রবিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

২৮শে সফর হযরত ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৬ 

news-image

২৮ সফর হযরত ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাত দিবস। ৫০ হিজরির এই দিনে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তিনি মদীনায় শাহাদাত বরণ করেন। মদীনার জান্নাতুল বাকীতে তাঁর মাজার রয়েছে।

ইমাম হাসান ইবনে আলী আল-মুজতবা (আ.)-এর জন্ম হয়েছিল ৩ হিজরির ১৫ রমজান মঙ্গলবার, মদীনায়। তাঁর শাহাদাতের দিবসটি ছিল বৃহস্পতিবার।

ইমাম হাসান ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর দৌহিত্র এবং আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) ও খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (আ.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর মূল নাম ‘আল-হাসান’। ‘আল-মুজতবা’ ছিল তাঁর উপাধি। আর ‘আবু মুহাম্মাদ’ ছিল তাঁর ডাকনাম।

দৌহিত্রের জন্মের সুসংবাদ শুনেই মহানবী (সা.) স্নেহাস্পদ কন্যার ঘরে যান এবং নবজাতক শিশুকে কোলে তুলে নেন। তিনি শিশুর ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামাত উচ্চারণ করেন এবং আল্লাহর আদেশ অনুসারে তাঁর নাম রাখেন ‘আল-হাসান’।

ইমাম হাসান (আ.)-এর বাল্যজীবনের প্রথম পর্যায়ের সাত বছর অতিবাহিত হয় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মমতাপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায়। তাঁর স্নেহভরা ও মহানুভব পৃষ্ঠপোষকতায় ইমাম হাসান (আ.)-এর মধ্যে তাঁর সকল সৎগুণের বিকাশ ঘটে। মহানবী (সা.) ইমাম হাসানকে তাঁর বাল্যকালেই খোদায়ী জ্ঞান, ধৈর্য, বুদ্ধিমত্তা, উদারতা ও বীরত্বব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ করেন।

মহানবী (সা.)-এর ওপর যখনই কোন অহী অবতীর্ণ হতো এবং তা তিনি তাঁর সাহাবীদের কাছে প্রকাশ করতেন তখনই ইমাম হাসান তা অবহিত হতেন। মহানবী (সা.) নতুন নাযিল হওয়া কোন অহী হযরত ফাতিমা (আ.)-এর কাছে ব্যক্তিগতভাবে জানানোর আগেই তিনি তা হুবহু তেলাওয়াত করে শুনিয়ে তাঁকে হতবাক করে দিতেন। এ ব্যাপারে হযরত ফাতিমাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান যে, ইমাম হাসানের মাধ্যমে ঐ অহী সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন।

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওফাত লাভের পর থেকে ইসলামী বিশ্বে নানা ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতে থাকে। কিন্তু এই ধরনের একটি পরিস্থিতির মধ্যেও ইমাম হাসান (আ.) শান্তিপূর্ণ পন্থায় ইসলামের প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারের পবিত্র মিশনে নিজেকে নিষ্ঠার সাথে নিয়োজিত রাখেন। আর এটাই ছিল তাঁর মহান পিতা ইমাম আলী (আ.)-কে সাথে নিয়ে নবী করিম (সা.)-এর শিক্ষা ও মিশন।

৪০ হিজরির ২১ রমজান আলী (আ.)-এর শাহাদাতের দিন থেকেই ইমাম হাসান (আ.)-এর খলিফা হিসাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ইমাম হাসান (আ.) ছয় মাস খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। অধিকাংশ মুসলমানই তাঁর প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে এবং তাঁর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাইআত গ্রহণ করে। নেতৃত্ব গ্রহণ করতে না করতেই ইমাম হাসানকে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী সিরিয়ার গভর্নর আমীর মুআবিয়ার চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়। অবশ্য আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে মুসলমানদের মধ্যে গণহত্যা পরিহার করার লক্ষ্যে তিনি মুআবিয়ার সাথে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে ইমাম হাসান ইসলামী সমাজকে রক্ষা করেন এবং একটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করেন। কিন্তু এই শান্তিচুক্তির অর্থ কখনই এই ছিল না যে, ইমাম হাসান (আ.) মুআবিয়াকে মেনে নিয়েছিলেন; বরং এর অর্থ ছিল যে, অন্তবর্তী সময়ের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের প্রশাসন মুআবিয়ার ওপর ন্যস্ত থাকবে এই শর্তে যে, তাঁর মৃত্যুর পর তা ইমাম হাসানের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং তারপরে তাঁর উত্তরাধিকারী হবেন ইমাম হোসাইন (আ.)। এই সময় ইমাম হাসান মদীনায় ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

ক্ষমতা গ্রহণের পর আমীর মুআবিয়া শান্তিচুক্তির বিপরীতে নবী-পরিবার ও তাদের প্রতি অনুরক্তদেরকে নানাভাবে প্রবল চাপের মধ্যে রাখে। ইমাম হাসানকে খুবই কষ্ট, কঠোরতা, অত্যাচার-নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে হয়।

ইমাম হাসানের প্রতি তাঁর বিরোধীদের বিদ্বেষ শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করার চক্রান্তে রূপ নেয়। এই চক্রান্তের সাথে যুক্ত হয় ইমাম হাসানের স্ত্রী যাদা। যাদা একদিন ইমাম হাসানকে শরবতের সাথে বিষপান করায় যা তাঁর পাকস্থলিতে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পঞ্চাশ হিজরির ২৮ সফর ইমাম হাসান শাহাদাত বরণ করেন। ইমাম হোসাইন (আ.) ও হাশিমী পরিবারের সদস্যরা তাঁর জানাযা ও দাফনে শরীক হন। মদীনার জান্নাতুল বাকীতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

তাকাওয়া-পরহেজগারীর দিক দিয়ে ইমাম হাসান ছিলেন তাঁর মাতামহ মহানবী (সা.)-এর এক খাঁটি দৃষ্টান্ত তাঁর পিতা ইমাম আলী (আ.)-এর এক স্মারক।

ইমাম হাসান (আ.)-এর কয়েকটি উক্তি

‘তুমি পার্থিব কিছু লাভ করতে ব্যর্থ হলে ধরে নিবে যে, ঐ ধরনের কোন চিন্তাই তোমার মনে আসেনি।’

‘পূর্ণতাপ্রাপ্তির জন্য পরামর্শ দ্বারা পরিচালিত হতে না চাইলে কোন জাতি কখনও পরামর্শের ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে পারে না।’

‘ভালোবাসা বহু দূরের পূর্বপুরুষদের সাথে সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করে এবং ভালোবাসার অভাব পূর্বপুরুষদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের কারণ হতে পারে।’

‘সুযোগ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায় এবং খুব দেরিতে আসে।’

(নিউজলেটার, সেপ্টেম্বর ১৯৯১)