কাওসারে আপনাকে স্বাগতম Archive » 2013 » মে » 29

সংবাদ বিচিত্রা

‘দুঃসাহস দেখালে ইসরাইলকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হবে’ -রাহবার

1-rahbarইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ্ ওয্মা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল দুঃসাহস দেখালে তেলআবিব ও হাইফাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে।

ইরানের মাশহাদ শহরে ইমাম রেযা (আ.)-এর মাযার প্রাঙ্গনে গত ২১ মার্চ এক বিশাল সমাবেশে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। সর্বোচ্চ নেতা বলেন, যায়নবাদী নেতারা মাঝে মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু তারা এটাও জানে যে, ইরানের বিষয়ে ভুল করলে তেলআবিব ও হাইফাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে।

ইরানের সঙ্গে আলোচনার মার্কিন প্রস্তাব সম্পর্কে তিনি বলেন, আমেরিকা যদি সংলাপের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে বিরোধ মেটানোর বিষয়ে আন্তরিক হয়, তাহলে তাকে প্রথমেই ইরানী জনগণের সঙ্গে শত্রুতা পরিহার করতে হবে এবং সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। আমেরিকা নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দেয়ার জন্যই সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, আমরা সংলাপের বিরোধী নই। আবার আমেরিকার নীতির বিষয়েও উদ্বিগ্ন নই। কারণ, আমেরিকা এ পর্যন্ত ইরানী জাতির বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে নি; ভবিষ্যতেও পারবে না।

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর বক্তব্যে বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড়

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ ওয্মা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী গত ২১ মার্চ পবিত্র মাশহাদ শহরে যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদ ও প্রচারমাধ্যম তার নানা অংশ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে। এগুলোর মধ্যে ছিল বার্তাসংস্থা রয়টার্স, এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), ফক্স নিউজ, সানা, আলমানার টেলিভিশন, সিসি টিভি, দৈনিক আল-কুদস আল-‘আরাবিয়া ও আল-মিয়াদিন টিভির মতো বিভিন্ন গণমাধ্যম।

বার্তাসংস্থা রয়টার্স ও ফক্স নিউজ ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এ বক্তব্য উদ্ধৃত করে, “যায়নবাদী নেতারা মাঝে মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু তারা এটাও জানে যে, ইরানের বিষয়ে ক্ষুদ্রতম ভুল করলে ইসলামী ইরান তেলআবিব ও হাইফাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে।” তিনি এ প্রসঙ্গে আরো বলেছিলেন, ইসরাইল ইরানের বড় ধরনের শত্রু হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এমন সময় এসব মন্তব্য করেন যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্প্রতি তেল আবিব সফরের সময় ইসরাইলকে শর্তহীন সামরিক সাহায্য দেয়ার এবং তেল আবিবের নিরাপত্তাকে আমেরিকারই নিরাপত্তা হিসেবে গুরুত্ব দেয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

ইরানের অকল্যাণকামীরা যে নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি দিয়ে দেশটির অগ্রযাত্রা রুখতে পারছে না আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ীর সে বক্তব্যও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে কোনো কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদ ও গণমাধ্যম।

ইরানী জাতি নিজের মেধার ওপর নির্ভর করে ও উপনিবেশবাদীদের ওপর নির্ভরশীলতা পরিহার করে যেসব সাফল্য অর্জন করেছে তা বিশ্বের অন্যান্য জাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারে বলে অনেক সংবাদ বিশ্লেষক মনে করেন।

চীনের সিসি টিভি বলে, আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মার্কিন প্রস্তাবকে প্রতারণার কৌশল হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, আমেরিকা এর মাধ্যমে ইরানের জনগণকে ধোঁকা দিয়ে তাদের দেশের ওপর নিজের ইচ্ছেগুলো চাপিয়ে দিতে চাইছে। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, আমেরিকা যদি সংলাপের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে বিরোধ মেটানোর বিষয়ে আন্তরিক হয়, তাহলে তাকে প্রথমেই ইরানী জনগণের সঙ্গে শত্রুতা পরিহার করতে হবে এবং সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, আমরা সংলাপের বিরোধী নই। আবার আমেরিকার নীতির বিষয়েও উদ্বিগ্ন নই। কারণ, আমেরিকা এ পর্যন্ত ইরানী জাতির বিরুদ্ধে কিছু করতে পারেনি। ভবিষ্যতেও পারবে না।

বার্তাসংস্থা এপি বলে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মার্কিন সরকারকেই তাঁর দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ইরানী জাতিকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ও তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মূল হোতা কে, তাহলে তারা সবাই একবাক্যে বলবে, ‘মার্কিন সরকার’।

জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলাই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য- কাযেম সিদ্দিকী

 3-Qazem siddiqiগত ২৯ মার্চ তেহরানের জুম্‘আ নামাযের খোতবায় হুজ্জাতুল ইসলাম কাযেম সিদ্দিকী বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের একপেশে নিষেধাজ্ঞা উত্তেজনা সৃষ্টি এবং ইরানের জনগণ ও সরকারের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্র মাত্র।

তিনি বলেন, বাহ্যত পরমাণু ইস্যুকে নিষেধাজ্ঞার জন্য অজুহাত করা হলেও ইসলামী ইরানের শত্রুদের আসল উদ্দেশ্য হল ইরানের জনগণকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া। কিন্তু তারা যত বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে ইরানের জনগণ তত বেশি সরকারকে সহযোগিতা করবে।

কাযেম সিদ্দিকী আরো বলেন, নিষেধাজ্ঞা তীব্রতর করার উদ্দেশ্য হল ইরানের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়া। কিন্তু ইরানের জনগণ অতীতের মতোই নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পশ্চিমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে নস্যাৎ করে দেবে। কোনো রকম উত্তেজনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি আশা করেন।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইরান সামরিক ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে এবং এ ক্ষেত্রে ইরান কোনোভাবেই পিছপা হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

‘কেবল মার্কিন নারী-শিশু হত্যাকে খারাপ ভাবা ঠিক নয়’- আহমাদ খাতামি

picuture no-4-Ahmad khatami‘ইরান বিশ্বের যে কোনো দেশে নিরপরাধ মানুষ হত্যার নিন্দা জানায়, তা আমেরিকা, সিরিয়া, ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা অন্য যে কোনো দেশেরই হোক না কেন।’ গত ১৯ এপ্রিল তেহরানের জুমা নামাজের খোতবায় এ মন্তব্য করেন ইরানের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও প্রভাবশালী নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আহমাদ খাতামি। তিনি বলেন, ইরানের এ নীতির ভিত্তি হল মানুষের প্রতি সম্মান। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের সব মানুষই সম্মান পাওয়ার যোগ্য, তাই তাদের সবার জীবন রক্ষা করতে হবে।

খাতামি বলেন, পশ্চিমাদের অনুচররা সিরিয়ার যায়নাবিয়ায় তথা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বোনের মাজার সংলগ্ন এলাকায় ঘরে ঢুকে সন্তানদের সামনে পিতাকে হত্যা করছে, পুত্র ও কন্যাকে হত্যা করছে এবং এমনকি তিন বছরের শিশুপুত্রকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করছে। আর এতেই স্পষ্ট, আমেরিকা ও ইউরোপ সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকারের স্লোগানগুলোকে কেবল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপিত

গত ১২ ফারভারদীন (১ এপ্রিল) ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ৩৪তম বিজয় বার্ষিকীতে প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করেছে গোটা জাতি। ৩৪ বছর আগে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে মার্কিন মদদপুষ্ট পাহলভী সরকারের পতনের পর পঞ্চাশ দিনেরও কম সময়ের ব্যবধানে ৩০ ও ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত গণভোটে ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে ব্যাপকভাবে ভোট দেয় ইরানের বিপ্লবী জনগণ। এতে ৯৮.২ শতাংশ মানুষ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করে। পরদিন ইরানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আড়াই হাজার বছরের রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান হয়, প্রতিষ্ঠিত হয় জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান।

এর পর থেকে ১২ ফারভারদীন (পয়লা এপ্রিল) ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয়ে আসছে।

 আল-আকসা মসজিদে ইসরাইলী হামলায় ইরানের নিন্দা

5-Al-Aqsaমুসলমানদের প্রথম কিবলা আল্-আকসা মসজিদে মুসল্লীদের ওপর ইসরাইলী বাহিনীর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। ৯ মার্চ ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রামীন মেহমানপারাস্ত্ এক বিবৃতিতে এ ধরনের বর্বর হামলার বিষয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে সব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আল-আকসা মসজিদে হামলার মাধ্যমে ইসলাম অবমাননা করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

মেহমানপারাস্ত্ আরো বলেন, এ ধরনের তৎপরতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমাজ জোরালো কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালে যায়নবাদী ইসরাইল এ ধরনের পাশবিকতা অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত হবে। দখলদার ইসরাইলী বাহিনী গত ৮ মার্চ মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদে মুসল্লীদের ওপর বর্বর হামলা চালায়। পূর্ব বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থিত এ মসজিদটি দীর্ঘ দিন ধরে দখল করে রেখেছে ইসরাইল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, জুম্‘আর নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলের বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ মসজিদে ঢুকে মুসল্লীদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় মুসল্লীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ও গ্রেনেড ছোঁড়া হয়। হামলায় বেশ কয়েক জন মুসল্লী আহত হন।

 ইরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখায় চীনের বিরোধিতা

 6-Chinaইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর মার্কিন নেতৃত্বাধীন একতরফা নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার বিরোধিতা করেছে চীন। জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের স্থায়ী উপপ্রতিনিধি গত ৭ মার্চ বলেন, বেইজিং সব সময় শক্তি প্রয়োগ কিংবা শক্তি প্রয়োগের হুমকির বিরুদ্ধে। এছাড়া আমরা ইরানের ওপর বাড়তি চাপ বা নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষেও নই।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে চীনা প্রতিনিধি ওয়াং মিন এসব কথা বলেন।  তিনি বলেন, আমরা কোনো দেশের বিরুদ্ধে একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপের কঠোর বিরোধী। একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পরে তার মাত্রা বাড়ানো হয়েছে এবং এতে অন্য অনেক দেশের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থা কূটনৈতিক উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করারও আহ্বান জানান ওয়াং মিন।

ইরান-বিরোধী নিষেধাজ্ঞা কাজ করছে না : মার্কিন কমান্ডার জেনারেল

 7-Markin commandarইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কাজ করছে না বলে মন্তব্য করেছেন আমেরিকার এক সামরিক কমান্ডার। মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল জেম্‌স ম্যাটিস্ গত ৫ মার্চ আমেরিকার সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস্ কমিটির শুনানিতে এ কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি রিপাবলিকান দলের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামকে বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচিও অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পরমাণু ইস্যু নিয়ে সৃষ্ট সঙ্কটের কূটনৈতিক সমাধান চায় বলে ছয় জাতিগোষ্ঠী নতুন বিবৃতি দেয়ার দিনই জেনারেল ম্যাটিস্ এসব কথা বললেন।

উল্লেখ্য, ছয় জাতিগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দেয়া এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের পরমাণু ইস্যুর সমাধানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতিই সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে।

আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানী হচ্ছে ছয় জাতিগোষ্ঠীর সদস্য।

নৈরাজ্য সৃষ্টির ষড়যন্ত্র : ইরানে বিবিসি’র তথ্যসন্ত্রাসীদের গ্রেফতার

8-BBCইরানের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশটিতে নতুন করে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য সক্রিয় তথ্যসন্ত্রাসীদের বেশ কয়েকটি নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়।  এ নেটওয়ার্কগুলো মূলত বিবিসি’র হয়ে কাজ করছিল। আগামী ১৪ জুন ইরানে প্রেসিডেন্ট ও পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।

বিবিসি’র অনুচর হিসেবে সক্রিয় এসব নেটওয়ার্কের তৎপরতা গত এক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করছিল ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়। বিচার বিভাগের অনুমতি নিয়ে বিবিসি-কেন্দ্রিক নেটওয়ার্কগুলোর কয়েক ডজন অনুচরকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছেন ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী হায়দার মোসলেহী।

২০০৯ সালের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এ তথ্যসন্ত্রাসীরা আবারও ইরানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করেছে বলে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছে। ইরানে ২০০৯ সালের নির্বাচনপরবর্তী অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টিতে গুজবসহ নানা প্রচারণা ছড়িয়ে দেয়ার মতো ব্যাপক ধ্বংসাত্মক ভূমিকা রেখেছিল বিবিসি সহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম। ঐ নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে বিবিসি ফারসি ভাষায় একটি বিশেষ টেলিভিশন-অনুষ্ঠান চালু করেছিল।

ইরানের ইসলামী সরকারের ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য ও নানা ধরনের গুজব প্রচারের জন্য বিবিসি’র তথ্যসন্ত্রাসীরা ছবি ও ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করছিল বলে ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

আটলান্টিক মহাসাগরে উপস্থিত হবে ইরানী নৌবাহিনী

 10-Irani navyঅচিরেই আটলান্টিক মহাসাগরে উপস্থিত হবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নৌবাহিনী। গত ১৫ মার্চ এ কথা জানান ইরানের নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল হাবিবুল্লাহ সাইয়ারী।

ইরানী নৌবাহিনীর প্রধান বলেন, বিদায়ী বছর প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে ইরানী নৌবাহিনীর উপস্থিতি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি আরো জানান, এবারই প্রথম ইরানের নৌবাহিনী প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবরেখা পার হয়েছে।

‘পরমাণু অস্ত্রের একক ব্যবহারকারী আমেরিকা, পরীক্ষা করেছে ১০০০ বার’

picture no-13-Ali Asgarআন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএই-তে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলী আসগর সুলতানিয়েহ গত ২৩ এপ্রিল অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ২০১৫ সালে অনুষ্ঠেয় পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি বা এনপিটি’র পর্যালোচনা সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির সভায় বলেছেন,  আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে হাজার হাজার পরমাণু ওয়ারহেড রয়েছে তা মানবতার জন্য সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করেছে।

২০১২ সালে আমেরিকার নেভাদায় যে পরমাণু পরীক্ষা চালানো হয়েছে তার তীব্র নিন্দা করে সুলতানিয়েহ বলেন, এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন করেছে এবং এতে সারা বিশ্বে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্বে নতুন করে পরমাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।  তিনি আরো বলেন, জাতিসংঘের হিসাব মতে- আমেরিকা এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার বার পরমাণু পরীক্ষা চালিয়েছে এবং আমেরিকাই বিশ্বে একমাত্র পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারকারী দেশ। এছাড়া, ব্রিটেনের পরমাণু অস্ত্র আধুনিকীকরণ কর্মসূচি ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের কাছে জার্মানির পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন বিক্রির কথা উল্লেখ করে তারও বিরোধিতা করেন আলী আসগর সুলতানিয়েহ।

ইরান-সিরিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে সিএনএন : আম্বার লিয়ন

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন। গত ১ এপ্রিল এ অভিযোগ করেন সিএনএন টেলিভিশন চ্যানেলেরই সাবেক অনুসন্ধানী রিপোর্টার আম্বার লিয়ন।

আম্বার লিয়ন ব্যক্তিগতভাবে খুবই স্পষ্টবাদী বলে পরিচিত। তিনি বলেন, ইরান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর কাজে সিএনএন-কে ব্যবহার করা হচ্ছে।

আম্বার লিয়নের উদ্ধৃতি দিয়ে সিরীয় বার্তাসংস্থা সানা জানিয়েছে, তিনি যখন সিএনএন-এ কাজ করতেন তখন মিথ্যা সংবাদ তৈরির জন্য বহু নির্দেশনা পেয়েছিলেন। এ ছাড়া, ইরান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানোর জন্য জনমত পক্ষে রাখতে অনেক সময় মার্কিন প্রশাসন তাঁকে খবরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দিতে বলেছে।

লিয়ন জানান, মূলধারার মার্কিন গণমাধ্যম ইরানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন চালানোর জন্য সরকার প্রয়োজনীয় জনসমর্থন পায়। তিনি জানান, ২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন সরকার যে ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিল, ইরান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে সেই একই রকম প্রেক্ষাপট তৈরি করা হচ্ছে। আম্বার লিয়ন আরো জানান, এসব মিথ্যা প্রচারণার জন্য সিএনএন মার্কিন প্রশাসন এবং আরো কয়েকটি দেশের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়েছে।

সিএনএন সহ মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর এ আচরণকে তিনি ‘মারাত্মক’ বলে অভিহিত করেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এসব গণমাধ্যম মার্কিন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জনগণকে সঠিক তথ্য দিচ্ছে না।

ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা ইরানের সেনাবাহিনী দিবসের প্রধান বার্তা

 picture no-14-Army১৮ এপ্রিল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে সেনাবাহিনী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদীনেজাদ তাঁর দেশের সেনাবাহিনীকে বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনীর জন্য আদর্শ বা মডেল হিসেবে অভিহিত করেন। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি ঈমান ও আত্মনির্ভরশীলতাকে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর ক্ষমতার প্রধান দুটি উৎস হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি আরো বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নিজস্ব ক্ষমতা ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

‘ইরানের সামরিক শক্তির ভয়েই আমেরিকা হামলা করবে না’

picture no-12-Armyইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সামরিক শক্তির ভয়েই আমেরিকা তেহরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সাহস করবে না। ইরানের সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হাসান ফিরোজাবাদি গত ১৮ এপ্রিল ইরানের ‘জাতীয় সেনাবাহিনী দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার অবকাশে এ কথা বলেন। ইরানের বিরুদ্ধে ইহুদিবাদী ইসরাইল ও আমেরিকার হামলার হুমকিকে তিনি নিতান্তই দম্ভোক্তি বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আমাদের সামরিক বাহিনীর শক্তি ও আস্থা নির্মাণের কাজ শেষ করেছি এবং এ পর্যায়ে আমরা শুধু ইরান নয়, বরং এ অঞ্চলকে রক্ষা করতে পারব।’

তিনটি নতুন সামরিক সরঞ্জাম উদ্বোধন করেছে ইরান

 picuture no-15-Missileইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পদাতিক বাহিনী তিনটি নতুন সামরিক সরঞ্জাম উদ্বোধন করেছে। ইরানের জাতীয় সেনাবাহিনী দিবস উপলক্ষে নতুন এ অর্জনগুলোর উদ্বোধন করা হয়। সেনাবাহিনীর নতুন এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ফাদাক ওয়ারলেস রেডিও, সোহেল মিসাইল লাঞ্চার ও টি-৭২ ট্যাংক সিমুলেটর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইরানের পদাতিক বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ রেজা পুরদাস্তান।

তারবিহীন ফাদাক রেডিওটি দু’ধরনের ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে। এর বিশেষ ধরনের অ্যান্টেনা ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে বা চার দিক থেকে একই সময় তথ্য আদান প্রদানে সক্ষম। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইলেক্ট্রনিক জ্যামিং যন্ত্র দিয়ে এ রেডিওকে জ্যাম করা যাবে না। পাশাপাশি খুবই অল্প ব্যাটারিতে রেডিওটি চালানো যায়। এমনকি নিজের সীমানার মধ্যে যোগাযোগকারী অন্যান্য যন্ত্রের অবস্থা নির্ণয়ে সক্ষম রেডিওটি। টি-৭২ ট্যাংক সিমুলেটরের সাহায্যে দিন ও রাতে যে কোন যুদ্ধ পরিস্থিতির কৃত্রিম পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে এক সঙ্গে তিন জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া যায়।

ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় নওরোয উদযাপিত

গত ২০ মার্চ ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নতুন ইরানী বছরকে বরণ করে নিয়েছে ইরানী জনগণ। সেই সঙ্গে নতুন বছরের শুরুতে তারা পশ্চিমা অবরোধ মোকাবেলায় দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

ইরানী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নওরোয বা বসন্ত দিয়ে শুরু হয় ইরানের নতুন বছর।  বছরের প্রথম মাস ফারভারদীন নামে পরিচিত। সাধারণত মার্চের ২১ তারিখ ইরানী বছর শুরু হয়ে থাকে।

নওরোয উপলক্ষে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয় ইরানে। এ সময় ইরানীরা বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করেন, দূর-দূরান্তে বেড়ানোর জন্য ছুটে যান। নওরোয উৎসব বিশ্বের প্রাচীন উৎসবগুলোর একটি। তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এ উৎসব পালন করে আসছে ইরানসহ আশপাশের কয়েকটি দেশের মানুষ।

২০১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কো নওরোয উৎসবকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে।  আমেরিকা, কানাডা, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর-পশ্চিম চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নওরোয উদযাপিত হয়ে থাকে। এদিকে নওরোয উপলক্ষে ইরানী জাতির শুভকামনা করে বক্তব্য দেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এ শুভেচ্ছা জানান তিনি।

নওরোয উপলক্ষে ড. আহমাদীনেজাদের তুর্কমেনিস্তান সফর

picture no-17-Nowruz-Festival-Ashgabatতুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট গুরবানগুলি বারদিমোহামেদো এর আহ্বানে এ বছরের আন্তর্জাতিক নওরোয উৎসবে যোগদানের জন্য ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদীনেজাদ গত ১৯ মার্চ তুর্কমেনিস্তান সফর করেন। তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তানসহ ১০টি দেশের নেতৃবৃন্দ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, ১৯৯২ সাল থেকে তুর্কমেনিস্তানের জনগণ নওরোয উৎসব পালন করে আসছে।

অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বন্ধের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ইরান

গত ১৪ মার্চ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহ্মাদীনেজাদ বলেন, ইরান ভবিষ্যতে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বন্ধের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

তিনি বলেন, ইরান এমন একটি অবস্থানে পৌঁছতে চায় যেখান থেকে আর তেল রপ্তানির প্রয়োজন হবে না। এ জন্যই দেশের ভেতরে তেল শোধনাগারের সংখ্যা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হবে এবং তা দেশের জন্য অনেক বেশি উপকারী ও লাভজনক হয়ে উঠবে।

মারকাযী (মধ্যাঞ্চলীয়) প্রদেশের শাহযান্দ ইমাম খোমেইনী তেল শোধনাগারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রেসিডেন্ট আহ্মাদীনেজাদ। এটি হচ্ছে ইরানের সবচেয়ে বড় পেট্রোল উৎপাদন স্থাপনা। তিনি জানান, ইরান তেল শোধনাগার প্রতিষ্ঠায় স্বয়ংস¤পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং এ খাতে বিদেশী সহযোগিতার প্রয়োজন হবে না।

বৃহত্তম গ্যাসোলিন্ উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধন

গত ১৪ মার্চ ইরানের বৃহত্তম গ্যাসোলিন উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদীনেজাদ। ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শাহযান্দ্ শহরের কাছে অবস্থিত এ স্থাপনায় দৈনিক এক কোটি ৬০ লাখ লিটার পেট্রোল উৎপাদন করা যাবে।  এছাড়া শাহযান্দ ইমাম খোমেইনী শোধনাগার চালুর পর প্রিমিয়াম পেট্রোলের উৎপাদন প্রতিদিন ১২ লাখ লিটার থেকে ৩২ লাখ লিটারে পৌঁছবে বলেও জানানো হয়েছে। তেল শোধনাগার চালুর পর তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি’র উৎপাদন ৫০০ টন থেকে বেড়ে ২০০০ টনে দাঁড়াবে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরানের বিশেষজ্ঞরাই প্রথমবারের মতো ডিজেল থেকে উন্নতমানের অকটেন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

ইরানের এ তেলক্ষেত্র থেকে পেট্রোল, তরল গ্যাস, প্রোপেলিন, কেরোসিন, জ্বালানি তেল ও আলকাতরা উৎপাদন করা হয়। তেল শোধনাগারটি সংস্কারে ৩৩০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে ন্যাশনাল ইরানীয়ান অয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কন্সট্রাকশন কো¤পানি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইরানের কাছে পেট্রোল বিক্রি বন্ধ করে দেয়ার পর উন্নতমানের পেট্রোল উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে ইরান।

‘জামারান-২’ ডেস্ট্রয়ার উদ্বোধন

 13-Zamaranগত ১৭ মার্চ ইরানে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘জামারান-২’ ডেস্ট্রয়ারের উদ্বোধন করেন প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদীনেজাদ। কাস্পিয়ান সাগরের ‘বন্দর আঞ্জালি’তে যুদ্ধজাহাজটি নামানো হয়। ইরানের বিশেষজ্ঞরাই ডেস্ট্রয়ারটির ডিজাইন থেকে শুরু করে নির্মাণ সংক্রান্ত সব পর্যায় দেশে সম্পন্ন করেন। এটি নির্মাণে ছয় বছর সময় ব্যয় হয়েছে।

১৪২০ টনের এ ডেস্ট্রয়ারটি ২০ হাজার অশ্বশক্তিসম্পন্ন। ঘণ্টায় এটি ৩০ নটিক্যাল মাইল বেগে ছুটতে পারে। জামারান-২ ডেস্ট্রয়ারটি হেলিকপ্টার বহন করতে পারে। সেই সঙ্গে এতে রয়েছে ভূমি থেকে ভূমি ও ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক আর্টিলারি ও টর্পেডো। এছাড়াও জামারান-২ ডেস্ট্রয়ারটি ‘ইলেক্ট্রনিক ওয়ার সিস্টেমে’ সুসজ্জিত। এটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নৌ শক্তির এক বড় নিদর্শন এবং কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী দেশগুলোকে এ ডেস্ট্রয়ার শান্তির বার্তা পৌঁছে দেয়।

জামারান-২ এর চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই দেশের নৌবাহিনীর মূল বহরের সঙ্গে যুক্ত হবে বলে জানানো হয়।

ইরানের বিমান বহরে যুক্ত হল সশস্ত্র জেটরেঞ্জার হেলিকপ্টার

 15-Helicopterগত ১৭ মার্চ ইরানের সেনাবাহিনীর এয়ারবোর্ন ডিভিশনে যুক্ত হল নতুন জঙ্গী হেলিকপ্টার ‘বেল-২০৬ জেটরেঞ্জার’। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে এক সামরিক মহড়ায় এ হেলিকপ্টারগুলোর পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

সেনাবাহিনীর এয়ারবোর্ন ঘাঁটির কমান্ডার কর্নেল ইউসুফ কোরবানী এয়ারবোর্ন ঘাঁটির বিমান বহরের সর্বশেষ অর্জনের কথা উল্লেখ করে বলেন, জেটরেঞ্জার হেলিকপ্টারগুলো গোয়েন্দা নযরদারীর কাজে ব্যবহৃত হলেও এখন আমরা এগুলোকে সশস্ত্র করে জঙ্গী কপ্টারে পরিণত করতে পারি।

জেটরেঞ্জারগুলোতে সমরাস্ত্র সংযোজন করায় এগুলো এখন যুদ্ধক্ষেত্রে একই সঙ্গে নযরদারী ও আক্রমণের কাজ করতে পারবে বলে জানান কমান্ডার কোরবানী। এজন্য তিনি সামরিক বিশেষজ্ঞদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কেরমান প্রদেশের এয়ারবোর্ন ঘাঁটিটি অতীতে মার্কিন সেনাদের তত্ত্বাবধানে ছিল। ইসলামী বিপ্লবের পর মার্কিন সেনারা ঘাঁটির সব যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ফেলে চলে যায়।

৩৩ বছর পর আবার চালু হল মিসর-ইরান সরাসরি ফ্লাইট

ইরান ও মিসরের মধ্যে যাত্রীবাহী বিমানের সরাসরি ফ্লাইট আবারও চালু হয়েছে ৩৩ বছর পর। গত ৩০ মার্চ মিসরের এয়ার মেমফিসের একটি যাত্রীবাহী বিমান কায়রো থেকে তেহরানে পৌঁছে। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর এটাই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি বিমান যোগাযোগ।

এদিকে ইরানী পর্যটকবাহী একটি বিমানও মিসরের আসোয়ান শহরে অবতরণ করে। মিসরের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী ওয়ায়েল মা’দাওয়ী বলেন, ইরান-মিসরের এ ফ্লাইটগুলোর মাধ্যমে মিসরের দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি ঐতিহাসিক শহর আসোয়ান, লুকসোর ও আবু সিম্বলের সাথে ইরানের সংযোগ সাধিত হবে।

এছাড়া মিসর ও ইরান সম্প্রতি পর্যটন খাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের জন্য একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে।

ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)-এর ১২তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর মাহমুদ আহ্মাদীনেজাদ দুই মাস আগে মিশর সফর করেছিলেন। ইসলামী বিপ্লবের পর এটাই ছিল দেশটিতে ইরানের কোনো প্রেসিডেন্টের আনুষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় সফর। মিসরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসী-ও গত বছর গ্রীষ্মকালে তেহরানে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম্)-এর সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। মিসরে মুবারক সরকারের পতনের পর থেকে তেহরান-কায়রো সম্পর্ক ক্রমেই জোরদার হচ্ছে।

ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপ লাইনে যুক্ত হতে চায় ভারত

গত ২৭শে মার্চ ভারতের তেল ও গ্যাস মন্ত্রী ভিরাপ্পা মৌলি বলেন যে, তাঁর দেশ ইরান-পাকিস্তান পাইপ লাইনের মাধ্যমে ইরান থেকে গ্যাস আমদানির জন্য তেহরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছে। ‘পিস পাইপ লাইন’ নামক এ প্রকল্পে যোগ দেয়া ভারতের জন্য জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইরান এ পাইপ লাইনের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানে ২৫ বছর গ্যাস রপ্তানি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইরান থেকে গ্যাস আমদানি ভারত ও পাকিস্তানের জন্য খুবই লাভজনক বিবেচিত হচ্ছে।

দুই হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পাইপ লাইনের পাকিস্তান অংশের কাজ এর মধ্যেই শুরু হয়েছে। ইরান থেকে পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে এ পাইপ লাইন ভারত পর্যন্ত নেয়ার প্রকল্পটি চূড়ান্ত করার জন্য অতীতেও বেশ কয়েক বার আলোচনা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছতে পারেন নি ইরানী ও ভারতীয় কর্মকর্তারা।

ত্রিপক্ষীয় (ইরান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপ লাইন) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শুরু হলে ভারত ও পাকিস্তান প্রতিদিন ইরান থেকে সরাসরি ১৫ কোটি ঘন মিটার গ্যাস আমদানি করতে সক্ষম হবে।  এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান দৈনিক ৯ কোটি ঘন মিটার ও ভারত প্রতিদিন ৬ কোটি ঘনমিটার গ্যাস আমদানি করবে বলে কথা রয়েছে।

প্রায় ২২ বছর আগে এ প্রকল্পের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল এবং দশ বছর আগে এ নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়। বর্তমানে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৭ হাজার কোটি ডলার ব্যয় হবে বলে মনে করা হচ্ছে।


নওরোয উপলক্ষে রাহবার আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী

নতুন বছরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ইরানী জাতির নযিরবিহীন সাফল্যের আশাবাদ

Leader-of-iranইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ ওযমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ইরানী জনগণের জিহাদসুলভ সক্রিয় ভূমিকার ফলে চলতি নতুন ইরানী বছর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নযিরবিহীন সাফল্য নিয়ে আসবে। তিনি গত ২১ মার্চ (২০১৩) ইরানী বর্ষপঞ্জির ১৩৯২ সালের শুভ সূচনা-নওরোয-উপলক্ষে প্রদত্ত এক ভাষণে এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

গত ২০ মার্চ তারিখে সমাপ্ত ইরানী বর্ষপঞ্জির ১৩৯১ সালে ইরানী জনগণ বিশেষ করে বিশ্ববলদর্পী শক্তির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে যে ব্যাপক উন্নতি-অগ্রগতি ও সাফল্যের অধিকারী হয়েছে তার ভিত্তিতে হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বর্তমান ইরানী বছরটিতে এ ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হবে। এ প্রত্যাশায় তিনি ১৩৯২ ইরানী সালকে ‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বীরত্বগাথার বছর’ নামকরণ করেন।

নওরোয উপলক্ষে প্রদত্ত ইসলামী বিপ্লবের রাহবার হযরত আয়াতুল্লাহ্ ওযমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ নিচে দেয়া হলো :

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম্।

 Nowroj

প্রিয় দেশবাসী ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী ইরানীদের প্রতি এবং নওরোয পালনকারী সকল জাতির প্রতি, বিশেষ করে প্রিয় আত্মত্যাগ স্বীকারকারী ব্যক্তিগণ, শহীদগণের পরিবারসমূহের সদস্যগণ, বিপ্লবে ও যুদ্ধে আহত ব্যক্তিগণ ও তাঁদের পরিবারবর্গের সদস্যগণ এবং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আমাদের প্রিয় দেশের খেদমতে নিয়োজিত সকলের প্রতি নওরোয উপলক্ষে মোবারকবাদ জানাচ্ছি। আমি আশা করছি যে, মহান আল্লাহ্ তা‘আলা আজকের এই দিনকে ও নতুন বছরের এ শুভ সূচনাকে আমাদের জাতির জন্য ও বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য খুশি, আনন্দ ও উন্নত ভবিষ্যতের উৎসে পরিণত করে দেবেন এবং আমাদের সকলকে আমাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সফল করে দেবেন।

এখানে প্রিয় দেশবাসীকে প্রথমেই একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, তা হচ্ছে, আমাদের নতুন বছরের আনন্দ ও উৎসবের দিনগুলো অব্যাহত থাকাকালেই ফাতেমী দিবসসমূহ  এসে যাচ্ছে- যার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের সকলের জন্যই জরুরি, সেহেতু আমি আশা করি যে, আমরা তা যথাযথ মর্যাদা সহকারে উদযাপন করব।

নতুন বছরকে বরণের মুহূর্তটি হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে একটি সমাপ্তি ও একটি সূচনার-বিগত বছরের সমাপ্তি ও নতুন বছরের সূচনার-মধ্যবিন্দু। অবশ্য আমাদের দৃষ্টি প্রধানত সামনের দিকে থাকা আবশ্যক; আমরা নতুন বছরের প্রতি দৃষ্টিপাত করব এবং বছরটির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করব ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করব। তবে পিছনের দিকে তথা যে পথ আমরা অতিক্রম করে এসেছি তার প্রতি ফিরে তাকানোর মধ্যেও অবশ্যই কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কারণ, আমাদের দেখার প্রয়োজন রয়েছে যে, আমরা কী করেছি, কীভাবে তৎপরতা চালিয়েছি এবং আমাদের কাজের কী ফল আমরা পেয়েছি। অতঃপর এ থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, এ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।

গত হয়ে যাওয়া ১৩৯১ সাল অন্যান্য বছরের মতোই বৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন রং ও চিত্রে পরিপূর্ণ একটি বছর ছিল; এ বছরটিতে মিষ্টতা যেমন ছিল, তেমনি তিক্ততাও ছিল, যেমন বিজয় ছিল তেমনি পশ্চাৎপদতাও ছিল। মানুষের গোটা জীবনও সব সময়ই এ ধরনেরই; এতে প্রশস্ততা বা আরাম-আয়েশও আছে, অনটনও আছে, চড়াই ও উতরাই এর সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই যে, আমাদের উতরাই থেকে উঠে আসতে হবে এবং নিজেদেরকে শীর্ষদেশে উপনীত করতে হবে।

গত হয়ে যাওয়া ১৩৯১ সালে বৈশ্বিক বলদর্পী শক্তিবর্গের সাথে আমাদের মোকাবিলার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট তা হচ্ছে, বিভিন্ন অঙ্গনে ইরানী জাতি ও ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুশমনদের কঠোরতর অবস্থান গ্রহণ। দুশমনরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন অঙ্গনে আমাদেরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, তবে প্রধানত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রসমূহই তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে যে, তারা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আমাদের জাতিকে অচল করে ফেলতে চায়। কিন্তু তারা ইরানী জাতিকে অচল করে ফেলতে পারে নি। বরং আল্লাহ্ তা‘আলার অনুগ্রহে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছি যার বিস্তারিত বিবরণ ইতিপূর্বে প্রিয় জনগণের সামনে পেশ করা হয়েছে এবং আরো পেশ করা হবে; আমিও এ ব্যাপারে কিছু আভাস দেয়ার আশা রাখি।

অবশ্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছিল; বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল, বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে কিছু অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়। কতক ভুলত্রুটি ও উদাসীনতার ব্যাপারও ঘটেছে- যা দুশমনের ষড়যন্ত্রের জন্য অনুকূল হয়েছিল। কিন্তু সরকারের সামগ্রিক কর্মকা- ও জনগণের সামগ্রিক তৎপরতা ছিল সামনে এগিয়ে যাবার জন্য নিবেদিত। ইন্ শাআল্লাহ্, এসব তৎপরতার সুফল সম্পর্কে পরে আলোচনা করব।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের অপতৎপরতার লক্ষ্য ছিল একদিকে আমাদের জাতিকে কোণঠাসা করে ফেলা এবং অন্যদিকে জাতির মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি করা ও ইরানী জনগণের মনোবল ভেঙে দেয়া বা দুর্বল করে ফেলা। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা ঠিক এর বিপরীত।

দুশমনরা ইরানী জাতিকে কোণঠাসা করার জন্য যেসব অপচেষ্টা চালায় সেসব ক্ষেত্রে তারা যে কেবল আমাদের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নীতিমালাকে সীমিত করে ফেলতে ব্যর্থ হয় শুধু তা-ই নয়, বরং তেহরানে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম)-এর শীর্ষ সম্মেলনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠানও সম্ভবপর হয়েছে- যে সফল সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণসহ বিপুল সংখ্যক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন। ফলে দুশমন যা আশা করেছিল তার বিপরীতে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যে কোণঠাসা হয় নি কেবল তা-ই নয়; বরং গোটা বিশ্ব ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি- ইসলামী ইরানের প্রতি ও আমাদের প্রিয় জাতির প্রতি সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে থাকে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই যে, আমাদের প্রিয় জাতি বরাবর সাধারণত যেভাবে তাদের ভাবাবেগ প্রদর্শন করে থাকে ঠিক সেভাবেই বিগত ২২শে বাহমান তথা ১১ই ফেব্রুয়ারি ইসলামী বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকী উদযাপনে অত্যন্ত আগ্রহ-উৎসাহ সহকারে ও বীরত্বব্যঞ্জকভাবে, বরং পূর্ববর্তী বছরগুলোর চেয়েও বেশি হারে ও অধিকতর উদ্দীপনা সহকারে অংশগ্রহণ করে ও ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে সম্ভব সর্বোচ্চ মাত্রায় স্বীয় ভাবাবেগের প্রকাশ ঘটায়। আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এ ক্ষেত্রে উত্তর খোরাসানের জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি- যা ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং তাদের জনসেবক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের প্রতি জনগণের অনুকূল মনোভাবের একটি আদর্শ ও সমুন্নত দৃষ্টান্ত।

আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহে বিগত এক বছরে অনেক বড় বড় কাজ সম্পাদিত হয়েছে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞানগবেষণার ক্ষেত্রে বহু কাজ করা হয়েছে, অবকাঠামোর ক্ষেত্রে অনেক কাজ সম্পাদিত হয়েছে, সামগ্রিকভাবে সকল ক্ষেত্রে দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ ও জনগণ ব্যাপকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং যেমন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, তেমনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ও একইভাবে অন্য সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আল্লাহর রহমতে বিরাট বিরাট পদক্ষেপের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহে এবং আমাদের মুসলিম জনগণের প্রচেষ্টার ফলে আমরা যেখানে উপনীত হয়েছি তার ভিত্তিতে ১৩৯২ সালের জন্য আশাব্যঞ্জক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। ইন্ শাআল্লাহ্, এ বছরটি ইরানী জাতির জন্য উন্নতি-অগ্রগতি, ব্যাপক কর্মতৎপরতা ও দক্ষতা প্রদর্শনের বছরে পরিণত হবে। এর মানে এ নয় যে, এ বছরে দুশমনদের দুশমনীর মাত্রা হ্রাস পাবে, বরং এর মানে হচ্ছে এই যে, ইন্ শাআল্লাহ্, ইরানী জাতির প্রস্তুতি আরো বৃদ্ধি পাবে, তার উপস্থিতি আরো বেশি প্রভাবশালী হবে এবং এ জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ তাদের নিজেদের দ্বারা ও নিজেদের প্রচেষ্টায় অধিকতর উত্তমভাবে ও অধিকতর আশাব্যঞ্জকভাবে সম্পাদিত হবে।

অবশ্য ১৩৯২ সালে আমাদের সামনে যেসব করণীয় রয়েছে তা প্রধানত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই ক্ষেত্রের বিষয়। গত বছরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের যে স্লোগান ছিল ঠিক সেভাবেই এ বছরেও এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে জাতীয় উৎপাদনের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করতে হবে। অবশ্য গত বছরে আমাদের সে স্লোগানের ভিত্তিতে বহু কাজও হয়েছে, কিন্তু জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ইরানী শ্রম ও পুঁজি বিনিয়োগের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের বিষয়টি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিষয়- যা এক বছরে পুরোপুরি আঞ্জাম দেয়া সম্ভব নয়। তবে খুশির বিষয় এই যে, বিগত বছরের দ্বিতীয়ার্ধ্বে জাতীয় উৎপাদন বিষয়ক নীতিমালা অনুমোদিত ও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। অর্থাৎ একে ট্রেন চলাচলের জন্য রেল লাইন বসানোর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ, এ নীতিমালার ভিত্তিতে মজলিসে শূরায়ে ইসলামী (পার্লামেন্ট) ও সরকার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে ও তার বাস্তবায়নের তৎপরতা শুরু করতে পারে। ইন্ শাআল্লাহ্, তাঁরা সমুন্নত মনোবল ও ধৈর্য সহকারে তার বাস্তবায়ন এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

১৩৯২ সালে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের সামনে একটি বিরাট করণীয় কাজ রয়েছে, তা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন- প্রকৃতপক্ষে যা দেশের নির্বাহী ও রাজনৈতিক এখতিয়ার অর্পণের নির্বাচন; এক অর্থে এ নির্বাচন আগামী চার বছরের জন্য দেশের সাধারণ শক্তি ও ক্ষমতাসংক্রান্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। ইন্ শাআল্লাহ্, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণ নির্বাচনী ময়দানে উপস্থিত হয়ে দেশের ও তাঁদের নিজেদের জন্য উত্তম ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। অবশ্য যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে তেমনি অর্থনৈতিক অঙ্গনে জনগণকে জিহাদী চেতনা নিয়ে উপস্থিত থাকতে হবে। তাঁদেরকে বীরত্বব্যঞ্জক মনোভাব ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সহকারে এ ময়দানে প্রবেশ করতে হবে, সমুন্নত মনোবল ও আশাব্যঞ্জক দৃষ্টি সহকারে প্রবেশ করতে হবে, আশা ও আনন্দে পরিপূর্ণ হৃদয় সহকারে সকল ময়দানে প্রবেশ করতে হবে এবং বীরত্বগাথা ও গৌরবগাথা রচনার মাধ্যমে লক্ষ্যসমূহে উপনীত হতে হবে। এ দৃষ্টিকে সামনে রেখে আমি ১৩৯২ সালকে ‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বীরত্বগাথার বছর’ নামকরণ করছি এবং আশা করছি যে, মহান আল্লাহ্ তা‘আলার অনুগ্রহে প্রিয় দেশবাসী ও আন্তরিকতার অধিকারী সরকারী কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীলগণের মাধ্যমে এ বছরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বীরত্বব্যঞ্জক গৌরবগাথা রচনার বিষয়টি বাস্তব রূপ লাভ করবে।

মহান আল্লাহ্ তা‘আলার অনুগ্রহদৃষ্টি ও হযরত বাক্বীয়াতুল্লাহ্র (আমাদের আত্মাসমূহ তাঁর জন্য উৎসর্গীত হোক) দো‘আ প্রত্যাশা করছি এবং মহান হযরত ইমামের পবিত্র নাফসের প্রতি ও প্রিয় শহীদগণের প্রতি দরূদ প্রেরণ করছি।

ওয়াস্-সালামু আলাইকুম্ ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।

(তথ্যসূত্র : মুমতায্ নিউয্)

ফার্সী থেকে অনুবাদ : নূর হোসেন মজিদী

১.  নতুন বছর বরণের দো‘আ। হে অন্তরসমূহ ও দৃষ্টিসমূহ পরিবর্তনকারী! হে রাত্রি ও দিবসের নিয়ন্ত্রণকারী! হে বছর ও অবস্থাসমূহের বিবর্তনকারী! আমাদের অবস্থাকে সর্বোত্তম অবস্থায় বিবর্তিত করে দিন।

২.  হযরত ফাতেমা (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা) স্মরণে বিশেষ দো‘আ। হে আল্লাহ্! হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহ্-এর কন্যা আপনার প্রিয়পাত্র বিশ্বের নারীকুল নেত্রী হযরত ফাতেমার প্রতি সালাত্ করুন। হে আল্লাহ্ তাঁর প্রতি এবং তাঁর পিতা, তাঁর স্বামী ও তাঁর সন্তানদের প্রতি সালাত্ করুন।

৩. ইমাম মাহদী (আ.)-এর জন্য দোয়া : হে আল্লাহ্! আপনি আপনার ওয়ালী হুজ্জাত্ ইবনে হাসানের- তাঁর ওপরে ও তাঁর পূর্বপুরুষদের ওপরে আপনার সালাত্- জন্য বর্তমান মুহূর্তে ও প্রতিটি মুহূর্তে ওয়ালী, সংরক্ষক, পরিচালক, সাহায্যকারী, প্রমাণ ও দৃষ্টিস্বরূপ হয়ে যান- যাতে আপনি আপনার পৃথিবীকে আনুগত্যে স্থিতিশীল করে দেন এবং তাতে অব্যাহত নে‘আমত-রাজি প্রদান করেন। হে আল্লাহ্! স্বয়ং তাঁকে ও তাঁর বংশধরদেরকে এবং তাঁর অনুসারীদেরকে, তাঁর প্রজাদেরকে, তাঁর খাস ব্যক্তিগণকে ও তাঁর প্রতি সাধারণভাবে অনুগতদেরকে, তাঁর শত্রুদেরকে ও দুনিয়ার সমস্ত অধিবাসীকে প্রদান করুন তা যা তাঁর নয়নকে শীতল করবে এবং তাঁর সত্তাকে আনন্দিত করবে।

৪. হযরত ফাতেমা (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা)-এর স্মরণ দিবসসমূহ। উল্লেখ্য, ২০শে জমাদিউস্ সানী তাঁর জন্মদিবস।- অনুবাদক

৫. হযরত ইমাম মাহ্দী (আল্লাহ্ তাঁর মহান আবির্ভাবকে ত্বরান্বিত করে দিন)।

৬. হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)।


নওরোয উৎসব

haft_sin-02নওরোযের উৎসব ইরানী জনগণের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নওরোয উৎসব প্রচলনের সঠিক সন-তারিখ জানা যায় না। তবে এর নিদর্শনগুলো কয়েক হাজার বছর পূর্বেকার ইরানের হাখামানেশী রাজবংশের শাসনামলের (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৩৩০ অব্দ) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। হাখামানেশী শাসনামল থেকে শুরু করে এ উপলক্ষে যেসব মুদ্রা তৈরি করা হয় তা এখনো মওজূদ আছে। প্রাগৈতিহাসিক কালের ইরানীরা প্রকৃতির জীবনের সমাপ্তি উপলক্ষে ইরানী বছরের শেষ এগার দিন (১০ই থেকে ২০শে মার্চ) শোক পালন করত এবং নওরোযে প্রকৃতিতে নতুন করে জীবনের আগমনের সাথে সাথে এ শোকের সমাপ্তি ঘটত। তাই এ উপলক্ষে আনন্দ-উৎসব করা হত।

হাখামানেশী সম্রাটদের যুগে এ উৎসব কীভাবে পালন করা হত সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় নি। আলেকজান্ডারের ইরান আক্রমণ ও তার ফলে সৃষ্ট ধ্বংস এ ব্যাপারে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ লাভের পথে বহুলাংশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও সাসানী রাজবংশের শাসনামলে (২৬২ থেকে ৬৫২ খ্রিস্টাব্দ) নওরোয উৎসব প্রচলিত ছিল বলে বহু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়।

তাখ্তে জামশীদে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, হাখামানেশীদের পূর্ববর্তী মদ্ রাজবংশের শাসনামলে নওরোযের উৎসব পালিত হত। নওরোযের উৎসব পালন হাজার হাজার বছর ধরে এতটাই ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি লাভ করেছিল যে, ইরান, তুরস্ক, ইরাক, তাজিকিস্তান, উযবেকিস্তান ও আযারবাইজান, ভারত উপমহাদেশের কোন কোন অংশে এবং মধ্য এশিয়ায়ও এখনো এ উৎসব পালন করা হচ্ছে। একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী এ উৎসব পালন করে থাকে।

নওরোয উৎসবের কালগত গুরুত্ব এখানে যে, এ উৎসব এমন এক সময় শুরু হয় যখন প্রকৃতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে থাকে; পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ সমাপ্ত করে আরেক বার প্রদক্ষিণ শুরু করে।

প্রাচীন ইরানের র্ফাস্ এলাকায় যরথুস্ত্রীরা নববর্ষের সূচনায় বিভিন্ন প্রতীকী বস্তু দ্বারা সাতটি ট্রে পূর্ণ করে স্রষ্টার উদ্দেশে উৎসর্গ করত। এই সাতটি ট্রে ছিল সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ঈমান, সুদপদেশ, সৎকর্ম, সৌভাগ্য এবং ক্ষমা ও অমরত্বের প্রতীক।

অতীতের এসব আনুষ্ঠানিকতা বর্তমানে যে পরিবর্তিত রূপ নিয়েছে তা হচ্ছে এই যে, এ উপলক্ষে বিশেষ ধরনের দস্তরখান বিছানো হয় এবং তার ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী জিনিস অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। এ উপকরণসমূহ হতে হবে বিভিন্ন ধরনের সাতটি উপকরণ যেগুলোর নাম ফার্সী বর্ণমালার ‘সীন্’ হরফ দিয়ে শুরু হয়েছে। এগুলো হলো ‘হাফ্‌ত সীন্’ যা সাধারণত নিম্নোক্ত উপকরণগুলোর মধ্য থেকে বেছে নেয়া হয়।

সাবযেহ্ (সবুজাভ) : গম বা ডালের কচি চারার গুচ্ছ – যা নওরোযের অব্যবহিত পূর্বে গজিয়েছে – একটা ট্রে বা প্লেটের ওপর বসিয়ে হাফ্‌ত সীন্ দস্তরখানায় রাখা হয় যা নব জীবনের প্রতীক। সামানূ : কচি গম, বার্লি বা অন্যান্য শাস্যদানার আটা দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের হালুয়া যা প্রাচুর্য ও নেয়ামতের প্রতীক। সেনজাদ : এক প্রকার শুষ্ক ফল যা প্রেমের প্রতীক। সীর (রসুন) : সৌন্দর্য ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক। সোম্মাগ : মশুরের ডালের চেয়ে সামান্য বড় লাল রঙের টক ফলবিশেষ যা উদীয়মান সূর্যের প্রতীক। র্সিকা : দীর্ঘায়ু ও ধৈর্যের প্রতীক। সোম্বোল : ছোট আকারের পুষ্পময় উদ্ভিদবিশেষ যা বসন্তের আগমন বার্তা বহন করে। সেক্কেহ্ (কয়েন বা মুদ্রা) : সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

সুপ্রাচীন কাল থেকে ইরান বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে যোগাযোগের ট্রানজিট রুট হিসাবে বিবেচিত হত। ইরান এশিয়াকে ইউরোপ ও আফ্রিকার সাথে সংযুক্ত করেছে। এ দেশে বিভিন্ন রসম-রেওয়াজ ও সংস্কৃতির উদ্ভব ও মিলন ঘটে যা বিশ্বের অন্যত্র পাওয়া দুষ্কর।

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে এবং সুপ্রাচীন কালে ইরানীদের ধর্মবিশ্বাস ও জাতিসত্তায় বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রান্ত হয়। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে এক আল্লাহর ইবাদত এবং র্শিক্ ও বহু দেবদেবীর পূজা প্রতিহতকরণ।

ইসলামের আবির্ভাব ও অন্যান্য ধর্মের সাথে, বিশেষতঃ ইরানীদের ধর্মবিশ্বাস ও জাতীয় ধ্যান-ধারণার সাথে ইসলামের শন্তিবাদী আচরণের দরুন ইরানীদের ইসলাম গ্রহণ করার পরেও তাদের আগেকার কতক ধ্যান-ধারণা ও রসম-রেওয়াজ অব্যাহত থাকে। অবশ্য ইরান-বিজেতা আরব মুসলমানদের ইসলামের সুমহান শিক্ষার আলোকে ইরানীদের সাথে সদয় আচরণের কারণেই তারা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে বরণ করে নেয় এবং তাদের আদর্শ ব্যক্তিবর্গ, বীরগণ ও প্রাচীন কাহিনীগুলোকে মহান দীন ইসলামের রঙে রঙিন করে নেয়। প্রাচীন ইরানীদের কিছু কিছু উপলক্ষ ও রেওয়াজ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও জনগণের ধ্যান-ধারণার সাথে মিশে গিয়েছিল। নওরোয এর অন্যতম। সুদীর্ঘ কয়েক সহস্রাব্দের পুরনো এ ঐতিহ্যটি ইরানের মুসলমানদের মনে একটি স্থায়ী আসন তৈরি করে নিয়েছে এবং ইরানের মনীষীগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট লেখালেখি করেছেন। বিশেষ করে আল-বিরূনী (ওফাত ৪৪০ হি.) তাঁর গ্রন্থ আতহারুল বাক্বীয়াহতে প্রাচীন ইরানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন। এছাড়া অনেক মুসলিম কবিই নওরোয ও প্রকৃতির নব জীবন লাভ নিয়ে কবিতা লিখেছেন। এখনও ইরানের অধিকাংশ লোকই পুরাতন বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আগমন ক্ষণে নতুন পোশাক পরিধান করে মিষ্টি-মধুর আচরণ সহকারে পবিত্র স্থানে বা পরিবারের মুরুব্বীদের সাথে কাটাতে পছন্দ করে। সে মুহূর্তে তারা কুরআন তেলাওয়াত করে ও দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর কাছে নিজেদের ও পরিবারবর্গের জন্য একটি সুন্দর এবং সুস্থতা ও সমৃদ্ধিপূর্ণ বছর কামনা করে।  নওরোযের পছন্দনীয় অন্যান্য রীতির মধ্যে রয়েছে পরস্পরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কুশলবিনিময়, কারও প্রতি রাগ বা ক্ষোভ থাকলে পরস্পরকে ক্ষমা করে দেয়া এবং নববর্ষের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করা। এছাড়া এ দিনে তারা এমন সব ব্যক্তির সাথে দেখা করতে যায় যারা পুরাতন বছরে কোন প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে।

এভাবে নওরোয প্রাচীন ইরান থেকে পর্যায়ক্রমে বর্তমান রূপে এসে দাঁড়িয়েছে এবং ইসলামের পছন্দনীয় রীতি-নীতিগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই ইসলামের মূলনীতির সাথে এর কোন বিরোধ নেই; বরং নওরোয উৎসব ইরানী সমাজের জন্য নৈতিক ও সামগ্রিক শিক্ষার সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

সংকলন ও অনুবাদ : নূরে আলম মা‘রূফ


ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ইসলামের এক মহাবিজয়ের দিন

মানুষ যদি মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে তাহলে তাকে শৃঙ্খলিত করার কোন ক্ষমতা কারও থাকে না। ইসলাম আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রবক্তা। তাই ইসলামী সরকারের মূল  ভিত্তি হচ্ছে ঐশী সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতা। প্রথম থেকেই এ দুটিই ছিল ইসলামী সরকারের ভিত্তি।

ইরানের ইসলামী জনতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে একটি সফল ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত করে। এ বিপ্লবের অনিবার্য দাবিই ছিল একটি ইসলামী সরকার কায়েম করা। ইরানের ইসলামী নেতৃত্ব তাঁদের প্রতিজ্ঞা ভুলে যান নি। তাই ১৯৭৯ সালের ৩০ ও ৩১শে মার্চ দু’দিন জনমত যাচাইয়ের জন্য ইরানে এক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। শতকরা ৯৮.২ ভাগ ভোটার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ভোট দেন। জনগণের রায়ের ভিত্তিতে পরদিন ১২ই ফারভারদীন (১লা এপ্রিল) হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) ইরানের নামকরণ করেন ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান’ এবং উক্ত তারিখকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করেন।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানই প্রমাণ করে যে, এ প্রজাতন্ত্রটি আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামী ইরানের সংবিধানের ২ নং ধারা মতে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হচ্ছে নিম্নবর্ণিত ‘আক্বায়েদের ভিত্তিতে গঠিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা :

১. একত্ববাদ (আল্লাহ ছাড়া কোন সার্বভৌম সত্তা নেই)। তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর বিধান তাঁরই ক্ষমতা ও অধিকারভুক্ত। তাঁর আদেশের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে।

২. ঐশী প্রত্যাদেশ এবং আইন প্রণয়নে একে মৌলিক ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ।

৩. পুনরুত্থান এবং আল্লাহর রাহে মানবজীবনের বিবর্তনে এর গঠনমূলক ভূমিকা।

৪. সৃষ্টির ক্ষেত্রে ঐশী বিচার ও ঐশী বিধান।

৫. ইমামত এবং ইসলামী বিপ্লব অব্যাহত রাখতে এর ইতিবাচক নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

৬. মানুষের মর্যাদা ও মানবতার মহান মূল্য। এটা মানুষের ইচ্ছা ও দায়িত্ববোধকে অতিক্রম করে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছায় এবং নিম্নোক্ত বিষয়াবলির সাহায্যে ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক,  সমাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও জাতীয় অখণ্ডতা প্রতিষ্ঠা করে :

ক. কুরআন, হাদীস্ ও ইমামগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ (ফক্বীহ্) কর্তৃক এর অব্যাহত অনুশীলন।

খ. বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানুষের অন্যান্য জ্ঞানের ব্যবহার এবং এগুলোর বিকাশের প্রচেষ্টা।

গ. সকল ধরনের নিপীড়ন অস্বীকার করা ও নিপীড়নের কাছে আত্মসমর্পণ না করা এবং স্বৈরাচার বর্জন।

অন্যান্য সরকারব্যবস্থার সঙ্গে ইরানের ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি বিরাট পার্থক্য হচ্ছে তার ‘বেলায়াতে ফক্বীহ্’ (মুজতাহিদের শাসন) নীতি। এর অর্থ সরকারের পদ্ধতি ও কার্যক্রম ইসলামী বিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা তা মুজতাহিদের মাধ্যমে তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা।

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সরকার কাঠামো

ইরানে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রী সরকার পদ্ধতির সাথে কাঠামো ও গঠন প্রকৃতির দিক থেকে বিশ্বের অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের কিছু সাযুজ্য ও কিছু পার্থক্য রয়েছে। আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র এখতিয়ারাধীনে দেশটি পরিচালিত। এ ক্ষেত্রে অন্য অনেক দেশের সরকারের সাথে এর মিল রয়েছে। তবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রে এ তিনটি বিভাগ ছাড়াও আরো কিছু সংস্থা আছে যেগুলো ঐ বিভাগত্রয়ের তত্ত্বাবধান করে। এ ক্ষেত্রেই অন্যান্য সরকারের সাথে এর প্রধান পার্থক্য। এ সংস্থাগুলো হচ্ছে : সংবিধানের অভিভাবক পরিষদ, সর্বোচ্চ বিচার পরিষদ ও নেতৃত্ব বা বেলায়াতে ফক্বীহ্।

সংবিধানের অভিভাবক পরিষদ

মজলিসে শূরায়ে ইসলামী (ইসলামী পরামর্শ পরিষদ বা পার্লামেন্ট)-এর কার্যাবলি তত্ত্বাবধান এবং ইসলামী বিধান, আইন ও সংবিধান অনুসারে এর কার্যক্রম নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘সংবিধানের অভিভাবক পরিষ’ নামে একটি পরিষদ রয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব (রাহবার) কর্তৃক মনোনীত ৬ জন ফক্বীহ্ এবং সর্বোচ্চ বিচার পরিষদ কর্তৃক প্রস্তাবিত ও মজলিস কর্তৃক অনুমোদিত ৬ জন সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনবিদ সমন্বয়ে এ পরিষদ গঠিত। প্রকৃতপক্ষে এ পরিষদই দেশের আইন প্রণয়নের তত্ত্বাবধানকারী সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে গৃহীত আইনসমূহ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সংবিধানের ৯১তম ধারায় বলা হয়েছে :

মজলিসের সিদ্ধান্তসমূহ যাতে ইসলামী বিধান ও সংবিধানের নীতিমালা লঙ্ঘন না করে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংবিধানের অভিভাবক পরিষদ গঠিত হবে। এ পরিষদের সদস্য হবেন :

১. ইসলামী আইন ও যুগের প্রয়োজন সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত ৬ জন উপযুক্ত ফক্বীহ্ (মুজতাহিদ)। এ ব্যক্তিদের নিয়োগের দায়িত্ব নেতা (রাহবার) বা নেতৃত্বপরিষদের।

২. আইনের বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে উপযুক্ত শিক্ষিত ৬ জন মুসলমান আইনবিশারদ। বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পরিষদ এদের নাম প্রস্তাব করবে এবং আইন পরিষদ (মজলিস) কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।

সংবিধানের অভিভাবক পরিষদের কাজের মধ্যে রয়েছে : সংবিধানের ব্যাখ্যা, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন তত্ত্বাবধান, মজলিসে শূরায়ে ইসলামীর নির্বাচন তত্ত্বাবধান, প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের যোগ্যতা অনুমোদন। এ সম্পর্কিত সংবিধানের একটি ধারায় বলা হয়েছে :

পরিষদে গৃহীত আইন ইসলামী বিধান অনুযায়ী প্রণীত হচ্ছে কিনা, সে সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক অভিভাবক পরিষদের আইনজ্ঞগণ। অনুরূপভাবে সংবিধান অনুযায়ী অভিভাবক পরিষদের সদস্যগণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সকল সিদ্ধান্ত নেবেন।

সর্বোচ্চ বিচার পরিষদ

এ অধ্যায়ে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর বিপ্লবী আদালতসমূহ সম্পর্কে আলোচনার সময় উল্লেখ করা হয়েছে যে, অতীতে ইরানের বিচারব্যবস্থা ছিল শাহ সরকারের বেআইনী কার্যাবলি অনুমোদনের হাতিয়ার। ঐ সব আদালতে ইসলামী ন্যায়বিচার বা মানবিক সমতার কোন চিহ্ন ছিল না। ঐ ব্যবস্থায় বিচারকরা ছিল শাহ সরকারের হাতিয়ার। ইসলামী বিধান ছাড়া অন্য সবকিছুই সেখানে বিবেচনা করা হত। বিচারব্যবস্থায় কোন মুসলমান বা আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণকারী লোক থাকলেও তাঁরা সব সময়ই ছিলেন এখতিয়ারবিহীন।

বস্তুতঃ ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের আগে বিচারব্যবস্থার প্রধান ত্রুটি ছিল ইসলামী চেতনার অভাব। এ পরিস্থিতি অনুধাবন করে সংবিধানে ‘সর্বোচ্চ বিচার পরিষদ’ নামে একটি পরিষদ গঠন করা হয়। সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এ পরিষদ ইসলামী বিধান অনুসারে বিচার প্রতিষ্ঠানসমূহ গঠনের দায়িত্ব পায। ৫ সদস্যের সমন্বয়ে এ পরিষদ গঠিত। এদের প্রত্যেকেই মুজতাহিদ। এদের মধ্যে দু’জন হলেন সর্বোচ্চ বিচার পরিষদের প্রধান ও দেশের প্রসিকিউটর জেনারেল – যারা নেতা বা নেতৃত্বপরিষদ দ্বারা মনোনীত হন। অপর ৩ জন সদস্য বিচারকদের দ্বারা নির্বাচিত হন।

তাই ইরানের বিচারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে এবং এ ব্যবস্থাকে বিশুদ্ধ ইসলামী ব্যবস্থায় রূপান্তর করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিচার পরিষদই হচ্ছে সর্বোত্তম ও সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষ। দেশে ইসলামী বিধান প্রবর্তনে অসম্মত ব্যক্তিদের সৃষ্ট বাধা-বিঘœ সত্ত্বেও সর্বোচ্চ বিচার পরিষদ বহু লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ইরানের বিচারব্যবস্থায়  ইসলামী বিধান রূপায়নে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। সংবিধান অনুমোদনের সময় থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত এ পরিষদের প্রথম কার্যকাল ছিল এবং এরপর নিয়মিত তা পুনর্গঠন হতে থাকে।

সর্বোচ্চ বিচার পরিষদ দেশের বিচারব্যবস্থার ইসলামীকরণ করে এবং জনগণ ইসলামী বিচারব্যবস্থার আওতায় পূর্ণাঙ্গ বিচার বিভাগীয় নিরাপত্তা অনুভব করে।

এটা উল্লেখ করতে হয় যে, বর্তমান বিশ্বে ইরানের সর্বোচ্চ বিচার পরিষদের মতো কোন প্রতিষ্ঠান নেই। মুসলিমপ্রধান অন্যান্য দেশেও এরকম প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না। কেবল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জনগণই এ ধরনের বিচার বিভাগীয় ক্ষমতার সুযোগ ভোগ করছে।

বেলায়াতে ফক্বীহ্

বিশ্বের বর্তমান প্রজাতান্ত্রিক সরকারসমূহের সাথে ইসলামী প্রজাতন্ত্রী সরকারের অন্যতম প্রধান পার্থক্য হচ্ছে ইরানে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রনেতৃত্বের ধরনের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ এ নেতৃত্বকে বলা হয় বেলায়াতে ফক্বীহ্ (মুজতাহিদের শাসনকর্তৃত্ব)।

ইসলামী প্রজাতন্ত্রী ব্যবস্থায় সরকারের ধরন হচ্ছে ইসলামী উম্মাহ ও নেতৃত্বের (অর্থাৎ ইসলামী উন্মাহ এবং সমাজের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব) মধ্যকার সম্পর্কভিত্তিক। এ ব্যবস্থার দু’টি ভিত্তি রয়েছে : জনগণের ভোট এবং ইসলামী বিধান ও ঐশী আইন। প্রথম ভিত্তিটির অভিভাবক জনগণ নিজেরাই। কারণ, জনগণই বিভিন্ন আইন-কানুন বাস্তবায়নে প্রার্থীদের ভোট দেয় এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম ও আইন অনুসারে দায়িত্ব পালন পর্যালোচনা করে। জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের নির্বাচিত বা ক্ষমতাচ্যুত করে। প্রথম প্রেসিডেন্টের অপসারণের ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছিল।

সংবিধানের ১১০ ধারা অনুসারে সুপ্রীম কোর্টের রায় বা মজলিসের রায় অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নেতার (রাহবার) অনুমোদনের পরই প্রেসিডেন্টের অপসারণ কার্যকর হবে। প্রকৃতপক্ষে এটা জনগণের পরোক্ষ ভোট প্রদান। প্রথম প্রেসিডেন্টের অপসারণের ক্ষেত্রে ১৯৮১ সালের ২১শে জুন তৎকালীন রাহবার ইমাম খোমেইনীর অনুমোদনক্রমে এতদসংক্রান্ত মজলিসের রায় কার্যকর হয়।

এ ব্যবস্থার দ্বিতীয় ভিত্তি ইসলামী বিধান ও ঐশী আদেশসমূহ বলবৎকরণ তত্ত্বাবধানের জন্য একজন নেতার (রাহবার) প্রয়োজন রয়েছে। জনগণের আস্থাভাজন কাউকে এ দায়িত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়তঃ সে ব্যক্তিকে ঐশী আদেশসমূহ ও ইজতিহাদী পর্যায়ে ইসলামের মৌল বিষয় সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত থাকতে হবে। তৃতীয়তঃ যুগ সম্পর্কে সচেতন হওয়া ছাড়াও তাঁর মধ্যে থাকতে হবে পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা ও দেশের নেতৃত্বদানের ক্ষমতা। সংবিধানের ৫ম ধারায় এসব মৌলিক বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। তাই নেতা বা বেলায়াতে ফক্বীহ্ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি ঐশী আদেশ ও ইসলামী বিধানসমূহের সাথে সরকারী নীতিমালার সমন্বয় সাধন ও তত্ত্বাবধান করেন। এজন্য তিনি আল্লাহ ও জনগণের কাছে দায়ী থাকেন।

নেতা বা নেতৃত্বপরিষদের নির্বাচন পদ্ধতি, তাঁদের বা তাঁর গুণাবলি, তাঁর বা তাঁদের ক্ষমতা ও এখতিয়ার সম্পর্কে সংবিধানে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। নেতৃত্ব-পরিষদ নির্বাচন সম্পর্কে সংবিধানের ১০৭ ধারায় বলা হয়েছে : যখন কোন ধর্মতত্ত্ব জ্ঞানী সংবিধানের ৫ম ধারায় উল্লিখিত শর্তসমূহ পূরণ করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দ্বারা মার্জা ও নেতা হিসেবে স্বীকৃত হন – যেমন হয়েছেন বিশিষ্ট মার্জা ও ইসলামী বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনী – এ নেতার সকল নির্দেশ দানের ক্ষমতা থাকবে। জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত বিশেষজ্ঞগণ (নেতানির্বাচনী বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যগণ) নেতৃত্বপদের জন্য সম্ভাব্য ব্যক্তিদের যোগ্যতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করবেন। সর্বোত্তম কাউকে পাওয়া গেলে তাঁকেই জনতার সামনে নেতা হিসাবে তুলে ধরা হবে, না হলে নেতৃত্বের যোগ্যতাসম্পন্ন তিন থেকে পাঁচজন উপযুক্ত ধর্মীয় নেতাকে নিয়ে গঠিত হবে নেতৃত্বপরিষদ এবং তাঁদেরকে জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। ১৯৮৯ সালে হযরত ইমাম খোমেইনীর ওফাতের পর পরই নেতানির্বাচনী বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যগণ পরামর্শ সভায় বসেন এবং সংবিধানের নির্দেশনা ও বিশেষজ্ঞ পরিষদের অভিজ্ঞ সদস্যদের যোগ্যতা পর্যালোচনা করে হযরত আয়াতুল্লাহ ওয্মা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীকে রাহবার বা সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করেন এবং আজ অবধি তিনিই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাহবার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নেতা বা নেতৃত্বপরিষদ সদস্যদের যেসব যোগ্যতা থাকতে হবে সংবিধানের ১০৯ ধারায় তার উল্লেখ রয়েছে :

১. ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ধর্মীয় আদেশ প্রদানের জন্য আবশ্যকীয় জ্ঞান ও গুণাবলি।

২. রাজনৈতিক ও সামাজিক অন্তর্দৃষ্টি, সাহস, যোগ্যতা ও ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত ক্ষমতা।

সংবিধানের ১১০ ধারায় নেতার দায়িত্ব ও এখতিয়ার সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ নিবন্ধে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যার অবকাশ নেই বলে ইসলামী ইরান কর্তৃক প্রবর্তিত প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি রেখচিত্র তুলে ধরা হলো।

উপরোক্ত অধ্যায়সমূহে ইরানের ‘ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক’ পদ্ধতির সরকার কাঠামো সম্বন্ধে আলোচিত হয়েছে। ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হচ্ছে : ইসলামী ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা ও বজায় রাখা; জনসাধারণের, সংখ্যালঘুদের এবং নারীর অধিকার রক্ষা করার বিষয় এ ব্যবস্থা নিশ্চয়তা বিধান করে। সংবিধানের ১১, ১৩, ১৪, ১৬, ১৭, ১৯, ২০, ২১ ও ২২ ধারায় এগুলো প্রতিফলিত হয়েছে। শাসনতন্ত্রের ৪৪, ৪৫, ৪৭, ৪৯ ধারা বিশ্লেষণ করে এটাই ধারণা হয় যে, ইসলামের অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রে পূর্ণতায় পৌঁছানো এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সংবিধানের ১৫২, ১৫৩ ও ১৫৪ ধারায় যা প্রতিফলিত হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, ইরানের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থ সংরক্ষণ করা। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যে সামরিক নীতি নির্ধারণ করেছে তা কুরআন মজীদে বিধৃত এ বিষয়ক লক্ষ্যেরই প্রতিফলন।

এক কথায়, ইরান যে ‘ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক’ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে তার ভিত্তি হল ইসলাম। (আল্লাহ পাক এ ব্যবস্থার উন্নতি উত্তরোত্তর প্রদান করুন এবং ধীরে ধীরে একে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে দিন!)

Islami Projatanto


স্মরণ

শহীদ আয়াতুল্লাহ বাকের সাদ্‌র ও শহীদ বিনতুল হুদা

Mohammad_Baqir_al_Sadr_by_70hassan07হিজরি ১৩৫০ সনে (১৯৩০ খ্রি.) ইরাকের কাদেমিন শহরের দরিদ্র এলাকায় একটি শিশুর জন্ম হয়। শিশুটির নাম মুহাম্মাদ বাকের এবং তার পিতার নাম সাইয়্যেদ হায়দার। এ পরিবারটি আর্থিক বিচারে গরীব হলেও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এ পরিবারে অনেক ইসলামী চিন্তাবিদের জন্ম হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কোম শহরের সাইয়্যেদ সাদ্রুদ্দীন সাদ্‌র, লেবাননের শিয়া মুসলমানদের নেতা ইমাম মূসা সাদ্‌র, ফরাসি উপনিবেশ থেকে লেবাননকে মুক্ত করার সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী সাইয়্যেদ আবুল হোসাইন শারাফউদ্দীন ও আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ বাকের সাদ্‌র। ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁরা সবাই অগ্রসেনা ও নেতা ছিলেন।

আয়াতুল্লাহ বাকের সাদ্‌র-এর মেধা সবাইকে হতবাক করে দেয়। দশ বছর বয়সেই তিনি ইসলামের ইতিহাসের ওপর বক্তৃতা দেয়া শুরু করেন। ইসলামী জ্ঞানার্জনে তিনি এত দ্রুত অগ্রগতি সাধন করেন যে, মাত্র আঠার বছর বয়সে তিনি ইজতিহাদের (কুরআন-হাদীসের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে মতামত ব্যক্ত করার) যোগ্যতা অর্জন করেন। বাইশ বছর বয়সে আয়াতুল্লাহ সাদ্‌র গায়াতুল ফিক্‌র ফি ইলমে উছূলে ফিক্বহ্ নামক একখানা ভাষ্য লিখেন যা জ্ঞানজগতে মূল্যবান গ্রন্থগুলোর একটি। এ গ্রন্থে আয়াতুল্লাহ সাদ্‌র রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ফাদাক’ সম্পর্কে বিশ্লেষণ করে এ ব্যাপারে তাঁর নিজের চমৎকার ও তথ্যসমৃদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন।

আয়াতুল্লাহ সাদ্‌র ছিলেন সে সকল লোকের একজন যাঁরা বিজ্ঞানসম্মত বিষয়গুলো জানার ক্ষেত্রে প্রবল আগ্রহের অধিকারী। তাঁর অনন্য মেধার কারণে তিনি কোনো শিক্ষক ছাড়াই কতিপয় বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে সক্ষম হন।

১৩৭৯ হিজরি সনে (১৯৫৯ খ্রি.) আরব বিশ্বে, বিশেষ করে, ইরাকে নাস্তিক্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আয়াতুল্লাহ্ সাদ্‌র এ সময়ে একটি ইসলামী জাগরণ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি একদিকে ইসলামপ্রিয় মুসলিম বুদ্ধিজীবীদেরকে সংঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান, অপর দিকে নিজে এমন বই-পুস্তক লেখা শুরু করেন যেগুলো মুসলিম মিল্লাতের সাংস্কৃতিক ভিত রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আয়াতুল্লাহ হাকীমের মৃত্যুর পর ইরাকের ইসলামী সংগ্রামে আয়াতুল্লাহ সাদ্‌র-এর উদ্দীপনাময় ও উজ্জ্বল ভূমিকার কারণে ইরাকের বাথ সরকার শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং তারা এ জাগরণ দমন করার সিদ্ধান্ত নেয়। আয়াতুল্লাহ সাদ্‌র সকল তৎপরতার কেন্দ্র হওয়ায় তাঁর ওপরই সকল চাপ এসে পড়ে। ইরাক সরকারের এজেন্টরা তাঁর সাথে যে কোনোভাবে জড়িত লোকদের অপদস্থ করতে থাকে। কিন্তু জাগরণের জোয়ার এভাবে স্তব্ধ করে দেয়া সম্ভব হয় নি। তাই বাথ সরকার অন্য পন্থায় বিষয়টি শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আয়াতুল্লাহ সাদ্র্কে গ্রেফতার করে। তাঁর গ্রেফতারের খবর অনতিবিলম্বে মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে; তারা বলিষ্ঠভাবে এর প্রতিবাদ জানায় এবং আয়াতুল্লাহকে ছেড়ে দিতে সরকারকে বাধ্য করে।

তিনি ইরানী জনগণ ও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রশংসা করায় এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা ঘোষিত হওয়ায় যায়নবাদ-প্রভাবিত ইরাকের সাদ্দাম সরকার ভয় পেয়ে যায়। ইরাকের অভ্যন্তরীণ জাগরণ ও ইরানে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্য এ দু’টি বিষয়ই তাদের জন্য ভয়ের কারণ ছিল। তাই ইরাক সরকার আয়াতুল্লাহ্কে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে গৃহবন্দী করে রাখে। কিন্তু আয়াতুল্লাহ গ্রেফতার হলেও তাঁর ইসলামী আন্দোলন থেমে যায় নি। তাই হিজরি ১৪০০ সালের ১৯শে জমাদিউল আউয়াল তারিখে (৯ এপ্রিল, ১৯৮০) ইরাক সরকারের এজেন্টরা তাঁকে বাগদাদে নিয়ে আসে এবং সেখানে তারা তাঁর ওপর নির্যাতন চালিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে শহীদ করে।

BintalHudaSisterofShahidasSadr

সেখানে তাঁর বোন বিনতুল হুদা সাদ্‌রও শাহাদাতবরণ করেন। বিনতুল হুদা ছিলেন একজন মহান ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তিনি মুসলিম নারীবিষয়ক অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেন। ভাই ও বোন দু’জনই তিন দিন যাবৎ কুখ্যাত সাদ্দামের জেলে বন্দী থাকার পর শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন। কিন্তু সাদ্দাম সরকার জানতো না যে, আল্লাহর পথের সৈনিক নারী-পুরুষদেরকে শহীদ করে-তা তাঁরা নেতা বা কর্মী যে স্তরেরই হোন না কেন-ইসলামী আন্দোলনকে কখনো স্তব্ধ করে দেয়া যায় না। (আল্লাহ্ আয়াতুল্লাহ সাদ্‌র এবং তাঁর সাহসী বোনের ওপর রহম করুন।)

শহীদ আয়াতুল্লাহ সাদ্‌র ও বিনতুল হুদা সাদ্‌র-এর লেখা কতিপয় পুস্তকের নাম এখানে দেয়া হল :

ইসলামের সুদবিহীন ব্যাংক ব্যবস্থা, মূলনীতির নতুন দিক, শাহাদাতের কথা, আমাদের দর্শন, আমাদের অর্থনীতি, ইসলামে শক্তির উৎস, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের মুখবন্ধ, আল্-ফাসিলাহ্ তানতাসের, নারী ও পুরুষ, মুসাফেরাতুল হাজ।


হযরত ইমাম খোমেইনী (র.)-এর দৃষ্টিতে নারীর মর্যাদা

ISFAHAN3p4নারী সম্পর্কে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা হযরত ইমাম খোমেইনী (র.)-এর দৃষ্টিকোণ হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ ইসলামী মানবিক দৃষ্টিকোণ যা সর্বোত্তম প্রগতিশীল দৃষ্টিকোণ। এ দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী তিনি মুসলিম নারীদের সামাজিক ভূমিকাকে বিশ্বের নারীকুলের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছেন। একই সাথে তিনি সমাজে নারীর সক্রিয় ভূমিকা পালন ও ইসলামী বিধি-বিধান মেনে চলার, বিশেষ করে হিজাবের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন : ‘নারীদের ব্যক্তিত্ব প্রদানের জন্য, তাকে মানবিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী করার জন্যই হিজাবের আয়াত নাযিল হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন : ‘নারীরা সামাজিক কর্মকা-সমূহে অংশগ্রহণ করতে পারে, তবে হিজাব সহকারে।’

হযরত ইমাম খোমেইনী (র.)-এর দৃষ্টিতে যে কোন সমাজব্যবস্থার জন্যই নারী হচ্ছে সর্বাধিক প্রভাবশালী স্তম্ভ এবং নারীর ভাল ও মন্দ হওয়ার বিষয়টি সমাজের ওপর বিরাট গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তাই আধুনিক জাহেলিয়্যাতের এ যুগে ইসলামের মুক্তিদাতা আদর্শের মহান সন্তান হিসেবে হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) নারীর ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ও মর্যাদা পুনরুজ্জীবনের জন্য নিরলস চেষ্টা-সাধনা করে যান।

হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) তাঁর সুদীর্ঘ জীবনের প্রতিটি স্তরেই নারীর মর্যাদাকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে সোচ্চার ছিলেন এবং এ কারণে নারী সম্পর্কে তাঁর সকল উক্তি একত্র করা হলে একটি বিরাট সংকলনের রূপ নেবে। তিনি মানবজীবনের প্রতিটি বিভাগেই নারীর মর্যাদাকে সমুন্নত করে তুলে ধরেছেন। এখানে আমরা তাঁর কয়েকটি উক্তি তুলে ধরে বিষয়টির ওপর অত্যন্ত সংক্ষেপে আলোকপাত করছি।

ইসলামে নারী-পুরুষের সমমর্যাদা

হযরত ইমাম খোমেইনী মনে করেন ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম মর্যাদা দিয়েছে। যেসব লোক মনে করে যে, ইসলাম নারীকে পুরুষের তুলনায় কম গুরুত্ব ও অধিকার দিয়েছে তাদের ধারণার প্রতিবাদ করে তিনি বলেন :

‘ইসলাম হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম পথনির্দেশ যা মানবিক মূল্যবোধের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের মধ্যকার সমতাকে পূর্ণতা প্রদান করেছে। ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য করেনি এবং যে কেউ এ ছাড়া অন্য কোন ধারণা পোষণ করে সে ইসলামকে সঠিকভাবে জানে না। ইসলাম নারীর অবমাননা করেনি এবং তাকে অবমাননা করার অনুমতিও দেয়নি। জ্ঞানার্জন, কাজকর্ম, সমাজ গঠন ও ইসলামী দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে ইসলাম নারী ও পুরুষকে অভিন্ন গণ্য করেছে।’

নারীর সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকার তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি

তিনি বলেন : ‘নারীর বিভিন্ন বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে ঠিক যেভাবে পুরুষেরও রয়েছে; মানুষের প্রাকৃতিক গঠনরূপজনিত এ মর্যাদা হচ্ছে তার জন্য তুচ্ছতম মর্যাদা। এটা যেমন নারীর জন্য তুচ্ছতম মর্যাদা, তেমনি পুরুষের জন্যও তুচ্ছতম মর্যাদা। এ তুচ্ছতম মর্যাদা থেকেই পূর্ণতা অভিমুখে তার অভিযাত্রা। মানুষ হচ্ছে এক গতিশীল সৃষ্টি; প্রাকৃতিক মর্যাদা থেকে গায়েবের দিকে- আল্লাহ্তে ফানা (বিলীন) হবার দিকে তার অভিযাত্রা।’

ইমাম খোমেইনী ইসলামের দৃষ্টিতে বহিরাঙ্গনে নারীর ভূমিকাকে সমর্থন করতে গিয়ে ইসলামের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন : ‘ইসলামের প্রথম যুগে নারীরা ময়দানসমূহে অবতীর্ণ হতেন; তাঁরা ইসলামী যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ করেন। তখন নারীরা আহতদের সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য রণাঙ্গনসমূহে যেতেন।’

জ্ঞানার্জন ও কর্মতৎপরতায় নারী পুরোপুরি স্বাধীন

নারীকে শিক্ষা, জ্ঞানার্জন ও কর্মতৎপরতা থেকে দূরে রাখা ও চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য করার কঠোর সমালোচনা করেছেন হযরত ইমাম খোমেইনী (র.)। তাঁর মতে, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আদৌ ইসলামসম্মত নয়। তিনি ১৩ নভেম্বর ১৯৭৯ তারিখে একজন জার্মান সাংবাদিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে ‘ইসলাম নারীর স্বাধীনতা ও জ্ঞানার্জনের বিরোধী’ মর্মে পাশ্চাত্যে প্রচলিত ইসলামবিরোধী বিষাক্ত অপ্রপচার খণ্ডন করে বলেন : ‘আপনারা মুসলিম নারীদের সম্বন্ধে ও অন্যান্য বিষয়ে যা কিছু শুনেছেন তার সবই শাহ্ ও মতলববাজ লোকদের প্রচার মাত্র। নারীরা পুরোপুরি স্বাধীন এবং তারা জ্ঞানার্জনেও পুরোপুরি স্বাধীন। অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে পুরুষরা যেমন স্বাধীন ঠিক সেভাবে তারাও স্বাধীন।’

ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের অব্যবহিত পূর্বে ১৯৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বর লস এঞ্জেলেস্ টাইমস্-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমাম বলেন : ‘ইসলামী সমাজে নারীরা স্বাধীন এবং বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত ও সভা-সমিতিতে গমনে কোনভাবেই তাদের বাধা দেয়া হয় না; যেটুকু বাধা দেয়া হয় তা হচ্ছে অনৈতিকতার বিষয়ে যে ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান এবং তা উভয়ের জন্যই হারাম।’

ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজে নারীর ভূমিকা

হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) ইসলামের দৃষ্টিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর উপস্থিতি ও তৎপরতার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেন : ‘ইসলামের দৃষ্টিতে নারীরা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অধিকারী। ইসলাম নারীকে এতখানি সমুন্নত করেছে যাতে সে সমাজের বুকে স্বীয় মানবিক অবস্থান ফিরে পেতে পারে এবং তাকে যে একটি ‘পণ্য’ মনে করা হত সে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। আর এর ফলে তার পক্ষে এতখানি বিকাশের অধিকারী হওয়া সম্ভব যাতে সে ইসলামী রাষ্ট্রে দায়িত্ব পালন করতে পারে।’

তিনি নারীদের রাজনৈতিক তৎপরতার অধিকারের ওপর জোর দিয়ে বলেন : ‘রাজনীতির মানে হচ্ছে দেশের শাসনকার্য পরিচালনা করা এবং দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। এ অর্থে এ দেশের সকল জনগণই এ কাজে অধিকার রাখে। নারীরা রাজনীতিতে প্রবেশের পুরোপুরি অধিকার রাখে এবং এ কাজ করা তাদের কর্তব্যও বটে।’

তিনি আরও বলেন : ‘নারীকে পুরুষের সমান অধিকার পেতে হবে। ইসলাম নারী ও পুরুষের সমতার ওপরে গুরুত্ব আরোপ করেছে। ইসলাম তাদের উভয়কেই স্বীয় ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দিয়েছে এবং তাদেরকে সকল অধিকারের অধিকারী করেছে- নির্বাচন করার, রায় দেয়ার ও নির্বাচিত হবার অধিকার দিয়েছে।’

ইসলামী বিপ্লবে নারীদের ভূমিকার মূল্যায়ন

এটা সর্বজনবিদিত যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পূর্বে সুদীর্ঘ এক যুগেরও বেশিকাল যাবৎ ইমামের অনুসারীরা দ্বীনের বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালনা করেন, আর এ আন্দোলনে কেবল পুরুষরাই অংশগ্রহণ করেননি, নারীরাও অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাঁদের অনেকে শহীদ বা আহত হয়েছেন। এছাড়া বিপ্লবের বিজয় প্রক্রিয়ায় এবং বিপ্লবোত্তরকালে বিশ্ব শয়তানী চক্রের উস্কানিতে সাদ্দাম কর্তৃক ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধেও নারীরা পবিত্র প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন। ইমাম খোমেইনী (র.) ইরানের মুসলিম নারীদের এ গৌরবময় ভূমিকার কথা বিভিন্ন সময় তুলে ধরেন। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন, বিপ্লব ও প্রতিরক্ষা যুদ্ধে ইরানী মুসলিম নারীদের সবচেয়ে বড় ও সর্বাধিক গৌরবময় ভূমিকা হচ্ছে স্বীয় প্রিয়জনদের আন্দোলন, বিপ্লব ও যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধকরণ- মা, বোন ও স্ত্রী হিসেবে যে ত্যাগের কোন তুলনা নেই। এ ত্যাগের মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইমাম বলেন : ‘পুরুষরা যেভাবে ময়দানে উপস্থিত ছিলেন সম্মানিত মহিলারাও সেভাবেই ময়দানে উপস্থিত ছিলেন; বরং বলা চলে যে, তাঁদের ভূমিকা ও তাঁদের চেষ্টা-সাধনা পুরুষদের তুলনায় বেশি ছিল। কারণ, নারীরা ময়দানে প্রবেশ করলে ময়দানে পুরুষদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়, দশ গুণ হয়; পুরুষদের পক্ষে এটা দেখা সম্ভব নয় যে, নারীরা ময়দানে প্রবেশ করেছেন, আর তারা পাশে সরে রয়েছেন।’

এ প্রসঙ্গে তিনি ইরানী মুসলিম নারীদের সম্বোধন করে বলেন : ‘আপনারা- মহিলারা প্রমাণ করেছেন যে, আপনারা সামনের কাতারে রয়েছেন। আপনারা পুরুষদের তুলনায় অগ্রবর্তী। পুরুষরা আপনাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছে। ইরানের পুরুষরা ইরানের পর্দানশীলাদের কাছ থেকে, ইরানের নারীদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি নারীদের প্রত্যক্ষ আত্মত্যাগের কথাও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন : ‘নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি অভ্যুত্থান করেন এবং স্বীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হন; তাঁরা শাহের বিরুদ্ধে নিন্দা জানান। এর ফলে বহুলপ্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, কালো শুক্রবারের ঘটনায় ছয়শ’ মুক্তিকামী নারী শাহের ভাড়াটেদের হাতে নিহত হন।’

নারীর কোলই সমাজের সৌভাগ্যের উৎসস্থল

ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ইরানের মুসলিম নারী সমাজ যে গৌরবময় ভূমিকা পালন করে তার ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি বলেন : ‘সমাজে নারীর এক বিরাট ভূমিকা রয়েছে। নারী হচ্ছে মানব প্রজাতির আশা-আকাক্সক্ষাসমূহ বাস্তবায়নের অন্যতম মাধ্যম। কারণ, নারী হচ্ছে সম্মানার্হ, নারী পুরুষদের লালনকারী। তারা সমাজের শিক্ষক; নারী মানব প্রজাতির সদস্যদের শিক্ষক। জাতিসমূহের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য নারীর উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। উপযুক্ত শিক্ষা পেলে নারী প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে এবং তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া হলে সে দেশকে গড়ে তোলে।’

হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) সমাজে নারীর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন : ‘নারী হচ্ছে সকল কল্যাণের উৎস। বিশ্বের বুকে নারীর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বৈশিষ্ট্যাবলির অধিকারী। একটি সমাজের ভাল ও মন্দ- কল্যাণ ও অকল্যাণ ঐ সমাজের নারীর ভাল ও মন্দ হওয়া থেকে উৎসারিত।’

ইমাম খোমেইনী আরও বলেন : ‘আমাদের যুগের নারীরা প্রমাণ করেছেন যে, পবিত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁরা পুরুষদের সমকক্ষ; বরং তাঁদের চেয়েও অগ্রবর্তী। নৈতিক পূত-পবিত্রতার বহিঃপ্রকাশ এই নারীরা সংগ্রামের ক্ষেত্রে যেমন অগ্রবর্তী ছিলেন, তেমনি স্বীয় ধনসম্পদ দানের ক্ষেত্রেও তাঁরা অগ্রবর্তী।’

ইমামের দৃষ্টিতে নারীর মাতৃভূমিকার গুরুত্ব

ইমাম খোমেইনীর চিন্তাধারায় পরিবার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অবস্থানের অধিকারী। মানবিক আবেগ-অনুভূতির উৎস ও বহিঃপ্রকাশ ক্ষেত্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবার হচ্ছে সমাজের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিধানের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। আর এ পরিবারের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন মা। বস্তুত সন্তানের লালন-পালন ও তাকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) বিভিন্ন সময় বলেন : ‘মায়ের কোল হচ্ছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানে শিশুকে শিক্ষা দেয়া হয়; আর এটা হচ্ছে শিক্ষকতার কাজ যা বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, মহান মানবগণ মহান মাতাদের দ্বারা প্রদত্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণেরই ফসল।’

ইমাম খোমেইনী (র.) মানবগঠনে নারীর ভূমিকার গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন : ‘কুরআন মাজীদ মানুষকে শিক্ষা প্রদান করে, তেমনি নারীও মানুষকে শিক্ষাদান করে।’

ইমাম খোমেইনীর এ উক্তি থেকে সুস্পষ্ট যে, যেসব মা সন্তানদের যথাযথভাবে লালন-পালন করেন এবং সুশিক্ষা দিয়ে সুসন্তানরূপে গড়ে তোলেন তাঁরা নবী-রাসূলগণের ভূমিকার অনুরূপ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মতে একটি জাতির সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য নির্ভর করে ঐ জাতির মায়েরা তাঁদের সন্তানদের কী হিসেবে গড়ে তুলছেন তার ওপরে।

ইমাম মায়েদের সম্বোধন করে বলেন : ‘মানুষ গড়ার লক্ষ্যে-যা আসলে নবী-রাসূলগণের মিশন-আল্লাহ আপনাদের হেফাযত করুন। আপনি যদি একজন সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তোলেন তাহলে হয়ত সে একটি জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। আর, খোদা না করুন, আপনার কোলে যদি একটি কুসন্তান গড়ে ওঠে তাহলে হয়ত তার মাধ্যমে সমাজে অনৈতিকতা বিস্তার লাভ করবে।’ অর্থাৎ তিনি সমাজের ভাল ও মন্দ, নেক আমল ও পাপাচার, কল্যাণ ও অকল্যাণ, উত্তম কর্ম ও অনাচার, জাতির খেদমত ও দুর্নীতি ইত্যাদির জন্য মায়ের ভূমিকাকে সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করেন।

ইমাম খোমেইনী মনে করেন যে, সন্তানের জন্য জীবনযাত্রার কঠিন সংগ্রামে ও প্রতিকূল পরিবেশে মা-ই হচ্ছেন সর্বোত্তম আশ্রয়স্থল। সমস্যা ও সঙ্কটের মুখোমুখি পরিস্থিতিতে সন্তানের জন্য মায়ের সান্ত্বনা এবং স্নেহ-মমতা ও ভালবাসার ন্যায় আর কোন মনস্তাত্ত্বিক নিরাময়কারী নেই। কারণ, এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেবল মায়ের পক্ষেই সর্বাধিক সান্ত্বনা প্রদান করা সম্ভব।

ইমামের দৃষ্টিতে সামাজিক অঙ্গনে নারীর উপস্থিতির গুরুত্ব

হযরত ইমাম খোমেইনী (র.) তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসমূহে মুসলিম নারীদের সক্রিয় উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি যথোপযুক্ত সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর বার বার জোর দিয়েছেন। তাঁর এ ধরনের উক্তিতে যেসব দিকের উল্লেখ রয়েছে আমরা এখানে সংক্ষেপে সেসব দিকের উল্লেখ করছি। এগুলো হচ্ছে :

*     ইসলামী সমাজ গঠন ও এ সমাজের জন্য যথোপযুক্ত মানুষ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা।

*     ইরানের ইসলামী বিপ্লবে মুসলিম নারীদের ভূমিকা।

*     ইসলামী সমাজের সামাজিক অঙ্গনসমূহে নারীদের সক্রিয় উপস্থিতির গুরুত্ব।

*     সুস্থ সমাজ গঠন ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত পবিত্র সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা।

*    অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতাসহ সকল অঙ্গনে তৎপরতার ক্ষেত্রে নারীদের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা।

হযরত ইমাম খোমেইনী (র.)-এর বিভিন্ন ভাষণ ও বিবৃতিতে নারী সম্পর্কিত যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে এবং তাতে নারীর জন্য যে গুরুত্ব ও মর্যাদা স্থান লাভ করেছে তার ভিত্তিতে আমরা এ উপসংহারে উপনীত হতে পারি যে, একটি ইসলামী সমাজে মুসলিম নারীরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালনে সক্ষম শুধু তা-ই নয়; বরং এসব অঙ্গনে তার পক্ষে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করা সম্ভব এবং তা পালন করা অপরিহার্যও বটে। এ কারণে ইমাম মনে করেন যে, সমাজে নারীর মর্যাদার উন্নয়ন, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সমাজের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের মতামত প্রকাশ অপরিহার্য প্রয়োজন। আর এটাকে তিনি কেবল তাদের অধিকারই মনে করেন না; বরং তাঁর মতে, তাদেরকে এ অধিকার প্রদান দ্বীনী দৃষ্টিতে এক অপরিহার্য কর্তব্য। অতএব, যারা দ্বীনী বিধি-বিধান ও ঐশী আদেশ-নিষেধ পালন করতে চায় তাদের জন্য নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান অপরিহার্য।

ইমামের এ দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি যা ইসলামকে সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য করে। কারণ, অন্যান্য ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের বিপরীতে ইসলাম নারীর ব্যক্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার দিয়েছে এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসমূহে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতি সমর্থন দিয়েছে।

হযরত ইমাম খোমেইনী (র.)-এর অনন্য সমুন্নত দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী হচ্ছে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অক্ষ ও ইসলামী সমাজব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাই তাকে মানুষ হিসেবে তার যথাযথ ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়ে গোটা সমাজের স্বার্থে তার মানবিক ও সৃজনশীল প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে অধিকতর উত্তমরূপে কাজে লাগানো অপরিহার্য।

ইন্টারনেট সূত্র অবলম্বনে

আবু মারুফ


বই পরিচিতি

নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.)

লেখক     : হযরত আয়াতুল্লাহ আল-উযমা সাইয়েদ মোহাম্মদ হুসাইন ফাযলুল্লাহ (রহ.)

ভাষান্তর   : মোহাম্মদ মিজানুর রহমান

প্রকাশক   : হযরত আয়াতুল্লাহ আল-উযমা সাইয়েদ মোহাম্মদ হুসাইন ফাযলুল্লাহর দপ্তর, কোম ইরান এবং আঞ্জুমান-এ-পাঞ্জাতানী, খুলনা, বাংলাদেশ

প্রথম প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১০

২য় সংস্করণ: ৪ আগস্ট, ২০১২

মূল্য        : ১৫০ টাকা

হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.) বেহেশতের নারীদের নেত্রী। মুসলিম জাতির পূর্ণতার পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য যেসকল মহান ব্যক্তিত্বের জীবনী অধ্যয়ন করা অতীব প্রয়োজনীয় তাঁদের অন্যতম হলেন হযরত ফাতেমা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল বাংলা ভাষায় হযরত ফাতেমার জীবনী সংক্রান্ত গ্রন্থ নিতান্তই অপ্রতুল। ‘নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.)’ গ্রন্থটি হযরত ফাতেমার মহিমান্বিত জীবনাদর্শ ও ফজিলত সম্পর্কে লেবাননের প্রখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মুহাম্মদ হুসাইন ফাযলুল্লাহর কিছু জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য ও লেখনির সংকলন। এ গ্রন্থে নবী নন্দিনীর বরকতময় জীবনের বিভিন্ন শিক্ষামূলক দিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও সুনিপূণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

আমরা গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করছি।


নারীকুল নেত্রী হযরত ফাতেমা যাহরা

fatima-2বিশ্বনারীকুল নেত্রী হযরত ফাতেমা যাহরা (সালামুল্লাহ্ ‘আলাইহা) ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর কন্যা। সারা বিশ্বের মুসলমানগণ তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রথমা স্ত্রী হযরত খাদীজা (সা.আ.)-এর গর্ভজাত সন্তান। তিনি মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতের ঘোষণার পঞ্চম বছরে ২০শে জমাদিউস সানি শুক্রবার মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

মহানবী (সা.)-এর আরও কয়েকজন সন্তান ছিলেন। কিন্তু তাঁরা কেউই দীর্ঘ জীবনের অধিকারী ছিলেন না; সকলেই স্বল্প বয়সে ইন্তেকাল করেন। হযরত ফাতেমা যাহরার মাধ্যমেই মহানবী (সা.)-এর বংশধারা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। হযরত ফাতেমা যাহরার জন্মদিবসকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে থাকে।

শৈশবকাল

তৎকালীন আরব সমাজের রীতি ছিল সদ্যজাত শিশুকে লালন-পালন করার জন্য ‘দুধ-মা’ নিয়োগ করা। কিন্তু হযরত ফাতেমা যাহরা জন্মের পর তৎকালীন আরব সমাজের সেই রীতি অনুযায়ী তাঁকে লালন-পালন করার জন্য ‘দুধ-মা’-এর নিকট হস্তান্তর করার পরিবর্তে তাঁর মা নিজেই এ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে মক্কায় পিতা-মাতার নিবিড় সাহচর্যে। তখন কুরাইশদের অত্যাচারে তাঁর পিতা জীবনের কঠিন সময় অতিক্রম করছিলেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায় : একদিন মহানবী (সা.) কা’বা ঘরে নামায আদায় করছিলেন। এ সময় আবু জেহেল ও তার কিছু সাঙ্গপাঙ্গ নবীজীর পিঠের ওপর উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেয়। বিষয়টি জানতে পেরে হযরত ফাতেমা নবীজীর কাছে চলে এলেন এবং নিজ হাতে সেসব নোংরা ময়লা সরিয়ে দেন, আর নবীজীকে কষ্টদানকারীদেরকে তিরস্কার করেন। তাঁর মায়ের ইন্তেকালের পর হযরত ফাতেমাকে এ রকম বহু দুঃখজনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছিল। মা খাদীজার মৃত্যুর পর তাঁর পিতা রাসূলে খোদা (সা.)-কে তিনি এমন ভক্তি সহকারে সেবাযত্ন করতেন যে, তাঁকে ‘উম্মে আবিহা’ অর্থাৎ ‘তাঁর পিতার মা’ হিসেবে অভিহিত করা হতো। রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-কে কুরাইশদের ক্ষতি থেকে রক্ষাকারী তাঁর চাচা হযরত আবু তালিবের মৃত্যু এবং একই বছরে হযরত খাদীজার ইন্তেকাল রাসূলে খোদার পরিবারের জন্য কঠিনতম সময় বয়ে নিয়ে আসে।

হযরত খাদীজার ইন্তেকালের পর পরিবারের দেখা-শোনার জন্য মহানবী (সা.) সাওদা নামক একজন বিধবাকে বিয়ে করেন। শিশু ফাতেমা যাহরাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য সাওদাকে বলা হলে তিনি জবাব দেন, ‘আমি কিভাবে তাঁকে শিক্ষা দিতে পারি যিনি নিজেই একজন পবিত্রা এবং উচ্চ মর্যাদাশীল ব্যক্তিত্ব? তাঁর কাছ থেকে আমার নিজেরই শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।’

তাঁর শিশুকাল এভাবে অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানজনক পরিবেশে অতিবাহিত হয়। তারপর তিনি লক্ষ্য করলেন, তাঁর পিতা মহানবী (সা.) শত্রুবেষ্টিত পরিবেশে ইসলামের বাণী প্রচার করছেন। হযরত আবু তালিব ও হযরত খাদীজার ইন্তেকালের পর এ শত্রুতা প্রকট আকার ধারণ করে। ইসলামের বাণী প্রচারের কারণে কাফেররা মহানবী (সা.)-এর ওপর এত ক্ষিপ্ত হয়েছিল যে, তারা তাঁর ওপর পাথর নিক্ষেপ করে। এতে তাঁর শরীর ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়ে যায়। হযরত ফাতেমা যাহরা রাসূলে খোদার সে ক্ষত-বিক্ষত দেহের শুশ্রূষা করেন।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর জীবন নাশের জন্য শত্রুরা যে পরিকল্পনা করেছিল তা-ও হযরত ফাতেমা  জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু তা জেনেও তিনি ভীত হতাশাগ্রস্ত হন নি।

উপাধিসমূহ

মুসলিম উম্মাহ্র নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে হযরত ফাতেমা যাহরাকে আদর্শ হিসেবে শ্রদ্ধা করে ও ভালবাসে। তাঁর নিজের নামের পাশাপাশি মুসলমানরা অনেক উপনামে তাঁকে অভিহিত করে। এ সব উপনাম হল তাঁর চারিত্রিক গুণাবলির সম্ভ্রমপূর্ণ প্রশংসার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর উপাধি হল আয্-যাহরা – যার অর্থ হল ‘জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্ব’ অথবা ‘আলোকিত মহিয়সী নারী’। সাধারণত তাঁকে ‘ফাতেমা যাহরা’ নামে অভিহিত করা হয়। তিনি উম্মে আবিহা (তাঁর পিতার মা) নামেও পরিচিত। তাঁকে ‘বাতুল’ (পবিত্র ও অপবিত্রতামুক্ত) নামেও অভিহিত করা হয়। তিনি নামায, কুরআন তেলাওয়াত ও ইবাদাত-বন্দেগীতে তাঁর অধিকাংশ সময় ব্যয় করতেন। তাঁর আরও দু’টি নাম ছিল : শারীফা (মহানুভব) ও সাইয়্যেদা (সম্মানিতা নেত্রী)।

হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) সকল মুসলমানের কাছে ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্রী। তিনি ছিলেন পিতার স্নেহধন্য কন্যা, মমতাময়ী মা, দায়িত্বশীল স্ত্রী, একজন একনিষ্ঠ মুসলিম এবং সর্বোপরি নারীদের জন্য একজন পরিপূর্ণ আদর্শ। তাঁর পিতার সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তিনি অন্য মহিলাদের সাথে তুলনীয় ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

হযরত খাদীজার পর হযরত ফাতেমা ঐতিহাসিকভাবে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। হযরত ফাতেমার যোগ্যতা ও পবিত্র ফযীলতের জন্য ইসলামে তাঁর এ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। হযরত ফাতেমার এ অবস্থানকে হযরত মারইয়াম (আ.)-এর অবস্থানের সাথে তুলনা করা যায়। হযরত ফাতেমাহ্ ছিলেন প্রথম মা‘সুম ইমাম হযরত আলী (আ.)-এর স্ত্রী, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ইমাম হাসান ও হোসাইন (আ.)-এর মাতা এবং নবীবংশের বাকি নয়জন মা‘সুম ইমাম তাঁরই বংশধর।

হিজরত

মহান আল্লাহর নির্দেশে হিজরতের সময় হযরত ফাতেমাও নবী পরিবারের অন্যদের সাথে হিজরত করেন। মহানবী (সা.)-এর মদীনায় হিজরতের পর দ্বিতীয় পর্যায়ে হযরত সাওদা, ইমাম আলী (আ.)-এর মাতা ও অপর কিছুসংখ্যক লোক তাঁদের সাথে হিজরত করেন। হিজরতের এ কাফেলায় নেতৃত্ব দেন ইমাম আলী (আ.)।

মহানবী (সা.)-এর হিজরতের পর তিনদিন ইমাম আলী (আ.) মক্কায় অবস্থান করেন। তিনি হিজরতের রাতে নিজের জীবন বাজি রেখে নবীজীর বিছানায় ঘুমান। মক্কার লোকদের গচ্ছিত কিছু আমানত ছিল নবীজীর কাছে, হিজরতের কারণে নবীজী ঐ মালগুলো তার প্রকৃত মালিকদের কাছে পৌঁছাতে পারেন নি। ইমাম আলী (আ.)-এর ওপর দায়িত্ব ছিল সেগুলো প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছে দেয়ার। তিনি দায়িত্বশীলতার সাথে সে কাজটি সম্পন্ন করার পরই মহানবীর পরিবারসহ মদীনায় হিজরত করেন।

বিবাহ

হিজরতের এক বছর পর হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর অনেক সাহাবী হযরত ফাতেমাকে বিবাহ করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাছে প্র্রস্তাব দেন। হযরত আবু বকর ও হযরত ওমরের প্রস্তাবও এর মধ্যে ছিল। কিন্তু রাসূলে আকরাম (সা.) কারো প্রস্তাবেই সম্মতি দেন নি। এ ব্যাপারে তিনি মহান আল্লাহর নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বলে সবাইকে আশ্বস্ত করেন।

রাসূলে আকরাম (সা.)-এর চাচাতো ভাই হযরত আলী বিন আবু তালিব (আ.)ও হযরত ফাতেমা (সা. আ.)-এর ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু তিনি মুখে কিছুই বলেন নি। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইমাম আলীর এ মনোভাব বুঝতে পারেন। তিনি ফাতেমা (সা.আ.)-কে আলীর সাথে বিয়ে দিতে চান। তিনি উভয়ের কাছে এ কথা উপস্থাপন করলে তাঁরা দু’জনই এ ব্যাপারে মৌন থাকেন। রাসূলে আকরাম (সা.) দু’জনের মৌনতাকে সম্মতি হিসেবে ধরে নেন এবং বিবাহের আয়োজন করেন।

হযরত ফাতেমা ছিলেন নবুওয়াতী ধারায় নারীদের জন্য আদর্শ। অন্যদিকে হযরত আলী (আ.) ছিলেন নবুওয়াতী মিশনের পর প্রথম উলিল আমর বা ইমাম। তাঁরা ছিলেন উত্তম দম্পতির এক অনন্য উদাহরণ।

এ দম্পতির বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা ছিল খুবই সাধারণ। রাসূলে খোদা (সা.) আলী (আ.)-কে ডেকে তাঁর ঢালটি বিক্রি করে বিয়ের জন্য অর্থ যোগাড় করার পরামর্শ দেন। হযরত আলী ঢালটি বিক্রি করে দুশ’ দিরহাম পান যা দিয়ে তিনি হযরত ফাতেমার দেনমোহর পরিশোধ করেন।

রাসূলে আকরাম (সা.) সমপরিমাণ দিরহাম মিলিয়ে নব-দম্পতির ঘরের জন্য কিছু জিনিস ক্রয় করার জন্য তাঁর সাহাবীদের কাছে দেন। বিবাহের যাবতীয় কাজ মহানবী (সা.) স্বীয় তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করেন। বিয়ের পর নব-দম্পতির জন্য আলাদা একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হয় মসজিদে নববীর এলাকার ভেতরে নবীজীর ঘরের কাছাকাছি।

তাঁদের বিবাহের তারিখ নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। তবে ধরে নেয়া হয় যে, তাঁদের বিবাহের সাল ছিল ৬২৩ খ্রিস্টাব্দ, হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষ। আবার কিছু উৎস থেকে বর্ণিত হয়, সালটা ছিল ৬২২ খ্রিস্টাব্দ। হযরত ফাতেমা (আ.)-এর ওফাত পর্যন্ত তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল প্রায় দশ বছর।

সন্তানাদি

হযরত ফাতেমা (সা.আ.) ছিলেন দুই পুত্রসন্তান ও দুই কন্যাসন্তান-এর মাতা। হযরত হাসান জন্মগ্রহণ করেন তৃতীয় হিজরিতে ও হযরত হোসাইন জন্মগ্রহণ করেন চতুর্থ হিজরিতে। তাঁর প্রথম কন্যা হযরত যায়নাব ষষ্ঠ হিজরিতে ও দ্বিতীয় কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম সপ্তম হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন।

রাসূলে আকরাম (সা.)-এর বংশধর বলতে হযরত ফাতেমা যাহরার বংশধারাকেই বুঝানো হয়।

কুরআন মজীদে ফাতেমা (সা.আ.)-এর ফযিলত

কুরআন মজীদের কিছুসংখ্যক আয়াত ফাতেমা (সা.আ.) ও তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যগণের উচ্চ মর্যাদার শানে অবতীর্ণ হয়েছে, যদিও আয়াতগুলোতে তাঁদের নাম উল্লেখ করা হয় নি। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু’টি আয়াত হল সূরা আল্-আহ্যাবের ৩৩ নং আয়াত ও সূরা আলে ইমরানের ৬১ নং আয়াত। সূরা আল্-আহ্যাবের উক্ত আয়াতের শানে নুযুলে তাঁদেরকে (মহানবী, আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন) বলা হয়েছে ‘নবীর পরিবার’ (আহলে বাইত)। এ আয়াত দ্বারা সাধারণভাবে বোঝা যায়, রাসূলে আকরাম (সা.) ফাতেমা (সা.আ.) ও তাঁর স্বামী আলী (আ.) এবং তাঁদের দুই পুত্রসন্তান একই পরিবারভুক্ত। দ্বিতীয় আয়াতে খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলের সামনে চ্যালেঞ্জ (মুবাহালা) প্রসঙ্গে তাঁদের পূতপবিত্র সত্তার প্রতি ইঙ্গিত করে হযরত ফাতেমার মর্যাদার গুপ্ত রহস্যের প্রকাশ ঘটানো হয়েছে।

মুবাহালার আয়াত নাযিলের সেই সঙ্কটজনক সময়ে আল্লাহ তা‘আলা যাঁদেরকে বিশেষ মানুষ হিসেবে প্রদর্শন করেন এবং অন্য সকলের ধ্বংস হওয়ার বিপরীতে তাঁদের নিরাপত্তার জামিনদার হন তাঁদের একজন ছিলেন হযরত ফাতেমা যাহরা।

এক হাদীসের বর্ণনা মতে, কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৪২ নং আয়াতের তাফসীরে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) হযরত ফাতেমা যাহরাকে হযরত ঈসা (আ.)-এর মাতা হযরত মারইয়ামের প্রশংসার সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছেন। এ হাদীস মতে, দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ চার নারী হলেন হযরত ঈসা (আ.)-এর মাতা হযরত মারইয়াম, ফিরআউনের স্ত্রী হযরত আছীয়া, মহানবী (সা.)-এর স্ত্রী হযরত খাদীজা ও তাঁর কন্যা হযরত ফাতেমা। তবে বর্ণনাকারীদের মতে এ চারজন মহিলার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন হযরত ফাতেমা যাহরা।

ওফাত

বিদায় হজ্বের পর হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) হযরত ফাতেমাকে তাঁর ইন্তেকালের আগাম খবর দেন এবং বলেন, ‘আমার আহলে বাইতের সদস্যদের মধ্যে তুমি আমার সাথে শীঘ্রই মিলিত হবে।’ কিছুদিন পর মহানবী (সা.) ইহধাম ত্যাগ করেন। হযরত ফাতেমা  খুবই দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং এ অবস্থার মধ্য দিয়ে ওফাত পর্যন্ত তিনি তাঁর জীবনের প্রায় নব্বই দিন অতিবাহিত করেন ।

