপনি আপনার অপর কোনো বিবির ঘরে চলে গেছেন। তখন হুজুর (সা.) বললেন : আল্লাহতায়ালা অর্ধশাবানের রাতে এ নিকটতম আসমানে অবতীর্ণ হন এবং ক্বালব গোত্রের মেষপালের পশম সংখ্যারও অধিক ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন। (আজ সেই রজনী)। (তিরমিজী, ইবনু মাজা মিশকাত)।
উপরোক্ত হাদিসের বর্ণনা মোতাবেক হুজুর (সা.) জান্নাতুল বাকী নামক কবরস্থানে গমন ও জিয়ারতের ঘটনা দ্বারা শবে বরাতের রাতে কবর জিয়ারতের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত প্রমাণিত হয়। তবে জিয়ারতে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে আলোকসজ্জা ও উৎসব করা অবশ্যই শরিয়ত বিরোধী, বর্জনীয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হারাম।
অপর এক হাদিসে হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত : একদা নবী করীম (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, (আয়েশা) তুমি জান কি এ রাতে অর্থাৎ শবে বরাতের রাতে কি কি আছে? তিনি বললেন : ইয়া রাসুলাল্লাহ! তাতে কি আছে? হুজুর (সা.) বললেন : এই রাতে নির্ধারিত হয় এই বছর মানুষের মধ্যে কারা মারা যাবে। এই রাতে ওপরে নিয়ে যাওয়া হয় মানুষের কর্মগুলো এবং অবতীর্ণ করা হয় তাদের রিজিকগুলো। অতপর হজরত আয়েশা (রা.) হুজুরকে জিজ্ঞাসা করলেন : ইয়া রাসুলাল্লাহ কোনো ব্যক্তি কি আল্লাহর রহমত ব্যতীত (আমল দ্বারা) বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না? হুজুর তিনবার করে বললেন : কোনো ব্যক্তিই বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না, আল্লাহর রহমত ব্যতীত। আয়েশা (রা.) বললেন : তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম : আপনিও কি পারবেন না, ইয়া রাসুলুল্লাহ! তখন তিনি আপন মাথার ওপর হাত রেখে বললেন, আমিও না। তবে যদি আল্লাহতায়ালা আপন রহমত দ্বারা আমায় ঢেকে নেন। এভাবে তিনি তিনবার বললেন।’ (রায়হাকির বরাতে মিশকাত, কিয়ামে শাহরে রামাদান অধ্যায়)।
অপর হাদিসে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী, অহংকারে পায়ের নিচের গিরা ঢেকে কাপড় পরে এমন ব্যক্তি, পিতামাতার আবাধ্য সন্তান, মধ্যপায়ী, অন্যায়ভাবে টেক্স উসুলকারী, সুদখোর, জাদুকর গণক, ঠাকুর, মানুষ হত্যাকারী ও বাদক প্রভৃতিকেও শবে বরাতে ক্ষমা পাওয়ার হিসাব থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
(এই রাতে ইবাদত ও পরদিনের রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে) হজরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : যখন অর্ধশাবান রাত উপস্থিত হয়, তোমরা সেই রাতে (নামাজ ও ইবাদতে) জাগ্রত থাক এবং পরের দিন রোজা রাখ। কেননা, এই রাতে আল্লাহতায়ালা সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই নিকটতম আসমানে অবতীর্ণ হন এবং (দুনিয়াবাসীর প্রতি ডাক দিয়ে) বলতে থাকেন : কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছ কি, যাকে আমি ক্ষমা করে দিতাম। কোনো রিজিক প্রার্থনাকারী আছ কি, তাকে আমি বিপদমুক্ত করতাম। এইভাবে অনেক ব্যক্তিকে ডাকেন- যতক্ষণ না ফজর হয়। – (ইবনু মাজা মিশকাত)।
এই নিবন্ধে উদ্ধৃত চারটি হাদিস মিশকাত শরিফ ‘কিয়ামু শাহরে রামাদান’ ‘রমজানে রাত জেগে ইবাদত’ পরিচ্ছেদ থেকে উদ্ধৃত। যারা শবে বরাত পালন বেদাত এবং শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলোকে মওজু বা বানোয়াট বলে থাকেন, একটি মূলনীতির দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব। হজরত নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বা জাল হাদিস বর্ণনা করবে তার ঠিকানা জাহান্নাম। নবীজি বলেননি- এমন কোনো কথা যদি তিনি বলেছেন বলে প্রচার করা হয় তার পরিণতি হবে জাহান্নাম। এখন যদি আল্লাহর নবী বলেছেন, এমন কোনো কথাকে মওজু বা বানোয়াট বলে কেউ আখ্যায়িত করে তা কি নবীজির কথাকে মিথ্যা আখ্যায়িত করার শামিল হবে না? যার পরিণতি জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।
আমাদের আলিয়া ও কওমী নেসাবের সব মাদ্রাসার পাঠ্য হাদিসের কিতাবের নাম মিশকাত। মিশকাতে সহিহ ছয় হাদিস নামে প্রসিদ্ধ সিহাহ সিত্তার অন্তর্গত দুই কিতাব তিরমিজি ও ইবনু মাজা এবং বায়হাকি থেকে শবে বরাত সম্পর্কিত যে হাদিসগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে, তা আমি এই নিবন্ধে উল্লেখ করেছি। এ হাদিসগুলোকে মুখের জোরে মওজু (বানোয়াট) আখ্যায়িত করতে বুকে কাঁপন ধরা উচিত। হাদিস সম্পর্কে আপনার জ্ঞান কী তাদের চাইতে বেশি? আপনি হয়তো বলবেন, শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী সাহেব শবে বরাতের একটিমাত্র হাদিসকে সহিহ বলে গ্রহণ করেছেন, কাজেই সেই হাদিসটি গ্রহণ করব। বাকিগুলো মওজু। প্রশ্ন হলো, ১৪০০ বছর পরে এসে হাদিস সহি বা অসহি সাব্যস্ত করার একমাত্র অথরিটি তিনি কীভাবে হতে পারেন? হাদিসবেত্তারা তো সরাসরি উস্তাদের সাক্ষাৎ লাভ ও তার কাছ থেকে শোনা ছাড়া হাদিস গ্রহণ করেননি। অথচ যারা কথায় কথায় শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানীর উদ্ধৃতি দেন, তারা নিজে বা পরিচিত কোনো বুজর্গ আলেম শায়খ নাসিরুদ্দীনের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে এসব কথা শুনেছেন বলে প্রমাণ নেই। যাকে দেখেননি বা দ্বীনি ব্যাপারে আপনার বিশ্বস্ত কেউ যার সাক্ষাৎ পায়নি, তার নামে প্রচারিত কথাগুলো ইন্টারনেট বা গুগোল সূত্রে পেয়ে কীভাবে বিশ্বাস করেন বা জনগণের দ্বীনি চেতনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। ইসলামের শত্রুরা শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানীর নামে আল্লাহর রাসুলের হাদিসের সার্টিফিকেট নেটে আপলোড করেনি বা উম্মতের মাঝে সন্দেহ সংশয় ও অনৈক্য সৃষ্টির কারসাজি করেনি- এ কথা কি আপনি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন। কাজেই সাবধান। মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরানোর ফাঁদে পা দেয়া উচিত হবে না।