বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুলাই, ২০১৯ ইং, ৩রা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

১৯৯৩ সালের প্রেক্ষাপটে ইসলামী বিপ্লব ও সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ৩০, ২০১৪ 

news-image

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান

ন্যায় ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা মানুষের চিরন্তন। একই সাথে মানবজীবনে অন্যায়, অশান্তি, অন্যায্য ও বিপর্যয়ের কারণও মানুষ নিজেই। মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাও প্রয়াশই যাবতীয় অশান্তি ও বিপর্যয়ের মূল কারণ। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাষ্ট্র কিংবা জাতি ইত্যাকার বিভিন্ন নামে একদল মানুষ বরাবরই এ প্রয়াস চালিয়েছে এবং প্রভুত্ব অব্যাহত রেখেছে।

আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন আল-ইসলাম। তাই মানবজীবনের এই মূল রোগেরই চিকিৎসা করেছে সর্বাগ্রে। মানুষের কাঁধের ওপর থেকে আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছুর আধিপত্য-কর্তৃত্ব সরিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ব্যক্তি জীবনে এ ঘোষণার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে হয় ‘মুসলিম’ এবং সামষ্টিক জীবনে এ ঘোষণাকে কার্যকরী ও বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়েই কোনো সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে সম্পন্ন হয় ইসলামী বিপ্লব। ইসলামী বিপ্লবের অন্তর্নিহিত চেতনা ও প্রেরণা তাই স্বাধীনতা- পূর্ণ স্বাধীনতা। মানুষের দাসত্বের নিগ্রহ থেকে মানবাত্মার মুক্তি ও স্বাধীনতা।

শয়তান ও তাগুতী শক্তির কাছে ইসলাম ও ইসলামী বিপ্লব তাই অসহ্য। নবীদের বেলায় এটি যেমন সত্য ছিল এবং যেমন সত্য ছিল শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবনে, তেমনি আজকের যুগেও। ইসলামী বিপ্লবকে যমদূতের মতোই ভয় পায় বিশ্বলুটেরা তথা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। মযলুম ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা জাতির ওপর দিয়ে দাম্ভিকতা প্রদর্শন তথা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অবসান ঘটবে- এটি কিছুতেই মেনে নিতে পারে না শয়তানি শক্তিসমূহ। ইসলামী বিপ্লবের প্রতিরোধে এরা তাই এঁটেই চলে নিত্য নতুন ফন্দি ও ষড়যন্ত্র।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে নব প্রতিষ্ঠিত এ রাষ্ট্রটিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র একের পর এক মোকাবিলা করেই পথ চলতে হয়েছে। বস্তুত ইরানে আজ অবধি ইসলামী বিপ্লবের স্থায়িত্ব ও তার অব্যাহত অগ্রযাত্রার ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অযুত ষড়যন্ত্র মোকাবিলারই ইতিহাস। এ বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন্য বিশ্বলুটেরা ও ক্ষমতাদর্পী শক্তিসমূহ তাদের পক্ষে অবলম্বন করার মতো কোনো উপায়ই বাকি রাখেনি। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের সকল হিসাব-নিকাশ ভুল প্রমাণ করে ইসলামী বিপ্লব আজো টিকে আছে এবং বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মধ্যে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কেন এবং কিভাবে তাদের মরণ সংবাদ প্রত্যক্ষ করে এবং এ বিপ্লবের বিরুদ্ধে তারা এ পর্যন্ত কি ধরনের ষড়যন্ত্র করেছে এবং এখনও ষড়যন্ত্রের জাল বুনেই চলছে, এ প্রবন্ধে এ সম্পর্কেই সামান্য আলোকপাত করা হয়েছে।

ইসলামী বিপ্লব ও নয়া বিশ্ব মানদণ্ড

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল ষড়যন্ত্রের মূল কারণ এ বিপ্লবের বিশিষ্ট চরিত্র ও অনন্য বৈশিষ্ট্য। অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক সকল দিক থেকেই এর বৈশিষ্ট্য সুপ্রমাণিত। ব্যতিক্রমী কায়দায় এ বিপ্লব জন্মলাভ করে, ব্যতিক্রমী এর নেতৃত্ব এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং জন্মলগ্ন থেকেই এ বিপ্লব সর্ববৃহৎ পরাশক্তি থেকে শুরু করে বিশ্বের ছোট-বড়, ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক সকল দাম্ভিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। ঐশী আদর্শে পুষ্ট ও সুশোভিত এ বিপ্লবের চরিত্র চিত্রণ করতে গিয়ে তাই প্রথমে পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রনীতিবিদ এবং সমাজ বিজ্ঞানীরা মহাসংকটে পড়ে। মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট ডি. লী তাই তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন : “The Islamic revolution appears rebellious and mysterious. Egalitarian yet not socialist or democratic, radical but seemingly traditional, xenophobic but scarcely isolationist, it does not mirror the French, the Russian or the American experience. Social scientific theories of modernization, whether Marxist or liberal-capitalist in inspiration, failed to anticipate the upheaval and have yet to explain it satisfactorily.’ (Robert D. Lee: Islamic Revolution and Authenticity) ।

যাই হোক, ইসলামী বিপ্লবের চরিত্র চিত্রণ করতে গিয়ে মার্কিন অ্যাকাডেমিক সার্কেলে মতপার্থক্য থাকলেও তাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গের একথা উপলব্ধি করতে বিলম্ব হয়নি যে, এ বিপ্লব কস্মিনকালেও তাদের অনুকূলে যাবে না। বরং এর শুরু ও বিকাশ, আহ্বান ও তৎপরতা এবং প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সবটাই বিশ্বব্যাপী মার্কিন নীতি ও পরিকল্পনার মুখোমুখি প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ও শক্তিশালী অবস্থান হারায়। বিপ্লব-পূর্ব ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বৃহত্তম ঘাঁটি হিসাবে মনে করা হতো, কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের বঞ্চিত-নিপীড়িতদের এক নম্বর শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়। বিপ্লবের নেতৃত্ব জনগণকে এ ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক করে তোলে। ফলে আমেরিকান কার্টেল ও ট্রাষ্টগুলোর জাল থেকে বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ তেল অঞ্চল বেরিয়ে গেল; মার্কিনীরা হারালো আরো বহু স্বার্থ। এখানেই শেষ নয়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অল্প দিনের মধ্যেই টের পেল যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়, অর্থাৎ পাশ্চাত্যশিক্ষিত টাই-স্যুট পরা ব্যক্তির স্থলে নিছক পাগড়ি ও আলখেল্লা পরিহিত ‘সনাতন’ ধর্মীয় মোল্লা শ্রেণির কর্তৃত্ব লাভই নয়; বরং এ বিপ্লবের রয়েছে আধ্যাত্মিক, দার্শনিক, মানবিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান; রয়েছে জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে নতুন মানদণ্ড ও উপলব্ধি। এ উপলব্ধি একজন ব্যক্তি মানুষকে ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, ভোগবাদিতা, দুনিয়াপূজারি দাম্ভিক শক্তিসমূহের পদলেহনের ও সেবাবৃত্তির পরিবর্তে তাকে দান করে জীবন সম্পর্কে উন্নততর মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি, আধ্যাত্মিকতা, পরমুখাপেক্ষাহীনতা, নির্ভীকতা, স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা। শয়তানি শক্তিকে ভয় করা কিংবা কুর্নিশ করা নয়, বরং তাকে ও তার সকল পৃষ্ঠপোষককে উৎখাত করার মন্ত্র শিখায় ইসলামী বিপ্লব। এ বিপ্লব আপোস করতে জানে না, প্রতিরোধ করতেই ভালোবাসে, কুফ্র ও কুফ্রি শক্তিকে ছাড় দিতে জানে না, জানে কেবল কুফ্রি শক্তির সাথে সরাসরি লড়াই করতে এবং জেহাদের ঝাণ্ডা সর্বক্ষণ সমুন্নত রাখতে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা, বর্তমান দুনিয়ার বিস্ময় ইমাম খোমেইনী (রহ.) শুরু থেকেই সমস্ত মুসলমান এবং বিশ্বের নির্যাতিত জনগণকে আহ্বান জানাতে থাকেন তারা যেন সাম্রাজ্যবাদের অক্টোপাশ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করার জন্য সচেষ্ট হয় এবং যেসব সরকার ও শাসকগোষ্ঠী জনগণের কষ্টার্জিত পরিশ্রমের ফসল বিশ্বলুটেরার হাতে তুলে দেয় সেসব দুষ্কৃতকারী নাপাক শাসকগোষ্ঠীকে যেন দেশ থেকে বহিষ্কার করে। তিনি বলেন : ‘ইসলামের বিধান হচ্ছে কেউ তোমার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে না, তুমিও কাউকে তোমার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে দিবে না।’ ইমাম খোমেইনী সবাইকে ইসলামের গৌরবময় পতাকাতলে সমবেত হয়ে ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে এবং ইসলামী সরকার কায়েম করে দেশে দেশে স্বাধীন সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাবার আহ্বান জানান। তারপর ‘প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য নয়- ইসলাম, কেবল ইসলাম’- এর নীতিকে ঘোষণা করেন ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসাবে। ফলত ইসলামী বিপ্লব তার এ নয়া বিশ্বমানদণ্ড নিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে পার্শ্ববতী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোসহ দুনিয়ার বিভিন্ন অংশের রাষ্ট্র ও জনপদকে। শংকিত হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদ ও তার তাঁবেদার রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ।

বস্তুত ইসলামী বিপ্লবের এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে তা হয়ে দাঁড়ায় চক্ষুশূল। ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়ার জন্য এ কারণেই শুরু হয় চক্রান্ত। বিপ্লবোত্তর দিনগুলোতে ইসলামী ইরানকে ঘরে ও বাইরে এতসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয় যে, এ বিপ্লবের অস্তিত্ব টিকে থাকা সত্যিই এক বিস্ময়কর ব্যাপার। খোদায়ী এ নেয়ামতকে স্বয়ং খোদা তাআলাই হেফাজত করেছেন। পরীক্ষা নিয়েছেন এ বিপ্লবের সংগঠকদের ও এর অনুরক্তদের। ইরানীরা সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা আর শাহাদাতের নজরানা পেশ করে টিকিয়ে রেখেছেন ইসলামী বিপ্লব নামক চারাগাছটিকে। শাহাদাতের রক্ত থেকে রস সিঞ্চন করেই বিপ্লবের এ চারাগাছটি বেড়ে উঠেছে, সুশোভিত হয়েছে। বিপ্লবোত্তর কালে ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে বিশ্বকুফ্র কী কী ষড়যন্ত্র প্লট তৈরি করে এবং কী কী ষড়যন্ত্র সে বাস্তবায়নের সুযোগ পায় এবারে সেসব নিয়ে আমরা সামান্য আলোচনায় যাব।

বিপ্লবোত্তর ইরান : প্রধান প্রধান ষড়যন্ত্র

বিপ্লবের বিজয়ের পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রথমে চেষ্টা চালায় সন্ত্রাস, অন্তর্ঘাতী তৎপরতা, প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে মদদ দান ও গুপ্তহত্যার মাধ্যমে বিপ্লবকে নিশ্চিত করা কিংবা অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য। বস্তুত বিপ্লবের বিজয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন চররা সন্ত্রাসবাদী কাজ শুরু করে। শহরের রাস্তায় রাতের আঁধারে তারা বহু বিপ্লবী রক্ষী খুন করে। তারপর বিপ্লবের প্রথম সারির নেতাদের খুন করার এক মাস্টার প্লান নিয়ে তারা একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মাত্র দু’মাস পরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম চীফ অব স্টাফ লে. জে. কারানী খুনীদের প্রথম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রখ্যাত জ্ঞানবিশারদ আয়াতুল্লাহ মোতাহহারীকে শহীদ করা হয়। শহীদ মোতাহহারী ছিলেন বিপ্লবী পরিষদের প্রধান এবং জ্ঞানরাজ্যের অনন্য দিকপাল। তাঁর হত্যাই প্রমাণ করে দেয়, ইসলামী বিপ্লবী চিন্তাধারা বিপ্লবের শত্রুদেরকে কতটা আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছিল। ড. বেহেশতী, রাজাই, বাহোনার, মোফাত্তেহ, আল্লামা তাবাতাবাঈ- এর মতো প্রত্যেক ব্যক্তিত্বই শাহাদাতপ্রাপ্ত হন কুফ্‌রি শক্তির টার্গেট হয়ে। হাশেমী রাফসানজানী ও আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর প্রাণনাশেরও চেষ্টা চলে। তাছাড়া নেতৃত্বে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা তথা উপদল সৃষ্টি, নেতৃত্ব সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টির অপপ্রয়াসও কম চলেনি। এসব চক্রান্ত রূপায়িত হয়ে তা ইসলামী বিপ্লবের জন্য শোচনীয় পরিণতি বয়ে আনতে পারত। বিপ্লবের সেবায় নিয়োজিত নেতাদের বদনাম করার মাধ্যমে নেতৃত্বে ভাঙন ধরলে তা বিপ্লবকে এতই দুর্বল করত যে, বিশ্বনিপীড়কদের ইরানে প্রত্যাবর্তনের পথ হতো প্রশস্ত। কিন্তু জনতার সচেতনতা এবং নেতৃত্বের সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়।

এখানেই শেষ নয়। ষড়যন্ত্রকারীরা বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় ষড়যন্ত্র করে, চক্রান্ত করে সরকারি দফতরগুলোতে ও সেনাবাহিনীতে। চরমপন্থী বাম সংগঠনসমূহ ও পূর্বতন শাসকগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে সংঘাত বাঁধায়। বিরোধ সৃষ্টি করে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিসত্তার ছদ্মাবরণে। জাতীয় শিল্পব্যবস্থা ভণ্ডুল করার জন্য কল-কারখানায় উসকে দেয় ধর্মঘট। কৃষি উৎপাদন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে কৃষি ক্ষেত্রে সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা। ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করে অর্থনৈতিক অবরোধ। অপপ্রচার, গুজব ও মিথ্যাচারের সয়লাব বইয়ে দেয়া হয় দুনিয়াময়। বিশ্ব থেকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যেই এসব চালিত হয়েছিল।

তারপর ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম সহায়ক স্তম্ভ ইমামের অনুসারী বিপ্লবী ছাত্রবৃন্দ যখন তেহরানের মার্কিন দূতাবাস (আসলে গোয়েন্দা আখড়া বা স্পাই সেন্টার) ঘেরাও করল, তখন সাম্রাজ্যবাদী-ইহুদিবাদী প্রচার মাধ্যমসমূহ প্রচারণা শুরু করল যে, ‘গোয়েন্দা আস্তানা’ দখলের বিপ্লবী কাজটি বেআইনি এবং তা সকল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু তারা একথার জবাব কখনই দেয়নি যে, কোনো দূতাবাসে গুপ্তচরবৃত্তি ও সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের সরঞ্জাম আইনসিদ্ধ কিনা। উল্লেখ্য, তাদের প্রচারণার মুখে ইরানকে নতজানু করতে ব্যর্থ হয়ে আমেরিকা ১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করে এবং ১৯৮০ সালের ৩০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ব্যাংকসমূহে ইরানী সম্পদ আটক করে। এসব ষড়যন্ত্রেও ইরান নতজানু না হওয়ায় আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপের পথ ধরে।

১৯৮০ সালের ২৫ এপ্রিল ৩ হাজার কমান্ডো, মোটর সাইকেল, সামরিক জীপগাড়ি, প্রচুর গ্রেনেড, কামান ও মেশিনগান নিয়ে ১৮টি পরিবহন বিমান ও ২০টি হেলিকপ্টার লুকিয়ে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং খোরাসান প্রদেশের তাবাস শহরের কাছে এক মরুভূমিতে অবতরণ করে। স্পাই সেন্টারে আটক কূটনীতিক নামধারী ক্রিমিন্যালদের উদ্ধার এবং পাহাড়াদার মুজাহিদ ছাত্রদেরকে খুন করাই ছিল এ অভিযানের উদ্দেশ্য। কিন্তু আল্লাহপাকের কী মহিমা! কী তাঁর গায়েবী সাহায্য! এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে মার্কিন ক্রুরা কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। ফলত তাদেরকে তাবাস মরুভূমিতে ৬টি হেলিকপ্টার, একটি বিমান, কয়েকটি জীপ, ৬টি মোটর সাইকেল, ৩০ হাজার ফাটানো গ্রেনেড এবং কয়েকজন অগ্নিদগ্ধ আমেরিকান কমান্ডোর লাশ ফেলে ইরান ত্যাগ করতে হয়। প্রসঙ্গত সূরা ফীলে কুরআনের ভাষ্যে অনুরূপ এক ঘটনার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ইসলাম আগমনের পূর্ব সময়ের আরবে হস্তিসজ্জিত এক বিশাল বাহিনী পবিত্র কাবা ধ্বংস করতে আসে। তারা মক্কা আক্রমণ করে। কিন্তু ঐ বাহিনীর সকলেই খুব উঁচু থেকে অসংখ্য ছোট ছোট পাখির ফেলা ক্ষুদ্র প্রস্তর খণ্ডে ধ্বংস হয়। ইরানী জাতি দেখল, আল্লাহর ইচ্ছায় তাবাস মরুভূমিতে বালুকণা বাতাসে উড়তে থাকে, এতে অন্ধ হয়ে পড়ে শত্রু ও তার হেলিকপ্টারগুলো।

একদল প্রতারিত সেনা ও পলাতক চরের সাহায্যে ইসলামী সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোই ছিল ইরানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের পরবর্তী চক্রান্ত। এ দায়িত্ব বখতিয়ারের ওপর অর্পণ করে আমেরিকা সরকার। প্রয়োজনীয় সবকিছুর সরবরাহও করা হয়। কিন্তু আল্লাহপাক ইসলামী বিপ্লবকে হেফাজত করেছেন। ইসলামী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ১৯৮০ সালের ৯ জুলাই রাতে অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগে চক্রান্ত সংশ্লিষ্ট চরদের গ্রেফতার করে। এ অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় অভ্যুত্থানের উদ্যোক্তারা তেহরান ও কোমে, বিশেষত ইমাম খোমেইনীর বাড়িতে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বোমা  বর্ষণের পরিকল্পনা করেছিল। এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মধ্যে ছিল মজলিস ও বিপ্লবী রক্ষী কেন্দ্রসমূহের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো।

এতসব কেলেংকারিজনক প্রচেষ্টা ও পরাজয়ের পর আমেরিকা ইরানে একটি উদারনৈতিক (অন্য কথায় মার্কিনীদের অনুগত) সরকার গঠনের আশা পোষণ করতে থাকে। বনি সদরকে দিয়েই তারা এ লক্ষ্য হাসিল করতে চেয়েছিল। সত্যি বলতে কি Bani Sadar Phenomenon ছিল মার্কিনী Super Conspiracy-এর একটি দৃষ্টান্ত। কত সূক্ষ্ম যে হয় মার্কিনী চাল, কত বহুমুখী তাদের কূটকৌশল- এ ঘটনা থেকেই তার প্রমাণ মেলে। দুনিয়ার দেশে দেশে তারা সরকার ও সরকারবিরোধী উভয় মহলেই লোক নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করে। প্রয়োজনমতো উপযুক্ত ব্যক্তিকে ব্যবহার করে উদ্দেশ্য হাসিল করে থাকে। কিন্তু বনি সদর, কুতুবযাদেহকে দিয়ে মার্কিনীরা যা করতে চেয়েছিল তা বেশিদূর এগুতে পারেনি। ইসলামী বিপ্লবকে বিচ্যুত করা ও ইরানের নির্বাহী ব্যবস্থার উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে ভর করে ইরানে আমেরিকা সরকারের পুনঃপ্রবেশের সকল পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তেহরানে আমেরিকান গোয়েন্দা আস্তানা থেকে উদ্ঘাটিত দলিল-দস্তাবেজ থেকে সব ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে পড়ে। বনি সদর ও তার সহযোগীদের পদচ্যুতি ঘটে। বিশ্বাসঘাতকতার উপযোগী শাস্তি তাদেরকে পেতে হয় অল্প সময়ের মধ্যেই। মুজাহেদীনে খালক-এর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা হয়, কোথাও কোথাও পূর্বাহ্নেই ফাঁস হয়ে পড়ায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

১৯৮২ সালের এপ্রিলে ইরানী সেনাবাহিনীর ইসলামী বিপ্লবী আদালত ইসলামী প্রজাতন্ত্রী ব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে পরিচালিত আরেকটি বড় ধরনের ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটন করে। এ ষড়যন্ত্রের প্রধান পরিচালক ছিল সাদেক কুতুবযাদেহ। গ্রেফতারের পরে টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে কুতুবযাদেহ স্বীকার করে যে, তার সন্ত্রাসবাদী সাংগঠনিক ব্যবস্থা ইমাম খোমেইনী, সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদের সদস্যবর্গকে (প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ও সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদের সভাপতি আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী, ইসলামী মজলিস শুরার স্পীকার ও সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদে ইমামের তৎকালীন প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম হাশেমী রাফসানজানীসহ) হত্যা করার মতলব আঁটে। ইমাম খোমেইনীর বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ও জামারানে গোলাবর্ষণ করে এটা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সাম্রাজ্যবাদের ঘাপটি মেরে বসে থাকা চররা এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে ইমাম খোমেইনী ও সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদের সদস্যবর্গ ছাড়াও জামারানের দশ সহস্রাধিক লোক সে সময়ে মারা যেত। আল্লাহ পাকের অসীম রহমতে ষড়যন্ত্র পূর্বাহ্নেই ফাঁস হয়ে যায় তাদেরই লোকের মাধ্যমে।

এভাবে একের পর এক ষড়যন্ত্র ও আঘাতের ধারা অব্যাহত রাখার এক পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরাককে দিয়ে ইসলামী ইরানের ওপর একতরফাভাবে চাপিয়ে দেয় এক আকস্মিক ও সর্বাত্মক যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দাম্ভিক পরাশক্তি ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো অনেকটা প্রকাশ্যেই ইরাককে সমর্থন করে এবং অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে থাকে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এ সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। তারা ইরাকের এ হামলা বন্ধের জন্য কোনো প্রচেষ্টাই চালায়নি। ফলে হামলাকারীরা একেবারেই বাঁধাহীন থেকে গেছে। ইরাকের বিরুদ্ধে তখন কোন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়নি এবং ইরানী ভূখণ্ড ও সীমান্ত থেকে ইরাকী বাহিনীর নিঃশর্ত প্রত্যাহার দাবিও কেউ তোলেনি। উপরন্তু বিভিন্ন উপলক্ষে বিভিন্ন মহল থেকে ইরাকী আগ্রাসনের শিকার ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধেই কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এ ছিল এমন এক সময় যখন ইরানী সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। ইরানী সৈন্যরা ছিল অসংগঠিত। সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে ধর্মঘট, বিভিন্ন বিষয়ে অস্পষ্টতা, সংঘাত ও নানারকম অস্থিতিশীলতা ছিল, সামরিক শৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে সমরাস্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতি দেখা দেয়। বিদেশী সামরিক বিশেষজ্ঞদের বরখাস্ত করার পাশাপাশি বিরাজিত বিশৃঙ্খলা প্রকৃতপক্ষে সর্বক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক স্থবিরতার সৃষ্টি করে। সে সময় ইরানী বাহিনীর পক্ষে প্রকৃত অর্থে কোন প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শন করা ছিল একেবারেই অকল্পনীয় ও অপ্রত্যাশিত। কুফ্্রি শক্তির মদদপুষ্ট হয়ে সাদ্দাম হোসেন এ সময়টিকেই ইরানের ওপর হামলার জন্য বেছে নেয়।

হামলার সূচনাকালে ইরাকীরা কিছুটা সাফল্য অর্জন করলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে এ যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। ইরান ‘আত্মরক্ষার’ (Defensive) পর্যায় থেকে নিজেদেরকে সামনে নিয়ে ‘আক্রমণাত্মক’ (offensive) পর্যায়ে চলে আসে। আর তখনি শত্রুদের অশুভ উদ্দেশ্য আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ইহুদি, সোভিয়েত প্রতিক্রিয়াশীলরা সে সময় শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি জানায় এবং একই সাথে ইরানের বিরুদ্ধে ইরাককে সাহায্য জোরদার করে। এ সময় পারস্য উপসাগর দিয়ে উড়ে যাওয়াকালে ইরানী যাত্রীবাহী বিমানের ওপর হামলা করা হয়, ইরানের আবাসিক এলাকায় বোমা বর্ষণ করা হয় এবং ইরানের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। ইরাকী বাহিনী এক পর্যায়ে পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করে এবং পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে বিদেশী সৈন্যের উপস্থিতি দেখা দেয়। এক পর্যায়ে শান্তির স্বার্থেই জাতিসংঘের ৫৯৮ নং প্রস্তাব মেনে নিয়ে ইরান তাতে স্বাক্ষর করে। ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসে ইরাকী প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতা ও প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এ চিঠির প্রেক্ষিত ইরাক ও ইরানের মধ্যে বেশ কিছু পত্র বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে ইরাকী প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে ইরানের সাথে বিরোধ অবসানের কথা ঘোষণা করেন।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ইরান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের গোলামি হতে তার বিপ্লব ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লব এ কারণে আজো বিশ্বের মযলুম মানুষকে মুক্তির হাতছানি দিয়ে ডাকতে সক্ষম হচ্ছে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব নিম্নোক্ত বিষয়সমূহের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ : স্বৈরতন্ত্র, উপনিবেশবাদ ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়া; সকল বঞ্চিত ও নিপীড়িত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা, তাদেরকে আশা দান করা এবং তাদের সকলকে সংগ্রামে সমবেত করা, যুলুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সকলের দায়িত্ব হিসাবে গণ্য করা, এক্ষেত্রে নীরবতা বা নির্লিপ্ততাকে বিশ্বাসঘাতক মনোভাব হিসাবে বিবেচনা করা; জনগণের মধ্যে জিহাদের ও সংগ্রামের উদ্দীপনা সঞ্চার করা, উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিশেষ করে সকল জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য দুনিয়া জুড়ে শক্তি সৃষ্টি করা। ইরান ইসলামী বিপ্লবী মতাদর্শ হিসাবে মনে করে যে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও বঞ্চিতকে রক্ষা করা ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব। তাই এ বিপ্লবের প্রতি দাম্ভিক অপশক্তির ষড়যন্ত্র আর আক্রমণেরও শেষ নেই।

ষড়যন্ত্রের তালিকায় সাম্প্রতিক সংযোজন

সাম্প্রতিককালে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার মুরুব্বি সোভিয়েত ইউনিয়নে ও তার পক্ষপুটে আশ্রিত পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহে সমাজতন্ত্রের পতন এবং সোভিয়েত সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্নায়ুযুদ্ধের ঘটে অবসান। কিন্তু এ প্রেক্ষাপেট মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার নয়া ‘বিশ্বব্যবস্থার’ ছদ্মাবরণে দুনিয়াময় একক আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হয়ে উঠেছে। কমিউনিজমের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ইসলামী পুনরুজ্জীবন আন্দোলনসমূহকে বিশেষ করে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে টার্গেট করে ষড়যন্ত্রের নতুন জাল বুনে চলছে। উত্তেজনা সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য নতুন নতুন  ইস্যু তৈরি করছে পারস্য উপসাগরীয় এলাকায়। আবিষ্কার করছে আগ্রাসনের নতুন নতুন প্লট।

বস্তুত ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অব্যাহত অগ্রযাত্রা, নবতর শক্তি হিসাবে তার অভ্যুদয়ে কুফ্রি শক্তি আরো বেশি বিচলিত হয়েছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের তালিকায় তাই নতুন সংযোজন হচ্ছে আবু মুসা দ্বীপ। বিশ্বকুফ্‌রি শক্তি ইরানের সাথে আরব আমীরাত ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের বিরোধ উসকে দেয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগরের আবু মুসা দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে যথেষ্ট এবং ঐতিহাসিকভাবে এটি ইরানী ভূখণ্ডের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের একটি চুক্তিতে আবু মুসা দ্বীপের ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হয় এবং সেখানেকার নিরাপত্তা রক্ষায় ইরানের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। চুক্তিতে বলা হয়, কেবল প্রশাসন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও তেল আহরণের কাজ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমীরাত যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করবে। দ্বীপটিতে কারো অনুপ্রবেশজনিত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার হুমকি মোকাবিলা করার লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। অবশ্য ইরানের এ উদ্যোগকে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো ভিন্নভাবে দেখছে এবং এ নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমীরাতের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। এরই সুযোগ নিতে চাচ্ছে পশ্চিমা শক্তিবর্গ যারা প্রতিবেশীদের সাথে ইরানের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটুক- এটা মেনে নিতে পারে না এবং চায় পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা লেগে থাকুক যাতে তাদের নাক গলাবার সুযোগ ঘটে এবং হস্তক্ষেপও করতে পারে। আবু মুসা দ্বীপ প্রসঙ্গে তারা আরব নেতৃবৃন্দকে এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করে থাকে যে, ইরান আরব দেশগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ। এ বিরোধের সাথে জড়িত পক্ষগুলোর যেখানে করণীয় হচ্ছে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং নিজেদের সম্পর্কের উন্নয়নে প্রয়াস চালানো, সেখানে আবু মুসা দ্বীপের ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে এবং আরব লীগ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের বৈঠকে সংযুক্ত আরব আমীরাতের দখলিস্বত্বের পক্ষে একতরফা প্রস্তাব উত্থাপন এবং ইরানকে আবু মুসাসহ তিনটি দ্বীপ থেকে সরে পড়ার আহ্বান পরিস্থিতিকে জটিলতর করারই ইঙ্গিতবহ। নিকট অতীতের ইতিহাস যেখানে সুস্পষ্ট সাক্ষী হয়ে রয়েছে, এ অঞ্চলের প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের বিরোধ এদের কারো জন্যই ক্ষতি বই কল্যাণ বয়ে আনে না।  লাভবান হয় কেবল বাইরের ইন্ধনদাতা মতলববাজ পশ্চিমা কুফ্‌রি শক্তি।

সম্প্রতি ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে নিরাপত্তা অঞ্চল গঠনের পেছনেও রয়েছে মার্কিনী দুরভিসন্ধি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে, এ এলাকায় ইরাকের বামপন্থী সরকার কর্তৃক পাইকারি হারে শিয়াদের হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকা এ পদক্ষেপ গ্রহণে তাড়িত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা ভিন্ন। বরং আমেরিকা তার নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্যই এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উল্লেখ্য, ১৮ মাসেরও অধিককাল ধরে এ এলাকার জনগণ যখন বুলেট, বোমাসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল তখন কিন্তু পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমগুলো নীরব ভূমিকা পালন করে আসছিল। সম্প্রতি হঠাৎ করে তাদের মানবাধিকার চেতনা এতটা উপচে পড়ার কারণ কি? বোসনিয়া-হারজেগোভিনায় মুসলমানদের পর সার্বীয়দের দ্বারা নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ব্যাপারে মার্কিনীরা তৎপর হয় না কেন? ভারতে মুসলিম হত্যার ব্যাপারেও তো তাদেরকে কোনো উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় নি? বরং উল্টো ভারতের সাথে মার্কিনীরা যৌথ সামরিক সহযোগিতা পাততে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আসলে মার্কিনীদের ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে ‘নো ফ্লাই যোন’ গঠন করা এবং ইরাকের ওপর সাম্প্রতিক সামরিক অ্যাকশনে যাবার পেছনে যেসব মতলব কাজ করছে তা হচ্ছে :

১. ইসরাইলী সরকার কর্তৃক চার শতাধিক ফিলিস্তিনী অন্যায়ভাবে দেশ থেকে বহিষ্কার এবং নো-ম্যানস ল্যান্ডে তাদেরকে মানবেতর অবস্থায় ফেলে রাখা এবং বোসনিয়া-হারজেগোভিনায় মুসলিম হত্যা ও নারী নির্যাতনের পাশবিকতা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও মার্কিনীদের কোনো কার্যকর ভূমিকা না থাকার ব্যাপারটাকে আড়াল করা।

২. সাদ্দামের পতনের পর সম্ভাব্য ক্ষমতার ভারসাম্য এবং এ এলাকায় আমেরিকা ও তার মিত্রদের স্বার্থ রক্ষার্থে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের মন জয় করার প্রচেষ্টা।

৩. সাদ্দামের পতনকে আমেরিকা তার নিজস্ব স্ট্র্যাটেজির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করে না এবং বিশ্ববিবেকের চাপের মুখে এবং  পারস্য উপসাগরীয় এলাকার শাসকদের সন্তুষ্টি অর্জন এবং সাদ্দামবিরোধী ইরাকীদের মন জয় করার একটা কৌশল হিসাবে গ্রহণ করেছে।

সত্যি বলতে কি, ঠিক এ মুহূর্তেই সাদ্দামের পতন আমেরিকা নিজেই চায় না। আমেরিকা বর্তমান যা কিছু করছে তা এক ধরনের নাটক। আমেরিকা আসলে যা চাচ্ছে তা হচ্ছে সাদ্দামের একটি বিকল্প ব্যক্তিত্বের সন্ধান। সম্ভবত সে এখনও তেমন ধরনের ব্যক্তিত্বের সন্ধান পায়নি। আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে তার জন্য অনুকূল এমন একটি সময়েই সাদ্দামের পতন হওয়া উচিত যাতে সে বিশ্ববাসীর  দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় যে, সে সাদ্দামের নির্যাতনের হাত থেকে ইরাকী জাতিকে রক্ষা করেছে এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়কে সামনে রেখে ফায়দা লুটতে পারে। উত্তর ইরাকের পর দক্ষিণ ইরাকে নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন ও সামরিক অ্যাকশনের পেছনে ইরাককে খণ্ডিত করা ও সমগ্র এলাকাকে একটি মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন করার পাঁয়তারা কাজ করছে।

কমিউনিস্ট শাসনের লৌহ প্রাচীর ভেঙে এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলো নিয়েও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শুরু করেছে ষড়যন্ত্র। বস্তুত সাম্প্রতিককালে আজারবাইজান, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান প্রজাতন্ত্রগুলো স্বাধীনতা লাভ করলে এসব প্রজাতন্ত্রের মুসলমানগণ মস্কোর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় নীতি অনুসরণের সুযোগ পায়। উল্লেখ্য যে, এ অবস্থা কেবল মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলোর মধ্যেই সীমাবন্ধ থাকল না, বরং অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্রও নিজেরা নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে চাইল। এসব অঞ্চলে ইসলামী পুনর্জাগণের কিছু সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় এবং ইসলামী বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় কোনো কোনো রিপাবলিক কিছুটা এগিয়ে যাওয়ায় মৃতপ্রায় কমিউনিস্টরা সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামী শক্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তাজিকিস্তানে এ অপশক্তি যে তাণ্ডবলীলা ও অমানবিকতা প্রদর্শন করছে তার তুলনা কেবল বোসনিয়ায় সার্বীয় বাহিনীর পৈশাচিকতার সাথেই করা চলে। এখানে আরো একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, যে ইয়েলৎসিন রাশিয়ায় বসে কমিউনিস্টদের মোকাবিলা করেছেন তিনিই কিন্তু তাজিকিস্তানে নিজস্ব বাহিনী পাঠিয়ে কমিউনিস্টদেরকে সাহায্য করছেন মুসলিম হত্যাযজ্ঞে এবং ইসলামী পুনর্জাগরণ ঠেকাতে। ‘আল-কুফ্রু মিল্লাতুন ওয়াহিদাহ’ অর্থাৎ দুনিয়ার সকল কুফ্র আসলে একই মিল্লাত বা সম্প্রদায়- এর আরেক জ্বলন্ত উদাহরণ মুসলমানরা এখানে প্রত্যক্ষ করল। বস্তুত একই কারণে বিশ্বের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও মধ্য এশিয়ার এ বর্বরতায় নিশ্চুপ। স্ট্যালিনীয় স্টাইলের বর্বরতাও তাদের ‘মানবাধিকার’ চেতনাকে স্পর্শ করে না।

ইসলাম, মুসলিম জাতি ও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে পাশ্চ্যাত্যের আরেকটি ষড়যন্ত্র হচ্ছে ইসলামের মহান নবী (সা.)-এর ওপর অবমাননাকারী বিশ্ব নিন্দিত গ্রন্থ ‘দি স্যাটানিক ভার্সেস’- এর কুখ্যাত লেখক সালমান রুশদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ রদ করার জন্য ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের ফন্দি-ফিকির। উল্লেখ্য, ইমাম খোমেইনী রুশদীর এ দণ্ড বিশ্বসমক্ষে ঘোষণা করেছিলেন। এ জন্য সাম্রাজ্যবাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই কুখ্যাত লেখককে ব্রিটেনের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় সফর করানো এবং বক্তৃতা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। রুশদীর এসব বক্তৃতার বিষয় একটাই। তা হলো ইরানের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা এবং কিছু মহল তার বক্তৃতা-বিবৃতি এমনভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করেছে যাতে আসল বিষয়কে আড়াল করা যায়। শয়তান রুশদীর পক্ষে ওকালতিকারী সংবাদ মাধ্যমসমূহ যে বিষয়টি বেমালুম চেপে যায় তা হচ্ছে বিশ্বের একশ কোটি মুসলমানের বিশ্বাস ও আবেগ-উপলব্ধির ওপর শয়তান রুশদীর আঘাতের বিষয়টি। তারা এটিও উল্লেখ করেন না যে, এ নরাধম কর্তৃক মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসের ওপর  আঘাতের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বহু মুসলমানকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদের অনুচররা কেবল ইসলামী আইন অনুযায়ী ইমাম খোমেইনী কর্তৃক রুশদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে এবং এহেন অভিমত পেশের চেষ্টা করে যে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সংগতিহীন। কি অপূর্ব তাদের কৌশল! মোট কথা, সাম্রাজ্যবাদের অনুচররা এবং তাদের প্রচারমাধ্যমসমূহ শয়তান রুশদীর ক্ষমাহীন অপরাধের প্রসঙ্গে না গিয়ে বরং এটিকে ইসলামী ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসাবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। তাদের ধারণা এর মাধ্যমেই ইউরোপীয় দেশসমূহের সাথে ইরানের সম্পর্ক সৃষ্টি ঠেকানো যাবে, ইরানকে কিছুটা ‘একঘরে’ করা যাবে। অথচ আজকে পাশ্চাত্যে যারা শয়তান রুশদীকে আদর আপ্যায়ন করছে, তার পক্ষে ওকালতিতে নামছে, তাদের এ কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, এ শাস্তি যথোচিত যা এ নরাধমের প্রাপ্য এবং সারা মুসলিম দুনিয়া এ দণ্ডাদেশের পক্ষে রায় ঘোষণা করেছে। কাজেই যে পথে উপরিউক্ত মহল পা বাড়িয়েছে তাতে এ উদ্দেশ্য সফল হবে না যে, মুরতাদ রুশদীর দণ্ড মওকুফ হবে কোনোদিন। তবে পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অন্য কোনো মতলব হয়তো হাসিল করতে পারে, তা হচ্ছে ইসলামী ইরানের সাথে বিরোধিতাকে নবরূপ দেয়া, চাঙ্গা করা এবং আনুষঙ্গিক কিছু জটিলতা সৃষ্টি করা। এতে আর বিস্মিত হবারই কি আছে। নব্য ক্রুসেড তো ইউরোপীয়রা অনেক জায়গায়ই শুরু করে দিয়েছে, এটি হয়তো তার সাথে নবতর সংযোজন হবে।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার আসনে নতুন ব্যক্তি সমাসীন হয়েছেন। তৃতীয় বিশ্বের অতি উৎসাহী এবং সঠিক তথ্য সম্পর্কে অনবগত কিছু ব্যক্তি নির্বাচনের পূর্বে যা-ই আশাবাদ ব্যক্ত করে থাকুন না কেন নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় গিয়ে শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, “…The Leadership of America changes, but the policies do not.” ‘পলিসি’ বলতে এখানে বিল ক্লিনটন মৌলিক পলিসির কথাই বুঝিয়েছেন। একেবারেই সত্য কথা। তবে হ্যাঁ, পরিবর্তন যদি সামান্য হয়ও তা হবে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকে আরো তীব্রতর করার লক্ষ্যেই। কৌশলগত পদক্ষেপে নতুন নতুন মাত্রা সংযোজন করা হবে হয়ত। তারই পূর্বাভাষ পাওয়া যায় পাশ্চাত্যেরই সংবাদমাধ্যম রয়টার্স পরিবেশিত খবরে। তাতে বলা হয়েছে : ‘বিল ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট হবার পর মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন কৌশলগত অবস্থান ইরাকের থেকে ইরানের দিকে পরিবর্তিত হতে পারে। ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপ অধিকাংশ আরব সন্তুষ্ট নয়। তারা মনে করে আরবের আধুনিকপন্থী ও মার্কিন মিত্রদের (তাঁবেদার) ভবিষ্যতের জন্য ক্রমবর্ধমান সমস্যা হচ্ছে ইরানী ধাঁচের ইসলামী শক্তি।’ এ পর্যবেক্ষণ পরিষ্কার করে দিচ্ছে আমাদের পূর্বের আলোচনার সারবত্তাকে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের প্রশাসনের শেষ সময়কার বক্তৃতা-বিবৃতি থেকেও আভাষ পাওয়া যাচ্ছিল মার্কিনীরা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার পথ খুঁজছে। ইরান অস্ত্র কিনছে, ইরান পারমাণবিক সরঞ্জামাদি কিনছে ও তৈরি করছে ইত্যাকার অভিযোগ বুশ প্রশাসনের নিত্যদিনকার বুলিতে পরিণত হচ্ছিল। অথচ ইসরাইলের অস্ত্র কেনা ও পারমাণবিক ক্ষমতায় মার্কিনীরা কোনো দোষ খুঁজে পায়  না।

বস্তুত ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও তার অব্যাহত অগ্রযাত্রা ইরানের সমৃদ্ধি ও প্রভাব সারা দুনিয়ার সামনে আজকে একটি জ্বলন্ত বাস্তবতা। এ বিপ্লব দুনিয়ার সামনে এমন এক দর্শন উপস্থাপন করেছে, দুনিয়াকে এমন এক পথ দেখিয়েছে যা বিশ্বশোষক ও লুটেরাদের হাত থেকে মযলুম মানবতাকে মুক্তির সন্ধান দিতে পারে। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যেখানেই নিপীড়িত মানুষের ক্রন্দন শোনা যায়, সেখানেই ইসলামী বিপ্লবের আহ্বান পৌঁছে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র সেখানেই সাহায্যের হাত প্রসারিত করে। এই বিশেষ কারণটির জন্যই বিশ্বসাম্রাজ্যবাদ ইসলামী বিপ্লবের প্রতি খড়গহস্ত। তারা ভালো করেই জানে যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অগ্রযাত্রার মধ্যেই নিহিত রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী কুফ্‌রি শক্তির মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি। ইসলামী বিপ্লব সম্প্রসারণের মধ্যেই রয়েছে বিশ্বের সকল যালেম শক্তির প্রতি লেজ গুটিয়ে সরে পড়বার নির্দেশনামা। তাইতো মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রের চোখের ঘুমও উধাও হয়েছে। তাদের মসনদ হাতছাড়া হবার ভয়ে তারা শঙ্কিত এবং সাহায্যের আশায় আরো বেশি করে সাম্রাজ্যবাদের পদযুগল চুম্বন করছে। এ কথা আজ দিবালোকের মতোই পরিষ্কার যে, শুধু মধ্যপাচ্যে নয়, দুনিয়ার দেশে দেশে মুসলমানদের নিদ্রাভঙের জন্য ইরানের ইসলামী বিপ্লব আজানের কাজ করেছে। এ আওয়াজকে স্তব্ধ করে এ শক্তি কারো নেই। এ বিপ্লব মযলুম মানবতার জন্য মুক্তি ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবে- এটি কেবল আজকের প্রত্যাশা নয়, এ আমাদের প্রত্যয়। বিশ্বের তাবৎ যালেমের ওপর আমরা মযলুমদের বিজয়ের প্রহরই গুণছি।

(নিউজলেটার, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩)