বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

English

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্পের মিথ্যাচার ফাঁস করেছে

পোস্ট হয়েছে: মে ১৪, ২০২৬ 

news-image

একটি গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারণার বিপরীতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনো উচ্চমাত্রায় অটুট রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্ক টাইমস ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে একটি গোপন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে; যে প্রতিবেদনটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সব দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।

নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে: “ইরানের সামরিক সক্ষমতার ‘ধ্বংস’ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে গোপনে যে মূল্যায়ন দিচ্ছে, তার তীব্র বিরোধ রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে প্রস্তুত করা গোপন মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরান আবারও তাদের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম এবং ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে।”

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়: “এই মূল্যায়ন সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর মতে, মার্কিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ইরান হরমুজ প্রণালীর আশপাশে অবস্থিত তাদের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিতে পুনরায় কার্যকর প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এটি ওই কৌশলগত জলপথ দিয়ে চলাচলকারী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তেলবাহী জাহাজগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।”

প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা বলেছেন, মূল্যায়নে দেখা গেছে—প্রতিটি ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ভেদে ভিন্নতা থাকলেও—ইরান এসব স্থাপনায় মোতায়েনকৃত মোবাইল লঞ্চারের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র অন্যত্র স্থানান্তর করতে সক্ষম। কিছু ক্ষেত্রে একই স্থাপনার ভেতরের উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম থেকেই সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতাও রয়েছে। মূল্যায়ন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর পাশে অবস্থিত মাত্র তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এখনো পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

এই মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান এখনো দেশজুড়ে তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার (চলমান ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা) বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুতও তাদের হাতে রয়েছে। এই মজুতের মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক ক্রুজ মিসাইল রয়েছে, যেগুলো স্বল্প দূরত্বের স্থল বা নৌ লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়।

নিউইয়র্ক টাইমসকে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতির মাধ্যমে যার মধ্যে স্যাটেলাইট চিত্র এবং অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তিও রয়েছে রিপোর্ট করেছে যে ইরান দেশজুড়ে তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বা কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে। এসব স্থাপনাকে এখন “আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর” হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস জোর দিয়ে বলেছে, এই তথ্যগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বহুদিনের প্রকাশ্য বক্তব্যের বিরোধিতা করে; তারা বারবার বলেছিলেন যে ইরানের সামরিক বাহিনী “ধ্বংস হয়ে গেছে” এবং আর কোনো হুমকি নয়।

ট্রাম্প ৯ মার্চ, যুদ্ধ শুরুর ১০ দিন পর সিবিএসকে বলেছিলেন যে “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত” এবং দেশটির “আর কোনো সামরিক সক্ষমতা নেই”। পিট হেগসেথও ৮ এপ্রিল পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে দাবি করেছিলেন যে “অপারেশন ক্রোধপূর্ণ আঘাত” (Operation Furious Strike) নামের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ অভিযান ইরানের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং বহু বছরের জন্য অক্ষম করে ফেলেছে।

কিন্তু হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালস এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “যে কেউ মনে করে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছে, সে হয় বিভ্রান্ত, নয়তো সে ইরানের পক্ষে কথা বলছে।”

নিউইয়র্ক টাইমস আরও লিখেছে যে নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী ট্রাম্প এবং তার সামরিক উপদেষ্টারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি অতিরঞ্জিতভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন এবং একই সঙ্গে ইরানের পুনর্গঠন সক্ষমতাকে কম করে দেখেছিলেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা অটুট থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুত চাপের মধ্যে রয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১,১০০টি দীর্ঘ-পাল্লার স্টেলথ ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করেছে, যা প্রায় তাদের পুরো অবশিষ্ট মজুতের সমান। এছাড়া তারা ১,০০০টিরও বেশি টমাহক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে, যা পেন্টাগনের বার্ষিক ক্রয়ের প্রায় ১০ গুণ। একইভাবে, ১,৩০০টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের উৎপাদন ক্ষমতার ভিত্তিতে দুই বছরের বেশি উৎপাদনের সমান।

নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, এই মজুত পুনর্গঠন করতে কয়েক বছর লাগবে, কয়েক মাসে নয়। লকহিড মার্টিন বর্তমানে বছরে প্রায় ৬৫০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরি করে। কোম্পানিটি উৎপাদন বাড়িয়ে বছরে ২,০০০ ইউনিট করার পরিকল্পনা করলেও কর্মকর্তারা বলছেন, এটি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। এছাড়া, ট্রাম্প যে গতিতে ক্ষেপণাস্ত্র ইঞ্জিন উৎপাদন বাড়াতে চান, তা শিল্প সক্ষমতার কারণে দ্রুত সম্ভব নয়।

সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি