বৃহস্পতিবার, ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

English

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী; সেই নেতা যিনি শেষ পর্যন্ত ইরানের পাশে অটল ছিলেন, ডঃ মোহসেন মোহাজেরনিয়া

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ১৬, ২০২৬ 

news-image

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ আল কোরআনের সূরা আল-ইমরানের ১৪৪ নাম্বার আয়াতে বলেন: “মুহাম্মদ কেবল একজন রসুল; তার আগে অনেক রসুল গত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন, তাহলে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে? আর যারা পেছনে ফিরে যায়, তারা আল্লাহকে কোন ক্ষতি দিতে পারবে না।”

এই আয়াতটি ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের অন্যতম সংবেদনশীল এবং সংকটময় মুহূর্তে উহুদ যুদ্ধে নাজিল হয়েছিল। সেই যুদ্ধে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম গুরুতর আঘাত পান এবং তাঁর শাহাদাতের গুজব মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে হতাশা, উৎকণ্ঠা এবং অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। কিছু সৈন্য সন্দেহে পতিত হয় এবং কেউ কেউ মনে করে, নবীর অনুপস্থিতিতে আর কোনো পথ অবশিষ্ট নেই।

এমন পরিস্থিতিতে, কোরআন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি শিক্ষা দেয়: তোমাদের আনুগত্য কেবল একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়, যদি সেই ব্যক্তি আল্লাহর রাসুলও হন। সত্যিকারের আনুগত্য হলো: ধর্মের মূল, আল্লাহর শাসন, একত্ববাদের পথ এবং ন্যায়ের ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য। নবী মহান, কিন্তু তাঁর মহত্ত্ব তাঁর আল্লাহ প্রদত্ত রেসালাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি নবী পৃথিবী ত্যাগ করেন বা শাহাদাত লাভ করেন, তাহলে ধর্মের মূলনীতি থেমে থাকা উচিত নয় এবং ইসলামি সমাজ পিছিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

অন্যভাবে বললে, এই আয়াতটি কুরআনের অন্যতম রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত; কারণ এটি মানুষের সাথে শাসনব্যবস্থার সম্পর্ক, উম্মতের সাথে নেতার সম্পর্ক, এবং আনুগত্যের সাথে সত্যভিত্তিক ব্যবস্থার সম্পর্ক স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ অবস্থানেও আল্লাহর বিধানভিত্তিক ব্যবস্থার অধীনেই সংজ্ঞায়িত হয়; এমন নয় যে, মূল ব্যবস্থাই ব্যক্তিদের অধীন।

এখান থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে পৌঁছানো যায়: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের আনুগত্য হওয়া উচিত মূল সত্যভিত্তিক ব্যবস্থার প্রতি, কেবল কোনো ব্যক্তি, কোনো পছন্দ বা কোনো রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতি নয়। নবী, ইমাম, ওলী-এ-ফকীহ এবং প্রতিটি মহান আল্লাহভক্ত কর্মধারক—সকলেই সেই মহান সত্যের সেবায় নিয়োজিত, যাকে আমরা তাওহীদের শাসনব্যবস্থা বলে অভিহিত করি।

অতএব, যদি কোনো ব্যক্তি ইন্তেকাল করেন, তবে পথ থেমে যাওয়া উচিত নয়; যদি কোনো নেতা শহীদ হন, তবে আনুগত্যের মূল ভিত্তি ভেঙে পড়া উচিত নয়; যদি কোনো মহান ব্যক্তিত্ব আমাদের মধ্য থেকে চলে যান, তবে মূল পথ ও সত্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।

 

 

এই একই অর্থ রুহুল্লাহ খোমেইনি-এর বক্তব্যেও অত্যন্ত গভীর ও স্পষ্ট ভাষায় পুনরাবৃত্ত হয়েছে; যেখানে তিনি বলেছিলেন: “নিযাম (ব্যবস্থা) রক্ষা করা সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ফরজগুলোর অন্যতম।”

