বৃহস্পতিবার, ২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের বাস্তবতা: পশ্চিমা মিডিয়ার গুজব ও ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য- সাইয়্যেদ রেজা মীর মোহাম্মাদী

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬ 

news-image

গতকাল ২৮ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকার ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে  ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে ইমাম, খতিব ও বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকায় নিযুক্ত ইরান দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ রেজা মীর মোহাম্মাদী সমসাময়িক নানা পরিস্থিতি নিয়ে  মতামত প্রকাশ করেন।

সাইয়্যেদ রেজা মীর মোহাম্মাদী জানান, ইরানে ১ জানুয়ারি থেকে ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। ইরানের মুদ্রার সঙ্গে ডলার ও ইউরোর দামের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় তারা বিক্ষোভে নামেন এবং সরকারকে এই সমস্যার সমাধান করতে বলেন। তিনি বলেন, এটি স্বাভাবিক বিষয় এবং সারা বিশ্বেই এমন হতে পারে। প্রথমদিকে আন্দোলন স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে তা সহিংস রূপ ধারণ করে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমেরিকা ও ইসরাইল ব্যাপকভাবে ইরানের বিপক্ষে মানুষকে উসকে দেয়। ইরানের অভ্যন্তরীণ শত্রুরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাঙ্গা ও সহিংসতা সৃষ্টি করে। আমেরিকা ও ইসরাইলের নির্দেশে তাদের প্রশিক্ষিত ভারী অস্ত্রধারী সশস্ত্র গোষ্ঠী সাধারণ আন্দোলনরত মানুষের ওপর গুলি চালায়। এতে অনেক নিরপরাধ মানুষ নিহত হয়।

মীর মোহাম্মাদী জানান, এই সহিংসতার ধারাবাহিকতায় তারা বহু মসজিদে অগ্নিসংযোগ করেছে, বাসে আগুন দিয়েছে, এমনকি অ্যাম্বুলেন্সেও আগুন দিয়েছে। দোকানপাট ভাঙচুর করেছে। শুধু তাই নয়, তারা সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে—যাদের মধ্যে ছিলেন মসজিদের নিরাপত্তাকর্মী, হাসপাতালের নার্স, পুলিশ বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। তাদের নির্মমতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, এটি কোনো স্বাভাবিক আন্দোলনকারীদের কাজ নয়, বরং সশস্ত্র গোষ্ঠীর পরিকল্পিত কার্যক্রম। ইরানের আপামর সাধারণ জনগণ, যারা ইমাম খামেনেয়ির পক্ষে অবস্থান করে, তারা কখনোই মসজিদ, বাস বা অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দিতে পারে না। এটি মূলত পশ্চিমাদের পরিকল্পিত কাজ।

জানুয়ারি মাসে সংঘটিত এই সন্ত্রাসী হামলায় মোট ৩,১১৭ জন মানুষ নিহত হয়। এদের মধ্যে ২,৪২৭ জন ছিলেন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৬৯০ জন ছিল সন্ত্রাসী। তবে পশ্চিমা গণমাধ্যম এই ঘটনাকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করেছে। তারা নিজেদের মিডিয়া শক্তি ব্যবহার করে পুরো ঘটনাটিকে ভুলভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। পশ্চিমা মিডিয়ার তৈরি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব গুজব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানের অভ্যন্তরে অবস্থানরত সন্ত্রাসীদের নির্দেশনাও দিচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরাইলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ইরান সরকার ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। যদিও অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক ইন্টারনেট সচল ছিল। তিনি আরও বলেন, ইরান এবার দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে একটি দেশে স্টারলিংক পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া যায়।

মতবিনিময় সভায় আসা অতিথিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,, ইরান সরকারের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েল ষড়যন্ত্র করে চলেছে। তবে সব ষড়যন্ত্র ইরান সরকার রুখে দিয়েছে। আপনারা যদি প্রকৃত ইরানের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান, তবে ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে তা জানতে হবে। যদি আপনি পশ্চিমা মিডিয়ার খবরের ওপর নির্ভর করে বিচার করেন, তবে মনে হবে ইরানের পতন ঘটেছে। তাই সত্য ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে হলে আপনাদের ইরানের নিউজ এজেন্সিগুলো থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে হবে।

 

এক প্রশ্নের উত্তরে মীর মোহাম্মাদী বলেন, আপনাদের যারা এখানে আছেন, কেউ আলেম, কেউ ইমাম, কেউ খতিব— আপনাদের কাছে আমার একটি আহবান, আপনারা যখনই খুতবা প্রদান করবেন, অবশ্যই আপনার খুতবায় ইরানের প্রকৃত অবস্থাটি তুলে ধরবেন, যাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ইরানের ব্যাপারে পূর্ণ ধারণা পেতে পারে।

উপস্থিত এক অতিথি প্রশ্ন করেন, বহু বছর ধরে শত্রুদের বারবার আঘাতের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে ইরানের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আছেন? এর উত্তরে মীর মোহাম্মাদী বলেন, ইরানের একটি মডেল রয়েছে, যেখানে তিনটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

১. আমাদের রাহবার রয়েছেন, যিনি আমাদের পথ দেখান।
২. আমাদের আপামর জনতা রয়েছে, যারা ঐক্যবদ্ধ।
৩. আমাদের দ্বীন ইসলাম রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমেরিকা ও ইসরাইল যা করছে, তা তাদের শক্তি বা সক্ষমতার কোনো প্রদর্শন নয়; বরং তারা ভয় থেকেই এসব করছে। ভয় রয়েছে বলেই তারা জোরপূর্বক নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে তারা সব ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে তারা সময় দিচ্ছে, অর্থ বিনিয়োগ করছে, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি করছে এবং পশ্চিমা মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে ইরান সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি করছে। বর্তমান যে চ্যালেঞ্জটি বিদ্যমান, তা মূলত একটি মিডিয়া সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল পরাজিত হওয়ার পর তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

৮ জানুয়ারির সন্ত্রাসী হামলাকে ইরানিরা যুদ্ধের ১৩তম দিন হিসেবে উল্লেখ করেছে । তিনি বাংলাদেশের সকল মানুষের কাছে দোয়া কামনা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে ইরান সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠবে।