বুধবার, ১৭ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

নবীকন্যা হযরত ফাতেমা (সা. আ.) এর পবিত্র জন্মদিন এবং বিশ্ব নারী দিবস

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ১৬, ২০২২ 

ড. সামিউল হক
সারা বিশে^র মুসলমানদের জন্য হযরত ফাতেমা (সা.আ.) অনুকরণীয় আদর্শ। আর তাই তাঁর জন্মদিনটি সকল মুসলমানই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকেন। যদিও প্রতি বছর মার্চ মাসের ৮ তারিখে বিশ^ব্যাপী নারী দিবস পালিত হয়, তবে নবীর আহলে বাইতের অনুসারিগণ হযরত ফাতেমার(সা.আ.) জন্মদিনকে কেন্দ্র করেই নারী দিবস বা মাতৃ দিবস পালন করে থাকেন এবং আরবি মাসের সাথে সৌর মাসের মিল না থাকার কারণে প্রতিবছর এ দিবসটি আরবি মাসের তারিখের উপর ভিত্তি করেই পালিত হয়। আর যেহেতু এবছর ২০শে জমাদিউস সানি দিনটি পড়েছে ২৪শে জানুয়ারি সোমবার তাই এ দিনটি উপলক্ষ্যে আমরা বিশ^ নারী দিবস হিসেবে প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে জানাই শীতকালীন উষ্ণ শুভেচ্ছা।
জন্মদিন পালনের কারণ
জন্মদিন পালন করা মানুষের সহজাত প্রবণতাই অংশ; ঠিক যেভাবে মানুষ তার বাবা, মা, স্ত্রী ও সন্তানের জন্মদিনকে স্মরণ করে আনন্দানুষ্ঠান পালন করে থাকে একইভাবে তার প্রিয়জন ও আদর্শবান ব্যক্তিত্বের জন্মদিনকে স্মরণ করেও আনন্দানুষ্ঠানের আয়োজন করে। মহান আল্লাহ কয়েকজন মানুষকে সবধরনের পূর্ণতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যাতে তাঁরা হন মানুষের জন্য উন্নতির আদর্শ। নবীকন্যা হযরত ফাতেমা (সা.আ.) এমনই একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব যাঁর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিশে^ তাঁর অনুসারী ও ভক্তবৃন্দ পালন করে থাকেন নারী দিবস বা মাতৃদিবস। গবেষণা করে পাওয়া যায় যে, যাঁরা জন্মদিন পালন করাকে ‘বেদআত’ বলে ফতোয়া দেন তাঁদের মূল যুক্তি হলো: জন্মদিনের অনুষ্ঠানে নাচ, গান ও শরিয়তবিরোধী কাজ করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা তাঁদের সেই যুক্তির মোকাবেলায় বলতে চাই: যদি তাতে শরিয়তবিরোধী কোনো কাজ না করা হয় এবং মহান ব্যক্তিবর্গকে স্মরণ করে শিক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয় তবে কোনোভাবেই তাকে ‘বেদআত’ বলা যাবে না।
এক নজরে ফাতেমা (সা. আ.)
