শনিবার, ১৭ই আগস্ট, ২০১৯ ইং, ২রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

হোসাইনী আত্মত্যাগ : প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ১৪, ২০১৬ 

আব্দুল কুদ্দুস বাদশা
প্রত্যেক ঘটনা ও বীরত্বগাথা যতই মৌলিক ও সত্য ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকুক না কেন, যদি তা বিকৃতি ও বিদআতের কবলে পড়ে এবং কুসংস্কৃতি দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে কালক্রমে তার মৌলিকতা হারিয়ে ফেলে। আবার তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করার বিষয়েও যদি যথাযথ পন্থা অবলম্বন করা না হয় সেক্ষেত্রেও একই পরিণতি হতে বাধ্য। ফলে উক্ত বীরত্বগাথা কালক্রমে যে প্রভাব রাখার কথা, তা তো রাখেই না, উপরন্তু কখনো বা তা এতটা বিকৃত রূপ পরিগ্রহ করে থাকে যে, ক্রমান্বয়ে তা বিপরীত চেহারা ধারণ করে। অর্থাৎ বিপরীত ভূমিকা রাখতে থাকে। ৬১ হিজরির ১০ মুহররম তথা আশুরার দিনে কারবালার ফোরাত-কূলে নবীবংশের যে রক্তধারা ঝরেছে তা মরুভূমি শুষে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত দ্বীন ইসলামকে যে কীভাবে পানি সিঞ্চন করেছে তা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ‘হোসাইন আমা হতে ও আমি হোসাইন হতে’- এ অমর বাণীর মধ্যে প্রতিফলিত হয়। তাই আজ যদি বিশ্বের যে কোন প্রান্তে যে কেউ নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয় এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে তার নবী বলে মানে তবে তাকে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, ‘হোসাইন আমা হতে আর আমি হোসাইন হতে।’ কিন্তু কোন মুসলমান যদি নিজের মুসলমান হওয়া কিংবা ইসলামের টিকে থাকার ক্ষেত্রে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর কোন ভূমিকাই মানতে না চায়, বরং ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য শোক পালনকে তার মুসলমানিত্ব বা ইসলামের জন্য ক্ষতিকারক বলে মনে করে তাহলে বুঝতে হবে যে, সমস্যা হোসাইনী আশুরার মধ্যে নয়; বরং অন্য কোথাও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে- উপরের কথাগুলো দ্বারা যার প্রতি ইশারা করা হয়েছে। তাছাড়া কারবালার শহীদদের বীরত্বগাথায় যে সত্য তাওহীদি আত্মা নিহিত- যা সকল স্বেচ্ছাচারিতা, খোদাদ্রোহিতা ও অধার্মিক অত্যাচারী শাসককে উৎখাত করার এক বজ্রকঠিন শপথ, একারণে যুগে যুগে স্বৈরাচারী ও খোদাদ্রোহী শাসকরা নিজেদের অবৈধ স্বার্থকে অটুট রাখতে এ মহাবীরত্বগাথার মর্মকথাকে বিকৃত করার সর্বপ্রকার চেষ্টা চালিয়েছে। ইসলামকে বাঁচাবার জন্য মরু কারবালার বুকে নবী-দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (আ.)-এর এ মহান আত্মত্যাগকে ঘিরে তাই তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নানা প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে। অর্থাৎ ইমাম হোসাইনকে বাস্তবিকপক্ষে দু’বার মযলুম করা হয়েছে। দু’বারই তাঁর নানার উম্মত মুসলমানদের পক্ষ থেকে। একবার কারবালার ময়দানে। আরেকবার তাঁর মহান আত্মত্যাগকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর বলে ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার মাধ্যমে। এরূপ এক নির্মম বাস্তবতার মধ্য দিয়ে প্রতি বছর মুহররম মাস ও আশুরা আসে। তাই ইসলামের জন্য ইমাম হোসাইন (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগকে স্মরণ করে দু’টি কথা বলতে চাই।

“এক’’
ইমাম হোসাইন (আ.) নিজেকে কেন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলেন? পবিত্র কোরআনে তো নিষেধ করা হয়েছে : لا تُلقُوا بأيديکم إلي التَّهلُکهِ : ‘তোমরা  নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’ (সূরা বাকারা : ১৯৫)
মূলত এরূপ একটি প্রশ্নের অবতারণা করে ইমাম হোসাইনকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ইমাম হোসাইন কি আদৌ জানতেন, তিনি যে পথে অগ্রসর হচ্ছেন তার শেষ প্রান্তে মৃত্যু অপেক্ষমাণ! এটাও একটি প্রশ্ন। যদিও এ ব্যাপারে মুসলিম প-িতগণের দু’টি মত রয়েছে। একটি মত এসেছে ইবনে খালদুন ও আরো কতিপয় খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ও প-িতগণের পক্ষ থেকে। তাঁদের মতে, ইমাম হোসাইন (আ.) জানতেনই না যে, তাঁর এই বিপ্লব ও আন্দোলনের শেষ পরিণতি মৃত্যু ও শাহাদাত। সেক্ষেত্রে উপরিউক্ত অভিযোগেরও কোন অবকাশ থাকে না যে, তিনি কেন নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করলেন। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ অভিমত নিতান্তই দুর্বল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) যেমন জিবরাইল (আ.) মারফত অবগত হয়ে এ খবর দিয়ে গিয়েছিলেন, তেমনি ইমাম হোসাইনও ছিলেন মাসুম ইমাম এবং নবীজির ঐশী ইলমের আকর।
অন্য মতটি হলো, ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁর শাহাদাতের কথা অবগত ছিলেন। অনেকগুলো সূত্রে এটা প্রমাণিত। আর সেটাই যদি হয়ে থাকে তাহলে মূল প্রশ্নটি জোরদার হয়ে সামনে আসে যে, তিনি জানা সত্ত্বেও কেন নিজেকে মৃত্যুর মধ্যে নিক্ষেপ করলেন!
খুব তত্ত্বকথায় না গিয়ে বলা যায় যে, এ সংশয়টি ঐ সমস্ত লোকই উত্থাপন করে থাকে যারা বলে : জগতে ‘জীবন’ই হচ্ছে নিরঙ্কুশভাবে কাক্সিক্ষত বস্তু। স্বাভাবিক মৃত্যু আর আধ্যাত্মিকতা ও আদর্শিক মূল্যবোধকে রক্ষার জন্য জীবনকে উৎসর্গ করার মধ্যে কোন পার্থক্য এরূপ লোকদের চোখে পড়ে না। একারণেই তারা মনে করে যে, মৃত্যুর কথা জেনেও সে পথে অগ্রসর হওয়াটা আক্ল (বুদ্ধিবৃত্তি) ও শার (ধর্মীয় বিধান) উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ।
যারা এরূপ সংশয় সৃষ্টি করে তাদের উদ্দেশে বক্তব্য হলো-
প্রথমত, আপনারা ‘জীবন’ (ইসলামের পরিভাষায় যার নাম হায়াত) এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন। আপনাদের কথা সঠিক হতো তখনই যখন ‘জীবন’ এর অর্থ হতো শুধুই খাওয়া ও পান করা আর (যৌন) কামনার নিবৃত্তি। যেখানে একটি পশুর জীবনের সাথে পার্থক্য করার মতো কোন দিক খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ কোরআনের অভিধানে ও দ্বীনের বিশ্বকোষে হায়াত তথা জীবনের অর্থ অন্য কিছু লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেখানে حيات معقول  তথা বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিগ্রাহ্য জীবন এবং حيات طيبه  তথা শুচিময় পবিত্র জীবনের যে আভাস রয়েছে তার অর্থ হচ্ছে যথাযথ যুক্তিপ্রমাণ ও কারণনির্ভর এমন একটি জীবন যার মালিক আল্লাহ এবং সে জীবনটাও তাঁরই জন্য [ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন]। এক্ষেত্রে পশুসুলভ জীবন যে শুধু কাক্সিক্ষতই হতে পারে না, তা নয়; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিগ্রাহ্য জীবনের পথে তা প্রতিবন্ধকও বটে। মোটকথা, জীবনকে একমাত্র সেই ব্যক্তিই বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিগ্রাহ্য এবং পবিত্র অর্থে গ্রহণ করতে পারবে, যে এটাকে শাশ্বত ঐশী প্রজ্ঞা থেকে উৎসারিত বলে জানবে। আর তখন তার কাছে প্রাকৃতিক জীবনটা ঐ পবিত্র জীবনে উপনীত হওয়ার একটি মাধ্যম হিসাবে গণ্য হবেÑ যে জীবন পাওয়ার জন্য উক্ত ব্যক্তি দ্বীনি বিচক্ষণতা দ্বারা এরূপ হাজারটা প্রাকৃতিক জীবনকে উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠিত নয়। আর এই জীবনবোধ আশুরার রাতে ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগী সৈনিকদের মাঝে পূর্ণরূপে প্রত্যক্ষ করা যায়।
দ্বিতীয়ত, যে জিহাদ ও শাহাদাত দ্বীনকে বাঁচানো এবং মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য হয়, সেটা আল্লাহর রাহে সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগী পদক্ষেপ। পক্ষান্তরে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করা অন্য বিষয়। কথাটা এভাবে বলা যায় যে, মানবজাতির হেদায়াত তথা সুপথপ্রাপ্তির জন্য একদিকে যেমন হেদায়াতের ‘উৎপত্তি তথা সৃষ্টি কারণ’ আবশ্যক, অপরদিকে তেমনি হেদায়াত ‘বজায় থাকা কারণ’ও আবশ্যক। প্রথম কারণটি বাস্তবায়ন হয় আম্বিয়াগণের নবুওয়াত ঘোষণার মাধ্যমে। আর দ্বিতীয় কারণটি বাস্তবায়িত হয় ‘বেলায়াতে কোবরা’র মাধ্যমে। ইমাম হোসাইন (আ.) হলেন আম্বিয়াগণের সেই দাওয়াতের স্থায়িত্ব বজায় থাকার কারণ ও রহস্যকথা। ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁর ইমামতের জ্ঞানের স্থান থেকে যেমন অবগত ছিলেন যে, শাহাদাত বরণ করবেন, একইভাবে এটাও জানতেন যে, তাঁর শাহাদাত বরণের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানরা রক্ষা পাবে। তাই তো তিনি বলেছিলেন : إن کانَ دينُ محمد (صلّي الله عليه و آله ) لم يستَقم إلاّ بقَتلي فيا سيوف خُذيني ‘আমার কতল ব্যতীত যদি মুহাম্মাদের দ্বীন রক্ষা না পায় তাহলে এসো হে তরবারিসমূহ! আমাকে গ্রহণ কর।’ (নাসেখুত তাওয়ারিখ : ৩/১১৯) এভাবেই তিনি ইসলামের জীবনকে নিজ জীবনের ওপর অগ্রগণ্য করেছিলেন। অন্যত্র ইমাম বলেন : ليس الموت في سبيل العزِّ إلاّ حياهً خالدهً و ليست الحياهُ مع الذّلِّ إلاّ الموته الذي لا حياهَ معه ‘সম্মানের পথে মৃত্যু আসলে চিরন্তন জীবন বৈ নয় আর অপমানের সাথে বেঁচে থাকা সেই মৃত্যু বৈ নয় যার সাথে কোন জীবনই নেই।’  (মাওসুআতু কালিমাতিল ইমাম আল-হোসাইন : ৩৫৬)
অর্থাৎ ইমাম হোসাইন (আ.)-এর দ্বীনি দৃষ্টিকোণ ও শিক্ষায় জীবনের যৌক্তিকতা নিহিত রয়েছে সম্মান আর ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষা পাওয়ার মধ্যেই এবং এটাই শেষ কথা। একজন ইমাম ও দ্বীনের নেতা হিসাবে তাঁর ভূমিকা কেবল দ্বীন ও ইসলামী আদর্শকে রক্ষা ছাড়া আর কী হতে পারে? আশুরার রক্তরঞ্জিত স্মৃতিকথা এই সত্যেরই প্রতিরূপ মাত্র যে, দ্বীনের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ বিপদের সম্মুখীন হলে দ্বীনের নেতা প্রয়োজনে শুধু নিজের জীবনই নয়, গোটা পরিবারের জীবনকে উৎসর্গ করে হলেও দ্বীন রক্ষায় এগিয়ে আসবেন এবং যে কোন মূল্যে দ্বীনের প্রদীপকে নিভে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাবেন।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। তা হলো, দ্বীন রক্ষার বিষয়টি নির্দিষ্ট কোন সীমায় সীমাবদ্ধ নয়। দ্বীন ও ইসলামী আদর্শকে রক্ষা করা- সেটা যে কোন উপায়েই হোক না কেন, সকলের ওপর অবশ্য কর্তব্য। শেষ অবধি যদি এ গুরু দায়িত্ব পালন করতে জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করার প্রয়োজন পড়ে তবুও পিছপা হওয়া চলবে না।
জ্বি, তাই বলে যদি সাধারণ দ্বীনদাররা তাদের এ কর্তব্য পালনে শৈথিল্য দেখায়, দ্বীনের নেতা যিনি, তিনি তো নিজেকে দায়িত্বমুক্ত করতে পারেন না। অন্যরা দাঁড়ালে হয়তো তাঁকে এভাবে সপরিবারে, এমনকি ছয় মাসের শিশুকে নিয়ে শাহাদাত বরণ করত হতো না। এ থেকে বোঝা যায়, সেদিন ইসলাম ধর্ম কত বড় বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল আর দ্বীনের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.) কত বেশি অসহায় ও মযলুম হয়ে পড়েছিলেন! তাই আজ যে ইসলামেরই বদৌলতে পরের অনুগ্রহে নিজে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গৃহে পরম আয়েশে বসে ইমাম হোসাইন (আ.)-কে ‘নিজ হাতে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপে’র দায়ে অভিযুক্ত করে তাঁকে আরো মযলুম করার চেয়ে বরং এ বাক্যটির সারকথা উপলব্ধির চেষ্টাই শ্রেয় হবে : الإسلامه محمدي الحدوث و حسيني البقاء ‘ইসলামের গোড়াপত্তন মুহাম্মাদ কর্তৃক আর বেঁচে থাকা হোসাইন কর্তৃক।’

“দুই”
ঐশী নিয়ম-পদ্ধতি হতে শাহী-সুলতানী নিয়ম-পদ্ধতিকে পৃথক করতে হবে। হোসাইনী আন্দোলন ও কারবালার রক্তস্নাত শিক্ষার মধ্যে এটি অন্যতম শিক্ষা। অবশ্যই খোদায়ী ও দ্বীনি শাসনব্যবস্থাকে শাহী-সুলতানী ও পরিবারতান্ত্রিক একনায়ক শাসনব্যবস্থা হতে আলাদা করে দেখতে হবে। ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া যখন মদীনার গভর্নর ওয়ালিদকে ইমাম হোসাইন (আ.) হতে বাইআত আদায়ের নির্দেশ পাঠাল এবং তিনি উক্ত বাইআতে অস্বীকৃতি জানালেন তখন ওয়ালিদকে উদ্দেশ্য করে ইমাম বলেন : ايها الامير ! انّا اهل بيت النبوه و معدن الرساله و مختلف الملائکه، بنا فتح الله و بنا ختم الله و يزيد رجل فاسق شارب الخمر، قاتل النفس المحرّمه، معلن بالفسق و مثلي لا يبايع مثله و لکن نصبه و تصبحون و ننظر و تنظرون اينا احقّ بالخلافه و البيعه؟ ‘হে আমীর! আমরা হলাম নবুওয়াতের পরিবার ও রেসালাতের খনি। আর ফেরেশতাদলের গমনাগমনের ঠিকানা। আল্লাহ আমাদের (খান্দানের) মাধ্যমেই (ইসলামের) শুভ সূচনা করেছেন এবং শেষ অবধি আমাদের মাধ্যমেই এর পরিসমাপ্তি ঘটাবেন। কিন্তু ইয়াযিদ-যার জন্য আপনি আমার নিকট থেকে বাইআত আদায়ের অপেক্ষা করছেন-একজন ফাসেক ও মদ্যপ ব্যক্তি। যার হাত নিরপরাধ মানুষদের রক্তে রঞ্জিত। সে আল্লাহর হুকুম বিধানের সীমাকে চুরমার করে দিয়েছে এবং প্রকাশ্যে জনসম্মুখে অনাচার-ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। তাই আমার মতো কেউ তার মতো কারো কাছে বাইআত হতে পারে না। তবুও আপনি রাতটা অতিবাহিত করুন, আমরাও রাতটা অতিবাহিত করি। সকাল হোক। আমাদের ও আপনাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতকে বিবেচনা করতে হবে। তাহলে দেখবেন আমাদের মধ্যে কে খেলাফত ও ইসলামী উম্মাহর নেতৃত্ব দানে অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন আর কে জনগণের বাইআতের উপযুক্ত।’  (আল লুহুফ, পৃ. ২৩)
ইমাম হোসাইন (আ.)-এর যুক্তিপূর্ণ এ সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের উপসংহারে এসে যে সিদ্ধান্তমূলক কথাটি বলেছেন, তা আর তাঁর মহান বিপ্লবের বার্তাকে দেশ-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে নি। অনাগত কালের সত্যাগ্রহী মানুষদের জন্য তিনি এমনি এক মাপকাঠি হাতে তুলে দিয়ে গেছেন যা ইসলামকে রক্ষার যেমন অটুট ঢাল হয়ে থাকবে, সত্যাগ্রহী প্রতিটি মানুষকেও তেমনি স্বীয় পথ খুঁজে পেতে এবং স্বীয় কর্তব্য পালনের জন্য চির অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে। কারণ, তিনি বলেছেন : و مثلي لايبايع مثله ‘আমার মতো কেউ তার (ইয়াযিদের) মতো কারো কাছে বাইআত হতে পারে না।’ একজন পবিত্রতা ও ধার্মিকতার প্রতীক। অন্যজন পাপাচার ও খোদাদ্রোহিতার প্রতীক। একজন দ্বীনদার ও দ্বীনরক্ষায় প্রাণোৎসর্গকারী। আরেকজন দ্বীন ধ্বংসকারী ও দ্বীনদারের প্রাণহন্তা। এখন আমাদের কর্তব্য ঠিক করে নিতে হবে। হয় হোসাইনী পথ ধরে বেহেশতের সরদারের নেতৃত্বে বেহেশতবাসী হওয়া। নয়তো ইয়াযিদের পথ ধরে জাহান্নামের পথকে পরিষ্কার করা- যা ইসলামের শিক্ষা ছিল না। ইমাম মূসা কাযিম (আ.) হিশামের উদ্দেশে এক অসিয়তে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন : لیس لانفسکم ثمن الا الجنة فلا تبیعوها بغیرها  ‘তোমাদের জীবনের মূল্য জান্নাত ছাড়া কিছু নয়। সুতরাং ঐ মূল্যে ছাড়া তা বিক্রি করবে না।’ (আল আনওয়ারুল বাহিয়্যাহ ফি তাওয়ারিখিল হুজাজিল ইলাহিয়্যাহ, পৃ. ৪৫)