খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি ও আধুনিক আধ্যাত্মিক কবি শাহরিয়ার গবেষণায় আহসানুল হাদী
পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
ইরানের সাথে বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের রয়েছে সুদীর্ঘকালের সাহিত্যিক,সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ও বিনিময়। ফারসি ভাষা প্রাচীন পারস্য তথা বর্তমান ইরানের রাষ্ট্রভাষা। মধ্যযুগে লম্বা একটা সময় ফারসি ভাষা এই উপমহাদেশের রাজভাষা ছিলো সেই সাথে এতদঞ্চলের প্রশাসনিক কাজে ফারসি ব্যবহৃত হতো ও অসংখ্য সাহিত্যকর্মও ফারসি ভাষায় রচিত হয়। সুলতানী ও মুঘল আমলে ইরান থেকে অনেক কবি-সাহিত্যিকগণ ভারতে আসেন ও সাহিত্য রচনা করেন। আমাদের বাংলাভাষার মধ্যযুগের সাহিত্য রচনাবলির দিকে তাকালে সহজেই অনুধাবন করা যায় যে মধ্যযুগের কবি-সাহিত্যিকগণ ফারসি থেকে অনুবাদ ও ফারসি ভাষার কোনো লেখকের সাহিত্যকর্মকে উপজীব্য করে সাহিত্য রচনা করেছেন। ফারসি কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে ফেরদৌসী,হাফিজ, মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি,শেখ সাদী,ওমর খৈয়াম এবং তাদের মাস্টারপিস সাহিত্যকর্ম যেমন শাহনামা, হাফিজের গজল, মসনভী, গুলিস্তাঁ ও বুস্তাঁ, রুবাইয়াতের সাথে আমরা বাংলাদেশিরা বেশি পরিচিত। ইরান,ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের কথা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে গেলেই আমাদের মনের মধ্যে প্রাচীন এসব কবি সাহিত্যিক ও তাদের সাহিত্যকর্মের নাম মনে পড়ে যায়।
কিন্তু বর্তমানেও ইরানে অনেক প্রসিদ্ধ কবি-সাহিত্যিক রয়েছে। যাদের সাহিত্যকর্মও ইরান ও ইরানের বাহিরে বেশ জনপ্রিয়। তেমনি একজন জনপ্রিয় আধুনিক আধ্যাত্মিক কবি হলেন শাহরিয়ার। বর্তমান তথা আধুনিক ইরান ও ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক কবিদের মধ্যে অন্যতম হলেন মুহাম্মদ হোসাইন শাহরিয়ার। শাহরিয়ারের পুরো নাম ‘সাইয়্যেদ মুহাম্মদ হোসাইন বেহজাত তাবরিজি’। ‘শাহরিয়ার’ তাঁর কাব্যনাম। যদিও প্রাথমিক জীবনে কাব্যনাম হিসেবে ‘বেহজাত’ নির্বাচন করেন কিন্তু পরবর্তী জীবনে কাব্যনাম নির্বাচনের ব্যাপারে ফালে হাফিজ (দিভানে হাফিজের কবিতার মাধ্যমে ভাগ্য গণনা) এর সাহায্য নেন। সেক্ষেত্রে ফালে হাফিজের ফলাফলে নিম্নোক্ত কবিতাটি উঠে আসে:
که چرخ سکه دولت به نام شهریان زد
روم به شهر خود و شهریار خود باشم.
উচ্চারণ:
কে চারখ সেক্কেয়ে দওলাত বেনা’মে শাহরিয়ান যাদ,
রাভাম বে শাহরে খোদ ভা শাহরিয়া’রে খোদ বশাম।
অর্থঃ
যেহেতু ভাগ্যের চাকা রাষ্ট্রীয় মুদ্রায় বাদশাদের নাম অঙ্কিত করলো,
তাই আমি নিজের শহরে যাব এবং নিজের বাদশা নিজেই হবো।।
উপর্যুক্ত বেইতের ‘শাহরিয়ার’ শব্দটির জন্য পরবর্তীতে তিনি কাব্যনাম হিসেবে ‘শাহরিয়ার’ নির্বাচন করেন। যিনি শাহরিয়ার নামেই সুপরিচিত ও বিখ্যাত। মাত্র নয় বছর বয়সেই শাহরিয়ার ফারসি ভাষায় প্রথম কবিতা লেখেন। শাহরিয়ার একজন আধ্যাত্মিক কবি। তিনি তাঁর জীবনের দীর্ঘ একটা সময় আধ্যাত্মিক সাধনার পেছনে ব্যয় করেন।তিনি ইসলামি বিপ্লবের একজন সমর্থক ছিলেন সেইসঙ্গে ইসলামি বিপ্লবের পক্ষে অনেক কবিতা রচনা করেন। পদ্য সাহিত্যে তাঁর অধিক বিচরণ ছিলো।
শাহরিয়ারের কবিতায় পূর্ববর্তী কবিদের, বিশেষ করে ক্লাসিক কবিদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ফেরদৌসীর জাতীয়তাবাদ ও বীরত্বগাঁথা, সানায়ির জ্ঞান- বিজ্ঞান, নিজামীর নাটকীয়তা,মৌলভির আধ্যাত্মিকতা, সা’দির কোমল বর্ণনা ভঙ্গির প্রভাব শাহরিয়ারের কবিতায় দেখতে পাওয়া যায়। তবে তিনি হাফিজকে সবচেয়ে বেশী অনুসরণ করেছেন। হাফিজের অধ্যাত্মবাদ ও গজলের প্রভাব শাহরিয়ারের গজল সমূহে অনুভব করা যায়। হাফিজের প্রভাব কবির জীবনে এতটাই প্রবল ছিল যে, দিভানে হাফিজের মাধ্যমে তিনি তাঁর কাব্য নাম পরিবর্তন করেন।