নবীকন্যা ফাতেমা (সা.আ.) এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁর সম্পর্কে শতাধিক পৃষ্ঠার বই লিখলেও তাঁর পরিপূর্ণ পরিচয় বর্ণনা করা সম্ভব হবে না। তাই এ পর্যায়ে একনজরে তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরছি:
নাম: ফাতেমা, সিদ্দীকা, মুবারেকাহ, তাহিরাহ, যাকিয়্যাহ, রাযিয়্যাহ, মারযিয়্যাহ, মুহাদ্দিসাহ এবং যাহরা (আমালি সাদুক/৬৮৮)।
ডাক নাম: উম্মুল হাসান, উম্মুল হোসাইন, উম্মুল মুহসিন, উম্মুল আইম্মাহ এবং উম্মে আবিহা (কাশফুল গুম্মাহ, ২/১৮)।
উপাধিসমূহ: বাতুল, সিদ্দিকা, কুবরা, আযরা, তাহিরা এবং সাইয়্যেদাতুন নিসা (মানাকিবে ইবনে শাহরে আশুব, ৩/১৩৩)।
পিতা: নবী করিম হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ (স.)।
মাতা: ইসলাম গ্রহণকারী সর্বপ্রথম নারী ও নবীপতœী খাদিজাতুল কুবরা।
জন্মস্থান: মক্কা নগরী ও জন্ম তারিখ: নবুওয়াতের পঞ্চম বছর (প্রাগুক্ত: ৩/১৩২)। আরবি জমাদিউস সানি মাসের ২০ তারিখ শুক্রবার, মক্কার প্রস্তরময় পর্বতের পাদদেশে কাবার সন্নিকটে, ওহী নাযিলের গৃহে মা খাদিজার গর্ভ থেকে নবীনন্দিনী ফাতেমা যাহরা জন্মগ্রহণ করেন।
হযরত ফাতেমা (সা.আ.) এর জন্মের ফলে নবীর গৃহ আগের চেয়ে আরো অধিক দয়া ও ¯েœহ-মমতার আধারে পরিণত হয়। তিনি তাঁর পিতার কষ্টের দিনগুলোতে প্রশান্তি যোগাতেন। এবিষয়ে নবী করিম(স.) বলেন,
‘ফাতেমা আমার প্রাণের সমতুল্য, তার কাছ থেকে আমি বেহেশতের সুঘ্রাণ পাই।’ (কাশফুল গুম্মাহ, ২/২৪)।
নবীকন্যা হযরত ফাতেমার সঙ্গে ইমাম আলীর বিবাহ
যখন নবীকন্যা বিবাহের বয়সে উপনীত হলেন, নবী করিম(স.) এর একাধিক সাহাবি তাঁর পবিত্র কন্যাকে বিবাহ করে সম্মানিত হবার জন্য নবীকে তাগাদা দিতে থাকেন। কিন্তু তিনি তাদের প্রস্তাবে তেমন কোনো সাড়া দিচ্ছিলেন না। নবী করিম (স.) ঘোষণা দিলেন যে, ফাতেমার বিয়ে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে এবং তিনি এ ব্যাপারে কিছুই করবেন না। এ ঘোষণা শোনার পর তাঁরা ফাতেমাকে বিয়ের প্রস্তাব থেকে নিবৃত হলেন এবং অনুধাবন করছিলেন যে, নবীর সাথে ইমাম আলীর যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং দ্বীনের পথে তাঁর যে কঠোর সংগ্রামের ভূমিকা রয়েছে তাতে আলীই হবেন ফাতেমার উপযুক্ত পাত্র।
অবশেষে নবী করিম (স.) সাহাবিদেরকে বললেন, আল্লাহ তাঁর কন্যাকে ইমাম আলীর সাথে বিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অতঃপর বললেন, “আল্লাহর ফেরেশতা আমার কাছে এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ আপনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং বলেছেন, মা ফাতেমা এবং আলীকে আমি জান্নাতে বিয়ে দিয়েছি। সুতরাং আপনি তাদেরকে দুনিয়াতে বিয়ে দিন।’ ” (মোস্তফা কামাল অনূদিত, মা ফাতিমা/৬৭)
জান্নাতের নেত্রী নবীকন্যা হযরত ফাতেমা (সা. আ.)