হযরত ফাতেমার দাসী আসমা বিনতে উমাইস তাঁর ওফাতের কাহিনী বর্ণনা করেন। ওফাতের দিন তিনি বাচ্চাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করেন এবং আসমাকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে তিনি তাঁর ইবাদাতের কক্ষে চলে যান। তিনি কিছুক্ষণ পর তাঁর কক্ষের মধ্যে জোরে জোরে তাকবীর ধ্বনি দিতে থাকেন। আসমা যখন তাঁর তাকবীর ধ্বনি আর শুনতে পেলেন না তখন মসজিদে গিয়ে আলী (আ.)-কে তাঁর স্ত্রীর ওফাতের খবর দিলেন।

আসমার প্রতি নির্দেশ ছিল ছেলে-মেয়েরা ঘরে ফিরে এলে এ খবর দেয়ার পূর্বেই তাঁদের খাবার খাইয়ে দিতে হবে। আসমা সে কাজটিই করলেন। ইমাম হাসান ও হোসাইন এলে তিনি তাঁদের খাবার দিলেন। তাঁরা তাঁদের মায়ের হাতে ছাড়া খাবেন না বলে বায়না ধরলে আসমা তাঁদের মায়ের ওফাতের খবর দেন। তাঁরা মায়ের ঘরে প্রবেশ করার পর পরই ইমাম আলী (আ.) সেখানে উপস্থিত হন এবং নিজেকে সামলে নিয়ে কাফন-দাফনের প্রস্তুতি নেন।

তাঁকে রাতের অন্ধকারে জান্নাতুল বাকী গোরস্তানে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। রাসূলে আকরাম (সা.)-এর কন্যার জানাজায় কয়েকজন পারিবারিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন। কিছুসংখ্যক ঐতিহাসিক মনে করেন, হযরত ফাতেমাকে তাঁর নিজ ঘরে সমাহিত করা হয়, যে অংশটি মসজিদে নববীর অন্তর্ভুক্ত।


শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামী চিন্তাধারা

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন :

 (إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن نُّطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَّبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرً‌ا ﴿٢﴾ إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرً‌ا وَإِمَّا كَفُورً‌ا ﴿٣

“অবশ্যই পরীক্ষা করার জন্য আমি মিলিত শুক্রবিন্দু হতে মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং এ জন্য তাকে শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন বানিয়েছি। অবশ্যই আমি তাকে পথপ্রদর্শন করেছি; সে কৃতজ্ঞ হতে পারে, হতে পারে অকৃতজ্ঞও।” (সূরা আদ্-দাহর : ২-৩)

ইসলাম হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম জীবনাদর্শ- যা স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং মানবজীবনের প্রতিটি স্তর, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে যার ব্যাপ্তি। ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে সুসংহত প্রশিক্ষণপদ্ধতি যা মেধা ও চারিত্রিক গুণাবলীর উৎকর্ষ সাধন করে – যা মানুষের প্রভু সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা‘আলা স্বভাবজাতভাবে মানুষকে দান করেছেন এবং এ ব্যাপারে বিশাল বিস্তৃত মহাবিশ্বের অন্যান্য সৃষ্টিও যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে।

মানুষ হচ্ছে দু’টি জগতের সমন্বয়। দৈহিক জগৎ ও আধাত্মিক জগৎ। পূর্ণতায় পৌঁছতে হলে তাকে অবশ্যই এই উভয় জগতের জন্য তার নিজের উৎকর্ষ সাধন করতে হবে এবং এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। কুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে :

( إِذْ قَالَ رَ‌بُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرً‌ا مِّن طِينٍ ﴿٧١﴾ فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّ‌وحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ ﴿٧٢

“(হে রাসূল!) স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি কাদামাটি হতে। অতঃপর যখন আমি তাকে সুষম করবো এবং তার ভিতরে আমার চেতনা সঞ্চারিত করবো তখন তোমরা তার প্রতি সেজদাবনত হও।” (সূরা ছ্বাদ্ : ৭১-৭২)

লক্ষণীয় যে, মানুষের বস্তুগত দিকটা বুঝাতে রূপক হিসেবে ‘কাদামাটি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তাই আত্মা বা ঐশীসত্তার দিকটি তার জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ – যা ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের পরিপূর্ণ পবিত্রতার দিকে মানুষকে এগিয়ে নেয়। আর আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করে একাকিত্ব ও অসহায়ত্বের মধ্যে ঠেলে দেন নি। তিনি তাদেরকে অসতর্কভাবে ও প্রশিক্ষণ ছাড়া পাঠান নি। আল্লাহ হচ্ছেন নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক, জগতের মালিক, সবকিছুর প্রভু এবং সকল সৃষ্টজীবের মান ও প্রয়োজনানুযায়ী তাদের শিক্ষাদানের দায়িত্বেও তিনিই রয়েছেন। যেহেতু মানুষ সৃষ্টিসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে, সেহেতু তাকে খলীফাহ্ বা প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে – যে নিজেকে শিক্ষিত করার সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশের অন্যান্য সৃষ্টিকেও সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। আর এজন্যই সে পৃথিবীতে নেতৃত্বের অধিকারী হতে পারে।

আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন :

وَإِذْ قَالَ رَ‌بُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْ‌ضِ خَلِيفَةً ۖ قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ۖ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ ﴿٣٠﴾ وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَ‌ضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَـٰؤُلَاءِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ ﴿٣١﴾ قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ ﴿٣٢﴾ قَالَ يَا آدَمُ أَنبِئْهُم بِأَسْمَائِهِمْ ۖ فَلَمَّا أَنبَأَهُم بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُل لَّكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْ‌ضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنتُمْ تَكْتُمُونَ

“এবং (হে রাসূল!) আপনার রব যখন ফেরেশতাদের বললেন : “আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি পাঠাবো”, তখন তারা বললো : “আপনি কি সেখানে এমন কাউকে পাঠাবেন যে সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ও রক্তপাত ঘটাবে? আমরাই তো আপনার প্রশংসা করছি ও আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি!” তিনি বললেন : “অবশ্যই আমি এমন কিছু জানি যা তোমরা জানো না।” আর তিনি আদমকে সকল নামের মূল (নামকরণের মূলনীতি) শিক্ষা দিলেন, অতঃপর তাকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থিত করলেন, অতঃপর তিনি বললেন : “তোমরা যদি সঠিক কথা বলে থাকো তাহলে আমাকে এসব বস্তুর নাম বলে দাও।” তারা বলল : “তুমি পরম প্রমুক্ত; তুমি আমাদেরকে যতটুকু শিক্ষা দিয়েছো তার বাইরে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই; নিশ্চয়ই তুমিই একমাত্র সর্বজ্ঞ ও মহাজ্ঞানবান।” (তখন) তিনি বললেন : “হে আদম! তাদেরকে এ জিনিসগুলোর নাম জানিয়ে দাও।” যখন সে তাদেরকে সেগুলোর নাম বলে দিলো, তখন তিনি (ফেরেশতাদেরকে) বললেন : “আমি কি তোমাদের বলি নি যে, আমি অবশ্যই আকাশম-ল ও পৃথিবীর সকল রহস্য অবগত এবং তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন কর তার সবই আমি জানি?” (সূরা আল্-বাক্বারাহ্ : ৩০-৩৩)

আদমই ছিলেন একমাত্র সৃষ্টি যিনি এ বিরাট দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পেরেছিলেন। তাঁর ছিল উচ্চ জ্ঞানগত যোগ্যতা। তাই মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাসন করার জন্য নিযুক্ত হয়েছে, নিযুক্ত হয়েছে তাঁর ঐশীবিধান (শরিয়ত) অনুসরণের উদ্দেশ্যে এবং সে-ই একমাত্র সৃষ্টি যাকে স্বাধীন ইচ্ছা দেয়া হয়েছে, আল্লাহর বিধান সে মানতে পারে, না-ও মানতে পারে,  সে ঈমান গ্রহণ করতে পারে কিংবা অস্বীকার করতে পারে।

 (إِنَّا عَرَ‌ضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْ‌ضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَن يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنسَانُ ۖ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا ﴿٧٢

“আমি তো আসমান যমীন ও পর্বতমালার ওপর এ আমানত অর্পণ করেছিলাম, কিন্তু তারা এটা বহন করতে অস্বীকার করল এবং এ বিষয়ে শঙ্কিত হল। আর মানুষ তা বহন করলো; সে তো অতিশয় যালেম অতিশয় অজ্ঞ।”  (সূরা আল্-আহযাব্ : ৭২)

সুতরাং পথপ্রদর্শনের পরও মানুষ কৃতজ্ঞ হতে পারে, না-ও হতে পারে। আচার-আচরণের দোষের কারণে সে পশুর চেয়েও নিকৃষ্টতর পর্যায়ে নিপতিত হতে পারে অথবা সে পূর্ণতা লাভের এমন উচ্চতম স্তরে পৌঁছতে সক্ষম যেখানে ফেরেশতারাও পৌঁছতে পারে না। মনুষ্য সমাজের মধ্যে যারা পূর্ণতা ও আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছতে পেরেছেন তাঁদেরকে মনোনীত করা হয়েছে তাঁর বাণীবাহক বা নবী-রাসূল (আ.) হিসেবে।

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَ‌سُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ

 “তিনি উম্মীদের মধ্যে তাদের একজনকে পাঠিয়েছেন রাসূল রূপে, যিনি তাদের নিকট তাঁর (আল্লাহর) আয়াত আবৃত্তি করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত: ইতিপূর্বে তো তারা ঘোর বিভ্রান্তিতে ছিলো।” (সূরা আল্-জুমুআহ্ : ২)

কুরআন মজীদে উল্লিখিত আয়াতে আমরা লক্ষ্য করি যে, আল্লাহর আয়াত পৌঁছে দেয়ার পর নবী-রাসূলগণের প্রথম দায়িত্ব মানুষকে সংশোধন করা (তাযকীয়াহ্), এরপর তাদেরকে ঐশী আইন-বিধান ও অন্যান্য জ্ঞান শিক্ষা দেয়া।

জ্ঞান সব সময়ই মানবজাতির জন্য কল্যণকর হয় না, বিশেষ করে যদি তা সংশোধন ও অর্থবহ দিকনির্দেশের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়। কোনো কোনো জ্ঞান তো সমাজকে বিরাট বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে অথবা সমাজকে বস্তুগতভাবে কিংবা আধ্যাত্মিকভাবে ধ্বংসও করতে পারে। দুর্ভাগ্যবশতঃ অধুনা জ্ঞান ও বিজ্ঞানকে পরিশক্তিগুলো মানুষের অজ্ঞতা, দারিদ্র্য ও দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করার কাজে অপব্যবহার করছে।

নবী-রাসূলগণের (আ.) আগমন ঘটেছে মানুষের অন্তর ও আত্মাকে পবিত্রকরণের জন্য, ওহী-নিয়ন্ত্রিত জ্ঞান দ্বারা শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে এবং তাদেরকে নির্ভুল পথপ্রদর্শনের অভিপ্রায়ে। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর নীতি নবী-রাসূলগণের নীতির বিপরীত। মানুষকে এখন ভেবে দেখতে হবে, তারা ‘কৃতজ্ঞ হবে অথবা অকৃতজ্ঞ হবে’।


সম্পাদকীয়

নওরোয

ইরানী নববর্ষ – নওরোয-এর উৎসব ইরানী জনগণের সুপ্রাচীন সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অংশ। প্রধানতঃ ২১ শে মার্চ ইরানী বছরের প্রথম দিনে নওরোয উৎসব পালিত হয়ে থাকে। প্রাচীন ইরানের সাসানী রাজবংশের শাসনামলে (২৬২ থেকে ৬৫২ খ্রিস্টাব্দ) নওরোয উৎসব প্রচলিত ছিল বলে বহু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তাখতে জামশীদে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, ইরানে হাখামানেশী রাজবংশের পূর্ববর্তী মদ্ রাজবংশের শাসনামলেও অত্যন্ত ধুমধামের সাথে নওরোযের উৎসব পালিত হত। নওরোযের উৎসব পালন হাজার হাজার বছর ধরে এতটাই ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি লাভ করে যে, এমনকি বর্তমানে ইরান ছাড়াও তুরস্ক, ইরাক, তাজিকিস্তান ও উযবেকিস্তান সহ প্রায় গোটা মধ্য এশিয়ায়, আযারবাইজানে এবং ভারত ও পাকিস্তানের কোন কোন অংশেও এ উৎসব পালিত হচ্ছে।

প্রাচীন ইরানের র্ফাস এলাকায় যরথুস্ত্রীরা নববর্ষের সূচনায় বিভিন্ন প্রতীকী বস্তু দ্বারা সাতটি ট্রে পূর্ণ করে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে উৎসর্গ করত। এই সাতটি ট্রে ছিল সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ঈমান, সুদপদেশ, সৎকর্ম, সৌভাগ্য এবং ক্ষমা ও অমরত্বের প্রতীক। ইসলামী যুগে পরিবর্তিত রূপে এটা অব্যাহত রয়েছে।

প্রাচীন ইরানীদের কিছু কিছু উপলক্ষ ও রেওয়াজ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও জনগণের ধ্যান-ধারণার সাথে মিশে গিয়েছিল। নওরোয এর অন্যতম। সুদীর্ঘ কয়েক হাজার বছরের পুরনো এ ঐতিহ্যটি ইসলামোত্তর ইরানের জনগণের মনে একটি স্থায়ী আসন তৈরি করে  নেয় এবং ইরানের মুসলিম মনীষীগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট লেখালেখি করেন। এছাড়া ইরানের অনেক মুসলিম কবিই নওরোয ও নতুন বছরে প্রকৃতির নবজীবন লাভ নিয়ে কবিতা লিখেছেন।

ইরানী জনগণ বিশেষ দো’আর মাধ্যমে নওরোযকে বরণ করে এবং নওরোযের সূচনায় কুরআন তেলাওয়াত করে ও দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর কাছে নিজেদের ও পরিবারবর্গের জন্য সুস্থতা ও সমৃদ্ধিপূর্ণ একটি সুন্দর বছর প্রার্থনা করে।

এভাবে ইরানীরা নওরোয উৎসবকে ইসলামের পছন্দনীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী ঢেলে সাজিয়েছে। নওরোয উৎসব ইরানী সমাজের জন্য নৈতিক ও সামগ্রিক শিক্ষার সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

বাংলা নববর্ষ

পহেলা বৈশাখ মোতাবেক ১৪ই এপ্রিল বাংলা সনের প্রথম দিন বা বাংলা নববর্ষ। বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম মাস।

বাংলা সন একটি হিজরী সৌর সন। মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে কৃষিনির্ভর বাংলা ভূখণ্ডে কর আদায়ের সুবিধার্থে ফসল তোলা সমাপ্তির পর থেকে নতুন বছর গণনার লক্ষ্যে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। জ্যোতির্বিদ আমীর ফতেউল্লাহ সিরাজী চান্দ্রমাসনির্ভর হিজরী বর্ষপঞ্জী ও সৌরমাসনির্ভর ভারতবর্ষীয় বর্ষপঞ্জী নিয়ে গবেষণা করে এ নতুন সৌরবর্ষপঞ্জীর প্রস্তাব করলে মুঘল সম্রাট আকবর তা গ্রহণ করেন। আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর হিসেবে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দকে ভিত্তিবছর ধরে হিজরী সনসংখ্যাকে বাংলা সনসংখ্যা গণ্য করে তখন থেকে চান্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষে পরিণত করা হয় এবং পারস্যের নওরোয উৎসবের অনুসরণে বাংলা নববর্ষের উৎসব পালন শুরু হয়। পরবর্তীতে বাংলা পঞ্জিকায় কিছুটা সংশোধনী আনা হয় এবং এ সংশোধিত পঞ্জিকা বর্তমানে প্রচলিত আছে। বাংলা নববর্ষের পহেলা বৈশাখ বাংলাভাষী জনগণের কাছে অতি প্রিয় একটি উৎসব। এদিন তারা বিগত বছরের জীর্ণ আর পুরনোকে বিদায় দিয়ে আগামী বছরের দিনগুলোকে সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরিয়ে দিতে নতুনকে আবাহন করে।

১৩৯২ হিজরী শামসী তথা ইরানী বছরের নওরোয ও বাংলা ১৪২০ সালের নববর্ষ উপলক্ষে আমরা নিউজলেটারের পাঠকসহ সবাইকে জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। একই সাথে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আমরা বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।