খামেনেয়ীর শাহাদাতে শোকাচ্ছন্ন ইরান
পোস্ট হয়েছে: মার্চ ২, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী নিহত হওয়ার পর পুরো ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। তেহরানে খামেনেয়ীর নিজ কার্যালয়ে গতকাল চালানো এই হামলায় তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য এবং শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও প্রাণ হারিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
শনিবার দিবাগত রাতে তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী। এতে ৮৬ বছর বয়সী খামেনেয়ী ছাড়াও তার মেয়ে, জামাতা এবং নাতি নিহত হন। এ ছাড়া হামলায় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি এবং আইআরজিসি-র প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরসহ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা প্রাণ হারিয়েছেন। খামেনেয়ীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তেহরানসহ ইরানের প্রধান শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ শোক মিছিলে অংশ নিতে রাস্তায় নেমে আসে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই হত্যাকা-কে ‘এক মহা অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং শোক পালনের পাশাপাশি ৭ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছেন। এদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই হত্যাকা-ের কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিয়েছে। ইতিমধ্যে তারা ইসরাইলের সামরিক স্থাপনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে কয়েক দফায় ড্রোন ও মিসাইল হামলা শুরু করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি তাদের প্রতিশোধমূলক অভিযানের মাত্র শুরু।
এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। দুবাই, দোহা এবং মানামার মতো শহরগুলোতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যা মূলত ইরানের পাল্টা হামলার প্রভাব বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে খামেনেয়ীকে ‘ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ইরান যদি পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করে তবে তাদের এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। বর্তমানে তেহরানের শাসনভার পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে, যার প্রভাব বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে।
প্রতিশোধ নেওয়া ‘দায়িত্ব ও বৈধ অধিকার’ : খামেনেয়ী এবং অন্যান্য শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যাকা-ের প্রতিশোধ নেওয়াকে জাতীয় ‘কর্তব্য এবং বৈধ অধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সম্প্রতি এক শোকবার্তায় তিনি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। পেজেশকিয়ান বলেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান মনে করে, এই ঐতিহাসিক অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতাদের বিচার ও উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এই মহান দায়িত্ব ও অঙ্গীকার পালনে ইরান তার সর্বশক্তি নিয়োগ করবে।” তিনি আরও জানান যে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ইরান কোনো ছাড় দেবে না।
উপসাগরীয় ভাইদের ওপর নয়, আমাদের লক্ষ্য কেবল মার্কিন ঘাঁটি : পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে জড়াতে চায় না ইরান। আল জাজিরাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের সামরিক পদক্ষেপ কেবল মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা এবং প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা। আরাগচি বলেন, “পারস্য উপসাগরের ওপারে থাকা দেশগুলোর সাথে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমাদের প্রতিবেশী এবং ভাইদের ওপর আক্রমণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের লক্ষ্যবস্তু কেবল এই অঞ্চলে থাকা আমেরিকান ঘাঁটিগুলো।”
ইরানে ‘আগ্রাসনে’ যোগ দিচ্ছে যুক্তরাজ্য : মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা করেছেন যে, যুক্তরাজ্য ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে সক্রিয় অংশ নিচ্ছে। তিনি জানান, “আমাদের বাহিনী সক্রিয় রয়েছে এবং ব্রিটিশ বিমান আজ আকাশে উড়ছে, যা সমন্বিত আঞ্চলিক প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের অংশ। এর লক্ষ্য আমাদের জনগণ, স্বার্থ এবং মিত্রদের রক্ষা করা।”
ইরানের পাল্টা হামলায় জ¦লছে উপসাগরীয় দেশগুলো: খামেনেয়ীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ইরান ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে অবস্থিত ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইসরাইল, দুবাই, কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েতের বিভিন্ন মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। দুবাইয়ের বিলাসবহুল ফেয়ারমন্ট দ্য পাম হোটেলে আগুন লেগেছে এবং দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪ জন আহত হয়েছেন।
ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মৃত্যুর মিছিল : ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে চলা ভয়াবহ সংঘাত ও হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০১ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনায় অন্তত ২৪টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় আহত হয়েছেন আরও ৭৪৭ জন। ইরানের পাল্টা হামলায় রক্তাক্ত হলো মধ্য ইসরাইলের বেইত সেমেশ শহর। জেরুসালেম থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই শহরে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে অন্তত ৯ জন নিহত এবং ২০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। ইসরাইলের জরুরি চিকিৎসা সেবা সংস্থা ‘মাগেন ডেভিড আদম’ (এমডিএ) এই হতাহতের খবর নিশ্চিত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ৫৮ জন। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। অন্য দুই জন পাকিস্তান ও নেপালের নাগরিক। পাকিস্তানের করাচি শহরে মার্কিন কনস্যুলেটের কাছে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে অন্তত নয়জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। এই তথ্য নিশ্চিত করেছে স্থানীয় উদ্ধারকারী সংস্থা।
বন্ধ আকাশসীমা, স্থবির আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল : মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে অস্থিরতার কালো মেঘ। ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে অচল হয়ে পড়েছে এই অঞ্চলের আকাশসীমা। যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলো তাদের কয়েকশ ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করেছে, যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার আন্তর্জাতিক যাত্রী।
মেয়েদের স্কুলে মার্কিন বিমান হামলায় নিহত বেড়ে ১৪৮ : ইরানে মার্কিন বিমান বাহিনীর সাম্প্রতিক এক শক্তিশালী বিমান হামলায় একটি বালিকা বিদ্যালয় বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ১৪৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন করে চরম রূপ নিয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের নিকটবর্তী একটি এলাকায় অবস্থিত ওই বিদ্যালয়ে যখন পাঠদান চলছিল, তখনই ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হানে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলার পর পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায় এবং স্কুল ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। উদ্ধারকর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশু ও শিক্ষকদের মরদেহ এবং আহতদের উদ্ধার করেন।
