মঙ্গলবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

English

হাজ্বীদের উদ্দেশে রাহ্বার আয়াতুল্লাহ্ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর বাণী

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ২২, ২০১৯ 

 

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উযমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর হজ্ব-বাণী গত ১০ই আগস্ট (২০১৯) সকালে সর্বোচ্চ নেতার হজ্ব বিষয়ক প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন নাভাব্ ‘আরাফাতের ময়দানে সমবেত হাজ্বীদের উদ্দেশে পাঠ করে শোনান। এখানে রাহ্বারের হজ্ব-বাণীর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তুলে ধরা হলো :
বিসমিল্লাহির রাহ্মার্নি রাহীম।
ওয়াল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল ‘আলামীন ওয়া ছ¡াল্লাল্লাহু ‘আলা রাসূলিহিল্ কারীম্ আল-আমীন্ মুহাম্মাদ খাতামুন্নাবীয়্যীন ওয়া ‘আলা আালিহিল মুতাহ্হিরিন সিয়ামা বাক্বীয়াতুল্লাহি ফীল র্আদিন্ ওয়া ‘আলা আছ¡হাবিহিল মুনতাজাবীন ও মান্ তাবে‘আহুম্ বি-ইহসান ইলা ইয়াওমিদ্দীন্।
প্রতি বছর মুসলিম উম্মাহর প্রতি পরওয়ারদেগার আল্লাহ তা‘আলার রহমতের ফল্গুধারা হয়ে হজ্বের মওসুম আগমন করে। কোরআন মজীদ্ ‘ওয়া আয্যিন ফিন্নাসি বিল-হাজ্ব’ (লোকদের মধ্যে হজ্বে¡র ঘোষণা প্রদান করুন) বলে ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় এ রহমতের দস্তরখানে আসন গ্রহণ করার জন্য সকলের প্রতি আমন্ত্রণ জানিয়েছে। খোদাপ্রেমিকদের অন্তর এবং চিন্তাশীলদের দৃষ্টি ও চিন্তাশক্তি এ আহ্বানে সাড়া দেয়। প্রতি বছর হজ্ব পালনকারী ব্যক্তিদের মাধ্যমে হজ্বে¡র শিক্ষাগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
হজ্বে¡ আল্লাহ্র যিকির ও ইবাদত হলো ব্যক্তি ও সমাজের আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রধান উপকরণ, এক সঙ্গে মুসলমানদের সমাবেশ ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহর প্রমাণ বহনকারী এবং একত্ববাদের কেন্দ্রবিন্দুকে ঘিরে সব বর্ণের মানুষের তাওয়াফ্ ইসলামে বর্ণবৈষম্য না থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ তুলে ধরে। এর ফলে বোঝা যায় যে, ইসলামে বর্ণবৈষম্যের কোনো স্থান নেই এবং এখানে সকলের জন্য সমান সুযোগ অবারিত রয়েছে। আর হজ্বে¡র এ আনুষ্ঠানিকতা বিশাল মুসলিম সমাজের একটি ছোট্ট নমুনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। ইসলাম বিশ্ববাসীর সামনে আদর্শ মুসলিম সমাজের যে চিত্র তুলে ধরতে চায় ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ, উকূফ, রামী ইত্যাদি হচ্ছে সেগুলোর কিছু খ-চিত্র।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত দেশ ও অঞ্চলসমূহের মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও সম্পদের আদান-প্রদান, পরস্পরের খোঁজ-খবর নেয়া, ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো এবং অভিন্ন শত্রুর মোকাবিলা করার লক্ষ্যে সকলের সক্ষমতা একত্র করা হচ্ছে হজ্বের অন্যতম বিশাল অর্জন- যা অন্যান্য জমায়েত বা সমাবেশ শত শত বার অনুষ্ঠিত করেও অর্জন করা সম্ভব নয়।
হজ্বে¡র বারাআত (সম্পর্কচ্ছেদ) অনুষ্ঠানটি হচ্ছে নির্যাতিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর বলদর্পী ও আধিপত্যকামী শক্তিগুলোর সব ধরনের যুুলুম, নিষ্ঠুরতা, অন্যায় ও অপকর্মের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বলপ্রয়োগ ও ছাড় আদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলারই নামান্তর।
আজ র্শিক ও কুফ্রের আস্তানা হিসেবে পরিচিত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এবং তাদের নেতা আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নকরণ নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর ঘাতক ও যুদ্ধবাজদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করারই সমতুল্য। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থ হচ্ছে দায়েশ ও মার্কিন ব্ল্যাকওয়াটারের মতো উগ্র সন্ত্রাসবাদীদের নিন্দা জানানো, শিশু হত্যাকারী যায়নবাদী সরকার ও তাকে সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানকারীদের প্রতি মুসলিম উম্মাহর ঘৃণা প্রকাশ এবং স্পর্শকাতর পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে আমেরিকা ও তার সহযোগীদের যুদ্ধ বাঁধানোর অপতৎপরতার নিন্দা জানানো। এসব অপশক্তি বিভিন্ন নির্যাতিত জাতির দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্টকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে এবং প্রতিদিনই নানাভাবে তাদের ওপর নির্যাতন ও দমন অভিযান পরিচালনা করছে।
বারাআত অর্থ হচ্ছে ভৌগোলিক সীমানা, বর্ণ ও বংশগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সৃষ্ট বৈষম্য ও বর্ণবাদী আচরণের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নকরণ। সেই সঙ্গে বারাআতের আরেকটি লক্ষ্য হচ্ছে ন্যায়বিচার, সমতা ও সম্মানজনক আচরণের বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদী ও মতভেদ সৃষ্টিকারীদের জঘন্য আচরণের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন; কারণ, ইসলাম সকলকে ন্যায়বিচার, সমতা ও সম্মানজনক আচরণের দিকে আহ্বান জানিয়েছে।
এগুলো হচ্ছে হজ্বে ইবরাহীমীর বিশাল বরকতের কিছু ক্ষুদ্র নমুনা যেগুলোর প্রতি প্রকৃত ইসলাম আমাদেরকে আহ্বান জানায়। আর প্রতি বছর বিশ্বের মুসলমানদের অনেকে হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা পালন করে যে বিশাল ও অর্থপূর্ণ ইবাদতে শামিল হন তার মাধ্যমে কার্যত তাঁরা সুস্পষ্টভাবে সবাইকে জানিয়ে দেন যে, মুসলিম উম্মাহ্ ঠিক এ রকম একটি সমাজ গঠনের জন্যই যুগ যুগ ধরে অপেক্ষার প্রহর গুণছে।
এ ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের দেশসমূহের চিন্তাবিদগণ- যাঁদের একটা অংশ এই মুহূর্তে হজ্বের আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ করছেন, তাঁদের কাঁধে একটি বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। হজ্বের এ শিক্ষাগুলো তাঁদের মাধ্যমে মুসলিম বিশে^র আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া উচিত এবং সাধারণ মুসলমানদেরকে তাঁদের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে হবে।
বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে ফিলিস্তিন সংকট। ভাষা, বর্ণ ও মাযহাব নির্বিশেষে এ সংকট সকল মুসলমানের সব ধরনের রাজনৈতিক সমস্যার শীর্ষে স্থান পাওয়া উচিত। সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোর সবচেয়ে ভয়ানক যুলুম ফিলিস্তিনে সংঘটিত হয়েছে। এ বেদনাদায়নক ঘটনায় একটি জাতির ভূমি, ঘরবাড়ি, কৃষিক্ষেত, সহায়-সম্বল, সম্মান-সম্ভ্রম ও আত্মপরিচিতি সহ সব কিছু জবরদখল করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এ জাতি এখনো পরাজয় মেনে নেয় নি ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে নি, বরং প্রতিদিন নতুন উদ্যোমে জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হচ্ছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ফিলিস্তিনী জাতির এ প্রচেষ্টার সাফল্য নির্ভর করছে তাদের প্রতি সকল মুসলমানের সম্মিলিত পৃষ্ঠপোষকতার ওপর। যালেম আমেরিকা ও তার সহযোগী বিশ্বাসঘাতক শাসকেরা ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামের যে ধোঁকাবাজির ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে তা শুধু ফিলিস্তিনী জাতির বিরুদ্ধে নয়, বরং সমগ্র মানব জাতির বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। আমরা শত্রুর এ প্রতারণা ও অপকৌশলকে ব্যর্থ করে দেয়ার লক্ষ্যে সকলের সক্রিয় উপস্থিতি কামনা করছি এবং আশা করছি, ইনশা আল্লাহ্, ইসলামি প্রতিরোধ ফ্রন্টের ঈমান ও প্রচেষ্টার সামনে সাম্রাজ্যবাদীদের এ অপকৌশল সহ অন্যান্য ধোঁকাবাজি প- হয়ে যাবে।
আল্লাহ তা‘আলা যেমন বলেছেন : ‘না; তারা ষড়যন্ত্র করতে চায়? অতএব, যারা কাফের, তারাই ষড়যন্ত্রের শিকার হবে।’ ছ¡াদাক্বাল্লাহুল ‘আলীয়্যুল ‘আযীম্।
মহান আল্লাহর দরবারে সকল সম্মানিত হাজ্বীর জন্য সুস্বাস্থ্য, রহমত ও সাফল্য কামনার পাশাপাশি তাঁদের সকলের ইবাদত যাতে কবুল হয় সে জন্য দো‘আ করছি।
সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী
১৪ই মোরদাদ ১৩৯৮ ইরানি সাল
মোতাবেক ৩রা যিলহাজ্ব, ১৪৪০ হিজরি।