এই উক্তিটি কোনো সাধারণ বাক্য নয়। এর পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক, ফিকহি এবং সভ্যতাগত যুক্তি নিহিত রয়েছে। এর অর্থ হলো, ইসলামী ব্যবস্থা নিজেই সমাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দ্বীনের বাস্তবায়নের সবচেয়ে মৌলিক ক্ষেত্র; আর যদি এই ভিত্তিটি সংরক্ষিত না থাকে, তবে বহু মূল্যবোধ ও বিধানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।

এর ভিত্তিতে, জনগণের সাথে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনক্ষমতার সম্পর্ককে, বিশেষ করে সংকটপূর্ণ ও জটিল পরিস্থিতিতে, আরও গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। মনে হয়, সব সমাজেই মানুষ তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণত তিন ধরনের অনুরাগ ও আনুগত্য পোষণ করতে পারে:

প্রথম ধরন হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্য। এই অবস্থায় মানুষের অনুরাগের কেন্দ্র হলেন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি—তিনি নবী হোন, ইমাম হোন, নেতা হোন কিংবা কোনো বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই হোন না কেন। এই ধরনের আনুগত্য, যদিও নিজের স্থানে স্বাভাবিক এবং এমনকি প্রয়োজনীয়ও, কিন্তু যদি তা চূড়ান্ত স্তরের আনুগত্যে পরিণত হয়, তাহলে তা বিপজ্জনক হতে পারে।

কারণ, যদি সেই ব্যক্তি ইন্তেকাল করেন, শহীদ হন বা অঙ্গন থেকে সরে যান, তাহলে সমাজ থেমে যেতে পারে, বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে, এমনকি বিচ্যুতির শিকারও হতে পারে।

দ্বিতীয় প্রকার হলো, মতাদর্শের প্রতি আনুগত্য, শাসন ব্যবস্থার কোনো নির্দিষ্ট ধারা বা রূপ । অর্থাৎ, কিছু মানুষের জন্য মূল বিষয় হলো যে সরকার বা শাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি তাদের চিন্তাধারা, রাজনৈতিক মত বা দলগত অবস্থানের সঙ্গে মিলবে; যেমন বামপন্থী বা ডানপন্থী, রক্ষণশীল বা সংস্কারপন্থী, র‍্যাডিকাল বা সংরক্ষণবাদী। এই ক্ষেত্রে আমরা একটি ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হই; কারণ যদি তাদের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় না আসে, তাহলে তাদের আনুগত্য মূলত রাষ্ট্রের প্রতি দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়।

দ্বিতীয় ধরন হলো প্রবণতা, দল বা শাসনব্যবস্থার নির্দিষ্ট কোনো রূপের প্রতি আনুগত্য। অর্থাৎ কিছু মানুষের কাছে মূল বিষয়টি হলো—রাষ্ট্র বা শাসনক্ষমতা ঠিক তাদের বৌদ্ধিক, রাজনৈতিক বা দলীয় রুচির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া; যেমন বাম বা ডানপন্থী, কঠোরভাবে বিপ্লবের মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্যশীল বা সংস্কারপন্থী, র‍্যাডিক্যাল বা রক্ষণশীল।

এই ক্ষেত্রে আমরা একটি ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হই; কারণ যদি তাদের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় না আসে, তাহলে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি তাদের মৌলিক আনুগত্যই নড়বড়ে হয়ে যায়।

কিন্তু তৃতীয় ধরন—যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক—হলো মূল ব্যবস্থা, মূল দ্বীন এবং তাওহীদী শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য। এই স্তরে ব্যক্তিরা সম্মানিত, ধারা বা প্রবণতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, মতামতগুলো আলোচনাযোগ্য—কিন্তু এদের কোনোটি-ই মৌলিক নয়। মৌলিকতা সেই সত্যের, যার অধীনে এগুলোর সবকিছুকে সংজ্ঞায়িত হতে হয়।

এটাই সেই যুক্তি, যা এই সম্মানিত আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়; সেই যুক্তি, যা বলে—যদি নবী শহীদ হন, তবুও তোমরা পিছিয়ে যাবে না। কারণ দ্বীনের মূল অবশিষ্ট আছে, পথের মূল অবশিষ্ট আছে, এবং সত্যভিত্তিক ব্যবস্থার মূল অবশিষ্ট আছে।

ইমাম খোমেইনি (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর, জাতির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এবং ঈমানদার ও বিপ্লবী শক্তিসমূহ—ব্যবস্থার যুক্তি সঠিকভাবে অনুধাবন করে—তাদের আনুগত্যকে বিপ্লবের মূল নীতি ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার দিকে স্থানান্তরিত করে।

তবে সেই সময়েও অল্পসংখ্যক কিছু মানুষ ছিল, যারা ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুরাগের স্তরেই থেমে যায় এবং তারা একই গভীরতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে এই পরিবর্তনকে উপলব্ধি করতে পারেনি। যদিও তাদের সংখ্যা খুবই কম ছিল, তবুও এই অল্পসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিই দেখায় যে, ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য যদি মূল ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যের স্থান দখল করে, তবে তা ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আজও আমরা অত্যন্ত সংবেদনশীল এক পরিস্থিতিতে অবস্থান করছি; এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে এই জাতি ও এই বিপ্লবের শত্রুরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে রাজনৈতিক, গণমাধ্যম, নিরাপত্তা ও সামরিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে ময়দানে নেমেছে। আমরা কোনো স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ চলমান রয়েছে; এমন যুদ্ধ, যা কেবল কঠোর সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং উপলব্ধি ও বর্ণনার ক্ষেত্র থেকে শুরু করে অর্থনীতি, মনস্তাত্ত্বিক অভিযান, নিষেধাজ্ঞা, সন্ত্রাস ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত।

এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আমাদের আনুগত্যকে মূল ব্যবস্থা, মূল ইসলাম এবং ঐশী শাসনব্যবস্থার প্রতি কেন্দ্রীভূত করা।

যদি আমরা মূল ব্যবস্থার প্রতি অনুগত থাকি, তাহলে ব্যক্তিদের অনুপস্থিতি—তারা যত বড় ব্যক্তিত্বই হোন না কেন—এই পথকে থামিয়ে দিতে পারবে না।

যদি আমাদের আনুগত্য তাওহীদ, ইসলাম, বিপ্লব এবং সত্যভিত্তিক শাসনের প্রতি হয়, তাহলে বড় ধরনের ঘটনাও এই জাতিকে তার পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।

এই অর্থটি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য ইসলামি বিপ্লবের ইতিহাসের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। এই বিপ্লব গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বহুবার বড় বড় হুমকির মুখে পড়েছে; এমন হুমকি, যা অন্য কোনো দেশের ওপর পড়লে সম্ভবত সেই দেশকে ধ্বংস করে দিত।

আট বছরের আরোপিত যুদ্ধ, ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা, জটিল নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সংগঠিত অস্থিরতা, অভ্যুত্থানচেষ্টা, হত্যাকাণ্ড এবং কঠোর গণমাধ্যম-অভিযান—প্রতিটি একেকটি কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল।

তবুও এই বিপ্লব টিকে থেকেছে, বিকশিত হয়েছে, গভীরভাবে শিকড় গেড়েছে এবং এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে আজ এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

এই টিকে থাকা ও ধারাবাহিকতাকে কেবল বস্তুগত হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। নিঃসন্দেহে ঐশী সাহায্য, আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর বিজয় এই বিপ্লবকে রক্ষায় মৌলিক ভূমিকা রেখেছে।

যখন মরহুম ইমাম (খোমেইনি) বলতেন: “খোররামশহরকে আল্লাহ মুক্ত করেছেন,” তখন এটি কেবল একটি আবেগপূর্ণ অভিব্যক্তি ছিল না; বরং একটি বাস্তব সত্যের প্রকাশ ছিল।