মসজিদুল আকসায় তারাবির নামাজ বন্ধ : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান হামলার জেরে সৃষ্ট ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’ ও জরুরি অবস্থার অজুহাতে পবিত্র মসজিদুল আকসায় এশা ও তারাবির নামাজ আদায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসরাইলি পুলিশ। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। এদিকে শুধু মসজিদই নয়, পুরোনো শহরের ফিলিস্তিনি ব্যবসায়ীদের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বেকারি ও নিত্যপণ্যের দোকান ছাড়া অধিকাংশ দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য করছে পুলিশ। অথচ একই এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা পুলিশের নিরাপত্তায় নিয়মিত আচার-অনুষ্ঠান পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইরবিলে মার্কিন ঘাঁটিতে ভয়াবহ হামলা : ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী ইরবিলে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইরানপন্থি একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘ফারস নিউজ’ এই খবর নিশ্চিত করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হামলার পর মার্কিন ঘাঁটি থেকে কালো ধোঁয়ার কু-লী আকাশে উড়তে দেখা গেছে। এর আগে পুরো শহরজুড়ে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তবে এই হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ইরানে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে বিশ^জুড়ে বিক্ষোভ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে প্রাণঘাতী বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে নিউ ইয়র্ক সিটির বাসিন্দারা। শনিবার স্থানীয় সময় বিকেলে ঐতিহাসিক টাইমস স্কয়ারে সমবেত হয়ে হাজার হাজার মানুষ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। উত্তাল হয়ে উঠেছে গ্রিসের রাজধানী এথেন্সও। রোববার সহস্রাধিক শান্তিকামী মানুষ মার্কিন ও ইসরাইলি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। বিক্ষোভকারীদের তোপের মুখে দূতাবাস এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্থানীয় পুলিশ।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর “শত শত ইরাকি” বাগদাদের গ্রিন জোনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে হামলার চেষ্টা করেছে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, “এখনও পর্যন্ত তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তবে তারা এখনও গ্রিন জোনে প্রবেশের চেষ্টা করছে।” এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের হাতে “ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠির পতাকা” ছিল এবং তারা নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছুঁড়ে মারছিল। পরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছিল। ইতোমধ্যেই স্থানীয় ইরাকি গণমাধ্যম দক্ষিনাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে বিক্ষোভের খবর দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর দুই পাশে আটকা পড়েছে শত শত তেলবাহী জাহাজ : ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালীতে। শিপিং ডেটা বা জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের দুই পাশে বর্তমানে শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এই অচলাবস্থার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও এর দাম নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ^নেতাদের নিন্দা ও প্রতিবাদ : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়ীর আকস্মিক মৃত্যুতে বিশ্ব রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় খামেনেয়ীর এই মৃত্যুকে ‘নৃশংস হত্যাকা-’ হিসেবে অভিহিত করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একে ‘মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’ বলে মন্তব্য করে ভয়াবহ প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেছেন।
রুশ রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা তাস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে পাঠানো এক বার্তায় এই হত্যাকা-ের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। পুতিন স্পষ্টভাবে বলেন, এই হামলা মানবিক নৈতিকতার সমস্ত আদর্শ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীন বলছে, সার্বভৌম একটি দেশের নেতার ওপর এমন হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত। গতকাল রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে এক জরুরি টেলিফোন আলাপে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে নেতাকে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইরানে ইসরাইলের হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে ‘‘অবৈধ আগ্রাসন’’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর চরম নিন্দা জানিয়েছে উত্তর কোরিয়া। এক বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই হামলাকে ইরানের জাতীয় সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। রোববার দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএর এক প্রতিবেদনে ওই তথ্য জানানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান প্রত্যাশিতই ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী এবং গু-ামিসুলভ আচরণে এমন ঘটনা অনিবার্য বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই ‘‘আগ্রাসনের যুদ্ধ’’ কোনও অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য ওই অঞ্চলের সব দেশ এবং যাদের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে, তাদের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। সূত্র : বিবিসি, আল-জাজিরা, এএফপি, রয়টার্স।
ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র দ্বিতীয় দিনে এসে প্রথম প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। গতকাল এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইরানে স্থল ও আকাশপথে চলমান যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে তিন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং আরো পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
নিহতদের পরিচয় পরিবারের সম্মতির অপেক্ষায় এখনই প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ভিডিও বার্তায় শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের সাহসী বীররা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করছেন। যুদ্ধে হতাহতের ঝুঁকি থাকেই, তবে আমাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান থামবে না।’ মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুদ্ধ ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় বোর্ড। যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বোর্ড মন্তব্য করেছে, ‘বিনা নোটিশে এবং অনির্ধারিত কৌশলে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করা সংবিধান পরিপন্থী ও হঠকারী সিদ্ধান্ত।’
সূত্র: ইনকিলাব