আধুনিক ও আধ্যাত্মিক কবি শাহরিয়ারের বৈচিত্র্যময় জীবন,লেখালেখি, চিন্তা ও সাহিত্যকর্মকে বাংলাভাষী পাঠক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আহসানুল হাদী। ড. হাদী ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি ঢাকার মিরপুরের লালকুঠিতে জন্মগ্রহণ করেন। আহসানুল হাদী ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে মিরপুরের হযরত শাহ আলী বোগদাদী সিনিয়র ফাযিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল (এস এস সি) এবং ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাসা-ই-আলিয়া ঢাকা থেকে আলিম (এইচ এস সি) পাশ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সী ও উর্দু বিভাগে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। তিনি ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে এই বিভাগ থেকে বি.এ সম্মান এবং ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘ফারসি কবি মুহাম্মদ হোসাইন শাহরিয়ার ও তাঁর আধ্যাত্মপ্রেম’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য একই বিভাগ থেকে এম.ফিল ডিগ্রি লাভ করেন।
২০১০ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। আহসানুল হাদী বাংলাদেশ ও ইরানে অনুষ্ঠিত ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করেছেন।
ড. আহসানুল হাদী ২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের শিরোনাম- ‘খাজা মুইনুদ্দিন চিশতির ফারসি রচনাবলি : একটি বিশ্লেষণ’।
ড. মোহাম্মদ আহসানুল হাদী কর্তৃক লিখিত ও প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা- ২টি। ‘ইরানের আধুনিক কবি মুহাম্মদ হোসাইন শাহরিয়ার’ গ্রন্থটি মূলত ড.হাদীর এম.ফিল গবেষণার অভিসন্দর্ভ থেকে রচিত বই। গ্রন্থটি ২০১৫ সালে ‘ইসলামী দর্শন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ থেকে প্রকাশিত হয়। ভূমিকা ও উপসংহারসহ চারটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত গ্রন্থটির প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে শাহরিয়ারের জীবনী,প্রথম কবিতা লেখা, প্রেমের সূচনা,প্রেমে ব্যর্থতা,প্রথম কাব্যগ্রন্থ,পিতার মৃত্যু, আধ্যাত্মিক সাধনা, মায়ের মৃত্যু,শাহরিয়ার ও ইসলামি বিপ্লব, মৃত্যু।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে শাহরিয়ারের সাহিত্যকর্ম,তাঁর কবিতার ভাষা ও বর্ণনা শৈলী,অলংকার শাস্ত্রের ব্যবহার,গঠন ও প্রকৃতি,চিন্তা-চেতনা ও বিষয়বস্তু, চিত্রকল্প, পূর্ববর্তী কবিদের প্রভাব,ধর্মের অবলম্বন, কাব্যালংকার।
তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে আধুনিক কবি শাহরিয়ার,ফারসি কাব্যরীতির প্রথম যুগ,ফারসি কাব্যরীতির দ্বিতীয় যুগ, ফারসি কাব্যরীতির তৃতীয় যুগ,ফারসি কাব্যরীতির চতুর্থ যুগ,ফারসি কাব্যরীতির পঞ্চম যুগ, ফারসি কাব্যরীতির ষষ্ঠ যুগ, আধুনিক কবিতার সূচনা কাল, অষ্টম যুগ বা সমকালীন যুগ, ফারসি কবিতার মাকতাব বা লেখনি পদ্ধতি, ইউরোপীয় রচনাশৈলী, শাহরিয়ারের দৃষ্টিতে নতুনত্ব, আধুনিক কবিতা ও শাহরিয়ার, আধুনিক কবি হিসেবে শাহরিয়ারের মূল্যায়ন।
গ্রন্থটির চতুর্থ তথা শেষ অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ রয়েছে শাহরিয়ারের জীবনে অধ্যাত্ম ভাবরস,শাহরিয়ারের প্রেমত্ততা,হাফিজ প্রভাবিত শাহরিয়ার,শাহরিয়ারের আধ্যাত্মিক দর্শন,শাহরিয়ারের দৃষ্টিতে আ’রেফ ও এরফানিয়াত,ওয়াহদাত বা প্রেমাস্পদের একত্ববাদ,ফাকর বা অমুখাপেক্ষিতা, কানায়াত বা অল্পেতুষ্টি, ফানা বা প্রেমাস্পদে আত্মবিলোপ, মোর্শেদ ও তাঁর অনুসরণ, বাকা তত্ত্ব,আত্মা-দর্শন,দুনিয়ার প্রতি অনীহা ও তওবা।
ড. আহসানুল হাদী রচিত গ্রন্থটি শুধু আধুনিক কবি শাহরিয়ারকে নিয়ে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং ফারসি সাহিত্যের কাব্যরীতির প্রাচীন তথা প্রথম যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সকল রীতির খুঁটিনাটি সব তথ্যের সমারোহ।
‘Life and Persian Literary Works of Khawja Muinuddin Chishty’ গ্রন্থটি ড. আহসানুল হাদী রচিত দ্বিতীয় বই। গ্রন্থটি ফারসি ভাষায় রচিত। যা ২০২৫ সালে ঢাকাস্থ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
ফারসি,বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লিখিত দেশি-বিদেশি গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত ড. মোহাম্মদ আহসানুল হাদীর গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা- ১৩টি।
সুজন পারভেজ
শিক্ষার্থী,ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।