মঙ্গলবার, ১৯শে জুন, ২০১৮ ইং, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

English

১ ফেব্রুয়ারি ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৫ 

news-image

১ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসলামী বিপ্লবের নেতা ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। সুদীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর নির্বাসিত জীবন যাপনের পর ১৯৭৯ সালের এই দিনে তিনি বিজয়ীর বেশে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। তদানীন্তন স্বৈরশাসক ইরানের শাহানশাহ রেযা শাহ পাহলভীর রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে মহান ইমামকে ১৯৬৪ সালের ৪ নভেম্বর থেকে ১৯৬৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তুরস্কে, ১৯৬৫ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭৮ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ইরাকে এবং ১৯৭৮ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭৯ সালের ঐ দিন পর্যন্ত ফ্রান্সে নির্বাচিত জীবন যাপন করতে হয়। ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ইরানে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যকে ত্বরান্বিত ও নিশ্চিত করে তোলে।

ইমামকে নির্বাসনে পাঠিয়ে শাহ ভেবেছিল তার বিরুদ্ধে ইমামসৃষ্ট বিপ্লবী গণ-আন্দোলন বন্ধ করা যাবে। কিন্তু না, তা হিতে বিপরীত হয়। ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী জনগণ তাদের সম্মানিত ও নন্দিত ইমাম খোমেইনীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাপক গণ-আন্দোলন শুরু করে। পর্যায়ক্রমে তা বিক্ষোভ ও বিদ্রোহে রূপ নেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে রেযা শাহ শাপুর বখতিয়ারকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন এবং দেশের প্রচলিত সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী, সেনাবাহিনী প্রধান ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে একটি রাজকীয় পরিষদ গঠন করে ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি কাপুরুষের মতো দেশ ত্যাগ করেন। বিদায় বেলায় ইরানের শাহানশাহ অত্যন্ত হাস্যাস্পদ একটি উক্তি করেছিলেন : ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকদিন বেড়িয়ে আসি।’ কিন্তু দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ও দাম্ভিক শাহ আর কোনোদিন ইরানের মাটিতে পদার্পণ করতে পারেনি। ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর নেতৃত্বে ইরানের মুক্তিকামী তাওহিদী জনতা শাহের ক্ষমতার দর্প চূর্ণ করে দেয়।

বিদায়ের সময় শাহ যে রাজকীয় পরিষদ গঠন করে গিয়েছিলেন, সেই পরিষদের সভাপতি প্রধান বিচারপতি দেশব্যাপী প্রচণ্ড গণজোয়ারের মধ্যে একদিন প্যারিসে গিয়ে হাজির হন এবং ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর নিকট আনুগত্য ঘোষণা করেন। এদিকে, ইমামকে সসম্মানে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে জনগণের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। কিন্তু ক্ষমতাসীন বখতিয়ার সরকার অব্যাহতভাবে ঐ দাবি উপেক্ষা করতে থাকে। অবশেষে দৃঢ়চেতা ইমাম বখতিয়ার সরকারের অনুমতি ছাড়াই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ইমামের আগমনের কথা জানতে পেরে ষড়যন্ত্রকারীরা বিমান বন্দরেই তাঁকে হত্যার চক্রান্ত করেছিল। ইমামের অনুসারীরা বিমান বাহিনীর কতিপয় সদস্য পূর্বাহ্নেই এ কথা জানতে পেরে ইমামকে তা অবহিত করে। কিন্তু নির্ভীক ইমাম নির্দিষ্ট দিনে এবং নির্দিষ্ট ফ্লাইটেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় শাপুর বখতিয়ার তেহরান বিমান বন্দর বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু বিমানের কর্মচারীরা ঐ নির্দেশ উপেক্ষা করে ইমামের বিমানকে নির্বিঘ্নে ইরানে অবতরণের সুযোগ করে দেয়। নির্ধারিত দিনে অর্থাত ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁর ৫০ জন উপদেষ্টা ও ১৫০ জন সাংবাদিকসহ বিজয়ীর বেশে ইরানের মাটিতে পদার্পণ করেন। ইমামের পদার্পণে ইরানের আকাশ, বাতাস, মাটি  আর মানুষ যেন তাদের পালহীন তরীর কাণ্ডারি খুঁজে পায়।

বিপুল উতসাহ আর উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ইমাম খোমেইনীকে সেদিন প্রাণঢালা সম্বর্ধনা দেয়া হয়। এজন্য মেহেরাবাদ বিমান বন্দরে সমবেত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। বিমান বন্দর এবং তার আশেপাশের এলাকায় কোথাও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। দীর্ঘদিন পর প্রাণপ্রিয় নেতাকে নিজেদের মাঝে পেয়ে ইরানী জাতি আনন্দ সাগরে অবগাহন করে। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তেহরানের মেহেরাবাদ বিমান বন্দরে ইমাম খোমেইনীকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রায় ৬০ লক্ষ নারী-পুরুষ সমবেত হয়েছিল। বিশ্ব ইতিহাসে অন্য কোনো নেতা এত বড় অভ্যর্থনা পাননি।