নবীকন্যা ফাতেমা(সা.আ.) নবী করিম(স.) এর বংশধারার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব, কারণ, তাঁর মাধ্যমেই নবী(স.) এর বংশধারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। আহলে সুন্নাতের বর্ণনায় চারজন নারীকে বেহেশতের সর্দার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে:
أفضَلُ نساءِ الجنَّةِ أربعٌ: مريمُ بنتُ عمرانَ، وخديجةُ بنتُ خوَيْلدٍ، وفاطمةُ بنتُ محمَّدٍ، وآسيةُ
নবী (স.) এর কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে: ‘বেহেশতের নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নারী চারজন: মারিয়াম বিনতে ইমরান, খাদিজা বিনতে খোয়াইলাদ, ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ ও আছিয়া।’ (মুত্তাকি হিন্দি, কানজুল উম্মাল, ১২/১৪৪) অন্যদিকে আহলে বাইতের বর্ণনায় বলা হয়েছে: নবীকন্যা ফাতেমা(সা.আ.) শুধু জান্নাতি নারীদের নেত্রীই নন; বরং তিনি বিশ^জাহানের নারীদের নেত্রী। আর নবীকন্যা ফাতেমার দুই সন্তান ইমাম হাসান ও হোসাইন(আ.) যে জান্নাতের যুবকদের নেতা তাতে সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তাই বলা যায় যে, পরকালের কা-ারি নবী করিম(স.) যখন কেয়ামতের দিন শাফায়াত করবেন তখন তাঁর পাশে থাকবেন তাঁরই কন্যা, সন্তানদ্বয় ও ইমাম আলী(আ.)। কারণ, সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে:
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم “الحسن والحسين سيدا شباب أهل الجنة. وأبوهما خير منهما “.
নবী করিম(স.) বলেছেন : হাসান ও হোসাইন(আ.) বেহেশতী যুবকদের সর্দার। আর তাদের পিতা তাদের চেয়েও উত্তম।
এই মহীয়সী নারীর গুণ বলে শেষ করা যাবে না। সহীহ হাদিসের পাশাপাশি পবিত্র কোরআনে তাঁর শানে যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে তার তাফসির করলে, এমনকি শুধু তার অনুবাদ অধ্যয়ন করলেই ফাতেমা যাহরার শান ও মর্যাদা সকল মুসলমানের কাছে সুস্পষ্ট হবে। উদাহরণস্বরূপ মুবাহেলার আয়াতটির (কোরআন ৩/৬১) উপর চিন্তা করলে অনুধাবন করা যাবে যে, নবওুয়তের কেন্দ্রীয় চাবিকাঠি হলেন নবীকন্যা হযরত ফাতেমা(সা.আ.) যে বিষয়ে লেখকের স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধ রয়েছে। দৈনিক যুগান্তরের এক প্রাবন্ধিক, ‘জান্নাতের নেত্রী হযরত ফাতেমা যাহরা’ শিরোনামে একটি প্রন্ধের শুরুতে এভাবে লিখেছেন, ‘যে নুরের আকর্ষণে সারা জাহান মাতোয়ারা, যে নুরের আলোতে আলোকিত আশি হাজার মাখলুক, সিরাজুম মুনিরা হিসেবে যে নুর উদ্ভাসিত, সে নুরের সরাসরি অংশ ফাতেমাতুয যাহরা(রা.)।’ (দৈনিক যুগান্তর, ২৮/২/২০২০)
নবীকন্যা হযরত ফাতেমার বিশেষত্ব, চরিত্র ও কর্ম-পদ্ধতি
নবীকন্যা হযরত ফাতেমা(সা.আ.) এর চরিত্র ও কর্ম-পদ্ধতির বর্ণনায় অসংখ্য বিশেষত্ব পরিলক্ষিত হয়, আলোচনার কলেবর সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যে এসব বিশেষত্বের শুধু সংক্ষিপ্ত নাম উল্লেখ করব: ১- যুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা, ২-বাড়ির কাজ নিজের হাতে সম্পাদন, ৩-অত্যধিক ইবাদাত ও অপরের জন্য দোয়া, ৪- নিজ হিজাবের সুরক্ষা, ৫- সতীত্ব ও বেগানা পুরুষ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, ৬- নিজের সম্পদ ও অলংকার আল্লাহর রাস্তায় দান করার স্পৃহা, ৭- পোশাকাদি ও বিশেষত বিয়ের পোশাক ভিক্ষুককে দান, ৮- তাকওয়া অর্জনে উদ্গ্রীব, ৯- আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি ছিলেন নবীর জন্য কাউসারের ঝরনাধারা যার মাধ্যমে নবীর বংশধারা আজো বিশে^ বিরাজমান, ১০- আদর্শ গৃহিনী বা স্ত্রী, ১১- আদর্শ জননী, ১২- আদর্শ সমাজ সেবিকা ও ১৩- সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী রমণী, ১৪- অগণিত কোরআনের আয়াত নাযিলের শান ও মর্যাদার অধিকারিণী, ১৫- উম্মে আবিহা: ¯েœহময়ী জননীর মতো নবী করিমের (স.) সেবা-যতœ করা এবং বিপদের সময় তাঁর সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য মহীয়সী নারী ফাতেমা(সা.আ.) এর অন্যতম নাম উম্মে আবিহা অর্থাৎ তাঁর পিতার জননী। অনুরূপ অগণিত বিশেষত্ব নবীকন্যা হযরত ফাতেমা (সা. আ.) এর শানে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর দরবারে তাঁর বিশেষ মর্যাদার কারণে নবী (স.) তাঁকে দেখলে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং তিনি বলেছেন, ‘ফাতেমা আমার দেহের অংশ, যা কিছু তাকে সন্তুষ্ট করে তা আমাকে সন্তুষ্ট করে এবং যা কিছু ফাতেমাকে কষ্ট দেয় তা আমাকে কষ্ট দেয়, আর যা আমাকে কষ্ট দেয় তা আল্লাহকেও কষ্ট দেয়।’ (বুখারি/৩৭১৪, মুসলিম ২৪৪৯)। এ পর্যায়ে একটি ঘটনা বর্ণনা করব যাতে বুঝা যাবে যে, ফাতেমার (সা.আ.) অন্তর ছিল আল্লাহর প্রতি ইমান ও ইয়াকিনে পূর্ণ:
হযরত আবুযর গিফারি(রা.) বলেন: একবার রাসূল (স.) আলীকে ডাকার জন্য আমাকে পাঠান। আলীর গৃহে এসে তাঁকে ডাকলে কেউ আমার ডাকে সাড়া দিল না। কিন্তু লক্ষ্য করলাম তার বাড়ির হস্তচালিত যাঁতাকলটি নিজে নিজেই ঘুরছে অথচ এর পাশে কেউ ছিল না। তখন আবার তাঁকে ডাকলাম। আলী ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন। আমি তাঁকে নবীর কথা বললে তিনি নবীর সাথে দেখা করার জন্য যাত্রা করলেন। নবী (স.) এর কাছে পৌঁছলে তাঁর সাথে নবী(স.) কথোপকথন করলেন এবং এমন কিছু বললেন যা আমি বুঝতে পারলাম না। তখন আমি নবী(স.) এর কাছে প্রশ্ন করলাম: ‘হে নবী, আলীর গৃহে হস্তচালিত যাঁতাকলটি দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছি। যাঁতাকলটি কীভাবে নিজে নিজেই ঘুরছিল অথচ এর পাশে কেউ ছিল না?!
নবী(স.) বলেন, ‘আমার কন্যা ফাতেমা এমন একজন রমণী যার অন্তর ও সর্বাঙ্গকে ইমান ও ইয়াকিনে পূর্ণ করেছেন। আল্লাহ ফাতেমার অক্ষমতা ও দৈহিক দুর্বলতার ব্যাপারে অবহিত। তাই তিনি তার জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে গায়েবিভাবে সাহায্য করে থাকেন। তুমি কি জান না আল্লাহর এমন অনেক ফেরেশতা আছেন যাঁরা মুহাম্মাদের বংশকে সাহায্য করার জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত?’ (চৌদ্দ মাসুম আ. এর জীবনী/১৪৫)
ফাতেমা (সা.আ.) ও নারী স্বাধীনতা
জাহেলিয়াতের যুগে আরব নারীরা সকল প্রকার জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হতো। অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হতো। নি¤েœ কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো:
জাহেলিয়াতের যুগে নারীদের সঙ্গে করা সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম নির্যাতনটি ছিল জীবন্ত কন্যাসন্তানকে কবর দেওয়া। কিছু আরব গোত্র তাদের ঘরে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে কবর দিয়ে দিত। তাদের মধ্যে বহুল প্রচলিত একটি প্রথা ছিল যে, কন্যাকে কবর দেওয়া মহত্ত্বের অংশ। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযিল করে বলেন:
আর যখন জীবন্ত কবরস্থ কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবেÑ কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে? (সূরা তাকভীর/৮-৯)
কিন্তু ইসলাম আগমনের পর বিশেষত মদীনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবার পর এ প্রথা চিরতরে রহিত হয়। এমনকি ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর মেয়েরা এতই সম্মানিত হয়েছিল যে, কোনো নারীকে দেখলেই পুরুষরা তাকে মা বলে সম্বোধন করতেন এবং তাকে মায়ের মতোই সম্মান করতেন। এই আচরণের শিক্ষা মুসলমানরা নবী(স.) এর কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। কারণ, ফাতেমা(সা.আ.) কে তিনি মা বলে সম্বোধন করতেন এবং বাস্তবে তাঁকে মায়ের মতোই সম্মান করতেন। আর তাই ফাতেমার অন্যতম উপাধি হলো: উম্মে আবিহা অর্থাৎ তাঁর পিতার জননী।
নবী করিম (স.) এর কাছে ফাতেমার সম্মান
নবীপতœী হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘যখনি হযরত ফাতেমা(সা.আ.) নবীর (স.) কাছে আসতেন তখনি তিনি ফাতেমার সম্মানে উঠে দাঁড়াতেন এবং ফাতেমার মাথায় চুমু খেতেন, অতঃপর তাকে নিজের স্থানে বসাতেন। আবার যখন নবী (স.) ফাতেমার সাক্ষাতে গমন করতেন তখন তাঁরা পরস্পরের মুখে চুম্বন করতেন এবং পাশাপাশি বসতেন।’ (মানাকিবে ইবনে শাহরে আশুব, ৩/১১৩)।
সর্বোপরি ফাতেমা(সা.আ.) এটা প্রমাণ করেছেন যে, পরিপূর্ণতার শিখরে ওঠার জন্য পুরুষ হওয়া জরুরি কোনো শর্ত নয়। তিনি এমন এক যুগে জন্মগ্রহণ করেছেন যখন আরবরা নারীকে মনে করত কেবল ভোগের সামগ্রী এবং কিছু আরব গোত্র তাদের ঘরে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলে অমর্যাদার ভয়ে তাদেরকে জীবন্ত কবর দিত বা গোপনে মেরে ফেলত। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ রাসূল ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের ঘরে একজন কন্যাসন্তান পাঠিয়ে নারী জাতির জন্য অশেষ সম্মান ও মুক্তির ব্যবস্থা করেছেন।
উপসংহার: যদিও প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়ে থাকে, যার ইতিহাসে নিবন্ধিত রয়েছে যে, ১৯০৮ সালে নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমে আসে প্রায় ১৫ হাজার নারী। আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ছিল নারীর মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা এবং কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। কিন্তু আরবিয় জাহেলী যুগের নারীদের প্রতি যে অবমাননা এবং জুলুম হয়েছে সেই পরিবেশে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবীর ঘরে ফাতেমা (সা.আ.) কে প্রেরণ করে তাঁর মাধ্যমেই নবীর বংশ বিস্তার করে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করতঃ যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন সে বিষয়ের প্রতি যদি আমরা মনোনিবেশ করি তবে ফাতেমা (সা.আ.) এর জন্মদিনটাই নারী দিবস ঘোষণা দেবার দাবি রাখে।
কী ওয়ার্ড: নবীকন্যা, নবী করিম, ফাতেমা, জন্মদিন ও নারী দিবস।