তাওহীদভিত্তিক যুক্তিতে চূড়ান্ত বিজয় মানুষের সংগ্রাম ও আল্লাহর সাহায্যের সমন্বয়ের ফল। সেই একই আল্লাহ, যিনি বদরের যুদ্ধে অল্পসংখ্যক মুসলমানকে সুসজ্জিত শত্রু বাহিনীর ওপর বিজয়ী করেছিলেন; সেই একই আল্লাহ, যিনি তাবাসের ঘটনায় বালুঝড়ের মাধ্যমে শত্রুর পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছিলেন; সেই একই আল্লাহ, যিনি বিভিন্ন সংকটময় পর্যায়ে এই জাতিকে কঠিন পথ অতিক্রম করিয়েছেন—আজও তিনি সক্ষম এবং ভবিষ্যতেও এই বিপ্লবকে রক্ষা করতে সক্ষম ও সহায় হবেন।

আমাদের মহান মরহুম ইমাম বলেছেন, এই বিপ্লব হলো যুহুর বা আগমনের (ইমাম মাহদী আ. এর আগমনের) পূর্বপ্রস্তুতি; এই বিপ্লব অবশ্যই যুহুরে গিয়ে শেষ হতে হবে। আর আমরা আশা করি যে ইমামের এই কবুল হওয়া দোয়া আমাদের ক্ষেত্রেও বাস্তবায়িত হবে।

আজ ইসলামি বিপ্লবের ক্ষমতা ও প্রতাপ বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধময় পরিস্থিতিতে সবাই ইসলামি বিপ্লবের সেই শক্তির কথা বলছে—যা একদিকে ইসরায়েলের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ন্যাটোর মতো শক্তির বিরুদ্ধে, অন্যদিকে মহাশক্তিধর দেশগুলোর বিরুদ্ধে, ন্যাটোর বিরুদ্ধে যা ইস্রায়েলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, অঞ্চলীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে এবং যারা তাদের সমর্থন করে সেই দোসরদের বিরুদ্ধে একাই দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে এবং দৃঢ়ভাবে তার শক্তির পথ অগ্রসর করছে।

কিন্তু আমাদের এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহর সাহায্য শর্তহীন নয়। পবিত্র কুরআনে ব  লেন: যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তবে আল্লাহও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদসমূহকে দৃঢ় ও স্থির রাখবেন।

অর্থাৎ, ঐশী সাহায্য তখনই নাজিল হয় যখন মানুষ ময়দানে সক্রিয় থাকে, অভিজাত ও দায়িত্বশীল শ্রেণি দায়িত্ব পালন করে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সন্দেহে না পড়ে, সমাজ শত্রুর সামনে দুর্বল না হয়, এবং ঈমানদাররা ময়দান থেকে সরে না যায়।

আল্লাহ এমন কোনো উদাসীন ও দায়িত্বহীন জাতিকে বিজয় দান করেন না; বরং তিনি সেই জনগণকেই সাহায্য করেন, যারা নিজেরাই যারা নিজেই উদ্যমী, প্রতিরোধী, ধৈর্যশীল, প্রজ্ঞাবান ও দৃঢ়সংকল্পী।

এই বছরগুলোতে আমরা বারবার এই ঐশী সাহায্যের প্রভাব দেখেছি। তাবাসের ঘটনায়, নোজেহ অভ্যুত্থানচেষ্টায়, পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধে, নিরাপত্তা সংকট পার করার সময়, আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় এবং অভ্যন্তরীণ ফিতনা ও অস্থিরতার সময়ে মূল ব্যবস্থাকে রক্ষার ক্ষেত্রে আল্লাহর শক্তির হাত স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

এটাই সেই সত্য, যা ইমাম খোমেইনি এবং তাঁর পরবর্তীকালে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বহুবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন: ইসলামি বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি একটি ঐশী আমানত, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নিয়ামত এবং একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব, যা সংরক্ষণ করতে হবে।

অতএব, ইসলামের সংরক্ষণ নির্ভর করছে দেশের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর। আলহামদুলিল্লাহ, দেশের সর্বত্র জনগণ ইসলাম রক্ষা, বিপ্লবকে রক্ষা এবং নেতৃত্বের প্রতি ও সর্বোচ্চ নেতার পরবর্তী নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য রাস্তায় উপস্থিত হচ্ছে, ময়দানে রয়েছে এবং প্রতিশোধের স্লোগান দিচ্ছে। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ।

আল্লাহ এই পরিস্থিতিতে ঘুমন্ত ঈমানকে এবং রাজনৈতিক ভাষায় যাকে “ধূসর ঈমান” বলা হয়, সেই ঈমানকেও আজ ময়দানে নিয়ে এসেছেন। পুরো জাতি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে।অনেক মানুষ, যারা খুব বেশি বিপ্লবী ছিলেন না এবং নেতৃত্বের আদর্শের সাথেও খুব বেশি সহমর্মী ছিলেন না, আজ তাঁরা কাঁদছেন। আজ তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে সর্বোচ্চ নেতা দেশের সবচেয়ে বিপ্লবী ও সবচেয়ে দেশভক্ত ব্যক্তি হিসেবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ময়দানে ছিলেন; অনেকদিন ধরে প্রচার করা হয়েছিল যে নেতা আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গিয়েছেন বা রাশিয়ায় পলায়ন করেছেন, অথচ তিনি তাঁর অফিসেই শহীদ হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের পাশে ছিলেন।

ঐশী সাহায্য এবং আল্লাহর শক্তিশালী হাত এই বিপ্লবের পেছনে রয়েছে এবং পরিস্থিতিকে এমনভাবে তৈরি করছে যাতে দেশ এগিয়ে যেতে পারে।

আলি খামেনেয়ী, যিনি বিপ্লবের শহীদদের ইমাম হিসেবে উল্লেখিত, ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রচেষ্টা, সংগ্রাম, জিহাদ, কারাবাস এবং বিপ্লবের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে একটি আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন—তিনি শহীদ হতে চেয়েছিলেন এবং এই নিয়ে চিন্তিত ছিলেন যে, যেন তিনি শহীদের কাফেলা থেকে পিছিয়ে না পড়েন এবং দুর্ঘটনা বা স্বাভাবিক মৃত্যুর মাধ্যমে দুনিয়া থেকে বিদায় না নেন।

অবশেষে তিনি তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষায় পৌঁছেছেন। যদিও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, যদিও বিপ্লব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও আল্লাহর ইচ্ছা এই যে, তিনি এই বিপ্লবকে ইমাম ও নেতাবিহীন অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না। ঠিক যেমন আমরা সবাই উদ্বিগ্ন ছিলাম যে, রুহুল্লাহ খোমেইনি দুনিয়া থেকে চলে গেলে এই বিপ্লবের কী হবে।

কী ঘটবে? বিপ্লব তো ইমামের পরও টিকে ছিল। ইমাম-পরবর্তী “শহীদ নেতা” ৩৭ বছর ধরে এই বিপ্লবকে ভয়াবহ ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে পরিচালিত করেছেন এবং এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন, যেখানে আজ আর কেউ সহজে এই বিপ্লবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করে না। আজ ইসরায়েল একা এই বিপ্লবের দিকে আঘাত করার সাহস পায় না; বরং তাকে সাথে নিতে হয় যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং ইউরোপকে।

কারণ বিপ্লব শক্তিশালী ও দৃঢ় হয়ে উঠেছে—এটা ইমাম, নেতা এবং শহীদদের বরকতের ফল। ইনশাআল্লাহ, আমরা যদি এই যুদ্ধ থেকে বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে আসতে পারি, তাহলে আমরা আরও শক্তিশালী হব এবং দেশের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা অবশ্যই আল্লাহর ইচ্ছায় নিশ্চিতভাবে আরও সুদৃঢ় হবে; অর্থনৈতিক অবস্থাও বর্তমানের চেয়ে ভালো ভবিষ্যতের দিকে যাবে।

অতএব বলা যায়, এই বিপ্লব স্থায়ী এবং ইনশাআল্লাহ এটি শেষ পর্যন্ত তার প্রকৃত অধিকারীর হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে।

সুত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি