বুধবার, ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

English

নতুন হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ কেমন হবে?

পোস্ট হয়েছে: মে ৬, ২০২৬ 

news-image

তেহরান ইরনা: হরমুজ প্রণালী আজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এই জলপথটি ৯ এসফান্দ ১৪০৪ (ইরানি তারিখ) পর্যন্ত কোনো খরচ ছাড়াই বৈশ্বিক নৌপরিবহনের জন্য উন্মুক্ত ছিল; কিন্তু এই তারিখের পর এবং “রমজান যুদ্ধ” শুরুর পর, ইরান এই অঞ্চলে তাদের “স্মার্ট ব্যবস্থাপনা” শুরু করে। এখন আর এটি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না; বরং একটি নতুন কাঠামোর মাধ্যমে, ইরানকে কেন্দ্র করে এর পরিচালনা করা হবে।

ইরনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে এই স্মার্ট ব্যবস্থাপনা বজায় রাখতে কিছু প্রয়োজনীয়তা এবং একটি সুনির্দিষ্ট ও বিস্তৃত পরিকল্পনার দরকার হবে, এবং এটি ইরানের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি করবে। এ প্রসঙ্গে এবং পারস্য উপসাগরের জাতীয় দিবস উপলক্ষে, “স্মার্ট গভর্নেন্স থিঙ্ক ট্যাঙ্ক”-এর প্রধান সাইয়্যেদ তাহা হোসেইন মাদানি এবং আমিরকবিরের “প্রোডাক্টিভিটি গভর্নেন্স থিঙ্ক ট্যাঙ্ক”-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত মোহাম্মদরেজা হাদ্দাদি’র উপস্থিতিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যা স্মার্ট গভর্নেন্স থিঙ্ক ট্যাঙ্কের জনসংযোগ বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়।

হরমুজ প্রণালীর স্মার্ট ব্যবস্থাপনা কীভাবে সম্ভব হলো?

এই বৈঠকে “স্মার্ট গভর্নেন্স থিঙ্ক ট্যাঙ্ক”-এর প্রধান সাইয়্যেদ তাহা হোসেইন মাদানি, ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালীর স্মার্ট ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন: ইরান তাদের শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিপুল তথ্যভাণ্ডারের উপর ভিত্তি করে, ডেটা-নির্ভর শাসনব্যবস্থা ও নির্ভুল বিশ্লেষণের মাধ্যমে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে স্মার্ট গভর্নেন্সের সূচকগুলো সফলভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছে এবং জাহাজ চলাচলকে স্মার্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

মাদানি আরও বলেন: অন্যভাবে বললে, রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ তথ্য—যেমন জাহাজের মালিকানা, চলাচলের পথ, জাহাজের পণ্যবস্তু, বিভিন্ন দেশের বাজারে এসব জাহাজের প্রভাব ইত্যাদি—থেকে পরিশোধিত ও তাৎক্ষণিক (রিয়েল-টাইম) ডেটা তৈরি করতে পেরেছে। এরপর এসব ডেটা একত্র করে তথ্য তৈরি করা হয় এবং সেই তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে এমন জ্ঞান অর্জন করা হয়, যার ভিত্তিতে জাহাজগুলোকে পারাপারের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রতিপক্ষ দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলা হচ্ছে।

প্রয়োজনীয় পণ্যের বিকল্প সরবরাহপথ

স্মার্ট ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখার জন্য যে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো দরকার, সে সম্পর্কে তিনি বলেন: এই ব্যবস্থাপনা চালু রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনগুলোর একটি হলো দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা—বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের—জন্য নতুন সরবরাহপথ নির্ধারণ করা, যাতে সামরিক বাহিনী খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে নিশ্চিন্তে এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের স্মার্ট ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যেতে পারে।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন: এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ইতোমধ্যেই প্রস্তুত রয়েছে। ইরান প্রতি বছর প্রায় ৭৫ মিলিয়ন টন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করে, যার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। অথচ ইরানের মোট সীমান্তের প্রায় ৭৫ শতাংশ—উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে—হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল নয়।

অন্যভাবে বললে, ইরানের ১৫টি প্রতিবেশী দেশ রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি দেশের সঙ্গে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার স্থল ও জলসীমা রয়েছে। ফলে তুরস্ক, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ সীমান্তপথ ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন: সামগ্রিকভাবে, ইরান তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী নির্ভরতা ছাড়াই বিকল্প পথে সরবরাহ করতে পারে। এই বিষয়টিকে ১৪০৫ সালের (ইরানি সন) প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর একটি হিসেবে দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত।

হরমুজ প্রণালীর স্মার্ট ব্যবস্থাপনার সুযোগসমূহ / নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা থেকে টোল আদায় পর্যন্ত

মাদানি হরমুজ প্রণালীর স্মার্ট ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখার ফলে ইরানের জন্য যে সুযোগগুলো তৈরি হতে পারে সে সম্পর্কে বলেন: এই ব্যবস্থাপনা ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, হরমুজ প্রণালীর স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে ইরানের আর্থিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া—যেমন ইরানের অর্থ ব্লক করে রাখা—থেকে বিরত রাখা সম্ভব হতে পারে।

“স্মার্ট গভর্নেন্স থিঙ্ক ট্যাঙ্ক”-এর প্রধান আরও বলেন: হরমুজ প্রণালীর এই ব্যবস্থাপনা এবং এর ধারাবাহিকতা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে এবং ইরান এই ব্যবস্থাকে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

তিনি আরও একটি সুযোগের কথা উল্লেখ করেন—সেটি হলো সামুদ্রিক বীমা ব্যবস্থায় ইরানি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ। তিনি বলেন: ইরানি কোম্পানিগুলো পারস্য উপসাগর অঞ্চলে চলাচলের জন্য বিশেষ অস্থায়ী ও আঞ্চলিক বীমা চালু করে এই খাতে অংশ নিতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। অর্থাৎ, যদি কোনো জাহাজ পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের যেকোনো গন্তব্যে পণ্য বহন করতে চায়, তাহলে সাধারণ বীমার পাশাপাশি ইরানি বা ইরান-অনুমোদিত আঞ্চলিক কোম্পানির কাছ থেকে এই অঞ্চলে চলাচলের জন্য আলাদা অস্থায়ী বীমা নিতে হবে। এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে অনুসরণ করা উচিত এবং এ জন্য ইরান সরকারকে প্রয়োজনীয় বিধান তৈরি করতে হবে। সামগ্রিকভাবে, হরমুজ প্রণালীতে বীমা সংক্রান্ত বিষয় আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মাদানি টোল (মাশুল) আদায়ের সুযোগ সম্পর্কেও বলেন: এটি বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় এবং হরমুজ প্রণালীর নতুন রূপের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। ইরান যে স্মার্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপত্তা ও সেবা প্রদান করছে, তার ভিত্তিতে টোল আদায় একটি বৈধ অধিকার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আগে যদি এ বিষয়ে রাজনৈতিক ইচ্ছা না থেকেও থাকে, বর্তমানে শত্রুপক্ষের হামলায় ইরানের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার যে ক্ষতি হয়েছে, তা বিবেচনায় এনে এই মাশুল আদায় করা যেতে পারে।

শেষে, ১০ ওরদিবেহেশ্ত (পারস্য উপসাগরের জাতীয় দিবস) প্রসঙ্গে তিনি বলেন: প্রায় ৪০০ বছর আগে এই দিনে ইরানের জনগণ সাহস ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে বহু বছরের দখলদারিত্ব শেষে পর্তুগিজ আগ্রাসীদের পারস্য উপসাগর থেকে বিতাড়িত করেছিল। আজও এই অঞ্চল থেকে বিদেশি শক্তিকে বের করে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালীতে টোল (মাশুল) আদায়ের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনি নথিপত্র

আমিরকবিরের “প্রোডাক্টিভিটি গভর্নেন্স থিঙ্ক ট্যাঙ্ক”-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত মোহাম্মদরেজা হাদ্দাদি টোল আদায়ের আইনি কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক আইনে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর মাশুল নেওয়ার অবস্থান সম্পর্কে বলেন: এ বিষয়ে ছয়টি আন্তর্জাতিক আইনি নথির উল্লেখ করা যায়। এগুলো হলো—১৯০৭ সালের হেগ কনভেনশন নং ১৩, ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশন (UNCLOS), ১৯৪৫ সালের জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর ধারা, ১৯৯৪ সালের সান রেমো নির্দেশিকা (সমুদ্রযুদ্ধের প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন), ১৯৮৮ সালের সমুদ্রযাত্রার নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অবৈধ কার্যক্রম দমন কনভেনশন (SUA) ও এর ২০০৫ প্রোটোকল, এবং ১৯৯৯ সালের সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন। এছাড়া আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও সামঞ্জস্যতার নীতিও (যা প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক আদালতের রীতিনীতি থেকে উদ্ভূত) এখানে প্রযোজ্য। এসব নথির ভিত্তিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে সাধারণ ও বিশেষ মাশুল আদায়কে বৈধ বলা যেতে পারে।

হাদ্দাদি আরও বলেন: ইরান কী ভিত্তিতে এই মাশুল আদায় করবে—এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, সাধারণ মাশুল নেওয়া হবে প্রণালী ব্যবহারের স্বাভাবিক ও প্রচলিত সেবার জন্য, আর বিশেষ মাশুল নেওয়া হবে সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং যুদ্ধজাহাজের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে।

আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি ব্যাখ্যা করেন: প্রথমে অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, এরপর ওমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং পরে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বহুপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব।

তিনি জোর দিয়ে বলেন: তবে মনে রাখতে হবে, হরমুজ প্রণালী থেকে আয় করা মূল লক্ষ্য নয়; বরং প্রধান অগ্রাধিকার হলো সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং বিদেশি সামরিক ঘাঁটি অপসারণ।

সবশেষে উল্লেখ করা হয়, এই টোল আদায় ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাহাজের বীমা খরচ কমানোর প্রেক্ষাপটে, বছরে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়—তার তুলনায় এই মাশুল অত্যন্ত সামান্য এবং যৌক্তিক বলে বিবেচিত।

সূত্র: ইরনা